নিসার আহমেদ
এ বছরের ১৫ আগস্টের সকাল। ঢাকায় এক চায়ের দোকানে বসে শফিক সাহেবের হাতে সেদিনের পত্রিকা। শিরোনামে বড় করে লেখা ‘ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ছাড়াল ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা’। তিনি গভীর এক নিঃশ্বাস ফেললেন। এই টাকার অঙ্কটা তার মাথায় ঢুকছে না। শুধু এটুকু বুঝতে পারছেন, তার ৩০ বছর ধরে জমানো সঞ্চয় যে ব্যাংকে, সেটার অবস্থা ভালো নয়। শফিক সাহেবের মতো কোটি কোটি বাংলাদেশীর আজ একটাই প্রশ্নঃ আমার সঞ্চয় কি নিরাপদ?
খেলাপি ঋণের বোঝা যখন মাথা ছাড়িয়ে গেল, তখন শুরু হলো ‘এভারগ্রিনিং’-এর নামে এক ভয়ঙ্কর খেলা। পুরনো খেলাপি ঋণ ঢাকতে নতুন ঋণ দেওয়া হলো। ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিটে খেলাপি ঋণ দেখানো হলো কম, কিন্তু বাস্তবে বিষফুলে পরিণত হলো তাদের সম্পদ। বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) কঠোর হওয়ার চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক চাপে বারবার নতি স্বীকার করতে হলো
সাম্প্রতিক খবর : সম্প্রতি জানা গেলো ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আসলে ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এতদিন বিভিন্ন নিয়ম-নীতি, আইন-কানুন পরিবর্তন করে তা লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা প্রকাশ করছে।
ভাঙা স্বপ্নের খাতা : যেখানে গল্প শুরু। রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জের ছোট্ট একটি গার্মেন্টস এক্সেসরিজ ব্যবসায়ী। পৈতৃক বাড়ি বন্ধক রেখে ৫০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন ব্যবসা বাড়ানোর জন্য। ব্যাংকের ম্যানেজার তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন ‘চিন্তা কী রাজু ভাই? আপনার ব্যবসার হিসাব তো ভালো।’ কিন্তু ছয় মাস পর ঋণের আবেদন ফেরত এসেছে এক কঠিন সত্য নিয়ে- ‘ঝুঁকি বিবেচনায় ঋণ মঞ্জুর করা গেল না।’ কারণ? ব্যাংকের ঋণখেলাপির হার এতটাই বেড়ে গেছে যে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য তহবিলই নেই। ব্যাংক কর্মকর্তা খোলাখুলি বললেন, ‘ভাই, আমরা তো ডুবতে বসেছি। বড় বড় খেলাপিদের ঋণ ঢাকতেই আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। আপনাদের মতো নতুনদের ঋণ দিলে আমাদের রিজার্ভ আরও কমে যাবে।’
রাজুর গল্প কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটিই বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের করুণ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
অন্ধকারের ইতিহাস: কিভাবে পৌঁছালাম এখানে?
এই সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি। এর শিকড় প্রোথিত আছে একাধিক দশকের সুপরিকল্পিত অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে:
১. দুঃসাহসিক ঋণ বিতরণের যুগ (২০০৫-২০১৫):
ব্যাংকিং লাইসেন্স দেওয়া হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। নতুন ব্যাংকগুলোর মালিকানা চলে গেল ক্ষমতাধর ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে। এরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে ‘ব্যক্তিগত ট্রেজারি’ হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। ভুয়া প্রকল্প প্রস্তাব, মূল্যহীন জামানত, আর ঋণ আবেদনে ক্ষমতার দাপট- এই ত্রয়ী হয়ে দাঁড়াল লুটপাটের হাতিয়ার। বেসিক ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক (পরে পদ্ধতি ব্যাংক), অ্যাননটেক্স কেলেঙ্কারি- এগুলো শুধু নাম নয়, একেকটি দুঃখের ইতিহাস।
২. ‘এভারগ্রিনিং’-এর কালো জাদু (২০১৬-২০২২):
খেলাপি ঋণের বোঝা যখন মাথা ছাড়িয়ে গেল, তখন শুরু হলো ‘এভারগ্রিনিং’-এর নামে এক ভয়ঙ্কর খেলা। পুরনো খেলাপি ঋণ ঢাকতে নতুন ঋণ দেওয়া হলো। ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিটে খেলাপি ঋণ দেখানো হলো কম, কিন্তু বাস্তবে বিষফুলে পরিণত হলো তাদের সম্পদ। বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) কঠোর হওয়ার চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক চাপে বারবার নতি স্বীকার করতে হলো।
সাম্প্রতিক অতীতে কেলেঙ্কারির মাত্রা ও সাহসিকতা চরমে পৌঁছেছিল। কোটিপতি খেলাপিরা বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন। তাদের সম্পদ গোপন করা হচ্ছে আইনজীবী আর দালালদের সহায়তায়। আদালতের নির্দেশ অমান্য করে চলেছেন ঋণখেলাপিরা। ব্যাংক মালিক-কর্মকর্তাদের একাংশের যোগসাজশে চলছে এই মহাযজ্ঞ।
বিষাক্ত উপাদান : এই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয়। একাধিক স্তরে একসাথে কাজ করেছে কিছু বিষাক্ত উপাদান।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ছত্রছনসহ ৮ জবকস বন বন জায়া: একজন উচ্চপদস্থ ব্যাংক কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, ‘খেলাপিরা সরাসরি বলে, তোমার চেয়ে বড় লোকের সঙ্গে কথা বলো। আমরা ফোন করলেই বুঝতে পারি, কত উঁচু স্তর থেকে চাপ আসছে। বলার সাধ্য থাকে না।’
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে যোগ্যতাহীন লোকের নিয়োগ, মালিকপক্ষের ব্যাংকগুলোর বোর্ডে রাজনৈতিক নেতাদের অবস্থান, খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে হস্তক্ষেপ- এগুলো নিত্যদিনের ঘটনা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাত-পা বাঁধা: বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) আইনগতভাবে স্বাধীন হলেও বাস্তবে তার সিদ্ধান্ত প্রায়ই ব্যাহত হয় রাজনৈতিক চাপে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (জরিমানা, পরিচালক পর্ষদ বরখাস্ত) নিলেও তা প্রায়ই কাগজে-কলমেই থেকে যায়।
আদালতের মামলা দীর্ঘসূত্রিতার ফাঁদে আটকে যায়। ‘আমরা যাকে খারাপ ঋণগ্রাহক ঘোষণা করি, তারাও নতুন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেলছে। আমাদের হাত বাঁধা’ বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকএর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
মালিকপক্ষের লুটেরা মানসিকতা: অনেক ব্যাংকের মালিকপক্ষ ব্যাংককে দেখেন নিজেদের ‘ব্যক্তিগত ভাণ্ডার’ হিসেবে। স্পনসর শেয়ারহোল্ডার ও তাদের আত্মীয়-স্বজনের নামে বিপুল ঋণ বিতরণ, সেটা খেলাপি হলেও তা আড়াল করা, ব্যাংকের তহবিল দিয়ে নিজেদের অন্যান্য ব্যবসায় ঋণ দেওয়া- এই চর্চা ব্যাংকের মূলধন গ্রাস করে ফেলেছে।
দায়মুক্তির সংস্কৃতি: এখানেই সবচেয়ে বড় সমস্যা। কয়েক হাজার কোটি টাকা খেলাপি হওয়ার পরও একজন উচ্চপদস্থ ব্যাংক কর্মকর্তা বা মালিকপক্ষের সদস্য কারাগারে যাননি।
খেলাপিরা রাজধানীর অভিজাত এলাকায় দামি গাড়ি চালিয়ে বেড়ায়, বিদেশ ভ্রমণ করে। এই দৃশ্য অন্যদেরও উৎসাহ জোগায়।‘যেখানে শাস্তি নেই, সেখানে অপরাধ বাড়বেই’ মন্তব্য করেন সুপ্রিম কোর্টের একজন বিশিষ্ট আইনজীবী।
সুনামির পূর্বাভাস: দীর্ঘমেয়াদী যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছে এই সংকটের প্রভাব শুধু ব্যাংকিং খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বাংলাদেশের সমগ্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
উৎপাদনশীল খাতের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা: ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের বোঝায় নুয়ে পড়েছে। তারা ঝুঁকি নিতে ভয় পাচ্ছে। ফলে রাজু আহমেদের মতো প্রকৃত উদ্যোক্তা, কৃষক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) প্রতিষ্ঠান- অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি - ঋণ পাচ্ছে না। নতুন বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও কার্যকরী মূলধনের অভাবে হিমশিম খাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর। বেকারত্বের হার বাড়ছে।
সাধারণ মানুষের সঞ্চয় হুমকির মুখে: ব্যাংকে টাকা রাখা সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। যদি কোনো বড় ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায় (যার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে), তাহলে ক্ষুদ্র আমানতকারীরা সর্বস্বান্ত হবেন। ইতিমধ্যেই অনেকের মধ্যে আস্থা হারানোর প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। কেউ কেউ টাকা তুলে বাড়িতে রেখে দিচ্ছেন, কেউ বা কম সুদ হলেও পোস্ট অফিসে সঞ্চয় করছেন- যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজস্বের অপচয় ও মুদ্রাস্ফীতির বিষবৃক্ষ: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে সরকারকে (অর্থাৎ জনগণের করের টাকা থেকে) বারবার পুঁজি (বেইলআউট) দিতে হচ্ছে। গত দশ বছরে এই পুঁজি সরবরাহের পরিমাণ কয়েক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে! এই টাকা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি বা অবকাঠামো খাতে ব্যয় করা যেত। ব্যাংক বাঁচাতে সরকার যখন অতিরিক্ত টাকা ছাপায়, তখন বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়ে যায়। এর ফলাফল? ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি। নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। গরিব মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিদেশি বিনিয়োগে বাধা ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্য: কোন বিদেশি বিনিয়োগকারী একটি দেশে টাকা ঢালবে, যেখানে ব্যাংকিং ব্যবস্থাই ধসের মুখে? দুর্নীতি, দুর্বল শাসন ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি বিদেশিদের ভয় ধরিয়ে দেয়। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য নেতিবাচক আউটলুক দিয়েছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক অসমতা ও সামাজিক অস্থিরতার বীজ: এই পুরো প্রক্রিয়াটি একদম উল্টোভাবে ‘ট্রিকল-ডাউন’ থিওরি কাজ করছে। অর্থনীতির সম্পদ লুট করে নিচ্ছে এক ক্ষুদ্র কিন্তু ক্ষমতাধর গোষ্ঠী। এর মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ - উচ্চ মুদ্রাস্ফীতিতে, বাড়তি করের বোঝায়, কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় এবং ভবিষ্যতের জন্য জমানো টাকা হারানোর ভয়ে। এই গভীর অর্থনৈতিক অসমতা সামাজিক ক্ষোভ ও অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
আলোর দিশা: রক্ষা পেতে হলে যা করতে হবে
এখনো সময় আছে। কিন্তু দ্রুত, সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ধ্বংস অনিবার্য। বিশেষজ্ঞরা যেসব জরুরি পদক্ষেপের কথা বলছেন:
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন: বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত করে সত্যিকারের স্বাধীনতা দিতে হবে। ব্যাংকিং নীতি, তদারকি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ও বাস্তবায়নযোগ্য হতে হবে।
ব্যাংক বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা থেকে রাজনীতির নির্মূল: ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও সৎ মানুষ বসাতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য লোক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। মালিকপক্ষের ব্যাংকগুলোর স্পনসর শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ টেস্ট কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। দুর্নীতির দায়ে প্রমাণিত মালিকদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত করে ব্যাংক থেকে বহিষ্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।
খেলাপি ঋণ আদায়ে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা: সব খেলাপির তালিকা প্রকাশ: নাম-ঠিকানা, খেলাপির পরিমাণসহ একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে (ব্যক্তিগত গোপনীয়তার যুক্তি খাটবে না)।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন: শুধু ব্যাংকিং মামলার জন্য বিশেষায়িত আদালত গঠন করতে হবে, যারা দ্রুততম সময়ে রায় দেবে। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা বন্ধ করতে হবে।
জব্দ-তল্লাশি জোরদার: খেলাপিদের গোপন সম্পদ (জমি, ফ্ল্যাট, শেয়ার, বিদেশে টাকা) শনাক্ত করে তা জব্দ করার জন্য শক্তিশালী একটি সেল গঠন করতে হবে।
বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
‘এভারগ্রিনিং’-এর সুযোগ বন্ধ করতে হবে: পুরনো খেলাপি ঋণ ঢাকতে নতুন ঋণ দেওয়ার প্রথার অবসান ঘটাতে হবে। ব্যালান্স শিটে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত করতে হবে।
সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্ষমতাসীন দলকে নিজেদের সমর্থক, দাতা বা প্রভাবশালী খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে। কোনো রকম পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই আইন প্রয়োগ করতে হবে।’একটা দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধ্বংস হলে সেটা সরকারের জন্যও ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে’ বলেন অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
সচেতন নাগরিক সমাজের ভূমিকা: জনগণকে এই সংকটের গভীরতা বুঝতে হবে। ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা দাবি করতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোকে এই বিষয়ে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। যারা দুর্নীতি করে ব্যাংক লুটছে, তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
শেষ কথা: আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের লড়াই ব্যাংকিং খাত কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি শফিক সাহেবের সারাজীবনের সঞ্চয়। এটি রাজু আহমেদের ব্যবসা বাড়ানোর স্বপ্ন। এটি দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণের কর্মসংস্থানের ভিত্তি। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মূল চালিকাশক্তি।
প্রশ্নটা খুব সরল: আমরা কি শফিক সাহেবের সঞ্চয়, রাজু আহমেদের স্বপ্ন এবং আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ একজনের লোভের বলি হতে দেবো? নাকি জেগে উঠব, একসাথে দাঁড়াব এবং আমাদের অর্থনীতির ধমনীকে বিষমুক্ত করব?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় আজই। আগামীকাল হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
[লেখক: ট্রেজারার, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
নিসার আহমেদ
বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫
এ বছরের ১৫ আগস্টের সকাল। ঢাকায় এক চায়ের দোকানে বসে শফিক সাহেবের হাতে সেদিনের পত্রিকা। শিরোনামে বড় করে লেখা ‘ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ছাড়াল ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা’। তিনি গভীর এক নিঃশ্বাস ফেললেন। এই টাকার অঙ্কটা তার মাথায় ঢুকছে না। শুধু এটুকু বুঝতে পারছেন, তার ৩০ বছর ধরে জমানো সঞ্চয় যে ব্যাংকে, সেটার অবস্থা ভালো নয়। শফিক সাহেবের মতো কোটি কোটি বাংলাদেশীর আজ একটাই প্রশ্নঃ আমার সঞ্চয় কি নিরাপদ?
খেলাপি ঋণের বোঝা যখন মাথা ছাড়িয়ে গেল, তখন শুরু হলো ‘এভারগ্রিনিং’-এর নামে এক ভয়ঙ্কর খেলা। পুরনো খেলাপি ঋণ ঢাকতে নতুন ঋণ দেওয়া হলো। ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিটে খেলাপি ঋণ দেখানো হলো কম, কিন্তু বাস্তবে বিষফুলে পরিণত হলো তাদের সম্পদ। বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) কঠোর হওয়ার চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক চাপে বারবার নতি স্বীকার করতে হলো
সাম্প্রতিক খবর : সম্প্রতি জানা গেলো ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আসলে ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এতদিন বিভিন্ন নিয়ম-নীতি, আইন-কানুন পরিবর্তন করে তা লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা প্রকাশ করছে।
ভাঙা স্বপ্নের খাতা : যেখানে গল্প শুরু। রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জের ছোট্ট একটি গার্মেন্টস এক্সেসরিজ ব্যবসায়ী। পৈতৃক বাড়ি বন্ধক রেখে ৫০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন ব্যবসা বাড়ানোর জন্য। ব্যাংকের ম্যানেজার তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন ‘চিন্তা কী রাজু ভাই? আপনার ব্যবসার হিসাব তো ভালো।’ কিন্তু ছয় মাস পর ঋণের আবেদন ফেরত এসেছে এক কঠিন সত্য নিয়ে- ‘ঝুঁকি বিবেচনায় ঋণ মঞ্জুর করা গেল না।’ কারণ? ব্যাংকের ঋণখেলাপির হার এতটাই বেড়ে গেছে যে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য তহবিলই নেই। ব্যাংক কর্মকর্তা খোলাখুলি বললেন, ‘ভাই, আমরা তো ডুবতে বসেছি। বড় বড় খেলাপিদের ঋণ ঢাকতেই আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। আপনাদের মতো নতুনদের ঋণ দিলে আমাদের রিজার্ভ আরও কমে যাবে।’
রাজুর গল্প কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটিই বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের করুণ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
অন্ধকারের ইতিহাস: কিভাবে পৌঁছালাম এখানে?
এই সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি। এর শিকড় প্রোথিত আছে একাধিক দশকের সুপরিকল্পিত অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে:
১. দুঃসাহসিক ঋণ বিতরণের যুগ (২০০৫-২০১৫):
ব্যাংকিং লাইসেন্স দেওয়া হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। নতুন ব্যাংকগুলোর মালিকানা চলে গেল ক্ষমতাধর ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে। এরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে ‘ব্যক্তিগত ট্রেজারি’ হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। ভুয়া প্রকল্প প্রস্তাব, মূল্যহীন জামানত, আর ঋণ আবেদনে ক্ষমতার দাপট- এই ত্রয়ী হয়ে দাঁড়াল লুটপাটের হাতিয়ার। বেসিক ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক (পরে পদ্ধতি ব্যাংক), অ্যাননটেক্স কেলেঙ্কারি- এগুলো শুধু নাম নয়, একেকটি দুঃখের ইতিহাস।
২. ‘এভারগ্রিনিং’-এর কালো জাদু (২০১৬-২০২২):
খেলাপি ঋণের বোঝা যখন মাথা ছাড়িয়ে গেল, তখন শুরু হলো ‘এভারগ্রিনিং’-এর নামে এক ভয়ঙ্কর খেলা। পুরনো খেলাপি ঋণ ঢাকতে নতুন ঋণ দেওয়া হলো। ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিটে খেলাপি ঋণ দেখানো হলো কম, কিন্তু বাস্তবে বিষফুলে পরিণত হলো তাদের সম্পদ। বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) কঠোর হওয়ার চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক চাপে বারবার নতি স্বীকার করতে হলো।
সাম্প্রতিক অতীতে কেলেঙ্কারির মাত্রা ও সাহসিকতা চরমে পৌঁছেছিল। কোটিপতি খেলাপিরা বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন। তাদের সম্পদ গোপন করা হচ্ছে আইনজীবী আর দালালদের সহায়তায়। আদালতের নির্দেশ অমান্য করে চলেছেন ঋণখেলাপিরা। ব্যাংক মালিক-কর্মকর্তাদের একাংশের যোগসাজশে চলছে এই মহাযজ্ঞ।
বিষাক্ত উপাদান : এই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয়। একাধিক স্তরে একসাথে কাজ করেছে কিছু বিষাক্ত উপাদান।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ছত্রছনসহ ৮ জবকস বন বন জায়া: একজন উচ্চপদস্থ ব্যাংক কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, ‘খেলাপিরা সরাসরি বলে, তোমার চেয়ে বড় লোকের সঙ্গে কথা বলো। আমরা ফোন করলেই বুঝতে পারি, কত উঁচু স্তর থেকে চাপ আসছে। বলার সাধ্য থাকে না।’
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে যোগ্যতাহীন লোকের নিয়োগ, মালিকপক্ষের ব্যাংকগুলোর বোর্ডে রাজনৈতিক নেতাদের অবস্থান, খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে হস্তক্ষেপ- এগুলো নিত্যদিনের ঘটনা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাত-পা বাঁধা: বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) আইনগতভাবে স্বাধীন হলেও বাস্তবে তার সিদ্ধান্ত প্রায়ই ব্যাহত হয় রাজনৈতিক চাপে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (জরিমানা, পরিচালক পর্ষদ বরখাস্ত) নিলেও তা প্রায়ই কাগজে-কলমেই থেকে যায়।
আদালতের মামলা দীর্ঘসূত্রিতার ফাঁদে আটকে যায়। ‘আমরা যাকে খারাপ ঋণগ্রাহক ঘোষণা করি, তারাও নতুন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেলছে। আমাদের হাত বাঁধা’ বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকএর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
মালিকপক্ষের লুটেরা মানসিকতা: অনেক ব্যাংকের মালিকপক্ষ ব্যাংককে দেখেন নিজেদের ‘ব্যক্তিগত ভাণ্ডার’ হিসেবে। স্পনসর শেয়ারহোল্ডার ও তাদের আত্মীয়-স্বজনের নামে বিপুল ঋণ বিতরণ, সেটা খেলাপি হলেও তা আড়াল করা, ব্যাংকের তহবিল দিয়ে নিজেদের অন্যান্য ব্যবসায় ঋণ দেওয়া- এই চর্চা ব্যাংকের মূলধন গ্রাস করে ফেলেছে।
দায়মুক্তির সংস্কৃতি: এখানেই সবচেয়ে বড় সমস্যা। কয়েক হাজার কোটি টাকা খেলাপি হওয়ার পরও একজন উচ্চপদস্থ ব্যাংক কর্মকর্তা বা মালিকপক্ষের সদস্য কারাগারে যাননি।
খেলাপিরা রাজধানীর অভিজাত এলাকায় দামি গাড়ি চালিয়ে বেড়ায়, বিদেশ ভ্রমণ করে। এই দৃশ্য অন্যদেরও উৎসাহ জোগায়।‘যেখানে শাস্তি নেই, সেখানে অপরাধ বাড়বেই’ মন্তব্য করেন সুপ্রিম কোর্টের একজন বিশিষ্ট আইনজীবী।
সুনামির পূর্বাভাস: দীর্ঘমেয়াদী যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছে এই সংকটের প্রভাব শুধু ব্যাংকিং খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বাংলাদেশের সমগ্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
উৎপাদনশীল খাতের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা: ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের বোঝায় নুয়ে পড়েছে। তারা ঝুঁকি নিতে ভয় পাচ্ছে। ফলে রাজু আহমেদের মতো প্রকৃত উদ্যোক্তা, কৃষক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) প্রতিষ্ঠান- অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি - ঋণ পাচ্ছে না। নতুন বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও কার্যকরী মূলধনের অভাবে হিমশিম খাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর। বেকারত্বের হার বাড়ছে।
সাধারণ মানুষের সঞ্চয় হুমকির মুখে: ব্যাংকে টাকা রাখা সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। যদি কোনো বড় ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায় (যার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে), তাহলে ক্ষুদ্র আমানতকারীরা সর্বস্বান্ত হবেন। ইতিমধ্যেই অনেকের মধ্যে আস্থা হারানোর প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। কেউ কেউ টাকা তুলে বাড়িতে রেখে দিচ্ছেন, কেউ বা কম সুদ হলেও পোস্ট অফিসে সঞ্চয় করছেন- যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রাজস্বের অপচয় ও মুদ্রাস্ফীতির বিষবৃক্ষ: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে সরকারকে (অর্থাৎ জনগণের করের টাকা থেকে) বারবার পুঁজি (বেইলআউট) দিতে হচ্ছে। গত দশ বছরে এই পুঁজি সরবরাহের পরিমাণ কয়েক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে! এই টাকা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি বা অবকাঠামো খাতে ব্যয় করা যেত। ব্যাংক বাঁচাতে সরকার যখন অতিরিক্ত টাকা ছাপায়, তখন বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়ে যায়। এর ফলাফল? ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি। নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। গরিব মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিদেশি বিনিয়োগে বাধা ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্য: কোন বিদেশি বিনিয়োগকারী একটি দেশে টাকা ঢালবে, যেখানে ব্যাংকিং ব্যবস্থাই ধসের মুখে? দুর্নীতি, দুর্বল শাসন ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি বিদেশিদের ভয় ধরিয়ে দেয়। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য নেতিবাচক আউটলুক দিয়েছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক অসমতা ও সামাজিক অস্থিরতার বীজ: এই পুরো প্রক্রিয়াটি একদম উল্টোভাবে ‘ট্রিকল-ডাউন’ থিওরি কাজ করছে। অর্থনীতির সম্পদ লুট করে নিচ্ছে এক ক্ষুদ্র কিন্তু ক্ষমতাধর গোষ্ঠী। এর মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ - উচ্চ মুদ্রাস্ফীতিতে, বাড়তি করের বোঝায়, কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় এবং ভবিষ্যতের জন্য জমানো টাকা হারানোর ভয়ে। এই গভীর অর্থনৈতিক অসমতা সামাজিক ক্ষোভ ও অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
আলোর দিশা: রক্ষা পেতে হলে যা করতে হবে
এখনো সময় আছে। কিন্তু দ্রুত, সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ধ্বংস অনিবার্য। বিশেষজ্ঞরা যেসব জরুরি পদক্ষেপের কথা বলছেন:
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন: বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত করে সত্যিকারের স্বাধীনতা দিতে হবে। ব্যাংকিং নীতি, তদারকি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ও বাস্তবায়নযোগ্য হতে হবে।
ব্যাংক বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা থেকে রাজনীতির নির্মূল: ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও সৎ মানুষ বসাতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য লোক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। মালিকপক্ষের ব্যাংকগুলোর স্পনসর শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ টেস্ট কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। দুর্নীতির দায়ে প্রমাণিত মালিকদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত করে ব্যাংক থেকে বহিষ্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।
খেলাপি ঋণ আদায়ে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা: সব খেলাপির তালিকা প্রকাশ: নাম-ঠিকানা, খেলাপির পরিমাণসহ একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে (ব্যক্তিগত গোপনীয়তার যুক্তি খাটবে না)।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন: শুধু ব্যাংকিং মামলার জন্য বিশেষায়িত আদালত গঠন করতে হবে, যারা দ্রুততম সময়ে রায় দেবে। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা বন্ধ করতে হবে।
জব্দ-তল্লাশি জোরদার: খেলাপিদের গোপন সম্পদ (জমি, ফ্ল্যাট, শেয়ার, বিদেশে টাকা) শনাক্ত করে তা জব্দ করার জন্য শক্তিশালী একটি সেল গঠন করতে হবে।
বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
‘এভারগ্রিনিং’-এর সুযোগ বন্ধ করতে হবে: পুরনো খেলাপি ঋণ ঢাকতে নতুন ঋণ দেওয়ার প্রথার অবসান ঘটাতে হবে। ব্যালান্স শিটে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত করতে হবে।
সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্ষমতাসীন দলকে নিজেদের সমর্থক, দাতা বা প্রভাবশালী খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে। কোনো রকম পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই আইন প্রয়োগ করতে হবে।’একটা দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধ্বংস হলে সেটা সরকারের জন্যও ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে’ বলেন অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
সচেতন নাগরিক সমাজের ভূমিকা: জনগণকে এই সংকটের গভীরতা বুঝতে হবে। ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা দাবি করতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোকে এই বিষয়ে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। যারা দুর্নীতি করে ব্যাংক লুটছে, তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
শেষ কথা: আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের লড়াই ব্যাংকিং খাত কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি শফিক সাহেবের সারাজীবনের সঞ্চয়। এটি রাজু আহমেদের ব্যবসা বাড়ানোর স্বপ্ন। এটি দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণের কর্মসংস্থানের ভিত্তি। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মূল চালিকাশক্তি।
প্রশ্নটা খুব সরল: আমরা কি শফিক সাহেবের সঞ্চয়, রাজু আহমেদের স্বপ্ন এবং আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ একজনের লোভের বলি হতে দেবো? নাকি জেগে উঠব, একসাথে দাঁড়াব এবং আমাদের অর্থনীতির ধমনীকে বিষমুক্ত করব?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় আজই। আগামীকাল হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
[লেখক: ট্রেজারার, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ]