alt

উপ-সম্পাদকীয়

’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন ও আজকের শিক্ষা

আকমল হোসেন

: বৃহস্পতিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

১৭ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক শিক্ষা দিবস। দিবসটি সরকারিভাবে পালিত না হলেও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। শিক্ষার অধিকার আদায়ে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার রাজপথে তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক শাসকের পুলিশ বাহিনীর বুলেটে জীবন দিতে হয়েছিল মোস্তফা ওয়াজিল্লাহ, বাবুল প্রমুখ ছাত্র নেতাদের। সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের শাসনামলে শরীফ কমিশনের নেতৃত্বে একটি শিক্ষানীতি প্রদান করা হয়েছিল। শিক্ষানীতির বেশ কিছু বক্তব্য তৎকালীন পাকিস্তানের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় শুধু বেমানানই ছিল না, অপ্রাসঙ্গিকও ছিল। এগুলোর মধ্যে উচ্চশিক্ষা সংকোচন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বছর শেষে পরীক্ষা ব্যবস্থা, ৩ বছর মেয়াদি ডিগ্রি পাস কোর্স চালু এবং ছাত্র বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবনা অন্যতম। এগুলো বাতিলের দাবিতে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্র ধর্মঘট আহবান করা হয়েছিল। সেই ধর্মঘট পালনকালেই পুলিশি এই হত্যাকান্ড। পরে আইয়ুব খান শরীফ কমিশনের শিক্ষানীতি বাতিল করেছিল।

শিক্ষা সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার হিসেবে পৃথিবীর দেশে দেশে গৃহীত হয়েছে। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা পত্রের ২৬ ধারায় নাগরিকের জন্য শিক্ষা লাভের অধিকার ঘোষণা করা হয়েছে। অন্ততপক্ষে প্রাথমিক ও মৌলিক পর্যায়ে শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামুলক হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সাধারণ ভাবে সহজলভ্য থাকবে এবং উচ্চতর শিক্ষা মেধার ভিত্তিতে সবার জন্য সমভাবে উন্মুক্ত থাকবে। এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণের পর জাতিসংঘ সব সদস্য রাষ্ট্রকে সেটি বাস্তবায়নের জন্য আহবান জানায় কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, পাকিস্তানে সেটা কার্যকর হয়নি।

তথাকথিত স্বাধীন পাকিস্তানে ১৯৫৬ সালের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত কোন সংবিধান প্রণয়ন সম্ভব হয়নি বরং পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের স্বার্থবিরোধী নানা কালাকানুন জারি করতে থাকে পাকিস্তানের শাসকরা। শিক্ষা সংস্কৃতি ও রাজনীতি চর্চার পরিবর্তে পুলিশি রাষ্ট্র কায়েমের প্রক্রিয়া হিসেবে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করা হয়। এ সমস্ত ঘটনার পরিপ্রক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানের সচেতন জনগণ এবং রাজনৈতিক মহলে প্রচন্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই ১৯৬২ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল।

শিক্ষা কী? কেন এবং কীভাবে এটা প্রদান করা যায়, সে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ভোগবাদী সমাজে মুনাফাভিত্তিক এবং পুঁজিবাদী সমাজে যেভাবে সব কিছুকে পণ্য ভাবা হচ্ছে এবং টাকা দিলে পণ্যের মতো সবই পাওয়া যায়- এমন প্রবণতা সৃষ্টির চেষ্টা চললেও এখনও অনেক দেশেই শিক্ষার সাংবিধানিক এবং মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি আছে। সেই বিবেচনায় শিক্ষার দর্শন নির্ধারিত হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য হওয়ার কথা নয়। এজন্য ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন এর বিষয়েও ভাবনার উন্নতি হওয়া দরকার। ব্যক্তির দেহ ও মনের সব ক্ষমতা বিকশিত, বিবর্তিত মার্জিত করে, তাকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান নৈপুণ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী করে তোলার ব্যবস্থাদির নাম শিক্ষা। মানবতাবাদী এবং কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হলে শিক্ষার দর্শন, অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনা এমন হবে, যেখানে সবার জন্য একই ধরনের অসাম্প্রদায়িক ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা হওয়া দরকার। পৃথিবীর যে সমস্ত দেশ শিক্ষা, সংস্কৃতি আর অর্থনীতিতে এগিয়েছে, তাদের শিক্ষার ইতিহাস এমনটাই। শিক্ষার দর্শন হিসেবে ভাববাদ, যুক্তি, দর্শন সর্বশেষে বিজ্ঞানই অন্যতম মাধ্যম। এই ধারাবাহিকতাকে উপেক্ষা করে শিক্ষার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করলে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যুগের চাহিদা মিটাতে সক্ষম হবে কি?

১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে লর্ড মেকলেকে দিয়ে সেই শিক্ষানীতি দেওয়া হয়েছিল, যা অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন ও হিসাব নিকাশ করার মতো একটি জাতি সৃষ্টি ছাড়া সৃজনশীল ও সত্যের পক্ষে অবস্থান গ্রহণকারী বা অন্যায়ের বিপক্ষে দাঁড়ানোর মতো চেতনাবোধ ওই শিক্ষা ব্যবস্থায় সৃষ্টি হয়নি। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতার আলোকে এবং সংবিধানের ১৭-এর (খ) ধারার আলোকে একই ধারার সর্বজনীন বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। জাতীয় বাজেটে জিজিপির প্রাথমিকভাবে ৫% এবং পর্যায়ক্রমে ইউনেস্কোকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৭% করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তারই অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু একবারে ৩৫১৭০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করেছিলেন। তার কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আমলে আরো ২৬ হাজার প্রাইমারি স্কুল সরকারি করা হয়েছে। যদিও এখনও ৪ হাজারের মতো প্রাইমারি স্কুল এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে ৯০ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি রয়েছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস সেই সাথে শিক্ষা ব্যবস্থাকেও আবার সাম্প্রাদায়িক করা হয়েছিল, এখনও সেখান থেকে বের হওয়া সম্ভব হয়নি।

শিক্ষার অধিকার আদায়ে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার রাজপথে তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক শাসকের পুলিশ বাহিনীর বুলেটে জীবন দিতে হয়েছিল মোস্তফা ওয়াজিল্লাহ, বাবুল প্রমুখ ছাত্র নেতাদের

সংবিধানে একই ধারার সর্বজনীন বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা ও ইংরেজি মাধ্যমের (তিন ধারার) শিক্ষা বহাল রয়েছে। শিক্ষায় অর্থায়ন, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাড়েনি, শিক্ষা প্রশাসনে দলীয়করণের ভূত বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডিতে দলীয়করণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪টি বাদে সবগুলোতে দলীয়করণের ভূত চেপে বসেছে। ফলে দলীয়ভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলায় তুলনামূলক কম যোগ্যতার লোক শিক্ষা প্রশাসনে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এতে শিক্ষার গুণগতমানের ক্ষেত্রে বিরাট সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের টাকার কমিশন বণ্টনে সমঝোতা করতে দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালীদের। সৃজনশীল আর এমসিকিউ পরীক্ষা গ্রুপ অব কোম্পানির মালিকরা শিক্ষা ব্যবসা শুরু করে শিক্ষার বারোটা বাজিয়েছে।

মৌলিক অধিকার শিক্ষা আজ সুপার মার্কেটের পণ্যের মতো, যার টাকা আছে সেই সেটা কিনতে পারবে। এটি জীবন দিয়ে স্বাধীন করা একটি দেশের জন্য খুবই দুঃখজনক, তবে এটাই এখন বাস্তব হয়ে উঠেছে। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে, শিক্ষার দর্শনে মুক্তিযদ্ধের চেতনা ও ১৯৭২ সালের সংবিধানের বিধান যেমন উপেক্ষিত হয়েছে, সাথে সাথে ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নের ক্ষেত্রেই কোন ইতিবাচক অগ্রগতি হয়নি বরং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলটির ক্ষমতাশীল আমলে শিক্ষা কারিকুলামে সাম্প্রদায়িকতা প্রশ্রয় পেয়েছে। আগে-পিছের শিক্ষার একাডেমিক ও কারিকুলামগত স্বীকৃতি না থাক, এ+ আর গোল্ডেনের সংখ্যা বাড়লেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা প্রদর্শন করতে পারছে না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকে অনেক নিচে অবস্থান করছে। অনুমোদনহীন কওমি মাদ্রাসার শেষপর্যায়ের শিক্ষাকে মাস্টার্সের মর্যাদা শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে হ-য-ব-র-ল সৃষ্টি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এ শিক্ষাকে কোনভাবেই সমর্থন করে না। আধুনিক সমাজে শিক্ষার বিষয়বস্তু হওয়া উচিত মানবিকতা, সৃজনশীলতা, যৌক্তিকতা ও উৎপাদনশীলতা।

’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনকে দমন করতে, পুলিশ ব্যবহার হয়েছিল; আর আজকের ছাত্র আন্দোলনকে দমন করতে পুলিশ ও দলীয় লাঠিয়াল ও হেলমেট বাহিনী ব্যবহার হচ্ছে। কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মতো একটি অরাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলন দমন করতে সরকারের পক্ষ থেকে যেভাবে হামলা গ্রেফতার রিমান্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তা গণতান্ত্রিক সরকারের আচরণ নয় বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষে উন্নয়ন তহবিল থেকে রুলিং পার্টির ছাত্র সংগঠনের নেতাদের যখন বখরা দেওয়া হয় তখন ওই ছাত্র সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তল্পিবাহক এবং লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার হওয়া ছাড়া ছাত্র অধিকার আদায়ে কোন ভূমিকা রাখতে পারে না, সেটা অনেক পূর্ব থেকেই দৃশ্যমান। কবে যে ছাত্র রাজনীতির এই দেউলিয়াত্ব ঘুচবে কে জানে? প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই যখন ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া ভিসি ও ডিনের চিরকুটে শিক্ষার্থী ভর্তি, কেবলই দলীয় বিবেচনায়- সেখানে শিক্ষার করুণ অবস্থা বুঝতে আর কোন বিষয়ের খোঁজ করার প্রয়োজন নেই। আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এটা সুখকর হবে না। তবে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিলেই দেশ ও জাতির উন্নয়ন কর্মকান্ডকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব- এর বাইরে বিকল্প কোন পথ থাকতে পারে না।

[লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিসি), কেন্দ্রীয়]

রাজধানী লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ির অত্যাচার থেকে মুক্ত হবে কবে?

ছবি

শিশুর জন্য নিরাপদ হয়ে উঠুক পৃথিবী

কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ

‘ঘটনাচক্রে শিক্ষক’ কেন তৈরি হচ্ছে

ছবি

নয়ন সমুখে তুমি নেই

ছবি

স্মরণ:কিংবদন্তি সাধক ফকির লালন শাহ

বজ্রপাতে মৃত্যু ও বিলুপ্ত তালগাছ

হায় হায় কোম্পানির ফাঁদ

ধর্মনিরপেক্ষতা, বামফ্রন্ট এবং পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকার

ছবি

যিনি আমাদের পদার্থবিজ্ঞানের রূপ, রস, বর্ণ ও গন্ধ চিনিয়েছেন

বেশি মজুরি তত্ত্বে অর্থনীতির নোবেল

‘বেতন আলোচনা সাপেক্ষ’

বর্গী সেনাপতি ভাস্কর পন্ডিতের অসমাপ্ত দুর্গাপূজা

ছবি

এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব

নিয়ন্ত্রণহীন পণ্যের বাজার, লাগাম টানবে কে?

নিরাময় অযোগ্য রোগীদের জন্য প্যালিয়েটিভ কেয়ার

আখভিত্তিক চিনিশিল্প উদ্ধারে কী করা যায়

‘ম্যাকবেথ’-এর আলোকে বঙ্গবন্ধু ও রাজা ডানকান হত্যাকান্ডের প্রেক্ষাপট ও নিষ্ঠুরতা

পাঠ্যপুস্তকে ভুল

জমি জবরদখল করলেই মালিক হওয়া যাবে?

ছবি

নীলিমা ইব্রাহিম : বাংলার নারী জাগরণের প্রতিভূ

বিশ্ব ডাক দিবস ও বাংলাদেশ ডাক বিভাগ

কৃষিপণ্যে মূল্য সংযোজন ও আন্তর্জাতিক বাজার

আগাছা-পরগাছা ভর করে বটবৃক্ষে

রোহিঙ্গা সংকটের শেষ কোথায়

তথ্য প্রাপ্তির অধিকার

করোনাকালে তরুণদের মানসিক ব্যাধি ও করণীয়

রবীন্দ্রনাথের চুলও লম্বা ছিল

ফোনে আড়িপাতা রোধ ও ফোনালাপ ফাঁস হওয়া সংক্রান্ত রিট

প্রাথমিক বিদ্যালয় রি-ওপেনিংকে ফলপ্রসূ করার পথ

গণতন্ত্রকে সঙ সাজিয়ে সংবিধান ভন্ডুলের প্রবণতা

সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব তলব দুরভিসন্ধিমূলক

প্রমিথিউস : মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের চিরন্তন প্রেরণা

পারিবারিক কৃষির রূপ ও রূপান্তর

রাষ্ট্র কি সবার করা গেল

আদিবাসী-হরিজনরাও মানুষ

tab

উপ-সম্পাদকীয়

’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন ও আজকের শিক্ষা

আকমল হোসেন

বৃহস্পতিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

১৭ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক শিক্ষা দিবস। দিবসটি সরকারিভাবে পালিত না হলেও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। শিক্ষার অধিকার আদায়ে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার রাজপথে তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক শাসকের পুলিশ বাহিনীর বুলেটে জীবন দিতে হয়েছিল মোস্তফা ওয়াজিল্লাহ, বাবুল প্রমুখ ছাত্র নেতাদের। সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের শাসনামলে শরীফ কমিশনের নেতৃত্বে একটি শিক্ষানীতি প্রদান করা হয়েছিল। শিক্ষানীতির বেশ কিছু বক্তব্য তৎকালীন পাকিস্তানের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় শুধু বেমানানই ছিল না, অপ্রাসঙ্গিকও ছিল। এগুলোর মধ্যে উচ্চশিক্ষা সংকোচন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বছর শেষে পরীক্ষা ব্যবস্থা, ৩ বছর মেয়াদি ডিগ্রি পাস কোর্স চালু এবং ছাত্র বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবনা অন্যতম। এগুলো বাতিলের দাবিতে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্র ধর্মঘট আহবান করা হয়েছিল। সেই ধর্মঘট পালনকালেই পুলিশি এই হত্যাকান্ড। পরে আইয়ুব খান শরীফ কমিশনের শিক্ষানীতি বাতিল করেছিল।

শিক্ষা সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার হিসেবে পৃথিবীর দেশে দেশে গৃহীত হয়েছে। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা পত্রের ২৬ ধারায় নাগরিকের জন্য শিক্ষা লাভের অধিকার ঘোষণা করা হয়েছে। অন্ততপক্ষে প্রাথমিক ও মৌলিক পর্যায়ে শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামুলক হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সাধারণ ভাবে সহজলভ্য থাকবে এবং উচ্চতর শিক্ষা মেধার ভিত্তিতে সবার জন্য সমভাবে উন্মুক্ত থাকবে। এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণের পর জাতিসংঘ সব সদস্য রাষ্ট্রকে সেটি বাস্তবায়নের জন্য আহবান জানায় কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, পাকিস্তানে সেটা কার্যকর হয়নি।

তথাকথিত স্বাধীন পাকিস্তানে ১৯৫৬ সালের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত কোন সংবিধান প্রণয়ন সম্ভব হয়নি বরং পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের স্বার্থবিরোধী নানা কালাকানুন জারি করতে থাকে পাকিস্তানের শাসকরা। শিক্ষা সংস্কৃতি ও রাজনীতি চর্চার পরিবর্তে পুলিশি রাষ্ট্র কায়েমের প্রক্রিয়া হিসেবে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করা হয়। এ সমস্ত ঘটনার পরিপ্রক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানের সচেতন জনগণ এবং রাজনৈতিক মহলে প্রচন্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই ১৯৬২ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল।

শিক্ষা কী? কেন এবং কীভাবে এটা প্রদান করা যায়, সে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ভোগবাদী সমাজে মুনাফাভিত্তিক এবং পুঁজিবাদী সমাজে যেভাবে সব কিছুকে পণ্য ভাবা হচ্ছে এবং টাকা দিলে পণ্যের মতো সবই পাওয়া যায়- এমন প্রবণতা সৃষ্টির চেষ্টা চললেও এখনও অনেক দেশেই শিক্ষার সাংবিধানিক এবং মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি আছে। সেই বিবেচনায় শিক্ষার দর্শন নির্ধারিত হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য হওয়ার কথা নয়। এজন্য ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন এর বিষয়েও ভাবনার উন্নতি হওয়া দরকার। ব্যক্তির দেহ ও মনের সব ক্ষমতা বিকশিত, বিবর্তিত মার্জিত করে, তাকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান নৈপুণ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী করে তোলার ব্যবস্থাদির নাম শিক্ষা। মানবতাবাদী এবং কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হলে শিক্ষার দর্শন, অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনা এমন হবে, যেখানে সবার জন্য একই ধরনের অসাম্প্রদায়িক ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা হওয়া দরকার। পৃথিবীর যে সমস্ত দেশ শিক্ষা, সংস্কৃতি আর অর্থনীতিতে এগিয়েছে, তাদের শিক্ষার ইতিহাস এমনটাই। শিক্ষার দর্শন হিসেবে ভাববাদ, যুক্তি, দর্শন সর্বশেষে বিজ্ঞানই অন্যতম মাধ্যম। এই ধারাবাহিকতাকে উপেক্ষা করে শিক্ষার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করলে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যুগের চাহিদা মিটাতে সক্ষম হবে কি?

১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে লর্ড মেকলেকে দিয়ে সেই শিক্ষানীতি দেওয়া হয়েছিল, যা অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন ও হিসাব নিকাশ করার মতো একটি জাতি সৃষ্টি ছাড়া সৃজনশীল ও সত্যের পক্ষে অবস্থান গ্রহণকারী বা অন্যায়ের বিপক্ষে দাঁড়ানোর মতো চেতনাবোধ ওই শিক্ষা ব্যবস্থায় সৃষ্টি হয়নি। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতার আলোকে এবং সংবিধানের ১৭-এর (খ) ধারার আলোকে একই ধারার সর্বজনীন বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। জাতীয় বাজেটে জিজিপির প্রাথমিকভাবে ৫% এবং পর্যায়ক্রমে ইউনেস্কোকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৭% করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তারই অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু একবারে ৩৫১৭০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করেছিলেন। তার কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আমলে আরো ২৬ হাজার প্রাইমারি স্কুল সরকারি করা হয়েছে। যদিও এখনও ৪ হাজারের মতো প্রাইমারি স্কুল এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে ৯০ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি রয়েছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস সেই সাথে শিক্ষা ব্যবস্থাকেও আবার সাম্প্রাদায়িক করা হয়েছিল, এখনও সেখান থেকে বের হওয়া সম্ভব হয়নি।

শিক্ষার অধিকার আদায়ে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার রাজপথে তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক শাসকের পুলিশ বাহিনীর বুলেটে জীবন দিতে হয়েছিল মোস্তফা ওয়াজিল্লাহ, বাবুল প্রমুখ ছাত্র নেতাদের

সংবিধানে একই ধারার সর্বজনীন বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা ও ইংরেজি মাধ্যমের (তিন ধারার) শিক্ষা বহাল রয়েছে। শিক্ষায় অর্থায়ন, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাড়েনি, শিক্ষা প্রশাসনে দলীয়করণের ভূত বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডিতে দলীয়করণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪টি বাদে সবগুলোতে দলীয়করণের ভূত চেপে বসেছে। ফলে দলীয়ভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলায় তুলনামূলক কম যোগ্যতার লোক শিক্ষা প্রশাসনে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এতে শিক্ষার গুণগতমানের ক্ষেত্রে বিরাট সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের টাকার কমিশন বণ্টনে সমঝোতা করতে দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালীদের। সৃজনশীল আর এমসিকিউ পরীক্ষা গ্রুপ অব কোম্পানির মালিকরা শিক্ষা ব্যবসা শুরু করে শিক্ষার বারোটা বাজিয়েছে।

মৌলিক অধিকার শিক্ষা আজ সুপার মার্কেটের পণ্যের মতো, যার টাকা আছে সেই সেটা কিনতে পারবে। এটি জীবন দিয়ে স্বাধীন করা একটি দেশের জন্য খুবই দুঃখজনক, তবে এটাই এখন বাস্তব হয়ে উঠেছে। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে, শিক্ষার দর্শনে মুক্তিযদ্ধের চেতনা ও ১৯৭২ সালের সংবিধানের বিধান যেমন উপেক্ষিত হয়েছে, সাথে সাথে ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নের ক্ষেত্রেই কোন ইতিবাচক অগ্রগতি হয়নি বরং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলটির ক্ষমতাশীল আমলে শিক্ষা কারিকুলামে সাম্প্রদায়িকতা প্রশ্রয় পেয়েছে। আগে-পিছের শিক্ষার একাডেমিক ও কারিকুলামগত স্বীকৃতি না থাক, এ+ আর গোল্ডেনের সংখ্যা বাড়লেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা প্রদর্শন করতে পারছে না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকে অনেক নিচে অবস্থান করছে। অনুমোদনহীন কওমি মাদ্রাসার শেষপর্যায়ের শিক্ষাকে মাস্টার্সের মর্যাদা শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে হ-য-ব-র-ল সৃষ্টি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এ শিক্ষাকে কোনভাবেই সমর্থন করে না। আধুনিক সমাজে শিক্ষার বিষয়বস্তু হওয়া উচিত মানবিকতা, সৃজনশীলতা, যৌক্তিকতা ও উৎপাদনশীলতা।

’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনকে দমন করতে, পুলিশ ব্যবহার হয়েছিল; আর আজকের ছাত্র আন্দোলনকে দমন করতে পুলিশ ও দলীয় লাঠিয়াল ও হেলমেট বাহিনী ব্যবহার হচ্ছে। কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মতো একটি অরাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলন দমন করতে সরকারের পক্ষ থেকে যেভাবে হামলা গ্রেফতার রিমান্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তা গণতান্ত্রিক সরকারের আচরণ নয় বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষে উন্নয়ন তহবিল থেকে রুলিং পার্টির ছাত্র সংগঠনের নেতাদের যখন বখরা দেওয়া হয় তখন ওই ছাত্র সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তল্পিবাহক এবং লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার হওয়া ছাড়া ছাত্র অধিকার আদায়ে কোন ভূমিকা রাখতে পারে না, সেটা অনেক পূর্ব থেকেই দৃশ্যমান। কবে যে ছাত্র রাজনীতির এই দেউলিয়াত্ব ঘুচবে কে জানে? প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই যখন ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া ভিসি ও ডিনের চিরকুটে শিক্ষার্থী ভর্তি, কেবলই দলীয় বিবেচনায়- সেখানে শিক্ষার করুণ অবস্থা বুঝতে আর কোন বিষয়ের খোঁজ করার প্রয়োজন নেই। আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এটা সুখকর হবে না। তবে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিলেই দেশ ও জাতির উন্নয়ন কর্মকান্ডকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব- এর বাইরে বিকল্প কোন পথ থাকতে পারে না।

[লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিসি), কেন্দ্রীয়]

back to top