সংকট ‘নভেম্বর’ থেকেই, ‘জানানো হয়নি’ দ্রুত সমাধান না হলে ‘অকটেনও ফুরিয়ে যাবে’
দেশে চলমান এলপি গ্যাস সংকটে পরিবহন খাত ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে যাত্রীসেবা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
সংবাদ সম্মেলনে এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন
সরকারের উচিত ছিল সবাইকে জানানো, মানুষ প্রস্তুতি নিতে পারতো।
যারা এলপিজি আমদানি করে, ‘বড় খেলোয়াড়’। ধরেন বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ওমেরা ইত্যাদি: হাসিন পারভেজ
ডিলাররা অন্য কোম্পানির গ্যাস নিতে ‘ক্লিয়ারেন্স চাইলে দেয়া হয় না’। এখানেও সংকট: সিরাজুল মাওলা
এদিকে সংকটে সৃষ্ট নেতিবাচক প্রভাবের জন্য সরকারকে দায়ী করেছে বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। গত নভেম্বর থেকে এলপি গ্যাসের সরবরাহ সংকট শুরু হয়েছে দাবি করে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘সরকার এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো তা মানুষকে জানায়নি’।
শনিবার, (১০ জানুয়ারী ২০২৬) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলায়তনে ‘এলপিজি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পরিবহন খাতে’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
দেশে আবাসিক রান্নায় বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপি গ্যাস (এলপিজি)। বর্তমানে যানবাহনও চলছে এই গ্যাস (অটোগ্যাস) দিয়ে। গত ডিসেম্বরের শেষদিক থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে এলপি গ্যাসের ভয়াবহ সংকট চলছে। সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে দেড় থেকে দ্বিগুণ দামে। এরপরও গ্যাস পাচ্ছেন না ভোক্তারা। এই সংকট এসে ভর করেছে যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাস খাতে।
বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সিরাজুল মাওলা শনিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এলপিজি অটোগ্যাস একটি পরিবেশবান্ধব, সহজলভ্য ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী জ্বালানি, যা সিএনজি, পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের বিকল্প হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সরকারের উৎসাহে সারাদেশের ৬৪ জেলায় প্রায় এক হাজার অটোগ্যাস স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এসব স্টেশনের ওপর নির্ভর করে প্রায় দেড় লাখ যানবাহন এলপিজিতে রূপান্তর করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তীব্র এলপিজি সংকটের কারণে দেশের প্রায় সব অটোগ্যাস স্টেশন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে স্টেশন মালিকদের পাশাপাশি এলপিজিচালিত যানবাহনের মালিক ও চালকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেশনে ঘুরেও গ্যাস না পেয়ে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে যাত্রীসেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং যাত্রীরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।’
সংগঠনের সভাপতি জানান, ‘দেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে যানবাহন খাতে ব্যবহৃত হয় মাত্র ১৫ হাজার মেট্রিক টন, যা মোট ব্যবহারের প্রায় ১০ শতাংশ। অথচ এই তুলনামূলক সামান্য পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় পুরো এলপিজি অটোগ্যাস শিল্প আজ ধ্বংসের মুখে।’
সংকট সমাধানে অ্যাসোসিয়েশনের তিন দফা দাবি উপস্থাপন করে তিনি বলেন, ‘গ্যাস সংকট না কাটলে অকটেনের ওপরে চাপ পড়বে এবং অকটেন ফুরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ।”’
সংকটের কারণ
কী কারণে সারাদেশে এলপি গ্যাসের সংকট হয়েছে বলে মনে করছেন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হাসিন পারভেজ বলেন, ‘সবকিছু আমাদের জানা আছে, এখানে আমাদের টিকে থাকার প্রশ্ন। নভেম্বরের (গত) মাঝামাঝি থেকে সংকটটা শুরু হয়েছে, আজকে ডিসেম্বর পুরাপুরি গেছে, জানুয়ারি (চলতি) মাঝামাঝি চলে আসছে, কিন্তু খুবই দুঃখজনক। এটার কোনো জবাব কিন্তু আমরা পাই নাই, কারণ এলপিজি বা জ্বালানিটা একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, কারণ চাল, ডাল ও লবণ ঘরে থাকলে আর কোনো জ্বালানি না থাকলে তো আপনি রান্না করে খেতে পারবেন না।’
সংকটের কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ব্যাপারটা এই যে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘি্নত হয়েছে বা যেটাই হয়েছে তা কমে গেছে, যেটা আছে আপনারা তো জানেন, এলপিজি অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন যারা এলপিজি ‘অপারেট’ করছে, যারা এলপিজি আমদানি করে, ‘বড় খেলোয়াড়’। ধরেন বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ওমেরা, জি গ্যাস, তারপর আই গ্যাস ১৬-১৮টা মনে হয় অনুমোদিত কোম্পানি আছে। তার মধ্যে ১২ জন আমদানি করে। ওনাদের প্রতিনিধি এবং সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট যারা, এনার্জি কমিশন (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন), ওনাদের কিন্তু একটা যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে, কিছু একটা করে সারাদেশের মানুষকে এটা জানানো দরকার ছিল, যে পরিস্থিতি এরকম এবং এটা এতদিন চলতে পারে। মানুষ তো তাহলে পরে নিজেই নিজের রেশনিংটা করতে পারতো, তাই না?’
হাসিন পারভেজ ‘যে আমি একটু গ্যাসটা কম ব্যবহার করি, সেটা না করে ফলে আপনি দেখেন যেটা হচ্ছে। সেটা হচ্ছে যে, দোষ আরোপ করার একটা রাজনীতির মতো একটা ব্যাপার। বলে দিচ্ছে যে, ছোট ছোট খুচরা বিক্রেতাদের ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব জরিমানা করে দিচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের উচিত ছিল এবং এখনও সময় আছে, যদি সরকার ধারণা করে যে এটা আরও কিছুদিন চলবে তাহলে পরে সবাইকে জানানো। সরকারের বলা উচিত যে এটা আমাদের কিছুদিন রেশনিং করে ব্যবহার করতে হবে। যদি আমাদের ‘সাপ্লাই চেইন ইন্টারাপশন’ হয়, কেন হইছে সেটা যদি না-ও বলতে পারে, সেটা যদি নাম ব্যবহার করতে না পারে বলুক, এটা যে চলবে আরও কিছু দিন এটা জানলে তো মানুষ বিকল্প চিন্তা করবে। কেউ ইলেকট্রিক চুলা কিনবে, কেউ ইন্ডাকশন কুকার কিনবে।’
ক্লিয়ারেন্স দেয়া হয় না
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল মাওলা বলেন, ‘অনেকের কাছ থেকে যেটা বুঝতে পারছি যে সরবরাহ ব্যবস্থায় কোথায়ও সমস্যা হয়েছে। এখানে সমস্যা হলো- অনেকের গ্যাস পাম্পের সরবরাহের চুক্তি একেকজনের একেক কোম্পানির সঙ্গে। যখন ওই কোম্পানির গ্যাস না থাকে তখন স্বাভাবিকভাবে অন্য কোম্পানি তাকে গ্যাস দিতে চায় না। এইটা আমাদের দেশে একটা সংস্কৃতি আছে। দেখা যাচ্ছে যে সাধারণত আমি যদি গ্যাস দিতে না পারি একটা আমার ডিলারকে নিয়ম হলো তাকে একটা ‘ক্লিয়ারেন্স’ দিয়ে দেয়া, ঠিক আছে? আমার কাছে গ্যাস নাই। তুমি অন্যর কাছ থেকে গ্যাস নিয়ে না-ও। আমি তোমাকে একটা লিখিত ‘ক্লিয়ারেন্স’ দিলাম। সাধারণত দেখা যাচ্ছে যে ‘ক্লিয়ারেন্স’ চাইলে তা দেয়া হয় না। এই ‘ক্লিয়ারেন্স’ না পাইলে অন্যরা গ্যাস দিচ্ছে না। এটা একটা জটিলতা আছে। এটা খুবই নমনীয় হওয়া দরকার।’
গাড়ির জ্বালানি অকটেন থেকে গ্যাসে রূপান্তরের বিষয়টি তুলে ধরে সিরাজুল মাওলা বলেন, ‘গ্যাস সংকটের সমাধান হওয়া খুব জরুরি। না হলে সরকারের ওপরে বাড়তি জ্বালানির চাপ পড়ে যাবে।’ এ চাপ সরকার নিতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, অকটেন দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ।
সংগঠনের আরেক নেতা সাজ্জাদুল করিম কাবুল দাবি করেন কেউ গ্যাস মজুদ করেনি। তিনি বলেন, ‘কারও কী স্টোরে পড়ে আছে গ্যাস? গ্যাস কিন্তু কারও স্টোরে পড়ে নাই। সবাই বিক্রি করতেছে।’
*অ্যাসোসিয়েশনের দাবি*
সংবাদ সস্মেলনে উপস্থাপন করা এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবিগুলো হলো- এলপিজি সরবরাহ কোম্পানি অপারেটর এবং এলপিজি অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলওএবি) কে ‘যেভাবেই হোক’ এলপিজি অটোগ্যাসের চাহিদা অনুযায়ী এলপি গ্যাস সরবরাহ করা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ও অন্যান্য সরকারি কর্তৃপক্ষ যেন এলপি গ্যাস আমদানিসংক্রান্ত কোন জটিলতা থাকলে তা সমাধান করে এবং অপারেটরের মাধ্যমে অটোগ্যাসের চাহিদা অনুযায়ী সরবাহ নিশ্চিত করে।
ভবিষ্যতে যাতে এলপি গ্যাসের সরবরাহ ব্যাঘাত না হয় সে ব্যপারে যাবতীয় পদক্ষেপ নেয়। প্রয়োজনে সরকার যেন বিকল্প হিসেবে এলপি গ্যাস আমদানির ব্যবস্থা করে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি সাঈদা আক্তার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসাইন, যুগ্ম অর্থ সম্পাদক মো. মোকবুল হোসেন, যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হুমায়ন কবির ভূঁইয়া, মো. মশিউর রহমানসহ অন্য নেতারা।