alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

লবলং খালের মৃত্যু: স্মৃতিতে নদী, বাস্তবে দূষণ

কামরুজ্জামান

: শুক্রবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৫

গাজীপুর জেলার শ্রীপুর পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত একমাত্র খালটি হলো লবলং। পুরো খালজুড়ে দেখা যায় কালো, ময়লাযুক্ত গরম পানি। এটি এখন যেন ময়লা-আবর্জনাযুক্ত বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। শ্রীপুর অঞ্চলের সব শিল্পকারখানার তরল বর্জ্য ফেলার নিরাপদ জায়গা এখন এই লবলং খালই।

আজ লবলং খালে ময়লা, আবর্জনা, কঠিন বর্জ্য, পলিথিন, কালো পানি ও কারখানার বিষাক্ত তরল ছাড়া কিছুই নেই। দুই পাড়ের জমিতেও কৃষিকাজ হয় না বললেই চলে। একসময়ের মাছের আধার লবলং খাল এখন মৃত

একসময় লবলং নদীতে পালতোলা নৌকা নিয়ে কুমাররা আসত। নৌকায় ভর্তি থাকত মাটির হাঁড়িপাতিল। তাল, ধানের চিটা বা আখের চিটাগুড় দিয়ে কুমারের কাছ থেকে হাঁড়িপাতিল কেনা যেত। কুমাররা বাঁশের খাঁচায় করে হাঁড়িপাতিল মাথায় নিয়ে সারা গ্রাম ঘুরে বিক্রি করত। নৌকা ঘাটে বাঁধা থাকত দুই-তিন দিন, কখনও এক সপ্তাহ পর্যন্ত। হাঁড়িপাতিল বিক্রি শেষ হলে তারা চলে যেত। আমরা ছোটরা ঘাটে বাঁধা সেই নৌকায় উঠে খেলাধুলা করতাম। লবলং নদীর সেই ঘাটগুলোর নাম এখনও আমার মনে আছে-আমিনা বাপের ঘাট, বংশীঘাট, মুন্সিঘাট, মাঝিঘাট, বিলাইঘাট ইত্যাদি।

এখন লবলং নদী মৃত। দূষণে নিমজ্জিত লবলং আজ কেবল স্মৃতি। এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা জানেই না, স্বচ্ছ জলের প্রবাহধারায় একসময় পালতোলা নৌকা চলত-বিশেষ করে ভরা বর্ষায় সেই দৃশ্য ছিল অপূর্ব।

স্বচ্ছ জলের লবলং খালের দুই পাড়ের জমিতে একসময় কৃষিকাজ হতো। বিভিন্ন ফসলের পাশাপাশি তরমুজ পর্যন্ত চাষ হতো। খাল ও খালের দুই পাড়ে সারা বছর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। আমরা নানা উপায়ে সেই মাছ ধরতাম-যা আজও স্মৃতিতে মধুর হয়ে আছে।

বাঁশের তৈরি বানা, ধর্মজাল, টানাজাল, ঝাঁকিজাল-এসব দিয়েই মাছ ধরতাম। বর্ষার পানিতে খাল একপাশ থেকে অন্যপাশে মিশে যেত, আর তখন বানা পেতে বড় ছোট সব ধরনের মাছ ধরা যেত। খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে কিংবা খালের পানিতে নেমে টানাজাল দিয়ে মাছ ধরার আনন্দ আজও মনে পড়ে। প্রতিটি টানেই জালে উঠত মাছ।

ঝাঁকিজাল ফেলা ছিল সাধারণ দৃশ্য। কেউ কেউ পানিতে ডুব দিয়ে মাছ ধরত, কেউ জাল ছুড়ে আবার টেনে তুলত। খালের দুই পাড়ে হালচাষের পেছনেও মাছ ধরা যেত। আষাঢ় মাসে ধান রোপণের আগে জমি চাষের সময় ছোট মাছ পাওয়া যেত প্রচুর।

বরশী দিয়েও মাছ ধরা যেত সারা বছর। বর্ষার রাতে বড় বরশীতে ছোট মাছ গেঁথে পানিতে ঝুলিয়ে রাখা হতো। সকালে গিয়ে দেখা যেত, বিশাল বোয়াল মাছ বরশীতে ঝুলে আছে। শরৎকালে যখন পানি নামতে শুরু করত, তখন ঠেলা জালি বা টানাজাল পেতে মাছ ধরা হতো।

শুকনো মৌসুমে খালের পানি সেচ করে মাছ ধরা ছিল এক বিশেষ কৌশল। বাঁশের তৈরি ‘উরি’ বা অ্যালুমিনিয়ামের বল দিয়ে দুই-তিনজন মিলে পানি তুলে সেচ করা হতো, পরে মাছ ধরা হতো। পরবর্তীকালে মেশিন দিয়েও পানি সেচ করে মাছ ধরেছি আমরা।

জমির ভাঙা আইল বা ধানক্ষেতের পানিভর্তি জমিতেও মাছ ধরা যেত। বর্ষায় জমির আইল ভেঙে গর্তে ছোট মাছ জমে থাকত। আমরা বিকল্প পথে পানি ছাড়িয়ে গর্ত শুকিয়ে টাকি, পুঁটি, গুতুম, বাইন ইত্যাদি মাছ ধরতাম।

বাঁশের তৈরি চাই পেতে রাতভর মাছ ধরা ছিল আরও এক মজার অভিজ্ঞতা। অনেক সময় মাছের সঙ্গে সাপও চাইয়ের ভেতরে ঢুকে যেত। তখন সেগুলো মেরে ফেলতাম-জানতাম না সাপও পরিবেশের উপকারী প্রাণী।

আজ লবলং খালে ময়লা, আবর্জনা, কঠিন বর্জ্য, পলিথিন, কালো পানি ও কারখানার বিষাক্ত তরল ছাড়া কিছুই নেই। দুই পাড়ের জমিতেও কৃষিকাজ হয় না বললেই চলে। একসময়ের মাছের আধার লবলং খাল এখন মৃত। এ দুঃখ কোথায় রাখি!

[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

নিজের চেতনায় নিজেরই ঘা দেয়া জরুরি

ঋণ অবলোপনের প্রভাব

ভেজাল গুড়ের মরণফাঁদ: বাঙালির ঐতিহ্য, জনস্বাস্থ্য ও আস্থার নীরব বিপর্যয়

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস

জোটের ভোট নাকি ভোটের জোট, কৌশলটা কী?

প্রমাণ তো করতে হবে আমরা হাসিনার চেয়ে ভালো

ছবি

কৃষি ডেটা ব্যবস্থাপনা

যুক্তরাজ্যে ভর্তি স্থগিতের কুয়াশা: তালা লাগলেও চাবি আমাদের হাতে

শিক্ষকদের কর্মবিরতি: পেশাগত নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ

জাতীয় রক্তগ্রুপ নির্ণয় দিবস

জাল সনদপত্রে শিক্ষকতা

সাধারণ চুক্তিগুলোও গোপনীয় কেন

ছবি

শিশুখাদ্যের নিরাপত্তা: জাতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষার প্রথম শর্ত

ছবি

ফিনল্যান্ড কেন সুখী দেশ

ছবি

কৃষকের সংকট ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

আলু চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

ই-বর্জ্য: নীরব বিষে দগ্ধ আমাদের ভবিষ্যৎ

ঢাকার জনপরিসর: আর্ভিং গফম্যানের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

আলু চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

কলি ফুটিতে চাহে ফোটে না!

কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তি

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে লোকালাইজেশন অপরিহার্য

আইসিইউ থেকে বাড়ি ফেরা ও খাদের কিনারায় থাকা দেশ

বিচারবহির্ভূত হত্যার দায় কার?

ছবি

ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা কৌশল

অযৌক্তিক দাবি: পেশাগত নৈতিকতার সংকট ও জনপ্রশাসন

সড়ক দুর্ঘটনা এখন জাতীয় সংকট

কেন বাড়ছে দারিদ্র্য?

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্জন্ম

লবণাক্ততায় ডুবছে উপকূল

বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ও বাস্তবতা

সড়ক দুর্ঘটনার সমাজতত্ত্ব: আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা ও কাঠামোর চক্রাকার পুনরুৎপাদন

ছবি

অস্থির সময় ও অস্থির সমাজের পাঁচালি

ভারতে বামপন্থার পুনর্জাগরণ: ব্যাধি ও প্রতিকার

চিপনির্ভরতা কাটিয়ে চীনের উত্থান

একতার বাতাসে উড়ুক দক্ষিণ এশিয়ার পতাকা

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

লবলং খালের মৃত্যু: স্মৃতিতে নদী, বাস্তবে দূষণ

কামরুজ্জামান

শুক্রবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৫

গাজীপুর জেলার শ্রীপুর পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত একমাত্র খালটি হলো লবলং। পুরো খালজুড়ে দেখা যায় কালো, ময়লাযুক্ত গরম পানি। এটি এখন যেন ময়লা-আবর্জনাযুক্ত বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। শ্রীপুর অঞ্চলের সব শিল্পকারখানার তরল বর্জ্য ফেলার নিরাপদ জায়গা এখন এই লবলং খালই।

আজ লবলং খালে ময়লা, আবর্জনা, কঠিন বর্জ্য, পলিথিন, কালো পানি ও কারখানার বিষাক্ত তরল ছাড়া কিছুই নেই। দুই পাড়ের জমিতেও কৃষিকাজ হয় না বললেই চলে। একসময়ের মাছের আধার লবলং খাল এখন মৃত

একসময় লবলং নদীতে পালতোলা নৌকা নিয়ে কুমাররা আসত। নৌকায় ভর্তি থাকত মাটির হাঁড়িপাতিল। তাল, ধানের চিটা বা আখের চিটাগুড় দিয়ে কুমারের কাছ থেকে হাঁড়িপাতিল কেনা যেত। কুমাররা বাঁশের খাঁচায় করে হাঁড়িপাতিল মাথায় নিয়ে সারা গ্রাম ঘুরে বিক্রি করত। নৌকা ঘাটে বাঁধা থাকত দুই-তিন দিন, কখনও এক সপ্তাহ পর্যন্ত। হাঁড়িপাতিল বিক্রি শেষ হলে তারা চলে যেত। আমরা ছোটরা ঘাটে বাঁধা সেই নৌকায় উঠে খেলাধুলা করতাম। লবলং নদীর সেই ঘাটগুলোর নাম এখনও আমার মনে আছে-আমিনা বাপের ঘাট, বংশীঘাট, মুন্সিঘাট, মাঝিঘাট, বিলাইঘাট ইত্যাদি।

এখন লবলং নদী মৃত। দূষণে নিমজ্জিত লবলং আজ কেবল স্মৃতি। এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা জানেই না, স্বচ্ছ জলের প্রবাহধারায় একসময় পালতোলা নৌকা চলত-বিশেষ করে ভরা বর্ষায় সেই দৃশ্য ছিল অপূর্ব।

স্বচ্ছ জলের লবলং খালের দুই পাড়ের জমিতে একসময় কৃষিকাজ হতো। বিভিন্ন ফসলের পাশাপাশি তরমুজ পর্যন্ত চাষ হতো। খাল ও খালের দুই পাড়ে সারা বছর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। আমরা নানা উপায়ে সেই মাছ ধরতাম-যা আজও স্মৃতিতে মধুর হয়ে আছে।

বাঁশের তৈরি বানা, ধর্মজাল, টানাজাল, ঝাঁকিজাল-এসব দিয়েই মাছ ধরতাম। বর্ষার পানিতে খাল একপাশ থেকে অন্যপাশে মিশে যেত, আর তখন বানা পেতে বড় ছোট সব ধরনের মাছ ধরা যেত। খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে কিংবা খালের পানিতে নেমে টানাজাল দিয়ে মাছ ধরার আনন্দ আজও মনে পড়ে। প্রতিটি টানেই জালে উঠত মাছ।

ঝাঁকিজাল ফেলা ছিল সাধারণ দৃশ্য। কেউ কেউ পানিতে ডুব দিয়ে মাছ ধরত, কেউ জাল ছুড়ে আবার টেনে তুলত। খালের দুই পাড়ে হালচাষের পেছনেও মাছ ধরা যেত। আষাঢ় মাসে ধান রোপণের আগে জমি চাষের সময় ছোট মাছ পাওয়া যেত প্রচুর।

বরশী দিয়েও মাছ ধরা যেত সারা বছর। বর্ষার রাতে বড় বরশীতে ছোট মাছ গেঁথে পানিতে ঝুলিয়ে রাখা হতো। সকালে গিয়ে দেখা যেত, বিশাল বোয়াল মাছ বরশীতে ঝুলে আছে। শরৎকালে যখন পানি নামতে শুরু করত, তখন ঠেলা জালি বা টানাজাল পেতে মাছ ধরা হতো।

শুকনো মৌসুমে খালের পানি সেচ করে মাছ ধরা ছিল এক বিশেষ কৌশল। বাঁশের তৈরি ‘উরি’ বা অ্যালুমিনিয়ামের বল দিয়ে দুই-তিনজন মিলে পানি তুলে সেচ করা হতো, পরে মাছ ধরা হতো। পরবর্তীকালে মেশিন দিয়েও পানি সেচ করে মাছ ধরেছি আমরা।

জমির ভাঙা আইল বা ধানক্ষেতের পানিভর্তি জমিতেও মাছ ধরা যেত। বর্ষায় জমির আইল ভেঙে গর্তে ছোট মাছ জমে থাকত। আমরা বিকল্প পথে পানি ছাড়িয়ে গর্ত শুকিয়ে টাকি, পুঁটি, গুতুম, বাইন ইত্যাদি মাছ ধরতাম।

বাঁশের তৈরি চাই পেতে রাতভর মাছ ধরা ছিল আরও এক মজার অভিজ্ঞতা। অনেক সময় মাছের সঙ্গে সাপও চাইয়ের ভেতরে ঢুকে যেত। তখন সেগুলো মেরে ফেলতাম-জানতাম না সাপও পরিবেশের উপকারী প্রাণী।

আজ লবলং খালে ময়লা, আবর্জনা, কঠিন বর্জ্য, পলিথিন, কালো পানি ও কারখানার বিষাক্ত তরল ছাড়া কিছুই নেই। দুই পাড়ের জমিতেও কৃষিকাজ হয় না বললেই চলে। একসময়ের মাছের আধার লবলং খাল এখন মৃত। এ দুঃখ কোথায় রাখি!

[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

back to top