image
নাতি-নাতনির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১০ এপ্রিল ১৯৩৪

নববীণায় বাজে নতুনের জয়গান

সঞ্জয় দেওয়ান

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ লেখক, কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতকার, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটোগল্পকার, দার্শনিক ও প্রাবন্ধিক। তিনি ৫৬টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস, ৩৯টি প্রবন্ধ, ০৯টি ভ্রমণকাহিনী, ০৩টি আত্মজীবনী, ১৫৩টি ছোটোগল্প এবং ২৫০০ গান লিখেছেন। তিনি ১৯১৩ সালে ঝড়হম Song Offerings গ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। রবীন্দ্রনাথ প্রায় ২০০০ ছবি এঁকেছেন। ইউরোপ-আমেরিকায় তাঁর চিত্রকলার প্রদর্শনী তাঁকে আধুনিক চিত্রশিল্পীহিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সাহিত্যে তাঁর সম্মোহনী উপস্থিতি আমাদের মুগ্ধ করে।তিনি সংগীতও নৃত্যকে শিক্ষার অপরিহার্য অংশ মনে করতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর “আমার সোনার বাংলা” ও “জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে” গানদুটি যথাক্রমে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংগীত। এছাড়াও, রবীন্দ্রনাথের গানের উপর ভিত্তি করে শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত রচিত হয়।

লেখক আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর ‘‘রবীন্দ্রনাথ চির-নূতনেরে দিল ডাক’’ গ্রন্থে বলেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথের পরিবার ছিল বৈদিক, মধ্যপ্রাচ্য ও পাশ্চাত্য- এই ত্রয়ী সংস্কৃতির সম্মিলিত স্রোতোধারার ফসল’’। ছোটবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথ সাংস্কৃতিক পরিম-লে মুক্ত বিহঙ্গের মতো বেড়ে ওঠেন। তাঁর ভাই দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন দার্শনিক ও কবি, সত্যেন্দ্রনাথ ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের সদস্য, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সংগীতকারও নাট্যকার এবং বোন স্বর্ণকুমারী দেবীঔপন্যাসিক ছিলেন।

নতুনদাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী কাদম্বরী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাল্যসখা এবং তাঁর রচনার অনুপ্রেরণাকারী। ১৮৮৪ সালে কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যা রবীন্দ্রনাথের মনকে অশান্ত করে। এ অপমৃত্যু তাঁর সাহিত্যে সুদীর্ঘছাপ ফেলে।

ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথের বাড়ির বাইরে যাওয়া বারণ থাকায় বাড়ির ভেতরের বাগানের দৃশ্য অবলোকন করতেন পরম মুগ্ধতায়। “শরৎকালের ভোরবেলায় ঘুম ভাঙিলেই এই বাগানে আসিয়া উপস্থিত হইতাম।একটি শিশিরমাখা ঘাসপাতার গন্ধ ছুটিয়া আসিত, এবং স্নিগ্ধ নবীন রৌদ্রটি লইয়া আমাদের পুব দিকের প্রাচীরের উপর নারিকেল পাতার কম্পমান ঝালরগুলির তলে প্রভাত আসিয়া মুখ বাড়াইয়া দিত। আট বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ কাব্যরচনার প্রথম প্রয়াস করেন।

রবীন্দ্রনাথের “অভিলাষ” কবিতাটি প্রথম রচনা হিসেবে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ১৮৭৪ সালে প্রকাশিত হয়। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ লন্ডনে আসেন। তিনি ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে ভর্তি হন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন-এ। আইন বিদ্যা পাঠ শুরু করলেও শেষ করেননি। শেক্সপিয়র ও অন্যান্য ইংরেজ সাহিত্যিকদের রচনা নিবিড়ভাবে অধ্যয়নের সুযোগ পান রবীন্দ্রনাথ। পাঠ করেন রিলিজিও মেদিচি; কোরিওলেনাস এবং অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা। ইংল্যান্ড বসবাসের অভিজ্ঞতা ভারতী পত্রিকায় প্রকাশ করেন। ‘যুরোপযাত্রী কোনো বঙ্গীয় যুবকের পত্র’- নামে প্রকাশিত হতে থাকে। মোট চৌদ্দ দফায় এসব পত্র প্রকাশিত হয়। তাঁর এসব পত্র নানাক্ষেত্রে নানারূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নারী-স্বাধীনতাই ছিল এর মূল বিষয়বস্তু। রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘‘মেয়েপুরুষে একত্রে মিলে আমোদ-প্রমোদ করাই তো স্বাভাবিক। মেয়েরা তো মনুষ্য জাতির অন্তর্গত; ঈশ্বর তো তাদের সমাজের এক অংশ করে সৃষ্টি করেছেন। মানুষে মানুষে আমোদ-প্রমোদ মেশামেশি করাকে একটি মহাপাতক, সমাজ-বিরুদ্ধ, রোমাঞ্চজনক ব্যাপার করে তোলা শুদ্ধ অস্বাভাবিক নয়, তা অসামাজিক সুতরাং এক হিসাবে অসভ্য। সমাজের অর্ধেক মানুষকে পশু করে ফেলা যদি ঈশ্বরের অভিপ্রেত বলে প্রচার কর, তা হলে তাঁর নামের অপমান করা হয়। মেয়েদের সমাজ থেকে নির্বাসিত করে দিয়ে আমরা কতটা সুখ ও উন্নতি থেকে বঞ্চিত হই, তা বিলেতের সমাজে এলে বোঝা যায়। এখানে যতগুলি ভারতবর্ষীয় এসেছেন, সর্বপ্রথমেই তাদের চোখে কি ঠেকেছে? এখানকার সমাজের সুখ ও উন্নতি সাধনে মহিলাদের নিতান্ত প্রয়োজনীয় সহায়তা। যাঁরা স্ত্রী-স্বাধীনতারবিরোধী ছিলেন, এখানে এসে নিশ্চয়ই তাঁদের মতের সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে’’। দেড় বছর ইংল্যান্ডে থেকে ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে ফিরে আসেন রবীন্দ্রনাথ। পাশ্চাত্য সংগীতের সুর ও অপেরা নাট্য শৈলীর অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের সৃজনকর্মে সহায়তা করেছে।

রবীন্দ্রনাথ প্রচলিত শিক্ষা সম্পর্কে প্রথাবিরুদ্ধ চিন্তা পোষণ করতেন। আব্দুর রউফ চৌধুরী বলেন, ‘‘‘তোতাকাহিনী’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ বিদ্যালয়ের মুখস্থসর্বস্ব শিক্ষাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেন। দেখিয়ে দেন, দেশের ছাত্রসমাজকে খাঁচাবদ্ধ পাখির মতো শুকনো বিদ্যা গিলিয়ে কীভাবে তাদের বৌদ্ধিক মৃত্যুসাধন হচ্ছে।’’

মুক্ত বিদ্যা চর্চার জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শান্তিনিকেতন। রবীন্দ্রনাথ কবির, মির্জা গালিব, জালালউদ্দিন রুমি ও লালন ফকির-এর বাণীতে অণুপ্রাণিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘‘গীতাঞ্জলি” এক অধ্যাত্মজগৎও মরমিবাদের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আব্দুর রউফ চৌধুরী বলেন, “‘গীতাঞ্জলি’তে রয়েছে প্রেমের বেদনা, প্রকৃতির টান।উপনিষদীয় ভাব।সংশয় ও দ্বিধা। রহস্য। অসহায়তা। নিরীশ্বর ভাব।”

‘‘গোরা’’ রবীন্দ্রনাথের প্রধানতম উপন্যাস। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষাংশ, সনাতন হিন্দু ও ব্রাহ্মসমাজের সংঘাত, ভারতবর্ষেররাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা এতে উপস্থাপিত হয়েছে। ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে এক অকাল বিধবার প্রণয়কে ঘিরে তিনি তির্যক প্রশ্ন ছুঁড়েছেন। ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ নিরীক্ষাধর্মী প্রেমের আখ্যান লিখেছেন। বিজ্ঞানচর্চার গুরুত্বারোপ করে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘‘বুদ্ধিকে মোহমুক্তি ও সতর্ক করবার জন্য প্রধান প্রয়োজন বিজ্ঞানচর্চার।’’

রবীন্দ্রনাথ বাংলার নদী,মাটি, কীট, মানুষ, পল্লিবাংলা ও একতারা ভালোবাসেন। তিনি লিখেন, ‘‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক আমি তোমাদের লোক / আর কিছু নয়, এই হোক শেষ পরিচয়।’’ আব্দুর রউফ চৌধুরী সন্তাপ প্রকাশ করেন, কেন সমগ্র বাঙালি জাতি বাঙালি হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে না? কেন তারা পারে না রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্ববাংলাকে ভালোবাসতে?

“আমি বেসেছিলেম ভালো

সকল দেহ মনে

এই ধরণীর ছায়া আলো আমার এ জীবনে”

হিন্দু-মুসলমান, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলেই বাঙালি। কোনো সামান্য কারণে যদি ঐক্য নষ্ট হয় তাহলে এর চেয়ে দুর্ভাগা জাতি পৃথিবীতে আর হবে না।

রবীন্দ্রসাহিত্যে জগতের আধমরা মানুষের সগৌরব অবস্থান রয়েছে। ‘বাঁশি’ কবিতায় হরিপদ কেরানির জীবনও তথৈবচ। অভাবের কারণে স্বভাব থেকে হারিয়ে যায় প্রেম। কবি বলেন,

‘‘ধলেশ্বরী নদীতীরে পিসিদের গ্রাম।

তাঁর দেওরের মেয়ে,

অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিল ঠিকঠাক।

লগ্ন শুভ, নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল

সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে’’

হরিপদ কেরানিরা নিঃসঙ্গ জীবন কাটায়। চ-ীদাস ও বিদ্যাপতি সম্বন্ধে অন্বেষণ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ যা জানতে পারেন সেই সম্বন্ধে তিনি বলেন, ‘‘নিজের প্রাণের মধ্যে, পরের প্রাণের মধ্যে ও প্রকৃতির প্রাণের মধ্যে প্রবেশ করিবার ক্ষমতাকেই বলে কবিত্ব।’’

রবীন্দ্রনাথের জীবনে কয়েকজন নারী দীর্ঘ রেখাপাত করেছেন। তাঁরা হলেন- কাদম্বরী দেবী, মৃণালিনী দেবী, মৈত্রেয়ী দেবী, রানী চন্দ, নির্মলকুমারী, অন্নপূর্ণা তরখদ, মিস স্কট, মিস ওসওয়ালড, মিস লং, মিস ভিভিয়ান, মিস মূল, ইন্দিরা দেবী ও ভিক্টোরীয়া ওকাম্পো। রবীন্দ্র রচনায় গুরুত্ববহ নারী চরিত্র- ঘরে বাইরে উপন্যাসের বিমলা, চোখের বালির বিনোদিনী, শেষের কবিতার লাবণ্য এবং নষ্টনীড়ের চারুলতা, সমাপ্তী গল্পের মৃন্ময়ী ও পোস্ট মাস্টার গল্পের রতন।

রাজা রামমোহন রায়, ব্রাহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র বিবেকানন্দ রবীন্দ্রনাথের উপর প্রভাব বিস্তার করেন।রবীন্দ্রনাথের কাব্যে প্রধান ভাব প্রগতিশীলতা। তাঁর মতে পরিবর্তনই সমাজ। রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘‘ভবিষ্যৎকাল অসীম, অতীতকালও তাই আর এ দুয়ের মাঝেই মানুষেরমন প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়।” লেখক বলেন, গীতা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের ধারণা কী তা উল্লেখ করা প্রয়োজন- ‘‘অর্জুনকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করবার জন্যে আত্মার অনশ্বরত্ব সম্বন্ধে যে উপদেশ রয়েছে তার মধ্যে বিশুদ্ধ সত্যের সরলতা নেই।’’

রবীন্দ্রনাথেরবিভিন্ন দেশ ভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতারয়েছে। তিনি সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার পর বিদেশি আমন্ত্রণে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

তিনি ৩৩টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছিলেন। দেশের বাহিরে ভ্রমণ এর মাধ্যমে তিনি নিজের দর্শনকে প্রচার করেন। ফলে সহসাই আন্তর্জাতিক, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। লন্ডনে মিশনারি তথা গান্ধীবাদী চার্লস এফ. অ্যান্ড্রুজ, অ্যাংলো-আইরিশ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস, এজরা পাউন্ড, রবার্ট ব্রিজেস, আর্নেস্ট রাইস, টমাস স্টার্জ মুর প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাঁর ভক্তে পরিণত হন। ১৯১৬ সালের ৩ মে থেকে ১৯১৭ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান। এছাড়া তিনি রচনা করেন ‘ন্যাশনালিজম ইন ইন্ডিয়া’ নামে একটি প্রবন্ধও। এটি একইসাথেনিন্দিত ও নন্দিত হয়। রোম্যাঁ রোলাঁ এই প্রবন্ধের প্রশংসা করেন।

তিনি পেরু সরকারের কাছ থেকে একটি আমন্ত্রণ পান। পেরু থেকে তিনি মেক্সিকোতে যান। ১৯২৪ সালে তিনি চীন ভ্রমণ করেন এবং সেবছরনভেম্বরে আর্জেন্টিনা গিয়েছিলেন। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর আন্তরিকতায়ভিলা মিরালরিওতে থাকেন। কবি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে নিয়ে লিখেছেন,

“আরও একবার যদি পারি

খুঁজে দেব সে আসনখানি

যার কোলে রয়েছে বিছানো

বিদেশের আদরের বাণী।”

তিনি১৯২৬ সালের ৩০ মে ইতালি গিয়েছিলেন। রোমে সাক্ষাৎ হয় বেনিতো মুসোলিনির সঙ্গে। ১৯২৭ সালের ১৪ জুলাইতিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চার মাসব্যাপী এক সফরে বের হন। তিনি ভ্রমণ করেন বালি, জাভা, কুয়ালালামপুর, মালাক্কা, পেনাং, সিয়াম ও সিঙ্গাপুর। ১৯৩০ সালে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে বের হলেন। লন্ডন ও প্যারিস নগরীতে তাঁর অঙ্কিত চিত্রের প্রদর্শনী হয়। ১৯৩০ সালে তিনি ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানি ভ্রমণ করেন। এরপর যান সোভিয়েত ইউনিয়নে। ১৯৩২ সালে তিনি যান ইরানে। সেখানে রেজা শাহ পাহলভির আতিথেয়তায় মুগ্ধ হন। তিনি ইরাকও ভ্রমণ করেন।তিনিসিংহল ভ্রমণ করেন১৯৩৩ সালে।

রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষের মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষা করেন কিশোরকাল থেকে। তিনি লিখেন, “মানুষের মন চায়, মানুষেরি মন”। তিনি বঙ্গভঙ্গের তুমুল বিরোধিতা করে এর নেতৃত্ব দেন। হিন্দুত্ব ও হিন্দুজাতীয়ত্ব যে এক জিনিস নয় তা রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেন স্বদেশি আন্দোলন এর সময়। স্বদেশি আন্দোলনের কার্যক্রমের সঙ্গেরবীন্দ্রনাথের অমিল ছিল, তবে বিরুদ্ধ নয়। তাঁর জীবনদর্শনের মূলে মানবতাবাদ। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মানুষের মধ্যে দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবের বাণী উচ্চারণ করেছেন। স্বদেশ ও স্বজাতির মুক্তি তিনি চেয়েছেন একই সাথে সমগ্র পৃথিবীর মানবমুক্তি ও মানবকল্যাণের স্বপ্ন তার মনে জাগরূক ছিল।

আব্দুর রউফ চৌধুরী বলেন, “নৃত্যই হচ্ছে কবির আত্মপ্রকাশের মাধ্যম- কবির শিল্পপ্রেরণার প্রথমস্তর। ‘প্রকৃতিতে নৃত্যেরই নিত্য দোলাচল’। বৈদিক যুগেও নৃত্যের প্রচলন ছিল। ‘‘বাল্মীকিপ্রতিভা’’ রবীন্দ্রনাথের প্রথম সুরের নাটিকা। দেশি ও বিলাতি সুরের চর্চার মধ্যে বাল্মীকিপ্রতিভার সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ আজীবন বিশ্বপ্রকৃতির সন্ধানে নিমগ্ন ছিলেন। প্রকৃতির বিচিত্র রূপরসগন্ধে বিভোর ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের জীবন বেদনার বালুচরে খাবি খায় তার স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর মাধ্যমে। কবির তিন সন্তান বেলা, রানী, শমীন্দ্র কবির জীবদ্দশাতেই জীবনের মায়া ত্যাগ করেন। স্ত্রীর মৃত্যুতে কবি লিখেন,

আমার ঘরেতে আর নাই সে যে নাই-

যাই আর ফিরে আসি, খুঁজিয়া না পাই।

আমার ঘরেতে নাথ, এইটুকু স্থান-

সেথা হতে যা হারায়, মেলে না সন্ধান।

স্ত্রী ও সন্তানদের মৃত্যু রবীন্দ্রনাথের কলমকে থামাতে পারেনি। পরিবারের একের পর এক মৃত্যুর করাল ¯্রােতের বিপক্ষে গিয়ে তিনি রচনা করেন ‘চোখের বালি’ ও নৌকাডুবি’’।

ঠাকুরবাড়ির একতারা, হারমোনিয়াম, তবলার ঝংকারের প্রভাব পড়েছিলরবীন্দ্রনাথের মনে। কিশোর মন আলোড়িত করতো সুরের লহরি। হারিয়ে যেতেন কল্পভূমে। গান লেখার পর সুর দেওয়ার চেষ্টা করতেন। সেই সুরগুলো আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ‘গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ’, ‘বড় আশা করে’, ‘পুরোনো সেই দিনের কথা’ ইত্যাদি গান আমাদের নস্টালজিক করে।রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায়ের গানে বিচিত্র সুর ও ভাবে সার্থক মেলবন্ধন রয়েছে।স্বদেশ পর্যায়ের গান হৃদয়স্পর্শী। তিনি লিখেন, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।’ তাঁর প্রেম পর্যায়ের গান পূজার সূচিতায় ভাস্বর। রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি পর্যায়ের গানগুলো সবিশেষ প্রকৃতি বন্দনায় মুখরিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতবিতান’ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।এগারো বছর বয়সে প্রথম গান লিখেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘বন্দে মাতরম’ গানের সুরকারও তিনি।বাংলার লোকজ সুর, পাশ্চাত্যের লোকগীতি ও কীর্তনের প্রভাব রবীন্দ্রনাথের সুরে নবব্যঞ্জনা তৈরি করেছে। বিশ^কবির জন্মতিথিতে নববীণায় বাজে নতুনের জয়গান।

সম্প্রতি