image
মর্জা গালিব / জন্ম : ২৭ ডিসেম্বর ১৭৯৭ (আগ্রা); মৃত্যু : ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৯ (দিল্লি)

যেভাবে ভাবতেন মির্জা গালিব

ফজল হাসান

এক. সারা জীবন ভুল তো এটাই করলাম, ধুলাবালি ছিল মুখে, আর আমি আয়না পরিষ্কার করছিলাম।

দুই. হাত তো সব সময় দোয়ার জন্য ওঠাই, কিন্তু মনে রেখো, যা কপালে নেই, তা হাতের রেখাতেও নেই।

তিন. কাফন বাঁধার পর কেন আসছ দেখতে? এখন তো চোখ খুলেও তোমাকে দেখতে পারব না।

চার. বোকা মানুষরা ভাবে তারা সব জানে, আর জ্ঞানী মানুষরা জানে তারা কিছুই জানে না।

পাঁচ. পৃথিবীতে পোশাকবিহীন এসেছিলে...। আর একটি কাফনের জন্য এত লম্বা সফর করলে।

মির্জা গালিব : ১৫৭তম মৃত্যুবার্ষিকী শ্রদ্ধাঞ্জলি

উপরের নির্বাচিত পাঁচটি পঙ্ক্তি কেনো কবি-লেখকের মস্তিষ্কে জন্ম নিয়ে একসময় কলমের ডগায় এসে সাদা কাগজের ওপর প্রস্ফুটিত হয়েছিল? তার উত্তর একটাই- অনন্য মির্জা গালিব ছাড়া আর কে-ই-বা লিখতে পারেন এমন অমোঘ পংক্তি।

মির্জা গালিব ছিলেন মোঘল রাজদরবারের কবি। তিনি মূলত উর্দু এবং ফার্সিতে সাহিত্য রচনা করেছেন। তিনি অসংখ্য কবিতা, গজল এবং শায়েরি লিখেছেন। এছাড়া তাঁর সাহিত্য ভা-ারে জমা আছে অগণিত পঙ্ক্তি বা বাণী। তিনি হয়ে উঠেছিলেন উর্দু কবিতার প্রাণপুরুষ এবং উর্দু ভাষার সবচেয়ে প্রভাবশালী কবি। তাঁকে উর্দু সাহিত্যের সম্রাটও বলা হয়ে থাকে।

‘যেভাবে ভাবতেন মির্জা গালিব’ প্রবন্ধে সূচনা ছাড়া রয়েছে মির্জা গালিবের ব্যক্তি জীবন; তাঁর জীবন-দর্শন, প্রেম ও আধ্যাত্মিকতা এবং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি; তাঁর সাহিত্যকর্ম; মির্জা গালিবের প্রভাব ও জনপ্রিয়তা; এবং সবশেষে রয়েছে শেষ কথা।

মির্জা গালিবের ব্যক্তি জীবন:

মির্জা গালিবের পুরো নাম মির্জা বেগ আসাদুল্লাহ খান, তবে তিনি মির্জা গালিব নামেই অধিক পরিচিত। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘আসাদ’ (অর্থাৎ সিংহ), যা তাঁর প্রদত্ত নাম আসাদুল্লাহ খান থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি তাঁর কাব্যিক জীবনের প্রথম দিকেই ‘গালিব’ (যার অর্থ সর্বজয়ী, শ্রেষ্ঠ, সর্বোত্তম) নামটি গ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম আগ্রার এক মুঘল পরিবারে, ১৭৯৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর।

শৈশবে মির্জা গালিব আগ্রার খ্যাতিমান প-িত শেখ মোয়াজ্জেমের কাছে লেখাপড়ার তালিম নেন। জানা যায়, তিনি মাদ্রাসায়ও কিছুদিন পড়াশোনা করেছেন। তিনি যুক্তিবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎ?সাশাস্ত্র ও অধিবিদ্যা (মেটাফিজিক্স) ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে, যেমন সাহিত্য ও ইতিহাস, পড়াশোনা করেন। তবে ভাষা এবং সাহিত্যের প্রতি ছিল তাঁর ভীষণ আসক্তি, বিশেষত ফার্সি ভাষার প্রতি। এক সময় আরবি ও ফার্সি ভাষায় দক্ষ আবদুস সামাদ নামে এক প-িত ব্যক্তি আগ্রা সফর করেন, তিনি মির্জা গালিবের মামার বাড়িতে দু’বছর অবস্থান করেন। মির্জা গালিব তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁর কাছে ফার্সি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। তিনি কখনো কাউকে নিজের ‘ওস্তাদ’ বলে স্বীকার না করলেও পরবর্তীকালে তিনি অত্যন্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে প-িত আবদুস সামাদের নাম উল্লেখ করেছেন।

মির্জা গালিব মাত্র তেরো বছর বয়সে নওয়াব ইলাহী বখশ খানের কন্যা উমরাও বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং বিয়ের পর তাঁরা আগ্রা থেকে দিল্লিতে চলে যান। কেননা তিনি মনে করেছিলেন যে, কবি হিসেবে খ্যাতি লাভের জন্যে আগ্রার চেয়ে দিল্লিই শ্রেয়। এছাড়া তাঁর শ্বশুর ছিলেন দিল্লির অভিজাত নাগরিকদের মধ্যে একজন। যাহোক, তিনি সেখানেই স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন এবং পরবর্তী একান্ন বছর দিল্লিতেই বসবাস করেছেন। তবে মির্জা গালিবের বিয়ে সুখের হয়নি। তারপর একসময় তিনি প্রেমে পড়েন অন্য এক রমণীর, কিন্তু সেই প্রেমও শেষপর্যন্ত পরিণতি পায়নি।

জানা যায়, মির্জা গালিবের স্ত্রী ছিলেন একজন ধার্মিক ও আল্লাহভীরু মুসলমান এবং রক্ষণশীল। অন্যদিকে তিনি সুরায় আসক্ত ছিলেন এবং মদ্যপান ছিল তাঁর মজ্জাগত অভ্যাস। তিনি সুরাপান করার সময় লিখতেন এবং লেখার জন্য ভালো সময় ছিল সন্ধ্যাবেলা। তিনি মনে করতেন যে, সৃজনশীলতা ও কল্পনার ক্ষেত্রে মদিরা ‘সহায়ক উপাদান’। বন্ধু-বান্ধবদের কাছে তিনি সব সময় বলতেন, মদ্যপান ছাড়া সৃজনশীলতা কিছুতেই সম্ভব নয়।

মির্জা গালিব নিজেই মদ্যপানের কথা স্বীকার করেছেন। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা উল্লেখ করা যায়। দিল্লিতে ১৮৫৭ সালের ৫ অক্টোবর ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহ শেষে ব্রিটিশ সেনারা কাশ্মীরী গেট দিয়ে প্রবেশ করার প্রায় তিন সপ্তাহ পর কিছু সেনা গালিবের বাড়িতে আসে এবং তাঁকে কমান্ডিং অফিসার কর্নেল ব্রাউনের সামনে নিয়ে যায়। সেদিন তিনি তুর্কি শৈলীর টুপি পরে উপস্থিত হয়েছিলেন। কর্নেল হাস্যরসের ভঙ্গিতে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ওয়েল! ইউ মুসলিম?’ উত্তরে মির্জা গালিব ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলেছিলেন, ‘হাফ (আধেক)?’ কর্নেল জানতে চেয়েছিলেন, ‘মানে কী?’ তিনি রসিকতার সুরে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি মদ পান করি, কিন্তু শূকরের মাংস খাই না।’

নিয়মিত মদ্য পান ছাড়াও মির্জা গালিব জুয়া খেলায় অভ্যস্ত ছিলেন। জুয়া খেলার কারণে ১৮৪১ সালে দিল্লির শহর কোতোয়াল তাঁকে সতর্ক করেন এবং তৎকালীন এক শ’ রুপি জরিমানা করেন। কিন্তু তারপরও তিনি জুয়া খেলা থেকে নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারেননি। জরিমানা পরিশোধের পরে তিনি নিজ বাসাতেই নিয়মিত জুয়া খেলতেন। একবার দিল্লির কোতোয়াল তাঁর বাড়িতে হানা দিয়ে জুয়া খেলারত অবস্থায় তাঁকে গ্রেফতার করে। পরে বিচারে তাঁকে ছয় মাসের সশ্রম কারাদ- এবং দুই শ’ রুপি জরিমানা করা হয়। তখন বিচারের রায় পাল্টানোর জন্য দিল্লি শহরের অভিজাত ও গন্যমাণ্য ব্যক্তিরা মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তিনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেন, কিন্তু সরকার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে এবং সম্রাটকে হস্তক্ষেপ না করার জন্য পরামর্শ দেয়। এসব কারণে হয়তো মির্জা গালিবের মধ্যে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান কিংবা অনুশাসনে কোনো ধরনের নিষ্ঠা বা দুর্বলতা ছিল না। তিনি কখনো রোজা রাখতেন না। সেই জন্য তাঁকে বারবার বিরূপ সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।

মির্জা গালিব কখনই বিত্তশালী ছিলেন না। তিনি জীবনে কোনোদিন কোনো পেশায় সম্পৃক্ত হননি, অর্থাৎ জীবিকার জন্য কোথাও কাজ করেননি। পারিবারিক বিত্ত, শ্বশুরকুলের সঙ্গতি এবং অযোধ্যার নওয়াব ও মোগল বাদশাহের মাসিক ভাতার ওপর নির্ভর করেই, এমনকী অনেক সময় ধারদেনা অথবা কোনো বন্ধু উদারতায় তিনি জীবন অতিবাহিত করেছেন। যদিও তাঁর আয়-রোজগার ছিল সীমিত ও অনিশ্চয়তাপূর্ণ, কিন্তু পারিবারিক ঐতিহ্য তাঁকে নাগরিক আভিজাত্যের মোড়কে আচ্ছন্ন করে রাখত। আর হয়তো এ কারণেই তিনি দিল্লিতে সস্ত্রীক বসবাসের জন্য চাঁদনি চকের কাছে প্রাসাদসদৃশ একটি ভবন ভাড়া নিয়েছিলে। তাঁর জীবনের আখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তিনি আভিজাত্য ও অহংকার ধারণ করেই জীবনযাপন পছন্দ করতেন। তাই তাঁর জীবন ছিল ঐশ্বর্য আর অভাবের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। এছাড়া শ্বশুরের প্রভাবের কারণে দিল্লির অভিজাত মহলে পরিচিত হতে তাঁকে বেগ পেতে হয়নি।

মির্জা গালিব প্রচ- জ্ঞানী মানুষ ছিলেন এবং তাঁর পা-িত্যের পরিধি তিনি নিজেই। তিনি ছিলেন একজন কোমল হৃদয়ের অতি দয়ালু প্রকৃতির মানুষ। তিনি ছিলেন শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সভাকবি। সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য সম্রাট তাঁকে দাবির-উল-মুলক (রাষ্ট্রের সচিব) এবং নজম-উদ-দৌলা (রাষ্ট্রের তারা) উপাধিতে ভূষিত করেন। এছাড়া তিনি মির্জা নৌশা উপাধি লাভ করেন। জানা যায়, এই উপাধি থেকেই তিনি ‘মির্জা’ নাম ধারণ করেছিলেন। তাঁর ২২০তম জন্মদিনে (২০১৭) ‘গুগল ডুডল’ তৈরি করে তাঁকে বিশেষভাবে সম্মান জানানো হয়।

মির্জা গালিবের মৃত্যু হয় ১৮৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি (৭১ বছর বয়সে) এবং তাঁকে দিল্লির নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারের কাছে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।

*

মির্জা গালিব ছিলেন আধ্যাত্মিক কবি। তাঁর চিন্তার জগত ছিল বিশাল। সেখানে তিনি সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও তাঁর প্রতি প্রেম, মানবাত্মার অস্তিত্ব,সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মানবাত্মার সম্পর্ক নিয়ে নিজের চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতি ও আনুষ্ঠানিকতা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা রেখে মানবতার গভীরে খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব। কেননা তাঁর বিশ্বাস ছিল যে, সৃষ্টিকর্তা সীমাহীন এবং চিররহস্যময় আর মানব জীবনের প্রকৃত মূল্য নিহিত রয়েছে প্রেম ও সহানুভূতির মধ্যে।

মির্জা গালিবের কবিতা, গজল এবং শায়েরি বাংলা, হিন্দি এবং উর্দু সাহিত্যের মধ্যে এক অমূল্য রতœ হিসাবে বিবেচিত হয়। তিনি কেবল কবিতা বা গীতিকার সীমানায় সীমাবদ্ধ না থেকে বরং তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে গভীর দর্শন, মানবিকতা, প্রেম, দুঃখ, আধ্যাত্মিকতা এবং জীবনের অস্থিরতাকে এক অনবদ্য চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর শেরগুলোর ভাষা এবং ভাবনার মধ্যে রয়েছে এমন এক আবেগ, যা পাঠককে এক গভীর নৈতিক ও মানসিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।

মির্জা গালিবের জীবন-দর্শন

মির্জা গালিবের শৈশবকাল রোমাঞ্চকর ছিল না, বরং তাঁর জীবনযাত্রার মধ্যে ছিল হতাশা এবং অনিশ্চয়তা। এছাড়া পরবর্তীতে দারিদ্র্য এবং অর্থকষ্ট ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। জানা যায়, একসময় তিনি মোগল আমলের শেষ দিকে বাদশার তরফ থেকে বার্ষিক ভাতা পেয়েছিলেন। কিন্তু ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহী বিপ্লবের পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁর ভাতা বন্ধ করে দেয়। তখন তিনি প্রচ- আর্থিক সঙ্কটে পড়েন। ভাতা পুনর্বহালের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তদ্বির করা হয় ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে। তাতে কোনো লাভ হয়নি।

শৈশব থেকেই মির্জা গালিবের মনের মধ্যে জমেছিল পাহাড় সমান কষ্ট। তিনি বিষণœতায় ভুগেছেন। এসব সত্ত্বেও তিনি সাহিত্য এবং কবিতার প্রতি গভীর আগ্রহ অনুভব করেছেন। তাঁর কলম দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল কষ্টের যন্ত্রণাগাথা আর সীমাহীন হতাশা। এ প্রসঙ্গে মাত্র কয়েকটা পংক্তি বা উক্তির উদ্ধৃতি দিলেই বোঝা যাবে তাঁর মন-মানসিকতা, আধ্যাত্মিক চিন্তাচেতনা এবং আত্মার আর্তনাদ। যেমন ‘বেঁচে থাকার ইচ্ছা ফুরিয়ে গেছে, এখন কেবল দিন পার করছি’, ‘চোখের পানি লুকাতে শিখে গেছি, এখন আর কেউ দুঃখ বোঝে না’, ‘কবর তো শরীরের হয়, মরে যাওয়া ইচ্ছের কোনো সমাধি হয় না’ এবং ‘মৃত্যু কেন আসে না, গালিব! আর কতদিন বেঁচে থাকার জন্য আফসোস করে যাবো! একদিন মরার জন্য কতদিন বাঁচতে হয়?’

মির্জা গালিব দাম্পত্য জীবনে সুখী ছিলেন না। বিয়েকে তিনি দ্বিতীয় কারাবাস হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে প্রথম কারাবাস ছিল তাঁর জীবন নিজেই। স্ত্রীর সঙ্গে বিরূপ সম্পর্ক, সাত সন্তানের অকাল মৃত্যু, আর্থিক সঙ্কট তাঁকে সব সময় দুঃশ্চিন্তায় রাখত। তাঁর বিভিন্ন কবিতায় ব্যক্তিগত জীবনের বেদনাবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর জীবন-দর্শন এবং কবিতায় তিনি জীবনের ধারাক্রমকে একটি ধারাবাহিক বেদনাময় সংগ্রামের রূপে দেখেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, কেবল মৃত্যুর মাধ্যমেই শেষ হতে পারে সেই সংগ্রাম। এই গভীর এবং তিক্ত জীবনবোধ তাঁর সাহিত্যকর্মে বারবার ফিরে এসেছে বিভিন্ন কবিতা বা শায়েরি। জীবন সম্পর্কে তাঁর ভাবনাকে সংক্ষেপে তুলে ধরেছে নিচের পংক্তি দু’টি:

‘জীবনের কারাগার আর দুঃখের শৃঙ্খল এক ও অভিন্ন,

মৃত্যুর আগে মানুষ কেন দুঃখ থেকে মুক্তি পাবে?’

মির্জা গালিবের প্রেম ও আধ্যাত্মিকতা

মির্জা গালিবের সাহিত্যে, বিশেষ করে কবিতায় ও গজলে, এক পরিপূর্ণ প্রেম ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। বলা যায়, তাঁর মধ্যে ছিল প্রেম ও আধ্যাত্মিকতার অপূর্ব সম্মিলন, যা পাঠকদের এক অনন্য ভালোবাসার জোয়ারে ভাসতে সাহায্য করে। তিনি তাঁর কবিতার মাধ্যমে মানুষকে আলোর দিকে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর আধ্যাত্মিক চিন্তাধারা শুধু শাস্ত্রীয় বা ধর্মীয় না হয়ে বরং ব্যক্তিগত আত্মপরিচয় ও আত্ম-অন্বেষণের দিকে পথ দেখায়। তাঁর কবিতায় সৃষ্টিকর্তার প্রতি এক গভীর প্রেম এবং দুঃখ-সুখের মিশ্রণ ফুটে উঠেছে, যা প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক ভাবনা এবং ইসলামী চিন্তাধারার মিলনস্থলে দাঁড়িয়ে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে।

মির্জা গালিবের কাছে প্রেম বলতে যে মিলন বোঝায়, তা কিন্তু নয়; বরং তাঁর বিশ্বাস ছিল যে, বিরহ আর অপেক্ষা প্রেমের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভালোবাসার সেই যন্ত্রণা আর মায়ার কথা বলতে তাঁর প্রেমের উক্তিগুলোর জুরি মেলা ভার। প্রেমিক হৃদয়ের অব্যক্ত হাহাকার বিভিন্নভাবে শব্দে রূপ পেয়েছে। নিচে উদাহরণ হিসাবে মির্জা গালিবের কয়েকটি প্রেমের উক্তি সন্নিবেশিত করা হলো।

*প্রেমে পড়ার পর বুঝলাম, বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার তফাত খুব সামান্য; যাকে দেখে প্রাণ জুড়ায়, আবার তার বিরহেই প্রাণ যায়।

*তোমার গলিতে গিয়ে বসে থাকা ছাড়া আমার আর কোনো কাজ নেই, এ যেন এক তীর্থযাত্রা।

*হৃদয়ে যদি তুমিই না থাকো, তবে এই হৃদস্পন্দনের আর কী দরকার?

*প্রেমের নদীতে ডুব না দিলে তার গভীরতা বোঝা যায় না, ডুব দিয়ে দেখো তল নেই।

*তোমাকে দেখার পর থেকে আর কোনো কিছু দেখার ইচ্ছে নেই, চোখ অন্ধ হয়ে গেছে ভালোবাসায়।

*তোমার চোখের ইশারায় আমি সব কিছু ভুলে যাই, এমনকী নিজেকেও।

মির্জা গালিবের সাহিত্যে প্রেম এসেছে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় প্রতীকী হয়ে, আবার কখনো কখনো প্রেম শুধুই মৃত্যুর দ্বার খুঁজে বেড়ায়, যেমন:

‘তার সে চোখে ডুব দিয়ে তো

মরতে পারি বারংবার,

সে চোখ নামায়, মরতে থামায়,

দেয় না খুলে মৃত্যু দ্বার।’

মির্জা গালিবের আধ্যাত্মিক ভাবনা তাঁর বিভিন্ন শায়েরি ও বাণী বা উক্তিতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি প্রেম, সৃষ্টিকর্তা, নিয়তি ও আত্মার যাত্রা নিয়ে এমনভাবে লিখেছেন, যা যে কোনো পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এখানে তাঁর ভাবধারায় অনুপ্রাণিত কয়েকটি আধ্যাত্মিক শের ও উক্তি তুলে দেওয়া হলো:

*দুনিয়ার কোলাহলে হারিয়ে যেও না, নীরবতার ভেতরেই আল্লাহর কণ্ঠ শোনা যায়।

*প্রার্থনা শুধু শব্দ নয়, এটি আত্মার দরজায় কড়া নাড়ার মতো।

*যে প্রেমে স্রষ্টার ছোঁয়া আছে, সে প্রেম কখনো ম্লান হয় না।

*আমার খোঁজে আমি যত দূরই যাই, শেষে এসে নিজেকেই খুঁজে পাই।

*আলো খুঁজতে গিয়ে যদি অন্ধকারে পড়ো, জেনে রেখো- আলো তোমার ভেতরেই আছে।

মির্জা গালিবের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি:

মির্জা গালিব ছিলেন কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধর্মে উদাসীন, যদিও তাঁর লেখায় ধর্ম উঠে এসেছে প্রকটভাবে এবং কোথাও কোথাও তা অতিমাত্রায় জটিল ও প্রতীকী। অন্যদিকে তিনি দুনিয়ার মানুষের লোক দেখানো ধর্মকে প্রচ-ভাবে কটাক্ষ করেছেন। আসলে তিনি ধর্মকে নিজ দর্শন দিয়েই ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি ধর্মীয় অনুশাসন এবং আত্মিক স্বাধীনতার মধ্যে যে দ্বন্দ্ব অনুভব করেছিলেন, তা সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমে, বিশেষ করে কবিতায়, শায়েরিতে ও গজলে, গভীর ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় তুলে ধরেছেন। যেমন মির্জা গালিব বলেছেন, ‘আমি কাবা শরীফের চারপাশে তাওয়াফ করব না’- এই বক্তব্যে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনার প্রচলিত ধর্মীয় পথে না গিয়ে তাঁর নিজের পথ অনুসরণ করার প্রতীকী অনুভূতি জানিয়েছেন। আবার ‘ইহরাম সুরায় ভিজে গেছে’- এই পংক্তিতে তিনি তাঁর জীবনের বিপরীতমুখী দিকটি তুলে ধরেছেন। একই শায়েরিতে জমজম কূপের উল্লেখও তাঁর জীবনের ব্যক্তিগত সংকটের প্রতীক। সুতরাং দেখা যায় যে, উক্ত শায়েরিটি তাঁর আত্মিক দ্বন্দ্ব এবং চিরায়ত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে নিজের মনের অভ্যন্তরীণ সংগ্রামের পরিচায়ক।

মির্জা গালিব মনে করতেন, পরকাল, বেহেশত এবং জাহান্নামের ধারণাগুলো মানুষের ভয় এবং আশা থেকে উদ্ভূত এবং এগুলো ধর্ম প্রচারকরা মানুষের মনন নিয়ন্ত্রণের জন্য বারবার ব্যবহার করেছেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর একটি বিখ্যাত শায়েরি রয়েছে, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তা হলো: ‘আমরা জানি, জান্নাতের প্রকৃত স্বরূপ কী, মনকে খুশি রাখতে এ ধারণা মন্দ নয়।’

এছাড়া আলেমদের সম্পর্কে মির্জা গালিব ছিলেন সমালোচনামুখর। তিনি মনে করতেন, মৌলভী ও মাওলানাদের অধিকাংশই সংকীর্ণমনা, যারা ধর্মের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান এবং কঠোর বিধিনিষেধের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেন, অথচ মানুষের আত্মিক মুক্তির পথে তেমন কোনো ভূমিকা রাখেন না। (বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়)

সম্প্রতি