alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

বস্তিবাসী নারী : অদৃশ্য শক্তির আখ্যান

মতিউর রহমান

: শনিবার, ৩১ মে ২০২৫

ঢাকার জনবহুল বস্তিগুলোর আঁকাবাঁকা, ঘিঞ্জি গলিগুলো শুধু দারিদ্র্য আর দুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি নয়, বরং প্রতিদিন সেখানে চলে এক অলিখিত যুদ্ধÑক্ষমতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার সংগ্রাম। বস্তির নারীরা, যারা মূলত গৃহকর্মী, পোশাক শ্রমিক অথবা অনানুষ্ঠানিক খাতের বিক্রেতা, তারা অর্থনৈতিক বঞ্চনা, সামাজিক অবহেলা এবং পুরুষতান্ত্রিক শাসনের শিকার। কিন্তু তারা নিছকই নিষ্ক্রিয় ভুক্তভোগী নন। বরং জেমস সি. স্কটের “প্রতিদিনের প্রতিরোধ” তত্ত্ব এবং নারীবাদী নগর-তত্ত্বের আলোকে আমরা দেখতে পাই, কীভাবে এই নারীরা সূক্ষ্ম এবং অনুল্লিখিত কৌশলের মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনে ক্ষমতা ও প্রভাবের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেন। তাদের এই নীরব প্রতিরোধ ঢাকার সামাজিক ও নাগরিক জীবনে এক গভীর পরিবর্তন আনছে।

জেমস সি. স্কট তার “প্রতিদিনের প্রতিরোধ” তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংঘাত ছাড়াও অধীনস্থ শ্রেণী কীভাবে ছোট ছোট কার্যকলাপের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই প্রতিরোধগুলো অনেক সময় ধীরগতি, ছলনা, নীরব অবাধ্যতা, গুজব ছড়ানো অথবা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার মতো রূপ নেয়। ঢাকার বস্তির নারীদের প্রতিরোধগুলোও এমনই সূক্ষ্ম, কিন্তু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। তারা সরাসরি প্রতিবাদ না করেও নিজেদের অধিকার আদায় করেন। অন্যদিকে, নারীবাদী নগর-তত্ত্ব আমাদের বোঝায় যে, নগরের পরিকল্পনা ও সামাজিক পরিকাঠামো কীভাবে পুরুষ-প্রধান এবং নারী-বিরুদ্ধ হয়ে উঠেছে। এই দুটি তত্ত্বের সমন্বয়ে আমরা বুঝতে পারি, কীভাবে দরিদ্র নারীরা প্রতিদিন নতুন করে নিজেদের জন্য জায়গা তৈরি করছেন, শহরের বুকেও নিজেদের অস্তিত্বকে জানান দিচ্ছেন।

বসবাসের জায়গা বা ভাড়াবাড়ি বস্তির নারীদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষেত্র। প্রতি মাসে ভাড়া জোগানো তাদের জন্য এক বিশাল চাপ। বেতন অনিয়মিত বা অপ্রতুল হলেও বাড়িওয়ালা নিয়মিত ভাড়া চান। এই পরিস্থিতিতে নারীরা গোপনে নানা কৌশলে দর কষাকষি করেনÑভাড়ার একাংশ দিয়ে বাকিটা পরে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, ধর্মীয় উৎসব বা পারিবারিক দুর্দশার দোহাই দেন, অথবা বাড়িওয়ালার পরিবারের সঙ্গে সহানুভূতির সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এটি এক ধরনের কৌশলী প্রতিরোধ, যেখানে তারা সরাসরি সংঘাতে না গিয়েও নিজের ও পরিবারের অধিকার রক্ষা করেন। অনেক সময় দেখা যায়, একজন নারী অন্য নারীর পক্ষে কথা বলছেন অথবা দলবদ্ধভাবে বাড়িওয়ালার কাছে নিজেদের সমস্যা তুলে ধরছেন, যা এক অদৃশ্য সংহতি তৈরি করে।

পারিবারিক সহিংসতা ঢাকার বস্তিগুলোতে এক করুণ বাস্তবতা। মদ্যপান, বেকারত্ব এবং সামাজিক বৈষম্য এর পেছনে বড় কারণ। কিন্তু নারীরা অনেক সময় এই অবস্থার বিরুদ্ধে নিজেদের মতো করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কখনও প্রতিবেশী নারীদের নিয়ে গোপন জোট তৈরি করেন, কখনওবা কিছু টাকা গোপনে জমিয়ে রাখেন, আবার কখনও নীরবতা বজায় রেখে অপমানের প্রতিবাদ করেন। অনেক সময় ঘরোয়া আলাপচারিতা, ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা তুলে ধরা অথবা সন্তানদের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখিয়ে স্বামীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। এই কৌশলগুলো নিছকই পারিবারিক কলহ নয়, বরং ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধে নারীদের নীরব প্রতিবাদ। তারা একে অপরের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন এবং প্রয়োজনে একে অপরের পাশে দাঁড়ান, যা তাদের প্রতিরোধের শক্তিকে বাড়িয়ে তোলে।

অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারÑযেমন গার্মেন্টস, হোটেল বা ঘরোয়া পরিষেবা খাতÑঢাকার বস্তির নারীদের প্রধান জীবিকা। এসব জায়গায় অধিকাংশ সময়ই নেই কোনো সুরক্ষা বা অধিকার। কিন্তু এখানেও তারা প্রতিরোধ করেন। ধীরে কাজ করা, বারবার টয়লেট ব্যবহার করা, অথবা একে অন্যের সঙ্গে কাজের জায়গা নিয়ে অভিজ্ঞতা শেয়ার করার মাধ্যমে তারা নিজেদের অধিকারের প্রতি এক অদৃশ্য প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তারা নিজেদের এক অদৃশ্য প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেনÑএটি কখনও সহকর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক, কখনও বাজারে যৌথভাবে পণ্য বিক্রি, অথবা কখনও দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ বা স্থানীয় নেতার সঙ্গে দর কষাকষি। তাদের এই নীরব প্রতিরোধ শোষণমূলক শ্রমকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে।

বস্তির জনপরিসর নারীদের জন্য প্রায়শই অনিরাপদ, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর। অথচ নারীরা এই জনপরিসরকে কৌশলে দখল করেন। অনেকেই খুব সকালে উঠে টিউবওয়েলের পানি সংগ্রহ করেন, অন্য নারীদের সঙ্গে একত্রে মিলিত হয়ে রান্না করেন, সন্তানদের পড়ানো বা সামাজিক আড্ডায় অংশ নেন। এভাবে তারা নগরের পুরুষতান্ত্রিক বিন্যাসকে প্রতিদিন একটু একটু করে চ্যালেঞ্জ জানান। এই স্থানগুলো তাদের জন্য কেবল নিত্যদিনের কাজ করার জায়গা নয়, বরং পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সংহতি গড়ে তোলার ক্ষেত্র, যা তাদের আত্মবিশ্বাস ও ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে।

বস্তির ভেতরেই গড়ে উঠেছে নারীকেন্দ্রিক অপ্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কÑযেমন ক্ষুদ্রঋণ সঞ্চয় দল, শিশু দেখাশোনার বিনিময় ব্যবস্থা, অথবা খাবার ভাগাভাগি। এগুলো একদিকে যেমন টিকে থাকার হাতিয়ার, তেমনি নারীদের মাঝে পারস্পরিক আস্থা ও শক্তি গড়ে তোলে। এই ব্যবস্থাগুলো যতটা না চ্যারিটি, তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক। এগুলো রাষ্ট্র বা বাজারের দখল ছাড়াই নারীদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা পরিসর। এই নেটওয়ার্কগুলো তাদের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সক্ষমতা বাড়ায়, যা তাদের প্রতিদিনের প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ধর্মের ভূমিকাও বস্তির নারীদের জীবনে জটিল। এটি যেমন কখনও নিপীড়নের হাতিয়ার, আবার কখনও সুরক্ষার ঢাল। অনেক নারী ধর্মীয় অনুশাসনের সাহায্যে স্বামী বা পাড়া-প্রতিবেশীর ওপর নৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন। কখনও মসজিদের মহিলাদের দল বা ধর্মীয় উৎসব নারীদের একত্রিত হওয়ার নিরাপদ পরিসর তৈরি করে। ধর্মীয় মূল্যবোধকে তারা নারীবাদী ব্যাখ্যায় ব্যবহার করে সাম্য ও মর্যাদার দাবি তোলেন। ধর্ম তাদের জন্য শুধু আধ্যাত্মিক আশ্রয় নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার।

মাতৃত্ব, যা অনেক সময় বস্তির নারীদের জন্য বোঝা হিসেবে চিত্রিত হয়, তা-ও এক রাজনৈতিক কৌশল হয়ে ওঠে। সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করানো, পড়ার খরচ চালানো, শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনাÑএসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তারা ভবিষ্যতের এক ভিন্ন দুনিয়ার স্বপ্ন দেখেন। এটি নিছক আত্মত্যাগ নয়; বরং বঞ্চনার পুনরুৎপাদন রোধে এক সচেতন পদক্ষেপ। মায়েরা তাদের সন্তানদের মাধ্যমে সমাজে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করেন এবং নতুন প্রজন্মের জন্য আরও ভালো ভবিষ্যতের পথ তৈরি করেন।

রাষ্ট্রের সঙ্গে বস্তির নারীদের সম্পর্ক দ্বৈতÑকখনও উপকারভোগী, কখনও নিপীড়িত। কেউ কেউ সরকারের কোনো প্রকল্প থেকে সুবিধা পেতে কৌশলে চুপ থাকেন, কেউ আবার স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যস্থতায় নাম লেখান কোনো ভাতার তালিকায়। কখনও দলীয় রাজনীতির প্রতিশ্রুতি ব্যবহার করে বা স্থানীয় নেতার কাছে নিজের সমস্যা নিয়ে যান। জেমস সি. স্কট যাকে “হিডেন ট্রান্সক্রিপ্ট” বা ‘চাপা কথোপকথন’ বলেন, এই কথোপকথনগুলো প্রত্যক্ষ বিরোধিতা না হলেও গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে নারীরা রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষমতা কাঠামোকে এক নীরব বার্তা দেন।

তবে এই প্রতিরোধ সবসময় র‌্যাডিক্যাল বা বিপ্লবাত্মক নয়। অনেক সময় নারী নিজের মধ্যেই পিতৃতন্ত্রের ধারণা বহন করেন, আবার অনানুষ্ঠানিক প্রথা মেনে চলেন যা বঞ্চনার ধারক। কেউ কেউ দলিত বা সংখ্যালঘু প্রতিবেশীদের দূরে ঠেলে রাখেন, অথবা অন্য নারীর প্রতি সহানুভূতিহীন থাকেন। কিন্তু এই দ্বৈততা আমাদের দেখায়, প্রতিরোধ কেমন জটিল, পরস্পরবিরোধী এবং প্রসঙ্গনির্ভর। এটি কোনো সরলরৈখিক প্রক্রিয়া নয়, বরং নিরন্তর পরিবর্তনশীল।

তবুও এই প্রতিদিনের কৌশলগুলোর সম্মিলিত প্রভাব বিশাল। দিনের পর দিন এই ক্ষুদ্র প্রতিরোধ সমাজের শক্ত কাঠামোকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। বস্তি হয়ে ওঠে এক জীবন্ত রাজনৈতিক প্রান্তরÑযেখানে ক্ষমতা একচেটিয়া নয়, এবং অধীনতা কখনোই স্থায়ী নয়। এখানকার নারীদের প্রতিদিনের সংগ্রাম আমাদের চোখে আনে এক অন্যরকম বাস্তবতাÑযেখানে আন্দোলন হয় চুপচাপ, বিদ্রোহ হয় রান্নার হাঁড়িতে, পানির লাইনে, শিশুকে স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়ে।

ঢাকার বস্তিতে নারীদের প্রতিদিনের জীবন যে রাজনীতিতে ভরপুর, তা আমরা বুঝতে পারি কেবল তখনই, যখন আমরা খুঁটিয়ে দেখি সেই অনুল্লিখিত সংগ্রামকে। স্কটের ‘প্রতিদিনের প্রতিরোধ’ এবং নারীবাদী নগর-তত্ত্বের আলোকে আমরা দেখতে পাইÑকীভাবে এই নারীরা নিছক টিকে থাকার তাগিদে নয়, বরং সামাজিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসে অবদান রাখছেন। এ এক নিঃশব্দ, ধৈর্যশীল কিন্তু দৃঢ় প্রতিরোধ, যা চিৎকার করে নয় বরং নীরবতার মধ্যেই বিপ্লবের বীজ বপন করে। ঢাকার এই অদৃশ্য বীর নারীরাই শহরের নীরব পরিবর্তনের প্রকৃত স্থপতি।

[লেখক : গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

মহাকাশ অর্থনীতি

কুষ্ঠ : নতুন সরকার ও একটি জাতীয় বিষয়ে প্রত্যাশা

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

ভাষার রাজনীতি এবং রাজনীতির ভাষা

ছবি

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী

ছবি

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতের আহ্বান

কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খলে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

ছবি

নির্বাচনে জোট, নাকি সরকারে

রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার

মানুষ কি বদলেছে, নাকি শুধু রং বদলিয়েছে?

সময় জীবনে চলার পথ দেখিয়ে দেয়

কালো ও সবুজ চা : জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব

বাঙালিরা ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়

অন্তর্বর্তী সরকার জাতিকে কী দিল

ভালোবাসা, সচেতনতা ও জনস্বাস্থ্য বাস্তবতা

ভালোবাসার দিনে সুন্দরবন: উদযাপনের আড়ালে অস্তিত্বের সংকট

ছবি

তিরাশির সেই দিন

অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ নিতে হবে নতুন সরকারকে

সবুজ অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ: সম্ভাবনা, সংকট ও করণীয়

গণতন্ত্র: একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা

‘ভোট দিছি ভাই, ছিল দিছি...’

নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

ক্ষমতার অক্টোপাস: রাষ্ট্র দখল ও আমজনতার নাভিশ্বাস

কার হাতে উঠবে শাসনের রাজদণ্ড

নির্বাচন ও সাধারণ ভোটারের ‘অসাধারণ’ সামাজিক চাপ

মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক

মহাকাশের ভূত ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

নির্বাচনী হাওয়ার ভেতরে করুণ মৃত্যুর সংবাদ

দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে!

দক্ষিণপন্থার রাজনীতি: অগ্রগতি নাকি অবনমন?

সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ

ছবি

নির্বাচনের স্বপ্ন ও স্বপ্নের নির্বাচন

সরিষার চাষে সমৃদ্ধি ও ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা

জমি কেনার আইনি অধিকার ও বাস্তবতা

‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে জামায়াত

‘মাউশি’ বিভাজন : শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার, না অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি?

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

বস্তিবাসী নারী : অদৃশ্য শক্তির আখ্যান

মতিউর রহমান

শনিবার, ৩১ মে ২০২৫

ঢাকার জনবহুল বস্তিগুলোর আঁকাবাঁকা, ঘিঞ্জি গলিগুলো শুধু দারিদ্র্য আর দুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি নয়, বরং প্রতিদিন সেখানে চলে এক অলিখিত যুদ্ধÑক্ষমতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার সংগ্রাম। বস্তির নারীরা, যারা মূলত গৃহকর্মী, পোশাক শ্রমিক অথবা অনানুষ্ঠানিক খাতের বিক্রেতা, তারা অর্থনৈতিক বঞ্চনা, সামাজিক অবহেলা এবং পুরুষতান্ত্রিক শাসনের শিকার। কিন্তু তারা নিছকই নিষ্ক্রিয় ভুক্তভোগী নন। বরং জেমস সি. স্কটের “প্রতিদিনের প্রতিরোধ” তত্ত্ব এবং নারীবাদী নগর-তত্ত্বের আলোকে আমরা দেখতে পাই, কীভাবে এই নারীরা সূক্ষ্ম এবং অনুল্লিখিত কৌশলের মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনে ক্ষমতা ও প্রভাবের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেন। তাদের এই নীরব প্রতিরোধ ঢাকার সামাজিক ও নাগরিক জীবনে এক গভীর পরিবর্তন আনছে।

জেমস সি. স্কট তার “প্রতিদিনের প্রতিরোধ” তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংঘাত ছাড়াও অধীনস্থ শ্রেণী কীভাবে ছোট ছোট কার্যকলাপের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই প্রতিরোধগুলো অনেক সময় ধীরগতি, ছলনা, নীরব অবাধ্যতা, গুজব ছড়ানো অথবা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার মতো রূপ নেয়। ঢাকার বস্তির নারীদের প্রতিরোধগুলোও এমনই সূক্ষ্ম, কিন্তু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। তারা সরাসরি প্রতিবাদ না করেও নিজেদের অধিকার আদায় করেন। অন্যদিকে, নারীবাদী নগর-তত্ত্ব আমাদের বোঝায় যে, নগরের পরিকল্পনা ও সামাজিক পরিকাঠামো কীভাবে পুরুষ-প্রধান এবং নারী-বিরুদ্ধ হয়ে উঠেছে। এই দুটি তত্ত্বের সমন্বয়ে আমরা বুঝতে পারি, কীভাবে দরিদ্র নারীরা প্রতিদিন নতুন করে নিজেদের জন্য জায়গা তৈরি করছেন, শহরের বুকেও নিজেদের অস্তিত্বকে জানান দিচ্ছেন।

বসবাসের জায়গা বা ভাড়াবাড়ি বস্তির নারীদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষেত্র। প্রতি মাসে ভাড়া জোগানো তাদের জন্য এক বিশাল চাপ। বেতন অনিয়মিত বা অপ্রতুল হলেও বাড়িওয়ালা নিয়মিত ভাড়া চান। এই পরিস্থিতিতে নারীরা গোপনে নানা কৌশলে দর কষাকষি করেনÑভাড়ার একাংশ দিয়ে বাকিটা পরে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, ধর্মীয় উৎসব বা পারিবারিক দুর্দশার দোহাই দেন, অথবা বাড়িওয়ালার পরিবারের সঙ্গে সহানুভূতির সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এটি এক ধরনের কৌশলী প্রতিরোধ, যেখানে তারা সরাসরি সংঘাতে না গিয়েও নিজের ও পরিবারের অধিকার রক্ষা করেন। অনেক সময় দেখা যায়, একজন নারী অন্য নারীর পক্ষে কথা বলছেন অথবা দলবদ্ধভাবে বাড়িওয়ালার কাছে নিজেদের সমস্যা তুলে ধরছেন, যা এক অদৃশ্য সংহতি তৈরি করে।

পারিবারিক সহিংসতা ঢাকার বস্তিগুলোতে এক করুণ বাস্তবতা। মদ্যপান, বেকারত্ব এবং সামাজিক বৈষম্য এর পেছনে বড় কারণ। কিন্তু নারীরা অনেক সময় এই অবস্থার বিরুদ্ধে নিজেদের মতো করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কখনও প্রতিবেশী নারীদের নিয়ে গোপন জোট তৈরি করেন, কখনওবা কিছু টাকা গোপনে জমিয়ে রাখেন, আবার কখনও নীরবতা বজায় রেখে অপমানের প্রতিবাদ করেন। অনেক সময় ঘরোয়া আলাপচারিতা, ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা তুলে ধরা অথবা সন্তানদের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখিয়ে স্বামীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। এই কৌশলগুলো নিছকই পারিবারিক কলহ নয়, বরং ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধে নারীদের নীরব প্রতিবাদ। তারা একে অপরের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন এবং প্রয়োজনে একে অপরের পাশে দাঁড়ান, যা তাদের প্রতিরোধের শক্তিকে বাড়িয়ে তোলে।

অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারÑযেমন গার্মেন্টস, হোটেল বা ঘরোয়া পরিষেবা খাতÑঢাকার বস্তির নারীদের প্রধান জীবিকা। এসব জায়গায় অধিকাংশ সময়ই নেই কোনো সুরক্ষা বা অধিকার। কিন্তু এখানেও তারা প্রতিরোধ করেন। ধীরে কাজ করা, বারবার টয়লেট ব্যবহার করা, অথবা একে অন্যের সঙ্গে কাজের জায়গা নিয়ে অভিজ্ঞতা শেয়ার করার মাধ্যমে তারা নিজেদের অধিকারের প্রতি এক অদৃশ্য প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তারা নিজেদের এক অদৃশ্য প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেনÑএটি কখনও সহকর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক, কখনও বাজারে যৌথভাবে পণ্য বিক্রি, অথবা কখনও দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ বা স্থানীয় নেতার সঙ্গে দর কষাকষি। তাদের এই নীরব প্রতিরোধ শোষণমূলক শ্রমকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে।

বস্তির জনপরিসর নারীদের জন্য প্রায়শই অনিরাপদ, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর। অথচ নারীরা এই জনপরিসরকে কৌশলে দখল করেন। অনেকেই খুব সকালে উঠে টিউবওয়েলের পানি সংগ্রহ করেন, অন্য নারীদের সঙ্গে একত্রে মিলিত হয়ে রান্না করেন, সন্তানদের পড়ানো বা সামাজিক আড্ডায় অংশ নেন। এভাবে তারা নগরের পুরুষতান্ত্রিক বিন্যাসকে প্রতিদিন একটু একটু করে চ্যালেঞ্জ জানান। এই স্থানগুলো তাদের জন্য কেবল নিত্যদিনের কাজ করার জায়গা নয়, বরং পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সংহতি গড়ে তোলার ক্ষেত্র, যা তাদের আত্মবিশ্বাস ও ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে।

বস্তির ভেতরেই গড়ে উঠেছে নারীকেন্দ্রিক অপ্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কÑযেমন ক্ষুদ্রঋণ সঞ্চয় দল, শিশু দেখাশোনার বিনিময় ব্যবস্থা, অথবা খাবার ভাগাভাগি। এগুলো একদিকে যেমন টিকে থাকার হাতিয়ার, তেমনি নারীদের মাঝে পারস্পরিক আস্থা ও শক্তি গড়ে তোলে। এই ব্যবস্থাগুলো যতটা না চ্যারিটি, তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক। এগুলো রাষ্ট্র বা বাজারের দখল ছাড়াই নারীদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা পরিসর। এই নেটওয়ার্কগুলো তাদের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সক্ষমতা বাড়ায়, যা তাদের প্রতিদিনের প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ধর্মের ভূমিকাও বস্তির নারীদের জীবনে জটিল। এটি যেমন কখনও নিপীড়নের হাতিয়ার, আবার কখনও সুরক্ষার ঢাল। অনেক নারী ধর্মীয় অনুশাসনের সাহায্যে স্বামী বা পাড়া-প্রতিবেশীর ওপর নৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন। কখনও মসজিদের মহিলাদের দল বা ধর্মীয় উৎসব নারীদের একত্রিত হওয়ার নিরাপদ পরিসর তৈরি করে। ধর্মীয় মূল্যবোধকে তারা নারীবাদী ব্যাখ্যায় ব্যবহার করে সাম্য ও মর্যাদার দাবি তোলেন। ধর্ম তাদের জন্য শুধু আধ্যাত্মিক আশ্রয় নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার।

মাতৃত্ব, যা অনেক সময় বস্তির নারীদের জন্য বোঝা হিসেবে চিত্রিত হয়, তা-ও এক রাজনৈতিক কৌশল হয়ে ওঠে। সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করানো, পড়ার খরচ চালানো, শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনাÑএসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তারা ভবিষ্যতের এক ভিন্ন দুনিয়ার স্বপ্ন দেখেন। এটি নিছক আত্মত্যাগ নয়; বরং বঞ্চনার পুনরুৎপাদন রোধে এক সচেতন পদক্ষেপ। মায়েরা তাদের সন্তানদের মাধ্যমে সমাজে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করেন এবং নতুন প্রজন্মের জন্য আরও ভালো ভবিষ্যতের পথ তৈরি করেন।

রাষ্ট্রের সঙ্গে বস্তির নারীদের সম্পর্ক দ্বৈতÑকখনও উপকারভোগী, কখনও নিপীড়িত। কেউ কেউ সরকারের কোনো প্রকল্প থেকে সুবিধা পেতে কৌশলে চুপ থাকেন, কেউ আবার স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যস্থতায় নাম লেখান কোনো ভাতার তালিকায়। কখনও দলীয় রাজনীতির প্রতিশ্রুতি ব্যবহার করে বা স্থানীয় নেতার কাছে নিজের সমস্যা নিয়ে যান। জেমস সি. স্কট যাকে “হিডেন ট্রান্সক্রিপ্ট” বা ‘চাপা কথোপকথন’ বলেন, এই কথোপকথনগুলো প্রত্যক্ষ বিরোধিতা না হলেও গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে নারীরা রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষমতা কাঠামোকে এক নীরব বার্তা দেন।

তবে এই প্রতিরোধ সবসময় র‌্যাডিক্যাল বা বিপ্লবাত্মক নয়। অনেক সময় নারী নিজের মধ্যেই পিতৃতন্ত্রের ধারণা বহন করেন, আবার অনানুষ্ঠানিক প্রথা মেনে চলেন যা বঞ্চনার ধারক। কেউ কেউ দলিত বা সংখ্যালঘু প্রতিবেশীদের দূরে ঠেলে রাখেন, অথবা অন্য নারীর প্রতি সহানুভূতিহীন থাকেন। কিন্তু এই দ্বৈততা আমাদের দেখায়, প্রতিরোধ কেমন জটিল, পরস্পরবিরোধী এবং প্রসঙ্গনির্ভর। এটি কোনো সরলরৈখিক প্রক্রিয়া নয়, বরং নিরন্তর পরিবর্তনশীল।

তবুও এই প্রতিদিনের কৌশলগুলোর সম্মিলিত প্রভাব বিশাল। দিনের পর দিন এই ক্ষুদ্র প্রতিরোধ সমাজের শক্ত কাঠামোকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। বস্তি হয়ে ওঠে এক জীবন্ত রাজনৈতিক প্রান্তরÑযেখানে ক্ষমতা একচেটিয়া নয়, এবং অধীনতা কখনোই স্থায়ী নয়। এখানকার নারীদের প্রতিদিনের সংগ্রাম আমাদের চোখে আনে এক অন্যরকম বাস্তবতাÑযেখানে আন্দোলন হয় চুপচাপ, বিদ্রোহ হয় রান্নার হাঁড়িতে, পানির লাইনে, শিশুকে স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়ে।

ঢাকার বস্তিতে নারীদের প্রতিদিনের জীবন যে রাজনীতিতে ভরপুর, তা আমরা বুঝতে পারি কেবল তখনই, যখন আমরা খুঁটিয়ে দেখি সেই অনুল্লিখিত সংগ্রামকে। স্কটের ‘প্রতিদিনের প্রতিরোধ’ এবং নারীবাদী নগর-তত্ত্বের আলোকে আমরা দেখতে পাইÑকীভাবে এই নারীরা নিছক টিকে থাকার তাগিদে নয়, বরং সামাজিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসে অবদান রাখছেন। এ এক নিঃশব্দ, ধৈর্যশীল কিন্তু দৃঢ় প্রতিরোধ, যা চিৎকার করে নয় বরং নীরবতার মধ্যেই বিপ্লবের বীজ বপন করে। ঢাকার এই অদৃশ্য বীর নারীরাই শহরের নীরব পরিবর্তনের প্রকৃত স্থপতি।

[লেখক : গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

back to top