বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে অন্তর্বর্তী সরকার যে নতুন আইন করেছে, তাতে জাতীয় উদ্যানে বনভোজন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ বিধান লঙ্ঘন করলে হতে পারে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড। সাফারি পার্ক, ইকোপার্ক, উদ্ভিদ উদ্যানসহ কয়েকটি জায়গায় অনুমোদন ছাড়া ভিডিও ধারণের জন্যও সাজার বিধান রাখা হয়েছে এই আইনে।
গত বুধবার আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ এ অধ্যাদেশ জারি করে।
আইনের ১৯ ধারায় অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যানে প্রবেশের বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ১৯-এর (ড) ধারায় অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যানে বনভোজন নিষিদ্ধের বিধান রাখা হয়েছে। এই ১৯ ধারার ১৪টি বিধিনিষেধের যে কোনোটি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ চার লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে নতুন আইনে।
বন অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২৫টি অভয়ারণ্য এবং ১৯ জাতীয় উদ্যান রয়েছে। এসব উদ্যানের বেশিরভাগই বনভোজনের জনপ্রিয় কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। গাজীপুরের ভাওয়াল, হবিগঞ্জের সাতছড়ি, মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া, দিনাজপুরের রামসাগর এসব জাতীয় উদ্যানে সরকারি উদ্যোগেই বনভোজনের ব্যবস্থা রয়েছে।
অধ্যাদেশে অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যানের সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত গ্রহণকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রক্ষিত এলাকার ২ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। অভয়ারণ্যের ভেতরে চাষাবাদ, খনিজ সম্পদ আহরণ, আগুন লাগানো এবং আগ্রাসী প্রজাতির বিদেশি উদ্ভিদ প্রবেশ করানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে বননির্ভর জনগোষ্ঠীর প্রথাগত অধিকার ও জীবিকার প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন আইনের ২২ ধারায় সাফারি পার্ক, ইকোপার্ক, উদ্ভিদ উদ্যান, বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র এবং বিশেষ জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকায় ১২ ধরনের কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এর মধ্যে অনুমোদন ছাড়া ভিডিও-চিত্র বা ডকুমেন্টারি ধারণের বিষয়েও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এ আইন ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
জানতে চাইলে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন আন্দোলনের (পরিজা) সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল বলেন, ‘বাংলাদেশে আইনের অভাব নাই, রয়েছে মান্য করার মানসিকতার অভাব। ঢালাওভাবে শাস্তির ব্যবস্থা তেমন কোনো পরিবর্তন আনবে না।
‘আপনি রাতারগুল কিংবা মধুপুর ঘুরতে যান। সেখানে একজন মানুষের যে সংবেদনশীল আচরণ করা প্রয়োজন, সেটা দেখা যায় না, এটা আপনি তাকে কীভাবে শেখাবেন?’
পরিবেশবাদী উজ্জল বলেন, ‘সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া সহজ ও সংবেদনশীল না করে শুধু শাস্তি জরিমানার বিধান কতটা কার্যকর হবে, সেটা বড় প্রশ্ন। ‘আমি মনে করি, আগে এসব আলোচনা পাঠ্যবইয়ে নিয়ে আসুন যে পাখি, প্রাণী, বন, পরিবেশের প্রতি শিশুরা কী আচরণ করবে বা করা উচিত, তারপর শাস্তির আলোচনা হতে পারে।’
নতুন আইনের ৪১ (১) ধারা অনুযায়ী, বাঘ (বেঙ্গল টাইগার) বা হাতি (এসিয়ান এলিফ্যান্ট) শিকারের জন্য সর্বনিম্ন ২ বছর ও সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। কেউ একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে তার সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে।
আর ভালুক, নেকড়ে, রাম কুকুর, খেকশিয়াল, বন বিড়াল, চিতা, চিতা বাঘ, চিতা বিড়াল, ভোঁদড়, বানর, হনুমান, বনরুই, সজারু, খরগোশ, হরিণ, শকুন, তিমি, ঈগল, হঁড়গিলা, টিয়া, কুমির, কাছিম, কচ্ছপ, গিরগিটি, তক্ষক, অজগর, হাঙ্গর শিকারের জন্য সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে নতুন আইনে।
নতুন আইনে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন বৃক্ষ, ঐতিহ্যবাহী স্মারক বৃক্ষ, পবিত্র বৃক্ষ এবং প্রথাগত ‘কুঞ্জবন’ সংরক্ষণের ধারা যুক্ত করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি জীবন রক্ষার প্রয়োজন ছাড়া এসব বৃক্ষ বা বন ধ্বংস করতে পারবেন না। এই বিধান অমান্য করলে সর্বোচ্চ ছয়য় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
অধ্যাদেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলা হয়েছে, এই অধ্যাদেশ প্রণয়নের আগে প্রথাগত ঐতিহ্য হিসেবে তাদের সংগৃহীত বন্যপ্রাণীর ট্রফি বা স্মৃতিচিহ্নের ক্ষেত্রে জব্দকরণের বিধান প্রযোজ্য হবে না। নতুন আইনে বন কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়াই অপরাধীকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।
এছাড়া জব্দ করা দ্রুত পচনশীল দ্রব্য তাৎক্ষণিক ধ্বংস বা অপসারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। সংক্ষুদ্ধ ব্যক্তি দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ পাবেন।