দেশে ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা বাড়লেও এখনো মোট লেনদেনে নগদ বা ক্যাশ টাকার পরিমাণ ৬৫ শতাংশ। বাকি ৩৫ শতাংশ পরিমাণ লেনদেন হয় ডিজিটাল মাধ্যমে। বড় অঙ্কের লেনদেনে নগদ টাকা ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। আর ডিজিটাল মাধ্যমে বেশি হয় ছোট লেনদেন। এ অবস্থায় দেশে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি দূরীকরণে ডিজিটাল বা নগদবিহীন লেনদেন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে একই সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেনে প্রতারণা রোধের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের নগদবিহীন লেনদেনের কৌশলগত রোডম্যাপ’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে। পিআরআইয়ের ঢাকার বনানী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। পিআরআই চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান। এতে বলা হয়, সংখ্যার হিসাবে বর্তমানে মোট লেনদেনের প্রায় ৪৯ শতাংশ হয় ডিজিটাল মাধ্যমে। প্রথাগত পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয় বাকি ৫১ শতাংশ পরিমাণ লেনদেন। মোট প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৪৩ শতাংশ ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং সেবার আওতায় এসেছেন। সক্রিয় মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট রয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৭১ লাখ মানুষের।
প্রবন্ধে বলা হয়, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতিদিন গড়ে ২ কোটি ৪০ লাখ বার লেনদেন হয়, যার পরিমাণ ৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি। মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের ৫২ শতাংশ গ্রামীণ এলাকার মানুষের এবং ৪২ শতাংশ নারীদের মালিকানাধীন। বাজার মালিকানার প্রায় ৪০ শতাংশ দখলে রয়েছে বিকাশের, ২৫ শতাংশ নগদের ও রকেটের বাজার হিস্যা ১৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান নগদবিহীন লেনদেনকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এ জন্য মানসিক পরিবর্তন আনতে হবে। নগদবিহীন ব্যবস্থায় যাওয়ার আগে নগদ অর্থের ব্যবহার কমাতে হবে। সে জন্য নগদ টাকাকে ব্যয়বহুল করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে ৫০ হাজার টাকার বেশি নগদ টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে বাড়তি ফি আরোপ করা যেতে পারে। কারণ, নগদ টাকা ছাপাতে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়।’
বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের সিইও নাসের এজাজ বিজয় বলেন, ‘নগদবিহীন লেনদেনকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এর মাধ্যমে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মতো আর্থিক অপরাধ কমানো সম্ভব। সে জন্য নগদ টাকা উত্তোলনের ওপর কর আরোপ করে সেই অর্থ ডিজিটাল লেনদেনে ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া যেতে পারে।’
নগদের প্রশাসক মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, ‘টার্নওভার কর যত দিন থাকবে, তত দিন বিনা খরচে সেবা দিলেও ডিজিটাল লেনদেন বাড়বে না। কারণ, প্রতিটি লেনদেনের বিপরীতে কর দিতে হয়। এ কর এড়াতে অনেকেই নগদ লেনদেন করেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের পাইকারি মোকাম খাতুনগঞ্জ ও ঢাকার মৌলভীবাজারের ৯০ শতাংশ ব্যবসা নগদ লেনদেনের মাধ্যমে হয়।’
মোবাইল অপারেটর রবির কর্মকর্তা শাহেদ আলম বলেন, ‘যুক্তরাজ্য ও মালয়েশিয়ায় জালিয়াতি ঠেকাতে ডিসপোজেবল কার্ড ব্যবহার করা হয়, যা ব্যবহারকারী নিজেই তৈরি করতে পারেন। কিন্তু দেশে সব নজরদারি চলে সিমের ওপর। সিম নিজে কোনো অপরাধ করে না। সিমের তথ্যের ওপর নির্ভর করে জালিয়াতি ঠেকানো যাবে না। তিনি আরও বলেন, দেশের নগদবিহীন লেনদেনের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নেই, যেখানে যুক্তরাজ্যে এ হার ৯১ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৯৫ শতাংশ।’
বিল সংগ্রহের মতো সরকারি সেবায় নগদবিহীন লেনদেন চালুর পরামর্শ দেন রাশেদা সুলতানা। মুক্ত আলোচনায় তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে মানুষ বাধ্য হয়েই নগদবিহীন লেনদেনে অভ্যস্ত হবেন।’ পাশাপাশি চিকিৎসক ও আইনজীবীদের চেম্বারে এমন লেনদেন ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন পিআরআইয়ের গবেষণা পরিচালক বজলুল হক খন্দকার। আরও বক্তব্য দেন পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক খুরশিদ আলম। সেমিনারে জানানো হয়, আগামী ছয় মাস গবেষণা করে জুলাই নাগাদ নগদবিহীন লেনদেনের একটি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করবে পিআরআই।
নগর-মহানগর: প্লাস্টিকের পুতুল ও ফুলই কাল হলো ছোট্ট আরিফার
নগর-মহানগর: স্কুলে শিশু নির্যাতনের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেপ্তার
ক্যাম্পাস: বিদ্যার দেবীর আরাধনায় ‘মব’ রুখে দেয়ার বার্তা