‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। এই আইনে গুম করার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড সহ কঠোর সাজার বিধান রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক
অভিযোগ গঠনের ১২০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্নের বাধ্যবাধকতা
রপ্তানি আকৃষ্ট করতে লজিস্টিক নীতির খসড়া অনুমোদন
বৃহস্পতিবার,(০৬ নভেম্বর ২০২৫) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক হয়। এরপর বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
গুম প্রতিরোধ এবং প্রতিকারের জন্য একটা আইন নিয়ে অনেকদিন ‘যথেষ্ট ডিবেট’ হয়েছে জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, ‘এরপর আজকে এটা চূড়ান্তভাবে অনুমোদন হয়েছে। এই অধ্যাদেশে গুমকে সংজ্ঞায়নের পাশাপাশি চলমান অপরাধ, কন্টিনিউ অফেন্স হিসেবে বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ড সহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।’
তিনি জানান, গোপন আটক কেন্দ্র স্থাপন, যা আয়নাঘর নামে পরিচিত, তা ব্যবহার শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গুম সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত কমিশনকে গুম সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
এই অধ্যাদেশে গুম প্রতিকারের লক্ষ্যে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের ১২০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্নের বাধ্যবাধকতা, ভুক্তভোগী, স্বাক্ষীর অধিকার সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ এবং আইনগত সহায়তা নিশ্চয়তা প্রদান সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান প্রেস সচিব।
আইনে গুম প্রতিরোধ প্রতিকার ও সুরক্ষার উদ্দেশ্যে তহবিল গঠন এবং তথ্যভাণ্ডার প্রতিষ্ঠার বিধানও সংযোজিত হয়েছে বলে জানান শফিকুল আলম।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সময় বাংলাদেশে হাজার-হাজার ছেলেমেয়ে গুম হয়েছে। তার মধ্যে গুম বিষয়ক যে কমিশন করা হয়েছে, সেখানে অভিযোগের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার এবং ওই কমিশনে যারা মেম্বার আছেন, তারা তাদের রিপোর্টে বারবার বলছেন যে এটার সংখ্যা চার হাজারের ওপরে হবে। আর দেশে শতশত আয়নাঘর ছিল, সেখানে এদেরকে রাখা হতো। অনেকে যারা গুম হয়েছেন, কেউ কেউ ফিরে এসেছেন, আবার অনেকে ফিরে আসেননি। বিএনপির অনেক কর্মী এখনও ফিরে আসেননি বলেও দাবি করেন প্রেস সচিব।
গুম সংক্রান্ত একটি ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন আছে উল্লেখ করে প্রেস সচিব বলেন, ‘যেটার নাম হচ্ছে, ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দি প্রটেকশন অব অল পারসনস ফ্রম এনফোরস ডিসএপিয়ারেন্স। গত বছর ২৯ আগস্ট বাংলাদেশের উপদেষ্টা পরিষদ এটার এপ্রুভ করেছেন। বাংলাদেশ এটার অংশীদার হয়েছে।’
অংশীদারের এই কনভেনশনকে ফলো করে অধ্যাদেশটা তৈরি করা হয়েছে জানিয়ে শফিকুল আলম বলেন, ‘এটা বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক আইন। এর ফলে বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিস্ট সরকার এসে গুমের রাজত্ব চালাতে পারবে না। দেশে কোনো আয়নাঘর তৈরি হবে না।’
লজিস্টিক নীতির খসড়া অনুমোদন:
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে জাতীয় লজিস্টিক নীতির খসড়া এবং চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, ‘জাতীয় নগরনীতি নিয়েও একটু আলাপ হয়েছে। এই বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।’
সরকার জাতীয় লজিস্টিক নীতিমালা প্রণয়ন করেছে জানিয়ে শফিকুল আলম বলেন, ‘এটি কোনো আইন না হলেও এ নীতিমালার দিকনির্দেশনার মাধ্যমে সরকার তার কাজগুলো সঠিকভাবে করতে পারবে।’
এই নীতিমালা প্রণয়নের ফলে দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ বাড়বে দাবি করে তিনি বলেন, ‘ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) আসবে। বাংলাদেশে রপ্তানির যে প্রতিযোগিতা, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আরও অনেক ভালো হবে।’
এই নীতিমালায় মোট ১১টি অধ্যায় রয়েছে জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন কোনো পণ্য রপ্তানি করতে গেলে শিপমেন্টের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরেই প্রায় ১১দিন পড়ে থাকে। লজিস্টিক নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে পারলে পণ্য পরিবহন, পণ্যের প্রাপ্যতা সবার কাছে পৌঁছাবে, রপ্তানিও দ্রুত করা সম্ভব হবে। ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ থেকে রপ্তানির জন্য বেশি আগ্রহী থাকবে।’
২০২৪ সালে এমন একটি নীতি করা হয়েছিল জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, ‘কিন্তু সচিব কমিটি সেই নীতি পুনর্মূল্যায়ন করে দেখেছে নীতিমালায় দুই পৃষ্ঠা জুড়ে শুধু শেখ মুজিবের বন্দনা ছিল।’
শফিকুল বলেন, ‘নতুন এ নীতিমালার মূল টার্গেট ২০৫০ সালের মধ্যে লজিস্টিক্যাল যে ইস্যুগুলো (মূল ফোকাস থাকবে রেলওয়ে ও নৌপরিবহন) সেগুলো যথাযথভাবে প্রস্তুত করা। বাংলাদেশে এখনও তিন হাজার কিলোমিটার নৌরুট ও তিন হাজার কিলোমিটার রেলওয়ে রয়েছে। কিন্তু এই রোডের বেশিরভাগই আমরা ব্যবহার করতে পারি না।’
এই নীতিমালার মাধ্যমে ‘লজিস্টিক্যাল ইস্যুগুলো একটা ডিজিটাল ইকো সিস্টেমে’ এসে পড়বে মন্তব্য করে প্রেস সচিব বলেন, ‘অনেক কিছুই যেমন কাস্টমসে যতগুলো ডকুমেন্টেশন ডিজিটালি ই-কাস্টমস বা ই-ক্লিয়ারেন্স করা যায় সে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে যে কেউ রিয়েল টাইমে তার রপ্তানিকৃত পণ্য কোথায় গেল তা বাংলাদেশে বসে ট্র্যাকিং করতে পারবে। যা আগে বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে করা যেতো।’