alt

সাময়িকী

ধারাবাহিক রচনা : আট

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

আহমেদ ফরিদ

: বুধবার, ০৬ অক্টোবর ২০২১

শিল্পী : সমর মজুমদার

(পূর্ব প্রকাশের পর)

১২.

আমাদের কোনো পড়াশোনা নেই আমাদের স্কুল নেই। আমরা স্কুলে যাওয়াটা খুব উপভোগ করতাম। দল বেঁধেই আমরা স্কুলে যেতাম। আমাদের স্কুলটা ছিল গ্রামের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে। আমাদের বাড়ি গ্রামের উত্তর প্রান্তে। আমরা কখনো একা স্কুলে যেতাম না। কমপক্ষে চার পাঁচজন আমাদের দলে থাকত। কেউ রেডি না থাকলে আমরা তাদের বাড়িতে গিয়ে অপেক্ষা করতাম। আমাদের বেশভূষা ছিল খুবই সাধারণ। একটা ট্রেটনের শার্ট আর হাফ প্যান্ট। সেন্ডেল, জুতা পরা ছিল বিশাল একটা বাহাদুরীর বিষয়। আমাদের সকলের হাফ-প্যান্টের সবকয়টা বোতাম সবসময় থাকত এমনটা নয়। মাঝে মাঝে বগা মিয়া বের হয়ে পড়ত প্যান্টের ফাঁক গলিয়ে। হাসির খোরাকের বেশি বলে কেউ একে মনে করত না। মাথায় আমরা প্রচুর তেল দিতাম। এতো বেশি তেল দিতাম যে সে তেল জুলফি বেয়ে গাল গড়িয়ে গলায় এসে গাদ হয়ে লেগে থাকত। যে যত বেশি মাথায় তেল দিত সে তত বেশি গর্ববোধ করত। আমাদের বইগুলো বাঁশের নেউল দিয়ে শক্ত করে বাঁধাই করে দিতেন আমাদের অভিভাকরা। কারণ, হাতের ঘামে বইগুলো ভিজে যেতো। বিশেষ কায়দায় বাঁশের ছটি দিয়ে মলাট লাগানো থাকত। এতে করে হাতের ঘাম লেগে বইগুলো কম নষ্ট হতো।

যুদ্ধের সময় বইগুলো বাবা তাকে উঠিয়ে রাখলেন। অহেতুক ঘাঁটাঘাঁটি করে যাতে নষ্ট না করি সেজন্য এ ব্যবস্থা। বইগুলোর জন্য আমার খুব মায়া লাগে। বইগুলো নতুন। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ যেনো আমার নাকে লেগে থাকত। আমার বইগুলো কি পাকিস্তানী সৈন্যরা পুড়িয়ে ফেলবে? ঘরে আগুন দিলে তো সব কিছুই পুড়বে। আমার মনে হলো পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের গ্রামে আসবে আর আসলে নিশ্চয়ই কোনো ঘরবাড়ি বাদ রাখবে না। সব আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেবে। আইয়ুব না ইয়াহিয়া খান নাকি বলেছে- এরা বাংলার মানুষ চায় না, চায় মাটি তাও মাধারণ মাটি নয় আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া মাটি। এ সকল খবর পাই আমারা বড়দের কাছ থেকে। বড়রা সন্ধ্যা হলেই খেয়ে দেয়ে চলে যায় নায়েব আলি কাকার দেকানে। নায়েব আলি চাচার দোকানে একটা বড় রেডিও আছে। সে রেডিওটা নাকি অনেক শক্তিশালী। নায়েব আলি কাকা খুব সৌখিন লোক। এমনিতেই তাঁর চেহারা সুরত খুব ভালো। গায়ের রঙ যথেষ্ট ফর্সা। ফর্সা দামি লুঙ্গি আর সাদা গেন্জি পরে থাকেন নায়েব আলি কাকা। তাঁর মাথার চুল বিরল হয়ে আসলেও সে চুল তৈলমর্দিত আর পরিপাটি থাকে সবসময়। তার একটা রেডিওটি ছিল। সেটি ছিট কাপড়ের কভারে ঢাকা থাকে। আমাদের খুব ইচ্ছে হয় রেডিওটি ধরে দেখার কিন্তু এটি সব সময় আমাদের নাগালের বাইরে থাকে। নায়েব আলি কাকা রেডিওটি কাউকে ধরতে দেয় না। এটিকে মাথা সমান উঁচু তাকের উপর তুলে রাখা হয়েছে। সওদা করতে গেলে আমরা মাঝে মাঝে কিছু গান শুনতে পাই মাত্র।

বড়দের আড্ডার আসর এখন নায়েব আলি কাকার দোকানে। অর্ধেক গ্রামের মানুষ এখন নায়েব আলি কাকার দোকানে এসে জড়ো হয়। সন্ধ্যার পরপরই আমাদের রাতের খাওয়া হয়ে যায়। আমাদের তখন পড়াশোনার কোনো বালাই নাই। যুদ্ধের কারণে স্কুল বন্ধ। বন্ধ না থাকলেও আমাদের মতো নিচের ক্লাসের ছাত্রদের রাত জেগে পড়াশোনা করার কোনো গরজ কেউ বোধ করত না। আর করলেই বা কী! সারা বিকাল প্রচন্ড খেলাধুলার পর আমাদের পক্ষে রাতের খাবার দাবার খেয়ে চোখ খোলা রাখা কোনো ভাবেই সম্ভব ছিল না।

বাবা কখন নায়েব আলি কাকার দোকানে যেতেন আর কখনই বা ফিরতেন তা টের পেতাম না। মাঝে মাঝে শুধু শুনতাম এ নিয়ে মা রাগে গজ গজ করছে। মাঝ রাতে বাড়ি না ফিরে বাকি রাতটুকু নায়েব আলি কাকার দোকানে কাটিয়ে দিলেই পারতো বলে মার অভিযোগ।

বড়দের আড্ডার আসর এখন নায়েব আলি কাকার দোকানে। অর্ধেক গ্রামের মানুষ এখন নায়েব আলি কাকার দোকানে এসে জড়ো হয়। সন্ধ্যার পরপরই আমাদের রাতের খাওয়া হয়ে যায়

যুদ্ধের খবর আমাদেরকে কেউ বলে না। আমরা বড়দের আলোচনা থেকে কিছু কিছু বুঝে নেই। অলস সময়ে বড়রা বাড়ির বারান্দায় বসে তামাক খেতে খেতে গল্প করে। সবই যুদ্ধের গল্প। সেই গল্পে ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর সব জিনিস থাকে। আমরা তামাক সাজিয়ে দেয়ার ছলে সেই গল্পগুলো শুনে নেই। কিংবা আড্ডার আশে পাশে কোনো একটা খেলা শুরু করে দেই। ভাবখানা এ রকম যে আমারা যুদ্ধের গল্পের কোনো ধার ধারি না। কিন্তু আমাদের চোখ খেলার দিকে থাকলেও কানকে উৎকীর্ণ করে রাখি আমরা আড্ডার দিকে।

সেখান থেকেই শুনলাম টিক্কা খান না কোনো এক খান বলেছে পূর্ব পাকিস্তানকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার জন্য। আমরা ভয় পেয়ে যাই। পূর্ব পাকিস্তানকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিবে? কিন্তু কীভাবে মিশাবে তা আমাদের মাথায় ঢুকে না। আমরা শুনেছি আর দেখেছিও- মানুষ মারা গেলে কবর দিতে হয়। কবর দেয়ার পর তার হাড়গোড়সহ পুরো শরীর মাটির সাথে মিশে যায়। সে কবর খুঁড়লে মাটি ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। পূর্ব পাকিস্তানকে কি মেরে কবর দেয়া হবে?

আমাদের সহপাঠি দেওয়ান আলি বলল, পাকিস্তানী সৈন্যরা আমাদেরকে মারবে না। তবে পূর্ব পাকিস্তানকে বোমা মেরে মেরে ওরা মেরে ফেলবে তার পর কবর দিয়ে দেবে। এভাবেই পূর্ব পাকিস্তান মাটির সাথে মিশে যাবে।

তাহলে আমরা যাবো কই? আমাদের শাহেদ ভাই প্রশ্ন করে। শাহেদ ভাই স্কুলে যায় না কিন্তু তার মাথা আমাদের চেয়ে বেশ পরিস্কার।

দেওয়ান আলির মুখ দিয়ে কোনো জবাব বের হয় না।

আমি আমার বইগুলো নিয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ি। বইগুলো কীভাবে রক্ষা করা যায়? একদিন বিকেলে আমাদের বারান্দায় বসে পাড়ার মুরুব্বীগণ যুদ্ধের গল্প করছেন। আমি কান পেতে শুনছি সে গল্প। তাদের কাছ হতে যা জানা গেলো যে কোনো দিন পাকিস্তানী আর্মি আমাদের গ্রামে আসতে পারে। আর আসলে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে। আমার মনে হলো বইগুলো আগে রক্ষা করা দরকার। কীভাবে বইগুলো রক্ষা করা যেতে পারে? আমি এ নিয়ে অনেক চিন্তা করেও কোনো কুল-কিনারা করতে পারলাম না। অবশেষে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি আসল। বইগুলি যদি আমি মাটির নিচে লুকিয়ে রাখি তাহলে কেউ দেখতে পাবে না। ঘরে আগুন দিলেও বইগুলি পুড়বে না। আমি বাবাকে আমার বই বাঁচানোর পরিকল্পনার কথা বললাম। বাবা দাত-মুখ খিচিয়ে আমাকে প্রচ-ভাবে ধমকালেন। মানুষের জান বাঁচে না, উনি আসছেন বইয়ের জান বাঁচাতে, বাবা বললেন। আমার খুব খারাপ লাগল। কারণ, বাবা আমাকে কখনো ধমক দেন না, অন্য কাউকেও না। আর একটা কারণে বেশি খারাপ লাগল, মানুষ জান নিয়ে পালাতে পারবে কিন্তু বই? তার তো কোনো হাত পা নেই যে আমাদের মতো করে সে পালাতে পারবে। আমাদের বইয়ের মলাটে হাত ধরাধরি করা দুটি ছেলেমেয়ের একটা ছবি ছিল। অন্যান্য বইতেও অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি ছিল। সবগুলি ছবিই কি তাহলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে? এক বুক অভিমান নিয়ে আমি চোখের পানি ফেলি। হায়! আমি বুঝি আমার বইগুলিকে বাঁচাতে পারলাম না। আমাদের খাটের উপরে একটা বাঁশের তাক। সেখানে বাবার পুঁথি, একপাশে কোরান শরীফ আর একদিকে আমার বই রাখা থাকে। আমি অভিমানে বইগুলোকে আর ছুঁই না। অনেক দিন দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত বইগুলো তাকের উপর পড়ে থাকে। কারণ পড়াশোনার কোনো তাগিদ আমাদের কারো ভিতরে কাজ করে না। স্কুল কলেজ সবকিছু বন্ধ। মানুষ ব্যস্ততাদের নিজেদের জীবন বাঁচাতে। সেখানে বইপত্রের জায়গা কোথায়। দেশ স্বাধীন হলে আমাদের জন্য নূতন বই আসে। সে বইগুলো আগের বইয়ের তুলনায় আরো সুন্দর। আমি ১৯৭১ সালে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। ১৯৭২ সালেও আমি দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রই থেকে যাই। আমাকে কেউ উপরের শ্রেণিতে উঠতে বলেনি, না স্কুল থেকে না আমার বাড়ি থেকে। অবশ্য আমাদের সাথের কেউই অটোপাস নেইনি বলে আমার মনে পড়ে। দেশ স্বাধীনের পর বিভিন্ন গ্রামে প্রাইমারি স্কুল স্থাপনের হিড়িক পড়ে যায়। আমাদের পাড়াতেও একটা স্কুল হয়। স্কুলটির নাম নূরপুর লাহাজুড়া প্রাইমারি স্কুল। স্কুলটি আমাদের বাড়ির খুব কাছে। আমাকে সেখানে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়। আমি পুরাতন স্কুলটিকে বিদায় জানিয়ে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়ে যাই। পুরানো স্কুলের জন্য আমার অনেক মায়া লাগে। পুরানো স্কুলটি ছিল একটা দালান বাড়ি আর শিক্ষকগণ ছিলেন অনেক অভিজ্ঞ আর বয়স্ক। নতুন স্কুলের শিক্ষদের সবাই নূতন আর অল্প বয়স্ক। তাদেরকে আমার শিক্ষক মনে হতো না। মনে হতো ভাই-বেরাদর, চাচা। তাঁরা অনেক যতœ করে আমাদেরকে পড়িয়েছেন। কারণ, স্কুলের পড়াশুনার মান ভালো না হলে, ভালো ফলাফল না হলে স্কুলটি জাতীয়করণ করা হবে না। বাঁশের বেড়া, বাঁশের বেঞ্চ আর টিনের ছাউনি ঘরে কেটে যায় আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জীবন।

১৩. যে পালায় সে বাঁচে

ঘুমে কাদা হয়ে আছি। মাঝ রাতে মা ডাকছেন- ওঠ রে আবু, ওঠ। আমি সারা বিকেল খেলে খেলে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়েছি, আমি এক দুই ডাকে উঠব কেনো? আমার দু’চোখের পাতা যেন কেউ আঠা দিয়ে জুড়ে দিয়েছে। তাছাড়া সকাল তো হয়নি। বাবা রেগে যান। ওর গায়ে পানি ঢেলে দাও তো। নবাবের বাচ্চাকে রেখেই তোমরা চলে যাও। ওকে পাকিস্তানি সৈন্যরা ধরে নিয়ে যাক। পাকিস্তানি সৈন্যরা কথায় লহমার মধ্যেই আমার চোখের পাতা খুলে যায়। আমি ধরমড় করে উঠে বসি বিছানায়। তাহলে কি শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনা আমাদের গ্রামে চলে এসেছ? আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে ওরা? ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেবে? আমার ছোট্ট কলিজা শুকিয়ে যায়। আমার পানি পিপাসা পেয়ে যায় এই শীতের রাতেও। আমি এক গ্লাস পানি চাই মায়ের কাছে। বাবা, মাকে তাড়া দেন, জীবন বাঁচলে ঢের পানি খাওয়া যাবে। মা কাঁসার বাটিতে করে একবাটি পানি দিলে আমি ঢকঢক করে পুরো বাটি শেষ করে দেই। মা ততক্ষণে কাপড়ের একটা ব্যাগে কিছু কাপড় চোপড় ভরে নিয়েছে।

আমাদের গন্তব্য কোথায় আমি কিছুই জানি না। যেখানেই যাই মা’র সাথে যাচ্ছি সেটাই বড় কথা। বাবার কোনো প্রস্তুতি নেই আমাদের সাথে যাওয়ার। তাহলে বাবা কি আমাদের সাথে যাচ্ছেন না? মনে হয় যাবে না। বাবা চলে গেলে আমাদের ঘরবাড়ি, গরু ইত্যাদি দেখবে কে? ততক্ষণে বাচ্চু মামা এসে বাড়িতে হাজির। বাচ্চু মামা আমার মেজো মামা।

দুনিয়ার সকল মামার মতো এই মেঝো মামাও আমাকে অত্যন্ত আদর করেন। মেঝো মামা আমাদের সাথে যাবে। আমরা মা-ছেলে আর মেঝো মামা বাড়ি ছেড়ে রওয়ানা দিলাম। কোথায় যাবো কীভাবে যাবো তার কিছুই জানা নেই। জানার মধ্যে একটাই জানা আছে আমাদেরকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে। যে কোনো মুহূর্তে পাকিস্তানি সৈন্য চলে আসতে পারে। ঘড়ি ধরে এরা আসবে না। আজ মাঝ রাতেও আসতে পারে, আবার আজানের সময়েও চলে আসতে পারে। বাবা নায়েব আলি কাকার দোকান থেকে জেনে এসেছে। নায়েব আলি কাকার দোকানের রেডিওতে আকাশবাণী,আগরতলার কেন্দ্র শোনাা যায়। সেখানে যুদ্ধের সকল খবর পাওয়া যায়। খবরের সাথে বাতাসে ভেসে বেড়ানো গুজব ধরে ধরে তিলকে তাল বানিয়ে ছাড়ে সবাই। সব খবরই যে গুজব তা নয়। রাজাকার আর পাকিস্তানি সৈন্যরা এর মধ্যেই বেশ কয়েকটা গ্রামে এসে বেশ কিছু মানুষ মেরে রেখে গিয়েছে। অবশ্য ওই গ্রামগুলি হিন্দু অধ্যুষিত। হিন্দুদেরকে মারার জন্যই রাজাকার আলবদর আর কাউসার বাহিনীর লোকজন পাকিস্তানি সৈন্যরাদেরকে নিয়ে এসেছিল। সেগুলি না হয় হিন্দু গ্রাম। কিন্তু আমাদের নূরপুর ফুলপুর? আমাদের গ্রামে তেমন হিন্দু নেই কিন্তু তারপরও এরা আসবে। কারণ, আমাদের গ্রাম দুটিতে প্রচুর মুক্তিযোদ্ধা আছে। কয়েকবার আসার জন্য রওয়ানা দিয়েও নাকি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আসতে পারে নাই। তবে এবার আর ছাড়াছাড়ি নেই। আজ রাতটা হতে পারে সেই অশুভ সময়।

উঠানে তখন মরা জ্যোস্না ঘরের চালের ছায়ার সাথে লুকোচুরি করছে। আমরা তিন আদম সন্তান ঘর থেকে বের হয়ে উঠোন পেরিয়ে রাস্তায় পড়েছি। আমাদের সাথে আরো দুই তিন জন সহযাত্রী। সুন্দরী বু আর তার দুই মেয়ে। পালানোর পরিকল্পনাটা তাহলে বেশ আগে থেকেই করা হয়েছে। আমি কিছুই টের পাইনি কেন?

পুবের খালে আমাদের নৌকাটা বাঁধা থাকত। গিয়ে দেখি সেখানে আমার নানী আর ছোট মামা। নানীর মাথায় গাট্টির মতো একটা কিছু। মনে হয় কাপড়-চোপড় হবে। এ দুনিয়ায় আমার সব চেয়ে প্রিয়তম মানুষটিকে দেখে আমার আনন্দ আর ধরে না। নানি আমাকে দিকে এগিয়ে এসে মাথায় হাত রেখে বিড় বিড় করে ‘আল্লাহু শাফি, আল্লাহু মাফি’ দোয়া পড়ে আমার মাথায় তিন ফুঁ দিল। এ কাজটা প্রতিবার নামাজ থেকে উঠে করা চাই নানির। আমার খুব লজ্জা লাগে। অনেক মানুষের সামনে যখন ফুঁক দেয় তখন আরো বেশি লজ্জা লাগে।

আমাদের কারো মুখে কোনো কথা নেই। কেবল নৌকা থেকে পানি সেচের ঝপ ঝপ শব্দ হচ্ছে। পানি সেচছে ছোট মামা ছায়েদ আলি। আমাদের নৌকাটাই এরকম। এটি চালাতে কম পক্ষে দুজন লাগে। একজন লাগে চালাতে আর একজনকে ফুটো দিয়ে ওঠা পানি ফেলতে। সংসার সম্পর্কে আবার বাবা যথেষ্ট উদাসীন ছিলেন। একজন সম্পন্ন কৃষকের ঘাটে এক দুইটা নৌকা বাঁধা না থাকলে ইজ্জত থাকে না। কিন্তু আমাদের অনেক দিন পর্যন্ত কেনো নৌকা ছিল না। লোকজন এ নিয়ে প্রচুর ঠাট্রা তামাশা করায় অবশেষে বাŸা একটা নৌকা কিনতে বাধ্য হলেন। তা ও ইসমাইল ভাইয়ের সেই ভাঙা নৌকা। নৌকার একটা গলুই না পাছা ছিল না। মিস্ত্রী ডেকে গলুই লাগানো হলো, আলকাতরা মাখানো হলো। নৌকা তখন বেশ ঝকঝকে তকতকে। আমার আনন্দের আর সীমা নেই। নিজেদের নৌকা তো হলো। যখন তখন সেই নৌকায় ওঠা যাবে। এদিক ওদিক যাওয়া যাবে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই দেখা গেলে নৌকার তলার কোনো একটা বাইন ফেটে গিয়ে পানি উঠছে। আজ সেই নৌকায় করেই আমরা জীবন বাঁচানোর জন্য এক অজানার উদ্যেশ্যে যাত্রা করছি। অজানা বললে হয়তো ভুল হবে কারণ আমাদের গন্তব্য আমার জানা না থাকলেও বড়রা সবাই জানে। আমি ভয়ে কাউকে প্রশ্ন করতে সাহস পাচ্ছি না। আমার মনে হচ্ছিল পাকিস্তানি সেনা আমরা যাদেরকে পাঞ্জাবি বলতাম তারা মনে হয় আমার ঘাড়ের উপর গরম নিশ্বাস ফেলছে। আমি ভয়ে পিছনে তাকাতে পারছি না।

আমাদের নৌকা ছেড়ে দিল। যাত্রা পুব দিকে। মাঠ জুড়ে গলা পানি। সেই গলা পানিতে আমন ধানের সবুজের বিছানা পেতে রাখা হয়েছে। মাঝে মাঝে জমির আইল। আইলের পানিকে মনে হচ্ছে সবুজ শাড়ির সাদা আঁচল। আলো আঁধারির এক অদ্ভুত পরিবেশ চারিদিকে। সারা মাঠ নিথর নিঃশব্দ। মাঠের বুক চিরে আমাদের নৌকা চলছে। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। প্রকৃতি আর আমাদের নৈশব্দতা মিলে কোনো এক অশুভ গুমোট পরিবেশ যেনো সৃষ্টি করেছে। মেঝো মামাই নৌকা চালাচ্ছে, মেঝো মামা ক্লান্ত হয়ে পড়লে ছোট মামা হয়তো চালাবে। অন্য সময় হলে তাদের কাছ থেকে লগি কেড়ে নিয়ে ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমিই হয়তো নৌকা চালাতাম। আজ আমার দেহ মন সবকিছুই কেমন অসাড় হয়ে পড়েছে। আমরা কি আমরা আবার আমাদের নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারব? আউলিয়া,সালেমা সাবেরাদের সাথে ফট্টি খেলা খেলতে পারব? আতিক,হামিদ, কাদির,লতিফ. দেওয়ান আলিদের সাথে ফুটবল খেলতে পারব? আমার মন বলছে, আমাদের আর ফেরা হবে না। মাঝ মাঠে গিয়ে দেখব রাজাকার আর পাকিস্তানী সৈন্যরা নৌকা নিয়ে আমাদেরকে ঘিরে ফেলেছে। তারপর? তারপর আর কী। সবাই পানিতে চুবিয়ে মারবে আর না হলে গুলি করে মারবে। অজানা আশংকায় আমি আতঙ্কিত। আমার মতো মনে হয় বড়দেরও অবস্থা একই। মেঝো মামা লগি মারছে কিন্তু তাতে কোনো জোর আছে বলে মনে হয় না। নৌকা কি সামনে যাচ্ছে? আমার মনে হচ্ছে নৌকাটি স্থির হয়ে আছে। আমরা কোথাও যেতে পারব না। মেঝো মামা নৌকা বাইতে থাকলে সা সা করে পানিতে এক রকম আওয়াজ আর ফেনা তুলে নৌকা যেনো দৌঁড়াতে থাকে। আজ আর এর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তবে কি রাজাকার আর পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে আমরা এখানেই মারা পড়ব?

বেশ কিছুক্ষণ পর আমাদের নৌকা কদমতলার খালে পড়ল। কদমতলা হলো আমাদের খেলার মাঠ। কাছাকাছি দুটি মাঠ। একটাতে বড়রা আর অন্যটাতে আমরা ছোটরা ফুটবল খেলি। ফা-ুন মাস থেকে আমরা সেই মাঠে খেলা শুরু করি, খেলা চলে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় মাস পর্যন্ত। তারপর মাঠ ডুবে যায়। মাঠ ডুবে গেলেও পানির উপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে কদমতলার কদম গাছটি। সেই গাছের আগায় ভুতের আলোর নাচন দেখেনি এরকম মানুষের সংখ্যা গ্রামে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আমি নিজেও বর্ষার সময় সেই কদম গাছের আগায় ভুতের আলো ছুটাছুটি করতে দেখেছি। মাঝ রাতে নাকি আমাদেরকে সেই ভুতের বাসস্থান কদম গাছের নিচ দিয়েই যেতে হবে! ভুত যদি নাও থাকে সাপ থাকবে নিশ্চয়ই। আমি নিজের চোখে দিনের বেলায় কদম গাছের ডালে ডোরা আর দাঁড়াস সাপকে পেছিয়ে থাকতে দেখেছি। দুয়েকটি নেমে এসে যদি আমাদের নৌকায় উঠে পড়ে তাহলে কী হবে ভাবতেই বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। ভুত, সাপ না কি পাঞ্জাবি, কার হাতে যে আজ মরণ আছে কে জানে! ভয়ে চোখ বন্ধ করে আছি। নানি বুঝতে পারছে আমি ভয় পেয়েছি। নানি আমাকে কাছে টেনে নিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে আমার মাথা ঢেকে দিল। আমার মনে হলো পৃথিবীর সকল আপদ-বিপদ নানির শাড়ির আঁচলের উপর দিয়ে চলে যাবে।

কদমতলার খাল পেরিয়ে মাকালার খাল। সেই খালটি বেশ গভীর আর চওড়া। সেখানে আবার চোর ডাকাত পড়ে বলে শুনেছি। খালটি গ্রাম থেকে বেশ দূরে। কোনো ডাকাত দল কী ওখান উৎপেতে আছে আমাদরেকে ধরার জন্য? এখানে চোর ডাকাত যদি আমাদেরকে ধরে তাহলে আর রক্ষা নেই। এরা হয়তো জানে মারবে না কিন্তু সবকিছু নিয়ে গিয়ে কিছু মারধর তো করবেই। যে ডাকাত মারধর করে না সে ডাকাত না কি ডাকাতই নয়। এই খালের পাড়ে আমাদের একটা বেশ বড় জমি আছে। আমাকে অসংখ্যবার এখানে বিভিন্ন কাজে আসতে হয়েছে। জমিতে বস্যাল ধান লাগানো হয়েছে। আমি আড়চোখে একবার জমিটির দিকে তাকাই। স্পষ্ট করে কিছু দেখা যায় না। কালো কোনো কিছু দাম বেধে পানির উপর ভাসছে বলে মনে হচ্ছে। কিছু দূর সামনে গিয়ে আমাদেরকে ডানে মোড় নিতে হলো। এখন সোজা কিছুদূর যেতে পারলে লক্ষীপুর গ্রাম। মাকালার খাল আমরা নিরাপদেই পার হয়ে যাই। এই খালটিতে তেমন কোনো ভয় নেই। তারপরও বলা যায় না। ডাকাতরা কোথায় উৎপেতে আছে কে জানে!

নানি সারাক্ষণ বিড় বিড় করে দোয়া-দরুদ পড়ছে। আমরা লক্ষীপুর গ্রামে নিরাপদে প্রবেশ করি। এখানে সুন্দরী বু’দের আত্নীয় বাড়ি। আমরা সেখানে তাদেরকে নামিয়ে দেই। আমাদেরকে আরো সামনে যেতে হবে। আমাদের গন্তব্য হলো ভোলাউকে। ভোলাউক যেতে হবে আরো একটা মাঠ পেরিয়ে। সে মাঠে চুরি ডাকাতি হয় কি না তা আমাদের জানা নেই। ঘন্টা খানেকের পথ। চাঁদের আলোতে খালের রুপালি পানি আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে চাঁদ ডুবতে বসেছে। আলো আঁধারির মধ্যেই আমরা ভোলাউক গ্রামে গিয়ে পৌঁছলাম। সেখানে নানির বাপের বাড়ি। ছোট্ট গ্রাম ভোলাউক। চারিদিকে পানি আর পানি। দেখে মনে হয় পানিতে ভাসমান এক খন্ড দ্বীপ। আমাদের আগমনে ধীরে ধীরে লোকজন চোখ কচলাতে কচলাতে আমাদেরকে দেখতে আসছে। পাকিস্তানি সৈন্যদের তাড়া খেয়ে আমরা পালিয়ে এসেছি- আমাদেরকে লোকজন বিস্মিত হয়ে দেখছে। মনে হয় আমরা অন্য গ্রহের লোক।

নানির চাচাতো ভাই মুইদর আলি। বেশ অবস্থাপন্ন লোক। কিন্তু তার অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে পড়েছে। মাত্র কয়েক দিন আগে তাদের ঘরে আগুন লেগে সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। এমন কি ধানের গোলা পর্যন্ত। সেই আধপোড়া ধান ঢেকিতে ছেঁটে চাল বানানো হয়। সেই চালের ভাত আমরা খাই। সেই ভাত আমার পক্ষ খাওয়া সম্ভব হয় না। জীবন বাঁচানোর জন্য সামান্য কিছু মুখে দিয়ে উঠে পড়ি।

কয় দিন ছিলাম ভোলাউকে আমার মনে নেই। খুব অল্পদিনই ছিলাম বলে মনে হয়। আমার বয়সী কেউ ঐ বাড়িতে ছিল কি না আমার মনে আসছে না। গ্রামটা আমার বেশ ভালো লেগেছিল। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। ঘর হতে বের হলেই সামনে চূড়াপুরের হাওড়। সেই হ্ওাড়ের মাঝ দিয়ে বহমান খাসটির খাল। খালটিকে খাল না বলে নদী বলাই ভালো। নদীর মতোই খালটি প্রশস্ত। এখান থেকেই দেখা যায় আমার ফুফুর গ্রাম রসুলপুর। নৌকায় করে আমি কতবারই না রসুলপুর গিয়েছি। ভোলাউক থাকত থাকতেই খবর পেলাম মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনে বেশ কয়েকজন লোক মারা পড়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় মুসলিম লীগের সবচেয়ে বড় নেতাটিও রয়েছেন। নেতা গিয়েছিলেন মহকুমা সদরে মিলিটারিদের সাথে মোলাকাত করার জন্য। সেখান থেকে মুক্তিবাহিনীকে কীভাবে দমন করা যায় তার দাওয়াই নিয়ে এসেছিলেন নিশ্চয়ই। কিন্তু তার আর নিজ বাড়িতে ফেরা হলো না। পথিমধ্যে তার শানদার নৌকাটি মুক্তিবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। তিনি পাটাতনের নিচে লুকিয়ে বাঁচার বৃথা চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু নিজেকে রক্ষা করতে পারেন নি। তার সাথে আরও কয়েকজনকে হত্যা করা হয়। বাকীরা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুবসাঁতারে অনেক দূর চলে গিয়ে নিজেদেরকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। ঘটনাটি পুরো থানায় সাড়া ফেলে। মুক্তিদের শক্তি সম্পর্কে মানুষের মনে আশার সঞ্চার হয়। এর আগে হত্যা করা আরো দুজনকে। একজন ছিলেন এলাকার নামকরা সর্দার আর একজন ছিলেন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। এদেরকে হত্যা করার পর বাকি যারা একটু একটু মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চেয়েছিল তারা আর সাহস করেনি। সারা থানায় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী মাত্র কয়েক জন লোক ছিল। এদের তিন চার জনকে হত্যা করার পর নাসিরনগর থানায় আর কোনো স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি।

ভোলাউক থেকে আমাদের প্রত্যাবর্তন ঘটে দিনের আলোতেই। আমাদের নৌকাটি আমাদের সাথেই ছিল। বাড়ি ফিরে দেখি সবকিছু আগের মতোই আছে। আপাতত পাকিস্তানি সৈন্যরা আসছে না। কেনো আসছে না কেউ তার কারণ বলতে পারছে না। কারো কারো মতে মুসলিম লীগ নেতাদের মারার কারণে প্রতিশোধ নিতে খুব শিগগিরই পাকিস্তানি সেনারা আসবে। সাপের লেজ দিয়ে কান চুলকালে সাপ ছোবল দিবেই। সাপের ছোবল থেকে বাঁচার জন্য আমাদের গাটটি-বোঁচকা সবসময়ই বাঁধা থাকে। আমরা জেনে গেছি, আমাদেরকে যেকোনো সময় জীবন বাঁচাতে পলাতে হবে। বড়রা যখন কথা বলে আমরা শুনি তারা ফিসফিস করছেন। কিসের এতো ফিসফিসানি? এই সকল ফিসফিসানি আমাদের ভয়কে আরো বাড়িয়ে দেয়।

তাদের ফিসফিসানি থেকে কিছু কিছু ঘটনা আমাদের কানে ঢুকে পড়ে। কোথায় যেনো এক হামিলদার (গর্ভবতী) মহিলাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা ফেলে। তারপর তার পেট চিড়ে ফেলে পেটের ভিতরে বাচ্চা কীভাবে থাকে তা দেখার জন্য। পেটের ভিতরে বাচ্চা দেখেই এরা ক্ষান্ত দেয় না। সেই বাচ্চাকে মায়ের পেট থেকে এনে দুপায়ে ধরে শুন্যে ছুড়ে মারে।

এ সব ঘটনা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বলেই হয়তো বড়রা আমাদের সামনে বলতে চান না। তারা চান না আমরা ভয় পেয়ে যাই। কিন্তু আমরা সারক্ষণ একটা ভয়ের মাঝেই থাকি। ক্রমশ...

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ইকরাম কবীর নিজেই নিজের গল্পের প্রেরণা

ছবি

বাউল, বাউলেশ্বর আর বাউলবিদ্বেষের অজান খবর

ছবি

চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের জীবনানন্দ ভ্রমণ

ছবি

খানসামা

ছবি

মোরগের ডাক

ছবি

নিরন্তর ধুলা ওড়ে

ছবি

ঘুণপোকা

ছবি

শামীম আজাদ-এর কবিতা

ছবি

করোনার টুকরো খবর

সাময়িকী কবিতা

ছবি

অঘ্রানের গন্ধের মতন : শাহিদ আনোয়ারের কবিতা

ছবি

শাহিদ আনোয়ার ও তাঁর কবিতা

ছবি

তাঁর দীর্ঘ ছায়া

ছবি

‘মেঘের ভিতরে তুমি দ্যাখো কোন পাখির চককর?’

ছবি

বানিয়ে বলা গল্পই হলো অমূল্য সম্ভার

ছবি

নব্বইয়ের দশকের কবিতা: বিশেষত্ব, বৈশিষ্ট্য ও সৃষ্টিশৈলী

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ছলম

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

ছবি

একটি পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থ

ছবি

সুবেদার রাজ্জাকের বীরত্বগাথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

লরেন্স ফারলিঙ্ঘেতির কবিতা

ছবি

অলকানন্দা

ছবি

মুখের দিকে না দেখে

ছবি

সোনা-মোড়া কথাশিল্প শহীদুল জহির

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

tab

সাময়িকী

ধারাবাহিক রচনা : আট

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

আহমেদ ফরিদ

শিল্পী : সমর মজুমদার

বুধবার, ০৬ অক্টোবর ২০২১

(পূর্ব প্রকাশের পর)

১২.

আমাদের কোনো পড়াশোনা নেই আমাদের স্কুল নেই। আমরা স্কুলে যাওয়াটা খুব উপভোগ করতাম। দল বেঁধেই আমরা স্কুলে যেতাম। আমাদের স্কুলটা ছিল গ্রামের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে। আমাদের বাড়ি গ্রামের উত্তর প্রান্তে। আমরা কখনো একা স্কুলে যেতাম না। কমপক্ষে চার পাঁচজন আমাদের দলে থাকত। কেউ রেডি না থাকলে আমরা তাদের বাড়িতে গিয়ে অপেক্ষা করতাম। আমাদের বেশভূষা ছিল খুবই সাধারণ। একটা ট্রেটনের শার্ট আর হাফ প্যান্ট। সেন্ডেল, জুতা পরা ছিল বিশাল একটা বাহাদুরীর বিষয়। আমাদের সকলের হাফ-প্যান্টের সবকয়টা বোতাম সবসময় থাকত এমনটা নয়। মাঝে মাঝে বগা মিয়া বের হয়ে পড়ত প্যান্টের ফাঁক গলিয়ে। হাসির খোরাকের বেশি বলে কেউ একে মনে করত না। মাথায় আমরা প্রচুর তেল দিতাম। এতো বেশি তেল দিতাম যে সে তেল জুলফি বেয়ে গাল গড়িয়ে গলায় এসে গাদ হয়ে লেগে থাকত। যে যত বেশি মাথায় তেল দিত সে তত বেশি গর্ববোধ করত। আমাদের বইগুলো বাঁশের নেউল দিয়ে শক্ত করে বাঁধাই করে দিতেন আমাদের অভিভাকরা। কারণ, হাতের ঘামে বইগুলো ভিজে যেতো। বিশেষ কায়দায় বাঁশের ছটি দিয়ে মলাট লাগানো থাকত। এতে করে হাতের ঘাম লেগে বইগুলো কম নষ্ট হতো।

যুদ্ধের সময় বইগুলো বাবা তাকে উঠিয়ে রাখলেন। অহেতুক ঘাঁটাঘাঁটি করে যাতে নষ্ট না করি সেজন্য এ ব্যবস্থা। বইগুলোর জন্য আমার খুব মায়া লাগে। বইগুলো নতুন। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ যেনো আমার নাকে লেগে থাকত। আমার বইগুলো কি পাকিস্তানী সৈন্যরা পুড়িয়ে ফেলবে? ঘরে আগুন দিলে তো সব কিছুই পুড়বে। আমার মনে হলো পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের গ্রামে আসবে আর আসলে নিশ্চয়ই কোনো ঘরবাড়ি বাদ রাখবে না। সব আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেবে। আইয়ুব না ইয়াহিয়া খান নাকি বলেছে- এরা বাংলার মানুষ চায় না, চায় মাটি তাও মাধারণ মাটি নয় আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া মাটি। এ সকল খবর পাই আমারা বড়দের কাছ থেকে। বড়রা সন্ধ্যা হলেই খেয়ে দেয়ে চলে যায় নায়েব আলি কাকার দেকানে। নায়েব আলি চাচার দোকানে একটা বড় রেডিও আছে। সে রেডিওটা নাকি অনেক শক্তিশালী। নায়েব আলি কাকা খুব সৌখিন লোক। এমনিতেই তাঁর চেহারা সুরত খুব ভালো। গায়ের রঙ যথেষ্ট ফর্সা। ফর্সা দামি লুঙ্গি আর সাদা গেন্জি পরে থাকেন নায়েব আলি কাকা। তাঁর মাথার চুল বিরল হয়ে আসলেও সে চুল তৈলমর্দিত আর পরিপাটি থাকে সবসময়। তার একটা রেডিওটি ছিল। সেটি ছিট কাপড়ের কভারে ঢাকা থাকে। আমাদের খুব ইচ্ছে হয় রেডিওটি ধরে দেখার কিন্তু এটি সব সময় আমাদের নাগালের বাইরে থাকে। নায়েব আলি কাকা রেডিওটি কাউকে ধরতে দেয় না। এটিকে মাথা সমান উঁচু তাকের উপর তুলে রাখা হয়েছে। সওদা করতে গেলে আমরা মাঝে মাঝে কিছু গান শুনতে পাই মাত্র।

বড়দের আড্ডার আসর এখন নায়েব আলি কাকার দোকানে। অর্ধেক গ্রামের মানুষ এখন নায়েব আলি কাকার দোকানে এসে জড়ো হয়। সন্ধ্যার পরপরই আমাদের রাতের খাওয়া হয়ে যায়। আমাদের তখন পড়াশোনার কোনো বালাই নাই। যুদ্ধের কারণে স্কুল বন্ধ। বন্ধ না থাকলেও আমাদের মতো নিচের ক্লাসের ছাত্রদের রাত জেগে পড়াশোনা করার কোনো গরজ কেউ বোধ করত না। আর করলেই বা কী! সারা বিকাল প্রচন্ড খেলাধুলার পর আমাদের পক্ষে রাতের খাবার দাবার খেয়ে চোখ খোলা রাখা কোনো ভাবেই সম্ভব ছিল না।

বাবা কখন নায়েব আলি কাকার দোকানে যেতেন আর কখনই বা ফিরতেন তা টের পেতাম না। মাঝে মাঝে শুধু শুনতাম এ নিয়ে মা রাগে গজ গজ করছে। মাঝ রাতে বাড়ি না ফিরে বাকি রাতটুকু নায়েব আলি কাকার দোকানে কাটিয়ে দিলেই পারতো বলে মার অভিযোগ।

বড়দের আড্ডার আসর এখন নায়েব আলি কাকার দোকানে। অর্ধেক গ্রামের মানুষ এখন নায়েব আলি কাকার দোকানে এসে জড়ো হয়। সন্ধ্যার পরপরই আমাদের রাতের খাওয়া হয়ে যায়

যুদ্ধের খবর আমাদেরকে কেউ বলে না। আমরা বড়দের আলোচনা থেকে কিছু কিছু বুঝে নেই। অলস সময়ে বড়রা বাড়ির বারান্দায় বসে তামাক খেতে খেতে গল্প করে। সবই যুদ্ধের গল্প। সেই গল্পে ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর সব জিনিস থাকে। আমরা তামাক সাজিয়ে দেয়ার ছলে সেই গল্পগুলো শুনে নেই। কিংবা আড্ডার আশে পাশে কোনো একটা খেলা শুরু করে দেই। ভাবখানা এ রকম যে আমারা যুদ্ধের গল্পের কোনো ধার ধারি না। কিন্তু আমাদের চোখ খেলার দিকে থাকলেও কানকে উৎকীর্ণ করে রাখি আমরা আড্ডার দিকে।

সেখান থেকেই শুনলাম টিক্কা খান না কোনো এক খান বলেছে পূর্ব পাকিস্তানকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার জন্য। আমরা ভয় পেয়ে যাই। পূর্ব পাকিস্তানকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিবে? কিন্তু কীভাবে মিশাবে তা আমাদের মাথায় ঢুকে না। আমরা শুনেছি আর দেখেছিও- মানুষ মারা গেলে কবর দিতে হয়। কবর দেয়ার পর তার হাড়গোড়সহ পুরো শরীর মাটির সাথে মিশে যায়। সে কবর খুঁড়লে মাটি ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। পূর্ব পাকিস্তানকে কি মেরে কবর দেয়া হবে?

আমাদের সহপাঠি দেওয়ান আলি বলল, পাকিস্তানী সৈন্যরা আমাদেরকে মারবে না। তবে পূর্ব পাকিস্তানকে বোমা মেরে মেরে ওরা মেরে ফেলবে তার পর কবর দিয়ে দেবে। এভাবেই পূর্ব পাকিস্তান মাটির সাথে মিশে যাবে।

তাহলে আমরা যাবো কই? আমাদের শাহেদ ভাই প্রশ্ন করে। শাহেদ ভাই স্কুলে যায় না কিন্তু তার মাথা আমাদের চেয়ে বেশ পরিস্কার।

দেওয়ান আলির মুখ দিয়ে কোনো জবাব বের হয় না।

আমি আমার বইগুলো নিয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ি। বইগুলো কীভাবে রক্ষা করা যায়? একদিন বিকেলে আমাদের বারান্দায় বসে পাড়ার মুরুব্বীগণ যুদ্ধের গল্প করছেন। আমি কান পেতে শুনছি সে গল্প। তাদের কাছ হতে যা জানা গেলো যে কোনো দিন পাকিস্তানী আর্মি আমাদের গ্রামে আসতে পারে। আর আসলে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে। আমার মনে হলো বইগুলো আগে রক্ষা করা দরকার। কীভাবে বইগুলো রক্ষা করা যেতে পারে? আমি এ নিয়ে অনেক চিন্তা করেও কোনো কুল-কিনারা করতে পারলাম না। অবশেষে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি আসল। বইগুলি যদি আমি মাটির নিচে লুকিয়ে রাখি তাহলে কেউ দেখতে পাবে না। ঘরে আগুন দিলেও বইগুলি পুড়বে না। আমি বাবাকে আমার বই বাঁচানোর পরিকল্পনার কথা বললাম। বাবা দাত-মুখ খিচিয়ে আমাকে প্রচ-ভাবে ধমকালেন। মানুষের জান বাঁচে না, উনি আসছেন বইয়ের জান বাঁচাতে, বাবা বললেন। আমার খুব খারাপ লাগল। কারণ, বাবা আমাকে কখনো ধমক দেন না, অন্য কাউকেও না। আর একটা কারণে বেশি খারাপ লাগল, মানুষ জান নিয়ে পালাতে পারবে কিন্তু বই? তার তো কোনো হাত পা নেই যে আমাদের মতো করে সে পালাতে পারবে। আমাদের বইয়ের মলাটে হাত ধরাধরি করা দুটি ছেলেমেয়ের একটা ছবি ছিল। অন্যান্য বইতেও অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি ছিল। সবগুলি ছবিই কি তাহলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে? এক বুক অভিমান নিয়ে আমি চোখের পানি ফেলি। হায়! আমি বুঝি আমার বইগুলিকে বাঁচাতে পারলাম না। আমাদের খাটের উপরে একটা বাঁশের তাক। সেখানে বাবার পুঁথি, একপাশে কোরান শরীফ আর একদিকে আমার বই রাখা থাকে। আমি অভিমানে বইগুলোকে আর ছুঁই না। অনেক দিন দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত বইগুলো তাকের উপর পড়ে থাকে। কারণ পড়াশোনার কোনো তাগিদ আমাদের কারো ভিতরে কাজ করে না। স্কুল কলেজ সবকিছু বন্ধ। মানুষ ব্যস্ততাদের নিজেদের জীবন বাঁচাতে। সেখানে বইপত্রের জায়গা কোথায়। দেশ স্বাধীন হলে আমাদের জন্য নূতন বই আসে। সে বইগুলো আগের বইয়ের তুলনায় আরো সুন্দর। আমি ১৯৭১ সালে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। ১৯৭২ সালেও আমি দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রই থেকে যাই। আমাকে কেউ উপরের শ্রেণিতে উঠতে বলেনি, না স্কুল থেকে না আমার বাড়ি থেকে। অবশ্য আমাদের সাথের কেউই অটোপাস নেইনি বলে আমার মনে পড়ে। দেশ স্বাধীনের পর বিভিন্ন গ্রামে প্রাইমারি স্কুল স্থাপনের হিড়িক পড়ে যায়। আমাদের পাড়াতেও একটা স্কুল হয়। স্কুলটির নাম নূরপুর লাহাজুড়া প্রাইমারি স্কুল। স্কুলটি আমাদের বাড়ির খুব কাছে। আমাকে সেখানে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়। আমি পুরাতন স্কুলটিকে বিদায় জানিয়ে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়ে যাই। পুরানো স্কুলের জন্য আমার অনেক মায়া লাগে। পুরানো স্কুলটি ছিল একটা দালান বাড়ি আর শিক্ষকগণ ছিলেন অনেক অভিজ্ঞ আর বয়স্ক। নতুন স্কুলের শিক্ষদের সবাই নূতন আর অল্প বয়স্ক। তাদেরকে আমার শিক্ষক মনে হতো না। মনে হতো ভাই-বেরাদর, চাচা। তাঁরা অনেক যতœ করে আমাদেরকে পড়িয়েছেন। কারণ, স্কুলের পড়াশুনার মান ভালো না হলে, ভালো ফলাফল না হলে স্কুলটি জাতীয়করণ করা হবে না। বাঁশের বেড়া, বাঁশের বেঞ্চ আর টিনের ছাউনি ঘরে কেটে যায় আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জীবন।

১৩. যে পালায় সে বাঁচে

ঘুমে কাদা হয়ে আছি। মাঝ রাতে মা ডাকছেন- ওঠ রে আবু, ওঠ। আমি সারা বিকেল খেলে খেলে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়েছি, আমি এক দুই ডাকে উঠব কেনো? আমার দু’চোখের পাতা যেন কেউ আঠা দিয়ে জুড়ে দিয়েছে। তাছাড়া সকাল তো হয়নি। বাবা রেগে যান। ওর গায়ে পানি ঢেলে দাও তো। নবাবের বাচ্চাকে রেখেই তোমরা চলে যাও। ওকে পাকিস্তানি সৈন্যরা ধরে নিয়ে যাক। পাকিস্তানি সৈন্যরা কথায় লহমার মধ্যেই আমার চোখের পাতা খুলে যায়। আমি ধরমড় করে উঠে বসি বিছানায়। তাহলে কি শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনা আমাদের গ্রামে চলে এসেছ? আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে ওরা? ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেবে? আমার ছোট্ট কলিজা শুকিয়ে যায়। আমার পানি পিপাসা পেয়ে যায় এই শীতের রাতেও। আমি এক গ্লাস পানি চাই মায়ের কাছে। বাবা, মাকে তাড়া দেন, জীবন বাঁচলে ঢের পানি খাওয়া যাবে। মা কাঁসার বাটিতে করে একবাটি পানি দিলে আমি ঢকঢক করে পুরো বাটি শেষ করে দেই। মা ততক্ষণে কাপড়ের একটা ব্যাগে কিছু কাপড় চোপড় ভরে নিয়েছে।

আমাদের গন্তব্য কোথায় আমি কিছুই জানি না। যেখানেই যাই মা’র সাথে যাচ্ছি সেটাই বড় কথা। বাবার কোনো প্রস্তুতি নেই আমাদের সাথে যাওয়ার। তাহলে বাবা কি আমাদের সাথে যাচ্ছেন না? মনে হয় যাবে না। বাবা চলে গেলে আমাদের ঘরবাড়ি, গরু ইত্যাদি দেখবে কে? ততক্ষণে বাচ্চু মামা এসে বাড়িতে হাজির। বাচ্চু মামা আমার মেজো মামা।

দুনিয়ার সকল মামার মতো এই মেঝো মামাও আমাকে অত্যন্ত আদর করেন। মেঝো মামা আমাদের সাথে যাবে। আমরা মা-ছেলে আর মেঝো মামা বাড়ি ছেড়ে রওয়ানা দিলাম। কোথায় যাবো কীভাবে যাবো তার কিছুই জানা নেই। জানার মধ্যে একটাই জানা আছে আমাদেরকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে। যে কোনো মুহূর্তে পাকিস্তানি সৈন্য চলে আসতে পারে। ঘড়ি ধরে এরা আসবে না। আজ মাঝ রাতেও আসতে পারে, আবার আজানের সময়েও চলে আসতে পারে। বাবা নায়েব আলি কাকার দোকান থেকে জেনে এসেছে। নায়েব আলি কাকার দোকানের রেডিওতে আকাশবাণী,আগরতলার কেন্দ্র শোনাা যায়। সেখানে যুদ্ধের সকল খবর পাওয়া যায়। খবরের সাথে বাতাসে ভেসে বেড়ানো গুজব ধরে ধরে তিলকে তাল বানিয়ে ছাড়ে সবাই। সব খবরই যে গুজব তা নয়। রাজাকার আর পাকিস্তানি সৈন্যরা এর মধ্যেই বেশ কয়েকটা গ্রামে এসে বেশ কিছু মানুষ মেরে রেখে গিয়েছে। অবশ্য ওই গ্রামগুলি হিন্দু অধ্যুষিত। হিন্দুদেরকে মারার জন্যই রাজাকার আলবদর আর কাউসার বাহিনীর লোকজন পাকিস্তানি সৈন্যরাদেরকে নিয়ে এসেছিল। সেগুলি না হয় হিন্দু গ্রাম। কিন্তু আমাদের নূরপুর ফুলপুর? আমাদের গ্রামে তেমন হিন্দু নেই কিন্তু তারপরও এরা আসবে। কারণ, আমাদের গ্রাম দুটিতে প্রচুর মুক্তিযোদ্ধা আছে। কয়েকবার আসার জন্য রওয়ানা দিয়েও নাকি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আসতে পারে নাই। তবে এবার আর ছাড়াছাড়ি নেই। আজ রাতটা হতে পারে সেই অশুভ সময়।

উঠানে তখন মরা জ্যোস্না ঘরের চালের ছায়ার সাথে লুকোচুরি করছে। আমরা তিন আদম সন্তান ঘর থেকে বের হয়ে উঠোন পেরিয়ে রাস্তায় পড়েছি। আমাদের সাথে আরো দুই তিন জন সহযাত্রী। সুন্দরী বু আর তার দুই মেয়ে। পালানোর পরিকল্পনাটা তাহলে বেশ আগে থেকেই করা হয়েছে। আমি কিছুই টের পাইনি কেন?

পুবের খালে আমাদের নৌকাটা বাঁধা থাকত। গিয়ে দেখি সেখানে আমার নানী আর ছোট মামা। নানীর মাথায় গাট্টির মতো একটা কিছু। মনে হয় কাপড়-চোপড় হবে। এ দুনিয়ায় আমার সব চেয়ে প্রিয়তম মানুষটিকে দেখে আমার আনন্দ আর ধরে না। নানি আমাকে দিকে এগিয়ে এসে মাথায় হাত রেখে বিড় বিড় করে ‘আল্লাহু শাফি, আল্লাহু মাফি’ দোয়া পড়ে আমার মাথায় তিন ফুঁ দিল। এ কাজটা প্রতিবার নামাজ থেকে উঠে করা চাই নানির। আমার খুব লজ্জা লাগে। অনেক মানুষের সামনে যখন ফুঁক দেয় তখন আরো বেশি লজ্জা লাগে।

আমাদের কারো মুখে কোনো কথা নেই। কেবল নৌকা থেকে পানি সেচের ঝপ ঝপ শব্দ হচ্ছে। পানি সেচছে ছোট মামা ছায়েদ আলি। আমাদের নৌকাটাই এরকম। এটি চালাতে কম পক্ষে দুজন লাগে। একজন লাগে চালাতে আর একজনকে ফুটো দিয়ে ওঠা পানি ফেলতে। সংসার সম্পর্কে আবার বাবা যথেষ্ট উদাসীন ছিলেন। একজন সম্পন্ন কৃষকের ঘাটে এক দুইটা নৌকা বাঁধা না থাকলে ইজ্জত থাকে না। কিন্তু আমাদের অনেক দিন পর্যন্ত কেনো নৌকা ছিল না। লোকজন এ নিয়ে প্রচুর ঠাট্রা তামাশা করায় অবশেষে বাŸা একটা নৌকা কিনতে বাধ্য হলেন। তা ও ইসমাইল ভাইয়ের সেই ভাঙা নৌকা। নৌকার একটা গলুই না পাছা ছিল না। মিস্ত্রী ডেকে গলুই লাগানো হলো, আলকাতরা মাখানো হলো। নৌকা তখন বেশ ঝকঝকে তকতকে। আমার আনন্দের আর সীমা নেই। নিজেদের নৌকা তো হলো। যখন তখন সেই নৌকায় ওঠা যাবে। এদিক ওদিক যাওয়া যাবে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই দেখা গেলে নৌকার তলার কোনো একটা বাইন ফেটে গিয়ে পানি উঠছে। আজ সেই নৌকায় করেই আমরা জীবন বাঁচানোর জন্য এক অজানার উদ্যেশ্যে যাত্রা করছি। অজানা বললে হয়তো ভুল হবে কারণ আমাদের গন্তব্য আমার জানা না থাকলেও বড়রা সবাই জানে। আমি ভয়ে কাউকে প্রশ্ন করতে সাহস পাচ্ছি না। আমার মনে হচ্ছিল পাকিস্তানি সেনা আমরা যাদেরকে পাঞ্জাবি বলতাম তারা মনে হয় আমার ঘাড়ের উপর গরম নিশ্বাস ফেলছে। আমি ভয়ে পিছনে তাকাতে পারছি না।

আমাদের নৌকা ছেড়ে দিল। যাত্রা পুব দিকে। মাঠ জুড়ে গলা পানি। সেই গলা পানিতে আমন ধানের সবুজের বিছানা পেতে রাখা হয়েছে। মাঝে মাঝে জমির আইল। আইলের পানিকে মনে হচ্ছে সবুজ শাড়ির সাদা আঁচল। আলো আঁধারির এক অদ্ভুত পরিবেশ চারিদিকে। সারা মাঠ নিথর নিঃশব্দ। মাঠের বুক চিরে আমাদের নৌকা চলছে। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। প্রকৃতি আর আমাদের নৈশব্দতা মিলে কোনো এক অশুভ গুমোট পরিবেশ যেনো সৃষ্টি করেছে। মেঝো মামাই নৌকা চালাচ্ছে, মেঝো মামা ক্লান্ত হয়ে পড়লে ছোট মামা হয়তো চালাবে। অন্য সময় হলে তাদের কাছ থেকে লগি কেড়ে নিয়ে ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমিই হয়তো নৌকা চালাতাম। আজ আমার দেহ মন সবকিছুই কেমন অসাড় হয়ে পড়েছে। আমরা কি আমরা আবার আমাদের নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারব? আউলিয়া,সালেমা সাবেরাদের সাথে ফট্টি খেলা খেলতে পারব? আতিক,হামিদ, কাদির,লতিফ. দেওয়ান আলিদের সাথে ফুটবল খেলতে পারব? আমার মন বলছে, আমাদের আর ফেরা হবে না। মাঝ মাঠে গিয়ে দেখব রাজাকার আর পাকিস্তানী সৈন্যরা নৌকা নিয়ে আমাদেরকে ঘিরে ফেলেছে। তারপর? তারপর আর কী। সবাই পানিতে চুবিয়ে মারবে আর না হলে গুলি করে মারবে। অজানা আশংকায় আমি আতঙ্কিত। আমার মতো মনে হয় বড়দেরও অবস্থা একই। মেঝো মামা লগি মারছে কিন্তু তাতে কোনো জোর আছে বলে মনে হয় না। নৌকা কি সামনে যাচ্ছে? আমার মনে হচ্ছে নৌকাটি স্থির হয়ে আছে। আমরা কোথাও যেতে পারব না। মেঝো মামা নৌকা বাইতে থাকলে সা সা করে পানিতে এক রকম আওয়াজ আর ফেনা তুলে নৌকা যেনো দৌঁড়াতে থাকে। আজ আর এর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তবে কি রাজাকার আর পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে আমরা এখানেই মারা পড়ব?

বেশ কিছুক্ষণ পর আমাদের নৌকা কদমতলার খালে পড়ল। কদমতলা হলো আমাদের খেলার মাঠ। কাছাকাছি দুটি মাঠ। একটাতে বড়রা আর অন্যটাতে আমরা ছোটরা ফুটবল খেলি। ফা-ুন মাস থেকে আমরা সেই মাঠে খেলা শুরু করি, খেলা চলে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় মাস পর্যন্ত। তারপর মাঠ ডুবে যায়। মাঠ ডুবে গেলেও পানির উপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে কদমতলার কদম গাছটি। সেই গাছের আগায় ভুতের আলোর নাচন দেখেনি এরকম মানুষের সংখ্যা গ্রামে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আমি নিজেও বর্ষার সময় সেই কদম গাছের আগায় ভুতের আলো ছুটাছুটি করতে দেখেছি। মাঝ রাতে নাকি আমাদেরকে সেই ভুতের বাসস্থান কদম গাছের নিচ দিয়েই যেতে হবে! ভুত যদি নাও থাকে সাপ থাকবে নিশ্চয়ই। আমি নিজের চোখে দিনের বেলায় কদম গাছের ডালে ডোরা আর দাঁড়াস সাপকে পেছিয়ে থাকতে দেখেছি। দুয়েকটি নেমে এসে যদি আমাদের নৌকায় উঠে পড়ে তাহলে কী হবে ভাবতেই বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। ভুত, সাপ না কি পাঞ্জাবি, কার হাতে যে আজ মরণ আছে কে জানে! ভয়ে চোখ বন্ধ করে আছি। নানি বুঝতে পারছে আমি ভয় পেয়েছি। নানি আমাকে কাছে টেনে নিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে আমার মাথা ঢেকে দিল। আমার মনে হলো পৃথিবীর সকল আপদ-বিপদ নানির শাড়ির আঁচলের উপর দিয়ে চলে যাবে।

কদমতলার খাল পেরিয়ে মাকালার খাল। সেই খালটি বেশ গভীর আর চওড়া। সেখানে আবার চোর ডাকাত পড়ে বলে শুনেছি। খালটি গ্রাম থেকে বেশ দূরে। কোনো ডাকাত দল কী ওখান উৎপেতে আছে আমাদরেকে ধরার জন্য? এখানে চোর ডাকাত যদি আমাদেরকে ধরে তাহলে আর রক্ষা নেই। এরা হয়তো জানে মারবে না কিন্তু সবকিছু নিয়ে গিয়ে কিছু মারধর তো করবেই। যে ডাকাত মারধর করে না সে ডাকাত না কি ডাকাতই নয়। এই খালের পাড়ে আমাদের একটা বেশ বড় জমি আছে। আমাকে অসংখ্যবার এখানে বিভিন্ন কাজে আসতে হয়েছে। জমিতে বস্যাল ধান লাগানো হয়েছে। আমি আড়চোখে একবার জমিটির দিকে তাকাই। স্পষ্ট করে কিছু দেখা যায় না। কালো কোনো কিছু দাম বেধে পানির উপর ভাসছে বলে মনে হচ্ছে। কিছু দূর সামনে গিয়ে আমাদেরকে ডানে মোড় নিতে হলো। এখন সোজা কিছুদূর যেতে পারলে লক্ষীপুর গ্রাম। মাকালার খাল আমরা নিরাপদেই পার হয়ে যাই। এই খালটিতে তেমন কোনো ভয় নেই। তারপরও বলা যায় না। ডাকাতরা কোথায় উৎপেতে আছে কে জানে!

নানি সারাক্ষণ বিড় বিড় করে দোয়া-দরুদ পড়ছে। আমরা লক্ষীপুর গ্রামে নিরাপদে প্রবেশ করি। এখানে সুন্দরী বু’দের আত্নীয় বাড়ি। আমরা সেখানে তাদেরকে নামিয়ে দেই। আমাদেরকে আরো সামনে যেতে হবে। আমাদের গন্তব্য হলো ভোলাউকে। ভোলাউক যেতে হবে আরো একটা মাঠ পেরিয়ে। সে মাঠে চুরি ডাকাতি হয় কি না তা আমাদের জানা নেই। ঘন্টা খানেকের পথ। চাঁদের আলোতে খালের রুপালি পানি আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে চাঁদ ডুবতে বসেছে। আলো আঁধারির মধ্যেই আমরা ভোলাউক গ্রামে গিয়ে পৌঁছলাম। সেখানে নানির বাপের বাড়ি। ছোট্ট গ্রাম ভোলাউক। চারিদিকে পানি আর পানি। দেখে মনে হয় পানিতে ভাসমান এক খন্ড দ্বীপ। আমাদের আগমনে ধীরে ধীরে লোকজন চোখ কচলাতে কচলাতে আমাদেরকে দেখতে আসছে। পাকিস্তানি সৈন্যদের তাড়া খেয়ে আমরা পালিয়ে এসেছি- আমাদেরকে লোকজন বিস্মিত হয়ে দেখছে। মনে হয় আমরা অন্য গ্রহের লোক।

নানির চাচাতো ভাই মুইদর আলি। বেশ অবস্থাপন্ন লোক। কিন্তু তার অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে পড়েছে। মাত্র কয়েক দিন আগে তাদের ঘরে আগুন লেগে সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। এমন কি ধানের গোলা পর্যন্ত। সেই আধপোড়া ধান ঢেকিতে ছেঁটে চাল বানানো হয়। সেই চালের ভাত আমরা খাই। সেই ভাত আমার পক্ষ খাওয়া সম্ভব হয় না। জীবন বাঁচানোর জন্য সামান্য কিছু মুখে দিয়ে উঠে পড়ি।

কয় দিন ছিলাম ভোলাউকে আমার মনে নেই। খুব অল্পদিনই ছিলাম বলে মনে হয়। আমার বয়সী কেউ ঐ বাড়িতে ছিল কি না আমার মনে আসছে না। গ্রামটা আমার বেশ ভালো লেগেছিল। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। ঘর হতে বের হলেই সামনে চূড়াপুরের হাওড়। সেই হ্ওাড়ের মাঝ দিয়ে বহমান খাসটির খাল। খালটিকে খাল না বলে নদী বলাই ভালো। নদীর মতোই খালটি প্রশস্ত। এখান থেকেই দেখা যায় আমার ফুফুর গ্রাম রসুলপুর। নৌকায় করে আমি কতবারই না রসুলপুর গিয়েছি। ভোলাউক থাকত থাকতেই খবর পেলাম মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনে বেশ কয়েকজন লোক মারা পড়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় মুসলিম লীগের সবচেয়ে বড় নেতাটিও রয়েছেন। নেতা গিয়েছিলেন মহকুমা সদরে মিলিটারিদের সাথে মোলাকাত করার জন্য। সেখান থেকে মুক্তিবাহিনীকে কীভাবে দমন করা যায় তার দাওয়াই নিয়ে এসেছিলেন নিশ্চয়ই। কিন্তু তার আর নিজ বাড়িতে ফেরা হলো না। পথিমধ্যে তার শানদার নৌকাটি মুক্তিবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। তিনি পাটাতনের নিচে লুকিয়ে বাঁচার বৃথা চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু নিজেকে রক্ষা করতে পারেন নি। তার সাথে আরও কয়েকজনকে হত্যা করা হয়। বাকীরা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুবসাঁতারে অনেক দূর চলে গিয়ে নিজেদেরকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। ঘটনাটি পুরো থানায় সাড়া ফেলে। মুক্তিদের শক্তি সম্পর্কে মানুষের মনে আশার সঞ্চার হয়। এর আগে হত্যা করা আরো দুজনকে। একজন ছিলেন এলাকার নামকরা সর্দার আর একজন ছিলেন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। এদেরকে হত্যা করার পর বাকি যারা একটু একটু মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চেয়েছিল তারা আর সাহস করেনি। সারা থানায় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী মাত্র কয়েক জন লোক ছিল। এদের তিন চার জনকে হত্যা করার পর নাসিরনগর থানায় আর কোনো স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি।

ভোলাউক থেকে আমাদের প্রত্যাবর্তন ঘটে দিনের আলোতেই। আমাদের নৌকাটি আমাদের সাথেই ছিল। বাড়ি ফিরে দেখি সবকিছু আগের মতোই আছে। আপাতত পাকিস্তানি সৈন্যরা আসছে না। কেনো আসছে না কেউ তার কারণ বলতে পারছে না। কারো কারো মতে মুসলিম লীগ নেতাদের মারার কারণে প্রতিশোধ নিতে খুব শিগগিরই পাকিস্তানি সেনারা আসবে। সাপের লেজ দিয়ে কান চুলকালে সাপ ছোবল দিবেই। সাপের ছোবল থেকে বাঁচার জন্য আমাদের গাটটি-বোঁচকা সবসময়ই বাঁধা থাকে। আমরা জেনে গেছি, আমাদেরকে যেকোনো সময় জীবন বাঁচাতে পলাতে হবে। বড়রা যখন কথা বলে আমরা শুনি তারা ফিসফিস করছেন। কিসের এতো ফিসফিসানি? এই সকল ফিসফিসানি আমাদের ভয়কে আরো বাড়িয়ে দেয়।

তাদের ফিসফিসানি থেকে কিছু কিছু ঘটনা আমাদের কানে ঢুকে পড়ে। কোথায় যেনো এক হামিলদার (গর্ভবতী) মহিলাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা ফেলে। তারপর তার পেট চিড়ে ফেলে পেটের ভিতরে বাচ্চা কীভাবে থাকে তা দেখার জন্য। পেটের ভিতরে বাচ্চা দেখেই এরা ক্ষান্ত দেয় না। সেই বাচ্চাকে মায়ের পেট থেকে এনে দুপায়ে ধরে শুন্যে ছুড়ে মারে।

এ সব ঘটনা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বলেই হয়তো বড়রা আমাদের সামনে বলতে চান না। তারা চান না আমরা ভয় পেয়ে যাই। কিন্তু আমরা সারক্ষণ একটা ভয়ের মাঝেই থাকি। ক্রমশ...

back to top