alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

মেশকাতুন নাহার

: বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬

শিশু যখন জন্ম নেয়, সে কোনো নিয়ম জানে না, কোনো ভয় জানে না, কোনো মুখোশ বহন করে না। তার চোখে থাকে বিস্ময়, কৌতূহল আর মুক্তির স্বপ্ন। সে জানে না এই পৃথিবীতে বড় হওয়া মানে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাওয়া; স্বপ্ন মানে সংশোধনযোগ্য অপরাধ, আর সততা মানে একধরনের আত্মঘাতী বিলাসিতা। সমাজ তাকে ধীরে ধীরে শেখায় কী বলা যাবে, কী বলা যাবে না; কী ভাবা নিরাপদ, আর কোন চিন্তা বিপজ্জনক। এভাবেই একটি পূর্ণ বৃক্ষের সম্ভাবনা জন্মলগ্ন থেকেই টবের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া হয়। শুরু হয় বনসাই জীবনের দীর্ঘ, নীরব বেদনা।

বনসাই দেখতে সুন্দর। সাজানো, নিয়ন্ত্রিত, পরিমিত। সমাজও ঠিক এমন মানুষই পছন্দ করে যারা প্রশ্ন করে না, প্রতিবাদ জানায় না, চোখে চোখ রেখে সত্য বলে না। এই সমাজের কাছে অতিরিক্ত সততা এক ধরনের অসভ্যতা, নৈতিকতা একধরনের অযোগ্যতা, আর স্পষ্টবাদিতা প্রায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ফলে মানুষকে শিখিয়ে দেয়া হয় বেঁচে থাকতে হলে নিজেকে ছোট রাখতে হবে, নিজের শাখা-প্রশাখা নিজেই কেটে ফেলতে হবে।

আমাদের সামাজিক কাঠামোটি এমনভাবে নির্মিত যে এখানে অন্যায় খুব স্বাভাবিক, কিন্তু তার প্রতিবাদ অস্বাভাবিক। দুর্নীতি এখানে কৌশল, চাটুকারিতা এখানে বুদ্ধিমত্তা, আর সত্য গোপন করা এখানে সামাজিক শিষ্টাচার। যে মানুষগুলো এই প্রবাহের বিপরীতে দাঁড়াতে চায়, তারা দ্রুত বুঝে ফেলে এই সমাজ পূর্ণ বৃক্ষের জন্য নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত বনসাইয়ের জন্যই নিরাপদ।

বিশেষ করে সৎ মানুষগুলোই এই বনসাই জীবনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। তারা চাইলেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। তাদের নৈতিক মেরুদন্ড যেন সমাজের চোখে অতিরিক্ত ভারী। কর্মক্ষেত্রে তারা অগ্রাধিকার পায় না, কারণ তারা ‘ম্যানেজ করতে জানে না’। সামাজিক পরিসরে তারা জনপ্রিয় হয় না, কারণ তারা মিথ্যা প্রশংসায় অংশ নেয় না। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তারা একা পড়ে যায়, কারণ তারা অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে না।

এই সমাজে সৎ মানুষকে বলা হয় ‘বাস্তববাদী হও।’ এই শব্দটির আড়ালে লুকিয়ে থাকে একটি নিষ্ঠুর নির্দেশ: অন্যায় মেনে নাও, নত হও, চুপ থাকো। সততা এখানে কোনো গৌরবের বিষয় নয়, বরং এক ধরনের অপ্রয়োজনীয় বোঝা। তাই সৎ মানুষগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। তারা কথা কম বলে, স্বপ্ন ছোট করে, প্রত্যাশা সীমিত করে। তারা বনসাই হয়ে যায় দেখতে শান্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্ষতবিক্ষত।

সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর অনাচারগুলোর একটি হলো মানুষকে তার অনুভূতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখানো। এখানে কাঁদা দুর্বলতা, ক্ষোভ অসভ্যতা, আর প্রতিবাদকে বলা হয় অশান্তি সৃষ্টি। ফলে মানুষের আবেগকে নিয়মের কাঁচিতে কেটে ফেলা হয়। আনন্দের সীমা নির্ধারণ করা হয়, দুঃখের প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়। এই আবেগহীন মানুষগুলোই পরে হয়ে ওঠে সবচেয়ে বিপজ্জনক কারণ তারা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাঁপে না।

আজকের আধুনিকতা আমাদের দিয়েছে উঁচু দালান, দ্রুত যোগাযোগ, আর কৃত্রিম হাসি। কিন্তু কেড়ে নিয়েছে খোলা আকাশ, মাটির গন্ধ, আর নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার। শিশুরা আর কাদামাটিতে খেলতে শেখে না, বড়রা আর সত্য বলতে সাহস পায় না। চারপাশে এত শব্দ, অথচ কোথাও কোনো সত্যিকারের সংলাপ নেই। সবাই ব্যস্ত নিজ নিজ টব সামলাতে।

আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলেছি যেখানে প্রশ্ন করার আগেই মানুষকে চুপ করিয়ে দেয়া হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুখস্থ বিদ্যা শেখানো হয়, কিন্তু চিন্তা শেখানো হয় না। কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতিতে আদর্শ নয়, কৌশলই মুখ্য। ধর্মের নামে নৈতিকতা বিক্রি হয়, আর নীতির নামে ক্ষমতা রক্ষা করা হয়। এই দ্বিচারিতাই সমাজকে ক্রমশ বনসাই উদ্যানে পরিণত করেছে যেখানে সবকিছু সাজানো, কিন্তু কিছুই স্বাভাবিক নয়।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো এই বনসাই জীবনকে আমরা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছি। আমরা ভাবছি, এভাবেই জীবন চলে। আমরা ভুলে যাচ্ছি মানুষের স্বাভাবিক গন্তব্য হলো বিস্তার, সংকোচন নয়। মানুষ জন্মায় আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে, টবের মাপে নিজেকে মাপার জন্য নয়।

যে সমাজ সৎ মানুষকে একা করে দেয়, সে সমাজ একদিন নৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। কারণ সততা কোনো ব্যক্তিগত বিলাসিতা নয়, এটি সামাজিক ভারসাম্যের মূল ভিত্তি। সততাকে যখন শাস্তি দেওয়া হয়, তখন অন্যায় পুরস্কৃত হয়। আর তখনই সমাজের ভিত ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে নীরবে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে।

তবু আশার কথা একেবারে শেষ হয়ে যায় না। এখনো কিছু মানুষ আছে যারা বনসাই হতে অস্বীকার করে। তারা জানে ঝড় আসবে, বজ্রপাত হবে, তবু পূর্ণ বৃক্ষ হয়ে দাঁড়ানোর ঝুঁকি নিতে হবে। তারা হয়তো সংখ্যায় কম, কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে পরিবর্তন কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ দিয়ে শুরু হয় না, শুরু হয় অল্প কিছু দৃঢ় মানুষ দিয়ে।

আমাদের প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষকে বড় হতে ভয় দেখানো হবে না। যেখানে সততা হবে শক্তি, দুর্বলতা নয়। যেখানে প্রশ্ন করা হবে নাগরিক দায়িত্ব, অপরাধ নয়। যেখানে মানুষ টব ভেঙে মাটিতে শিকড় ছড়াতে পারবে।

নইলে আমরা সবাই মিলে এক বিশাল বনসাই বাগান হয়ে থাকব পরিপাটি, নিয়ন্ত্রিত, নীরব। বাইরে থেকে দেখলে সুন্দর, কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রাণহীন। আর সেই বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইতিহাস একদিন আমাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করবে-

‘তোমরা কি সত্যিই বেঁচে ছিলে, নাকি কেবল বেঁচে থাকার অভিনয় করেছিলে?’

[লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

মহাকাশ অর্থনীতি

কুষ্ঠ : নতুন সরকার ও একটি জাতীয় বিষয়ে প্রত্যাশা

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

ভাষার রাজনীতি এবং রাজনীতির ভাষা

ছবি

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী

ছবি

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতের আহ্বান

কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খলে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

ছবি

নির্বাচনে জোট, নাকি সরকারে

রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার

মানুষ কি বদলেছে, নাকি শুধু রং বদলিয়েছে?

সময় জীবনে চলার পথ দেখিয়ে দেয়

কালো ও সবুজ চা : জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব

বাঙালিরা ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়

অন্তর্বর্তী সরকার জাতিকে কী দিল

ভালোবাসা, সচেতনতা ও জনস্বাস্থ্য বাস্তবতা

ভালোবাসার দিনে সুন্দরবন: উদযাপনের আড়ালে অস্তিত্বের সংকট

ছবি

তিরাশির সেই দিন

অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ নিতে হবে নতুন সরকারকে

সবুজ অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ: সম্ভাবনা, সংকট ও করণীয়

গণতন্ত্র: একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা

‘ভোট দিছি ভাই, ছিল দিছি...’

নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

ক্ষমতার অক্টোপাস: রাষ্ট্র দখল ও আমজনতার নাভিশ্বাস

কার হাতে উঠবে শাসনের রাজদণ্ড

নির্বাচন ও সাধারণ ভোটারের ‘অসাধারণ’ সামাজিক চাপ

মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক

মহাকাশের ভূত ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

নির্বাচনী হাওয়ার ভেতরে করুণ মৃত্যুর সংবাদ

দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে!

দক্ষিণপন্থার রাজনীতি: অগ্রগতি নাকি অবনমন?

সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ

ছবি

নির্বাচনের স্বপ্ন ও স্বপ্নের নির্বাচন

সরিষার চাষে সমৃদ্ধি ও ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা

জমি কেনার আইনি অধিকার ও বাস্তবতা

‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে জামায়াত

‘মাউশি’ বিভাজন : শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার, না অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি?

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

মেশকাতুন নাহার

বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬

শিশু যখন জন্ম নেয়, সে কোনো নিয়ম জানে না, কোনো ভয় জানে না, কোনো মুখোশ বহন করে না। তার চোখে থাকে বিস্ময়, কৌতূহল আর মুক্তির স্বপ্ন। সে জানে না এই পৃথিবীতে বড় হওয়া মানে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাওয়া; স্বপ্ন মানে সংশোধনযোগ্য অপরাধ, আর সততা মানে একধরনের আত্মঘাতী বিলাসিতা। সমাজ তাকে ধীরে ধীরে শেখায় কী বলা যাবে, কী বলা যাবে না; কী ভাবা নিরাপদ, আর কোন চিন্তা বিপজ্জনক। এভাবেই একটি পূর্ণ বৃক্ষের সম্ভাবনা জন্মলগ্ন থেকেই টবের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া হয়। শুরু হয় বনসাই জীবনের দীর্ঘ, নীরব বেদনা।

বনসাই দেখতে সুন্দর। সাজানো, নিয়ন্ত্রিত, পরিমিত। সমাজও ঠিক এমন মানুষই পছন্দ করে যারা প্রশ্ন করে না, প্রতিবাদ জানায় না, চোখে চোখ রেখে সত্য বলে না। এই সমাজের কাছে অতিরিক্ত সততা এক ধরনের অসভ্যতা, নৈতিকতা একধরনের অযোগ্যতা, আর স্পষ্টবাদিতা প্রায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ফলে মানুষকে শিখিয়ে দেয়া হয় বেঁচে থাকতে হলে নিজেকে ছোট রাখতে হবে, নিজের শাখা-প্রশাখা নিজেই কেটে ফেলতে হবে।

আমাদের সামাজিক কাঠামোটি এমনভাবে নির্মিত যে এখানে অন্যায় খুব স্বাভাবিক, কিন্তু তার প্রতিবাদ অস্বাভাবিক। দুর্নীতি এখানে কৌশল, চাটুকারিতা এখানে বুদ্ধিমত্তা, আর সত্য গোপন করা এখানে সামাজিক শিষ্টাচার। যে মানুষগুলো এই প্রবাহের বিপরীতে দাঁড়াতে চায়, তারা দ্রুত বুঝে ফেলে এই সমাজ পূর্ণ বৃক্ষের জন্য নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত বনসাইয়ের জন্যই নিরাপদ।

বিশেষ করে সৎ মানুষগুলোই এই বনসাই জীবনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। তারা চাইলেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। তাদের নৈতিক মেরুদন্ড যেন সমাজের চোখে অতিরিক্ত ভারী। কর্মক্ষেত্রে তারা অগ্রাধিকার পায় না, কারণ তারা ‘ম্যানেজ করতে জানে না’। সামাজিক পরিসরে তারা জনপ্রিয় হয় না, কারণ তারা মিথ্যা প্রশংসায় অংশ নেয় না। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তারা একা পড়ে যায়, কারণ তারা অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে না।

এই সমাজে সৎ মানুষকে বলা হয় ‘বাস্তববাদী হও।’ এই শব্দটির আড়ালে লুকিয়ে থাকে একটি নিষ্ঠুর নির্দেশ: অন্যায় মেনে নাও, নত হও, চুপ থাকো। সততা এখানে কোনো গৌরবের বিষয় নয়, বরং এক ধরনের অপ্রয়োজনীয় বোঝা। তাই সৎ মানুষগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। তারা কথা কম বলে, স্বপ্ন ছোট করে, প্রত্যাশা সীমিত করে। তারা বনসাই হয়ে যায় দেখতে শান্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্ষতবিক্ষত।

সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর অনাচারগুলোর একটি হলো মানুষকে তার অনুভূতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখানো। এখানে কাঁদা দুর্বলতা, ক্ষোভ অসভ্যতা, আর প্রতিবাদকে বলা হয় অশান্তি সৃষ্টি। ফলে মানুষের আবেগকে নিয়মের কাঁচিতে কেটে ফেলা হয়। আনন্দের সীমা নির্ধারণ করা হয়, দুঃখের প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়। এই আবেগহীন মানুষগুলোই পরে হয়ে ওঠে সবচেয়ে বিপজ্জনক কারণ তারা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাঁপে না।

আজকের আধুনিকতা আমাদের দিয়েছে উঁচু দালান, দ্রুত যোগাযোগ, আর কৃত্রিম হাসি। কিন্তু কেড়ে নিয়েছে খোলা আকাশ, মাটির গন্ধ, আর নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার। শিশুরা আর কাদামাটিতে খেলতে শেখে না, বড়রা আর সত্য বলতে সাহস পায় না। চারপাশে এত শব্দ, অথচ কোথাও কোনো সত্যিকারের সংলাপ নেই। সবাই ব্যস্ত নিজ নিজ টব সামলাতে।

আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলেছি যেখানে প্রশ্ন করার আগেই মানুষকে চুপ করিয়ে দেয়া হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুখস্থ বিদ্যা শেখানো হয়, কিন্তু চিন্তা শেখানো হয় না। কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতিতে আদর্শ নয়, কৌশলই মুখ্য। ধর্মের নামে নৈতিকতা বিক্রি হয়, আর নীতির নামে ক্ষমতা রক্ষা করা হয়। এই দ্বিচারিতাই সমাজকে ক্রমশ বনসাই উদ্যানে পরিণত করেছে যেখানে সবকিছু সাজানো, কিন্তু কিছুই স্বাভাবিক নয়।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো এই বনসাই জীবনকে আমরা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছি। আমরা ভাবছি, এভাবেই জীবন চলে। আমরা ভুলে যাচ্ছি মানুষের স্বাভাবিক গন্তব্য হলো বিস্তার, সংকোচন নয়। মানুষ জন্মায় আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে, টবের মাপে নিজেকে মাপার জন্য নয়।

যে সমাজ সৎ মানুষকে একা করে দেয়, সে সমাজ একদিন নৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। কারণ সততা কোনো ব্যক্তিগত বিলাসিতা নয়, এটি সামাজিক ভারসাম্যের মূল ভিত্তি। সততাকে যখন শাস্তি দেওয়া হয়, তখন অন্যায় পুরস্কৃত হয়। আর তখনই সমাজের ভিত ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে নীরবে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে।

তবু আশার কথা একেবারে শেষ হয়ে যায় না। এখনো কিছু মানুষ আছে যারা বনসাই হতে অস্বীকার করে। তারা জানে ঝড় আসবে, বজ্রপাত হবে, তবু পূর্ণ বৃক্ষ হয়ে দাঁড়ানোর ঝুঁকি নিতে হবে। তারা হয়তো সংখ্যায় কম, কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে পরিবর্তন কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ দিয়ে শুরু হয় না, শুরু হয় অল্প কিছু দৃঢ় মানুষ দিয়ে।

আমাদের প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষকে বড় হতে ভয় দেখানো হবে না। যেখানে সততা হবে শক্তি, দুর্বলতা নয়। যেখানে প্রশ্ন করা হবে নাগরিক দায়িত্ব, অপরাধ নয়। যেখানে মানুষ টব ভেঙে মাটিতে শিকড় ছড়াতে পারবে।

নইলে আমরা সবাই মিলে এক বিশাল বনসাই বাগান হয়ে থাকব পরিপাটি, নিয়ন্ত্রিত, নীরব। বাইরে থেকে দেখলে সুন্দর, কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রাণহীন। আর সেই বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইতিহাস একদিন আমাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করবে-

‘তোমরা কি সত্যিই বেঁচে ছিলে, নাকি কেবল বেঁচে থাকার অভিনয় করেছিলে?’

[লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

back to top