শাহ মো. জিয়াউদ্দিন
‘শকট’ শব্দটির সঙ্গে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। “শকট” শব্দের অর্থ গাড়ি বা যান। ‘শকট’-এর দুটি প্রধান অর্থ রয়েছে-একটি গাড়ি বা যান, অপরটি দৈত্যবিশেষ। তবে ব্যাটারিচালিত শকট দৈত্যের মতো নয়; কারণ এটি শব্দহীন, ছোট আকারের এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গত করে না। বর্তমানে এটি তিন চাকার গাড়ি। তবে ‘বাষ্প-শকট’ বলতে রেলগাড়িকে বোঝানো হয়। ধনীদের প্রাইভেটকারগুলোও চার চাকার শকট।
বাংলাদেশে হাতে টানা রিকশার প্রচলন শুরু হয় ১৯১৯ সালে। প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার (তৎকালীন বার্মা) থেকে প্রথমে চট্টগ্রাম শহরে এর আবির্ভাব ঘটে। ১৯২০-এর দশকে রংপুরেও কিছু রিকশা দেখা গিয়েছিল। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় যে সাইকেল রিকশা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তার উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের কলকাতা শহর। নারায়ণগঞ্জ ও নেত্রকোনায় (তৎকালীন ময়মনসিংহ) বসবাসকারী ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত পাট রপ্তানিকারকরা ১৯৩৮ সালে প্রথম এই যানটি আমদানি করেন। ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জের পর ঢাকাই ছিল বাংলাদেশের তৃতীয় শহর, যেখানে সাইকেল রিকশা চালু হয়। ১৯৪০ সালে পাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রেইলি ব্রাদার্সের একজন কেরানি কলকাতা থেকে নারায়ণগঞ্জে একটি রিকশা নিয়ে এসেছিলেন।
বর্তমানে স্বল্পসংখ্যক প্যাডেলচালিত রিকশার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রচলন শুরু হয়েছে। গত এক দশকে এই রিকশার সংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ। এর শুরু হয় সাইকেল রিকশায় ব্যাটারি সংযোজনের মাধ্যমে, যেখানে চালক প্যাডেল না ঘুরিয়ে শুধু হ্যান্ডেল ধরে রিকশা চালান এবং মোটরের সাহায্যে রিকশাটি চলে। বাংলাদেশে ২০০৭-২০০৯ সালের দিকে (বা তারও আগে) বৈদ্যুতিক রিকশার প্রচলন হয়, যা দ্রুত ঐতিহ্যবাহী প্যাডেলচালিত রিকশাগুলোকে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করে।
বাংলাদেশে ব্যাটারিচালিত রিকশার সঠিক সংখ্যা অজানা, কারণ এগুলোর নিবন্ধন দিয়ে থাকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী দেশে প্রায় ৪০ লক্ষাধিক ই-রিকশা বা ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় সাত থেকে আট লক্ষ ই-রিকশা চলাচল করে বলে অনুমান করা হয়।
ব্যাটারিচালিত রিকশা হলো প্যাডেলচালিত রিকশার একটি পরিবর্তিত রূপ, যেখানে ব্যাটারির সাহায্যে একটি ছোট মোটর চালানো হয়, যা রিকশাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। এতে চালকদের কষ্ট কমে যায় এবং জ্বালানি খরচ না থাকায় এটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। ফলে এটি অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
ঢাকার অটোরিকশাগুলো মূলত আগেকার তিন চাকার রিকশায় ব্যাটারি বসিয়ে তৈরি। এই যানটিতে দুই থেকে চারজন পর্যন্ত যাত্রী বহন করা যায়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ জানিয়েছেন, প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধে ডিএনসিসি ও ডিএমপি যৌথভাবে কাজ করছে। ঢাকায় অটোরিকশা তৈরির ওয়ার্কশপ ও চার্জিং স্টেশন বন্ধে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ইতিমধ্যে এসব ওয়ার্কশপ ও চার্জিং স্টেশনের তালিকা করেছে। চট্টগ্রাম ট্রাফিক পুলিশ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী নগরে অন্তত ৫০ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। এক সংবাদসূত্র জানায়, রাজশাহী নগরীর সড়কগুলোতে রয়েছে ৭০-৮০ হাজার অটোরিকশা। অটোরিকশা চালকেরা বলেন, সিটি করপোরেশনের একটি চক্র একেকটি লাইসেন্স দুই-তিনবার করে বিক্রি করেছে ৪০-৫০ হাজার টাকায়। খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) সূত্রে জানা গেছে, মহানগরে ৮ হাজার ইজিবাইক, ২ হাজার ৯৮টি মালবাহী ইজিবাইক ও ১৭ হাজার রিকশার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এসব অটোরিকশা থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো লাইসেন্স বাবদ মোটা অঙ্কের রাজস্ব আয় করছে।
কিছু মহল দাবি করেন, ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর ব্যাটারি চার্জে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। তবে অটোরিকশা চালকেরা বলেন, প্রতিদিন তারা ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বিনিময়ে অটো রিকশা চার্জ করেন। প্রশ্ন হলো, অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন তো এই গরিব অদক্ষ চালকেরা নেয় না; যারা অবৈধভাবে লাইন নিয়ে বিদ্যুৎ বিক্রি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এ বিষয়ে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
ঢাকা মহানগরে অটো রিকশা বন্ধে ‘অটো ট্র্যাপার’ বসানো হয়েছে-যা দিয়ে অটোর চাকা নষ্ট করা হয়। দরিদ্র চালকদের গাড়ি নষ্ট করলে কি সব সমস্যার সমাধান হবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক অটোরিকশা চালক বলেছেন, “এ দেশে ওয়াশিং মেশিন, মসলা বাটা, শাকসবজি কাটার মেশিন, ইলেকট্রিক ইস্ত্রি, ফ্যান, ওয়াটার কুলার, এয়ার কুলারসহ নানা গৃহস্থালি যন্ত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। এগুলোতে যদি বিদ্যুৎ ঘাটতি না হয়, তাহলে অটো চালকদের সামান্য ব্যাটারি চার্জে কেন হবে?” তিনি আরও বলেন, “আমাদের পরিবারে তো এয়ার কুলার, ওয়াটার কুলারসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় না। আমরা টাকায় চার্জ করি।” চালকের এই কথাটি সংশ্লিষ্টদের ভাবা উচিত।
ট্রাফিক জটের বড় কারণ অটোরিকশা-এই কথাটি কতটা যুক্তিযুক্ত? ঢাকার নিউমার্কেট থেকে আসাদগেট পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে অসংখ্য প্রাইভেটকার সারিবদ্ধভাবে পার্কিং করা থাকে। রাস্তার প্রায় অর্ধেক অংশ এসব গাড়ির দখলে। এই প্রাইভেটকারগুলো কি যানজট সৃষ্টি করছে না?
সম্প্রতি সিলেটে অটোরিকশা শ্রমিকদের আন্দোলন দমন করতে পুলিশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রায় ৪০ দিন ধরে সিলেটে অটোরিকশা বন্ধ রয়েছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলসহ ১১ দফা দাবিতে শহীদ মিনার এলাকায় প্রতীকী অনশন করার কথা ছিল রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের। কিন্তু পুলিশের অভিযানে ২৮ নেতা-কর্মী ও শ্রমিক আটক হওয়ায় তারা আন্দোলন থেকে পিছু হটেছেন।
একটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইউনিয়নটি আগামী ২ নভেম্বর ২০২৫ (রোববার) নির্ধারিত অনশন কর্মসূচি স্থগিত করেছে। সংগঠনের নেতারা বলেন, “সিলেটের রিকশা শ্রমিকদের আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা সিলেটবাসীকে আবার ফ্যাসিবাদী আমলের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।”
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) জানান, “আমরা অনেককে আটক করেছি; ১২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তবে ২৩ জনকে আদালতে তোলা হবে।” গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের দাবি-রিকশা শ্রমিকদের আন্দোলনে তৃতীয় কোনো পক্ষ ইন্ধন দিচ্ছে, যদিও সেই পক্ষের পরিচয় জানায়নি পুলিশ। প্রশ্ন হচ্ছে-যদি জানাই না, তবে তৃতীয় পক্ষের কথা পুলিশ জানল কীভাবে?
দেশের এই ন্যূনতম মজুরি পাওয়া শ্রমিকদের ওপর এমন অমানবিক আচরণ সত্যিই দুঃখজনক। ব্যাটারিচালিত যান নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য একটি সহায়ক যান। তবে এই যান থাকার কারণে ধনীদের প্রাইভেটকারগুলোর কিছু অসুবিধা হয়; তাই রাষ্ট্র কাঠামো বারবার ধনিক শ্রেণির স্বার্থে দেশের বিভিন্ন স্থানে অটোরিকশা বন্ধের পাঁয়তারা করছে।
দেশে প্রায় ৫০ লাখ অটোরিকশা চালক রয়েছেন। দেখা যায়, একটি রিকশা দিয়ে চালকসহ অন্তত চারজনের আহার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা হয়। সেই হিসাবে দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রায় দুই কোটিরও বেশি। সুতরাং কারও ইচ্ছায় অটো বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই সমাধান হতে পারে না। অটো বন্ধ করে দিলে এই বিপুলসংখ্যক বেকার মানুষের কী হবে, সেটি সরকারের গভীরভাবে ভাবা উচিত।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: উন্নয়নকর্মী]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
শাহ মো. জিয়াউদ্দিন
বুধবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৫
‘শকট’ শব্দটির সঙ্গে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। “শকট” শব্দের অর্থ গাড়ি বা যান। ‘শকট’-এর দুটি প্রধান অর্থ রয়েছে-একটি গাড়ি বা যান, অপরটি দৈত্যবিশেষ। তবে ব্যাটারিচালিত শকট দৈত্যের মতো নয়; কারণ এটি শব্দহীন, ছোট আকারের এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গত করে না। বর্তমানে এটি তিন চাকার গাড়ি। তবে ‘বাষ্প-শকট’ বলতে রেলগাড়িকে বোঝানো হয়। ধনীদের প্রাইভেটকারগুলোও চার চাকার শকট।
বাংলাদেশে হাতে টানা রিকশার প্রচলন শুরু হয় ১৯১৯ সালে। প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার (তৎকালীন বার্মা) থেকে প্রথমে চট্টগ্রাম শহরে এর আবির্ভাব ঘটে। ১৯২০-এর দশকে রংপুরেও কিছু রিকশা দেখা গিয়েছিল। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় যে সাইকেল রিকশা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তার উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের কলকাতা শহর। নারায়ণগঞ্জ ও নেত্রকোনায় (তৎকালীন ময়মনসিংহ) বসবাসকারী ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত পাট রপ্তানিকারকরা ১৯৩৮ সালে প্রথম এই যানটি আমদানি করেন। ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জের পর ঢাকাই ছিল বাংলাদেশের তৃতীয় শহর, যেখানে সাইকেল রিকশা চালু হয়। ১৯৪০ সালে পাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রেইলি ব্রাদার্সের একজন কেরানি কলকাতা থেকে নারায়ণগঞ্জে একটি রিকশা নিয়ে এসেছিলেন।
বর্তমানে স্বল্পসংখ্যক প্যাডেলচালিত রিকশার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রচলন শুরু হয়েছে। গত এক দশকে এই রিকশার সংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ। এর শুরু হয় সাইকেল রিকশায় ব্যাটারি সংযোজনের মাধ্যমে, যেখানে চালক প্যাডেল না ঘুরিয়ে শুধু হ্যান্ডেল ধরে রিকশা চালান এবং মোটরের সাহায্যে রিকশাটি চলে। বাংলাদেশে ২০০৭-২০০৯ সালের দিকে (বা তারও আগে) বৈদ্যুতিক রিকশার প্রচলন হয়, যা দ্রুত ঐতিহ্যবাহী প্যাডেলচালিত রিকশাগুলোকে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করে।
বাংলাদেশে ব্যাটারিচালিত রিকশার সঠিক সংখ্যা অজানা, কারণ এগুলোর নিবন্ধন দিয়ে থাকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী দেশে প্রায় ৪০ লক্ষাধিক ই-রিকশা বা ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় সাত থেকে আট লক্ষ ই-রিকশা চলাচল করে বলে অনুমান করা হয়।
ব্যাটারিচালিত রিকশা হলো প্যাডেলচালিত রিকশার একটি পরিবর্তিত রূপ, যেখানে ব্যাটারির সাহায্যে একটি ছোট মোটর চালানো হয়, যা রিকশাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। এতে চালকদের কষ্ট কমে যায় এবং জ্বালানি খরচ না থাকায় এটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। ফলে এটি অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
ঢাকার অটোরিকশাগুলো মূলত আগেকার তিন চাকার রিকশায় ব্যাটারি বসিয়ে তৈরি। এই যানটিতে দুই থেকে চারজন পর্যন্ত যাত্রী বহন করা যায়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ জানিয়েছেন, প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধে ডিএনসিসি ও ডিএমপি যৌথভাবে কাজ করছে। ঢাকায় অটোরিকশা তৈরির ওয়ার্কশপ ও চার্জিং স্টেশন বন্ধে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ইতিমধ্যে এসব ওয়ার্কশপ ও চার্জিং স্টেশনের তালিকা করেছে। চট্টগ্রাম ট্রাফিক পুলিশ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী নগরে অন্তত ৫০ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। এক সংবাদসূত্র জানায়, রাজশাহী নগরীর সড়কগুলোতে রয়েছে ৭০-৮০ হাজার অটোরিকশা। অটোরিকশা চালকেরা বলেন, সিটি করপোরেশনের একটি চক্র একেকটি লাইসেন্স দুই-তিনবার করে বিক্রি করেছে ৪০-৫০ হাজার টাকায়। খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) সূত্রে জানা গেছে, মহানগরে ৮ হাজার ইজিবাইক, ২ হাজার ৯৮টি মালবাহী ইজিবাইক ও ১৭ হাজার রিকশার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এসব অটোরিকশা থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো লাইসেন্স বাবদ মোটা অঙ্কের রাজস্ব আয় করছে।
কিছু মহল দাবি করেন, ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর ব্যাটারি চার্জে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। তবে অটোরিকশা চালকেরা বলেন, প্রতিদিন তারা ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বিনিময়ে অটো রিকশা চার্জ করেন। প্রশ্ন হলো, অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন তো এই গরিব অদক্ষ চালকেরা নেয় না; যারা অবৈধভাবে লাইন নিয়ে বিদ্যুৎ বিক্রি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এ বিষয়ে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
ঢাকা মহানগরে অটো রিকশা বন্ধে ‘অটো ট্র্যাপার’ বসানো হয়েছে-যা দিয়ে অটোর চাকা নষ্ট করা হয়। দরিদ্র চালকদের গাড়ি নষ্ট করলে কি সব সমস্যার সমাধান হবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক অটোরিকশা চালক বলেছেন, “এ দেশে ওয়াশিং মেশিন, মসলা বাটা, শাকসবজি কাটার মেশিন, ইলেকট্রিক ইস্ত্রি, ফ্যান, ওয়াটার কুলার, এয়ার কুলারসহ নানা গৃহস্থালি যন্ত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। এগুলোতে যদি বিদ্যুৎ ঘাটতি না হয়, তাহলে অটো চালকদের সামান্য ব্যাটারি চার্জে কেন হবে?” তিনি আরও বলেন, “আমাদের পরিবারে তো এয়ার কুলার, ওয়াটার কুলারসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় না। আমরা টাকায় চার্জ করি।” চালকের এই কথাটি সংশ্লিষ্টদের ভাবা উচিত।
ট্রাফিক জটের বড় কারণ অটোরিকশা-এই কথাটি কতটা যুক্তিযুক্ত? ঢাকার নিউমার্কেট থেকে আসাদগেট পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে অসংখ্য প্রাইভেটকার সারিবদ্ধভাবে পার্কিং করা থাকে। রাস্তার প্রায় অর্ধেক অংশ এসব গাড়ির দখলে। এই প্রাইভেটকারগুলো কি যানজট সৃষ্টি করছে না?
সম্প্রতি সিলেটে অটোরিকশা শ্রমিকদের আন্দোলন দমন করতে পুলিশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রায় ৪০ দিন ধরে সিলেটে অটোরিকশা বন্ধ রয়েছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলসহ ১১ দফা দাবিতে শহীদ মিনার এলাকায় প্রতীকী অনশন করার কথা ছিল রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের। কিন্তু পুলিশের অভিযানে ২৮ নেতা-কর্মী ও শ্রমিক আটক হওয়ায় তারা আন্দোলন থেকে পিছু হটেছেন।
একটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইউনিয়নটি আগামী ২ নভেম্বর ২০২৫ (রোববার) নির্ধারিত অনশন কর্মসূচি স্থগিত করেছে। সংগঠনের নেতারা বলেন, “সিলেটের রিকশা শ্রমিকদের আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা সিলেটবাসীকে আবার ফ্যাসিবাদী আমলের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।”
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) জানান, “আমরা অনেককে আটক করেছি; ১২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তবে ২৩ জনকে আদালতে তোলা হবে।” গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের দাবি-রিকশা শ্রমিকদের আন্দোলনে তৃতীয় কোনো পক্ষ ইন্ধন দিচ্ছে, যদিও সেই পক্ষের পরিচয় জানায়নি পুলিশ। প্রশ্ন হচ্ছে-যদি জানাই না, তবে তৃতীয় পক্ষের কথা পুলিশ জানল কীভাবে?
দেশের এই ন্যূনতম মজুরি পাওয়া শ্রমিকদের ওপর এমন অমানবিক আচরণ সত্যিই দুঃখজনক। ব্যাটারিচালিত যান নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য একটি সহায়ক যান। তবে এই যান থাকার কারণে ধনীদের প্রাইভেটকারগুলোর কিছু অসুবিধা হয়; তাই রাষ্ট্র কাঠামো বারবার ধনিক শ্রেণির স্বার্থে দেশের বিভিন্ন স্থানে অটোরিকশা বন্ধের পাঁয়তারা করছে।
দেশে প্রায় ৫০ লাখ অটোরিকশা চালক রয়েছেন। দেখা যায়, একটি রিকশা দিয়ে চালকসহ অন্তত চারজনের আহার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা হয়। সেই হিসাবে দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রায় দুই কোটিরও বেশি। সুতরাং কারও ইচ্ছায় অটো বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই সমাধান হতে পারে না। অটো বন্ধ করে দিলে এই বিপুলসংখ্যক বেকার মানুষের কী হবে, সেটি সরকারের গভীরভাবে ভাবা উচিত।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: উন্নয়নকর্মী]