alt

বামনার গ্রামীণ ঐতিহ্য ‘খেজুরের রস’ আজ বিলুপ্তির পথে, হতাশ গাছিরা

প্রতিনিধি, বামনা (বরগুনা) : শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫

একসময় শীতকাল এলেই বাংলাদেশের উপকূলীয় বরগুনা জেলার বামনা উপজেলার গ্রামগঞ্জে যে উৎসবের আমেজ শুরু হতো, তার প্রধান আকর্ষণ ছিল আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ ও তা থেকে আহরিত সুস্বাদু খেজুরের রস-গুড়। হেমন্তের মাঝামাঝি সময় থেকে শীতের ভরা মৌসুম পর্যন্ত পুরো জনপদে চলত নবান্নের উৎসব। শীতের ভোরে মিষ্টি রোদের তাপ নিতে নিতে মাটির ভাঁড়ে খেজুরের মিষ্টি কাঁচা রস পান করার সেই স্মৃতি আজও অমলিন। শুধু পানীয় হিসেবে নয়, এই রস দিয়ে তৈরি হতো নানান ধরনের পিঠা, পায়েস, ক্ষির এবং লোভনীয় পাটালি ও নালি গুড়। এটি ছিল বরগুনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের নবান্নের সেরা উপহার এবং সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। খেজুর গুড় ছাড়া আমাদের শীতকালীন উৎসব ভাবাই যেত না। খেজুরের রস ছিল গ্রামীণ জীবনের শীতের উৎসবের মূল সূচনা।

কিন্তু কালের বিবর্তনে এবং মানবসৃষ্ট কিছু কারণে বামনা উপজেলার সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক এই মধুময় খেজুর গাছ আজ আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। চোখে পড়ে না রস আহরণে গাছিদের সেই নিপুণ ব্যস্ততা-কোমরে দড়ির সঙ্গে ঝুড়ি বেঁধে ধারালো দা দিয়ে গাছ চাঁচাছোলা ও নলি বসানোর কাজ। এখন শুধু ক্যালেন্ডার ও ছবিতেই সেই দৃশ্য দেখা যায়। সাত সকালে খেজুরের রস নিয়ে গাছিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাঁকডাক দিতেন, সেই দৃশ্যও এখন দুষ্প্রাপ্য। ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস ও গুড় দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠায় হতাশ এ অঞ্চলের গাছিরা। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে অচিরেই এই ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে যাবে। বরগুনা জেলার বামনা উপজেলাতেই খেজুর গাছ কমে যাওয়ায় এই ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে। প্রতিটি অঞ্চলের চিত্র প্রায় একই রকম, তবে অল্প কিছু নিবেদিতপ্রাণ গাছি এখনও সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।

বামনা উপজেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন সিডর ও আইলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খেজুর গাছের সংকট প্রকট হয়েছে। গত ৯-১০ বছর ধরে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দক্ষিণাঞ্চলে খেজুর গাছের সংখ্যা কমতে শুরু করে। একসময় শীতকালে এই অঞ্চলের সর্বত্র শীত উদযাপনের নতুন আয়োজন শুরু হয়ে যেত এবং অতিথিদের রসের তৈরি পায়েস দিয়ে আপ্যায়ন করার প্রচলন ছিল। এখন রস না পাওয়ায় নবান্নের সেই আনন্দ থেকে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন। বামনা উপজেলার রামনা ইউনিয়নের বলইবুনিয়া গ্রামের মো. ফিরোজ মিয়া জানান, আগে তাদের দারুণ কদর ছিল, মৌসুম শুরুর আগ হতেই কথাবার্তা পাকা হতো কার কটি খেজুর গাছ কাটতে হবে। কিন্তু এখন আর আগের মতো গাছও নেই, আর গ্রামের লোকেরাও তেমন খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করতে চায় না। তারা অল্প কিছু গাছ কেটে নিজেদের চাহিদা মেটান।

বামনা উপজেলায় শীতের মৌসুমেও স্থানীয় বাজারে খেজুরের রসের চাহিদা বেড়েছে। উপজেলার বুকাবুনিয়া ইউনিয়নের লক্ষীপুরা গ্রামে গাছি আব্দুল খালেক দফাদার এখনও রস সংগ্রহ করছেন। প্রতিদিন ভোর বেলায় গাছিদের কাছে খেজুরের রস খাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের ভিড় দেখা যায়। রস সংগ্রহের জন্য তিনি বাদুড়ের সংস্পর্শ এড়াতে বাঁশের বেড়া দিয়ে প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। গাছি খালেক দফাদার জানান, শীত মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত রসের সন্ধান পাচ্ছি না এবং গ্রামে দিন দিন কমে যাচ্ছে খেঁজুর গাছের সংখ্যা। গাছ কম থাকায় এখন শুধুমাত্র রস বিক্রি করা হয়। প্রতি গ্লাস রসের দাম ২০ টাকা এবং প্রতি লিটার ৮০ টাকা। রসের দাম বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি রসের কম ফলন এবং রাতে রস চুরি হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অনেক গাছ কাইট্টা হালাইছে (কেটে ফেলেছে)। এই জন্য রসের দাম বেশি আর রাইতে (রাতে) তো পোলাপান চুরি হইরা (করে) রস লইয়া যায়। সকালে আইয়া দেহি রস নাই। এর লাইগ্যাও (জন্যও) অনেকে গাছ কাডে (কাটে) না। লক্ষীপুরা গ্রামের বাসিন্দা আলামিন আকন জানান, এক সময় তাদের গ্রামে অনেক খেঁজুর গাছ ছিল, কিন্তু সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে এটি এখন বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। বামনা উপজেলাজুড়ে খেজুর গাছ কমে যাওয়ার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ দায়ী, যা এই গ্রামীণ ঐতিহ্যকে প্রায় বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে:

(১) ইট ভাটার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার: খেজুর গাছ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো ইট ভাটার জ্বালানি হিসাবে এর বেপরোয়া ব্যবহার। অসাধু ব্যক্তিরা অধিক মুনাফার লোভে খেজুর গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে। একসময় ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো নিষিদ্ধ হওয়ার পর ইটভাটায় পোড়ানোর জন্য খেজুর গাছ নিধন শুরু হয়। ফলে খেজুর গাছের ব্যাপক নিধনের কারণে সারাদেশে গাছ কমছে এবং রস দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে।

(২) জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ: প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন সিডর ও আইলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও খেজুর গাছের সংখ্যা হ্রাসের জন্য দায়ী। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দক্ষিণাঞ্চলে খেজুর গাছের সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া, জলবায়ুর পরিবর্তন ও দূষণের ফলেও রস সংগ্রহের উপযোগী গাছের সংখ্যা কমছে।

(৩) গাছিদের অভাব ও পেশার অনিশ্চয়তা: রস আহরণের মতো পরিশ্রমসাধ্য এই পেশায় লাভ কম এবং ঝুঁকির কারণে তরুণ প্রজন্ম মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বামনার গাছিরা কম ফলন, রসের দাম কম পাওয়া এবং রাতে রস চুরি হয়ে যাওয়ার কারণে হতাশা প্রকাশ করেছেন। আগে গাছিদের দারুণ কদর ছিল, কিন্তু এখন আর কেউ ডাকে না।

বামনা উপজেলার প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এখনই সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসা উচিত। এই শিল্প পুনরুদ্ধারে সবার সম্মিলিতভাবে কাজ করা দরকার। পরিবেশ রক্ষার জন্য এবং রসের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে রাস্তার পাশে খেজুর গাছ লাগানোর দাবি উঠেছে।

এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক এবং পরিবেশগত দিক থেকেও জরুরি। এখনই যদি এই গাছের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তবে অচিরেই হারিয়ে যাবে সুস্বাদু এই প্রাকৃতিক মধুর রসের গাছ। এখন শুধু ক্যালেন্ডার ও ছবিতেই দেখা যায় রস আহরণে গাছিরা কোমরে দড়ির সাথে ঝুড়ি বেঁধে ধারালো দা দিয়ে নিপুণ হাতে গাছ চাঁচাছোলা ও নলি বসানোর কাজ করছে। এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু স্মৃতিতেই এই ঐতিহ্যকে খুঁজে পাবে।

ছবি

উজাড় হচ্ছে মীরসরাইয়ের অবশিষ্ট বনাঞ্চল

ছবি

গৌরীপুরে দর্শক মাতালেন বাউল শাহ আলম সরকার ও মমতাজ কন্যা জুলিয়া বেগম

ছবি

সাতক্ষীরা-শ্যামনগর সড়ক নির্মাণে ধীরগতি, ধুলায় চরম ভোগান্তি!

ছবি

সিংগাইরে প্রতিবন্ধী তরুণী অন্ত:সত্ত্বার ঘটনায় মামলা, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার

ছবি

টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মানববন্ধন

ছবি

রোববার পলাশকান্দা ট্র্যাজেডি দিবস

ছবি

শ্রীমঙ্গলে খাদ্যের সন্ধানে পাঁচটি অজগর লোকালয়ে, সাধারণ মানুষ আতঙ্কে

ছবি

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দাতব্য সংস্থা ডিরেক্ট রিলিফ ৩৬ কোটি টাকার ইনজেকশন পেল রাজশাহী মেডিকেল

ছবি

রায়পুরে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ও ছানি অপারেশন ক্যাম্প

ছবি

মীরসরাইয়ের ৩৩ কি.মি. রেলপথ যেন মৃত্যুফাঁদ!

ছবি

মোরেলগঞ্জে অর্ধশতাধিক পরিত্যাক্ত জরাজীর্ণ ভবন

ছবি

নড়াইলে বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় দোয়া মাহফিল

ছবি

জয়পুরহাটের প্রাচীন জনপদ ও সভ্যতার লীলাভূমি পাথরঘাটা

ছবি

গণসংযোগে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে ড. বাবলু

ছবি

সোনারগাঁয়ে ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে ৪ লাখ টাকা ছিনতাই

ছবি

ডিজিটাল সহিংসতা প্রতিরোধে কুড়িগ্রামে সাইকেল র‌্যালি

ছবি

সালথায় দুইগ্রুপের সংঘর্ষে আহত ২৫

ছবি

কলারোয়ায় অভ্যন্তরীণ আমন ধান-চাল সংগ্রহের উদ্বোধন

ছবি

নড়াইলে কমিটি ঘোষণার পরই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়কের পদত্যাগ

ছবি

৫৯ বিজিবি’র অভিযানে ৩টি ওয়ান শুটার ও গুলি উদ্ধার

ছবি

ইয়াবাকাণ্ডে র‍্যাব-১৫ তে গণবদলি

ছবি

ফরিদপুরে মন্দিরের দেয়াল ভেঙে ঘণ্টা-টাকা চুরি

ছবি

খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় ফয়সল চৌধুরীর উদ্যোগে মিলাদ ও দোয়া

ছবি

দিগন্তজুড়ে সোনালি আমন ফসলের দোলা, বাম্পার ফলনের আশা কৃষকদের

ছবি

নওগাঁয় জোড়া পেটের জমজ কন্যা শিশুর জন্ম

ছবি

সিলেটে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে খুন ১, আটক ৩

ছবি

বরিশালে চোরাই পথে আনা ১১ হাজার টন কয়লা জব্দ, গ্রেপ্তার ১২

ছবি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ফের দুইপক্ষে গোলাগুলি, নিহত ১

ছবি

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি: এজিএম নিয়ে অনিশ্চয়তা, কর্মীদের ক্ষোভ বাড়ছে

ছবি

এলজিইডির ৫ কোটি টাকার আম্পান প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

ছবি

মহেশপুরে করাত কলের অনিয়মে বাড়ছে পরিবেশ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি

ছবি

জনস্বাস্থ্যের উপ সহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে টিউবওয়েল প্রদানের অভিযোগ

ছবি

হারিয়ে যাচ্ছে লাঙল জোয়াল

ছবি

ভোলায় গাছ থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু

ছবি

দশমিনায় কৃষকদের মাঝে কৃষি উপকরন বিতরন

ছবি

আটোয়ারিতে নবাগত জেলা প্রশাসক কর্তৃক গণশুনানি অনুষ্ঠিত

tab

বামনার গ্রামীণ ঐতিহ্য ‘খেজুরের রস’ আজ বিলুপ্তির পথে, হতাশ গাছিরা

প্রতিনিধি, বামনা (বরগুনা)

শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫

একসময় শীতকাল এলেই বাংলাদেশের উপকূলীয় বরগুনা জেলার বামনা উপজেলার গ্রামগঞ্জে যে উৎসবের আমেজ শুরু হতো, তার প্রধান আকর্ষণ ছিল আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ ও তা থেকে আহরিত সুস্বাদু খেজুরের রস-গুড়। হেমন্তের মাঝামাঝি সময় থেকে শীতের ভরা মৌসুম পর্যন্ত পুরো জনপদে চলত নবান্নের উৎসব। শীতের ভোরে মিষ্টি রোদের তাপ নিতে নিতে মাটির ভাঁড়ে খেজুরের মিষ্টি কাঁচা রস পান করার সেই স্মৃতি আজও অমলিন। শুধু পানীয় হিসেবে নয়, এই রস দিয়ে তৈরি হতো নানান ধরনের পিঠা, পায়েস, ক্ষির এবং লোভনীয় পাটালি ও নালি গুড়। এটি ছিল বরগুনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের নবান্নের সেরা উপহার এবং সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। খেজুর গুড় ছাড়া আমাদের শীতকালীন উৎসব ভাবাই যেত না। খেজুরের রস ছিল গ্রামীণ জীবনের শীতের উৎসবের মূল সূচনা।

কিন্তু কালের বিবর্তনে এবং মানবসৃষ্ট কিছু কারণে বামনা উপজেলার সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক এই মধুময় খেজুর গাছ আজ আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। চোখে পড়ে না রস আহরণে গাছিদের সেই নিপুণ ব্যস্ততা-কোমরে দড়ির সঙ্গে ঝুড়ি বেঁধে ধারালো দা দিয়ে গাছ চাঁচাছোলা ও নলি বসানোর কাজ। এখন শুধু ক্যালেন্ডার ও ছবিতেই সেই দৃশ্য দেখা যায়। সাত সকালে খেজুরের রস নিয়ে গাছিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাঁকডাক দিতেন, সেই দৃশ্যও এখন দুষ্প্রাপ্য। ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস ও গুড় দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠায় হতাশ এ অঞ্চলের গাছিরা। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে অচিরেই এই ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে যাবে। বরগুনা জেলার বামনা উপজেলাতেই খেজুর গাছ কমে যাওয়ায় এই ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে। প্রতিটি অঞ্চলের চিত্র প্রায় একই রকম, তবে অল্প কিছু নিবেদিতপ্রাণ গাছি এখনও সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।

বামনা উপজেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন সিডর ও আইলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খেজুর গাছের সংকট প্রকট হয়েছে। গত ৯-১০ বছর ধরে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দক্ষিণাঞ্চলে খেজুর গাছের সংখ্যা কমতে শুরু করে। একসময় শীতকালে এই অঞ্চলের সর্বত্র শীত উদযাপনের নতুন আয়োজন শুরু হয়ে যেত এবং অতিথিদের রসের তৈরি পায়েস দিয়ে আপ্যায়ন করার প্রচলন ছিল। এখন রস না পাওয়ায় নবান্নের সেই আনন্দ থেকে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন। বামনা উপজেলার রামনা ইউনিয়নের বলইবুনিয়া গ্রামের মো. ফিরোজ মিয়া জানান, আগে তাদের দারুণ কদর ছিল, মৌসুম শুরুর আগ হতেই কথাবার্তা পাকা হতো কার কটি খেজুর গাছ কাটতে হবে। কিন্তু এখন আর আগের মতো গাছও নেই, আর গ্রামের লোকেরাও তেমন খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করতে চায় না। তারা অল্প কিছু গাছ কেটে নিজেদের চাহিদা মেটান।

বামনা উপজেলায় শীতের মৌসুমেও স্থানীয় বাজারে খেজুরের রসের চাহিদা বেড়েছে। উপজেলার বুকাবুনিয়া ইউনিয়নের লক্ষীপুরা গ্রামে গাছি আব্দুল খালেক দফাদার এখনও রস সংগ্রহ করছেন। প্রতিদিন ভোর বেলায় গাছিদের কাছে খেজুরের রস খাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের ভিড় দেখা যায়। রস সংগ্রহের জন্য তিনি বাদুড়ের সংস্পর্শ এড়াতে বাঁশের বেড়া দিয়ে প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। গাছি খালেক দফাদার জানান, শীত মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত রসের সন্ধান পাচ্ছি না এবং গ্রামে দিন দিন কমে যাচ্ছে খেঁজুর গাছের সংখ্যা। গাছ কম থাকায় এখন শুধুমাত্র রস বিক্রি করা হয়। প্রতি গ্লাস রসের দাম ২০ টাকা এবং প্রতি লিটার ৮০ টাকা। রসের দাম বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি রসের কম ফলন এবং রাতে রস চুরি হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অনেক গাছ কাইট্টা হালাইছে (কেটে ফেলেছে)। এই জন্য রসের দাম বেশি আর রাইতে (রাতে) তো পোলাপান চুরি হইরা (করে) রস লইয়া যায়। সকালে আইয়া দেহি রস নাই। এর লাইগ্যাও (জন্যও) অনেকে গাছ কাডে (কাটে) না। লক্ষীপুরা গ্রামের বাসিন্দা আলামিন আকন জানান, এক সময় তাদের গ্রামে অনেক খেঁজুর গাছ ছিল, কিন্তু সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে এটি এখন বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। বামনা উপজেলাজুড়ে খেজুর গাছ কমে যাওয়ার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ দায়ী, যা এই গ্রামীণ ঐতিহ্যকে প্রায় বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে:

(১) ইট ভাটার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার: খেজুর গাছ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো ইট ভাটার জ্বালানি হিসাবে এর বেপরোয়া ব্যবহার। অসাধু ব্যক্তিরা অধিক মুনাফার লোভে খেজুর গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে। একসময় ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো নিষিদ্ধ হওয়ার পর ইটভাটায় পোড়ানোর জন্য খেজুর গাছ নিধন শুরু হয়। ফলে খেজুর গাছের ব্যাপক নিধনের কারণে সারাদেশে গাছ কমছে এবং রস দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে।

(২) জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ: প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন সিডর ও আইলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও খেজুর গাছের সংখ্যা হ্রাসের জন্য দায়ী। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দক্ষিণাঞ্চলে খেজুর গাছের সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া, জলবায়ুর পরিবর্তন ও দূষণের ফলেও রস সংগ্রহের উপযোগী গাছের সংখ্যা কমছে।

(৩) গাছিদের অভাব ও পেশার অনিশ্চয়তা: রস আহরণের মতো পরিশ্রমসাধ্য এই পেশায় লাভ কম এবং ঝুঁকির কারণে তরুণ প্রজন্ম মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বামনার গাছিরা কম ফলন, রসের দাম কম পাওয়া এবং রাতে রস চুরি হয়ে যাওয়ার কারণে হতাশা প্রকাশ করেছেন। আগে গাছিদের দারুণ কদর ছিল, কিন্তু এখন আর কেউ ডাকে না।

বামনা উপজেলার প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এখনই সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসা উচিত। এই শিল্প পুনরুদ্ধারে সবার সম্মিলিতভাবে কাজ করা দরকার। পরিবেশ রক্ষার জন্য এবং রসের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে রাস্তার পাশে খেজুর গাছ লাগানোর দাবি উঠেছে।

এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক এবং পরিবেশগত দিক থেকেও জরুরি। এখনই যদি এই গাছের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তবে অচিরেই হারিয়ে যাবে সুস্বাদু এই প্রাকৃতিক মধুর রসের গাছ। এখন শুধু ক্যালেন্ডার ও ছবিতেই দেখা যায় রস আহরণে গাছিরা কোমরে দড়ির সাথে ঝুড়ি বেঁধে ধারালো দা দিয়ে নিপুণ হাতে গাছ চাঁচাছোলা ও নলি বসানোর কাজ করছে। এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু স্মৃতিতেই এই ঐতিহ্যকে খুঁজে পাবে।

back to top