alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

এইচ এম ইমাম হাসান

: বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬

বর্তমানে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী একজন প্রার্থী ভোটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারেন। এই সীমাবদ্ধতা খুব স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় রাজনীতিতে বিশাল পোস্টার, লাগামহীন মাইকিং কিংবা ব্যয়বহুল শোভাযাত্রার যুগ ধীরে ধীরে শেষের পথে। বদলে যাচ্ছে প্রচারের ভাষা ও কৌশল। এই নতুন বাস্তবতা আমাদের শেখায়, রাজনীতিতে জয়ের চাবিকাঠি আর অর্থের জোরে নয়; বরং নির্ভুল পরিকল্পনা, বুদ্ধিদীপ্ত বার্তা আর সৃজনশীল যোগাযোগই এখন আসল শক্তি।

ডিজিটাল প্রযুক্তি সেই শক্তিকেই সহজ করে দিয়েছে। অল্প খরচে, স্বল্প সময়ে এবং কোনো মধ্যস্থতা ছাড়াই একজন প্রার্থী এখন সহজেই সরাসরি পৌঁছে যেতে পারেন হাজারো ভোটারের কাছে তার হাতে থাকা মোবাইল ফোনে।

এসএমএসের মাধ্যমে পাঠানো বার্তা, ছোট ভিডিও ক্লিপ বা প্রার্থীর নিজের কণ্ঠে ভোট চাওয়ার অডিও বার্তা এই ছোট ছোট উদ্যোগ যেমন একদিকে পরিবেশ নষ্ট না করে পোস্টারভরা দেয়ালের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। আবার অন্যদিকে এসব পদ্ধতি কম খরচে ভোটারকে অনেক বেশি আকৃষ্ট করতে পারে। অনেক সময় প্রার্থীর নিজস্ব কণ্ঠের বার্তাই ভোটারের মনে আলাদা প্রভাব ফেলে। কারণ এখানে শব্দ নয়, পৌঁছায় মানুষ; স্লোগান নয়, পৌঁছায় অনুভূতি। ডিজিটাল যোগাযোগ তাই আজ কেবল বিকল্প নয়, আধুনিক রাজনীতির সবচেয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত হাতিয়ার।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শুধু প্রচারণার নয়, সংলাপেরও জায়গা

আজকের দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক যোগাযোগের বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। ফেইসবুক, এক্স (টুইটার), ইউটিউব বা টিকটক সবকিছুই হতে পারে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সংযোগ সেতু।

২০০৮ ও ২০১২ সালের মার্কিন নির্বাচনে বারাক ওবামার ডিজিটাল ভোটার ক্যাম্পেইনের কৌশল বাংলাদেশের নির্বাচনী পরিবেশেও প্রাসঙ্গিক। দেশে আজকের তরুণ ভোটাররা ফেইসবুক, ইউটিউব, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে খবর এবং রাজনৈতিক তথ্য গ্রহণ করে। একজন প্রার্থী যদি এদের কাছে সরাসরি পৌঁছাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন যেমন: ফেসবুক লাইভ, ছোট ভিডিও বার্তা, বা এসএমএসের মাধ্যমে নির্বাচনী বার্তা তাহলে কম খরচে, সীমিত সময়ে বেশি ভোটারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন সম্ভব। স্থানীয় ভোটারদের জন্য ছোট, এলাকার ভাষায় তৈরি ভিডিও বা অডিও বার্তা প্রেরণ করলে মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত সংযোগ তৈরি হয়, যা প্রচারণার কার্যকারিতা অনেক বৃদ্ধি করে।

প্রার্থীর নিজের কণ্ঠে বলা ছোট বার্তা কেন তিনি দাঁড়িয়েছেন, কীভাবে তিনি এলাকার সমস্যাগুলো দেখছেন; এটি এসএমএস বা মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়া গেলে ভোটারের সঙ্গে এক ধরনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়। অনেক সময় সেই কণ্ঠের আন্তরিকতাই সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।

ডিজিটাল জরিপ ও অনলাইন ফর্ম ব্যবহার করে ভোটারদের মতামত নেয়াও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব রাখে। প্রার্থীরা ছোট প্রশ্নমালা, এসএমএস ভোট বা ফেইসবুক পুলের মাধ্যমে জনগণের ভাবনা ও চাহিদা সংগ্রহ করতে পারেন। এতে ভোটাররা অনুভব করেন প্রার্থী শুধু কথা বলছেন না, তারা তাদের কথাও শুনছেন। এই অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া ইশতেহার তৈরি বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলন আনে। যে নেতা এই ডিজিটাল অংশগ্রহণকে কাজে লাগাতে পারেন, তার প্রতি মানুষের আস্থা ও সমর্থন অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়।

সহজ ভাষা, আন্তরিক কথা এটাই কার্যকর রাজনীতি

রাজনৈতিক ভাষণ যত ভারী শব্দে বোঝাই হয়, মানুষের মন তত দ্রুত সরে যায়। সাধারণ মানুষ চায় নিজের জীবনের সঙ্গে মিল আছে এমন কথা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানি তার বক্তৃতায় রাজনীতির জটিল হিসাব না কষে তিনি গল্প বলেছেন। সেই গল্পে ছিল একজন শ্রমজীবী মানুষ, একজন শিক্ষার্থী, কিংবা একটি পরিবারের সংগ্রাম। ফলে ভোটাররা শুধু রাজনীতির কথা শোনেন নায়, তারা তাদের নিজেদের অবস্থানসমূহ অনুভব করতে পেরেছেন।

এই জায়গাটিতেই ডিজিটাল মাধ্যম রাজনীতিকে নতুন শক্তি দিতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গল্প বলা সহজ, দ্রুত এবং প্রভাবশালী। একজন প্রার্থী চাইলে ফেইসবুক বা ইউটিউবে দুই মিনিটের একটি ভিডিওতে একজন কৃষকের ক্ষতির গল্প তুলে ধরতে পারেন কেন সেচের দাম বেড়েছে, কীভাবে বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতায় তিনি ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। একইভাবে তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রশ্নে লম্বা ভাষণের বদলে একটি ছোট ভিডিও বা রিলেই বলা যায় একজন বেকার গ্রাজুয়েট কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে, আর রাষ্ট্রীয় নীতিতে কোথায় সহায়তা দরকার।

লাইভ ভিডিও বা স্টোরির মাধ্যমে সরাসরি কথা বলার সুযোগ ডিজিটাল মাধ্যমের বড় শক্তি। প্রার্থী যখন নিজের মোবাইল ফোনে ক্যামেরা চালু করে সাধারণ ভাষায় বলেন ‘আপনাদের সমস্যাগুলো আমি শুনছি’ তখন সেটি পোস্টারের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়। এখানে কোনো স্ক্রিপ্টেড বক্তব্য নয়, বরং স্বাভাবিক কথোপকথনই মানুষকে টানে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রশ্ন-উত্তরই আধুনিক নেতৃত্বের পরিচয়

কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর টাউন হল মিটিং শুধু একটি সভা নয়, এটি ছিল জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সরাসরি সংযোগের একটি কার্যকর মডেল। সেখানে নাগরিকরা নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পেরেছেন, আবার সরকারও দায়িত্বশীলভাবে জবাব দিয়েছে। এই পারস্পরিক সংলাপই সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা দৃঢ় করেছিল।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় একই ধরনের ‘জনসংলাপ দিবস’ চালু করা এখন আর কঠিন কিছু নয়। সময় ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকের পক্ষে সরাসরি উপস্থিত থাকা সম্ভব না হলেও, ডিজিটাল মাধ্যম সেই বাধা সহজেই ভেঙে দিতে পারে।

ফেইসবুক লাইভ হতে পারে ডিজিটাল জনসংলাপের সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। নির্দিষ্ট দিনে ও সময়ে জনপ্রতিনিধি লাইভে এসে এলাকার সমস্যা, চলমান উন্নয়ন প্রকল্প বা নাগরিক সেবার অগ্রগতি নিয়ে কথা বলতে পারেন। একই সঙ্গে কমেন্ট বক্স থেকে প্রশ্ন নেয়া বা আগে থেকে সংগ্রহ করা প্রশ্নের উত্তর দেয়া যেতে পারে। এতে মানুষ সরাসরি যুক্ত থাকার সুযোগ পায়, আবার নেতার কাছ থেকেও তাৎক্ষণিক জবাব পায়। জনগণ তখন বুঝতে পারে তাদের কথা গুরুত্ব পাচ্ছে। এই অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিই আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগের ভিত্তি।

মানবিক উপস্থিতি: ডিজিটাল মাধ্যমেও সহানুভূতির প্রকাশ সম্ভব

কখনো কখনো একটি মানবিক আচরণ হাজার বক্তৃতার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন ২০১৯ সালের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদ হামলার পর যেভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তা শুধু মাঠের উপস্থিতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না তার বক্তব্য, ছবি ও বার্তা ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছিল।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বন্যা, অগ্নিকান্ড বা দুর্ঘটনার সময় নেতাদের তাৎক্ষণিক ডিজিটাল আপডেট ফেইসবুক লাইভ, সংক্ষিপ্ত ভিডিও বার্তা কিংবা নিজ কণ্ঠে দেয়া অডিও বার্তা মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারে। তবে শর্ত একটাই এই উপস্থিতি যেন ক্যামেরার জন্য না হয়, মানুষের জন্য হয়। ডিজিটাল মাধ্যম এখানে সহানুভূতির বাহক হতে পারে, প্রদর্শনের নয়।

সহজ ভাষা আর আন্তরিক কথাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ডিজিটাল মাধ্যম সবচেয়ে কার্যকর মঞ্চ। যে নেতা এই শক্তিকে বুঝে ব্যবহার করতে পারবেন, তার কথা কাগজে বা ডিজিটাল ডিভাইসে আটকে থাকবে না, মানুষের মনে জায়গা করে নেবে।

[লেখক: ডেপুটি ম্যানেজার (পাবলিক রিলেশনস), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)]

মহাকাশ অর্থনীতি

কুষ্ঠ : নতুন সরকার ও একটি জাতীয় বিষয়ে প্রত্যাশা

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

ভাষার রাজনীতি এবং রাজনীতির ভাষা

ছবি

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী

ছবি

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতের আহ্বান

কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খলে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

ছবি

নির্বাচনে জোট, নাকি সরকারে

রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার

মানুষ কি বদলেছে, নাকি শুধু রং বদলিয়েছে?

সময় জীবনে চলার পথ দেখিয়ে দেয়

কালো ও সবুজ চা : জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব

বাঙালিরা ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়

অন্তর্বর্তী সরকার জাতিকে কী দিল

ভালোবাসা, সচেতনতা ও জনস্বাস্থ্য বাস্তবতা

ভালোবাসার দিনে সুন্দরবন: উদযাপনের আড়ালে অস্তিত্বের সংকট

ছবি

তিরাশির সেই দিন

অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ নিতে হবে নতুন সরকারকে

সবুজ অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ: সম্ভাবনা, সংকট ও করণীয়

গণতন্ত্র: একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা

‘ভোট দিছি ভাই, ছিল দিছি...’

নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

ক্ষমতার অক্টোপাস: রাষ্ট্র দখল ও আমজনতার নাভিশ্বাস

কার হাতে উঠবে শাসনের রাজদণ্ড

নির্বাচন ও সাধারণ ভোটারের ‘অসাধারণ’ সামাজিক চাপ

মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক

মহাকাশের ভূত ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

নির্বাচনী হাওয়ার ভেতরে করুণ মৃত্যুর সংবাদ

দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে!

দক্ষিণপন্থার রাজনীতি: অগ্রগতি নাকি অবনমন?

সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ

ছবি

নির্বাচনের স্বপ্ন ও স্বপ্নের নির্বাচন

সরিষার চাষে সমৃদ্ধি ও ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা

জমি কেনার আইনি অধিকার ও বাস্তবতা

‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে জামায়াত

‘মাউশি’ বিভাজন : শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার, না অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি?

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

এইচ এম ইমাম হাসান

বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬

বর্তমানে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী একজন প্রার্থী ভোটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারেন। এই সীমাবদ্ধতা খুব স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় রাজনীতিতে বিশাল পোস্টার, লাগামহীন মাইকিং কিংবা ব্যয়বহুল শোভাযাত্রার যুগ ধীরে ধীরে শেষের পথে। বদলে যাচ্ছে প্রচারের ভাষা ও কৌশল। এই নতুন বাস্তবতা আমাদের শেখায়, রাজনীতিতে জয়ের চাবিকাঠি আর অর্থের জোরে নয়; বরং নির্ভুল পরিকল্পনা, বুদ্ধিদীপ্ত বার্তা আর সৃজনশীল যোগাযোগই এখন আসল শক্তি।

ডিজিটাল প্রযুক্তি সেই শক্তিকেই সহজ করে দিয়েছে। অল্প খরচে, স্বল্প সময়ে এবং কোনো মধ্যস্থতা ছাড়াই একজন প্রার্থী এখন সহজেই সরাসরি পৌঁছে যেতে পারেন হাজারো ভোটারের কাছে তার হাতে থাকা মোবাইল ফোনে।

এসএমএসের মাধ্যমে পাঠানো বার্তা, ছোট ভিডিও ক্লিপ বা প্রার্থীর নিজের কণ্ঠে ভোট চাওয়ার অডিও বার্তা এই ছোট ছোট উদ্যোগ যেমন একদিকে পরিবেশ নষ্ট না করে পোস্টারভরা দেয়ালের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। আবার অন্যদিকে এসব পদ্ধতি কম খরচে ভোটারকে অনেক বেশি আকৃষ্ট করতে পারে। অনেক সময় প্রার্থীর নিজস্ব কণ্ঠের বার্তাই ভোটারের মনে আলাদা প্রভাব ফেলে। কারণ এখানে শব্দ নয়, পৌঁছায় মানুষ; স্লোগান নয়, পৌঁছায় অনুভূতি। ডিজিটাল যোগাযোগ তাই আজ কেবল বিকল্প নয়, আধুনিক রাজনীতির সবচেয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত হাতিয়ার।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শুধু প্রচারণার নয়, সংলাপেরও জায়গা

আজকের দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক যোগাযোগের বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। ফেইসবুক, এক্স (টুইটার), ইউটিউব বা টিকটক সবকিছুই হতে পারে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সংযোগ সেতু।

২০০৮ ও ২০১২ সালের মার্কিন নির্বাচনে বারাক ওবামার ডিজিটাল ভোটার ক্যাম্পেইনের কৌশল বাংলাদেশের নির্বাচনী পরিবেশেও প্রাসঙ্গিক। দেশে আজকের তরুণ ভোটাররা ফেইসবুক, ইউটিউব, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে খবর এবং রাজনৈতিক তথ্য গ্রহণ করে। একজন প্রার্থী যদি এদের কাছে সরাসরি পৌঁছাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন যেমন: ফেসবুক লাইভ, ছোট ভিডিও বার্তা, বা এসএমএসের মাধ্যমে নির্বাচনী বার্তা তাহলে কম খরচে, সীমিত সময়ে বেশি ভোটারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন সম্ভব। স্থানীয় ভোটারদের জন্য ছোট, এলাকার ভাষায় তৈরি ভিডিও বা অডিও বার্তা প্রেরণ করলে মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত সংযোগ তৈরি হয়, যা প্রচারণার কার্যকারিতা অনেক বৃদ্ধি করে।

প্রার্থীর নিজের কণ্ঠে বলা ছোট বার্তা কেন তিনি দাঁড়িয়েছেন, কীভাবে তিনি এলাকার সমস্যাগুলো দেখছেন; এটি এসএমএস বা মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়া গেলে ভোটারের সঙ্গে এক ধরনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়। অনেক সময় সেই কণ্ঠের আন্তরিকতাই সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।

ডিজিটাল জরিপ ও অনলাইন ফর্ম ব্যবহার করে ভোটারদের মতামত নেয়াও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব রাখে। প্রার্থীরা ছোট প্রশ্নমালা, এসএমএস ভোট বা ফেইসবুক পুলের মাধ্যমে জনগণের ভাবনা ও চাহিদা সংগ্রহ করতে পারেন। এতে ভোটাররা অনুভব করেন প্রার্থী শুধু কথা বলছেন না, তারা তাদের কথাও শুনছেন। এই অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া ইশতেহার তৈরি বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলন আনে। যে নেতা এই ডিজিটাল অংশগ্রহণকে কাজে লাগাতে পারেন, তার প্রতি মানুষের আস্থা ও সমর্থন অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়।

সহজ ভাষা, আন্তরিক কথা এটাই কার্যকর রাজনীতি

রাজনৈতিক ভাষণ যত ভারী শব্দে বোঝাই হয়, মানুষের মন তত দ্রুত সরে যায়। সাধারণ মানুষ চায় নিজের জীবনের সঙ্গে মিল আছে এমন কথা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানি তার বক্তৃতায় রাজনীতির জটিল হিসাব না কষে তিনি গল্প বলেছেন। সেই গল্পে ছিল একজন শ্রমজীবী মানুষ, একজন শিক্ষার্থী, কিংবা একটি পরিবারের সংগ্রাম। ফলে ভোটাররা শুধু রাজনীতির কথা শোনেন নায়, তারা তাদের নিজেদের অবস্থানসমূহ অনুভব করতে পেরেছেন।

এই জায়গাটিতেই ডিজিটাল মাধ্যম রাজনীতিকে নতুন শক্তি দিতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গল্প বলা সহজ, দ্রুত এবং প্রভাবশালী। একজন প্রার্থী চাইলে ফেইসবুক বা ইউটিউবে দুই মিনিটের একটি ভিডিওতে একজন কৃষকের ক্ষতির গল্প তুলে ধরতে পারেন কেন সেচের দাম বেড়েছে, কীভাবে বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতায় তিনি ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। একইভাবে তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রশ্নে লম্বা ভাষণের বদলে একটি ছোট ভিডিও বা রিলেই বলা যায় একজন বেকার গ্রাজুয়েট কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে, আর রাষ্ট্রীয় নীতিতে কোথায় সহায়তা দরকার।

লাইভ ভিডিও বা স্টোরির মাধ্যমে সরাসরি কথা বলার সুযোগ ডিজিটাল মাধ্যমের বড় শক্তি। প্রার্থী যখন নিজের মোবাইল ফোনে ক্যামেরা চালু করে সাধারণ ভাষায় বলেন ‘আপনাদের সমস্যাগুলো আমি শুনছি’ তখন সেটি পোস্টারের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়। এখানে কোনো স্ক্রিপ্টেড বক্তব্য নয়, বরং স্বাভাবিক কথোপকথনই মানুষকে টানে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রশ্ন-উত্তরই আধুনিক নেতৃত্বের পরিচয়

কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর টাউন হল মিটিং শুধু একটি সভা নয়, এটি ছিল জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সরাসরি সংযোগের একটি কার্যকর মডেল। সেখানে নাগরিকরা নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পেরেছেন, আবার সরকারও দায়িত্বশীলভাবে জবাব দিয়েছে। এই পারস্পরিক সংলাপই সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা দৃঢ় করেছিল।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় একই ধরনের ‘জনসংলাপ দিবস’ চালু করা এখন আর কঠিন কিছু নয়। সময় ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকের পক্ষে সরাসরি উপস্থিত থাকা সম্ভব না হলেও, ডিজিটাল মাধ্যম সেই বাধা সহজেই ভেঙে দিতে পারে।

ফেইসবুক লাইভ হতে পারে ডিজিটাল জনসংলাপের সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। নির্দিষ্ট দিনে ও সময়ে জনপ্রতিনিধি লাইভে এসে এলাকার সমস্যা, চলমান উন্নয়ন প্রকল্প বা নাগরিক সেবার অগ্রগতি নিয়ে কথা বলতে পারেন। একই সঙ্গে কমেন্ট বক্স থেকে প্রশ্ন নেয়া বা আগে থেকে সংগ্রহ করা প্রশ্নের উত্তর দেয়া যেতে পারে। এতে মানুষ সরাসরি যুক্ত থাকার সুযোগ পায়, আবার নেতার কাছ থেকেও তাৎক্ষণিক জবাব পায়। জনগণ তখন বুঝতে পারে তাদের কথা গুরুত্ব পাচ্ছে। এই অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিই আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগের ভিত্তি।

মানবিক উপস্থিতি: ডিজিটাল মাধ্যমেও সহানুভূতির প্রকাশ সম্ভব

কখনো কখনো একটি মানবিক আচরণ হাজার বক্তৃতার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন ২০১৯ সালের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদ হামলার পর যেভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তা শুধু মাঠের উপস্থিতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না তার বক্তব্য, ছবি ও বার্তা ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছিল।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বন্যা, অগ্নিকান্ড বা দুর্ঘটনার সময় নেতাদের তাৎক্ষণিক ডিজিটাল আপডেট ফেইসবুক লাইভ, সংক্ষিপ্ত ভিডিও বার্তা কিংবা নিজ কণ্ঠে দেয়া অডিও বার্তা মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারে। তবে শর্ত একটাই এই উপস্থিতি যেন ক্যামেরার জন্য না হয়, মানুষের জন্য হয়। ডিজিটাল মাধ্যম এখানে সহানুভূতির বাহক হতে পারে, প্রদর্শনের নয়।

সহজ ভাষা আর আন্তরিক কথাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ডিজিটাল মাধ্যম সবচেয়ে কার্যকর মঞ্চ। যে নেতা এই শক্তিকে বুঝে ব্যবহার করতে পারবেন, তার কথা কাগজে বা ডিজিটাল ডিভাইসে আটকে থাকবে না, মানুষের মনে জায়গা করে নেবে।

[লেখক: ডেপুটি ম্যানেজার (পাবলিক রিলেশনস), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)]

back to top