image
শনিবার বনানীর শেরাটন হোটেলের বলরুমে আয়োজিত গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তারেক রহমান

প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান তারেক রহমানের

মহসীন ইসলাম টুটুল

দেড় যুগের নির্বাসিত জীবন শেষে স্বদেশে ফেরা এবং সদ্য দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ, সবমিলিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ নিয়ে নিজের স্বপ্নের কথা জানিয়েছেন বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান।

প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান তারেক রহমানের

সাংবাদিকদের কাছে দেশের সমস্যার সমাধানে সাহায্য করে এমন সমালোচনা চাই

সামনে অনেক কঠিন

চ্যালেঞ্জ রয়েছে

৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফেরার সুযোগ নেই

স্বাস্থ্যখাতে ‘প্রিভেনশন মডেল’ ও ১ লাখ কর্মসংস্থান

কৃষকদের কথা শোনার

জন্য রাজনীতিবিদদেরই তাদের কাছে যেতে হবে

সড়কে বছরে ৭ হাজার মানুষের মৃত্যু স্বাভাবিক হতে পারে না, এ নিয়ে রাজনীতিবিদদের ভাবতে হবে

আগামীকাল থেকে দেশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দিকে নতুন যাত্রা শুরু করবে

তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বাংলাদেশ আর পেছনের দিকে হাঁটবে না। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে তারেক রহমান জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে তা কমিয়ে আনার আহ্বান জানান। এছাড়া মতপার্থক্য যেন মতবিরোধের পর্যায়ে না যায় সে ব্যাপারেও সবাইকে সতর্ক করেন।

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের সমস্যা ছিল সমস্যা আছে কিন্তু আমরা ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় আর ফিরে যেতে চাই না। প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধের পরিণতি কী হতে পারে তা দেশের মানুষ ৫ আগস্ট দেখেছে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার তা মাধ্যমে কমিয়ে আনতে হবে। মতপার্থক্য যেন কোনোভাবেই মতবিরোধের পর্যায়ে না যায়।’ যে কোনো মূল্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু করার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, ‘মতপার্থক্য ভুলে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে আমাদের বেড়িয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্র আমাকে কী দিলো এসব না ভেবে বরং আমাদের ভাবতে হবে আমি রাষ্ট্রকে কী দিলাম।’

বিএনপি আগামীতে সরকার গঠন করলে কিভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, তার একটি স্পষ্ট ও জনকল্যাণমুখী রূপরেখা তুলে ধরেন তারেক রহমান। তার পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশের নারীসমাজ ও সাধারণ পরিবারগুলো। এ সময় দেশ গঠনে ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড ও কৃষি খাতের আমূল পরিবর্তনের মতো অভিনব পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি জানান, দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। এই কার্ডের মূল স্বত্বাধিকারী হবেন পরিবারের নারীরা বা গৃহিণীরা। পরিকল্পনার বিস্তারিত জানিয়ে তিনি বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে ৫-৭ বছর পর্যন্ত পরিবারগুলোকে রাষ্ট্র থেকে খাদ্য বা আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে তার পরিকল্পনার কথা এভাবে জানান দেন। বক্তব্যের শুরুতেই সদ্য দলের চেয়ারম্যানের দ্বায়ীত্বপ্রাপ্ত এই নেতা দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অতীতে বিভেদের রাজনীতি জাতিকে কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তার অভিজ্ঞতা সবার জানা। তাই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাই রাজনৈতিক কর্মীদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।

শনিবার, (১০ জানুয়ারী ২০২৬) রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুম যখন দেশের বরেণ্য সাংবাদিক ও সম্পাদকদের উপস্থিতিতে সরগরম সেসময় অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেন বিএনপির নতুন চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি প্রত্যেক টেবিলে টেবিলে গিয়ে সবার সঙ্গে হাত মিলিয়ে কুশল বিনিময় করেন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দলের প্রধানের সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের এই সরাসরি সাক্ষাৎ এক ভিন্নমাত্রার আবহ তৈরি করে। অন্য শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও এ সময় তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন। মির্জা ফখরুল বলেন, সঙ্গত কারণেই গত বছরগুলো দলের প্রধানের সঙ্গে গণমাধ্যমের এমন সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ হয়ে ওঠেনি, আর সেই শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যেই এই আয়োজন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিকের বক্তব্য শুনেন তারেক রহমান। এরপর বিএনপির সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাংবাদিকদের উদ্দেশে তার বক্তব্য দেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে হলজুড়ে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে যখন তারেক রহমান নিজের জীবনের তিনটি ধ্রুব তারিখের কথা উল্লেখ করেন। আবেগময় অথচ দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি আমার অবস্থান থেকে যদি চিন্তা করি, আমার এক পাশে ১৯৮১ সালের একটি জানাযা (বাবা জিয়াউর রহমানের), একই সঙ্গে আমার আরেক পাশে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের একটি জানাজা (মা খালেদা জিয়ার) এবং আরেক পাশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনা। এই তিনটি ঘটনা কেবল আমার একার নয় বরং দলের নেতাকর্মী ও পুরো দেশবাসীর জন্য এক বড় শিক্ষার জায়গা। এই বাস্তবতাই বলে দিচ্ছে যে, ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ বা কারণ নেই।’

তারেক রহমান বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের হাতে অর্থ থাকলে তা মূলত স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগে ব্যয় হয়, যা পরিবার ও স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।’ তার প্রয়াত মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নারী শিক্ষায় অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, নারীরা শিক্ষিত হয়েছে, এখন তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার পালা। এই সুবিধা হবে সর্বজনীন, যেখানে দলীয় পরিচয় বা শ্রেণীভেদ থাকবে না। এছাড়া দেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে নিজের গভীর ভাবনার কথাও জানান বিএনপি চেয়ারম্যান। উন্নত বিশ্বের আদলে তিনি চিকিৎসায় ‘প্রতিকারের’ চেয়ে ‘প্রতিরোধ’ বা প্রিভেনশনের ওপর জোর দিতে চান।

তিনি বলেন, ‘মানুষকে যদি সচেতন করা যায় কোন খাবারগুলো খেলে কিডনি, হার্ট বা ডায়াবেটিসের সমস্যা হবে না, তবে রাষ্ট্রের চিকিৎসা ব্যয় অনেক কমে আসে এবং মানুষ সুস্থ থাকে।’ এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেন, যার ৮০/৮৫ শতাংশই হবেন নারী। এই কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করবেন।

শহরের জৌলুসের বাইরে গ্রামের কৃষকদের কথাও ভুলে যাননি তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘দেশে দেড় কোটির মতো কৃষক আছেন। যারা ২০ কোটি মানুষের অন্নের সংস্থান করছেন, তাদের কথা বলার মতো কোনো ভেন্যু নেই, তারা এমন হোটেলে প্রোগ্রাম করতে পারেন না।’ কৃষকদের এই নীরব কান্না শোনার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, রাজনীতিবিদদেরই তাদের কাছে যেতে হবে। কৃষকদের সহায়তার জন্য ‘অ্যাগ্রি কার্ড’ বা কৃষি কার্ড চালুর ভাবনার কথাও তিনি জানান।

দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে সাভারসহ বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে নতুন প্রজন্ম একটি গাইডেন্স (দিকনির্দেশনা) চাইছে, তারা একটি আশা দেখতে চাইছে।’ কেবল তরুণরাই নয়, সব প্রজন্মই এখন রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে সঠিক পথের দিশা খুঁজছে বলে তিনি মনে করেন ।

তিনি অকপটে স্বীকার করেন, সামনে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে ১৯৭১, ১৯৯০ এবং ২০২৪-এর ৫ আগস্টের চেতনাকে ধারণ করে এগোলে জাতিকে সঠিক গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে তিনি বিশ্বাস করেন। সড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বছরে সাত হাজার মানুষের মৃত্যু স্বাভাবিক হতে পারে না, এ নিয়ে রাজনীতিবিদদের ভাবতে হবে। এছাড়া বিগত সময়ে আইটি পার্কের নামে নির্মিত ভবনগুলো ভিন্ন কাজে ব্যবহারের সমালোচনা করে সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

# গণমাধ্যমের কাছে প্রত্যাশা

বক্তব্যের শেষাংশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘সমালোচনা প্রয়োজন, কিন্তু শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচনা নয়। আমরা এমন সমালোচনা চাই, যা দেশের সমস্যার সমাধানে সাহায্য করে।’ তিনি সাংবাদিকদের আহ্বান জানান, বিএনপি সরকার গঠন করলে তাদের ভুলগুলো যেন গঠনমূলকভাবে ধরিয়ে দেয়া হয় যাতে তারা সঠিক পথে থাকতে পারেন।

গণতন্ত্রের পথে যাত্রা আগামী দিনগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচীর ইঙ্গিত দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘যে কোনো মূল্যে আমাদের ডেমোক্র্যাটিক প্রসেস বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে।’ তিনি জানান, ইনশাআল্লাহ আগামী ১২ তারিখ (আগামীকাল) থেকে দেশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দিকে নতুন যাত্রা শুরু করবে। এছাড়া আগামী ২২ তারিখ থেকে নির্বাচনী ইশতেহার বা পরিকল্পনা নিয়ে দলটি জনগণের দোরগোড়ায় যাবে।

অনুষ্ঠানে দেশের প্রথিতযশা সম্পাদক ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে যায় যায় দিন সম্পাদক শফিক রেহমান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, নিউ এইজ সম্পাদক নূরুল কবীর, সংবাদ সম্পাদক আলতামাশ কবির, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, কালের কণ্ঠ সম্পাদক হাসান হাফিজ, যুগান্তর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন প্রমুখ। বিএনপির পক্ষ থেকে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মির্জা আব্বাস, সালাহউদ্দিন আহমদ. সেলিমা রহমান, আবদুল মঈন খান ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।

গত ২৫ ডিসেম্বর সপরিবারে দেশে ফেরার পর ৩০ ডিসেম্বর তারেক রহমান তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে হারান। এর ১০ দিন পর দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তে তাকে বিএনপির চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। চেয়ারম্যান হিসেবে এটিই ছিল তার প্রথম আনুষ্ঠানিক মতবিনিময়।

‘রাজনীতি’ : আরও খবর

» জুলাই সনদের বাইরে বিএনপির কোনো বক্তব্য নেই: সালাহউদ্দিন

» আসন ভাগাভাগির দ্বন্দ্বে স্থগিত ১১ দলের সংবাদ সম্মেলন

সম্প্রতি