alt

উপ-সম্পাদকীয়

ধর্মনিরপেক্ষতা, বামফ্রন্ট এবং পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকার

গৌতম রায়

: শুক্রবার, ১৫ অক্টোবর ২০২১

ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের নামে শপথ নিয়ে শারদোৎসবের সময়ে একটা বিরাট সংখ্যক দুর্গাপুজো কমিটিকে পুজো পালনের জন্যে মোটা অঙ্কের টাকা দিচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেশ কয়েকবছর ধরে। এই জনগণেশের সেবার ইনাম অবশ্য মমতা গত বিধানসভা ভোটে পেয়েছেন। পাশাপাশি ওয়াকফের টাকা দিয়ে একটা অংশের ইমাম, মোয়াজ্জিনদের ও তিনি একটা মাসিক ভাতা দিচ্ছেন।

মমতা ক্ষমতায় আসার বেশ অনেককাল পর জানতে পারা যাচ্ছে ; বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করবার জন্যে তিনি মুসলমান সম্প্রদায়ের ভিতরে জ্বলন্ত সমস্যাগুলিকে তার দলীয় আঙ্গিকে ব্যবহার করে কি ধরণের সুবিধা পেয়েছিলেন। বামফ্রন্টের ধারাবাহিক শাসনকালে দাঙ্গার ভয়াবহ উত্তাপ থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানেরা প্রায় মুক্ত ছিলেন। এই স্বস্তির দিকটির পাশাপাশি মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনের দিকটির ক্রমান্নোতির সময়োপযোগী ধারাবাহিকতা রক্ষিত না হওয়ার সুযোগটি মমতা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছিলেন। সেই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে তিনি মুসলমান সমাজের ভিতরে নিজস্ব লোকেদের সাহায্যে একটা ভয়াবহ আভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি করিয়েছিলেন।

মুসলমান সমাজের সময়োপযোগী আর্থ- সামাজিক উন্নতির জন্যে সাম্প্রতিক অতীতে সবথেকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করা হয়েছিল জ্যোতি বসুর অবসরগ্রহণের পরে বুদ্ধদেব ভট্টাটার্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রিত্বের কালে সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে মহঃ সেলিমের ভূমিকার ভিতর দিয়ে। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে মেধা অনুযায়ী নবীন প্রজন্মের মুসলমানদের শিক্ষাক্ষেত্রে সংযুক্ত করে, সেই অধীত শিক্ষার মাধ্যমে পেশাজীবনে স্থিতাব্যস্থায় পৌঁছাক সংখ্যালঘু মুসলমান সমাজের নতুন প্রজন্ম- এই স্বপ্নকে বুকে ধরেই নিজের কর্মপদ্ধতি পরিচালিত করেছিলেন মহঃ সেলিম। সংখ্যালঘু উন্নয়ন বিত্ত নিগমের ভিতর দিয়ে মুসলমান সমাজকে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী করবার যে প্রচেষ্টা তিনি শুরু করেছিলেন, তৎকালীন সময়ে সংসদে তার প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার।

সেলিমের নেতৃত্বে এই প্রক্রিয়া চলাকালীনই খারিজি মাদ্রাসায় জঙ্গি প্রশিক্ষণ জনিত বিতর্কে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মন্তব্য ঘিরে মুসলমান সমাজের ভিতরে প্রবল প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বর্তমান নিবন্ধকার সেই সময়কালে সীমান্তবর্তী মালদহ, মুর্শিদাবাদ জেলাগুলির ঘুরে সরকারি এবং বেসরকারী মাদ্রাসা গুলি ঘুরে দেখেছিলেন, অতি সাধারণ মুসলমান সম্প্রদায়ের ভিতর বুদ্ধদেববাবুর মন্তব্য ঘিরে কি গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল। এই নিবন্ধকারের স্মৃতিতে এখনও ভাসে, মুর্শিদাবাদের জলঙ্গী অঞ্চলের একটি খারিজি মাদ্রাসার আদুলগায়ের তালেবুর আলেম ছোট্ট শিশুটির কথা; এসে দেকে যান চাচা, মোরা ই মাদ্দাসার ভিতিরি বোম বাঁধতিছি, না বন্দুক চালান শিখতিছি।

মাদ্রাসা ঘিরে সেই সময়ের যাবতীয় অপপ্রচারের মূল পান্ডা ছিলেন ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানী। বিজেপির এই প্রবীণ নেতাই ছিলেন ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের অন্যতম প্রধান ষড়যন্ত্রী। আডবানীর তৈরি করা এই ফাঁদে মুসলমান সমাজ সম্পর্কে সম্যক অজ্ঞতা থেকে একাংশের বামপন্থীরা পড়ে যান। এই ঘটনাক্রম কেই কিন্তু ধীরে ধীরে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে মুসলমান সমাজকে ক্ষেপিয়ে তুলতে ব্যবহার করেন মমতা। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আদবানী যখন মাদ্রাসা তথা মুসলমান সমাজ সম্পর্কেই বিষোদগার করছিলেন, অটলবিহারী বাজপেয়ীর মন্ত্রীসভার সদস্যা হিসেবে আডবানীর কথার একটা প্রতিবাদ কিন্তু মমতা করেন নি। যে মমতা, অটলবিহারী ভালো আর লালকৃষ্ণ আডবানী মন্দ - এই তত্ত্বের অবতারণা করেছিলেন, সেই মমতা কেন ওই আডবানীর মুসলমান সমাজ সম্পর্কে অসত্য অপবাদ ঘিরে একটা শব্দ ও উচ্চারণ করলেন না? আসলে মমতা তখন মুসলমান সমাজের ভিতরে নানা আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি করে , মুসলমান সমাজকে ধীরে ধীরে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছেন। তাই আডবানীর কথা ঘিরে মমতার এই নীরবতা।

অপরপক্ষে, মমতার এই ষড়যন্ত্রের মাঝেই ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে জিতে জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন মহঃ সেলিম। মমতা সেই নির্বাচনে একমাত্র নিজে জিতলেও বামফ্রন্টকে উৎখাত করবার যে জাতীয়, আন্তর্জাতিক স্তরের ষড়যন্ত্র চলছিল, সেই ষড়যন্ত্র শেষ হয়ে গিয়েছিল, এমনটা ভেবে নেওয়ার আদৌ কোনো কারন নেই। বরংচ মহঃ সেলিম রাজ্য মন্ত্রিসভা থেকে সাংসদ হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নেওয়ায় জাতীয় স্তরে ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনের অনেক অগ্রগতি ঘটলেও পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান সমাজের শিক্ষা- কর্মসংস্থানের উন্নতির ভিতর দিয়ে তিনি মুসলমানদের আর্থ- সামাজিক ব্যবস্থার যে উদ্ধৃতিতে আন্তরিকভাবে যতœবান হয়েছিলেন, সেই যতেœর অভাব টা সেলিম দিল্লির রাজনীতিতে চলে যাওয়ার ফলে অত্যন্ত প্রকট হলো। আর সেই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে আইনসভায় বামপন্থিদের যে আধিপত্য, তার জেরে মুসলমান সমাজের চাকরি, শিক্ষা, ব্যবসা ইত্যাদি ঘিরে যে নতুন একটা জাগরণের পরিপ্রেক্ষিত মন্ত্রী হিসেবে সেলিম তৈরি করেছিলেন, সেই কার্যক্রম কে সফল করার মানসিকতা তো দূরের কথা, সেই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রটিও ঠিক ভাবে দেখতে পাওয়া গেল না।

এই ফাঁক ফোকর গুলো কিন্তু মমতা জোরদার ভাবে বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করবার কাজে ব্যবহার করতে শুরু করে দিলেন। ফুরফরা, তবলিক জামাত, আহলে হাদিস ইত্যাদিদের ভিতরে যে নানা কারনে মতভেদ আছে সেগুলিকে খুব সূক্ষ্ম ভাবে ব্যবহার করতে শুরু করলেন মমতা। সেলিম মন্ত্রী থাকাকালীন মুসলমান সমাজের আধুনিক চিন্তাভাবনার মানুষ, বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষদের সঙ্গে নিয়ে মুসলমান সমাজে চিন্তার ক্ষেত্রে আধুনিকতার সঞ্চারে আন্তরিক ভাবে প্রয়াসী হয়েছিলেন। কর্মমুখী শিক্ষার ভিতর দিয়ে অর্থনীতির মূল ধারাতে মুসলমান সমাজকে নিয়ে আসার লক্ষ্যে তিনি বহু কর্মসূচি নিয়েছিলেন। সেসব কর্মসূচিগুলো যে শুধু কলকাতা শহরেই আবদ্ধ ছিল- এমনটা ভাববার আদৌ কোনো কারন নেই। রাজ্যের প্রত্যন্ত প্রান্তেও চোখের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যে অপট্রোমেট্রির প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে সরকারি ঋণের মাধ্যমে ছোট ছোট ব্যবসায় গড়ে তোলা- এই কর্মসূচিগুলো অত্যন্ত সাফল্যের মুখ দেখছিল। তার পাশাপাশি লক্ষনীয় বিষয় ছিল যে, যুব কল্যাণ দপ্তর বা সংখ্যালঘু উন্ধয়ন ও বিত্ত নিগম থেকে নানা কাজে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ যে ঋণ নিতেন, সেটি পরিশোধের ক্ষেত্রে সংখ্যাগুরুর থেকে সংখ্যালঘুদের ট্রাক রেকর্ড ছিল অনেকটাই ভালো।

সেলিম কখনো মুসলমান সমাজের কোনো রকম উন্নয়নের জন্যে ধর্মীয় মানুষদের ঘিরে অতিরিক্ত সখ্যতার কোনো পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। আবার ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে কখনো সংঘাতের পরিবেশ ও তিনি রচনা করেন। তার এক সতীর্থ যখন ফুরফুরার অন্যতম ব্যক্তিত্ব ত্বহা সিদ্দিকির সঙ্গে অতিরিক্ত সখ্যতা তৈরি করেন, সেই সখ্যতাকে ঘিরে সেলিমের কোনো বিশেষ তাপ উত্তাপ ছিল না। অচিরেই দেখা যায়, বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকাকালীন ই সেলিমের সেই সতীর্থের কব্জা থেকে ত্বহা সিদ্দিকিকে নিজেদের দিকে টেনে নেন মমতা মুকুল রায়কে দিয়ে। কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদের স্বঘোষিত শাহি ইমাম বরকতিকে একদম দলীয় কাজে কার্যত ব্যবহার করতে শুরু করে দেন মমতা। তখন তিনি কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে তিনি রেল দপূতর থেকে নার্সিং ট্রেনিং কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করান এই স্বঘোষিত শাহি ইমাম কে দিয়ে।

সেলিম জাতীয় রাজনীতিতে চলে যাওয়ার পর ২০০৬ সালের বিধানসভা ভোটে র পর সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছিল আবদুস সাত্তারকে। সেই সময়েই সিঙ্গুর পর্ব শুরু হয়েছে। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে রায়চক পর্যন্ত রাস্তার তৈরির ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণের প্রশ্নে মুসলমানদের যে চরম ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়, তার আলাপ-আলোচনা ইত্যাদির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাহীন আবদুস সাত্তার কোনো প্রভাব ই ফেলতে পারেন না। সেলিম মুসলমান সমাজের সার্বিক উন্নয়নে যে কর্মসূচি নিয়েছিলেন, রাজনৈতিক সঙ্কটের মুহূর্তে সেইসব কর্মসূচি গুলির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিশেষ প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবার মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সাত্তারের ছিল না। ফলে মুসলমান সমাজকে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে মমতা এবং তার হরেক কিসিমের সহযোগীরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সাফল্যের মুখ দেখতে থাকেন। সংখ্যালঘুদের ভিতরে সক্রিয় আর এস এসের শাখা সংগঠন ‘মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চ’ (প্রতিষ্ঠা -২০০২) অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। সংকীর্ণতাবাদী রাজনীতির সঙ্গে লোকজন ও এই পর্যায়ে মুসলমান সমাজকে বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে উসকে দেয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয় ক্যাটালিস্টের ভূমিকা পালন করতে শুরু করে দেয়।

মুসলমান সমাজ থেকে শিক্ষকতার চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে স্কুল সার্ভিস কমিশন থেকে পৃথক করে মাদ্রাসায় নিয়োগের জন্যে এই সময়ে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন তৈরি হলেও আবদুস সাত্তার সেই কমিশনের আইনি স্বীকৃতির দিকটি যথোচিত মর্যাদায় সুরক্ষিত করেন নি। ফলে মুসলমান সমাজের শিক্ষিত মানুষজনের মাদ্রাসায় চাকরির ক্ষেত্রটি কে সংকচিত করতে পরবর্তীতে এই কমিশনকে অকেজো করার যে ষড়যন্ত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসন করছে, সেই চক্রান্তটি করা মমতার পক্ষে অনেকখানি সহজ হয়েছে আবদুস সাত্তার (ইনি এখন বামপন্থী শিবির ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন) কর্তৃক মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের আইনি দিকগুলি সঠিক ভাবে সুরক্ষিত না করবার ফলে।

ষষ্ঠ বামফ্রন্ট সরকারের শেষ দিক থেকে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের ভেতরে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের একটা পরিবেশ তৈরি হতে শুরু করেছে। এই পরিবেশটি সপ্তম বামফ্রন্টের আমলে সিঙ্গর- নন্দীগ্রাম পর্বের সময়কালে ক্রমশঃ আরো জটিল হয়ে উঠছে। তবলিগ জামায়াতের সঙ্গে নানা জায়গায় ট্রাডিশনার মুসলমানদের ছুতোনাতায় সংঘর্ষ হচ্ছে। বিশেষ করে এই ধরণের সংঘর্ষ দেখা গিয়েছিল হাওড়া, মেদিনীপুর ইত্যাদি যে জেলাগুলির মুসলমানদের একটা বড় অংশ দর্জি শিল্প, জরি শিল্প ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত থেকে অর্থনৈতিকভাবে একটু শক্ত বনিয়াদের উপরে আছেন, সেইসব জেলাগুলিতে। এই আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি করে মুসলমান সমাজকে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে মমতাকে বিশেষভাবে এই সময়কালে সাহায্য করেছিল আর এস এসের শাখা সংগঠন ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চ’। নিম্ন বর্গীয় হিন্দুদের ভিতর ব্রাহ্মণ্যত্ব প্রদানের একটা ধারার সামাজিক বিধিবিধান ছিল। নাথ সম্প্রদায়, যোগী বা যুগীরা নিজেদের নাথ ব্রাহ্মণ বলে মনে করতেন। ভি পি সিংয়ের আমলের মন্ডল কমিশন এদের ‘ও বি সি’র অন্তর্গত করেছে। কিন্তু আর এস এসের শাখা সংগঠন শান্তিকুঞ্জ হরিদ্বার’ একটা দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকাতে গণহারে নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের, এমন কি মহিলাদের ও পৈতে দিয়ে তাদের ব্রাহ্মণ্যত্ব প্রদান করে।

এই সংগঠনগুলোর কর্মকা-ই পরবর্তীতে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। আর মমতা মুসলমানদের সঙ্গে ঘটে চলা বেশ কিছু ন্যায্য বঞ্চনাকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। সেভাবেই তিনি মুসলমান সমাজকে ক্ষেপাতে থাকেন বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে।

এমন ঘোরালো পরিস্থিতির মোকাবিলায় বামপন্থিদের ভেতরে যোগ্য নেতৃত্বের অভাবটা খুব গভীর ভাবে প্রকট হয়ে উঠেছিল। আবদুস সাত্তার এই পরিস্থিতি মোকাবিলার আদৌ কোনো উপযুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। এখানে দরকার ছিল সেলিমের মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সম্পন্ন নেতার। এই পর্যায়ে বামপন্থিরা যদি সেই সময়ে মমতার সংখ্যালঘু সমাজ এবং জাতিসত্তাকে ঘিরে যাবতীয় চক্রান্তের মোকাবিলায় মহ. সেলিমের মতো ব্যক্তিত্বকে ব্যবহার করতেন, যিনি মমতার যাবতীয় চক্রান্তের স্বরূপ উপলব্ধি করে, সেই চক্রান্তকে সমূলে উৎপাটিত করবার শক্তি রাখতেন, তাহলে হয়তো আজকের এই দুরবস্থার সামনে আমাদের পড়তে হতো না।

মুসলমান সমাজ ঘিরে নিজের স্বার্থে যে অবস্থান মমতা নিয়েছিলেন, সেই অবস্থানের ভেতরেই কি ভবিষৎ পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিজেপির জোরদার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসবার বীজ সুপ্ত অবস্থায় ছিল না? মুসলমান সম্প্রদায়াকে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দিতে গিয়ে মমতা সেদিন যেভাবে আর এসএস- বিজেপির সাহায্য নিয়ে ওদের কে জমি পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেছিলেন, তা কি আজকে পশ্চিমবঙ্গের বুকে আর এস এসেবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির এই বাড়বাড়ন্তের জন্যে অন্যতম দায়ী নয়?

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

সহনশীলতা : সৃষ্টির শক্তি

ছবি

ভোগ্যপণ্যের ওপর ডলারের দামের প্রভাব

ছবি

খেলা বনাম রাজনীতি

সুবর্ণ দিনের প্রত্যাশায়

ছবি

শহীদ ডা. মিলন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন

ভারতের কৃষি আইন, মোদির ঘোষণা এবং রাজনীতি

তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা কেন দরকার?

খসড়া আয়কর আইন নিয়ে কিছু কথা

তেল-গ্যাস সংকট : হাত বাড়াতে হবে সমুদ্রে

ইউপি নির্বাচন ও ইসির ভূমিকা

আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস

রোহিঙ্গা সংকট : নিরাপত্তা পরিষদেও প্রচেষ্টা চালাতে হবে

খেলার মাঠে পাকিস্তানপন্থার উল্লাস

পঞ্চাশের পাওয়া না-পাওয়া

ছবি

স্মরণ : লাল ঝান্ডা ও সম্পাদকের কলম

ছবি

স্মরণ : একজন সাহসী সম্পাদক

গ্লাসগো সম্মেলন থেকে কী মিলল?

জগৎজ্যোতি দাস : ইতিহাসের বীরশ্রেষ্ঠ

গণপরিবহন ও উন্নত দেশের স্বপ্ন

নতুন ধানের উৎসব

এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স : বিপর্যয় রোধে করণীয়

পুষ্টি নিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা

কালের চাকা থেমে নেই

মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রশাসন

১৫৫(৪) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবতা

ধর্ষণ মামলায় বিচারকের পর্যবেক্ষণ

শিশুদের নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষা

জীবনযাত্রার খরচ বাড়ার উত্তাপ

রাজনীতির আবরণে ধান্ধাবাজির সামাজিক বিস্তার এবং বামপন্থা

সিআরবি রক্ষা আন্দোলন

ছবি

রপ্তানিমুখী কৃষির শিল্পায়ন

ছবি

আমরা এখন একা

‘ইতিবাচক দর্শন ও আগামী প্রজন্ম’

কেমন হচ্ছে পাবলিক পরীক্ষা?

বাগদা ফার্ম, সাঁওতাল হত্যা দিবস এবং অনড় সরকার

হিন্দু বিতাড়নের রাজনীতি

tab

উপ-সম্পাদকীয়

ধর্মনিরপেক্ষতা, বামফ্রন্ট এবং পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকার

গৌতম রায়

শুক্রবার, ১৫ অক্টোবর ২০২১

ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের নামে শপথ নিয়ে শারদোৎসবের সময়ে একটা বিরাট সংখ্যক দুর্গাপুজো কমিটিকে পুজো পালনের জন্যে মোটা অঙ্কের টাকা দিচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেশ কয়েকবছর ধরে। এই জনগণেশের সেবার ইনাম অবশ্য মমতা গত বিধানসভা ভোটে পেয়েছেন। পাশাপাশি ওয়াকফের টাকা দিয়ে একটা অংশের ইমাম, মোয়াজ্জিনদের ও তিনি একটা মাসিক ভাতা দিচ্ছেন।

মমতা ক্ষমতায় আসার বেশ অনেককাল পর জানতে পারা যাচ্ছে ; বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করবার জন্যে তিনি মুসলমান সম্প্রদায়ের ভিতরে জ্বলন্ত সমস্যাগুলিকে তার দলীয় আঙ্গিকে ব্যবহার করে কি ধরণের সুবিধা পেয়েছিলেন। বামফ্রন্টের ধারাবাহিক শাসনকালে দাঙ্গার ভয়াবহ উত্তাপ থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানেরা প্রায় মুক্ত ছিলেন। এই স্বস্তির দিকটির পাশাপাশি মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনের দিকটির ক্রমান্নোতির সময়োপযোগী ধারাবাহিকতা রক্ষিত না হওয়ার সুযোগটি মমতা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছিলেন। সেই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে তিনি মুসলমান সমাজের ভিতরে নিজস্ব লোকেদের সাহায্যে একটা ভয়াবহ আভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি করিয়েছিলেন।

মুসলমান সমাজের সময়োপযোগী আর্থ- সামাজিক উন্নতির জন্যে সাম্প্রতিক অতীতে সবথেকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করা হয়েছিল জ্যোতি বসুর অবসরগ্রহণের পরে বুদ্ধদেব ভট্টাটার্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রিত্বের কালে সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে মহঃ সেলিমের ভূমিকার ভিতর দিয়ে। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে মেধা অনুযায়ী নবীন প্রজন্মের মুসলমানদের শিক্ষাক্ষেত্রে সংযুক্ত করে, সেই অধীত শিক্ষার মাধ্যমে পেশাজীবনে স্থিতাব্যস্থায় পৌঁছাক সংখ্যালঘু মুসলমান সমাজের নতুন প্রজন্ম- এই স্বপ্নকে বুকে ধরেই নিজের কর্মপদ্ধতি পরিচালিত করেছিলেন মহঃ সেলিম। সংখ্যালঘু উন্নয়ন বিত্ত নিগমের ভিতর দিয়ে মুসলমান সমাজকে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী করবার যে প্রচেষ্টা তিনি শুরু করেছিলেন, তৎকালীন সময়ে সংসদে তার প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার।

সেলিমের নেতৃত্বে এই প্রক্রিয়া চলাকালীনই খারিজি মাদ্রাসায় জঙ্গি প্রশিক্ষণ জনিত বিতর্কে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মন্তব্য ঘিরে মুসলমান সমাজের ভিতরে প্রবল প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বর্তমান নিবন্ধকার সেই সময়কালে সীমান্তবর্তী মালদহ, মুর্শিদাবাদ জেলাগুলির ঘুরে সরকারি এবং বেসরকারী মাদ্রাসা গুলি ঘুরে দেখেছিলেন, অতি সাধারণ মুসলমান সম্প্রদায়ের ভিতর বুদ্ধদেববাবুর মন্তব্য ঘিরে কি গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল। এই নিবন্ধকারের স্মৃতিতে এখনও ভাসে, মুর্শিদাবাদের জলঙ্গী অঞ্চলের একটি খারিজি মাদ্রাসার আদুলগায়ের তালেবুর আলেম ছোট্ট শিশুটির কথা; এসে দেকে যান চাচা, মোরা ই মাদ্দাসার ভিতিরি বোম বাঁধতিছি, না বন্দুক চালান শিখতিছি।

মাদ্রাসা ঘিরে সেই সময়ের যাবতীয় অপপ্রচারের মূল পান্ডা ছিলেন ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানী। বিজেপির এই প্রবীণ নেতাই ছিলেন ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের অন্যতম প্রধান ষড়যন্ত্রী। আডবানীর তৈরি করা এই ফাঁদে মুসলমান সমাজ সম্পর্কে সম্যক অজ্ঞতা থেকে একাংশের বামপন্থীরা পড়ে যান। এই ঘটনাক্রম কেই কিন্তু ধীরে ধীরে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে মুসলমান সমাজকে ক্ষেপিয়ে তুলতে ব্যবহার করেন মমতা। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আদবানী যখন মাদ্রাসা তথা মুসলমান সমাজ সম্পর্কেই বিষোদগার করছিলেন, অটলবিহারী বাজপেয়ীর মন্ত্রীসভার সদস্যা হিসেবে আডবানীর কথার একটা প্রতিবাদ কিন্তু মমতা করেন নি। যে মমতা, অটলবিহারী ভালো আর লালকৃষ্ণ আডবানী মন্দ - এই তত্ত্বের অবতারণা করেছিলেন, সেই মমতা কেন ওই আডবানীর মুসলমান সমাজ সম্পর্কে অসত্য অপবাদ ঘিরে একটা শব্দ ও উচ্চারণ করলেন না? আসলে মমতা তখন মুসলমান সমাজের ভিতরে নানা আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি করে , মুসলমান সমাজকে ধীরে ধীরে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছেন। তাই আডবানীর কথা ঘিরে মমতার এই নীরবতা।

অপরপক্ষে, মমতার এই ষড়যন্ত্রের মাঝেই ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে জিতে জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন মহঃ সেলিম। মমতা সেই নির্বাচনে একমাত্র নিজে জিতলেও বামফ্রন্টকে উৎখাত করবার যে জাতীয়, আন্তর্জাতিক স্তরের ষড়যন্ত্র চলছিল, সেই ষড়যন্ত্র শেষ হয়ে গিয়েছিল, এমনটা ভেবে নেওয়ার আদৌ কোনো কারন নেই। বরংচ মহঃ সেলিম রাজ্য মন্ত্রিসভা থেকে সাংসদ হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নেওয়ায় জাতীয় স্তরে ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনের অনেক অগ্রগতি ঘটলেও পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান সমাজের শিক্ষা- কর্মসংস্থানের উন্নতির ভিতর দিয়ে তিনি মুসলমানদের আর্থ- সামাজিক ব্যবস্থার যে উদ্ধৃতিতে আন্তরিকভাবে যতœবান হয়েছিলেন, সেই যতেœর অভাব টা সেলিম দিল্লির রাজনীতিতে চলে যাওয়ার ফলে অত্যন্ত প্রকট হলো। আর সেই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে আইনসভায় বামপন্থিদের যে আধিপত্য, তার জেরে মুসলমান সমাজের চাকরি, শিক্ষা, ব্যবসা ইত্যাদি ঘিরে যে নতুন একটা জাগরণের পরিপ্রেক্ষিত মন্ত্রী হিসেবে সেলিম তৈরি করেছিলেন, সেই কার্যক্রম কে সফল করার মানসিকতা তো দূরের কথা, সেই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রটিও ঠিক ভাবে দেখতে পাওয়া গেল না।

এই ফাঁক ফোকর গুলো কিন্তু মমতা জোরদার ভাবে বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করবার কাজে ব্যবহার করতে শুরু করে দিলেন। ফুরফরা, তবলিক জামাত, আহলে হাদিস ইত্যাদিদের ভিতরে যে নানা কারনে মতভেদ আছে সেগুলিকে খুব সূক্ষ্ম ভাবে ব্যবহার করতে শুরু করলেন মমতা। সেলিম মন্ত্রী থাকাকালীন মুসলমান সমাজের আধুনিক চিন্তাভাবনার মানুষ, বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষদের সঙ্গে নিয়ে মুসলমান সমাজে চিন্তার ক্ষেত্রে আধুনিকতার সঞ্চারে আন্তরিক ভাবে প্রয়াসী হয়েছিলেন। কর্মমুখী শিক্ষার ভিতর দিয়ে অর্থনীতির মূল ধারাতে মুসলমান সমাজকে নিয়ে আসার লক্ষ্যে তিনি বহু কর্মসূচি নিয়েছিলেন। সেসব কর্মসূচিগুলো যে শুধু কলকাতা শহরেই আবদ্ধ ছিল- এমনটা ভাববার আদৌ কোনো কারন নেই। রাজ্যের প্রত্যন্ত প্রান্তেও চোখের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যে অপট্রোমেট্রির প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে সরকারি ঋণের মাধ্যমে ছোট ছোট ব্যবসায় গড়ে তোলা- এই কর্মসূচিগুলো অত্যন্ত সাফল্যের মুখ দেখছিল। তার পাশাপাশি লক্ষনীয় বিষয় ছিল যে, যুব কল্যাণ দপ্তর বা সংখ্যালঘু উন্ধয়ন ও বিত্ত নিগম থেকে নানা কাজে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ যে ঋণ নিতেন, সেটি পরিশোধের ক্ষেত্রে সংখ্যাগুরুর থেকে সংখ্যালঘুদের ট্রাক রেকর্ড ছিল অনেকটাই ভালো।

সেলিম কখনো মুসলমান সমাজের কোনো রকম উন্নয়নের জন্যে ধর্মীয় মানুষদের ঘিরে অতিরিক্ত সখ্যতার কোনো পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। আবার ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে কখনো সংঘাতের পরিবেশ ও তিনি রচনা করেন। তার এক সতীর্থ যখন ফুরফুরার অন্যতম ব্যক্তিত্ব ত্বহা সিদ্দিকির সঙ্গে অতিরিক্ত সখ্যতা তৈরি করেন, সেই সখ্যতাকে ঘিরে সেলিমের কোনো বিশেষ তাপ উত্তাপ ছিল না। অচিরেই দেখা যায়, বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকাকালীন ই সেলিমের সেই সতীর্থের কব্জা থেকে ত্বহা সিদ্দিকিকে নিজেদের দিকে টেনে নেন মমতা মুকুল রায়কে দিয়ে। কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদের স্বঘোষিত শাহি ইমাম বরকতিকে একদম দলীয় কাজে কার্যত ব্যবহার করতে শুরু করে দেন মমতা। তখন তিনি কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে তিনি রেল দপূতর থেকে নার্সিং ট্রেনিং কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করান এই স্বঘোষিত শাহি ইমাম কে দিয়ে।

সেলিম জাতীয় রাজনীতিতে চলে যাওয়ার পর ২০০৬ সালের বিধানসভা ভোটে র পর সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছিল আবদুস সাত্তারকে। সেই সময়েই সিঙ্গুর পর্ব শুরু হয়েছে। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে রায়চক পর্যন্ত রাস্তার তৈরির ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণের প্রশ্নে মুসলমানদের যে চরম ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়, তার আলাপ-আলোচনা ইত্যাদির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাহীন আবদুস সাত্তার কোনো প্রভাব ই ফেলতে পারেন না। সেলিম মুসলমান সমাজের সার্বিক উন্নয়নে যে কর্মসূচি নিয়েছিলেন, রাজনৈতিক সঙ্কটের মুহূর্তে সেইসব কর্মসূচি গুলির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিশেষ প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবার মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সাত্তারের ছিল না। ফলে মুসলমান সমাজকে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে মমতা এবং তার হরেক কিসিমের সহযোগীরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সাফল্যের মুখ দেখতে থাকেন। সংখ্যালঘুদের ভিতরে সক্রিয় আর এস এসের শাখা সংগঠন ‘মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চ’ (প্রতিষ্ঠা -২০০২) অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। সংকীর্ণতাবাদী রাজনীতির সঙ্গে লোকজন ও এই পর্যায়ে মুসলমান সমাজকে বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে উসকে দেয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয় ক্যাটালিস্টের ভূমিকা পালন করতে শুরু করে দেয়।

মুসলমান সমাজ থেকে শিক্ষকতার চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে স্কুল সার্ভিস কমিশন থেকে পৃথক করে মাদ্রাসায় নিয়োগের জন্যে এই সময়ে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন তৈরি হলেও আবদুস সাত্তার সেই কমিশনের আইনি স্বীকৃতির দিকটি যথোচিত মর্যাদায় সুরক্ষিত করেন নি। ফলে মুসলমান সমাজের শিক্ষিত মানুষজনের মাদ্রাসায় চাকরির ক্ষেত্রটি কে সংকচিত করতে পরবর্তীতে এই কমিশনকে অকেজো করার যে ষড়যন্ত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসন করছে, সেই চক্রান্তটি করা মমতার পক্ষে অনেকখানি সহজ হয়েছে আবদুস সাত্তার (ইনি এখন বামপন্থী শিবির ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন) কর্তৃক মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের আইনি দিকগুলি সঠিক ভাবে সুরক্ষিত না করবার ফলে।

ষষ্ঠ বামফ্রন্ট সরকারের শেষ দিক থেকে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের ভেতরে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের একটা পরিবেশ তৈরি হতে শুরু করেছে। এই পরিবেশটি সপ্তম বামফ্রন্টের আমলে সিঙ্গর- নন্দীগ্রাম পর্বের সময়কালে ক্রমশঃ আরো জটিল হয়ে উঠছে। তবলিগ জামায়াতের সঙ্গে নানা জায়গায় ট্রাডিশনার মুসলমানদের ছুতোনাতায় সংঘর্ষ হচ্ছে। বিশেষ করে এই ধরণের সংঘর্ষ দেখা গিয়েছিল হাওড়া, মেদিনীপুর ইত্যাদি যে জেলাগুলির মুসলমানদের একটা বড় অংশ দর্জি শিল্প, জরি শিল্প ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত থেকে অর্থনৈতিকভাবে একটু শক্ত বনিয়াদের উপরে আছেন, সেইসব জেলাগুলিতে। এই আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি করে মুসলমান সমাজকে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে মমতাকে বিশেষভাবে এই সময়কালে সাহায্য করেছিল আর এস এসের শাখা সংগঠন ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চ’। নিম্ন বর্গীয় হিন্দুদের ভিতর ব্রাহ্মণ্যত্ব প্রদানের একটা ধারার সামাজিক বিধিবিধান ছিল। নাথ সম্প্রদায়, যোগী বা যুগীরা নিজেদের নাথ ব্রাহ্মণ বলে মনে করতেন। ভি পি সিংয়ের আমলের মন্ডল কমিশন এদের ‘ও বি সি’র অন্তর্গত করেছে। কিন্তু আর এস এসের শাখা সংগঠন শান্তিকুঞ্জ হরিদ্বার’ একটা দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকাতে গণহারে নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের, এমন কি মহিলাদের ও পৈতে দিয়ে তাদের ব্রাহ্মণ্যত্ব প্রদান করে।

এই সংগঠনগুলোর কর্মকা-ই পরবর্তীতে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। আর মমতা মুসলমানদের সঙ্গে ঘটে চলা বেশ কিছু ন্যায্য বঞ্চনাকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। সেভাবেই তিনি মুসলমান সমাজকে ক্ষেপাতে থাকেন বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে।

এমন ঘোরালো পরিস্থিতির মোকাবিলায় বামপন্থিদের ভেতরে যোগ্য নেতৃত্বের অভাবটা খুব গভীর ভাবে প্রকট হয়ে উঠেছিল। আবদুস সাত্তার এই পরিস্থিতি মোকাবিলার আদৌ কোনো উপযুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। এখানে দরকার ছিল সেলিমের মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সম্পন্ন নেতার। এই পর্যায়ে বামপন্থিরা যদি সেই সময়ে মমতার সংখ্যালঘু সমাজ এবং জাতিসত্তাকে ঘিরে যাবতীয় চক্রান্তের মোকাবিলায় মহ. সেলিমের মতো ব্যক্তিত্বকে ব্যবহার করতেন, যিনি মমতার যাবতীয় চক্রান্তের স্বরূপ উপলব্ধি করে, সেই চক্রান্তকে সমূলে উৎপাটিত করবার শক্তি রাখতেন, তাহলে হয়তো আজকের এই দুরবস্থার সামনে আমাদের পড়তে হতো না।

মুসলমান সমাজ ঘিরে নিজের স্বার্থে যে অবস্থান মমতা নিয়েছিলেন, সেই অবস্থানের ভেতরেই কি ভবিষৎ পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিজেপির জোরদার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসবার বীজ সুপ্ত অবস্থায় ছিল না? মুসলমান সম্প্রদায়াকে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দিতে গিয়ে মমতা সেদিন যেভাবে আর এসএস- বিজেপির সাহায্য নিয়ে ওদের কে জমি পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেছিলেন, তা কি আজকে পশ্চিমবঙ্গের বুকে আর এস এসেবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির এই বাড়বাড়ন্তের জন্যে অন্যতম দায়ী নয়?

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

back to top