alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

গণভোটের রাজনৈতিক গুরুত্ব

ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ

: বৃহস্পতিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৫

গণতন্ত্রের মূল দর্শন হলো জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা। জনগণই রাষ্ট্রের মালিক, আর সরকার কেবল তাদের প্রতিনিধি। এই নীতিকেই বাস্তবে রূপ দেয় গণভোট, যেখানে জনগণ সরাসরি “হ্যাঁ” বা “না” ভোটের মাধ্যমে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অংশ নেয়। এটি এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নাগরিকেরা সংসদ বা সরকারের বদলে নিজেরাই রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে মত প্রকাশ করতে পারেন। গণভোট তাই গণতন্ত্রের এক উজ্জ্বল অনুশীলন এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রকৃত প্রতিফলন। গণভোট শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন রিফেরি থেকে, যার অর্থ “ফিরিয়ে দেওয়া” বা “জনমতের কাছে উপস্থাপন করা”। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণভোট হলো এমন এক সাংবিধানিক বা নীতিগত প্রক্রিয়া, যেখানে সরকার জনগণের কাছে কোনো প্রশ্ন বা প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়, জনগণই এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়। বিশ্বের বহু দেশে গণভোটের প্রচলন দীর্ঘদিনের। সুইজারল্যান্ড গণভোটের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সমৃদ্ধ উদাহরণ। দেশটিতে প্রতি বছরই নানান সাংবিধানিক ও নীতিগত প্রশ্নে গণভোট হয়। সেখানে নাগরিকদের একটি নির্দিষ্ট অংশ চাইলে সংসদকে বাধ্য করা হয় গণভোটের আয়োজন করতে। যুক্তরাজ্য ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা বা “ব্রেক্সিট” সিদ্ধান্ত নিয়েছিল গণভোটের মাধ্যমে, যেখানে ৫১.৯% মানুষ ‘ছাড়ার’ পক্ষে রায় দেন। ফ্রান্স ১৯৫৮ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং প্রেসিডেন্ট শাসিত পঞ্চম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য গণভোট আয়োজন করেছিল। ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এক গণভোটের মাধ্যমে দেশটিকে সংসদীয় থেকে প্রেসিডেন্ট শাসিত ব্যবস্থায় রূপান্তর করেন। মিশর, ইন্দোনেশিয়া, ভেনিজুয়েলা সহ অনেক উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে গণভোট ব্যবহৃত হয়েছে নতুন সংবিধান গ্রহণ, সরকারের বৈধতা যাচাই বা ক্ষমতা সম্প্রসারণে. অতএব, বৈশ্বিক দৃষ্টিতে গণভোট কখনও গণতন্ত্রের বিকাশে ভূমিকা রেখেছে, আবার কখনও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের হাতিয়ারও হয়েছে। গণভোটের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে এর স্বচ্ছতা, মুক্ত মত প্রকাশের পরিবেশ এবং জনঅংশগ্রহণের স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে তার ওপর।

২০১৭ সালের ১৬ এপ্রিল তুরস্কে সবচেয়ে বিতর্কিত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। বিষয় ছিল সংসদীয় ব্যবস্থার বদলে প্রেসিডেন্সিয়াল শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। সরকারি ফলাফলে দেখা যায়, ‘হ্যাঁ’ ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ‘না’ ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ, ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৮৫ শতাংশ। ফলাফলে অল্প ব্যবধান এবং উচ্চ ভোটার উপস্থিতি এই গণভোটকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিতর্কিত করেছে। গণভোটকে বিতর্কিত বলা হচ্ছে মূলত, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং ভোট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের কারণে। নতুন সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আইন প্রণয়ন, জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে সরাসরি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। সমালোচকেরা মনে করেন, এটি ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, যা গণতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। ভোটের পরিবেশ নিয়েও তখন বিতর্ক দেখা দেয়। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে, ভোটের সময় মিডিয়া ও প্রশাসন সরকারপক্ষীয় ছিল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মিশ্র বার্তা দেন। যদিও ভোট শান্তিপূর্ণ ছিল, তবে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফলাফলের সামান্য ব্যবধানও বিতর্কের একটি কারণ। মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যবধানের কারণে ভোটের ফল অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে এবং দেশের রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হয়। গণভোটের মাধ্যমে তুরস্কে সংসদীয় থেকে প্রেসিডেন্সিয়াল শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি ও সরকার কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের কারণে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর গণভোটের ইতিহাস খুব সংক্ষিপ্ত হলেও তা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর তিনটি জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতি জনগণের আস্থা যাচাইয়ের জন্য ৩০ মে ১৯৭৭ সালে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জাতীয় গণভোট। ভোটারদের প্রশ্ন ছিল “আপনি কি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতিমালার প্রতি আস্থা রাখেন?” সরকারি ফলাফলে প্রায় ৮৮% ভোটার অংশগ্রহণ করেন এবং ৯৯% ভোট ‘হ্যাঁ’ পড়ে। তবে বিরোধী দলগুলো এ গণভোটকে “ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠার কৌশল” বলে আখ্যা দিয়েছিল। মার্চ ১৯৮৫ সালে প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনকালেও এক গণভোট হয়। ফলাফলে প্রায় ৯৪% ভোট ‘হ্যাঁ’ পড়ে। তবে তখনও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নেয়নি এবং ভোটে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। এই দুই গণভোটই মূলত সামরিক শাসকদের রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণভোট, সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর অনুমোদনের জন্য। এতে জনগণ রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেন। প্রায় ৮৪% ভোটার “হ্যাঁ” ভোট দেন এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পথ পুনর্গঠিত হয়। এরপর সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে (২০১১) গণভোটের বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হয়, ফলে বর্তমানে সংবিধানে আর কোনো বিষয়েই গণভোট আয়োজনের বাধ্যতামূলক বিধান নেই।

নিকট অতীতে বাংলাদেশের রাজনীতি খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলো। সাম্প্রতিক কয়েকটি সাধারণ নির্বাচনে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ভোট বাদ দিয়েছে এবং ভোটের পরিবেশ নিয়ে ব্যাপক শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে পর্যালোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো বলেছে নির্বাচনটি “ফ্রি ও ফেয়ার” হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধানও ভোটের আগে সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপের নিন্দা করেন। একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সিইসি ঘোষিত ভোটার উপস্থিতি ৪১.৮% হলেও এই পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। যেমন, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের শেষ ঘণ্টায় ভোটার উপস্থিতি ২৭.১৫% ছিল বলে জানিয়েছিল, হঠাৎ ৪১.৮% এ পৌছানো হলেও বিরোধীরা সেটা ভুল বলে দাবি করে। এ ছাড়াও নির্বাচনের আগে পুলিশের অভিযান ও সমাবেশ নিষিদ্ধের ফলে সহিংসতা ও হাজার হাজার বিরোধী কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের পরিবেশকে আঘাত করেছে।

গণভোটের সুফল ও ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। সমালোচকদের একটি যুক্তি হলো, রাজনৈতিক পার্টির নির্বাচনী ইশতেহারে বিবৃত দৃষ্টিভঙ্গি গন্য করা হচ্ছে, তাই আলাদা গণভোটের প্রয়োজন নেই। একটি মতবাদ অনুযায়ী, যদি কোনো দল নির্বাচনে জয়ী হয় তবে তার নীতিমালাই জনমত অনুমোদন পেয়েছে এবং সে অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করবে। তাছাড়া একক গণভোটে ৪৮টি বিস্তৃত প্রস্তাব একসঙ্গে গণনা করলে ভোটারদের বিভ্রান্তি হতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সমর্থন না থাকলে গণভোট পাশ হলেও অনেকে হতাশ হতে পারেন। জনগণের নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে গণভোটের প্রয়োজন অনুচিত, কারণ নির্বাচনে ঠিক যে দল বিজয়ী হয় জনগণ তার প্রতি আস্থা প্রদর্শন করেছে। অন্যদিকে শাসনকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবকরা মনে করেন গণভোট এই ঝামেলা কাটিয়ে সাংবিধানিক সংস্কারকে বৈধতা দেবে। ন্যাশনাল কনসেনসাস কমিশনের প্রতিবেদন অনুসারে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈপ্লবিক মতভেদ থাকলেও ‘অংশগ্রহণমূলক গণভোট’ নিয়ে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে। তবে জেলহাইকা বা ভোটবহির্ভূত প্রভাব এলে জনমত বৈধ হবে না এমন উদ্বেগও আছে। জনমতের দিক থেকেও প্রশ্ন রয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখায়, গণভোটে ভোটার উপস্থিতি সর্বদা বিষয়টিকে অনুধাবন করে না। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯১ সালের গণভোটে জাতির পুস্তক অনুযায়ী প্রায় ৯০% ভোটার বিষয়টিকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বললেও ভোটেই মাত্র ৩৫% অংশগ্রহণ করে। অর্থাৎ জনপ্রিয় সমর্থন থাকলেও অংশগ্রহণ কম থাকায় গণভোটের ফলাফল পুরোদস্তুর জনমত প্রতিফলন নাও হতে পারে। এই জন্য প্রচার-প্রচারণা এবং ভোটারদের সচেতনতা বাড়ানো, ভোট গ্রহণ যথাযথভাবে সম্পন্ন করার মতো আয়োজন প্রয়োজন।

বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো মূলত নির্বাচন কমিশন ও অস্থায়ী সরকারের প্রশ্নে মতানৈক্য দেখিয়েছে। বিএনপি নানান গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিতে নির্বাচনে অঙ্গীকারবিহীন থাকার অভিযোগ এনে বিরোধিতা করেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ২০২৩ সালে অস্থায়ী সরকারের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার, নতুন ভোটার তালিকা এবং নিরপেক্ষ ইসি প্রতিষ্ঠার দাবিতে সাধারণ নির্বাচন বর্জন করেছিল। বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী অভিব্যক্তি দিয়েছেন যে দরকারবিহীনভাবে গণভোট নিয়ে অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং এর ফলে গণতন্ত্রের পথে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এদিকে কয়েকটি ইসলামি এবং স্বতন্ত্র দল গণভোটের পক্ষে রায়ের দাবি তুলেছে। নির্বাচনী পরিবেশ ও অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় সাধারণ জনমনে হতাশার ছাপ বিরাজ করছে। সব মিলিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপট একদিকে একদলীয় শাসনের দিকে হাওয়া বইছে, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক সংস্কার নিয়ে চাহিদা বেড়ে উঠছে।

বাংলাদেশের জন্য গণভোট জনমত যাচাইয়ের উদ্যোগ হিসেবে গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে, তবে লোপ সিস্টেম না থাকলে এটি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর হবে না। বর্তমান রাজনৈতিক তৎপরতায় গণভোটকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তগুলিকে গ্রহণযোগ্য করতে হলে বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐক্যমত্য, ওপেন আলোচনা এবং সুশৃঙ্খল আয়োজন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নতুবা জনমতবিরোধী অভিযোগ এবং নির্বাচন-ভঙ্গুর পরিপ্রেক্ষিতে গণভোট আরও বিতর্ক ও বিভক্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই গঠনমূলক গণভোট আয়োজনের গুরুত্ব সত্ত্বেও এর সঠিক বাস্তবায়ন বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যথেষ্ট জটিল ও চ্যালেঞ্জিং কাজ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গণভোট এমন এক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যা রাষ্ট্রের মালিক জনগণকে সরাসরি নীতিনির্ধারণে অংশ নিতে সুযোগ দেয়। বিশ্বজুড়ে গণভোট কখনও গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটিয়েছে, আবার কখনও ক্ষমতার হাতিয়ার হয়েছে, সবই নির্ভর করেছে পরিবেশের স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতার ওপর। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গণভোটের ইতিহাস মিশ্র, তবে এর সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। যদি রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারে, এবং যদি নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখে, তাহলে গণভোট হতে পারে জনগণের সত্যিকারের কণ্ঠস্বর প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম। তবে এর আগে দরকার, জনগণের আস্থা ফেরানো, মুক্ত মত প্রকাশ নিশ্চিত করা, এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। এমন একটি পরিবেশে গণভোট কেবল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং হতে পারে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের নতুন অধ্যায়।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

নিজের চেতনায় নিজেরই ঘা দেয়া জরুরি

ঋণ অবলোপনের প্রভাব

ভেজাল গুড়ের মরণফাঁদ: বাঙালির ঐতিহ্য, জনস্বাস্থ্য ও আস্থার নীরব বিপর্যয়

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস

জোটের ভোট নাকি ভোটের জোট, কৌশলটা কী?

প্রমাণ তো করতে হবে আমরা হাসিনার চেয়ে ভালো

ছবি

কৃষি ডেটা ব্যবস্থাপনা

যুক্তরাজ্যে ভর্তি স্থগিতের কুয়াশা: তালা লাগলেও চাবি আমাদের হাতে

শিক্ষকদের কর্মবিরতি: পেশাগত নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ

জাতীয় রক্তগ্রুপ নির্ণয় দিবস

জাল সনদপত্রে শিক্ষকতা

সাধারণ চুক্তিগুলোও গোপনীয় কেন

ছবি

শিশুখাদ্যের নিরাপত্তা: জাতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষার প্রথম শর্ত

ছবি

ফিনল্যান্ড কেন সুখী দেশ

ছবি

কৃষকের সংকট ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

আলু চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

ই-বর্জ্য: নীরব বিষে দগ্ধ আমাদের ভবিষ্যৎ

ঢাকার জনপরিসর: আর্ভিং গফম্যানের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

আলু চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

কলি ফুটিতে চাহে ফোটে না!

কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তি

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে লোকালাইজেশন অপরিহার্য

আইসিইউ থেকে বাড়ি ফেরা ও খাদের কিনারায় থাকা দেশ

বিচারবহির্ভূত হত্যার দায় কার?

ছবি

ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা কৌশল

অযৌক্তিক দাবি: পেশাগত নৈতিকতার সংকট ও জনপ্রশাসন

সড়ক দুর্ঘটনা এখন জাতীয় সংকট

কেন বাড়ছে দারিদ্র্য?

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্জন্ম

লবণাক্ততায় ডুবছে উপকূল

বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ও বাস্তবতা

সড়ক দুর্ঘটনার সমাজতত্ত্ব: আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা ও কাঠামোর চক্রাকার পুনরুৎপাদন

ছবি

অস্থির সময় ও অস্থির সমাজের পাঁচালি

ভারতে বামপন্থার পুনর্জাগরণ: ব্যাধি ও প্রতিকার

চিপনির্ভরতা কাটিয়ে চীনের উত্থান

একতার বাতাসে উড়ুক দক্ষিণ এশিয়ার পতাকা

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

গণভোটের রাজনৈতিক গুরুত্ব

ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ

বৃহস্পতিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৫

গণতন্ত্রের মূল দর্শন হলো জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা। জনগণই রাষ্ট্রের মালিক, আর সরকার কেবল তাদের প্রতিনিধি। এই নীতিকেই বাস্তবে রূপ দেয় গণভোট, যেখানে জনগণ সরাসরি “হ্যাঁ” বা “না” ভোটের মাধ্যমে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অংশ নেয়। এটি এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নাগরিকেরা সংসদ বা সরকারের বদলে নিজেরাই রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে মত প্রকাশ করতে পারেন। গণভোট তাই গণতন্ত্রের এক উজ্জ্বল অনুশীলন এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রকৃত প্রতিফলন। গণভোট শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন রিফেরি থেকে, যার অর্থ “ফিরিয়ে দেওয়া” বা “জনমতের কাছে উপস্থাপন করা”। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণভোট হলো এমন এক সাংবিধানিক বা নীতিগত প্রক্রিয়া, যেখানে সরকার জনগণের কাছে কোনো প্রশ্ন বা প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়, জনগণই এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়। বিশ্বের বহু দেশে গণভোটের প্রচলন দীর্ঘদিনের। সুইজারল্যান্ড গণভোটের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সমৃদ্ধ উদাহরণ। দেশটিতে প্রতি বছরই নানান সাংবিধানিক ও নীতিগত প্রশ্নে গণভোট হয়। সেখানে নাগরিকদের একটি নির্দিষ্ট অংশ চাইলে সংসদকে বাধ্য করা হয় গণভোটের আয়োজন করতে। যুক্তরাজ্য ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা বা “ব্রেক্সিট” সিদ্ধান্ত নিয়েছিল গণভোটের মাধ্যমে, যেখানে ৫১.৯% মানুষ ‘ছাড়ার’ পক্ষে রায় দেন। ফ্রান্স ১৯৫৮ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং প্রেসিডেন্ট শাসিত পঞ্চম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য গণভোট আয়োজন করেছিল। ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এক গণভোটের মাধ্যমে দেশটিকে সংসদীয় থেকে প্রেসিডেন্ট শাসিত ব্যবস্থায় রূপান্তর করেন। মিশর, ইন্দোনেশিয়া, ভেনিজুয়েলা সহ অনেক উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে গণভোট ব্যবহৃত হয়েছে নতুন সংবিধান গ্রহণ, সরকারের বৈধতা যাচাই বা ক্ষমতা সম্প্রসারণে. অতএব, বৈশ্বিক দৃষ্টিতে গণভোট কখনও গণতন্ত্রের বিকাশে ভূমিকা রেখেছে, আবার কখনও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের হাতিয়ারও হয়েছে। গণভোটের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে এর স্বচ্ছতা, মুক্ত মত প্রকাশের পরিবেশ এবং জনঅংশগ্রহণের স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে তার ওপর।

২০১৭ সালের ১৬ এপ্রিল তুরস্কে সবচেয়ে বিতর্কিত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। বিষয় ছিল সংসদীয় ব্যবস্থার বদলে প্রেসিডেন্সিয়াল শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। সরকারি ফলাফলে দেখা যায়, ‘হ্যাঁ’ ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ‘না’ ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ, ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৮৫ শতাংশ। ফলাফলে অল্প ব্যবধান এবং উচ্চ ভোটার উপস্থিতি এই গণভোটকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিতর্কিত করেছে। গণভোটকে বিতর্কিত বলা হচ্ছে মূলত, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং ভোট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের কারণে। নতুন সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আইন প্রণয়ন, জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে সরাসরি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। সমালোচকেরা মনে করেন, এটি ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, যা গণতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। ভোটের পরিবেশ নিয়েও তখন বিতর্ক দেখা দেয়। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে, ভোটের সময় মিডিয়া ও প্রশাসন সরকারপক্ষীয় ছিল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মিশ্র বার্তা দেন। যদিও ভোট শান্তিপূর্ণ ছিল, তবে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফলাফলের সামান্য ব্যবধানও বিতর্কের একটি কারণ। মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যবধানের কারণে ভোটের ফল অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে এবং দেশের রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হয়। গণভোটের মাধ্যমে তুরস্কে সংসদীয় থেকে প্রেসিডেন্সিয়াল শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি ও সরকার কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের কারণে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর গণভোটের ইতিহাস খুব সংক্ষিপ্ত হলেও তা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর তিনটি জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতি জনগণের আস্থা যাচাইয়ের জন্য ৩০ মে ১৯৭৭ সালে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জাতীয় গণভোট। ভোটারদের প্রশ্ন ছিল “আপনি কি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতিমালার প্রতি আস্থা রাখেন?” সরকারি ফলাফলে প্রায় ৮৮% ভোটার অংশগ্রহণ করেন এবং ৯৯% ভোট ‘হ্যাঁ’ পড়ে। তবে বিরোধী দলগুলো এ গণভোটকে “ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠার কৌশল” বলে আখ্যা দিয়েছিল। মার্চ ১৯৮৫ সালে প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনকালেও এক গণভোট হয়। ফলাফলে প্রায় ৯৪% ভোট ‘হ্যাঁ’ পড়ে। তবে তখনও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নেয়নি এবং ভোটে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। এই দুই গণভোটই মূলত সামরিক শাসকদের রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণভোট, সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর অনুমোদনের জন্য। এতে জনগণ রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেন। প্রায় ৮৪% ভোটার “হ্যাঁ” ভোট দেন এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পথ পুনর্গঠিত হয়। এরপর সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে (২০১১) গণভোটের বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হয়, ফলে বর্তমানে সংবিধানে আর কোনো বিষয়েই গণভোট আয়োজনের বাধ্যতামূলক বিধান নেই।

নিকট অতীতে বাংলাদেশের রাজনীতি খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলো। সাম্প্রতিক কয়েকটি সাধারণ নির্বাচনে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ভোট বাদ দিয়েছে এবং ভোটের পরিবেশ নিয়ে ব্যাপক শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে পর্যালোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো বলেছে নির্বাচনটি “ফ্রি ও ফেয়ার” হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধানও ভোটের আগে সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপের নিন্দা করেন। একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সিইসি ঘোষিত ভোটার উপস্থিতি ৪১.৮% হলেও এই পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। যেমন, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের শেষ ঘণ্টায় ভোটার উপস্থিতি ২৭.১৫% ছিল বলে জানিয়েছিল, হঠাৎ ৪১.৮% এ পৌছানো হলেও বিরোধীরা সেটা ভুল বলে দাবি করে। এ ছাড়াও নির্বাচনের আগে পুলিশের অভিযান ও সমাবেশ নিষিদ্ধের ফলে সহিংসতা ও হাজার হাজার বিরোধী কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের পরিবেশকে আঘাত করেছে।

গণভোটের সুফল ও ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। সমালোচকদের একটি যুক্তি হলো, রাজনৈতিক পার্টির নির্বাচনী ইশতেহারে বিবৃত দৃষ্টিভঙ্গি গন্য করা হচ্ছে, তাই আলাদা গণভোটের প্রয়োজন নেই। একটি মতবাদ অনুযায়ী, যদি কোনো দল নির্বাচনে জয়ী হয় তবে তার নীতিমালাই জনমত অনুমোদন পেয়েছে এবং সে অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করবে। তাছাড়া একক গণভোটে ৪৮টি বিস্তৃত প্রস্তাব একসঙ্গে গণনা করলে ভোটারদের বিভ্রান্তি হতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সমর্থন না থাকলে গণভোট পাশ হলেও অনেকে হতাশ হতে পারেন। জনগণের নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে গণভোটের প্রয়োজন অনুচিত, কারণ নির্বাচনে ঠিক যে দল বিজয়ী হয় জনগণ তার প্রতি আস্থা প্রদর্শন করেছে। অন্যদিকে শাসনকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবকরা মনে করেন গণভোট এই ঝামেলা কাটিয়ে সাংবিধানিক সংস্কারকে বৈধতা দেবে। ন্যাশনাল কনসেনসাস কমিশনের প্রতিবেদন অনুসারে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈপ্লবিক মতভেদ থাকলেও ‘অংশগ্রহণমূলক গণভোট’ নিয়ে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে। তবে জেলহাইকা বা ভোটবহির্ভূত প্রভাব এলে জনমত বৈধ হবে না এমন উদ্বেগও আছে। জনমতের দিক থেকেও প্রশ্ন রয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখায়, গণভোটে ভোটার উপস্থিতি সর্বদা বিষয়টিকে অনুধাবন করে না। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯১ সালের গণভোটে জাতির পুস্তক অনুযায়ী প্রায় ৯০% ভোটার বিষয়টিকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বললেও ভোটেই মাত্র ৩৫% অংশগ্রহণ করে। অর্থাৎ জনপ্রিয় সমর্থন থাকলেও অংশগ্রহণ কম থাকায় গণভোটের ফলাফল পুরোদস্তুর জনমত প্রতিফলন নাও হতে পারে। এই জন্য প্রচার-প্রচারণা এবং ভোটারদের সচেতনতা বাড়ানো, ভোট গ্রহণ যথাযথভাবে সম্পন্ন করার মতো আয়োজন প্রয়োজন।

বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো মূলত নির্বাচন কমিশন ও অস্থায়ী সরকারের প্রশ্নে মতানৈক্য দেখিয়েছে। বিএনপি নানান গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিতে নির্বাচনে অঙ্গীকারবিহীন থাকার অভিযোগ এনে বিরোধিতা করেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ২০২৩ সালে অস্থায়ী সরকারের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার, নতুন ভোটার তালিকা এবং নিরপেক্ষ ইসি প্রতিষ্ঠার দাবিতে সাধারণ নির্বাচন বর্জন করেছিল। বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী অভিব্যক্তি দিয়েছেন যে দরকারবিহীনভাবে গণভোট নিয়ে অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং এর ফলে গণতন্ত্রের পথে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এদিকে কয়েকটি ইসলামি এবং স্বতন্ত্র দল গণভোটের পক্ষে রায়ের দাবি তুলেছে। নির্বাচনী পরিবেশ ও অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় সাধারণ জনমনে হতাশার ছাপ বিরাজ করছে। সব মিলিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপট একদিকে একদলীয় শাসনের দিকে হাওয়া বইছে, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক সংস্কার নিয়ে চাহিদা বেড়ে উঠছে।

বাংলাদেশের জন্য গণভোট জনমত যাচাইয়ের উদ্যোগ হিসেবে গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে, তবে লোপ সিস্টেম না থাকলে এটি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর হবে না। বর্তমান রাজনৈতিক তৎপরতায় গণভোটকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তগুলিকে গ্রহণযোগ্য করতে হলে বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐক্যমত্য, ওপেন আলোচনা এবং সুশৃঙ্খল আয়োজন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নতুবা জনমতবিরোধী অভিযোগ এবং নির্বাচন-ভঙ্গুর পরিপ্রেক্ষিতে গণভোট আরও বিতর্ক ও বিভক্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই গঠনমূলক গণভোট আয়োজনের গুরুত্ব সত্ত্বেও এর সঠিক বাস্তবায়ন বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যথেষ্ট জটিল ও চ্যালেঞ্জিং কাজ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গণভোট এমন এক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যা রাষ্ট্রের মালিক জনগণকে সরাসরি নীতিনির্ধারণে অংশ নিতে সুযোগ দেয়। বিশ্বজুড়ে গণভোট কখনও গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটিয়েছে, আবার কখনও ক্ষমতার হাতিয়ার হয়েছে, সবই নির্ভর করেছে পরিবেশের স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতার ওপর। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গণভোটের ইতিহাস মিশ্র, তবে এর সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। যদি রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারে, এবং যদি নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখে, তাহলে গণভোট হতে পারে জনগণের সত্যিকারের কণ্ঠস্বর প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম। তবে এর আগে দরকার, জনগণের আস্থা ফেরানো, মুক্ত মত প্রকাশ নিশ্চিত করা, এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। এমন একটি পরিবেশে গণভোট কেবল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং হতে পারে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের নতুন অধ্যায়।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

back to top