alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ঢাকার নদী ও খালের দখল-দূষণ: পুনরুদ্ধার কোন পথে

ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ

: বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫
image

ঢাকার অধিকাংশ খাল দখল, দূষণ ও বর্জ্য জমার কারণে ভরাট হওয়ায় অবশিষ্ট খালগুলোরও প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়

ঢাকার চারপাশে থাকা নদীগুলো হচ্ছে- তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা। এই নদীগুলো একসময় শহরের পানির প্রধান উৎস ছিল এবং বন্যা ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। তাছাড়া ঢাকার ভিতরে ছিল প্রায় ৫৪টিরও বেশি খাল, যা শহরের পানির চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতো । কিন্তু বর্তমানে ঢাকার অধিকাংশ খাল দখল, দূষণ ও বর্জ্য জমার কারণে ভরাট হওয়ায় অবশিষ্ট খালগুলোরও প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সেগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। খাল ও নদীগুলোতে প্লাস্টিক, পলিথিন, শিল্পবর্জ্য, এবং গৃহস্থালি আবর্জনার পাশাপাশি কঠোর দখল এই পরিবেশের অবনতি ঘটিয়েছে। এর ফলে বর্ষাকালে পানিবদ্ধতা বৃদ্ধি পায় এবং নগরবাসী প্রবল সমস্যার মুখোমুখি হয়। নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রতিবেশ হারানোর ফলে বর্ষার সময় পানি নিষ্কাশনের ব্যর্থতা দৃশ্যমান। নদী-খালগুলোর উপরিভাগের পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি গভীরতর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন কমছে, যা পানির অভাবে সংকট সৃষ্টি করছে। নদী-খাল দখল এবং বর্জ্য দূষণ ঢাকার পরিবেশগত সংকটের মূল চ্যালেঞ্জ। দখলদারিত্ব এবং অব্যবস্থাপনার কারণে নদী ও খালগুলোর প্রাকৃতিক অবস্থা হারিয়ে যাচ্ছে। বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থার অভাবে অগণিত বর্জ্য সরাসরি নদী-খালে ফেলা হয়, যা পানির গুণগত মান কমায় এবং জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট করে।

ঢাকার সঙ্গে যে নদীটির নাম জড়িয়ে আছে, তা বুড়িগঙ্গা। এই শহর ও নদীটির অধঃপতন যেন পাল্লা দিয়ে চলছে। বিশ্বে বসবাসের সবচেয়ে অনুপযুক্ত কয়েকটি শহরের মধ্যে আছে ঢাকা, আর বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকার নদী বুড়িগঙ্গা। টেক্সটাইলস কারখানা থেকে শুরু করে সব ধরনের কলকারখানার বর্জ্য, গৃহস্থালির বর্জ্য, পঁচা ফলমূল থেকে শুরু করে শাকসবজি, হাসপাতালের বর্জ্য, সুয়ারেজের বর্জ্য, মরা প্রাণী, প্লাস্টিকের বর্জ্য ও পেট্রোলিয়াম-কোনো কিছুই বাদ নেই। প্রতিদিন বুড়িগঙ্গায় ৪ হাজার ৫০০ টন বর্জ্য এসে পড়ে। নদীতে সুয়ারেজের যে বর্জ্য ফেলা হয়, তার ৮০ শতাংশই কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়া বুড়িগঙ্গায় মেশে। বুড়িগঙ্গা কেন বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর একটি, তা আমাদের কাছে পরিষ্কার। আমরা যদি বুড়িগঙ্গাকে ভাগাড় বানাই, তবে তা-ই তো হওয়ার কথা। পাঁচ বছর আগের তুলনায় বুড়িগঙ্গায় দূষণের মাত্রা যেহেতু বেড়েছে, ফলে বুঝতে হবে যে এই সময়ে দূষণ দূর করার যেসব উদ্যোগ ও কথাবার্তা আমরা শুনেছি, তা কাজে দেয়নি। বরং বুড়িগঙ্গায় বর্জ্য ফেলার পরিমাণ দিনে দিনে বেড়েছে। ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, নদী রক্ষা করা ও দূষণমুক্ত করা সেসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার দায়িত্ব, তাদের বিরুদ্ধেই নদীদূষণের অভিযোগ রয়েছে। ওয়াসা বা সিটি করপোরেশনের ময়লা যদি নদীতে গিয়ে পড়ে, তবে নদী রক্ষা পাবে কীভাবে? ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোর নদীতে যেসব কলকারখানার বর্জ্য মেলে, সেগুলোতে আইন অনুযায়ী পরিশোধনযন্ত্র বা ইটিপি থাকার কথা। কিছু কারাখানায় তা বসানো হলেও সব সময়ে তা চালু থাকে না। এসব দেখার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট বিভাগের। সেই কাজটি যথাযথভাবে পলিত হলে বুড়িগঙ্গার দশা দিনে দিনে খারাপ হতো না।

রাজধানীর যেসব নদী ও খাল দূষিত হচ্ছে, সেগুলো হলো বুড়িগঙ্গা নদী, তুরাগ নদ, বালু নদ, রামপুরা খাল, কল্যাণপুর খাল, বেগুনবাড়ী খাল, ভাটারা খাল, হাজারীবাগ খাল, রামচন্দ্রপুর খাল, বাড্ডা খাল, আদি বুড়িগঙ্গা ও রূপনগর খাল। নদী রক্ষা কমিশনের পক্ষ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে ঢাকা জেলার নদনদী, খালবিল দূষণকারীদের তালিকা চাওয়া হয় ২০২১ সালের নভেম্বর। এক মাস পর পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকার খাল ও নদনদী দূষণকারীদের তালিকা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে প্রাথমিকভাবে দূষণের ২৮০টি উৎস চিহ্নিত করা হয়। সেখানে দেখা যায়, শিল্পবর্জ্যের পাশাপাশি রাজধানীর হাসপাতালের তরল বর্জ্যও পড়ছে খাল ও নদীতে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত ২৮০টি উৎস মধ্যে ২২০টিই ছিল হাসপাতাল। নদী দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, কারখানাগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই টেক্সটাইল ডাইং এবং প্রিন্টিং, ওয়াশিং, মেটাল, আইসক্রিম কারখানা। এছাড়া রয়েছে ওষুধ উৎপাদন কারখানা, সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, বেসরকারি ডায়াগনিস্টিক সেন্টার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোয় ইটিপি নেই বললেই চলে। পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারি হাসপাতালে ইটিপি বা ছাড়পত্র নেওয়ার বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে কঠোর অনুশাসন প্রতিপালন করা হয় না। মূলত হাসপাতাল বিবেচনায় এ বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একসময় রাজধানীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বেশ কয়েকটি বড় নদী। অপরিকল্পিত নগরায়ণে হারিয়ে গেছে অনেক খাল ও উল্লেখযোগ্য নদনদী। এক্ষেত্রে হাসপাতাল হোক বা কারখানা নদীদূষণের ক্ষেত্রে যাদেরই নাম আসে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

পরিবেশের সব ধরণের দূষণ যেন জীবনযাপনের নিত্যদিনের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। ঢাকাবাসীর জীবনে দূষণকে সাধারণ সংস্কৃতির অংশ বললেও অত্যুক্তি হবে না! নীতিনির্ধারক থেকে সাধারণ নগরবাসী দূষণ নিয়ে যেন কারোরই কোনো বিকার নেই। ঢাকাকে ব্যবহার করে সবাই যেন নিজেদের আখের গোছাতে চায়, কিন্তু শহরটার বাসযোগ্যতার কথা কেউ ভাবে না! বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, নদী-খাল দূষণ, প্লাস্টিক-পলিথিন দূষণ, পানিদূষণ, বর্জ্যদূষণ, জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন পরিবেশগত সমস্যায় জর্জরিত রাজধানী ঢাকা শহর। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যার দখল-দূষণরোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও দখল-দূষণ থেমে নেই। নদ-নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রকৃতি-প্রতিবেশ ব্যবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। শহরের অভ্যন্তরের খালগুলোও দখল- দখলের হাত থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না। একসময় ঢাকা শহরের মধ্যে ৫৪টিরও বেশি খাল ছিল। অধিকাংশ খাল দখল ও বর্জ্য-আবর্জনায় ভরাট হয়ে হারিয়ে গেছে। এখন কোনো রকমে ২৩টির মতো খালের অস্তিত্ব আছে। এগুলোও ব্যাপক দখল ও দূষণে জর্জরিত। খালগুলোর সাথে আশপাশের নদ-নদীর সংযোগ কাটা পড়ার কারণে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় নাকাল হতে হয় নগরবাসীকে। ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন নিচে চলে যাচ্ছে। তাই আগামী দিনগুলোতে নদ-নদীর উপরিভাগের পানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে বলে ধরে নেওয়া যায়। তাই ঢাকার আশপাশের নদ-নদীগুলো দূষণ ও দখলমুক্ত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

শিল্পকারখানার বর্জ্য, পলিথিন ও মানববর্জ্যরে দূষণে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার আশপাশের অন্যান্য নদ-নদীর পানি কালো হয়ে গেছে। তাই নদী-খাল রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে। পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার ‘নিষিদ্ধ’ করা হলেও এর জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি। অবশ্য পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের ও কাগজের ব্যাগ সহজলভ্য না করার কারণে পলিথিন দূষণ থামছে না! সহজে ব্যবহারযোগ্য ও ক্রেতার জন্য বিনা ফিতে পাওয়া পলিথিন পরিবেশের অন্যতম প্রধান শত্রু। অপচনশীল এই পলিথিন ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার ক্ষতিসহ সার্বিক পরিবেশ ব্যবস্থার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনি এমনি এই পলিথিন দূষণ বন্ধ হবে বলে মনে হয় না। পলিথিন উৎপাদন ও বিপণনকারীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিক অভিযান চলমান রাখতে হবে। পাশাপাশি জনসাধারণ পর্যায়ে পলিথিনের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। ঢাকার বাজার ও সব ধরনের দোকানে বিক্রেতা পর্যায়ে অভিযান চালাতে হবে। এ ছাড়া সারা দেশব্যাপী বাজার ও দোকানগুলোতেও অভিযান চলমান রাখতে হবে। মনে রাখা দরকার, বিক্রেতারা যদি পলিথিনে পণ্য ও মালামাল না দেয় তাহলে ক্রেতাদেরও কাছে পলিথিন কখনো পৌঁছাবে না। পাশাপাশি পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ জনপ্রিয় করতে শুরুর দিকে এর ওপর ব্যাপক ভর্তুকি দিতে হবে। পাটের ব্যাগ সহজলভ্য ও চাহিদা অনুযায়ী জোগান দেওয়া সম্ভব হলে রুগ্ন পাটশিল্প বাঁচবে, পরিবেশও রক্ষা পাবে।

বিশে^র অন্যতম বায়ুদূষণের শহর মেগাসিটি ঢাকা। বিশ^ব্যাংকের সম্প্রতি এক তথ্য মতে, বাংলাদেশে বায়ু, পানি ও পরিবেশ দূষণের কারণে বছরে ক্ষতি হয় প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা। আধুনিক ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে না তোলার ফলে ময়লা-আবর্জনা রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। ঢাকা শহরে সড়কের সাথেই গড়ে উঠেছে ময়লা-আবর্জনা রাখার স্থান বা ‘সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন’ (এসটিএস)। ফলে চলতে-ফিরতে বর্জ্য দূষণের শিকার হতে হচ্ছে নগরবাসীকে। সব ধরনের বর্জ্য একসাথে সংগ্রহ না করে আলাদা আলাদা করে সংগ্রহ করা হলে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, আঠা, সার ও অন্যান্য বিকল্প অনেক কিছু তৈরি করা সম্ভব। এ শহরটাকে পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত করে গড়ে তোলার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ সবার। ইপিএ-এর প্রতিবেদন অনুসারে, পরিবেশ দূষণ রোধে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৭৯তম। প্রতিবছর ঘটা করে পরিবেশ দিবস পালন করা হয়, পরিবেশ নিয়ে কত-শত আলোচনা ও উদ্যোগের কথা শোনা যায়। প্রশ্ন হলো, আসলে কি পরিবেশ দূষণ কমছে, পরিবেশ রক্ষা হচ্ছে? এভাবে দিনের পর দিন পরিবেশ দূষণ করতে করতে আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদেরই খুন করছি না তো? পরিবেশ ধ্বংস করতে করতে এমন একটা সময় আসবে যখন থাকবে শুধু অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দূষণ আর রোগগ্রস্ত জীবন। তখন কোনো কিছুর বিনিময়ে সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা ও সুস্থ জীবনযাপন করা সম্ভব হবে না!

নদী-খাল মানেই শুধু জল এমনটা নয়- তা হলো নগর জীবনের রক্তপ্রবাহ। এগুলো যদি নষ্ট হয়, নগরের তাপমাত্রা বাড়বে, বন্যা ঝুঁকি বেড়ে যাবে, জলজজীবন ধসে যাবে, এবং নগরবাসীরা স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাছাড়া-জলপথের সৌন্দর্য ও সামাজিক ইতিহাসও হারাবে। একটি সুস্থ নদী একই সঙ্গে পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য বহন করে। এই সংকট কেবল প্রশাসন বা পরিবেশবিদের মধ্যে আটকে রাখা যায় না-এটি নাগরিক যোদ্ধারও দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, নাগরিক কমিটি ও সরকার একযোগে না হলে দিনের শেষে নদীগুলোই হারাবে। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে যে, আমরা সময় নষ্ট করছি। প্রতিটি বছর দেরি করা মানে পুনরুদ্ধারের খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি। এখনই পরিকল্পিত, নিয়মিত ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ দরকার। সংক্ষেপে, ঢাকার পরিবেশগত সমস্যা গুরুতর ও বহুমাত্রিক। নদী-খালগুলো নিস্তেজ হয়ে পড়েছে দূষণ ও দখলের কারণে। এছাড়া বায়ুদূষণ মারাত্মক পর্যায়ে, যা নগরে অপরিকল্পিত উন্নয়ন পরিবেশ বিপর্যয়ের দায়ী। সময়োপযোগী সমাধান গ্রহণ না করলে এই সমস্যা মানব জীবনের জন্য আরও ক্ষতিকর প্রমাণিত হবে।

মহানগর ঢাকাকে সাজাতে হলে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হবে। ঢাকার বিকাশ ও সভ্যতা বিনির্মাণে পরিবেশের ভূমিকাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এ লক্ষ্যে বুড়িগঙ্গার শাসন ও সংস্কার কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। অধিকন্তু পরিবেশের এ বিপর্যয় রোধ করার লক্ষ্যে পরিবেশ বান্ধব বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তবমুখী সফল কার্যক্রম গ্রহণ করে পরিবেশের প্রতি একটি ইতিবাচক মনোভাব তৈরী করতে হবে এবং পরিবেশ সুরক্ষার কাজকে একটি আন্দোলনে রূপান্তর করতে হবে। ঢাকা মাহানগরবাসীরা এক মহা আতঙ্কের মধ্যে পরে এক দূর্যোগময় ও দুঃসহ জীবন যাপনের শিকার হয়েছে। এই অবস্থা নিরসনকল্পে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণে মনযোগী হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সকল সরকারি-বেসরকারি, এনজিও সংস্থা ও প্রতিনিধিকে সমন্বিত কর্মসূচী প্রনয়নপূর্বক তার যথাযথ বাস্তবায়নে আন্তরিক হতে হবে।

[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

নিজের চেতনায় নিজেরই ঘা দেয়া জরুরি

ঋণ অবলোপনের প্রভাব

ভেজাল গুড়ের মরণফাঁদ: বাঙালির ঐতিহ্য, জনস্বাস্থ্য ও আস্থার নীরব বিপর্যয়

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস

জোটের ভোট নাকি ভোটের জোট, কৌশলটা কী?

প্রমাণ তো করতে হবে আমরা হাসিনার চেয়ে ভালো

ছবি

কৃষি ডেটা ব্যবস্থাপনা

যুক্তরাজ্যে ভর্তি স্থগিতের কুয়াশা: তালা লাগলেও চাবি আমাদের হাতে

শিক্ষকদের কর্মবিরতি: পেশাগত নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ

জাতীয় রক্তগ্রুপ নির্ণয় দিবস

জাল সনদপত্রে শিক্ষকতা

সাধারণ চুক্তিগুলোও গোপনীয় কেন

ছবি

শিশুখাদ্যের নিরাপত্তা: জাতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষার প্রথম শর্ত

ছবি

ফিনল্যান্ড কেন সুখী দেশ

ছবি

কৃষকের সংকট ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

আলু চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

ই-বর্জ্য: নীরব বিষে দগ্ধ আমাদের ভবিষ্যৎ

ঢাকার জনপরিসর: আর্ভিং গফম্যানের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

আলু চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

কলি ফুটিতে চাহে ফোটে না!

কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তি

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে লোকালাইজেশন অপরিহার্য

আইসিইউ থেকে বাড়ি ফেরা ও খাদের কিনারায় থাকা দেশ

বিচারবহির্ভূত হত্যার দায় কার?

ছবি

ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা কৌশল

অযৌক্তিক দাবি: পেশাগত নৈতিকতার সংকট ও জনপ্রশাসন

সড়ক দুর্ঘটনা এখন জাতীয় সংকট

কেন বাড়ছে দারিদ্র্য?

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্জন্ম

লবণাক্ততায় ডুবছে উপকূল

বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ও বাস্তবতা

সড়ক দুর্ঘটনার সমাজতত্ত্ব: আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা ও কাঠামোর চক্রাকার পুনরুৎপাদন

ছবি

অস্থির সময় ও অস্থির সমাজের পাঁচালি

ভারতে বামপন্থার পুনর্জাগরণ: ব্যাধি ও প্রতিকার

চিপনির্ভরতা কাটিয়ে চীনের উত্থান

একতার বাতাসে উড়ুক দক্ষিণ এশিয়ার পতাকা

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ঢাকার নদী ও খালের দখল-দূষণ: পুনরুদ্ধার কোন পথে

ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ

image

ঢাকার অধিকাংশ খাল দখল, দূষণ ও বর্জ্য জমার কারণে ভরাট হওয়ায় অবশিষ্ট খালগুলোরও প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়

বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫

ঢাকার চারপাশে থাকা নদীগুলো হচ্ছে- তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা। এই নদীগুলো একসময় শহরের পানির প্রধান উৎস ছিল এবং বন্যা ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। তাছাড়া ঢাকার ভিতরে ছিল প্রায় ৫৪টিরও বেশি খাল, যা শহরের পানির চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতো । কিন্তু বর্তমানে ঢাকার অধিকাংশ খাল দখল, দূষণ ও বর্জ্য জমার কারণে ভরাট হওয়ায় অবশিষ্ট খালগুলোরও প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সেগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। খাল ও নদীগুলোতে প্লাস্টিক, পলিথিন, শিল্পবর্জ্য, এবং গৃহস্থালি আবর্জনার পাশাপাশি কঠোর দখল এই পরিবেশের অবনতি ঘটিয়েছে। এর ফলে বর্ষাকালে পানিবদ্ধতা বৃদ্ধি পায় এবং নগরবাসী প্রবল সমস্যার মুখোমুখি হয়। নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রতিবেশ হারানোর ফলে বর্ষার সময় পানি নিষ্কাশনের ব্যর্থতা দৃশ্যমান। নদী-খালগুলোর উপরিভাগের পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি গভীরতর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন কমছে, যা পানির অভাবে সংকট সৃষ্টি করছে। নদী-খাল দখল এবং বর্জ্য দূষণ ঢাকার পরিবেশগত সংকটের মূল চ্যালেঞ্জ। দখলদারিত্ব এবং অব্যবস্থাপনার কারণে নদী ও খালগুলোর প্রাকৃতিক অবস্থা হারিয়ে যাচ্ছে। বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থার অভাবে অগণিত বর্জ্য সরাসরি নদী-খালে ফেলা হয়, যা পানির গুণগত মান কমায় এবং জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট করে।

ঢাকার সঙ্গে যে নদীটির নাম জড়িয়ে আছে, তা বুড়িগঙ্গা। এই শহর ও নদীটির অধঃপতন যেন পাল্লা দিয়ে চলছে। বিশ্বে বসবাসের সবচেয়ে অনুপযুক্ত কয়েকটি শহরের মধ্যে আছে ঢাকা, আর বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকার নদী বুড়িগঙ্গা। টেক্সটাইলস কারখানা থেকে শুরু করে সব ধরনের কলকারখানার বর্জ্য, গৃহস্থালির বর্জ্য, পঁচা ফলমূল থেকে শুরু করে শাকসবজি, হাসপাতালের বর্জ্য, সুয়ারেজের বর্জ্য, মরা প্রাণী, প্লাস্টিকের বর্জ্য ও পেট্রোলিয়াম-কোনো কিছুই বাদ নেই। প্রতিদিন বুড়িগঙ্গায় ৪ হাজার ৫০০ টন বর্জ্য এসে পড়ে। নদীতে সুয়ারেজের যে বর্জ্য ফেলা হয়, তার ৮০ শতাংশই কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়া বুড়িগঙ্গায় মেশে। বুড়িগঙ্গা কেন বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর একটি, তা আমাদের কাছে পরিষ্কার। আমরা যদি বুড়িগঙ্গাকে ভাগাড় বানাই, তবে তা-ই তো হওয়ার কথা। পাঁচ বছর আগের তুলনায় বুড়িগঙ্গায় দূষণের মাত্রা যেহেতু বেড়েছে, ফলে বুঝতে হবে যে এই সময়ে দূষণ দূর করার যেসব উদ্যোগ ও কথাবার্তা আমরা শুনেছি, তা কাজে দেয়নি। বরং বুড়িগঙ্গায় বর্জ্য ফেলার পরিমাণ দিনে দিনে বেড়েছে। ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, নদী রক্ষা করা ও দূষণমুক্ত করা সেসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার দায়িত্ব, তাদের বিরুদ্ধেই নদীদূষণের অভিযোগ রয়েছে। ওয়াসা বা সিটি করপোরেশনের ময়লা যদি নদীতে গিয়ে পড়ে, তবে নদী রক্ষা পাবে কীভাবে? ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোর নদীতে যেসব কলকারখানার বর্জ্য মেলে, সেগুলোতে আইন অনুযায়ী পরিশোধনযন্ত্র বা ইটিপি থাকার কথা। কিছু কারাখানায় তা বসানো হলেও সব সময়ে তা চালু থাকে না। এসব দেখার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট বিভাগের। সেই কাজটি যথাযথভাবে পলিত হলে বুড়িগঙ্গার দশা দিনে দিনে খারাপ হতো না।

রাজধানীর যেসব নদী ও খাল দূষিত হচ্ছে, সেগুলো হলো বুড়িগঙ্গা নদী, তুরাগ নদ, বালু নদ, রামপুরা খাল, কল্যাণপুর খাল, বেগুনবাড়ী খাল, ভাটারা খাল, হাজারীবাগ খাল, রামচন্দ্রপুর খাল, বাড্ডা খাল, আদি বুড়িগঙ্গা ও রূপনগর খাল। নদী রক্ষা কমিশনের পক্ষ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে ঢাকা জেলার নদনদী, খালবিল দূষণকারীদের তালিকা চাওয়া হয় ২০২১ সালের নভেম্বর। এক মাস পর পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকার খাল ও নদনদী দূষণকারীদের তালিকা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে প্রাথমিকভাবে দূষণের ২৮০টি উৎস চিহ্নিত করা হয়। সেখানে দেখা যায়, শিল্পবর্জ্যের পাশাপাশি রাজধানীর হাসপাতালের তরল বর্জ্যও পড়ছে খাল ও নদীতে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত ২৮০টি উৎস মধ্যে ২২০টিই ছিল হাসপাতাল। নদী দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, কারখানাগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই টেক্সটাইল ডাইং এবং প্রিন্টিং, ওয়াশিং, মেটাল, আইসক্রিম কারখানা। এছাড়া রয়েছে ওষুধ উৎপাদন কারখানা, সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, বেসরকারি ডায়াগনিস্টিক সেন্টার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোয় ইটিপি নেই বললেই চলে। পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারি হাসপাতালে ইটিপি বা ছাড়পত্র নেওয়ার বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে কঠোর অনুশাসন প্রতিপালন করা হয় না। মূলত হাসপাতাল বিবেচনায় এ বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একসময় রাজধানীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বেশ কয়েকটি বড় নদী। অপরিকল্পিত নগরায়ণে হারিয়ে গেছে অনেক খাল ও উল্লেখযোগ্য নদনদী। এক্ষেত্রে হাসপাতাল হোক বা কারখানা নদীদূষণের ক্ষেত্রে যাদেরই নাম আসে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

পরিবেশের সব ধরণের দূষণ যেন জীবনযাপনের নিত্যদিনের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। ঢাকাবাসীর জীবনে দূষণকে সাধারণ সংস্কৃতির অংশ বললেও অত্যুক্তি হবে না! নীতিনির্ধারক থেকে সাধারণ নগরবাসী দূষণ নিয়ে যেন কারোরই কোনো বিকার নেই। ঢাকাকে ব্যবহার করে সবাই যেন নিজেদের আখের গোছাতে চায়, কিন্তু শহরটার বাসযোগ্যতার কথা কেউ ভাবে না! বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, নদী-খাল দূষণ, প্লাস্টিক-পলিথিন দূষণ, পানিদূষণ, বর্জ্যদূষণ, জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন পরিবেশগত সমস্যায় জর্জরিত রাজধানী ঢাকা শহর। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যার দখল-দূষণরোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও দখল-দূষণ থেমে নেই। নদ-নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রকৃতি-প্রতিবেশ ব্যবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। শহরের অভ্যন্তরের খালগুলোও দখল- দখলের হাত থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না। একসময় ঢাকা শহরের মধ্যে ৫৪টিরও বেশি খাল ছিল। অধিকাংশ খাল দখল ও বর্জ্য-আবর্জনায় ভরাট হয়ে হারিয়ে গেছে। এখন কোনো রকমে ২৩টির মতো খালের অস্তিত্ব আছে। এগুলোও ব্যাপক দখল ও দূষণে জর্জরিত। খালগুলোর সাথে আশপাশের নদ-নদীর সংযোগ কাটা পড়ার কারণে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় নাকাল হতে হয় নগরবাসীকে। ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন নিচে চলে যাচ্ছে। তাই আগামী দিনগুলোতে নদ-নদীর উপরিভাগের পানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে বলে ধরে নেওয়া যায়। তাই ঢাকার আশপাশের নদ-নদীগুলো দূষণ ও দখলমুক্ত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

শিল্পকারখানার বর্জ্য, পলিথিন ও মানববর্জ্যরে দূষণে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার আশপাশের অন্যান্য নদ-নদীর পানি কালো হয়ে গেছে। তাই নদী-খাল রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে। পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার ‘নিষিদ্ধ’ করা হলেও এর জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি। অবশ্য পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের ও কাগজের ব্যাগ সহজলভ্য না করার কারণে পলিথিন দূষণ থামছে না! সহজে ব্যবহারযোগ্য ও ক্রেতার জন্য বিনা ফিতে পাওয়া পলিথিন পরিবেশের অন্যতম প্রধান শত্রু। অপচনশীল এই পলিথিন ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার ক্ষতিসহ সার্বিক পরিবেশ ব্যবস্থার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনি এমনি এই পলিথিন দূষণ বন্ধ হবে বলে মনে হয় না। পলিথিন উৎপাদন ও বিপণনকারীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিক অভিযান চলমান রাখতে হবে। পাশাপাশি জনসাধারণ পর্যায়ে পলিথিনের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। ঢাকার বাজার ও সব ধরনের দোকানে বিক্রেতা পর্যায়ে অভিযান চালাতে হবে। এ ছাড়া সারা দেশব্যাপী বাজার ও দোকানগুলোতেও অভিযান চলমান রাখতে হবে। মনে রাখা দরকার, বিক্রেতারা যদি পলিথিনে পণ্য ও মালামাল না দেয় তাহলে ক্রেতাদেরও কাছে পলিথিন কখনো পৌঁছাবে না। পাশাপাশি পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ জনপ্রিয় করতে শুরুর দিকে এর ওপর ব্যাপক ভর্তুকি দিতে হবে। পাটের ব্যাগ সহজলভ্য ও চাহিদা অনুযায়ী জোগান দেওয়া সম্ভব হলে রুগ্ন পাটশিল্প বাঁচবে, পরিবেশও রক্ষা পাবে।

বিশে^র অন্যতম বায়ুদূষণের শহর মেগাসিটি ঢাকা। বিশ^ব্যাংকের সম্প্রতি এক তথ্য মতে, বাংলাদেশে বায়ু, পানি ও পরিবেশ দূষণের কারণে বছরে ক্ষতি হয় প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা। আধুনিক ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে না তোলার ফলে ময়লা-আবর্জনা রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। ঢাকা শহরে সড়কের সাথেই গড়ে উঠেছে ময়লা-আবর্জনা রাখার স্থান বা ‘সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন’ (এসটিএস)। ফলে চলতে-ফিরতে বর্জ্য দূষণের শিকার হতে হচ্ছে নগরবাসীকে। সব ধরনের বর্জ্য একসাথে সংগ্রহ না করে আলাদা আলাদা করে সংগ্রহ করা হলে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, আঠা, সার ও অন্যান্য বিকল্প অনেক কিছু তৈরি করা সম্ভব। এ শহরটাকে পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত করে গড়ে তোলার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ সবার। ইপিএ-এর প্রতিবেদন অনুসারে, পরিবেশ দূষণ রোধে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৭৯তম। প্রতিবছর ঘটা করে পরিবেশ দিবস পালন করা হয়, পরিবেশ নিয়ে কত-শত আলোচনা ও উদ্যোগের কথা শোনা যায়। প্রশ্ন হলো, আসলে কি পরিবেশ দূষণ কমছে, পরিবেশ রক্ষা হচ্ছে? এভাবে দিনের পর দিন পরিবেশ দূষণ করতে করতে আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদেরই খুন করছি না তো? পরিবেশ ধ্বংস করতে করতে এমন একটা সময় আসবে যখন থাকবে শুধু অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দূষণ আর রোগগ্রস্ত জীবন। তখন কোনো কিছুর বিনিময়ে সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা ও সুস্থ জীবনযাপন করা সম্ভব হবে না!

নদী-খাল মানেই শুধু জল এমনটা নয়- তা হলো নগর জীবনের রক্তপ্রবাহ। এগুলো যদি নষ্ট হয়, নগরের তাপমাত্রা বাড়বে, বন্যা ঝুঁকি বেড়ে যাবে, জলজজীবন ধসে যাবে, এবং নগরবাসীরা স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাছাড়া-জলপথের সৌন্দর্য ও সামাজিক ইতিহাসও হারাবে। একটি সুস্থ নদী একই সঙ্গে পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য বহন করে। এই সংকট কেবল প্রশাসন বা পরিবেশবিদের মধ্যে আটকে রাখা যায় না-এটি নাগরিক যোদ্ধারও দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, নাগরিক কমিটি ও সরকার একযোগে না হলে দিনের শেষে নদীগুলোই হারাবে। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে যে, আমরা সময় নষ্ট করছি। প্রতিটি বছর দেরি করা মানে পুনরুদ্ধারের খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি। এখনই পরিকল্পিত, নিয়মিত ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ দরকার। সংক্ষেপে, ঢাকার পরিবেশগত সমস্যা গুরুতর ও বহুমাত্রিক। নদী-খালগুলো নিস্তেজ হয়ে পড়েছে দূষণ ও দখলের কারণে। এছাড়া বায়ুদূষণ মারাত্মক পর্যায়ে, যা নগরে অপরিকল্পিত উন্নয়ন পরিবেশ বিপর্যয়ের দায়ী। সময়োপযোগী সমাধান গ্রহণ না করলে এই সমস্যা মানব জীবনের জন্য আরও ক্ষতিকর প্রমাণিত হবে।

মহানগর ঢাকাকে সাজাতে হলে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হবে। ঢাকার বিকাশ ও সভ্যতা বিনির্মাণে পরিবেশের ভূমিকাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এ লক্ষ্যে বুড়িগঙ্গার শাসন ও সংস্কার কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। অধিকন্তু পরিবেশের এ বিপর্যয় রোধ করার লক্ষ্যে পরিবেশ বান্ধব বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তবমুখী সফল কার্যক্রম গ্রহণ করে পরিবেশের প্রতি একটি ইতিবাচক মনোভাব তৈরী করতে হবে এবং পরিবেশ সুরক্ষার কাজকে একটি আন্দোলনে রূপান্তর করতে হবে। ঢাকা মাহানগরবাসীরা এক মহা আতঙ্কের মধ্যে পরে এক দূর্যোগময় ও দুঃসহ জীবন যাপনের শিকার হয়েছে। এই অবস্থা নিরসনকল্পে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণে মনযোগী হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সকল সরকারি-বেসরকারি, এনজিও সংস্থা ও প্রতিনিধিকে সমন্বিত কর্মসূচী প্রনয়নপূর্বক তার যথাযথ বাস্তবায়নে আন্তরিক হতে হবে।

[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

back to top