alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

মৃত্যুদণ্ড, তারপর...

আনোয়ারুল হক

: রোববার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫

জুলাই আন্দোলনের সময়ে সংঘটিত অপরাধের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছেন বা ভবিষ্যতে যাবেন, তাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, কেউই আইন ও বিচারের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় কোনো শাসকেরা ইতিহাসের এই সত্যকে মনে রাখেন না

অপর আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজস্বাক্ষী হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করায় তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের রায় যে ঘোষিত হবে তা মোটামুটি সবাই ধারণা করছিলেন। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জামায়াত নেতাদের আইনজীবী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর নিযুক্ত হওয়ায় শুরু থেকেই সমাজের একাংশে সন্দেহ সৃষ্টি হয় প্রতিশোধের বিচার আয়োজন হচ্ছে কিনা। এবং এ ধরনের একটি জটিল বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে ও স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করায় সে সন্দেহ আরো জোরালো হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা এবং শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালও সম্ভবত রায় এমনটা হবে ধারণা করেছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে এই রায় কার্যকর করা সম্ভবপর হবে কিনা, না প্রতিকী ব্যবস্থা হিসেবেই রয়ে যাবে? অনেকে এটা ধরেই নিয়েছেন শেখ হাসিনা তার জীবদ্দশায় বাংলাদেশে ফিরছেন না। তাহলে কি তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখানেই শেষ হচ্ছে?

ভারতীয় উপমহাদেশে এ পর্যন্ত তিনজন রাষ্ট্রনেতার ফাঁসির আদেশ হলেও এ পর্যন্ত ফাঁসি কার্যকর হয়েছে একজনের। তিনি হলেন পাকিস্তানের একসময়ের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। সামরিক সরকার ভুট্টোকে ফাঁসি দিয়েছিলো ১৯৭৯ সালে। ২০২৪ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ সর্বসম্মত রায়ে জানায়, ন্যায়বিচার পাননি ভুট্টো। ভুট্টোর বিচার ‘স্বচ্ছ ও যথাযথ আইনি পদ্ধতি’ মেনে হয়নি বলে পাকিস্তানের শীর্ষ আদালত রায়ে উল্লেখ করে। আমাদের দেশেও সরকার পরিবর্তন হলে রায় পরিবর্তনের নজির সব আমলেই রয়েছে। আর এ বারে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তা রেকর্ড স্পর্শ করেছে। আবার বিদেশে থাকাকালীন মৃত্যুদণ্ডের সাজা শুনতে হয়েছিল পাকিস্তানের প্রাক্তন সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মুশারফকে। কিন্তু তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি এবং জীবদ্দশায় পাকিস্তানে ফিরতে পারেননি তিনি।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায় ঘোষিত হওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন, ‘যত ক্ষমতাবানই হোক, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়-এটা পুনর্নিশ্চিত করেছে আদালত’। অবশ্য মানুষের অভিজ্ঞতা, সাধারণত বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে এ ধরনের বক্তব্য। যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছেন বা ভবিষ্যতে যাবেন, তাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, কেউই আইন ও বিচারের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় কোনো শাসকেরা ইতিহাসের এই সত্যকে মনে রাখেন না।

ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনাকে প্রত্যাবর্তনের জন্য পুনরায় ভারত সরকারের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়েছেন। লিখিত নোটও পাঠানো হচ্ছে। অবশ্য রায় বের হওয়ার পর শীতল প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ভারত সরকার বলেছে, ‘ভারত সবসময়ে বাংলাদেশের মানুষের শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা ও স্থিতিশীলতার পক্ষেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা করবে ভারত সরকার’। তবে ভারত সরকার যেভাবে তার আশ্রয় ও নিরাপত্তা বিধান করছে তাতে এটা প্রায় নিশ্চিত যে ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে না। সেক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তন চুক্তির একটি ধারা যেখানে বলা হয়েছে যে, বিচারের নেপথ্যে যদি সৎ কোনও উদ্দেশ্য না-থাকে, তা হলে ভারত বা বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করবে না। হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না-করার জন্য এই যুক্তি খাড়া করতে পারে ভারত। আবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, যদি কোনও দেশে কারও জীবনের ঝুঁকি থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়া দেশ তাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য নয়। হাসিনার ক্ষেত্রেও এই আইনের কথা তুলে ধরতে পারে ভারত।

রায়কে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল- এর প্রতিবেদনকেও ভারত কাজে লাগাতে চেষ্টা করবে। ‘দীর্ঘ দমনমূলক শাসনের কারণে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ আজও রয়ে গেছে, তবে বিচার অবশ্যই আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে হওয়া উচিত’ বলে মন্তব্য করে এইচআরডব্লিউ তাদের প্রতিবেদনে উদ্বেগ জানিয়ে উল্লেখ করেছে ‘দুজনের অনুপস্থিতিতে হওয়া এ বিচার আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে’। অপরদিকে অ্যামনেস্টি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে ‘এই বিচার ও সাজা কোনোটিই সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত হয়নি’। তবে পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন পুষ্ট এ ধরনের মানবাধিকার সংস্থাগুলো শেখ হাসিনার শাসনামলে দমনপীড়নের বিরুদ্ধে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যা শেখ হাসিনা কখনোই আমলে নেননি। এখন দেখা যাক প্রধান উপদেষ্টা তার পশ্চিমা বন্ধুত্ব ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে ব্যবহার করে ভারতের কূটনৈতিক কৌশলকে পরাস্ত করতে পারেন কিনা। নির্ধারিত সফরসূচির এক দিন আগেই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান দিল্লিতে পৌঁছে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে বৈঠকে বসে কী আলোচনা করলেন দুপক্ষের কেউই এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আলোকপাত করেনি।

বিচারিক প্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে দেশে- বিদেশে যত প্রশ্ন ও বিতর্কই থাকুক, এ কথা তো ঠিক ছাত্র আন্দোলনের সূচনা থেকে শেষ পর্যন্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী কখনই রাষ্ট্রনায়কোচিত বা অভিভাবকসুলভ বক্তব্য রাখেননি। আন্দোলনকারীদের প্রতি তার এবং দলের অন্যান্য নেতাদের অবজ্ঞা এবং তাচ্ছিল্যপূর্ণ বক্তব্য আগুনে ঘি ঢেলেছে মাত্র। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে যে কোনো সরকারই তা নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নেয় এবং সে ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ ও জীবনহানিও ঘটতে পারে। কিন্তু তিনি ও তার পারিষদরা যেভাবে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে ভূমিকা রেখেছিলেন তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্বিচার হত্যকাণ্ড সংঘটিত করতে মরিয়া করে তোলে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও তার সমর্থকরা নানা ধরনের উগ্রবাদী শক্তির আন্দোলনের মাঝে ঢুকে নাশকতা সৃষ্টির এবং পুলিশকে গুলি করতে প্ররোচিত করার কথা বলে থাকেন। এটা যদি সত্যও হয় তাহলে তো সরকারের আরো সাবধান হয়ে আন্দোলনকারীদের সাথে শুরুতেই মীমাংসায় এসে উগ্রবাদী শক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার প্রয়োজন ছিলো। তা না করে ছাত্র-নেতৃত্বের উপর চাপ সৃষ্টি করে, তাদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে এবং তাদের কণ্ঠ দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহার করানোর যে কৌশল তারা নিয়েছিলেন তা ব্যর্থ হয় এবং কথিত উগ্রবাদীদের হাতে পাশার দান তুলে দেওয়া হয়। এর দায় তো পতিত সরকারের। প্রকৃতপক্ষে তিন-তিনটি একতরফা জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে সরকার এবং আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্নতার শেষ সীমায় চলে গিয়েছিলো। আওয়ামী লীগের কর্মী ও বিশাল সমর্থকগোষ্ঠিও হয়ে পড়েছিলো রাজনৈতিক ও মানসিকভাবে দুর্বল। তাই শেষ পর্যন্ত নিরীহ কোটা আন্দোলনই পরিণত হলো সরকার পতনের আন্দোলনে। পরাজিত হতে হলো স্বৈরশাসনকে।

এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের গোটা নেতৃত্বই হয় দেশান্তরি না হয় কারাগারে, কেউ কেউ হয়তোবা দেশাভ্যন্তরেই পলাতক এবং অনেকেই সাজার মুখোমুখি রয়েছেন, এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী? শেখ হাসিনার এই দণ্ড তার দল আওয়ামী লীগকে আরো বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর অনেক কিছু নির্ভর করলেও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোন পথে যাবে, মূলত তা দলটির যথাযথ উদ্যোগের উপর নির্ভর করে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের যে রাজনীতি, সমাজে যদি তার উপযোগিতা থেকে থাকে তাহলে তো সে দল ও রাজনীতিকে নিঃশেষ করা যাবে না। পাকিস্তান নাই, মুসলিম লীগ নিঃশেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ থাকলে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দল নিঃশেষ হয়ে যাবে তেমনটা মনে হয় না - যদি না তারা নিজেরাই আত্মাহুতির পথ বেছে নেয়।

বর্তমানে যে কোন একটা ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রবাসী নেতৃত্বের নির্দেশে দেশাভ্যন্তরে চোরাগোপ্তা কর্মসূচি পালন করে - ‘আওয়ামী লীগ আছে’ শুধুমাত্র এটা জানান দেওয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে পুনঃ সংগঠিত ও পূনর্জ্জীবিত করা যাবে বলে মনে হয় না। সত্য-অসত্য অনুমান নির্ভর যেটাই হোক না কেনো, জুলাই হত্যাকাণ্ডের কুশীলব হিসেবে জনমানসে যাদের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্য হয়েছে তাদের নেতৃত্বে রেখে এবং কোনো রকম অনুশোচনা ও আত্মসমালোচনা ছাড়া মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা কঠিন। শুধু জুলাই আন্দোলনের দিনগুলোর ভূমিকা নিয়ে নয়, দেশ পরিচালনায় দীর্ঘ সময় যাবত তাদের দলীয় সরকারের যে কতৃত্ববাদী শাসন, নানা কৌশলে বিরোধী দলকে বাইরে রেখে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা এবং দলের মাঝে পারিবারিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি নানা বিষয় তাদের পূনর্মূল্যায়ন করে অপেক্ষাকৃত নবীন ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বে দল পুনর্গঠনের কাজে নামা উচিত। আবার এ ধরনের ভাবনার সুযোগ নিয়ে সরকারের বা স্টাবলিশমেন্টের কোনো কোনো মহল নিজেরাই রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ গড়ার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত আছেন বলেও গুজব আছে। সে ধরনের প্রচেষ্টা ভালো কোনো ফল বয়ে আনবে না। আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন, নবায়ন ও পুনর্গঠন আওয়ামী লীগকেই করতে হবে এবং সে সুযোগ পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। আওয়ামী লীগের মতো বড় ধরনের সমর্থকগোষ্ঠির অধিকারী একটা দলকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করার সুযোগ না দিলে রাজনৈতিক অস্থিরতাকেই আলিঙ্গন করা হবে। ইতোমধ্যে নির্বাচনের পূর্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর বিধান পুনর্বহাল হওয়ায় জনমানসে এ প্রশ্ন উঠেছে যে তা কেন সামনের ফেব্রুয়ারি নির্বাচন থেকেই নয়? অন্তর্বর্তী সরকার তো নিরপেক্ষতার অবস্থান রক্ষা করতে পারেনি। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সকল দলই সরকারের ও উপদেষ্টাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। অবশ্য বর্তমান ক্ষমতা কাঠামোতে ও প্রশাসনে এসব দলের কম বেশি অংশীদারিত্ব থাকায় এখন আর এ দাবি তুলছে না।

চলতি বছরের ৮মে রাত থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে জমায়েত নিষিদ্ধ স্থানে জামায়াত ও এনসিপিকে দিয়ে মব সমাবেশ করিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে এবং একই সাথে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন স্থগিত করে কার্যত দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ দলে পরিণত করা হয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ করে দিয়ে আওয়ামী লীগের জন্য নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় অগ্রসর হওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দেয়ায় তাদের চোরাগোপ্তা কার্যকলাপ জনসাধারণের একাংশের মাঝে ন্যায্যতা পেয়ে যাচ্ছে। দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বড় জায়গা করে নিচ্ছে। মানুষও বিশ্বাস করে সাময়িকভাবে কঠিন সময়ের মধ্যে পড়লেও আওয়ামী লীগ বিলীন হয়ে যাবে না। রাজনীতিতে বা সমাজে আওয়ামী লীগকে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলার মতো কোনো ঘটনা অদূর ভবিষ্যতেও ঘটবে বলে মনে হয় না।

আওয়ামী লীগের যা হওয়ার হবে। তবে জুলাই আন্দোলন পরবর্তীতে যে উগ্রবাদী শক্তির উত্থান হয়েছে তাদের লক্ষ্যবস্তু আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে সীমিত নয়। তাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তু মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধে তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়া। তাইতো তারা কথায় কথায় ৩২ নং এর দিকে এক্সকাভেটর নিয়ে রওনা হয়। ওরা জানে এই বাড়িটাকে কেন্দ্র করে সেই কবে থেকে শুরু হয়েছিলো স্বাধিকার আর স্বাধীনতার আয়োজন পর্ব। তাই ’২৪কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ওরা বারবার ৩২ নম্বর এর দিকে ধেয়ে যায় ’৭১এর অ্যালার্জি থেকে উপশম পেতে। ’৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম, তার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেওয়া সকল রাজনৈতিক সামাজিক শক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের সকল স্মৃতিচিহ্নকে তারা ফ্যাসিবাদী কায়দায় নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। শেখ মুজিব সরকার প্রধান হিসেবে নিশ্চয়ই সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিলেন না। সরকার প্রধান হিসেবে তার ভুল ও ব্যর্থতার সমালোচনা হতেই পারে। কিন্তু কোনো যুক্তিতেই স্বাধীনতার স্থপতি হিসেবে তার যে অবদান-সেটি ম্লান হয়ে যায় না। বরং ৩২নং এর বাড়িটি ভাঙার ও ভাঙা বাড়ি পুনর্ভঙের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে এই বাংলায় মুজিবের প্রাসঙ্গিকতাকেই তারা তুলে ধরছে। কারো ভালো লাগুক আর না-লাগুক ধানমন্ডি ৩২-এর বাড়িটি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। এখনকার এই নিরাকার ৩২ বারবার ফিরে আসবে, তাড়া করবে ঐসব উন্মাদদের।

মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ, স্মৃতি মুছে ফেলার প্রচেষ্টার মাঝেই আর এক দেশবিরোধী তৎপরতা চলছে। দেশের বন্দর ও তার টার্মিনালসমূহ একে একে মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট পশ্চিমা কোম্পানিসমূহের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইউনূস সরকার নিয়ে রেখেছে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই ইতোমধ্যে লালদিয়া টার্মিনাল ও পানাগাও বন্দর তুলে দেয়া হলো মার্কিনি স্বার্থের ঘনিষ্ঠ দুটি পশ্চিমা কোম্পানিকে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হওয়া চুক্তিতে নন ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট বা গোপনীয়তা বজায় রাখার বিষয়টি যুক্ত থাকায় এ নিয়ে খুব বেশি তথ্য জানাও যাচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদী এবং স্পর্শকাতর এসব সিদ্ধান্ত নিতে স্বল্প মেয়াদের বা অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য দায়িত্বে থাকা ইউনূস সরকার কেন তাড়াহুড়ো করছে তা বুঝতে কারো অসুবিধা হচ্ছে না। লন্ডন বৈঠক ও নিউইর্য়কে সফরসঙ্গী হওয়ার পর থেকে বিএনপি এসব বিষয়ে নিশ্চুপ। জামায়াত, এনসিপিও এসব বিষয়ে সরকারের সাথে থাকার কারণে তারাও নিউইর্য়কে সফরসংগী ছিলেন।

ক্ষুদ্র শক্তির বামপন্থী দলসমূহ এবং প্রগতিশীল সামাজিক-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, বন্দর শ্রমিক ও নাগরিক সমাজের একাংশ ছাড়া সরকারের এসব ভয়ংকর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অন্য কাউকে এখনো সরব হতে দেখা যাচ্ছে না। জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে কেনো দেশের তরুণ সমাজ এগিয়ে আসছে না? কেনো বিদেশি কোম্পানির সাথে জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী ও বৈষম্যমূলক চুক্তির বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সেই সাহসী ছাত্র সমাজ প্রতিবাদী হয়ে উঠছে না? স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা ও সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশার বিপরীত যাত্রায়, আমাদের মাতৃভূমি সাম্রাজ্যবাদ ও দেশি-বিদেশি শাসকশ্রেণির নানামুখী আগ্রাসনের মুখোমুখি। দুর্বল হয়ে পড়া বহুমাত্রিক সামাজিক গাঁথুনি যতটুকু ছিলো ধর্মীয় উগ্রতার ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সম্প্রসারণে তাও ভেঙে পড়ছে। তাহলে জুলাই আন্দোলনের ‘কঠিন তপস্যা কী আনিলো না ভোর!’

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

আগুনের ছাইয়ে কলমের আলো

বিগ বাউন্স শেষে বিগ ক্রাঞ্চের পথে ব্রহ্মাণ্ড

সংস্কৃতি চর্চা: শিকড়, সংকট ও আগ্রাসন

শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত কারাব্যবস্থার প্রত্যাশা

ছবি

প্রসঙ্গ: ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা

ছবি

খালেদা জিয়া, কাছে ও দূর থেকে দেখা

মানবসভ্যতা ও প্রাণিকল্যাণ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাবনা

ছবি

ইরানের ধর্মভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী

ফুল ও মৌমাছির গণিতে কৃষির প্রতিচ্ছবি

দুর্নীতির ঐকিক নিয়ম

‘বিয়ার রাতেই বিড়াল মারো...’

তেল-উত্তর আরব: অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক রূপান্তর

ভোটের মনস্তত্ত্ব: বাংলাদেশে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ ও ভোটার মানস

প্রতিবেশী যদি বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা না দেন

চাপে অর্থনীতি, সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্র

মনোনয়নপত্র বাতিলের পরে বৈধতা পাওয়া

চিকিৎসাসেবায় ভেন্টিলেটর ও লাইফ সাপোর্ট

রেশম: এক ঐতিহ্য, এক সম্ভাবনার অবসান

প্রযুক্তিযুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

যেভাবে বদলেছে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা

ছবি

খোলা হাওয়া, তেজি বৃষ্টি এবং ঝকঝকে রোদ

কৃষি অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

তেলের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব

নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার সুস্পষ্ট রূপরেখা চাই

মহাকাশে বিস্ময়কর মহাকাশ

টেংরাটিলা ট্র্যাজেডি : ক্ষতিপূরণহীন এক বিপর্যয়

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ -এর নমুনা

শীতের নীরব আঘাত

ভোটে ইসলামী জোট

আইনের শাসন কি উপেক্ষিতই থাকবে?

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

ভূমিকম্প ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

“ফিজ-না-ফিজ...”

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

এলপিজি সংকট

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

মৃত্যুদণ্ড, তারপর...

আনোয়ারুল হক

রোববার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫

জুলাই আন্দোলনের সময়ে সংঘটিত অপরাধের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছেন বা ভবিষ্যতে যাবেন, তাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, কেউই আইন ও বিচারের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় কোনো শাসকেরা ইতিহাসের এই সত্যকে মনে রাখেন না

অপর আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজস্বাক্ষী হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করায় তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের রায় যে ঘোষিত হবে তা মোটামুটি সবাই ধারণা করছিলেন। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জামায়াত নেতাদের আইনজীবী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর নিযুক্ত হওয়ায় শুরু থেকেই সমাজের একাংশে সন্দেহ সৃষ্টি হয় প্রতিশোধের বিচার আয়োজন হচ্ছে কিনা। এবং এ ধরনের একটি জটিল বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে ও স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করায় সে সন্দেহ আরো জোরালো হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা এবং শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালও সম্ভবত রায় এমনটা হবে ধারণা করেছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে এই রায় কার্যকর করা সম্ভবপর হবে কিনা, না প্রতিকী ব্যবস্থা হিসেবেই রয়ে যাবে? অনেকে এটা ধরেই নিয়েছেন শেখ হাসিনা তার জীবদ্দশায় বাংলাদেশে ফিরছেন না। তাহলে কি তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখানেই শেষ হচ্ছে?

ভারতীয় উপমহাদেশে এ পর্যন্ত তিনজন রাষ্ট্রনেতার ফাঁসির আদেশ হলেও এ পর্যন্ত ফাঁসি কার্যকর হয়েছে একজনের। তিনি হলেন পাকিস্তানের একসময়ের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। সামরিক সরকার ভুট্টোকে ফাঁসি দিয়েছিলো ১৯৭৯ সালে। ২০২৪ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ সর্বসম্মত রায়ে জানায়, ন্যায়বিচার পাননি ভুট্টো। ভুট্টোর বিচার ‘স্বচ্ছ ও যথাযথ আইনি পদ্ধতি’ মেনে হয়নি বলে পাকিস্তানের শীর্ষ আদালত রায়ে উল্লেখ করে। আমাদের দেশেও সরকার পরিবর্তন হলে রায় পরিবর্তনের নজির সব আমলেই রয়েছে। আর এ বারে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তা রেকর্ড স্পর্শ করেছে। আবার বিদেশে থাকাকালীন মৃত্যুদণ্ডের সাজা শুনতে হয়েছিল পাকিস্তানের প্রাক্তন সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মুশারফকে। কিন্তু তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি এবং জীবদ্দশায় পাকিস্তানে ফিরতে পারেননি তিনি।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায় ঘোষিত হওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন, ‘যত ক্ষমতাবানই হোক, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়-এটা পুনর্নিশ্চিত করেছে আদালত’। অবশ্য মানুষের অভিজ্ঞতা, সাধারণত বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে এ ধরনের বক্তব্য। যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছেন বা ভবিষ্যতে যাবেন, তাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, কেউই আইন ও বিচারের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় কোনো শাসকেরা ইতিহাসের এই সত্যকে মনে রাখেন না।

ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনাকে প্রত্যাবর্তনের জন্য পুনরায় ভারত সরকারের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়েছেন। লিখিত নোটও পাঠানো হচ্ছে। অবশ্য রায় বের হওয়ার পর শীতল প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ভারত সরকার বলেছে, ‘ভারত সবসময়ে বাংলাদেশের মানুষের শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা ও স্থিতিশীলতার পক্ষেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা করবে ভারত সরকার’। তবে ভারত সরকার যেভাবে তার আশ্রয় ও নিরাপত্তা বিধান করছে তাতে এটা প্রায় নিশ্চিত যে ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে না। সেক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তন চুক্তির একটি ধারা যেখানে বলা হয়েছে যে, বিচারের নেপথ্যে যদি সৎ কোনও উদ্দেশ্য না-থাকে, তা হলে ভারত বা বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করবে না। হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না-করার জন্য এই যুক্তি খাড়া করতে পারে ভারত। আবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, যদি কোনও দেশে কারও জীবনের ঝুঁকি থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়া দেশ তাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য নয়। হাসিনার ক্ষেত্রেও এই আইনের কথা তুলে ধরতে পারে ভারত।

রায়কে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল- এর প্রতিবেদনকেও ভারত কাজে লাগাতে চেষ্টা করবে। ‘দীর্ঘ দমনমূলক শাসনের কারণে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ আজও রয়ে গেছে, তবে বিচার অবশ্যই আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে হওয়া উচিত’ বলে মন্তব্য করে এইচআরডব্লিউ তাদের প্রতিবেদনে উদ্বেগ জানিয়ে উল্লেখ করেছে ‘দুজনের অনুপস্থিতিতে হওয়া এ বিচার আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে’। অপরদিকে অ্যামনেস্টি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে ‘এই বিচার ও সাজা কোনোটিই সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত হয়নি’। তবে পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন পুষ্ট এ ধরনের মানবাধিকার সংস্থাগুলো শেখ হাসিনার শাসনামলে দমনপীড়নের বিরুদ্ধে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যা শেখ হাসিনা কখনোই আমলে নেননি। এখন দেখা যাক প্রধান উপদেষ্টা তার পশ্চিমা বন্ধুত্ব ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে ব্যবহার করে ভারতের কূটনৈতিক কৌশলকে পরাস্ত করতে পারেন কিনা। নির্ধারিত সফরসূচির এক দিন আগেই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান দিল্লিতে পৌঁছে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে বৈঠকে বসে কী আলোচনা করলেন দুপক্ষের কেউই এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আলোকপাত করেনি।

বিচারিক প্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে দেশে- বিদেশে যত প্রশ্ন ও বিতর্কই থাকুক, এ কথা তো ঠিক ছাত্র আন্দোলনের সূচনা থেকে শেষ পর্যন্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী কখনই রাষ্ট্রনায়কোচিত বা অভিভাবকসুলভ বক্তব্য রাখেননি। আন্দোলনকারীদের প্রতি তার এবং দলের অন্যান্য নেতাদের অবজ্ঞা এবং তাচ্ছিল্যপূর্ণ বক্তব্য আগুনে ঘি ঢেলেছে মাত্র। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে যে কোনো সরকারই তা নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নেয় এবং সে ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ ও জীবনহানিও ঘটতে পারে। কিন্তু তিনি ও তার পারিষদরা যেভাবে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে ভূমিকা রেখেছিলেন তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্বিচার হত্যকাণ্ড সংঘটিত করতে মরিয়া করে তোলে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও তার সমর্থকরা নানা ধরনের উগ্রবাদী শক্তির আন্দোলনের মাঝে ঢুকে নাশকতা সৃষ্টির এবং পুলিশকে গুলি করতে প্ররোচিত করার কথা বলে থাকেন। এটা যদি সত্যও হয় তাহলে তো সরকারের আরো সাবধান হয়ে আন্দোলনকারীদের সাথে শুরুতেই মীমাংসায় এসে উগ্রবাদী শক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার প্রয়োজন ছিলো। তা না করে ছাত্র-নেতৃত্বের উপর চাপ সৃষ্টি করে, তাদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে এবং তাদের কণ্ঠ দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহার করানোর যে কৌশল তারা নিয়েছিলেন তা ব্যর্থ হয় এবং কথিত উগ্রবাদীদের হাতে পাশার দান তুলে দেওয়া হয়। এর দায় তো পতিত সরকারের। প্রকৃতপক্ষে তিন-তিনটি একতরফা জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে সরকার এবং আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্নতার শেষ সীমায় চলে গিয়েছিলো। আওয়ামী লীগের কর্মী ও বিশাল সমর্থকগোষ্ঠিও হয়ে পড়েছিলো রাজনৈতিক ও মানসিকভাবে দুর্বল। তাই শেষ পর্যন্ত নিরীহ কোটা আন্দোলনই পরিণত হলো সরকার পতনের আন্দোলনে। পরাজিত হতে হলো স্বৈরশাসনকে।

এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের গোটা নেতৃত্বই হয় দেশান্তরি না হয় কারাগারে, কেউ কেউ হয়তোবা দেশাভ্যন্তরেই পলাতক এবং অনেকেই সাজার মুখোমুখি রয়েছেন, এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী? শেখ হাসিনার এই দণ্ড তার দল আওয়ামী লীগকে আরো বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর অনেক কিছু নির্ভর করলেও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোন পথে যাবে, মূলত তা দলটির যথাযথ উদ্যোগের উপর নির্ভর করে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের যে রাজনীতি, সমাজে যদি তার উপযোগিতা থেকে থাকে তাহলে তো সে দল ও রাজনীতিকে নিঃশেষ করা যাবে না। পাকিস্তান নাই, মুসলিম লীগ নিঃশেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ থাকলে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দল নিঃশেষ হয়ে যাবে তেমনটা মনে হয় না - যদি না তারা নিজেরাই আত্মাহুতির পথ বেছে নেয়।

বর্তমানে যে কোন একটা ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রবাসী নেতৃত্বের নির্দেশে দেশাভ্যন্তরে চোরাগোপ্তা কর্মসূচি পালন করে - ‘আওয়ামী লীগ আছে’ শুধুমাত্র এটা জানান দেওয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে পুনঃ সংগঠিত ও পূনর্জ্জীবিত করা যাবে বলে মনে হয় না। সত্য-অসত্য অনুমান নির্ভর যেটাই হোক না কেনো, জুলাই হত্যাকাণ্ডের কুশীলব হিসেবে জনমানসে যাদের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্য হয়েছে তাদের নেতৃত্বে রেখে এবং কোনো রকম অনুশোচনা ও আত্মসমালোচনা ছাড়া মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা কঠিন। শুধু জুলাই আন্দোলনের দিনগুলোর ভূমিকা নিয়ে নয়, দেশ পরিচালনায় দীর্ঘ সময় যাবত তাদের দলীয় সরকারের যে কতৃত্ববাদী শাসন, নানা কৌশলে বিরোধী দলকে বাইরে রেখে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা এবং দলের মাঝে পারিবারিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি নানা বিষয় তাদের পূনর্মূল্যায়ন করে অপেক্ষাকৃত নবীন ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বে দল পুনর্গঠনের কাজে নামা উচিত। আবার এ ধরনের ভাবনার সুযোগ নিয়ে সরকারের বা স্টাবলিশমেন্টের কোনো কোনো মহল নিজেরাই রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ গড়ার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত আছেন বলেও গুজব আছে। সে ধরনের প্রচেষ্টা ভালো কোনো ফল বয়ে আনবে না। আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন, নবায়ন ও পুনর্গঠন আওয়ামী লীগকেই করতে হবে এবং সে সুযোগ পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। আওয়ামী লীগের মতো বড় ধরনের সমর্থকগোষ্ঠির অধিকারী একটা দলকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করার সুযোগ না দিলে রাজনৈতিক অস্থিরতাকেই আলিঙ্গন করা হবে। ইতোমধ্যে নির্বাচনের পূর্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর বিধান পুনর্বহাল হওয়ায় জনমানসে এ প্রশ্ন উঠেছে যে তা কেন সামনের ফেব্রুয়ারি নির্বাচন থেকেই নয়? অন্তর্বর্তী সরকার তো নিরপেক্ষতার অবস্থান রক্ষা করতে পারেনি। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সকল দলই সরকারের ও উপদেষ্টাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। অবশ্য বর্তমান ক্ষমতা কাঠামোতে ও প্রশাসনে এসব দলের কম বেশি অংশীদারিত্ব থাকায় এখন আর এ দাবি তুলছে না।

চলতি বছরের ৮মে রাত থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে জমায়েত নিষিদ্ধ স্থানে জামায়াত ও এনসিপিকে দিয়ে মব সমাবেশ করিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে এবং একই সাথে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন স্থগিত করে কার্যত দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ দলে পরিণত করা হয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ করে দিয়ে আওয়ামী লীগের জন্য নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় অগ্রসর হওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দেয়ায় তাদের চোরাগোপ্তা কার্যকলাপ জনসাধারণের একাংশের মাঝে ন্যায্যতা পেয়ে যাচ্ছে। দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বড় জায়গা করে নিচ্ছে। মানুষও বিশ্বাস করে সাময়িকভাবে কঠিন সময়ের মধ্যে পড়লেও আওয়ামী লীগ বিলীন হয়ে যাবে না। রাজনীতিতে বা সমাজে আওয়ামী লীগকে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলার মতো কোনো ঘটনা অদূর ভবিষ্যতেও ঘটবে বলে মনে হয় না।

আওয়ামী লীগের যা হওয়ার হবে। তবে জুলাই আন্দোলন পরবর্তীতে যে উগ্রবাদী শক্তির উত্থান হয়েছে তাদের লক্ষ্যবস্তু আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে সীমিত নয়। তাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তু মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধে তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়া। তাইতো তারা কথায় কথায় ৩২ নং এর দিকে এক্সকাভেটর নিয়ে রওনা হয়। ওরা জানে এই বাড়িটাকে কেন্দ্র করে সেই কবে থেকে শুরু হয়েছিলো স্বাধিকার আর স্বাধীনতার আয়োজন পর্ব। তাই ’২৪কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ওরা বারবার ৩২ নম্বর এর দিকে ধেয়ে যায় ’৭১এর অ্যালার্জি থেকে উপশম পেতে। ’৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম, তার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেওয়া সকল রাজনৈতিক সামাজিক শক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের সকল স্মৃতিচিহ্নকে তারা ফ্যাসিবাদী কায়দায় নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। শেখ মুজিব সরকার প্রধান হিসেবে নিশ্চয়ই সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিলেন না। সরকার প্রধান হিসেবে তার ভুল ও ব্যর্থতার সমালোচনা হতেই পারে। কিন্তু কোনো যুক্তিতেই স্বাধীনতার স্থপতি হিসেবে তার যে অবদান-সেটি ম্লান হয়ে যায় না। বরং ৩২নং এর বাড়িটি ভাঙার ও ভাঙা বাড়ি পুনর্ভঙের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে এই বাংলায় মুজিবের প্রাসঙ্গিকতাকেই তারা তুলে ধরছে। কারো ভালো লাগুক আর না-লাগুক ধানমন্ডি ৩২-এর বাড়িটি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। এখনকার এই নিরাকার ৩২ বারবার ফিরে আসবে, তাড়া করবে ঐসব উন্মাদদের।

মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ, স্মৃতি মুছে ফেলার প্রচেষ্টার মাঝেই আর এক দেশবিরোধী তৎপরতা চলছে। দেশের বন্দর ও তার টার্মিনালসমূহ একে একে মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট পশ্চিমা কোম্পানিসমূহের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইউনূস সরকার নিয়ে রেখেছে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই ইতোমধ্যে লালদিয়া টার্মিনাল ও পানাগাও বন্দর তুলে দেয়া হলো মার্কিনি স্বার্থের ঘনিষ্ঠ দুটি পশ্চিমা কোম্পানিকে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হওয়া চুক্তিতে নন ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট বা গোপনীয়তা বজায় রাখার বিষয়টি যুক্ত থাকায় এ নিয়ে খুব বেশি তথ্য জানাও যাচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদী এবং স্পর্শকাতর এসব সিদ্ধান্ত নিতে স্বল্প মেয়াদের বা অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য দায়িত্বে থাকা ইউনূস সরকার কেন তাড়াহুড়ো করছে তা বুঝতে কারো অসুবিধা হচ্ছে না। লন্ডন বৈঠক ও নিউইর্য়কে সফরসঙ্গী হওয়ার পর থেকে বিএনপি এসব বিষয়ে নিশ্চুপ। জামায়াত, এনসিপিও এসব বিষয়ে সরকারের সাথে থাকার কারণে তারাও নিউইর্য়কে সফরসংগী ছিলেন।

ক্ষুদ্র শক্তির বামপন্থী দলসমূহ এবং প্রগতিশীল সামাজিক-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, বন্দর শ্রমিক ও নাগরিক সমাজের একাংশ ছাড়া সরকারের এসব ভয়ংকর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অন্য কাউকে এখনো সরব হতে দেখা যাচ্ছে না। জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে কেনো দেশের তরুণ সমাজ এগিয়ে আসছে না? কেনো বিদেশি কোম্পানির সাথে জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী ও বৈষম্যমূলক চুক্তির বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সেই সাহসী ছাত্র সমাজ প্রতিবাদী হয়ে উঠছে না? স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা ও সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশার বিপরীত যাত্রায়, আমাদের মাতৃভূমি সাম্রাজ্যবাদ ও দেশি-বিদেশি শাসকশ্রেণির নানামুখী আগ্রাসনের মুখোমুখি। দুর্বল হয়ে পড়া বহুমাত্রিক সামাজিক গাঁথুনি যতটুকু ছিলো ধর্মীয় উগ্রতার ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সম্প্রসারণে তাও ভেঙে পড়ছে। তাহলে জুলাই আন্দোলনের ‘কঠিন তপস্যা কী আনিলো না ভোর!’

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

back to top