alt

উপ-সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব বাহিনী

মোস্তাফা জব্বার

: সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১

পাঁচ

মহিউদ্দিন আহমদ তার বইতে মুজিব বাহিনী সম্পর্কে বেশকিছু মন্তব্য করেছেন। বিশেষ করে মুজিব বাহিনী গঠন ও তার কার্যক্রম নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হতে পারে। তার মতে, ভুল বোঝাবুঝির জন্য মুজিব বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর মাঝে বেশ কয়েক স্থানে সংঘাত হয়। বিশেষ করে তিনি ২ নাম্বার সেক্টরের কথা উল্লেখ করেছেন।

মহিউদ্দিন মনে করেন শেখ মনি, তাজউদ্দীন ও খালেদ মোশাররফ উভয়ের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তার অভিযোগ ছিল, খালেদ তার সেক্টরে বামপন্থি ছাত্রদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিচ্ছেন। দেশের অন্য তিনটি অঞ্চলে এ ধরনের কোন সংঘাত ছিল না। সেসব অঞ্চলে তারা সবাই পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ করতেন। দেখা গেছে, অনেক জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান নেতা ছিলেন বিএলএফের কমান্ডার। খুলনা, যশোর, বগুড়া, রংপুর- এসব জেলায় বিএলএফের জেলা ও মহকুমা কমান্ডাররা সব মুক্তিযোদ্ধারাই নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেসব জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কোনো বিভাজন ছিল না।

২ নম্বর সেক্টরে ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিনের বাহিনীর সঙ্গে বিএলএফের একটি দলের সংঘর্ষ হয়েছিল। বিষয়টি সুরাহা করার জন্য আওয়ামী লীগের নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী আইনউদ্দিনের কাছে গেলে তিনি বাংলাদেশ সরকারের একটা চিঠি দেখান। চিঠিতে লেখা ছিল, ‘আমাদের সরকারি বাহিনীর অনুমতি ছাড়া কেউই সশস্ত্র অবস্থায় দেশের ভেতরে যেতে পারবে না। এ ব্যাপারে উবানের সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক লে. জেনারেল অরোরার কথা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, সীমান্তের ভেতরে ২০ মাইল পর্যন্ত এলাকায় মুক্তিবাহিনী কার্যকর থাকবে এবং বিএলএফ দেশের অভ্যন্তরে দায়িত্ব পালন করবে। দেশের ভেতরে যাতায়াতের জন্য সীমান্তে বিএলএফের সদস্যরা নির্দিষ্ট কয়েকটা করিডর ব্যবহার করবেন।

বামপন্থিদের ব্যাপারে প্রবাসী সরকারের উৎকণ্ঠা ছিল। বামপন্থিদের অভিযোগ ছিল, বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ক্ষেত্রে বামপন্থি, বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। বিএলএফের নেতারাও সতর্ক ছিলেন, যাতে বামপন্থিরা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র না পায়।”

মুজিব বাহিনী সম্পর্কে আমরা জেনারেল ওবানের বই থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারি; ওবান লিখেছেন, “যুবনেতাগণ: স্যার, আমরা আশা করিনি আপনারা নকশালপন্থি ও মার্ক্সবাদীদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রপাতি দেবেন, যাতে আমরা গত ২৫ বছরে যা অর্জন করেছি তা বরবাদ হয়ে যায়। উবান: আপনারা এসব কী বলছেন?

যুবনেতাগণ : আপনি বলতে চান আপনি জানেন না যে, নকশালপন্থিদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রপাতি দেয়া হচ্ছে ... (একটা জায়গার নাম বলে) জায়গায় এবং ভারতীয় কর্মকর্তারা তাদের নেতাদের প্রথম শ্রেণীর ভারতীয় হোটেলে রাখছেন ও তাদের সঙ্গে গল্পগুজব করছেন।

উবান : আমি এমন আজগুবি কথা আগে শুনিনি। আমি সব সময় ভেবেছি, শত্রুর দালাল আমাদের মধ্যে ভাঙন ধরাবে। এখন বলেন, আপনাদের মধ্যে এসব গুজব কারা ছড়াচ্ছে?

যুবনেতাগণ : আমরা আমাদের নিজেদের চোখে দেখেছি এবং নিজেদের কানে শুনেছি। আমাদের মন ভেঙে গেছে। দয়া করে খবর নিন এবং আমাদের আপনার সরকারের পলিসি জানান। রাশিয়াপন্থি কমিউনিস্ট পার্টির কথা না হয় বোঝা যায়, তারা পুনর্গঠিত হলে যা-কিছু হোক শুধু কাগজে-কলমে বিদ্যমান থাকবে। কিন্তু চীনপন্থি কমিউনিস্ট পার্টি?

জেনারেল উবান যুবনেতাদের মনোভাব আর এন কাউকে জানালেন। কাও উবানকে অবাক করে দিয়ে বললেন যে, বাস্তবিকই মাওলানা ভাসানীর লোকজন কোন এক স্থানে প্রশিক্ষণ পাচ্ছে। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছুই করা হচ্ছে না। তারা ভাসানীর লোকদের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মস্ত সম্পদ হিসেবে দেখছেন। কাও উবানকে পরামর্শ দিলেন, ‘দয়া করে আপনার যুবনেতাদের বলুন যে পছন্দ না করলেও এটা তাদের গিলতে হবে। আমরা তাদের সমর্থন দেব শুধু সামগ্রিক প্রকল্পের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে, একটা স্বাধীন রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে নয়।’ উবান যুবনেতাদের বললেন যে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করতে প্রস্তুত এমন সবাইকে সাহায্য করছে তাদের নিজেদের অস্থায়ী সরকারের সুপারিশ অনুযায়ী। কিছু অবাঞ্ছিত লোক এর সুযোগ নিতে পারে এবং এ কারণে তাদের দিগুণ সতর্ক থাকতে হবে।”

মহিউদ্দিন আহমেদ মুজিব বাহিনীর ভেতরের অনেক তথ্য দিয়েছেন এবং এর ফলে এই বাহিনীটি সম্পর্কে অনেক ভালো ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

আলোচনায় ভাসানী পন্থি বা চীনের প্রতি অনুরক্তদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবার কিঞ্চিত আভাষ থাকলেও মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র ইউনিয়ন ঘরানার অংশগ্রহণ করার বিষয়ে তেমন কোন আলোকপাত নেই। গত ২৩ মার্চ ২০১৫ দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি খবর থেকে জানা যায় যে, ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও একটি বিশেষ গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল। খবরে বলা হয়, “মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মুক্তিবাহিনী গঠনের শুরু থেকে ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র-যুবকেরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেন। একাত্তরের মে মাসে কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়ন ‘সশস্ত্র সংগ্রামে নিজ উদ্যোগে পরিপূর্ণ অংশগ্রহণের’ সিদ্ধান্ত নেয়। এ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠন করা হয়। ভারত ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকারের সাহায্যের ফলে গেরিলা বাহিনী প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পায়।

বিশেষ গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ নেয়ার প্রধান স্থান ছিল ভারতের আসাম রাজ্যের তেজপুরে। এছাড়া ভারতের ত্রিপুরা, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত সিপিবির দ্বিতীয় কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রতিবেদন অনুসারে, কমিউনিস্ট পাটিং, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে প্রায় ১৭ হাজার তরুণ মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেন। এর মধ্যে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন প্রায় ১২ হাজার, বিশেষ গেরিলা বাহিনীতে ছিলেন প্রায় পাঁচ হাজার।”

খবরে এই বাহিনীর সদস্যদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। খবরটিতে বলা হয়, “মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে ঘোষণাপত্র পড়ে শোনান ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য। এতে বলা হয়, ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সদস্যদের রাষ্ট্রীয় মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া বর্তমানে এক অসম্মানজনক ও অমর্যাদকর অবস্থায় রয়েছে। এ কার্যক্রম দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শক্তির সংহতিকে দুর্বল করছে।

সমাবেশে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টাম-লীর একমাত্র জীবিত সদস্য অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে সম্মাননা জানানো হয়। তবে ৯৩ বছর বয়সী এ রাজনীতিক অসুস্থতার কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, বাংলাদেশ বাম রাজনীতির বিকাশ ও মুক্তিযুদ্ধসহ এ অঞ্চলের রাজনীতিতে অবদানের কথা স্মরণ করে মোজাফফর আহমদকে এ সম্মাননা দেয়া হচ্ছে।

সমাবেশে প্রবীণ রাজনীতিক অজয় রায়, সিপিবির উপদেষ্টা মনজুরুল আহসান খান, বিশেষ গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার শাহ আলমসহ শতাধিক গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা উপস্থিত ছিলেন। পরে একটি মিছিল দোয়েল চত্বর-প্রেসক্লাব ঘুরে পল্টন মোড়ে শেষ হয়।”

বস্তুত পক্ষে ৭১ সালে একটি সার্বজনীন মুক্তিযুদ্ধ হলেও আওয়ামী লীগ ও মস্কোপন্থি রাজনৈতিক দলসমূহের আলাদা সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা হয়। নিজস্ব রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণার প্রভাব বিস্তার ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ করাকালীন নেতৃত্ব এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন যুদ্ধের ৯ মাসের আগেই ভিন্নভাবে নিজেদের সংগঠিত করার চেষ্টা করে আসছিল।

লেখাটি শেষ করার সময় মুজিব বাহিনীর এক বিশেষ যোদ্ধা ওয়ার্ল্ড ইউনিভাসিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান চৌধুরীর একটি বই আমার হাতে পৌঁছে। বইটিতে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুজিব বাহিনীর অসাধারণ যুদ্ধের বিবরণ দিয়েছেন। আমি তার লেখা প্রসঙ্গ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর ১১৯ পৃষ্ঠা থেকে একটি অনুচ্ছেদ তুলে ধরছি।

“আমি তো মুজিব বাহিনীতে ছিলাম। আমার মাঝে মাঝে বড় কষ্ট হয়। হায়রে আমার কপাল বলে একটি লেখা সহসা আসবে। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আমি। অন্যরাও উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। অর্ধাহারে অনারে দিন কাটিয়ে রোদে বৃষ্টিতে ভিজে যুদ্ধ পরিচালনা করলাম এবং কেউ পরিকল্পনা তৈরির আগেই আমরা যুদ্ধে নেমে গেলাম। ভারতীয় বা বাংলাদেশের অহেতুক কোন নিয়ন্ত্রণের বেড়াজাল ছিল না বলে আমাদের গেরিলা যোদ্ধারা সীমান্ত ছাড়িয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রথমে (পাকিস্তানি) সেনাবাহিনী ও পরে রাজাকারদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল, যুদ্ধের টেম্পো রক্ষিত হলো আর ১৩ দিনের সম্মুখ ও ঐতিহ্যগত যুদ্ধে পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো। সেই আমরাই অপবাদের বোঝা মাথায় নিয়ে চলছি। রক্ষী বাহিনী নাকি আমাদের দিয়ে গঠিত হয়েছিল। সিরাজ স্যারের বদৌলতে দেখলাম মুজিব বাহিনীতে নাকি কৃষক শ্রমিকদের সন্তানরা ছিল না। তাহলে রক্ষী বাহিনীতে কি আমরা সব শিক্ষিতরা সৈনিক হয়ে যোগ দিয়েছিলাম? হয় মুজিব বাহিনীতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সব ধরনের সৈনিকেরা ছিলেন কিংবা রক্ষী বাহিনীতে মুজিব বাহিনীর তেমন কেউ ছিলেন না। সে হিসেবে মুজিব বাহিনী ভারতে যা করতে চেয়েছিল দেশের নাম বদলিয়ে রক্ষীবাহিনী কীভাবে পূর্ববর্তী অপকর্ম করে গেল? একজন হয় দুদু খাবে না হয় তামাক খাবে। দুদু ও তামাক কারা একসঙ্গে খায় সে কথা কি সিরাজ স্যার জানাবেন।” ড. মান্নান যে কথাগুলো লিখেছেন সেটি আমার নিজের ধারণায় ড. সিরাজুল ইসলামের কোন লেখার প্রেক্ষিতে। স্বাধীনতাকালে মুজিব বাহিনী তার মতো করে কাজ করেছে-তবে স্বাধীনতার পরে সেই বাহিনীকে রক্ষী বাহিনী বানিয়ে বিতর্কিত করার চেষ্টাও ব্যাপকভাবে হয়েছে। অথচ মুজিব বাহিনীর প্রধান স্র্রোত যারা পরে জাসদ গড়ে তুলে তারা তো রক্ষীবাহিনীতে যোগ না দিয়ে বরং সেই বাহিনীকে সমালোচনা করেছে।

২০২১ সালে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টির গেরিলা বাহিনীর একটি তালিকা যুক্ত হলেও মুজিব বাহিনীর কোন তালিকা নেই। ফলে মুজিব বাহিনীর সদস্যদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়াটা সম্ভবত সুদূর পরাহত

তবে অবস্থা যাই হোক স্বাধীনতা উত্তরকালে জাসদ গঠিত না হলে এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের প্রগতিশীল, সমাজতন্ত্রী অংশটিও যুক্ত থাকলে আজকে মুজিব বাহিনী একটি সম্মানিত বাহিনী হতে পারতো।

বস্তুত স্বাধীনতার এতো বছর পরও এই বাহিনীর কোন স্বীকৃতি নেই। এই বাহিনীর কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও বেশিরভাগই কোন ধরনের স্বীকৃতিও পাননি। আমার মতো অনেকেই সনদপত্রের জন্য আবেদনও করেননি। ২০২১ সালে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টির গেরিলা বাহিনীর একটি তালিকা যুক্ত হলেও মুজিব বাহিনীর কোন তালিকা নেই। ফলে মুজিব বাহিনীর সদস্যদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়াটা সম্ভবত সুদূর পরাহত।

ঢাকা। ২৬ মার্চ, ২০১৯। আপডেট : ২২ জুলাই, ২০২১।

[লেখক: তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাসের চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার এবং বিজয় ডিজিটাল শিক্ষা সফটওয়্যারের উদ্ভাবক]

mustafajabbar@gmail.com

উন্নত বাংলাদেশের কাণ্ডারি

সংশপ্তকের জন্য জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা: স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

অপার সম্ভাবনার পর্যটন

ভাবমূর্তির উন্নয়ন

ধর্ম যখন বর্ম

ফল ও সবজি রপ্তানি এবং কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউজ

আফগানিস্তানে তালেবান ও ভূলুণ্ঠিত মানবাধিকার

বিমানবন্দরে পিসিআর ল্যাব স্থাপন প্রসঙ্গে

আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য

পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থিদের নেতৃত্বে কারা আসছেন

বোনেরা প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হলে কী করবেন?

ছবি

তালেবানরা উদারপন্থি হচ্ছে কি

ছবি

কারিকুলাম প্রণয়নের চেয়ে বাস্তবায়নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ

দুর্বিনীত লোভের ফাঁদ

কিশোর শিক্ষার্থীদের কোভিড ভ্যাকসিন

সমাপনী পরীক্ষা এবার থেকেই বাদ নয় কেন

ইটিং ডিজঅর্ডার সম্পর্কে জানা জরুরি

ধনী হওয়ার মন্ত্র ও বোকা বানানোর যন্ত্র

মুজিব বাহিনী ও মুজিববাদ

দেশের ইস্পাত শিল্প

আদিবাসীদের শ্মশানও দখল হয়ে গেল

অন্ধকার অতল গহ্বরে আফগান জনগণ

সংকটে রবিদাস জনগোষ্ঠী

প্রশাসনকে মাটির কাছাকাছি আসতে হবে

তালেবানদের সরকার গঠন

যেখানে সময় এসে মানুষকে ধরা দেয়

পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী রাজনীতির ঘূর্ণাবর্ত

ছবি

শিক্ষা দিবস

সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শূন্যতা ও জঙ্গিবাদ

ঐতিহাসিক সত্য উন্মোচনে ট্রুথ কমিশন

’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন ও আজকের শিক্ষা

আন্তর্জাতিক ওজন দিবস

ভূমিসংক্রান্ত অপরাধ দমনে আইন প্রণয়ন জরুরি

ছবি

শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা

বেশি দামে সার বিক্রিতে প্রতারিত হচ্ছেন কৃষক

tab

উপ-সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব বাহিনী

মোস্তাফা জব্বার

সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১

পাঁচ

মহিউদ্দিন আহমদ তার বইতে মুজিব বাহিনী সম্পর্কে বেশকিছু মন্তব্য করেছেন। বিশেষ করে মুজিব বাহিনী গঠন ও তার কার্যক্রম নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হতে পারে। তার মতে, ভুল বোঝাবুঝির জন্য মুজিব বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর মাঝে বেশ কয়েক স্থানে সংঘাত হয়। বিশেষ করে তিনি ২ নাম্বার সেক্টরের কথা উল্লেখ করেছেন।

মহিউদ্দিন মনে করেন শেখ মনি, তাজউদ্দীন ও খালেদ মোশাররফ উভয়ের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তার অভিযোগ ছিল, খালেদ তার সেক্টরে বামপন্থি ছাত্রদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিচ্ছেন। দেশের অন্য তিনটি অঞ্চলে এ ধরনের কোন সংঘাত ছিল না। সেসব অঞ্চলে তারা সবাই পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ করতেন। দেখা গেছে, অনেক জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান নেতা ছিলেন বিএলএফের কমান্ডার। খুলনা, যশোর, বগুড়া, রংপুর- এসব জেলায় বিএলএফের জেলা ও মহকুমা কমান্ডাররা সব মুক্তিযোদ্ধারাই নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেসব জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কোনো বিভাজন ছিল না।

২ নম্বর সেক্টরে ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিনের বাহিনীর সঙ্গে বিএলএফের একটি দলের সংঘর্ষ হয়েছিল। বিষয়টি সুরাহা করার জন্য আওয়ামী লীগের নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী আইনউদ্দিনের কাছে গেলে তিনি বাংলাদেশ সরকারের একটা চিঠি দেখান। চিঠিতে লেখা ছিল, ‘আমাদের সরকারি বাহিনীর অনুমতি ছাড়া কেউই সশস্ত্র অবস্থায় দেশের ভেতরে যেতে পারবে না। এ ব্যাপারে উবানের সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক লে. জেনারেল অরোরার কথা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, সীমান্তের ভেতরে ২০ মাইল পর্যন্ত এলাকায় মুক্তিবাহিনী কার্যকর থাকবে এবং বিএলএফ দেশের অভ্যন্তরে দায়িত্ব পালন করবে। দেশের ভেতরে যাতায়াতের জন্য সীমান্তে বিএলএফের সদস্যরা নির্দিষ্ট কয়েকটা করিডর ব্যবহার করবেন।

বামপন্থিদের ব্যাপারে প্রবাসী সরকারের উৎকণ্ঠা ছিল। বামপন্থিদের অভিযোগ ছিল, বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ক্ষেত্রে বামপন্থি, বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। বিএলএফের নেতারাও সতর্ক ছিলেন, যাতে বামপন্থিরা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র না পায়।”

মুজিব বাহিনী সম্পর্কে আমরা জেনারেল ওবানের বই থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারি; ওবান লিখেছেন, “যুবনেতাগণ: স্যার, আমরা আশা করিনি আপনারা নকশালপন্থি ও মার্ক্সবাদীদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রপাতি দেবেন, যাতে আমরা গত ২৫ বছরে যা অর্জন করেছি তা বরবাদ হয়ে যায়। উবান: আপনারা এসব কী বলছেন?

যুবনেতাগণ : আপনি বলতে চান আপনি জানেন না যে, নকশালপন্থিদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রপাতি দেয়া হচ্ছে ... (একটা জায়গার নাম বলে) জায়গায় এবং ভারতীয় কর্মকর্তারা তাদের নেতাদের প্রথম শ্রেণীর ভারতীয় হোটেলে রাখছেন ও তাদের সঙ্গে গল্পগুজব করছেন।

উবান : আমি এমন আজগুবি কথা আগে শুনিনি। আমি সব সময় ভেবেছি, শত্রুর দালাল আমাদের মধ্যে ভাঙন ধরাবে। এখন বলেন, আপনাদের মধ্যে এসব গুজব কারা ছড়াচ্ছে?

যুবনেতাগণ : আমরা আমাদের নিজেদের চোখে দেখেছি এবং নিজেদের কানে শুনেছি। আমাদের মন ভেঙে গেছে। দয়া করে খবর নিন এবং আমাদের আপনার সরকারের পলিসি জানান। রাশিয়াপন্থি কমিউনিস্ট পার্টির কথা না হয় বোঝা যায়, তারা পুনর্গঠিত হলে যা-কিছু হোক শুধু কাগজে-কলমে বিদ্যমান থাকবে। কিন্তু চীনপন্থি কমিউনিস্ট পার্টি?

জেনারেল উবান যুবনেতাদের মনোভাব আর এন কাউকে জানালেন। কাও উবানকে অবাক করে দিয়ে বললেন যে, বাস্তবিকই মাওলানা ভাসানীর লোকজন কোন এক স্থানে প্রশিক্ষণ পাচ্ছে। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছুই করা হচ্ছে না। তারা ভাসানীর লোকদের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মস্ত সম্পদ হিসেবে দেখছেন। কাও উবানকে পরামর্শ দিলেন, ‘দয়া করে আপনার যুবনেতাদের বলুন যে পছন্দ না করলেও এটা তাদের গিলতে হবে। আমরা তাদের সমর্থন দেব শুধু সামগ্রিক প্রকল্পের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে, একটা স্বাধীন রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে নয়।’ উবান যুবনেতাদের বললেন যে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করতে প্রস্তুত এমন সবাইকে সাহায্য করছে তাদের নিজেদের অস্থায়ী সরকারের সুপারিশ অনুযায়ী। কিছু অবাঞ্ছিত লোক এর সুযোগ নিতে পারে এবং এ কারণে তাদের দিগুণ সতর্ক থাকতে হবে।”

মহিউদ্দিন আহমেদ মুজিব বাহিনীর ভেতরের অনেক তথ্য দিয়েছেন এবং এর ফলে এই বাহিনীটি সম্পর্কে অনেক ভালো ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

আলোচনায় ভাসানী পন্থি বা চীনের প্রতি অনুরক্তদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবার কিঞ্চিত আভাষ থাকলেও মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র ইউনিয়ন ঘরানার অংশগ্রহণ করার বিষয়ে তেমন কোন আলোকপাত নেই। গত ২৩ মার্চ ২০১৫ দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি খবর থেকে জানা যায় যে, ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও একটি বিশেষ গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল। খবরে বলা হয়, “মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মুক্তিবাহিনী গঠনের শুরু থেকে ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র-যুবকেরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেন। একাত্তরের মে মাসে কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়ন ‘সশস্ত্র সংগ্রামে নিজ উদ্যোগে পরিপূর্ণ অংশগ্রহণের’ সিদ্ধান্ত নেয়। এ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠন করা হয়। ভারত ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকারের সাহায্যের ফলে গেরিলা বাহিনী প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পায়।

বিশেষ গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ নেয়ার প্রধান স্থান ছিল ভারতের আসাম রাজ্যের তেজপুরে। এছাড়া ভারতের ত্রিপুরা, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত সিপিবির দ্বিতীয় কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রতিবেদন অনুসারে, কমিউনিস্ট পাটিং, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে প্রায় ১৭ হাজার তরুণ মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেন। এর মধ্যে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন প্রায় ১২ হাজার, বিশেষ গেরিলা বাহিনীতে ছিলেন প্রায় পাঁচ হাজার।”

খবরে এই বাহিনীর সদস্যদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। খবরটিতে বলা হয়, “মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে ঘোষণাপত্র পড়ে শোনান ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য। এতে বলা হয়, ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সদস্যদের রাষ্ট্রীয় মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া বর্তমানে এক অসম্মানজনক ও অমর্যাদকর অবস্থায় রয়েছে। এ কার্যক্রম দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শক্তির সংহতিকে দুর্বল করছে।

সমাবেশে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টাম-লীর একমাত্র জীবিত সদস্য অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে সম্মাননা জানানো হয়। তবে ৯৩ বছর বয়সী এ রাজনীতিক অসুস্থতার কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, বাংলাদেশ বাম রাজনীতির বিকাশ ও মুক্তিযুদ্ধসহ এ অঞ্চলের রাজনীতিতে অবদানের কথা স্মরণ করে মোজাফফর আহমদকে এ সম্মাননা দেয়া হচ্ছে।

সমাবেশে প্রবীণ রাজনীতিক অজয় রায়, সিপিবির উপদেষ্টা মনজুরুল আহসান খান, বিশেষ গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার শাহ আলমসহ শতাধিক গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা উপস্থিত ছিলেন। পরে একটি মিছিল দোয়েল চত্বর-প্রেসক্লাব ঘুরে পল্টন মোড়ে শেষ হয়।”

বস্তুত পক্ষে ৭১ সালে একটি সার্বজনীন মুক্তিযুদ্ধ হলেও আওয়ামী লীগ ও মস্কোপন্থি রাজনৈতিক দলসমূহের আলাদা সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা হয়। নিজস্ব রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণার প্রভাব বিস্তার ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ করাকালীন নেতৃত্ব এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন যুদ্ধের ৯ মাসের আগেই ভিন্নভাবে নিজেদের সংগঠিত করার চেষ্টা করে আসছিল।

লেখাটি শেষ করার সময় মুজিব বাহিনীর এক বিশেষ যোদ্ধা ওয়ার্ল্ড ইউনিভাসিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান চৌধুরীর একটি বই আমার হাতে পৌঁছে। বইটিতে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুজিব বাহিনীর অসাধারণ যুদ্ধের বিবরণ দিয়েছেন। আমি তার লেখা প্রসঙ্গ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর ১১৯ পৃষ্ঠা থেকে একটি অনুচ্ছেদ তুলে ধরছি।

“আমি তো মুজিব বাহিনীতে ছিলাম। আমার মাঝে মাঝে বড় কষ্ট হয়। হায়রে আমার কপাল বলে একটি লেখা সহসা আসবে। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আমি। অন্যরাও উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। অর্ধাহারে অনারে দিন কাটিয়ে রোদে বৃষ্টিতে ভিজে যুদ্ধ পরিচালনা করলাম এবং কেউ পরিকল্পনা তৈরির আগেই আমরা যুদ্ধে নেমে গেলাম। ভারতীয় বা বাংলাদেশের অহেতুক কোন নিয়ন্ত্রণের বেড়াজাল ছিল না বলে আমাদের গেরিলা যোদ্ধারা সীমান্ত ছাড়িয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রথমে (পাকিস্তানি) সেনাবাহিনী ও পরে রাজাকারদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল, যুদ্ধের টেম্পো রক্ষিত হলো আর ১৩ দিনের সম্মুখ ও ঐতিহ্যগত যুদ্ধে পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো। সেই আমরাই অপবাদের বোঝা মাথায় নিয়ে চলছি। রক্ষী বাহিনী নাকি আমাদের দিয়ে গঠিত হয়েছিল। সিরাজ স্যারের বদৌলতে দেখলাম মুজিব বাহিনীতে নাকি কৃষক শ্রমিকদের সন্তানরা ছিল না। তাহলে রক্ষী বাহিনীতে কি আমরা সব শিক্ষিতরা সৈনিক হয়ে যোগ দিয়েছিলাম? হয় মুজিব বাহিনীতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সব ধরনের সৈনিকেরা ছিলেন কিংবা রক্ষী বাহিনীতে মুজিব বাহিনীর তেমন কেউ ছিলেন না। সে হিসেবে মুজিব বাহিনী ভারতে যা করতে চেয়েছিল দেশের নাম বদলিয়ে রক্ষীবাহিনী কীভাবে পূর্ববর্তী অপকর্ম করে গেল? একজন হয় দুদু খাবে না হয় তামাক খাবে। দুদু ও তামাক কারা একসঙ্গে খায় সে কথা কি সিরাজ স্যার জানাবেন।” ড. মান্নান যে কথাগুলো লিখেছেন সেটি আমার নিজের ধারণায় ড. সিরাজুল ইসলামের কোন লেখার প্রেক্ষিতে। স্বাধীনতাকালে মুজিব বাহিনী তার মতো করে কাজ করেছে-তবে স্বাধীনতার পরে সেই বাহিনীকে রক্ষী বাহিনী বানিয়ে বিতর্কিত করার চেষ্টাও ব্যাপকভাবে হয়েছে। অথচ মুজিব বাহিনীর প্রধান স্র্রোত যারা পরে জাসদ গড়ে তুলে তারা তো রক্ষীবাহিনীতে যোগ না দিয়ে বরং সেই বাহিনীকে সমালোচনা করেছে।

২০২১ সালে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টির গেরিলা বাহিনীর একটি তালিকা যুক্ত হলেও মুজিব বাহিনীর কোন তালিকা নেই। ফলে মুজিব বাহিনীর সদস্যদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়াটা সম্ভবত সুদূর পরাহত

তবে অবস্থা যাই হোক স্বাধীনতা উত্তরকালে জাসদ গঠিত না হলে এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের প্রগতিশীল, সমাজতন্ত্রী অংশটিও যুক্ত থাকলে আজকে মুজিব বাহিনী একটি সম্মানিত বাহিনী হতে পারতো।

বস্তুত স্বাধীনতার এতো বছর পরও এই বাহিনীর কোন স্বীকৃতি নেই। এই বাহিনীর কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও বেশিরভাগই কোন ধরনের স্বীকৃতিও পাননি। আমার মতো অনেকেই সনদপত্রের জন্য আবেদনও করেননি। ২০২১ সালে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টির গেরিলা বাহিনীর একটি তালিকা যুক্ত হলেও মুজিব বাহিনীর কোন তালিকা নেই। ফলে মুজিব বাহিনীর সদস্যদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়াটা সম্ভবত সুদূর পরাহত।

ঢাকা। ২৬ মার্চ, ২০১৯। আপডেট : ২২ জুলাই, ২০২১।

[লেখক: তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাসের চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার এবং বিজয় ডিজিটাল শিক্ষা সফটওয়্যারের উদ্ভাবক]

mustafajabbar@gmail.com

back to top