alt

অপরাধ ও দুর্নীতি

খিলগাঁওয়ে সিআইডি ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনের অত্যাচার, আতঙ্কে ১০ পরিবার

বাকী বিল্লাহ ও সাইফ বাবলু : বুধবার, ১৩ অক্টোবর ২০২১

সিআইডি পুলিশের এক ইন্সপেক্টরের দাপটে নিজের বাসায়ই প্রবাসীর মতো থাকতে হচ্ছে ১০ পরিবারকে। তাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, সন্ত্রাসীদের দিয়ে হামলা-মারপিট করা, এমনকি বাড়ি থেকে বিতারিত করার অব্যাহত হুমকি দিচ্ছেন সিআইডি ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন ও তার সহযোগীরা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনের ভাষ্য, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয়।

রাজধানীর খিলগাঁও থানার পূর্ব গোরানের এক বহুতল ভবনের বাসিন্দা ওই ১০ পরিবার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। এসব ঘটনায় খিলগাঁও থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার মেলেনি। এ পরিস্থিতিতে প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগীরা পুলিশ সদরদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ৪৪৮ পূর্ব গোরানের নিপুন মীর মহল ভবনে ১২টি ফ্ল্যাট। এই ভবনের দ্বিতীয় তলায় পূর্ব দিকের ফ্ল্যাটের মালিক বীনা বেগম। তার স্বামী সিআইডি ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন। ফ্ল্যাটে উঠার পর থেকে গত ৩ বছরযাবত তিনি, তার পরিবার এবং দ্বিতীয় তলার পশ্চিম পাশের ফ্ল্যাট মালিক নীলা বেগম (শামসুদ্দীনের ভাগনী) ওই ভবনের অন্যান্য বাসিন্দাদের উপর বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে আসছে। ফ্ল্যাটের অন্যান্য মালিকদের কথায় কথায় পেন্ডিং (পুরোনো) মামলায় আসামি করার হুমকি দিচ্ছেন।

শামসুদ্দিন ও তার পরিবার এবং আত্মীয়দের অত্যাচারে ওই ভবনের ৭ জন দারোয়ান চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন অথবা তাদের বিতারিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ জন দারোয়ানকে মারধর করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত ৩ সেপ্টেম্বর শামসুদ্দিন বহিরাগত সন্ত্রাসী দিয়ে ভবনে হামলা চালিয়ে এক দারোয়ারকে মারধর করেছেন। ওই ঘটনায় কয়েকজন ফ্ল্যাট মালিকও আহত হয়েছেন।

কারণে-অকারণে শামসুদ্দিন ও তার পরিবারের সদস্যরা জমির মালিকসহ অন্যান্য ফ্ল্যাট মালিকদের অশ্লীল ভাষায় গালমন্দ করেন।

এসব সমস্য সমধানে ফ্ল্যাট মালিকরা স্থানীয়দের মাধ্যমে কয়েক দফা বৈঠক করে ভবনে বসবাসের একটি নীতিমালা তৈরি করেন। কিন্তু ওই নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আসছেন শামসুদ্দিন ও তার পরিবারের লোকজন।

আর সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং খিলগাঁও থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ করায় অভিযোগকারী ফ্ল্যাট মালিকদের নানাভাবে হুমকিধমকি দিয়ে আসছেন শামসুদ্দিন।

গত ৩ বছর ধরে শামসুদ্দিন ফ্ল্যাট মালিক সমিতির নতুন কমিটি গঠনেও বাধা দিচ্ছেন। ভবনের কিছু সম্পত্তিও জোর করে দখল করে রেখেছেন বলে অভিযোগ।

পুলিশ সদরদপ্তরে লিখিত অভিযোগে স্বাক্ষর করেছেন ভবনের জমির মূল মালিক ও ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতি মীর লুৎফর রহমান, সৈয়দ লুৎফর সাইদ, এস এল সাদিক, এ এইচ এম এরশাদুজ্জামান (রুদ্র) লতিফা বেগম ১ এবং লতিফা বেগম ২, সাবিনা ইয়াসমিন, মিনারা এবং সাইফুল ইসলাম শিপন।

সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গছে, পূর্ব গোরানের তালুকদার গলিতে ৪৪৮ নম্বর জমির মূল মালিক মীর লুৎফর রহমান। ওই জমিতে ৭ তলা ভবন ও ১২টি ফ্ল্যাট নির্মাণের জন্য শফিউল আলম তারেকের মালিকানাধীন নিপুন প্রপার্টিস-এর সঙ্গে চুক্তি হয়।

চুক্তি অনুযায়ী ২০১৪ সালে ডেভেলপার কোম্পানি ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেয়ার কথা থাকলেও সেটি তারা করেননি। এমন পরিস্থিতিতে জমির মালিক ২০১৮ সালে নিজের ভাগের ফ্লাটগুলো দখলে নেন। ডেভেলপার কোম্পানি যাদের কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি করেন তারাও ফ্ল্যাটে উঠেন। ওই বাড়িতে দ্বিতীয় তলায় দুটি ফ্ল্যাট কিনেন সিআইডি ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন ও তার ভাগ্নি জামাতা জয়নাল। ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনের ফ্ল্যাটটি তার স্ত্রীর নামে এবং ভাগ্নি জামাতা জয়নালের ফ্ল্যাটটি শামসুদ্দিনের ভাগ্নি নীলার নামে। অন্যান্য ফ্ল্যাট মালিকদের মতো শামসুদ্দিন ও তার আত্মীয় জয়নালও ডেভেলপার কোম্পানির কাছ থেকে কেনা ফ্ল্যাট দখলে নিয়ে উঠেন।

ফ্ল্যাটে উঠার পর ১২টি ফ্ল্যাটের মালিকরা একটি সমিতি গঠন করেন। নিরাপত্তার জন্য দারোয়ান এবং ফ্ল্যাট মালিকদের নানা সুবিধা অসুবিধা দেখার জন্য কমিটি কাজ করবে। কমিটির বৈঠকে জমির মালিক মীর লুৎফর রহমানকে সভপাতি এবং পুলিশ ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনকে কমিটির সাধারণ সম্পদক নির্বাচিত করা হয়। পুলিশ ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পরই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। জমির মালিক ও অন্যান্য ফ্ল্যাট মালিকদের তোয়াক্কা না করে পুরো বাড়ি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন পুলিশ ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন। আর এ নিয়ন্ত্রণের জন্য ফ্ল্যাটের জমির মালিকসহ ১০ ফ্ল্যাট মালিকের জীবন অতিষ্ট করে তুলেছেন তিনি।

এসব ঘটনায় খিলগাঁও থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার মেলেনি। সিআইডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করায় ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন ১০ পরিবারের ওপর।

ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতি ও জমির মালিক মীর লুৎফর রহমান জানান, ১২টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ৬টি ফ্ল্যাটের মালিক তিনি। আর ৬টি ফ্ল্যাটের মালিক ডেভেলপার কোম্পানি। ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন ও তার আত্মীয় দুটি ফ্ল্যাট কিনে সেখানে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন।

শামসুদ্দিন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, তাই তাকে ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। তারা ভেবেছিলেন ফ্ল্যাট নিরাপত্তা এবং ভালো পরিবেশ তৈরি হবে। কিন্তু ফল হয় তার উল্টো, বললেন লুৎফর রহমান।

‘কথায় কথায় তিনি বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ে আসেন। একজন দারোয়ানকে দুদফা মারধর করিয়েছেন সন্ত্রাসীদের দিয়ে। এ বিষয়ে খিলগাঁও থানায় অভিযোগ করলেও কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি। পুরো বাড়ির ১০টি পরিবার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। শামসুদ্দিন তার লোকজনকে দিয়ে ফ্ল্যাট-ভবনের ১০ পরিবারকে ফোন করে গালমন্দ করেন,’ অভিযোগ লুৎফর রহমানের।

স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, গোরান এলাকার অপরাধী/সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো পুলিশ ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনের নিয়ন্ত্রণে। তাদের দিয়ে ফ্ল্যাট মালিকদের নাজেহাল করার ভয় দেখান।

এ বিষয়ে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় ১ মাস আগে ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনের বিষয়ে অভিযোগ জানাতে এক নারী এসেছিলেন। আমি সবকিছু শুনে ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনকে ডেকে সতর্ক করে বলেছি, অন্যান্য ফ্ল্যাট মালিকদের সঙ্গে বসে সমাধান করার জন্য। এও বলেছি, এ বিষয়টি সমাধান না করলে তারই সমস্যা হবে। আমি ওই নারীকে বলেছি, পরবর্তীতে কোন সমস্যা হলে আমাকে যেন জানায়। কিন্তু তারা আর না জানানোর কারণে আমি মনে করেছি বিষয়টি সমাধান হয়ে গেছে। এখন লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে সিআইডি বিভাগীয় তদন্ত করে ব্যবস্থা নিবে।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে শামসুদ্দিনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার পর প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়ে ফোন রিসিভকারী ব্যক্তি বলেন, ‘তিনি ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন নন’। তবে নাম্বারটি কিভাবে এ প্রতিবেদক পেলেন পাল্টা প্রশ্ন করেন। ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর নিশ্চিত হয়েই সংবাদের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। অবশেষে মঙ্গলবার (১২ অক্টোবর) বিকেলে তিনি সংবাদ কার্যালয়ে এসে জানান, তার বিরুদ্ধে বলা সব অভিযোগ সঠিক নয় বরং মিথ্যে। পুরো ভবনটি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। পেন্ডিং মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করছেন। তিনি উল্টো অভিযোগ করে বলেন, তারাই তাকে নানাভাবে হুমকি দিচ্ছেন। ফ্ল্যাটের বিভিন্ন গ্যারেজে বহিরাগতদের মোটরসাইকেল রাখার সুযোগ দেন। এতে সমস্যা হয়। তাকে ফ্ল্যাটের মালিক সুমনসহ অন্যান্য বিভিন্ন সময়ে দুদকের ভয় দেখিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। দারোয়ানকে তারাই মারধর করেছে। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক জিডি করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে তা সবই মিথ্যে। তিনি বলেন. মীর লুৎফর সাহেব ও তার ছেলেরা কাউকে মানে না। তবে মীর লুৎফর রহমানের পরিবার সংবাদকে জানান, নিরপেক্ষ সংস্থা দিয়ে সরজমিন তদন্ত করলে সিআইডি ইন্সপেক্টরের অপকর্মের নানা কাহিনী বেরিয়ে আসবে। আমরা শান্তিতে ও স্বত্বিতে ফ্ল্যাটে বসবাস করতে চাই।

ছবি

গাজীপুরে চালককে হত্যা করে ইজিবাইক ছিনতাই

উখিয়া রোহিঙ্গা শিবির থেকে দেশীয় অস্ত্রসহ ১৪ ডাকাত গ্রেপ্তার

ছবি

সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফের এপিএস আরও দুই দিনের রিমান্ডে

ছবি

ঘরের মেঝে খুঁড়ে বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার, আটক ১

ছবি

কুবিতে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মারামারির ঘটনায় আহত ১০

কুমিল্লায় সোশাল মিডিয়ায় অপপ্রচারের অভিযোগে আরও একজন গ্রেপ্তার

জবির চার শিক্ষার্থীসহ পাঁচ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট

বোয়ালমারীতে পুলিশের ওপর হামলা : আটক ৩

চাকরির বিজ্ঞাপনে প্রতারিত ১২শ’ যুবক : আটক ৩

ছবি

মিতু হত্যা : নারাজি আবেদনে বলা হয়, ‘বাবুল ষড়যন্ত্রের শিকার’

ছবি

কুমিল্লায় ‘উসকানি’ দিয়ে মন্দিরে হামলা : আটক ৪৩

ছবি

এহসান গ্রুপ, কিউকমসহ ১০ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব স্থগিত

ছবি

বিতর্কিত কাউন্সিলর চিত্তরঞ্জন দাস কারাগারে

ছবি

তসলিমা নাসরিনসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

ছবি

রাজধানীতে মাদক বিরোধী অভিযানে আটক ৪২

বিয়ের পাঁচ দিনের মাথায় স্বামীকে অচেতন করে নববধূ উধাও

মুদি দোকানি থেকে মানব পাচারকারী

ছবি

রাজউকের সাবেক গাড়ি চালক ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

যৌতুক, পরকীয়ায় বাধা দেয়াই কাল হয় স্বর্ণার

ছবি

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় নুরকে অব্যাহতি

লক্ষ্মীপুরে তাস খেলা বিবাদে জেলেকে হত্যার অভিযোগ

ছবি

ভান্ডারিয়ায় ফুটপাত দখল করে দোকান : যানজট

পাথরঘাটায় ছাত্রীকে উত্যক্তের প্রতিবাদী ৩ ছাত্রকে মারধর

প্রতিবাদী বৃদ্ধাকে মারধর

চেয়ারম্যানের প্রতারণায় হিন্দু পরিবার নিঃস্ব : তদন্তের নির্দেশ

ফরিদপুরে সাবেক মন্ত্রীর এপিএস ফুয়াদ আটক

ছবি

সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের এপিএস ফুয়াদ গ্রেপ্তার

ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে মানবপাচারকারী চক্রের প্রধানসহ আটক ৮

কিডনি বেচাকেনায় প্রতারণা, প্রতি কিডনি ২০ লাখ টাকা

শতাধিক ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারের দুর্নীতির অনুসন্ধানে দুদক

বগুড়ায় খাদ্যবান্ধব কর্মসুচীর ৭১ বস্তা চাল আটক

চাটখিলে অবাধে চলছে হাইড্রোলিক ট্রাক : দুর্ঘটনা প্রতিদিন

দুই জেলায় মা ইলিশ ধরায় ১৮২ জেলের কারাদন্ড শরীয়তপুর

কিশোরগঞ্জে ইয়াবা, যুবক ধৃত

সৈয়দপুরে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার

ছবি

সুইস ব্যাংকে প্রিন্স মুসার বিলিয়ন ডলারের সকল তথ্য মিথ্যা: ডিবি

tab

অপরাধ ও দুর্নীতি

খিলগাঁওয়ে সিআইডি ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনের অত্যাচার, আতঙ্কে ১০ পরিবার

বাকী বিল্লাহ ও সাইফ বাবলু

বুধবার, ১৩ অক্টোবর ২০২১

সিআইডি পুলিশের এক ইন্সপেক্টরের দাপটে নিজের বাসায়ই প্রবাসীর মতো থাকতে হচ্ছে ১০ পরিবারকে। তাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, সন্ত্রাসীদের দিয়ে হামলা-মারপিট করা, এমনকি বাড়ি থেকে বিতারিত করার অব্যাহত হুমকি দিচ্ছেন সিআইডি ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন ও তার সহযোগীরা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনের ভাষ্য, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয়।

রাজধানীর খিলগাঁও থানার পূর্ব গোরানের এক বহুতল ভবনের বাসিন্দা ওই ১০ পরিবার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। এসব ঘটনায় খিলগাঁও থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার মেলেনি। এ পরিস্থিতিতে প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগীরা পুলিশ সদরদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ৪৪৮ পূর্ব গোরানের নিপুন মীর মহল ভবনে ১২টি ফ্ল্যাট। এই ভবনের দ্বিতীয় তলায় পূর্ব দিকের ফ্ল্যাটের মালিক বীনা বেগম। তার স্বামী সিআইডি ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন। ফ্ল্যাটে উঠার পর থেকে গত ৩ বছরযাবত তিনি, তার পরিবার এবং দ্বিতীয় তলার পশ্চিম পাশের ফ্ল্যাট মালিক নীলা বেগম (শামসুদ্দীনের ভাগনী) ওই ভবনের অন্যান্য বাসিন্দাদের উপর বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে আসছে। ফ্ল্যাটের অন্যান্য মালিকদের কথায় কথায় পেন্ডিং (পুরোনো) মামলায় আসামি করার হুমকি দিচ্ছেন।

শামসুদ্দিন ও তার পরিবার এবং আত্মীয়দের অত্যাচারে ওই ভবনের ৭ জন দারোয়ান চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন অথবা তাদের বিতারিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ জন দারোয়ানকে মারধর করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত ৩ সেপ্টেম্বর শামসুদ্দিন বহিরাগত সন্ত্রাসী দিয়ে ভবনে হামলা চালিয়ে এক দারোয়ারকে মারধর করেছেন। ওই ঘটনায় কয়েকজন ফ্ল্যাট মালিকও আহত হয়েছেন।

কারণে-অকারণে শামসুদ্দিন ও তার পরিবারের সদস্যরা জমির মালিকসহ অন্যান্য ফ্ল্যাট মালিকদের অশ্লীল ভাষায় গালমন্দ করেন।

এসব সমস্য সমধানে ফ্ল্যাট মালিকরা স্থানীয়দের মাধ্যমে কয়েক দফা বৈঠক করে ভবনে বসবাসের একটি নীতিমালা তৈরি করেন। কিন্তু ওই নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আসছেন শামসুদ্দিন ও তার পরিবারের লোকজন।

আর সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং খিলগাঁও থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ করায় অভিযোগকারী ফ্ল্যাট মালিকদের নানাভাবে হুমকিধমকি দিয়ে আসছেন শামসুদ্দিন।

গত ৩ বছর ধরে শামসুদ্দিন ফ্ল্যাট মালিক সমিতির নতুন কমিটি গঠনেও বাধা দিচ্ছেন। ভবনের কিছু সম্পত্তিও জোর করে দখল করে রেখেছেন বলে অভিযোগ।

পুলিশ সদরদপ্তরে লিখিত অভিযোগে স্বাক্ষর করেছেন ভবনের জমির মূল মালিক ও ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতি মীর লুৎফর রহমান, সৈয়দ লুৎফর সাইদ, এস এল সাদিক, এ এইচ এম এরশাদুজ্জামান (রুদ্র) লতিফা বেগম ১ এবং লতিফা বেগম ২, সাবিনা ইয়াসমিন, মিনারা এবং সাইফুল ইসলাম শিপন।

সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গছে, পূর্ব গোরানের তালুকদার গলিতে ৪৪৮ নম্বর জমির মূল মালিক মীর লুৎফর রহমান। ওই জমিতে ৭ তলা ভবন ও ১২টি ফ্ল্যাট নির্মাণের জন্য শফিউল আলম তারেকের মালিকানাধীন নিপুন প্রপার্টিস-এর সঙ্গে চুক্তি হয়।

চুক্তি অনুযায়ী ২০১৪ সালে ডেভেলপার কোম্পানি ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেয়ার কথা থাকলেও সেটি তারা করেননি। এমন পরিস্থিতিতে জমির মালিক ২০১৮ সালে নিজের ভাগের ফ্লাটগুলো দখলে নেন। ডেভেলপার কোম্পানি যাদের কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি করেন তারাও ফ্ল্যাটে উঠেন। ওই বাড়িতে দ্বিতীয় তলায় দুটি ফ্ল্যাট কিনেন সিআইডি ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন ও তার ভাগ্নি জামাতা জয়নাল। ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনের ফ্ল্যাটটি তার স্ত্রীর নামে এবং ভাগ্নি জামাতা জয়নালের ফ্ল্যাটটি শামসুদ্দিনের ভাগ্নি নীলার নামে। অন্যান্য ফ্ল্যাট মালিকদের মতো শামসুদ্দিন ও তার আত্মীয় জয়নালও ডেভেলপার কোম্পানির কাছ থেকে কেনা ফ্ল্যাট দখলে নিয়ে উঠেন।

ফ্ল্যাটে উঠার পর ১২টি ফ্ল্যাটের মালিকরা একটি সমিতি গঠন করেন। নিরাপত্তার জন্য দারোয়ান এবং ফ্ল্যাট মালিকদের নানা সুবিধা অসুবিধা দেখার জন্য কমিটি কাজ করবে। কমিটির বৈঠকে জমির মালিক মীর লুৎফর রহমানকে সভপাতি এবং পুলিশ ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনকে কমিটির সাধারণ সম্পদক নির্বাচিত করা হয়। পুলিশ ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পরই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। জমির মালিক ও অন্যান্য ফ্ল্যাট মালিকদের তোয়াক্কা না করে পুরো বাড়ি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন পুলিশ ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন। আর এ নিয়ন্ত্রণের জন্য ফ্ল্যাটের জমির মালিকসহ ১০ ফ্ল্যাট মালিকের জীবন অতিষ্ট করে তুলেছেন তিনি।

এসব ঘটনায় খিলগাঁও থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার মেলেনি। সিআইডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করায় ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন ১০ পরিবারের ওপর।

ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতি ও জমির মালিক মীর লুৎফর রহমান জানান, ১২টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ৬টি ফ্ল্যাটের মালিক তিনি। আর ৬টি ফ্ল্যাটের মালিক ডেভেলপার কোম্পানি। ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন ও তার আত্মীয় দুটি ফ্ল্যাট কিনে সেখানে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন।

শামসুদ্দিন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, তাই তাকে ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। তারা ভেবেছিলেন ফ্ল্যাট নিরাপত্তা এবং ভালো পরিবেশ তৈরি হবে। কিন্তু ফল হয় তার উল্টো, বললেন লুৎফর রহমান।

‘কথায় কথায় তিনি বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ে আসেন। একজন দারোয়ানকে দুদফা মারধর করিয়েছেন সন্ত্রাসীদের দিয়ে। এ বিষয়ে খিলগাঁও থানায় অভিযোগ করলেও কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি। পুরো বাড়ির ১০টি পরিবার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। শামসুদ্দিন তার লোকজনকে দিয়ে ফ্ল্যাট-ভবনের ১০ পরিবারকে ফোন করে গালমন্দ করেন,’ অভিযোগ লুৎফর রহমানের।

স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, গোরান এলাকার অপরাধী/সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো পুলিশ ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনের নিয়ন্ত্রণে। তাদের দিয়ে ফ্ল্যাট মালিকদের নাজেহাল করার ভয় দেখান।

এ বিষয়ে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় ১ মাস আগে ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনের বিষয়ে অভিযোগ জানাতে এক নারী এসেছিলেন। আমি সবকিছু শুনে ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনকে ডেকে সতর্ক করে বলেছি, অন্যান্য ফ্ল্যাট মালিকদের সঙ্গে বসে সমাধান করার জন্য। এও বলেছি, এ বিষয়টি সমাধান না করলে তারই সমস্যা হবে। আমি ওই নারীকে বলেছি, পরবর্তীতে কোন সমস্যা হলে আমাকে যেন জানায়। কিন্তু তারা আর না জানানোর কারণে আমি মনে করেছি বিষয়টি সমাধান হয়ে গেছে। এখন লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে সিআইডি বিভাগীয় তদন্ত করে ব্যবস্থা নিবে।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে শামসুদ্দিনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার পর প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়ে ফোন রিসিভকারী ব্যক্তি বলেন, ‘তিনি ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন নন’। তবে নাম্বারটি কিভাবে এ প্রতিবেদক পেলেন পাল্টা প্রশ্ন করেন। ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিনের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর নিশ্চিত হয়েই সংবাদের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। অবশেষে মঙ্গলবার (১২ অক্টোবর) বিকেলে তিনি সংবাদ কার্যালয়ে এসে জানান, তার বিরুদ্ধে বলা সব অভিযোগ সঠিক নয় বরং মিথ্যে। পুরো ভবনটি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। পেন্ডিং মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করছেন। তিনি উল্টো অভিযোগ করে বলেন, তারাই তাকে নানাভাবে হুমকি দিচ্ছেন। ফ্ল্যাটের বিভিন্ন গ্যারেজে বহিরাগতদের মোটরসাইকেল রাখার সুযোগ দেন। এতে সমস্যা হয়। তাকে ফ্ল্যাটের মালিক সুমনসহ অন্যান্য বিভিন্ন সময়ে দুদকের ভয় দেখিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। দারোয়ানকে তারাই মারধর করেছে। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক জিডি করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে তা সবই মিথ্যে। তিনি বলেন. মীর লুৎফর সাহেব ও তার ছেলেরা কাউকে মানে না। তবে মীর লুৎফর রহমানের পরিবার সংবাদকে জানান, নিরপেক্ষ সংস্থা দিয়ে সরজমিন তদন্ত করলে সিআইডি ইন্সপেক্টরের অপকর্মের নানা কাহিনী বেরিয়ে আসবে। আমরা শান্তিতে ও স্বত্বিতে ফ্ল্যাটে বসবাস করতে চাই।

back to top