মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
প্রবীণ হলো অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত ফসল, যে সত্যটিকে আমরা আজ সংকীর্ণ করে ফেলেছি। সাধারণত আমরা বহমান জীবন স্রোতের শেষ প্রান্তে পৌঁছানো বা বার্ধক্যর মধ্যে প্রবীণ শব্দটি সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশের জাতীয় প্রবীণ নীতিমালায় (২০১৩) অনুযায়ী, ৬০ (ষাট) বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের প্রবীণ বা জ্যেষ্ঠ নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়। এই বয়স থেকেই মানুষ জীবনের সক্রিয় কাজ বা চাকরি থেকে অবসর নেন এবং বার্ধক্যজনিত কারণে বিশেষ যত্ন ও সহায়তার প্রয়োজন হয়। কিন্তু তারা যে অতীত এবং বর্তমানের সংযোগ স্থাপনকারী সে বিষয়টি আমরা ভুলেই গিয়েছি। তাদের জীবনব্যাপী অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা, প্রজ্ঞা যেন প্রবীণ শব্দটার সজ্ঞায়নের মধ্যে আর পাওয়া যায় না। অথচ তাদের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই অতীতের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধ পরবর্তী জন্মের কাছে বর্তায়।
তাদের পাড়ি দেওয়ার দীর্ঘ জীবন পথের উত্থান-পতন, ভুল-ভ্রান্তি, সাফল্য এবং অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সঠিক দিক নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। শুধু তাই নয় পারিবারিক বন্ধন, শিশুদের পরিচর্যা ও নৈতিক শিক্ষা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে প্রবীণরাই আমাদের পথপ্রদর্শক।
কিন্তু বর্তমান সমাজে প্রবীনদের দ্বিমুখী অবস্থান বেশ জটিলতা সৃষ্টি করেছে। একদিকে তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে জ্যৈষ্ঠ নাগরিকের মর্যাদা পাচ্ছেন। নির্ধারিত বয়সের পর তাকে অবসর দেওয়া হচ্ছে এবং দীর্ঘদিন কাজের বিনিময়ে অবসরের সময় পেনশন প্রদান করা, অক্ষম বৃদ্ধদের জন্য বয়স্ক ভাতা ইত্যাদি সুবিধা রয়েছে। অন্যদিকে এর ভিন্ন বাস্তব রূপ আমরা দেখতে পাই। যেখানে প্রবীণরা পরিবার এবং সমাজ কেন্দ্রিক অবহেলা ও উপেক্ষিত হয়ে একাকীত্ব ও মানসিক টানাপোড়নের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছে।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে গিয়ে একক পরিবারে পরিণত হওয়ার ফলে বৃদ্ধ বয়সে তারা নিজেদের পরিবারের প্রিয় মানুষের সাথে সময় কাটাতে পারছে না। সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, অনেক সন্তানেরা প্রতিষ্ঠিত হবার পর বৃদ্ধ পিতা মাতাকে ‘বোঝা’ বলে গণ্য করে। তাদের সাথে ঘৃণিত আচরণ করতেও দ্বিধাবোধ করে না। শেষ পর্যন্ত তাদের স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে। বাংলাদেশে বর্তমান এরকম উদাহরণ অহরহ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে আমার নিজের দেখা একটি ঘটনা উপস্থাপন করছি, গত ২০ আগস্ট সকালবেলা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মেইন গেটের সামনে যাত্রী ছাউনিতে এক অসহায় বৃদ্ধা মহিলাকে দেখা যায়। সাধারণ ভিক্ষুক বলে তাকে এড়িয়ে গেলেও দেখা যায় তিন দিন ধরে তিনি একই জায়গায় অবস্থান করছেন। পরবর্তীতে জানা যায়, তার বাসা মাগুরা। পরিবারের সদস্যরা তাকে মারধর করে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের দেওয়া চপ, রুটি,পাউরুটি, কেক ইত্যাদি খেয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন এবং তাকে একটি বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য অনুনয় করছিলেন। আমাদের চারদিকে তাকালেই আমরা এরকম ঘটনা প্রতিনিয়ত দেখতে পাবো। শুধু তাই নয়, অনেক সময় সম্পত্তিজনিত কারণে ন্যাক্কারজনক বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়। এছাড়া প্রজন্মের মধ্যে সময় ব্যবধানের ফলে অনেক সময় তাদের চিন্তাধারার সাথে আমাদের চিন্তাধারা মিলেনা। তাই তাদের কথায় কোনো সময় গুরুত্ব না দেওয়ার ফলে তাদের বাড়ির এক কোণে জড় বস্তুর মতো পড়ে থাকতে দেখা যায়। এমনকি অনেক সময় দেখা যায় বৃদ্ধরা তাদের নাতি-নাতনিদের সাথে ও ঠিকভাবে কথা বলার সুযোগ পর্যন্ত পায়না। বার্ধক্য জনিত কারণে অসুস্থতায় তাদের জন্য কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থাও করা হয় না। এছাড়াও অর্থনৈতিক সচ্ছল নয় এমন পরিবারে প্রবীনদের জন্য নেমে আসে বড় দুর্দশা। অনেকে আছে যাদের শেষ অবলম্বন পর্যন্তও থাকেনা।
যদিও বাংলাদেশ সরকার অসচ্ছল বয়স্ক প্রবীণদের জন্য ‘বয়স্ক ভাতা’ চালু করেছেন। কিন্তু বর্তমান দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতির কারণে এ ভাতা পর্যাপ্ত নয়। এছাড়াও বার্ধক্য জনিত রোগে আক্রান্ত দরিদ্র প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্য সেবা, ঔষুধ ও পুষ্টির ব্যবস্থা অপ্রতুল থাকায় তারা অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে।
তাই প্রবীণদেরকে সমাজের বোঝা না মনে করে তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে ব্যবহার করে আমরা পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে অতীত এবং বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে দৃঢ় সেতু বন্ধন তৈরি করতে পারি।
অবশ্যই আমাদের স্মরণ রাখা উচিত, প্রবীণদের প্রতি আমাদের আজকের অবজ্ঞা, আসলে ভবিষ্যতের আয়নায় নিজেদের প্রতিবিম্বকে অস্বীকার করা। তাদের সাথে নেতিবাচক আচরণ করে আমরা আজ যে বীজ বপন করছি, বার্ধক্যে তাই ফসল হয়ে আমাদের কাছে ফিরে আসবে। অর্থাৎ জীবনের অভিধানের পাতা থেকে প্রবীণদের সম্মান মুছে দিয়ে আমরা নিজেদেরই শেষ জীবনযাত্রার মানদণ্ডকে ইচ্ছে করে নামিয়ে আনছি। আজ আমরা তাঁদের সঙ্গে যেমন আচরণ করছি, আগামীতে আমাদের প্রজন্মও আমাদের জন্য সেই মানদণ্ডই স্থির করবে। তাই জীবনের অভিধানে প্রবীনদের প্রাপ্য সম্মান এবং তাদের জীবনের মান উন্নত করার জন্য প্রবীণবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণের বিষয়টার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ইসমা খাতুন
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
সোমবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৫
প্রবীণ হলো অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত ফসল, যে সত্যটিকে আমরা আজ সংকীর্ণ করে ফেলেছি। সাধারণত আমরা বহমান জীবন স্রোতের শেষ প্রান্তে পৌঁছানো বা বার্ধক্যর মধ্যে প্রবীণ শব্দটি সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশের জাতীয় প্রবীণ নীতিমালায় (২০১৩) অনুযায়ী, ৬০ (ষাট) বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের প্রবীণ বা জ্যেষ্ঠ নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়। এই বয়স থেকেই মানুষ জীবনের সক্রিয় কাজ বা চাকরি থেকে অবসর নেন এবং বার্ধক্যজনিত কারণে বিশেষ যত্ন ও সহায়তার প্রয়োজন হয়। কিন্তু তারা যে অতীত এবং বর্তমানের সংযোগ স্থাপনকারী সে বিষয়টি আমরা ভুলেই গিয়েছি। তাদের জীবনব্যাপী অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা, প্রজ্ঞা যেন প্রবীণ শব্দটার সজ্ঞায়নের মধ্যে আর পাওয়া যায় না। অথচ তাদের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই অতীতের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধ পরবর্তী জন্মের কাছে বর্তায়।
তাদের পাড়ি দেওয়ার দীর্ঘ জীবন পথের উত্থান-পতন, ভুল-ভ্রান্তি, সাফল্য এবং অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সঠিক দিক নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। শুধু তাই নয় পারিবারিক বন্ধন, শিশুদের পরিচর্যা ও নৈতিক শিক্ষা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে প্রবীণরাই আমাদের পথপ্রদর্শক।
কিন্তু বর্তমান সমাজে প্রবীনদের দ্বিমুখী অবস্থান বেশ জটিলতা সৃষ্টি করেছে। একদিকে তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে জ্যৈষ্ঠ নাগরিকের মর্যাদা পাচ্ছেন। নির্ধারিত বয়সের পর তাকে অবসর দেওয়া হচ্ছে এবং দীর্ঘদিন কাজের বিনিময়ে অবসরের সময় পেনশন প্রদান করা, অক্ষম বৃদ্ধদের জন্য বয়স্ক ভাতা ইত্যাদি সুবিধা রয়েছে। অন্যদিকে এর ভিন্ন বাস্তব রূপ আমরা দেখতে পাই। যেখানে প্রবীণরা পরিবার এবং সমাজ কেন্দ্রিক অবহেলা ও উপেক্ষিত হয়ে একাকীত্ব ও মানসিক টানাপোড়নের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছে।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে গিয়ে একক পরিবারে পরিণত হওয়ার ফলে বৃদ্ধ বয়সে তারা নিজেদের পরিবারের প্রিয় মানুষের সাথে সময় কাটাতে পারছে না। সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, অনেক সন্তানেরা প্রতিষ্ঠিত হবার পর বৃদ্ধ পিতা মাতাকে ‘বোঝা’ বলে গণ্য করে। তাদের সাথে ঘৃণিত আচরণ করতেও দ্বিধাবোধ করে না। শেষ পর্যন্ত তাদের স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে। বাংলাদেশে বর্তমান এরকম উদাহরণ অহরহ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে আমার নিজের দেখা একটি ঘটনা উপস্থাপন করছি, গত ২০ আগস্ট সকালবেলা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মেইন গেটের সামনে যাত্রী ছাউনিতে এক অসহায় বৃদ্ধা মহিলাকে দেখা যায়। সাধারণ ভিক্ষুক বলে তাকে এড়িয়ে গেলেও দেখা যায় তিন দিন ধরে তিনি একই জায়গায় অবস্থান করছেন। পরবর্তীতে জানা যায়, তার বাসা মাগুরা। পরিবারের সদস্যরা তাকে মারধর করে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের দেওয়া চপ, রুটি,পাউরুটি, কেক ইত্যাদি খেয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন এবং তাকে একটি বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য অনুনয় করছিলেন। আমাদের চারদিকে তাকালেই আমরা এরকম ঘটনা প্রতিনিয়ত দেখতে পাবো। শুধু তাই নয়, অনেক সময় সম্পত্তিজনিত কারণে ন্যাক্কারজনক বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়। এছাড়া প্রজন্মের মধ্যে সময় ব্যবধানের ফলে অনেক সময় তাদের চিন্তাধারার সাথে আমাদের চিন্তাধারা মিলেনা। তাই তাদের কথায় কোনো সময় গুরুত্ব না দেওয়ার ফলে তাদের বাড়ির এক কোণে জড় বস্তুর মতো পড়ে থাকতে দেখা যায়। এমনকি অনেক সময় দেখা যায় বৃদ্ধরা তাদের নাতি-নাতনিদের সাথে ও ঠিকভাবে কথা বলার সুযোগ পর্যন্ত পায়না। বার্ধক্য জনিত কারণে অসুস্থতায় তাদের জন্য কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থাও করা হয় না। এছাড়াও অর্থনৈতিক সচ্ছল নয় এমন পরিবারে প্রবীনদের জন্য নেমে আসে বড় দুর্দশা। অনেকে আছে যাদের শেষ অবলম্বন পর্যন্তও থাকেনা।
যদিও বাংলাদেশ সরকার অসচ্ছল বয়স্ক প্রবীণদের জন্য ‘বয়স্ক ভাতা’ চালু করেছেন। কিন্তু বর্তমান দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতির কারণে এ ভাতা পর্যাপ্ত নয়। এছাড়াও বার্ধক্য জনিত রোগে আক্রান্ত দরিদ্র প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্য সেবা, ঔষুধ ও পুষ্টির ব্যবস্থা অপ্রতুল থাকায় তারা অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে।
তাই প্রবীণদেরকে সমাজের বোঝা না মনে করে তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে ব্যবহার করে আমরা পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে অতীত এবং বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে দৃঢ় সেতু বন্ধন তৈরি করতে পারি।
অবশ্যই আমাদের স্মরণ রাখা উচিত, প্রবীণদের প্রতি আমাদের আজকের অবজ্ঞা, আসলে ভবিষ্যতের আয়নায় নিজেদের প্রতিবিম্বকে অস্বীকার করা। তাদের সাথে নেতিবাচক আচরণ করে আমরা আজ যে বীজ বপন করছি, বার্ধক্যে তাই ফসল হয়ে আমাদের কাছে ফিরে আসবে। অর্থাৎ জীবনের অভিধানের পাতা থেকে প্রবীণদের সম্মান মুছে দিয়ে আমরা নিজেদেরই শেষ জীবনযাত্রার মানদণ্ডকে ইচ্ছে করে নামিয়ে আনছি। আজ আমরা তাঁদের সঙ্গে যেমন আচরণ করছি, আগামীতে আমাদের প্রজন্মও আমাদের জন্য সেই মানদণ্ডই স্থির করবে। তাই জীবনের অভিধানে প্রবীনদের প্রাপ্য সম্মান এবং তাদের জীবনের মান উন্নত করার জন্য প্রবীণবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণের বিষয়টার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ইসমা খাতুন