সুকুমার বড়ুয়া
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
বাঙালির রক্তে জন্ম হতেই ছড়ার ছন্দ দোলা দিয়ে যায়। গ্রামে-গঞ্জে সনদবিহীন শিক্ষায় বেড়ে ওঠা মায়েদের মুখে মুখে ঘুমপাড়ানি ছড়া কিংবা ছড়ার ছন্দে শ্লোক-ধাঁধা-হেঁয়ালি জাতীয় লোকছড়া শুনতে শুনতে শিশুর মনোজগতে তৈরি হয় ছড়ার প্রতি ভালোবাসা। পল্লী মায়ের কোলে বেড়ে ওঠা এমন এক ছড়ার শিশু সুকুমার বড়–য়া। মধ্যম বিনাজুড়ি গ্রামে বাবা সর্বানন্দ বড়–য়া ও মা কিরণ বালা বড়–য়ার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন সুকুমার। গ্রামে মনসার পুঁথিপাঠের আসর থেকে ছড়ার ছন্দে তিনি আগ্রহ বোধ করেন। প্রথাগত পড়াশোনা আর্থিক অনটনে তেমন না আগালেও মেধাবী সুকুমার যতটুকু পড়েছেন ততটুকু দিয়েই জয় করেছেন ছড়ার জগত, হয়ে উঠেছেন ছড়া-স¤্রাট। তিনি অসংখ্য ছড়া লিখেছেন। একটা শিশুতোষ গল্পের বইও তিনি রচনা করেছেন। একজন ছড়াকার হিসেবে সুকুমার বড়–য়াকে ব্যবচ্ছেদ করলে যা উঠে আসে তা হলো তাঁর সর্বজনগ্রাহ্যতা। তিনি সবার ছড়াকার হয়ে উঠতে পেরেছেন অবলীলায়। তিনি যেমন খোকাখুকুর ছড়াকার, তেমনি তিনি বাবা-মা’রও ছড়াকার। আবার তিনি তরুণ-তরুণীরও ছড়াকার। তাঁর ছড়ার বিষয়-বৈচিত্র্য চতুর্মুখী। তাঁর ছড়ায় দেশপ্রেম যেমন আছে তেমনি আছে তীব্র শ্লেষ। সামাজিক অসঙ্গতিগুলো তিনি তুলে ধরেছেন শ্লেষের মাধ্যমে। ছড়ায় ছড়ায় তাঁর রসিকতাও অনন্য। তিনি কখনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ছড়া লিখেছেন আবার কখনও চটুল বিষয়কেও ছড়ার উপজীব্য করে তুলেছেন। তাঁর ছড়ার বড় বৈশিষ্ট্য হলো উইট বা তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা। তাঁর ছড়া রসে ভরা, কষে কড়া। তাঁর অন্ত্যমিল সহজ ও অনন্য। একমাত্রিক অন্ত্যমিলের চেয়ে বহুমাত্রিক অন্ত্যমিলের প্রয়াস তাঁর ছড়ায় অধিক। তাঁর ছড়া স্বতঃস্ফূর্ত। জোর করে ছন্দমাত্রা মিলানোর কোনো চেষ্টা নেই। তিনি মাথা নিচের দিকে গুঁজে হাঁটতে হাঁটতে ছড়া তৈরি করেন মস্তিষ্কের কারখানায়। তিনি একজন ক্ষণজন্মা জাত ছড়াকার। ছড়া লিখে তিনি অটোগ্রাফ যেমন দিয়েছেন তেমনি ছড়া লিখে শুভেচ্ছা বাণীও পাঠিয়েছেন। আবার দৈনিক পত্রিকায় দায়িত্বকালীন রাহাত খানের কাছে ছড়া সম্বলিত খুদে চিঠি পাঠিয়েই পাওনা আদায়ের সৌজন্য তৈরি করেছেন। প্রমিত বাংলায় ছড়া লিখতে তিনি যেমন অভ্যস্ত তেমনি নিজের জন্ম-জনপদ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাতেও তিনি ছড়া লিখে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন। তাঁর ছড়া কখনও কমলের চেয়ে কোমল আর কখনও প্রয়োজনে হাতুড়ি-শাবল।
দেশপ্রেমিক সুকুমার বাঙালির অনন্য অর্জন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখেন অনন্য ছড়া ‘মুক্তিসেনা’। মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়খোলা অভিনন্দন জানিয়ে তিনি লেখেন: “ধন্য সবাই ধন্য/অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করে/মাতৃভূমির জন্য”। তাঁর ছড়ার ভাষা শিশুর পক্ষে পাঠযোগ্য সরলতায় ভরপুর। ফলে মনে হয় এ যেন কোনো শিশুর মন হতে আওড়ানো বুলি। তিনি যখন বলেন, ‘দেশের তরে ঝাঁপিয়ে পড়ে/শক্ত হাতে ঘায়েল করে/সব হানাদার সৈন্য/ধন্য ওরাই ধন্য’ তখন আমাদেরও গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি বীরদের অমিত বিক্রমের কথা চিন্তা করলে। ছড়ায় ছড়ায় কোমলমতি শিশুদের সঠিক ইতিহাস রপ্ত করানোর এ এক ঋদ্ধ উপায়।
পিঠাপিঠি ভাইবোন থাকলে ঘরে মারপিট যেমন বাড়ে তেমনি মিল-মিশও বেশি হয়। সুকুমার বড়–য়ার ‘চন্দনা রঞ্জনার ছড়া’গ্রন্থে এরকম একটি ঘরের ছবি পাই যাতে পিঠাপিঠি দুই বোনের খুনসুঁটি ফুটে ওঠে। ‘চন্দনা আর রঞ্জনাতে আচ্ছামতো মিল/ বুকভরে পায় আদর সোহাগ / পিঠ ভরে খায় কিল’ ‘এই বলে তিনি চন্দনা-রঞ্জনার মধ্য দিয়ে প্রতিটা ঘরের অন্দরের চিত্র তুলে ধরেছেন। উল্লেখ্য, চন্দনা তাঁর বড় মেয়ে আর রঞ্জনা তাঁর মেঝো মেয়ে। তাঁর ছোট কন্যার নাম অঞ্জনা। তাঁর আর একটি ছড়া ‘আনিকা ও শারিকা’। এই ছড়াতে অন্ত্যমিল ব্যবহারের মুন্সিয়ানা লক্ষ্যণীয়।
তিনি অন্ত্যমিলের খোঁজে ঐতিহ্যের খাবারের সন্ধান কিংবা মাথায় মাথায় ঢুশ লাগিয়ে ছেড়েছেন। সবার দৃষ্টি কেড়ে নিয়ে তিনি যেন আঙুল নির্দেশ করে বলেছেন, ‘ওই আমাদের আনিকায় / মিষ্টি বাখরখানি খায় / সর্দি হলে বরফ দিয়ে / গরম গরম পানি খায়।’ এতোটুকু শুনলেই বাখরখানি খেতে যেমন মন চায় তেমনি বরফ দিয়ে গরম পানি খাওয়ার উপমা মুহূর্তেই হাসির উদ্রেক ঘটায়। আবার, ‘তার যে সাথি শারিকায় / ভাত দিয়ে তরকারি খায়’, শুনলে অন্ত্যমিলের অপূর্ব মিলে মনের মধ্যে সহজ স্বস্তি পাখা মেলে।
শিশুমনের দারুণ আগ্রহ বিবিধ জীব-জন্তুতে। তিনি তাঁর ছড়ার মাধ্যমে যেন সবাইকে নিমিষে ঘুরিয়ে আনেন চিড়িয়াখানা হতে। ‘হাতি’ ছড়াটি চিড়িয়াখানা ঘুরে এস গল্পবলা কোনো শিশুর মুখে শুনতে পাওয়া যেন:‘এত্তোটুকুন হাতিটার / অত্তোবড়ো দাঁত / শাক খায় না মাছ খায় না / খায় না গরম ভাত।’ এটুকুন পর্যন্ত ছড়াটি শুনে মনে মনে উৎসাহ জাগে, কৌতূহল হয়, হাতি তাহলে কী খায়।
যারা স্কুলে যায় তাদের কাছে ভালো লাগে না শৃঙ্খলা, তাই যেন দুপুরের টিফিন ছুটির জন্যে সবার প্রতীক্ষা। সুকুমার বড়–য়া স্কুলের এই জীবন নিয়েও মজা করতে ভোলেননি‘ ‘ক-শাখা/ খ-শাখা/ গ-শাখা/ ঘ-শাখা/ দুপুরের ছুটিতে / নুন দিয়ে শশা খা’। ছড়া পড়তে পড়তে ‘নুন দিয়ে শশা’ খাওয়ার চিত্রকল্প আমাদের গ্রামের সেই স্কুলের বারান্দায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
কম্পিউটার নিয়ে সকলের বিস্ময়ের অন্ত নেই। তাতে ডাটা প্রসেস করতে করতে পেরেশান হয়েছেন অনেকেই। তিনি এই ডাটাকে তরকারির ডাটার সাথে মিশিয়ে আমাদের দিচ্ছেন ‘ডাটা সংবাদ’: ‘পুঁইয়ের ডাটা লাউয়ের ডাটা/ বায়োডাটার ঝোল/ ডাটা প্রসেস করতে হলে কম্পিউটার খোল’। গবেষকের ডাটার যে তারতম্য আছে তাও তিনি বলেছেন। ‘ডালের সাথে মাছের সাথে / যেমন ডাটা চলে / গবেষকের ডাটা আবার / অন্য কথা বলে।’ তাঁর এই ডাটার সংবাদে অনেকের জিভে জল চলে আসে।
অনুপ্রাসে সিদ্ধহস্ত সুকুমার বড়–য়া খুব অনায়াসে বলছেন, ‘রাশবিহারী দাশের নাতি / হাসপাতালে বাস করে/ মাস ফুরালে দেশে গিয়ে / খাশ জমিতে চাষ করে।’ এই গল্পে রাশবিহারী দাশের নাতির মতো অনেক কিশোর আমাদের আশেপাশে ঘুর ঘুর করে, ‘যারা পাস করেনি পরীক্ষাতে / পয়সাকড়ি নাশ করে।’ সুকুমার বড়–য়া ছড়াকার হলেও রোগ সচেতন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি বিভাগে কর্মজীবনে নিযুক্ত ছিলেন। আর এ কারণেই ‘ম্যাড কাউ’ ডিজিজ নিয়ে তিনি সচকিত হয়ে বলেন, ‘রেডকাউ ম্যাড কাউ ব্যাড কাউরে / লাউ খেলে করে শুধু হাউ কাউরে।’ এখানে ‘উ’ ধ্বনির অনুপ্রাসে ম্যাড কাউ রোগের কথা ভেবে বাজারে গিয়ে খেই হারান ছড়াকার। তিনি কী কিনতে কী কিনেন ভেবে না পেয়ে বলেন, ‘আজ কিনি না কাল কিনি / ঝালকাঠিতে চাল কিনি। নীল কিনি না লাল কিনি / তিল ছেড়ে আজ তাল কিনি।’ সত্যিই গ্রোতস্বিনীর মতো সতত প্রবহমান তাঁর অন্ত্যমিলের ধারা।
ছড়ার ছন্দ-মাত্রার প্রয়োজনে, অন্ত্যমিলের আবাহনে ছড়াকার সুকুমার বড়–য়া বাংলার মাঝে ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে বাংলাকে ঋদ্ধ করেছেন। আবার ইংরেজিকেও ম্লেচ্ছ বলে দূরে রাখেননি। শেয়ালকে ধূর্ত ডাকলেও বাংলার লোকসমাজে তাকে প-িত আখ্যা দেওয়া হয়। ধূর্ত শেয়ালকে নিয়ে তিনি শিশুদের বলছেন, ‘শেয়াল নাকি লোভ করে না / পরের কোন জিনিসটার / কী পরিচয় দিল আহা / কী সততা কী নিষ্ঠার / তাইতো শিয়াল বনের মাঝে/ এডুকেশন মিনিস্টার।’ শিয়ালের এডুকেশন মিনিস্টারির কথা শুনে হাসি পেলেও ভালোও লাগে শুনতে। মনে পড়ে যায় কুমিরের সাত ছানাকে বিদ্যা দিয়ে দিগগজ করা শেয়াল প-িতের কথা। বোকা কুমির ও শেয়ালকে বিশ্বাস করে গভীরভাবে। শেয়াল আর কুমিরের আগেকার রূপকথার গল্প বা গ্রাম-বাংলার উপকথা আজকের শিশুরা আর শোনে না। তারা এখন কার্টুনের পাগল। সুকুমার বড়–য়া এই কার্টুনপ্রিয়তা নিয়েও গজাল মেরেছেন ‘কার্টুনের দেশ’ নামক ছড়ায়। তিনি দুঃখ করে বলেছেন, ‘টম-জেরি হাতোরি / মিস্টার বিন / দেখে দেখে কেটে যায় / রাত আর দিন।’ একজন সমাজ ও সময় সচেতন ছড়াকার ছিলেন সুকুমার বড়–য়া। তাঁর খরদষ্টি থেকে কিছুই বাদ যায়নি।
মধ্যবিত্ত বাঙালি ঘরে অসময়ে মেহমান আসেনি এমন ঘর বিরল। দুপুরে সবাই খেতে বসেছে এমন সময়ে মেহমানের উৎপাত। রাতে ঘুমুতে যাওয়ার যোগাড় হচ্ছে এমন সময় বেজে ওঠে ডোরবেল। মেহমানের এই উৎপাত হতে বাঁচতে সুকুমার ছোট দুরন্ত শিশুটি হয়ে, রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্পের ডানপিটে ফটিকের মতো প্রাণপণ চেষ্টা করেন। তবুও ত্যাঁদোড় মেহমান আসবেই। এই ঘটনাই তিনি বলছেন আমাদের‘ ‘অসময়ে মেহমান / ঘরে ঢুকে বসে যান / বোঝালাম ঝামেলার / যতগুলো দিক আছে/ তিনি হেসে বললেন/ ঠিক আছে ঠিক আছে।’ মেহমানকে এতেও দমানো গেল না। তবুও ছড়াকার হারবার পাত্র নন। বলতেই থাকেন, ‘রেশনের মোটা চাল / টলটলে বাসি ডাল / থালাটাও ভাঙাচোরা / বাটিটাও লিক্ আছে/ যেতে যেতে জানালেন / ঠিক আছে, ঠিক আছে।’ এমন মেহমানের পাল্লায় যদি সত্যি সত্যি কেউ পড়ে তবে কী হয় কী জানি!
এদেশে একটা সময় ছিলো যখন ছিঁচকে চোরের আবির্ভাবে জনমনে স্বস্তি ছিলো না। মসজিদের সামনে থেকে জুতো চুরি হয়ে যায়। মুরগির খোঁয়াড় হতে মুরগি গায়েব হয়। সিঁদ কেটে ঘর লোপাট হয়। এতোসব কিছু দেখে সুকুমার বড়–য়াই-বা বসে থাকবেন কেন হাত গুটিয়ে। তিনি তীক্ষè শ্লেষ মেখে আমাদের জানাচ্ছেন ছিঁচকে চুরির সংবাদ‘ ‘দিন দুপুরে ঘর ডাকাতি / পানি তোলার লোটাও নেই / সর্ষে-তেলের বোতল গায়েব / তেল তাতে এক ফোঁটাও নেই।’ এমনই হা ভাতে সেই চোর, তেলহীন বোতলটাও তার কাছে অনেক কিছু। শেষমেষ পুষিয়ে নিতে দড়িসহ ছাগলটাও চুরি করে নিয়ে যায়। ছড়াকারের জবানিতে আমরা পাই‘ ‘ছাগল বাঁধার দড়ি গেছে। দড়ির মাথায় খোঁটাও নেই / আরেক মাথায় ছাগল ছিল / এখন দেখি ওটাও নেই।’
ঢাকা রাজধানী হলেও জীবনযাত্রা খুব সুবিধার নয়। এখানে বাস করতে গেলে বড় ভাইদের ছত্রছায়া লাগে। এটাকে বুঝাতে গিয়েই তিনি অদ্ভুত সুন্দরভাবে ঢাকা বাসের বিড়ম্বনার কথা তুলে ধরেছেন ‘ছত্রছায়া’য়‘ ‘ঢাকার পথে চলতে হলে / সারা বছর ধরুন ছাতা / উপর তলার ময়লা পানি / কিংবা কাকের কা- যা-তা।’
নিচুতলার মানুষের জীবনের যে কষ্ট তা ফুটে উঠেছে ‘কাফন’ ছড়ায় অনন্যভাবে। ঢাকা শহরের বিড়ম্বনা ছাপিয়ে জীবনের বিড়ম্বনা আরও বড়ো। এই জীবনে ফকির আলীর মতো দরিদ্ররা অসহায়। তাদের নিয়েই সুকুমার বড়–য়া বলেছেন, ‘জ্যান্ত দিতে দানা পানি / মরণকালে দাফন / সর্বহারা ফকির আলীর / কেউ ছিলো না আপন / বেঁচে থাকার পায় না টিকেট/ মৃত্যুরও নাই সার্টিফিকেট/ উভয় বিপদ জেনেও খোঁজে / ন্যায্য দামে কাফন।’
আঞ্চলিক ছড়ায় সমানভাবে সিদ্ধহস্ত সুকুমার বড়–য়ার একটা ছড়াগ্রন্থের নাম ‘কোয়াল খাইয়ে’। চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষায় রচিত এসব ছড়ায় ভাষার মাধুর্যের পাশাপাশি রস ও রম্যতা যেমন আছে তেমনি খুঁচিয়ে অসঙ্গতি নির্দেশের মুন্সীয়ানাও পরিলক্ষিত হয়। আমাদের দেশে ভোট নিয়ে নানা তালবাহানা হয়। নেতাদের নানা প্রতিশ্রুতি থাকে। কিন্তু ভোটের বৈতরণী পার হয়ে গেলে সেই প্রতিশ্রুতি তারা ভুলে যায়। এরকম ভোটের কড়চা নিয়ে তিনি ‘ভোট’ শিরোনামের ছড়ায় লিখেছেন, ‘ভোট দি যা ভোট / ভোট ভোট দিলে কি কি দিব?/ টেঁয়া দিব সিকি দিব /হাতি দিব ঘোড়া দিব / ভাজা দিব পোড়া দিব / ন মানিলে হোঁড়া দিব / দিব ছিঁড়া কোট।’ কী অসাধারণ ভোটের ছবি! কত প্রতিশ্রুতি আর লোভের হাতছানি! ভোট না দিলে হোঁড়া (পায়ে পাড়া দেওয়া) দেওয়ার ভয়ও তিনি লাগিয়েছেন। এর চেয়ে সত্য আর কী হতে পারে! ভোটের যেমন অসঙ্গতি আছে তেমনি নেতারাও অসঙ্গতিতে কম যায় না। অনেক নব্য নেতা আছে যারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে। এমন একজন নেতা হলেন সুকুমার বড়–য়ার ‘লাল মিয়া’। তিনি তাকে নিয়েই লেখেন, ‘লাল মিয়া তো বিরাট নেতা/ রাস্তা ঘাডে ফালমারে / দিনৎ বড় ভালামানুষ / রাইত দুপুরে জাল মারে / গরীবরলাই কাঁদি কাঁদি/ টেঁয়া পইসার টাল মারে / জাল কবলা দলিল বানাই / পরর ক্ষেতৎ হাল মারে।’ এই ‘লাল মিয়া’দের মতো নেতাতেই ভরে গেছে বাংলাদেশ। তাঁর ছড়া সময় ও সমাজকে যেন ভাবী কালের কাছে যথার্থভাবেই উপস্থাপন করে।
যারা গণপরিবহনে যাতায়াত করেন তারা জানেন, দৈনন্দিন চলাচলে গাড়ি ভাড়া নিয়ে কী রকম দরাদরি করা লাগে! এই মুলামুলির একটা বাস্তব চিত্র তিনি এঁকেছেন ‘ভাড়া বিভ্রাট’ ছড়ায়। তিনি বলছেন,
‘তিন তুলা তলে জীপ গাড়ি চলে
তিন গুঁজা মারি ভিতরে ঘলে
দুই টেয়ার জাগাৎ ন টেয়া ভাড়া
ছেঁচেড়াই লই যায় নোয়াপাড়া।’
এছড়ায় অনুপ্রাস আছে, গল্প আছে, আছে বিড়ম্বনা। ছোট্ট একটা ভ্রমণকাহিনীও আছে।
দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে বাংলাদেশ। এটা এখন এ সমাজে মারাত্মক ব্যাধি। তিনি এই অসততা নিয়ে ‘অসৎ’ নামের ছড়ায় লিখেছেন, ‘এত বড় অসৎ/ টেয়া খাইয়ে ছশত / মরা মাছি ধরা খাইয়ে /রসগোল্লার রসত।’ ছোট্ট এ ছড়াটিতে শেষের দু’চরণে তিনি মাছির সাথে অসৎ লোকের চমৎকার সাযুজ্য তৈরি করেছেন।
কিছু কিছু জায়গার নাম শুনলে মনে কৌতূহল জাগে। কিছু কিছু নামে যেমন দার্শনিক ভাষ্য থাকে তেমনি কিছু কিছু নামে হাসির উদ্রেকও হয়। তিনি ‘নামের বাহার’ নামের ছড়ায় চট্টগ্রামের এরকম কিছু স্থানের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে তুলেছেন। যেমন: ‘কানাই মাদারী বাকখালি/ কত দেশৎ পাকখালি/ কর্তালা যাই কচুহাক দি/ ইলিশ মাছর নাকখালি।/ বোয়ালখালি কাতালগঞ্জ/ কত দুয়ার ধাক্কালি,/ বড় মাছর মাখা ন পাই/ তেলাকচুর হাকখালি।’
এছড়ায় আবার কচুশাক দিয়ে ইলিশ মাছের মাথা এবং তেলাকুচা শাকের মতো ঐতিহ্যবাহী খাবারকেও তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন। জাত ছড়াকারের এখানেই জাদুকরী ছোঁয়া বোঝা যায়।
ভাষায় সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম। এর আঞ্চলিক ভাষায় এমন কিছু শব্দ আছে যেগুলো ছোট্ট পরিসরে অনেক কিছুপ্রকাশ করে। এরকম একটা শব্দ হলো ‘গেয়া’। যখন কোনো তুলনা বা উপমা মনমতো মনে পড়ে না তখন ঐ শূন্যস্থান ভরাতে ‘গেয়া’ শব্দের ব্যবহার হয়। সুকুমার বড়–য়া ‘সুখ’ নামক ছড়ায় ‘গেয়া’ শব্দের এরকম যুৎসই ব্যবহার করেছেন। যেমন: ‘দেয়ানা হাডর দেয়ানা / মস্ত বড় সেয়ানা,/ গরু বেচের বাড়ি কিনের / এই টেঁয়া সেই টেঁয়া না?/ বেডার মতো বেডা হইয়ে / তোরার মত গেয়া-না?’ উল্লেখ্য কারও নাম মনে না পড়লেও সেক্ষেত্রে ‘গেয়া’ শব্দের ব্যবহার হয়।
একসময় দেশজুড়ে ছিনতাইকারীর উপদ্রব ছিলো। এখন তা আরও বেড়েছে। এদেরকে স্থানীয় ভাষায় ঝাপটাবাজ বলে। ঝাপটাবাজের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি ছড়ায় ছড়ায় বলেছেন, ‘খরোবাইয়ুন ছঁইয়র বীচি/ কেঁচা মরিচ লই, / বেচিবারলাই বুড়া জেডা / হাডৎ গেইয়েগই। / জিনিস বেচি বাজার গরি /বউ পোয়ারলাই আনে, / পথর মাঝে ঝাপটা বাজে / গাট্টি ধরে টানে।’ তাঁর এ ছড়া হতে বোঝা যায়, ছিঁচকে ধরনের ঝাপটাবাজের হাত থেকে গ্রামের স্বল্প আয়ের খেটে খাওয়া মানুষেরও কোনো রেহাই নেই।
হঠাৎ করে আঙুল ফুলে যারা বড়লোক হয় তাদের ভাবসাব হয়ে যায় আলাদা। কথায় আছে, লোকের টাকা হলে হয় ভোটে দাঁড়ায় নাহলে মামলায় জড়ায়। ‘চম্পাবতীর জামাইয়ে’ ছড়াটি এমন একজনেরই উদাহরণ যিনি বাড়তি টাকার কামড়ে টিকতে না পেরে চেয়ারম্যান পদে দাঁড়াতে চান। এ ছড়ায় আমরা পাই, ‘চম্পাবতীর জামাইয়ে/ পইসা দু’য়া কামাইয়ে/ গরম গরম টেঁয়া ঢালি/ ট্যাম্পু দুইয়ান নামাইয়ে।/ মনত বড় আশা গরি/ চকবাজারত বাসা গরি/ চেয়ারম্যানত খাড়াইবারলাই/ এবার মাথা ঘামাইয়ে।’
ছড়াটি পাঠের পর নিশ্চয়ই নিজ নিজ এলাকার এমন কারও কারও মুখ চোখে ভেসে ওঠে।
সুকুমার বড়–য়ার কিছু ছড়া আছে যেগুলোতে জসীমউদ্দীনের গ্রাম-বাংলার হাসির গল্পের আমেজ পাওয়া যায়। এরকম একটা গল্প হলো ‘গর্বা ধা’। গর্বা মানে হলো মেহমান বা অতিথি। পড়ে দেখা যাক কেমন মজার ছড়াটি।
‘থৈলার ভিতর মাডি ভরি / গর্বা গেলো লাডিছরি/ চিয়ন চইলর ভাত দিয়েরে / মাংস দিয়ে বাডি ভরি/ গর্বা খা‘ খা‘/ থৈলা খুলি পাইয়ে মাডি / হাতৎ দিয়ে বেতর লাডি / গর্বা ধা‘ ধা‘!’
উপরের ছড়াটি একটি মজার গ্রামীণ গল্পের ছড়ারূপ যেখানে একজন মেহমান বিস্কুট বা মিষ্টির বদলে থলেভর্তি মাটি নিয়ে লাঠিছড়ি নামের জায়গায় বেড়াতে যায়। মেহমানকে পেয়ে চিকন চালের ভাত আর গোশত দিয়ে খেতে দেয় গৃহস্থ। কিন্তু মেহমান গৃহস্থকে মাটি দিয়ে ঠকানোর কারণে ভাতপাতে তাকে লাঠিপেটা করে গৃহস্থ। এতে মেহমান দৌড়ে পগারপার হয়। এ ছড়া পড়ে হাসি না পাওয়ার কোনো কারণ নেই বটে।
বাঙালির দুই সুকুমার। কটিয়াদীর সুকুমার লিখেছেন ‘সৎপাত্র’ আর বিনাজুরির সুকুমার লিখলেন ‘বদপাত্র’। কেমন মজার সে পাত্র দেখা যাক:
‘খবর পাইলাম সাতবাড়িয়া / তোঁয়ার বলে ঝিয়র বিয়া/হাড্ডি মাংস পোঁচাইয়ারে/পাত্র পালি বোচাইয়ারে?/পোয়ার বাড়ি নজরটিলা/ মাথার বেয়াক ইসকুরু ঢিলা/আডারো বার মেট্রিক দিয়ে/কিয়ৎ লাগের আই-এ বি-এ/হেরোইন আর বাংলা গিলে/ ইয়াবা গাঁজা ফেনসিডিলে/ গ-া গ-া বোতলর যম/ চোর হইলেয়ো পোয়াউয়া গম।’
সাতবাড়িয়া গিয়ে ছড়াকার খবর পেলেন, তাঁর চেনাশোনা এক ব্যক্তির মেয়ের বিয়ে। হাড়-মাস এক করে খুঁজে পেতে পাওয়া পাত্রের নাকটা বোঁচা। মাথার স্ক্রু সব ঢিলা। আঠারোবার মেট্রিকে ফেল। ইয়াবা-গাঁজা-ফেন্সিডিল-মদ কোনো নেশাই তার বাকি নেই। পাত্র আবার চোরও বটে। তবে ছেলে ভালো। এই হলো বদপাত্রের নমুনা।
ছড়াকার সুকুমার বড়–য়া ছড়ার সরোবরে এক পরমহংস। তিনি জানেন, হাজার হাজার শব্দের ভিড় হতে সঠিক শব্দটি কীভাবে নির্বাচন করতে হয়। তিনি জানেন, পথহারা সমাজকে কী আঘাতে পথে তুলে দিতে হয়। জীবনকে জয় করে সুকুমার বার্ধক্যের অনিত্য সময়ে এসে ছড়ার ভেলায় চড়ে পাড়ি দিয়েছেন অনন্তকালের পথে। কিন্তু তাঁর সৃজনশস্যে ভরে দিয়ে গেছেন আমাদের সাহিত্যের গোলা, আমাদের মনের সম্পদের বাকশো। সুকুমার বড়–য়ার জন্মদিনকে জাতীয় ছড়া দিবসের মর্যাদায় রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন করা হোক, এ আমাদের নিবিড় আকাক্সক্ষা।
নগর-মহানগর: প্লাস্টিকের পুতুল ও ফুলই কাল হলো ছোট্ট আরিফার
নগর-মহানগর: স্কুলে শিশু নির্যাতনের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেপ্তার
ক্যাম্পাস: বিদ্যার দেবীর আরাধনায় ‘মব’ রুখে দেয়ার বার্তা