বরেন্দ্রর ব্যালটে পুরনো হিসাব ভাঙছে, নতুন সমীকরণ জন্ম নিচ্ছে

জেলা বার্তা পরিবেশক, রাজশাহী

নীরব বরেন্দ্রের হাওয়ায় এখন শুধু শস্যের গন্ধ নয় ভাসছে ভোটের হিসাব, আশার গুঞ্জন আর ক্ষোভের দীর্ঘশ্বাস। রাজশাহীর মাটি আবারও দাঁড়িয়ে আছে এক সন্ধিক্ষণে। রাজশাহী-১ থেকে রাজশাহী-৫ দুটি আসন, দুটি ভিন্ন ভৌগোলিকতা, কিন্তু মানুষের আকাক্সক্ষা একটাই বদল। আদিবাসী জনপদ, সনাতন ধর্মাবলম্বী পাড়া, তরুণদের অস্থির স্বপ্ন আর বেকারত্বে পুড়ে যাওয়া সময়সব মিলিয়ে এই নির্বাচনী মানচিত্রে সবচেয়ে ভারী হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের সিদ্ধান্ত।

একদিকে রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ‘ভিআইপি’ আসন, অন্যদিকে প্রত্নতত্ত্বে ভরা সম্ভাবনাময় জনপদ- দুই জায়গাতেই প্রশ্ন এক- কে দেবে কর্মসংস্থান, কে রুখবে মাদক, কে ফিরিয়ে দেবে ন্যায্যতা? পোস্টার-ব্যানারের কোলাহলের আড়ালে সাধারণ ভোটারের মুখে মুখে ঘুরছে সততা, সুশাসন আর নিরাপত্তার কথা। ক্ষমতার দীর্ঘ ছায়া সরে যাওয়ার পর নতুন করে জমাট বাঁধছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা; পুরোনো হিসাব ভাঙছে, নতুন সমীকরণ জন্ম নিচ্ছে।

এই নির্বাচন শুধু প্রার্থীর লড়াই নয়এটি তরুণদের ভবিষ্যৎ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা আর একটি অঞ্চলের আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। শেষ হাসি কার মুখে ফুটবে, তা নির্ধারণ করবে সেই ভোটাররাই যারা এতদিন নীরবে সহ্য করেছে, এবার পরিবর্তনের ভাষা খুঁজছে ব্যালটের কাগজে।

রাজশাহী-১ আসনটি তানোর ও গোদাগাড়ি উপজেলা নিয়ে গঠিত। ভৌগোলিক বিশালত্ব আর রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কারণে এই আসনটি দেশের অন্যতম ‘ভিআইপি’ আসন হিসেবে পরিচিত। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এখানে বইছে নির্বাচনি উত্তাপ। আসনটিতে বেশ কয়েকজন প্রার্থী থাকলেও নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে।

নির্বাচনি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই আসনের বড় একটি অংশ সনাতন ধর্মাবলম্বী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তরুণ ভোটার। বিশেষ করে গোদাগাড়ি উপজেলায় তাদের সংখ্যা উল্যেখযোগ্য। জয়ের শেষ হাসি কে হাসবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে এই বিপুলসংখ্যক ভোটারের সমর্থনের ওপর।

একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, আসনটি মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সাধারণ ভোটারদের মুখে মুখে ঘুরছে দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর নাম। তারা হলেন, বিএনপি মনোনীত মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দিন (ধানের শীষ) এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত অধ্যাপক মুজিবুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা)।

এছাড়া গণঅধিকার পরিষদের মীর মো. শাহজাহান (ট্রাক), এবি পার্টির মো. আব্দুর রহমান (ঈগল) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আল সাআদ (মোবাইল ফোন) নির্বাচনে থাকলেও তাদের প্রচারণা সীমিত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আসটির বিপুল সনাতন ধর্মাবলম্বী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তরুণ ভোটারদের টানতে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই নানা কৌশল অবলম্বন করছে।

ইতোমধ্যে জামায়াতের জনসভায় সংখ্যালঘু নেতাদের উপস্থিতি নতুন এক রাজনৈতিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এদিকে, ২০০৮ সাল থেকে আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের এলাকায় দেখা যাচ্ছে না, দলীয় কার্যক্রমও স্থবির। এই সুযোগে বিএনপি তাদের একসময়ের দুর্গ পুনরুদ্ধারে কোমর বেঁধে নেমেছে।

অন্যদিকে, জামায়াতও তাদের সাংগঠনিক শক্তি ব্যবহার করে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

এদিকে রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা নির্বাচনি এলাকায় প্রচার-প্রচারণায় মেতে উঠেছেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে এ আসনে বিএনপির একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। এই আসনে বিভিন্ন দলের ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন, পুঠিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, ২০০৮ এবং ২০১৮ সালে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন, অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল।

রাজশাহী-৫ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৩ জন। দুজন বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় এ আসনে এবার নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়তে দেখা যাচ্ছে। তবে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমেছেন যুক্তরাজ্য জিয়া পরিষদের সহসভাপতি ব্যারিস্টার রেজাউল করিম এবং পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ইসফা খায়রুল হক শিমুল। অন্য দলের প্রার্থীরা হলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পুঠিয়া উপজেলা আমির মনজুর রহমান, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) পদপ্রার্থী আলতাফ হোসেন মোল্লা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রুহুল আমিন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী রায়হান কাওসার।

সিয়াম হোসেন নামের শিক্ষক বলেন, যত দিন যাচ্ছে আর বেকারত্বের সংখ্যা বাড়ছে। শুধু কর্মসংস্থান না থাকায়, আজ যুবকসমাজ অপরাধমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এবারের নির্বাচনে যারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার প্রতিশ্রুতি দেবেন তাকে ভোট দেব। পুঠিয়া সদরের রিপন আহাম্মেদ বলেন, অতীতে যারা এ আসনে নির্বাচিত হয়ে ছিলেন, তারা এলাকার উল্যেখযোগ্য কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ণ করেনি। বরং তারা নির্বাচনীয় এলাকার শত শত কোটি টাকা অনিয়ম দুর্নীতি করে লুটপাট করে নিজের আখের গুজেছেন। আমরা আগামীতে আর লুটপাটকারি জনপ্রতিনিধি দেখতে চাই না।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি