alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

পিএইচডি: উচ্চ শিক্ষার মানদণ্ড না প্রতীকী মরীচিকা?

সৌরভ জাকারিয়া

: শনিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৫

(গতকালের পর)

উচ্চশিক্ষায় পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক: অপরিহার্য নাকি শর্তাধীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজসহ উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষকতার ভূমিকা নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কে উচ্চশিক্ষায় পিএইচডিধারী শিক্ষকের অপরিহার্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, উচ্চ শিক্ষার জন্য পিএইচডিধারী শিক্ষক অপরিহার্য। এ প্রসঙ্গে স্বীকার্য যে, শিক্ষাদানের দক্ষতা ও গবেষণার যোগ্যতা-দুটি পৃথক গুণ। একজন ভালো শিক্ষককে যেমন কোনো বিষয়ের গভীর জ্ঞানী হতে হয়, তেমনি তাকে হতে হয় অনুপ্রেরণাদায়ক, সহানুভূতিশীল ও শিক্ষার্থীর বোধগম্যতায় দক্ষ। পিএইচডি ডিগ্রি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই গুণগুলো নিশ্চিত করে না। গবেষণায় পারদর্শী ব্যক্তি ক্লাসরুমে ততা কার্যকর নাও হতে পারেন। এজন্যই অনেক উন্নত দেশে শিক্ষণ পদ্ধতির প্রশিক্ষণকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগের শর্ত হিসেবে যুক্ত করা হয়। একজন নিবেদিত শিক্ষক গবেষণামুখী না হলেও শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক সরকারি কলেজে পিএইচডি শিক্ষকের স্বল্পতার প্রসঙ্গ টেনে তা উচ্চশিক্ষার মানের একমাত্র নির্ণায়ক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। অথচ শিক্ষার মান নির্ভর করে কেবল ডিগ্রির ওপর নয়; বরং শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা, শিক্ষার্থীর মনোভাব এবং প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত একাডেমিক পরিবেশের ওপর। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকসু নির্বাচনে কয়েকজন ভিপিপ্রার্থী প্রকাশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্লাস ও পাঠদানের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে কৌতুক ও কটাক্ষের সুরে প্রশ্ন তুলেছেন-যদি সাত কলেজের শিক্ষকদের যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে “ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি” প্রতিষ্ঠার দাবি তোলা যায়, তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে করণীয় কী? তাহলে কি এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ড থেকে শিক্ষক আমদানি করতে হবে? সুতরাং, উচ্চ শিক্ষায় পিএইচডি শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও একে শিক্ষার মান নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখা নিঃসন্দেহে একটি ভুল দৃষ্টিভঙ্গি।

বিশ্ববিদ্যার চেতনা ও সরকারি কলেজের শিক্ষক: এক অবমূল্যায়িত শক্তি বিশ্ববিদ্যার আলয় তথা বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটির মধ্যেই নিহিত আছে এক অনন্য দর্শন। ‘বিশ্ব’ মানে সার্বিক বা সর্বজনীন, আর ‘বিদ্যা’ মানে জ্ঞান। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয় কেবল কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণকেন্দ্র নয়; এটি মানবচিন্তা, মূল্যবোধ ও জ্ঞানের সমন্বিত বিকাশের আলয়। একজন ভালো ছাত্র কেবল রসায়ন বা অর্থনীতি জানলেই চলবে না, তাকে জানতে হবে নীতি, মানবতা, সমাজ ও সংস্কৃতির জটিল বাস্তবতাও। একইভাবে, একজন শিক্ষকের কাজ কেবল পাঠদান নয়; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে চিন্তা, প্রশ্ন ও যুক্তির বিকাশ ঘটানো। যদি শিক্ষক কেবল বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন, তবে শিক্ষার্থীরা হয়তো মেশিনের মতো তথ্য মুখস্থ করবে, কিন্তু সেই জ্ঞানকে বিশ্লেষণ, সমন্বয় ও সৃজনশীল উদ্ভাবনে রূপ দিতে পারবে না।

পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক সাধারণত একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের গভীর বিশেষজ্ঞ হন। যেমন, সাহিত্যে পিএইচডি করা শিক্ষক কোনো বিশেষ ভাষা বা ধারায় পারদর্শী হতে পারেন, কিন্তু বিজ্ঞান, অর্থনীতি বা নৈতিক দর্শনের আলোচনায় শিক্ষার্থীদের সমন্বিত বোধ গঠনে কিছতা তুলনামূলকভাবে সীমাবদ্ধ থাকতে পারেন। এই প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যার সার্বজনীন চাহিদা পূরণে সরকারি কলেজের শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকগণ অনেক সময় তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখেন। কারণ, তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিষয়জ্ঞান ছাড়াও যুক্তি, বিশ্লেষণ ও বহুমুখী জ্ঞানের সক্ষমতা যাচাই করা হয়। বিসিএস পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ-প্রিলিমিনারি, লিখিত, ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে-এই ভারসেটাইলিটি নিশ্চিত করা হয়। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে নির্দিষ্ট বিষয়ে ভালো ফলাফল বা গবেষণার ওপর। অনেক ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার দুর্বলতা প্রকৃত মেধা যাচাইকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে অনেক শিক্ষক বিষয়জ্ঞানসম্পন্ন হলেও সার্বজনীন জ্ঞান ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সীমিত থেকে যান, যা ‘বিশ্ববিদ্যা’-র মূল চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এই প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের সার্বজনীন বিকাশে সরকারি কলেজের শিক্ষকগণ, অনেক সময়, প্রথিতযশা পিএইচডিধারী বা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের তুলনায় বাস্তবিকভাবে অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন।

প্রেক্ষাপট: ঢাকার সাত কলেজ ও উচ্চ শিক্ষার বাস্তবতা

ঢাকার সাত সরকারি কলেজ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল। এই কলেজগুলোতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রাখা হয়েছে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায়। রাষ্ট্রের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের উচ্চশিক্ষা পরিষেবা বিপুল সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রসারণ করা সম্ভব নয়; ফলে কলেজ পর্যায়ের সীমিত অবকাঠামো ও সম্পদের মধ্যেও উচ্চশিক্ষা চালু রাখার প্রয়াস নেয়া হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংখ্যা কম, এই যুক্তি দেখিয়ে সাত কলেজের পাঠদান পদ্ধতি ও মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। অথচ এই কলেজগুলোর শিক্ষকগণ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়সমমানের পাঠদান ও পরীক্ষা পরিচালনা করে আসছেন, যা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক ও প্রশাসনিক সংকটের দায় একতরফাভাবে শিক্ষকদের ওপর চাপানো হচ্ছে, এবং পিএইচডিধারী শিক্ষকের অপ্রতুলতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ঐতিহ্যবাহী এই কলেজগুলো বিলুপ্ত করার প্রস্তাব তোলা হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার মান উন্নয়ন মানে প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করা নয়; বরং এসব কলেজের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা কার্যক্রমের সম্প্রসারণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ একাডেমিক উদ্যোগ গ্রহণই হতে পারে কার্যকর ও টেকসই সমাধান।

উচ্চশিক্ষার মূলত তিনটি স্তর-স্নাতক (অনার্স), স্নাতকোত্তর (মার্স্টার্স) ও গবেষণা স্তর (এমফিল/পিএইচডি)। স্নাতক স্তরে পিএইচডি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাধ্যতামূলক নয়; এ স্তরে অভিজ্ঞ বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষকও ভালো পাঠদান করতে পারেন। স্নাতকোত্তর স্তরে পিএইচডি প্রায় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে গবেষণা, তত্ত্ব ও পদ্ধতি শেখানো হয়। আর গবেষণা স্তরে পিএইচডি সম্পূর্ণ অপরিহার্য, কারণ এখানে শিক্ষককেই গবেষণার পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করতে হয়। বাংলাদেশের সরকারি কলেজভিত্তিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বৃহৎ অংশ স্নাতক পর্যায়ভিত্তিক; স্নাতকোত্তর স্তরের শিক্ষার্থী তুলনামূলকভাবে কম, আর গবেষণা স্তর কার্যত অনুপস্থিত। ফলে সরকারি কলেজের উচ্চশিক্ষায় পিএইচডিধারী শিক্ষকের উপস্থিতি নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা বাস্তবতার নিরিখে অপ্রয়োজনীয় এবং অপ্রাসংগিক।

একাডেমিক চরিত্র অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান মূলত দুধরনের- ‘শিক্ষণমুখী’ ও ‘গবেষণামুখী’। সরকারি কলেজগুলো মূলত শিক্ষণমূখী প্রতিষ্ঠান, যেখানে গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির চেয়ে বিদ্যমান জ্ঞান বিতরণের দিকেই মনোযোগ বেশি দেয়া হয়। অথচ দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও শিক্ষণমূখী উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকায় রয়েছে। সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র ঢাকার সাত কলেজ বা সরকারি কলেজে পিএইচডি শিক্ষক বা গবেষণা পরিবেশের প্রশ্ন তোলা যুক্তিসঙ্গত নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক সরকারি কলেজে পিএইচডি শিক্ষকের স্বল্পতার কথা বলে উচ্চশিক্ষা সংকোচন বা প্রতিষ্ঠান বিলুপ্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে মাত্র ৩৮% পিএইচডিধারী, আর ৬% এমফিল বা সমমানের ডিগ্রিধারী। খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই হার ৪৯%, আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ২১%। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যেই পিএইচডি অর্জনের এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে, সরকারি কলেজের শিক্ষণমুখী উচ্চশিক্ষায় পিএইচডি ডিগ্রিকে পূর্বশর্ত হিসেবে চাপানো মোটেও বাস্তবসম্মত নয়।

(অসমাপ্য)

[লেখক: শিক্ষক ও সদস্য, দি অ্যাডভাইজরস: থিংক ট্যাংক অব সিভিল এডুকেশন]

নিজের চেতনায় নিজেরই ঘা দেয়া জরুরি

ঋণ অবলোপনের প্রভাব

ভেজাল গুড়ের মরণফাঁদ: বাঙালির ঐতিহ্য, জনস্বাস্থ্য ও আস্থার নীরব বিপর্যয়

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস

জোটের ভোট নাকি ভোটের জোট, কৌশলটা কী?

প্রমাণ তো করতে হবে আমরা হাসিনার চেয়ে ভালো

ছবি

কৃষি ডেটা ব্যবস্থাপনা

যুক্তরাজ্যে ভর্তি স্থগিতের কুয়াশা: তালা লাগলেও চাবি আমাদের হাতে

শিক্ষকদের কর্মবিরতি: পেশাগত নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ

জাতীয় রক্তগ্রুপ নির্ণয় দিবস

জাল সনদপত্রে শিক্ষকতা

সাধারণ চুক্তিগুলোও গোপনীয় কেন

ছবি

শিশুখাদ্যের নিরাপত্তা: জাতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষার প্রথম শর্ত

ছবি

ফিনল্যান্ড কেন সুখী দেশ

ছবি

কৃষকের সংকট ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

আলু চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

ই-বর্জ্য: নীরব বিষে দগ্ধ আমাদের ভবিষ্যৎ

ঢাকার জনপরিসর: আর্ভিং গফম্যানের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

আলু চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

কলি ফুটিতে চাহে ফোটে না!

কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তি

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে লোকালাইজেশন অপরিহার্য

আইসিইউ থেকে বাড়ি ফেরা ও খাদের কিনারায় থাকা দেশ

বিচারবহির্ভূত হত্যার দায় কার?

ছবি

ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা কৌশল

অযৌক্তিক দাবি: পেশাগত নৈতিকতার সংকট ও জনপ্রশাসন

সড়ক দুর্ঘটনা এখন জাতীয় সংকট

কেন বাড়ছে দারিদ্র্য?

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্জন্ম

লবণাক্ততায় ডুবছে উপকূল

বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ও বাস্তবতা

সড়ক দুর্ঘটনার সমাজতত্ত্ব: আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা ও কাঠামোর চক্রাকার পুনরুৎপাদন

ছবি

অস্থির সময় ও অস্থির সমাজের পাঁচালি

ভারতে বামপন্থার পুনর্জাগরণ: ব্যাধি ও প্রতিকার

চিপনির্ভরতা কাটিয়ে চীনের উত্থান

একতার বাতাসে উড়ুক দক্ষিণ এশিয়ার পতাকা

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

পিএইচডি: উচ্চ শিক্ষার মানদণ্ড না প্রতীকী মরীচিকা?

সৌরভ জাকারিয়া

শনিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৫

(গতকালের পর)

উচ্চশিক্ষায় পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক: অপরিহার্য নাকি শর্তাধীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজসহ উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষকতার ভূমিকা নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কে উচ্চশিক্ষায় পিএইচডিধারী শিক্ষকের অপরিহার্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, উচ্চ শিক্ষার জন্য পিএইচডিধারী শিক্ষক অপরিহার্য। এ প্রসঙ্গে স্বীকার্য যে, শিক্ষাদানের দক্ষতা ও গবেষণার যোগ্যতা-দুটি পৃথক গুণ। একজন ভালো শিক্ষককে যেমন কোনো বিষয়ের গভীর জ্ঞানী হতে হয়, তেমনি তাকে হতে হয় অনুপ্রেরণাদায়ক, সহানুভূতিশীল ও শিক্ষার্থীর বোধগম্যতায় দক্ষ। পিএইচডি ডিগ্রি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই গুণগুলো নিশ্চিত করে না। গবেষণায় পারদর্শী ব্যক্তি ক্লাসরুমে ততা কার্যকর নাও হতে পারেন। এজন্যই অনেক উন্নত দেশে শিক্ষণ পদ্ধতির প্রশিক্ষণকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগের শর্ত হিসেবে যুক্ত করা হয়। একজন নিবেদিত শিক্ষক গবেষণামুখী না হলেও শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক সরকারি কলেজে পিএইচডি শিক্ষকের স্বল্পতার প্রসঙ্গ টেনে তা উচ্চশিক্ষার মানের একমাত্র নির্ণায়ক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। অথচ শিক্ষার মান নির্ভর করে কেবল ডিগ্রির ওপর নয়; বরং শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা, শিক্ষার্থীর মনোভাব এবং প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত একাডেমিক পরিবেশের ওপর। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকসু নির্বাচনে কয়েকজন ভিপিপ্রার্থী প্রকাশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্লাস ও পাঠদানের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে কৌতুক ও কটাক্ষের সুরে প্রশ্ন তুলেছেন-যদি সাত কলেজের শিক্ষকদের যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে “ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি” প্রতিষ্ঠার দাবি তোলা যায়, তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে করণীয় কী? তাহলে কি এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ড থেকে শিক্ষক আমদানি করতে হবে? সুতরাং, উচ্চ শিক্ষায় পিএইচডি শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও একে শিক্ষার মান নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখা নিঃসন্দেহে একটি ভুল দৃষ্টিভঙ্গি।

বিশ্ববিদ্যার চেতনা ও সরকারি কলেজের শিক্ষক: এক অবমূল্যায়িত শক্তি বিশ্ববিদ্যার আলয় তথা বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটির মধ্যেই নিহিত আছে এক অনন্য দর্শন। ‘বিশ্ব’ মানে সার্বিক বা সর্বজনীন, আর ‘বিদ্যা’ মানে জ্ঞান। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয় কেবল কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণকেন্দ্র নয়; এটি মানবচিন্তা, মূল্যবোধ ও জ্ঞানের সমন্বিত বিকাশের আলয়। একজন ভালো ছাত্র কেবল রসায়ন বা অর্থনীতি জানলেই চলবে না, তাকে জানতে হবে নীতি, মানবতা, সমাজ ও সংস্কৃতির জটিল বাস্তবতাও। একইভাবে, একজন শিক্ষকের কাজ কেবল পাঠদান নয়; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে চিন্তা, প্রশ্ন ও যুক্তির বিকাশ ঘটানো। যদি শিক্ষক কেবল বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন, তবে শিক্ষার্থীরা হয়তো মেশিনের মতো তথ্য মুখস্থ করবে, কিন্তু সেই জ্ঞানকে বিশ্লেষণ, সমন্বয় ও সৃজনশীল উদ্ভাবনে রূপ দিতে পারবে না।

পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক সাধারণত একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের গভীর বিশেষজ্ঞ হন। যেমন, সাহিত্যে পিএইচডি করা শিক্ষক কোনো বিশেষ ভাষা বা ধারায় পারদর্শী হতে পারেন, কিন্তু বিজ্ঞান, অর্থনীতি বা নৈতিক দর্শনের আলোচনায় শিক্ষার্থীদের সমন্বিত বোধ গঠনে কিছতা তুলনামূলকভাবে সীমাবদ্ধ থাকতে পারেন। এই প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যার সার্বজনীন চাহিদা পূরণে সরকারি কলেজের শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকগণ অনেক সময় তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখেন। কারণ, তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিষয়জ্ঞান ছাড়াও যুক্তি, বিশ্লেষণ ও বহুমুখী জ্ঞানের সক্ষমতা যাচাই করা হয়। বিসিএস পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ-প্রিলিমিনারি, লিখিত, ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে-এই ভারসেটাইলিটি নিশ্চিত করা হয়। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে নির্দিষ্ট বিষয়ে ভালো ফলাফল বা গবেষণার ওপর। অনেক ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার দুর্বলতা প্রকৃত মেধা যাচাইকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে অনেক শিক্ষক বিষয়জ্ঞানসম্পন্ন হলেও সার্বজনীন জ্ঞান ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সীমিত থেকে যান, যা ‘বিশ্ববিদ্যা’-র মূল চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এই প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের সার্বজনীন বিকাশে সরকারি কলেজের শিক্ষকগণ, অনেক সময়, প্রথিতযশা পিএইচডিধারী বা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের তুলনায় বাস্তবিকভাবে অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন।

প্রেক্ষাপট: ঢাকার সাত কলেজ ও উচ্চ শিক্ষার বাস্তবতা

ঢাকার সাত সরকারি কলেজ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল। এই কলেজগুলোতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রাখা হয়েছে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায়। রাষ্ট্রের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের উচ্চশিক্ষা পরিষেবা বিপুল সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রসারণ করা সম্ভব নয়; ফলে কলেজ পর্যায়ের সীমিত অবকাঠামো ও সম্পদের মধ্যেও উচ্চশিক্ষা চালু রাখার প্রয়াস নেয়া হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংখ্যা কম, এই যুক্তি দেখিয়ে সাত কলেজের পাঠদান পদ্ধতি ও মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। অথচ এই কলেজগুলোর শিক্ষকগণ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়সমমানের পাঠদান ও পরীক্ষা পরিচালনা করে আসছেন, যা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক ও প্রশাসনিক সংকটের দায় একতরফাভাবে শিক্ষকদের ওপর চাপানো হচ্ছে, এবং পিএইচডিধারী শিক্ষকের অপ্রতুলতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ঐতিহ্যবাহী এই কলেজগুলো বিলুপ্ত করার প্রস্তাব তোলা হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার মান উন্নয়ন মানে প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করা নয়; বরং এসব কলেজের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা কার্যক্রমের সম্প্রসারণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ একাডেমিক উদ্যোগ গ্রহণই হতে পারে কার্যকর ও টেকসই সমাধান।

উচ্চশিক্ষার মূলত তিনটি স্তর-স্নাতক (অনার্স), স্নাতকোত্তর (মার্স্টার্স) ও গবেষণা স্তর (এমফিল/পিএইচডি)। স্নাতক স্তরে পিএইচডি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাধ্যতামূলক নয়; এ স্তরে অভিজ্ঞ বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষকও ভালো পাঠদান করতে পারেন। স্নাতকোত্তর স্তরে পিএইচডি প্রায় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে গবেষণা, তত্ত্ব ও পদ্ধতি শেখানো হয়। আর গবেষণা স্তরে পিএইচডি সম্পূর্ণ অপরিহার্য, কারণ এখানে শিক্ষককেই গবেষণার পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করতে হয়। বাংলাদেশের সরকারি কলেজভিত্তিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বৃহৎ অংশ স্নাতক পর্যায়ভিত্তিক; স্নাতকোত্তর স্তরের শিক্ষার্থী তুলনামূলকভাবে কম, আর গবেষণা স্তর কার্যত অনুপস্থিত। ফলে সরকারি কলেজের উচ্চশিক্ষায় পিএইচডিধারী শিক্ষকের উপস্থিতি নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা বাস্তবতার নিরিখে অপ্রয়োজনীয় এবং অপ্রাসংগিক।

একাডেমিক চরিত্র অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান মূলত দুধরনের- ‘শিক্ষণমুখী’ ও ‘গবেষণামুখী’। সরকারি কলেজগুলো মূলত শিক্ষণমূখী প্রতিষ্ঠান, যেখানে গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির চেয়ে বিদ্যমান জ্ঞান বিতরণের দিকেই মনোযোগ বেশি দেয়া হয়। অথচ দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও শিক্ষণমূখী উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকায় রয়েছে। সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র ঢাকার সাত কলেজ বা সরকারি কলেজে পিএইচডি শিক্ষক বা গবেষণা পরিবেশের প্রশ্ন তোলা যুক্তিসঙ্গত নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক সরকারি কলেজে পিএইচডি শিক্ষকের স্বল্পতার কথা বলে উচ্চশিক্ষা সংকোচন বা প্রতিষ্ঠান বিলুপ্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে মাত্র ৩৮% পিএইচডিধারী, আর ৬% এমফিল বা সমমানের ডিগ্রিধারী। খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই হার ৪৯%, আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ২১%। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যেই পিএইচডি অর্জনের এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে, সরকারি কলেজের শিক্ষণমুখী উচ্চশিক্ষায় পিএইচডি ডিগ্রিকে পূর্বশর্ত হিসেবে চাপানো মোটেও বাস্তবসম্মত নয়।

(অসমাপ্য)

[লেখক: শিক্ষক ও সদস্য, দি অ্যাডভাইজরস: থিংক ট্যাংক অব সিভিল এডুকেশন]

back to top