১০ জানুয়ারি ২০২৬
সরকারি আইন অমান্য করে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার পদ্মা নদীর তীরে একটি প্রভাবশালী মহল অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৩ অনুযায়ী নদীর ভূ-প্রকৃতির ক্ষতি হয় এবং ড্রেজিংয়ের ফলে ফসলি জমি ও নদীতীর ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে সেখানে ড্রেজিং নিষিদ্ধ। তবে এসব আইন উপেক্ষা করেই হরিরামপুরে নির্বিচারে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
সরকারি আইন না মেনে ড্রেজিং চালানোর ফলে নদীতীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে শত শত বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও নামধারী কিছু সাংবাদিককে ‘ম্যানেজ’ করে একটি প্রভাবশালী চক্র দাপটের সঙ্গে এই অবৈধ বালু ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয়রা জানান, সরকার নির্ধারিত বালুমহালের সীমানার মধ্যে বালু উত্তোলন না করে প্রভাবশালীদের সুবিধামতো এলাকায় ড্রেজিং করা হচ্ছে। এর ফলে নদী তীরবর্তী বসতভিটা ও ফসলি জমি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভাঙনে হরিরামপুর উপজেলার অন্তত ১৩টি মৌজা ইতোমধ্যেই পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে রয়েছে নদীরক্ষা বাঁধসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা।
এক্ষেত্রে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৩-এর খ, গ ও ছ ধারা সরাসরি লঙ্ঘন করা হচ্ছে, যেখানে সড়ক, বাঁধ, নদীতীর ও ফসলি জমির ভাঙন এবং ভূ-প্রকৃতির ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে ড্রেজিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ অনুযায়ী পরিবেশ সংকটে পড়ে এমন স্থান থেকে মাটি বা বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকলেও এসব আইন মানছে না মাটি লুটেরা চক্রটি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের কারণেই পদ্মা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন ৫-৭টি ড্রেজার (কাটিং মেশিন) দিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করে বাল্কহেডে ভরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতি ঘণ্টায় একটি ড্রেজার দিয়ে ২-৩টি বাল্কহেড বালু ভর্তি করা হয়। একটি বাল্কহেড চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি খালি বাল্কহেড সেখানে ভেড়ে।
উত্তোলিত বালু ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার ঘনফুট ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বাল্কহেডে পরিবহন করা হচ্ছে। প্রতিদিন শতাধিক বাল্কহেড বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বালু ব্যবসায়ীদের হিসাবে, প্রতিদিন গড়ে ৮-১০ লাখ ঘনফুট বালু বিক্রি হচ্ছে, যার বাজারমূল্য ১৫-২০ লাখ টাকা। মাসে প্রায় ৪-৬ কোটি টাকার বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই অবৈধ বালু উত্তোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে সদ্য আবির্ভূত কিছু ব্যক্তি ও একটি প্রভাবশালী মহল। তাদের নিরাপত্তায় রয়েছে বিশাল ক্যাডার বাহিনী। সূত্র জানায়, হান্নান মৃধা, হক সাহেব, মোশারফ হোসেন, শাহীন, মিজান, আকিমূল ও সূরুষ এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। অভিযোগ রয়েছে আকিমূল খা ও সূরুষ প্রশাসন ও সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার দায়িত্বে রয়েছেন। তবে এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা অভিযোগ অস্বীকার করেন। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের ৭ মে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ বালুমহালের ইজারা নেয় ফরিদপুর জেলার মিথিলা এন্টারপ্রাইজ। গত ২৯ মে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে নির্ধারিত সীমানা বুঝিয়ে দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্ধারিত বালুমহালের সীমানা অতিক্রম করে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বয়ড়া ইউনিয়নে দুপুরে ৫-৭টি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইজারাদার অধিক মুনাফার আশায় নির্ধারিত বালুমহালের বাইরে গিয়ে মোটা বালু উত্তোলন করছেন। ইজারাকৃত স্থানে থাকা ভিটি বালুর প্রতি ঘনফুট মূল্য যেখানে ৫০-৮০ পয়সা, সেখানে ইজারাবহির্ভূত এলাকায় থাকা মোটা বালুর দাম প্রতি ঘনফুট ৫-৭ টাকা।
এ বিষয়ে হরিরামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হান্নান মৃধা বলেন, ‘আমি বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নই। নির্ধারিত জায়গার বাইরে বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই। এটি প্রশাসনের দেখার বিষয়।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মিথিলা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আলমগীর হোসেন জানান, ‘নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যেই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আমি সেখানে থাকি না, অন্য লোকজন নিয়ন্ত্রণ করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইজারা, স্থানীয় ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয় হবে।’
হরিরামপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফাহজি বীসরাত হোসেন বলেন, ‘বালুমহালে কোনো অনিয়মের বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে লিখিত অভিযোগ বা সংবাদ প্রকাশ হলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘বালুমহালের ইজারা জেলা প্রশাসনের বিষয়। তবে অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং করা হলে নদীভাঙন বাড়বে। পদ্মার চরাঞ্চল এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। বিষয়টি আমরা প্রশাসনকে অবহিত করবো।’
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘নির্ধারিত সীমানার বাইরে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও দ-নীয় অপরাধ। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’