মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য আজ এক চরম সংকটের মুখোমুখি। যে পৃথিবীকে আমরা যুগের পর যুগ ধরে নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে জেনে এসেছি, মানুষেরই কিছু অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকান্ডের ফলে সেই পৃথিবী আজ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা এই বৈশ্বিক পরিবর্তনকে অভিহিত করছেন ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ নামে। এটি কোনো সাধারণ ঋতু পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং এটি পৃথিবীর অস্তিত্ব ও মানবসভ্যতার ভবিষ্যতের ওপর এক গভীর হুমকি।
শিল্পকারখানা ও যানবাহনের নির্গত কালো ধোঁয়া, নির্বিচারে বনভূমি উজাড় এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ নানা ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলেই পৃথিবী ধীরে ধীরে এক বিশাল অগ্নিকুন্ডে পরিণত হচ্ছে।
গত কয়েক বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলো ছিল মানব ইতিহাসের উষ্ণতম সময়। এই অতিরিক্ত উষ্ণতার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে মেরু অঞ্চল ও পার্বত্য হিমবাহগুলোর ওপর। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বিশাল বরফস্তূপ এবং হিমালয়ের হিমবাহগুলো দ্রুতগতিতে গলে যাচ্ছে।
এই গলিত বরফের পানি সাগরে মিশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই বহু নিচু দ্বীপরাষ্ট্র ও উপকূলীয় শহর সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এটি কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং কোটি কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের পূর্বাভাস।
পৃথিবী ধ্বংসের কতটা কাছাকাছি-তা বোঝাতে বিজ্ঞানীরা ‘ডুমসডে ক্লক’ বা ‘মহাপ্রলয়ের ঘড়ি’ ব্যবহার করেন। এটি কোনো বাস্তব ঘড়ি নয়, বরং মানবসভ্যতার জন্য একটি প্রতীকী সতর্কবার্তা। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও জলবায়ু সংকটের ভয়াবহতা বিবেচনায় বিজ্ঞানীরা এই ঘড়ির কাঁটাকে মধ্যরাতের আরও কাছে নিয়ে এসেছেন।
বর্তমানে ডুমসডে ক্লক মধ্যরাত থেকে মাত্র ৯০ সেকেন্ড দূরে অবস্থান করছে-যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন সময়। এর অর্থ, মানবসভ্যতা আজ এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সামান্য ভুল সিদ্ধান্তই ডেকে আনতে পারে অপূরণীয় বিপর্যয়। এই ৯০ সেকেন্ড আসলে একটি বৈশ্বিক অ্যালার্ম, যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে-সময় প্রায় শেষ।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঘনঘন ও বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে। অসময়ে বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ এবং শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আজ নিত্যনৈমিত্তিক বাস্তবতা। বনাঞ্চলে দাবানল সৃষ্টি হয়ে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা ও অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।
অন্যদিকে, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ও অম্লতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র। বিশেষ করে প্রবাল প্রাচীরগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রকৃতি যেন মানুষের অবহেলার বিরুদ্ধে নীরব অথচ ভয়ংকর প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন কোনো একক দেশের সমস্যা নয়-এটি সমগ্র বিশ্বের অভিন্ন সংকট। তবে এই সংকট মোকাবিলার পথ শুরু হয় ব্যক্তিগত সচেতনতা থেকেই। বেশি করে গাছ লাগানো, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির প্রসার এবং টেকসই জীবনযাত্রা গড়ে তোলাই হতে পারে এই লড়াইয়ের প্রথম ধাপ।
আমরা যদি এখনই আমাদের ভোগবাদী জীবনধারায় পরিবর্তন না আনি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাব একটি মৃতপ্রায় ও বসবাসের অযোগ্য পৃথিবী।
সময় আমাদের সামনে শেষ সুযোগ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ডুমসডে ক্লকের সেই ৯০ সেকেন্ড আসলে আমাদের জন্য এক চূড়ান্ত সতর্কসংকেত। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে নয়, বরং প্রকৃতির সহাবস্থানের মাধ্যমেই মানবসভ্যতার টিকে থাকা সম্ভব। পৃথিবী বাঁচলে তবেই বাঁচবে মানুষ।
আজ আমরা যদি সচেতন না হই, তবে হয়তো আগামী দিনের সূর্য আমাদের জন্য আর কোনো আশার আলো নিয়ে উঠবে না।
মেহরীন মালিহা
শিক্ষার্থী, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য আজ এক চরম সংকটের মুখোমুখি। যে পৃথিবীকে আমরা যুগের পর যুগ ধরে নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে জেনে এসেছি, মানুষেরই কিছু অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকান্ডের ফলে সেই পৃথিবী আজ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা এই বৈশ্বিক পরিবর্তনকে অভিহিত করছেন ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ নামে। এটি কোনো সাধারণ ঋতু পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং এটি পৃথিবীর অস্তিত্ব ও মানবসভ্যতার ভবিষ্যতের ওপর এক গভীর হুমকি।
শিল্পকারখানা ও যানবাহনের নির্গত কালো ধোঁয়া, নির্বিচারে বনভূমি উজাড় এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ নানা ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলেই পৃথিবী ধীরে ধীরে এক বিশাল অগ্নিকুন্ডে পরিণত হচ্ছে।
গত কয়েক বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলো ছিল মানব ইতিহাসের উষ্ণতম সময়। এই অতিরিক্ত উষ্ণতার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে মেরু অঞ্চল ও পার্বত্য হিমবাহগুলোর ওপর। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বিশাল বরফস্তূপ এবং হিমালয়ের হিমবাহগুলো দ্রুতগতিতে গলে যাচ্ছে।
এই গলিত বরফের পানি সাগরে মিশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই বহু নিচু দ্বীপরাষ্ট্র ও উপকূলীয় শহর সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এটি কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং কোটি কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের পূর্বাভাস।
পৃথিবী ধ্বংসের কতটা কাছাকাছি-তা বোঝাতে বিজ্ঞানীরা ‘ডুমসডে ক্লক’ বা ‘মহাপ্রলয়ের ঘড়ি’ ব্যবহার করেন। এটি কোনো বাস্তব ঘড়ি নয়, বরং মানবসভ্যতার জন্য একটি প্রতীকী সতর্কবার্তা। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও জলবায়ু সংকটের ভয়াবহতা বিবেচনায় বিজ্ঞানীরা এই ঘড়ির কাঁটাকে মধ্যরাতের আরও কাছে নিয়ে এসেছেন।
বর্তমানে ডুমসডে ক্লক মধ্যরাত থেকে মাত্র ৯০ সেকেন্ড দূরে অবস্থান করছে-যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন সময়। এর অর্থ, মানবসভ্যতা আজ এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সামান্য ভুল সিদ্ধান্তই ডেকে আনতে পারে অপূরণীয় বিপর্যয়। এই ৯০ সেকেন্ড আসলে একটি বৈশ্বিক অ্যালার্ম, যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে-সময় প্রায় শেষ।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঘনঘন ও বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে। অসময়ে বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ এবং শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আজ নিত্যনৈমিত্তিক বাস্তবতা। বনাঞ্চলে দাবানল সৃষ্টি হয়ে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা ও অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।
অন্যদিকে, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ও অম্লতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র। বিশেষ করে প্রবাল প্রাচীরগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রকৃতি যেন মানুষের অবহেলার বিরুদ্ধে নীরব অথচ ভয়ংকর প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন কোনো একক দেশের সমস্যা নয়-এটি সমগ্র বিশ্বের অভিন্ন সংকট। তবে এই সংকট মোকাবিলার পথ শুরু হয় ব্যক্তিগত সচেতনতা থেকেই। বেশি করে গাছ লাগানো, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির প্রসার এবং টেকসই জীবনযাত্রা গড়ে তোলাই হতে পারে এই লড়াইয়ের প্রথম ধাপ।
আমরা যদি এখনই আমাদের ভোগবাদী জীবনধারায় পরিবর্তন না আনি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাব একটি মৃতপ্রায় ও বসবাসের অযোগ্য পৃথিবী।
সময় আমাদের সামনে শেষ সুযোগ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ডুমসডে ক্লকের সেই ৯০ সেকেন্ড আসলে আমাদের জন্য এক চূড়ান্ত সতর্কসংকেত। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে নয়, বরং প্রকৃতির সহাবস্থানের মাধ্যমেই মানবসভ্যতার টিকে থাকা সম্ভব। পৃথিবী বাঁচলে তবেই বাঁচবে মানুষ।
আজ আমরা যদি সচেতন না হই, তবে হয়তো আগামী দিনের সূর্য আমাদের জন্য আর কোনো আশার আলো নিয়ে উঠবে না।
মেহরীন মালিহা
শিক্ষার্থী, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়