alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

খোলা হাওয়া, তেজি বৃষ্টি এবং ঝকঝকে রোদ

শেখর ভট্টাচার্য

: সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
image

জিজ্ঞাসা কি ক্রমান্বয়ে কমে আসছে আমাদের? জিজ্ঞাসা না করার সুবিধা অনেক। আপনি কী জানতে চান, জানতে চাওয়ার মতলব কী- এসব বিষয় নিয়ে গবেষণা করার লোকের অভাব নেই দেশে। সকলেই গবেষক। অনেকেই জিজ্ঞাসাকে পাকস্থলীতে ঢুকিয়ে রাখেন আজকাল। পাকস্থলীতে ঢুকিয়ে রাখলে জিজ্ঞাসা বিকশিত হওয়ার আগেই নীরবে, অলক্ষ্যে বেরিয়ে যায়। কেউ জানতে পারে না। আপনার মুখোশ দৃশ্যমান, মুখ আড়ালে। মুখোশ নিয়েই দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারেন সারা জীবন।

আমাদের শৈশবে একটি বিষয় শেখানো হতো, বড়দেরকে প্রশ্ন করতে নেই। বড়দেরকে প্রশ্ন করা আদব লেহাজের বাইরের বিষয়। এখনও একই মূল্যবোধ আমরা ধরে রেখেছি। ‘বড়দের’ শব্দটির সংজ্ঞা কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। ‘বড়’ হলো ক্ষমতাবান। ক্ষমতার সঙ্গে দুটি বিষয় অবিচ্ছেদ্য। ক্ষমতাকে পরিপুষ্ট করে অর্থ এবং পদবী কিংবা পেশা। অর্থের কোন জাত-ধর্ম নেই তবে পদবী রাজনৈতিক হলে ক্ষমতাকে মমতা করে দ্রুত বেড়ে উঠতে সহায়তা করে। ক্ষমতা কী না পারে। ক্ষমতার ম্যাজিকে চাটুকারের দল মুহূর্তে বদলে যায়। ক্ষমতা আপনার চরিত্রকে ফুল, চাঁদ কিংবা নক্ষত্রের মতো পবিত্র করতে পারে নিমিষেই।

স্তাবকের দল মুহূর্তে ছড়িয়ে বেড়ায়, তিনি প্রশ্নাতীত অর্থাৎ তাকে প্রশ্ন করতে নেই। কথাটির অর্থ হলো ক্ষমতাকে, ক্ষমতাসীনকে প্রশ্ন করতে নেই। প্রশ্ন না করার অভ্যাস হয়ে গেলে প্রশ্ন করার সাহস, বিশ্বাস দ্রুত কমে যায় তখন আমরা বলি এই জনপদের মানুষগুলো সন্তুষ্ট চিত্তে জীবনকে যাপন করে যাচ্ছে। কিছু দুষ্টু লোক আবার বলে বেড়ায় সমাজে, জনপদে, রাষ্ট্রে নীরবতার সংস্কৃতি নেমে এসেছে। নীরবতার সংস্কৃতি কথাটির অর্থ হলো, প্রশ্ন করা, জিজ্ঞাসা করার সামনে দেয়াল তুলে দিয়ে শব্দ, বাক্যকে ব্যক্তির মনের বাইরে যেতে না দেয়ার ব্যবস্থা করা। কবি আল মাহমুদ অসাধারণভাবে জিজ্ঞাসা বা প্রশ্ন নিয়ে কবিতার চরণে চরণে চমৎকার কিছু কথা বলে গেছেন। কবির কথাগুলো অনন্তকাল প্রাসঙ্গিক থেকে যাবে, কী বলেছিলেন বাংলা সাহিত্যের এই প্রধান কবি:

“আমার জিজ্ঞাসা যেন ক্রমান্বয়ে কমে আসছে, আমি/অহরহ আর কাউকে প্রশ্নবাণে/বিব্রত করি না।/জানতে চাই না আজকাল/কেবল আমারি কেন পদতলে কেঁপে ওঠে মাটি।/কোথাও ভূকম্পন নেই।/ তবু কেন তবু কেন/নগরকম্পনের জের চলতে থাকে আমার শিরায়।/প্রশ্ন করি না।” আহা, আমাদের এই দেশ, এই সমাজে জিজ্ঞাসা নিয়ে আর কোন কবি এত মহৎ কবিতা রচনা করেছেন কিনা আমার জানা নেই।

ক্ষমতার ধার যেমন বেশি, ভারেও ক্ষমতা ক্ষমতাবান। অস্থির সময়ে তাই ক্ষমতাকে বুদ্ধিমানরা প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকেন। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার থেকে ‘আমন ধান নিয়ে প্রশ্ন সুবিধাজনক। প্রিয় পাঠক আমন ধানের গল্পটির কথা মনে আছে। হুমায়ূন আহমেদের বিপুল জনপ্রিয় ‘অয়োময়’ নাটকের কেন্দ্রিয় চরিত্র মির্জা সাহেব। আভিজাত্যের দম্ভ, জমিদারির অহংকারের সামনে কারো পক্ষে তার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করা কঠিন। মির্জা সাহেব সবার কাছে অভিজাত হিসেবে স্বীকৃত। অভিজাত মানুষ হিসেবে অনুভূতি প্রকাশে সংযমী। কান্না করাকে পৌরুষত্বের গ্লানি বলে ভাবেন। হাসেনও খুব মাপজোক করে। হিসেবি হাসি। খিলখিল করে হাসে ছোটলোকেরা। এরকম হাসিতে ব্যক্তিত্ব ম্লান হয়ে যায়।

অয়োময় নাটকের একটি ছোট দৃশ্য খুব তাৎপর্যময়। মির্জা সাহেবের দরিদ্র শ্বশুর এসেছেন মেয়েকে নাইওর নিতে। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন জামাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রস্তাবটি পাড়তে তিনি হতবিহ্বল। দুর্বল চিত্তের শ্বশুর তাকে কিছু বলতে চান! প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মির্জা সাহেব বিষয়টি তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে টের পেয়ে যান। অনেক কসরত করে, কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করে একপর্যায়ে আলাপের ফাঁকে শ্বশুর মেয়েকে নাইওর নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন।

‘বাবাজি মেয়েটি অনেক দিন হয় ওর মায়েরে দেখে না, এবার তাকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাব বলে চিন্তা করেছি।’ ঠোঁটের কোন দিয়ে এক চিলতে হাসি বেরিয়ে পড়ে মির্জা সাহেবের। হাসির মধ্যে মির্জা সাহেবের নিজস্ব ঢঙের গাম্ভীর্য রয়েছে। এ হাসির অর্থ যে কী, তা ঠাহর করা কষ্ট। নাইওর নেয়ার প্রস্তাবের উত্তরে দাপুটে মির্জা হঠাৎ করে বলে উঠেন, ‘আপনাদের দেশে এবছর আমন ধানের ফলন কেমন’। প্রসঙ্গ ময়মনসিংহ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে চলে যায়। মির্জার দরিদ্র নিস্প্রভ চরিত্রের শ্বশুর, মেয়েকে আর নিয়ে যাওয়ার কথায় ফিরে আসতে পারেন না। অভিজাত জমিদারের মুখের অভিব্যক্তি আর আমন ধানের প্রসঙ্গ স্পষ্ট বুঝিয় দেয়, তিনি এ আলোচনা পছন্দ করছেন না। মির্জা সাহেবের চালে শ্বশুরের দাবার বোর্ডের রাজা, মন্ত্রী ঘোড়া, নৌকা, বোড়ে সব কুপোকাত। প্রশ্নটি হাওরের ধু-ধু বাতাসে কোথায় উড়ে চলে যায় দরিদ্র শ্বশুর তা ঠাহর করতে পারেন না। ক্ষমতা আর ক্ষমতাবানরা প্রশ্ন পছন্দ করেন না। ক্ষমতাবানদের চারদিকে সবকিছু সুন্দর, আলোকময়, তর্কহীন।

জিজ্ঞাসা কি ক্রমান্বয়ে কমে আসছে আমাদের? জিজ্ঞাসা না করার সুবিধা অনেক। আপনি কী জানতে চান, জানতে চাওয়ার মতলব কী এসব বিষয় নিয়ে গবেষণা করার লোকের অভাব নেই দেশে। সকলেই গবেষক। অনেকেই জিজ্ঞাসাকে পাকস্থলীতে ঢুকিয়ে রাখেন আজকাল। পাকস্থলীতে ঢুকিয়ে রাখলে জিজ্ঞাসা বিকশিত হওয়ার

আগেই নীরবে, অলক্ষ্যে বেরিয়ে যায়। কেউ জানতে পারে না। আপনার মুখোশ দৃশ্যমান, মুখ আড়ালে। মুখোশ

নিয়েই দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারেন সারা জীবন

জিজ্ঞাসা বা প্রশ্ন করে করে আজকের পৃথিবী পাথরে পাথর ঘষতে ঘষতে মহাকাশে বিশাল গ্যাসীয় স্রোত, মস্তিষ্ক-কম্পিউটার ইন্টারফেসের উন্নয়ন, সৌরশক্তি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুগে পৌঁছে গেছে। সক্রেটিস থেকে শুরু করে স্টিফেন হকিং পর্যন্ত বিজ্ঞানী বা দার্শনিক ক্ষমতাবানদের সামনে প্রশ্ন করে করে নির্যাতিত হতে হতে পৃথিবীকে এ পর্যায়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। জিজ্ঞাসা বিপদ ডেকে আনে, এ কথাটি জেনেও তারা মানুষের কল্যাণে ‘হ্যামলক’ পান করেছেন। মৃত্যুকালে হাসতে হাসতে সক্রেটিস বলে গেছেন। আমি চলে যাচ্ছি, তোমরা বেঁচে থাকো। কার বেঁচে থাকা মঙ্গলজনক তা শুধু সৃষ্টিকর্তাই জানেন।

সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার চারপাশে প্রশ্ন উত্থাপন ‘জেনে শুনে বিষ পান’ করার মতো বিষয়। এক্ষেত্রে বুদ্ধিমানেরা ‘সুবোধ বালক’ সেজে থাকেন। সুবোধ বালক সাজা ভালো তবে বাউল সেজে থাকা বিপজ্জনক। আজকাল বাউলকে সমাজ আর আলাভোলা বাউল হিসেবে বিবেচনা করে না। বাউলরা প্রশ্ন করেন। জাত, পাত, সৃষ্টি রহস্য নিয়ে বাউলদের সহজ-সরল অনেক প্রশ্ন আছে। যেমন বাউল শিরোমণি লালন তার সংগীতে অনেক প্রশ্ন করে গেছেন। সবাই করেছেন। হাছনেরও নানা প্রশ্ন। সমাজের হাল তো ধরে থাকেন সমাজপতিরা। সমাজপতিরা বড় ক্ষমতাবান। তারাও তাই প্রশ্ন শুনলে বিরক্ত হন।

তাই সময়কে অনুধাবন করে বুদ্ধিমানের মতো প্রশ্ন করতে হবে। হাছন রাজার মতো বাউলের সহজ প্রশ্নও সময় বিরক্তিকর করে তুলতে পারে। ‘কী ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার...’ কাকে, কেন, কী জানতে প্রশ্ন করেছিলেন হাছন। এর সহজ-সরল ব্যাখ্যা হতে পারে আবার জটিল ব্যাখ্যাও সময়ের স্রোতে ভেসে আমরা করতে পারি।

তেরশ নদীতে ঘেরা এই দেশ, এই সমাজের প্রান্তজনরা বড় অসাধারণ। তারা খোলা হাওয়া, তেজি বৃষ্টি, ঝকঝকে রোদ পছন্দ করেন। তাদের চাওয়া-পাওয়া বড় সীমিত। তাদের জিজ্ঞাসাও সীমিত। তাদের কাছে কী হতে পারে না রাজনীতিবিদ, ক্ষমতাবানদের জবাবদিহি।

সুশাসনের জন্য চাই সব ক্ষেত্রে প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণ। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাজনীতির সংস্কৃতি গড়া খুব কঠিন কাজ নয় এদেশে। ক্ষমতার শক্তির জোগান যদি আসে কৃষি ক্ষেতে কাজ করা আপাত নীরিহ কৃষক, গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিক, ফুটপাতে বসে থাকা হকারের কাছ থেকে। শীতের রাতে নিজেকে প্রতিরোধ করার জন্য যে মানুষ দেহকে নানাভাবে ভেঙে মোচড় দিয়ে রাখেন সেসব মানুষকে কী আমরা সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনা। অবশ্যই পারি। এ কাজ যদি আমরা করতে পারি তাহলে খোলা হাওয়া এসে আমাদের নতুন সমাজের শেকড়কে তরতাজা করে তুলবে। আমরা স্লোগান দেই ‘ক্ষমতা না জনতা, জনতা জনতা’। আন্তরিকভাবে আমরা এবার কি এগোবো জনতার ক্ষমতায়নের পথে। অমূল্য সুযোগ অপেক্ষা করছে আমাদের সামনে। আমরা কী এগোবো এবার জনতার ক্ষমতার পথে।

[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

মহাকাশ অর্থনীতি

কুষ্ঠ : নতুন সরকার ও একটি জাতীয় বিষয়ে প্রত্যাশা

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

ভাষার রাজনীতি এবং রাজনীতির ভাষা

ছবি

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী

ছবি

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতের আহ্বান

কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খলে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

ছবি

নির্বাচনে জোট, নাকি সরকারে

রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার

মানুষ কি বদলেছে, নাকি শুধু রং বদলিয়েছে?

সময় জীবনে চলার পথ দেখিয়ে দেয়

কালো ও সবুজ চা : জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব

বাঙালিরা ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়

অন্তর্বর্তী সরকার জাতিকে কী দিল

ভালোবাসা, সচেতনতা ও জনস্বাস্থ্য বাস্তবতা

ভালোবাসার দিনে সুন্দরবন: উদযাপনের আড়ালে অস্তিত্বের সংকট

ছবি

তিরাশির সেই দিন

অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ নিতে হবে নতুন সরকারকে

সবুজ অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ: সম্ভাবনা, সংকট ও করণীয়

গণতন্ত্র: একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা

‘ভোট দিছি ভাই, ছিল দিছি...’

নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

ক্ষমতার অক্টোপাস: রাষ্ট্র দখল ও আমজনতার নাভিশ্বাস

কার হাতে উঠবে শাসনের রাজদণ্ড

নির্বাচন ও সাধারণ ভোটারের ‘অসাধারণ’ সামাজিক চাপ

মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক

মহাকাশের ভূত ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

নির্বাচনী হাওয়ার ভেতরে করুণ মৃত্যুর সংবাদ

দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে!

দক্ষিণপন্থার রাজনীতি: অগ্রগতি নাকি অবনমন?

সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ

ছবি

নির্বাচনের স্বপ্ন ও স্বপ্নের নির্বাচন

সরিষার চাষে সমৃদ্ধি ও ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা

জমি কেনার আইনি অধিকার ও বাস্তবতা

‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে জামায়াত

‘মাউশি’ বিভাজন : শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার, না অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি?

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

খোলা হাওয়া, তেজি বৃষ্টি এবং ঝকঝকে রোদ

শেখর ভট্টাচার্য

image

সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

জিজ্ঞাসা কি ক্রমান্বয়ে কমে আসছে আমাদের? জিজ্ঞাসা না করার সুবিধা অনেক। আপনি কী জানতে চান, জানতে চাওয়ার মতলব কী- এসব বিষয় নিয়ে গবেষণা করার লোকের অভাব নেই দেশে। সকলেই গবেষক। অনেকেই জিজ্ঞাসাকে পাকস্থলীতে ঢুকিয়ে রাখেন আজকাল। পাকস্থলীতে ঢুকিয়ে রাখলে জিজ্ঞাসা বিকশিত হওয়ার আগেই নীরবে, অলক্ষ্যে বেরিয়ে যায়। কেউ জানতে পারে না। আপনার মুখোশ দৃশ্যমান, মুখ আড়ালে। মুখোশ নিয়েই দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারেন সারা জীবন।

আমাদের শৈশবে একটি বিষয় শেখানো হতো, বড়দেরকে প্রশ্ন করতে নেই। বড়দেরকে প্রশ্ন করা আদব লেহাজের বাইরের বিষয়। এখনও একই মূল্যবোধ আমরা ধরে রেখেছি। ‘বড়দের’ শব্দটির সংজ্ঞা কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। ‘বড়’ হলো ক্ষমতাবান। ক্ষমতার সঙ্গে দুটি বিষয় অবিচ্ছেদ্য। ক্ষমতাকে পরিপুষ্ট করে অর্থ এবং পদবী কিংবা পেশা। অর্থের কোন জাত-ধর্ম নেই তবে পদবী রাজনৈতিক হলে ক্ষমতাকে মমতা করে দ্রুত বেড়ে উঠতে সহায়তা করে। ক্ষমতা কী না পারে। ক্ষমতার ম্যাজিকে চাটুকারের দল মুহূর্তে বদলে যায়। ক্ষমতা আপনার চরিত্রকে ফুল, চাঁদ কিংবা নক্ষত্রের মতো পবিত্র করতে পারে নিমিষেই।

স্তাবকের দল মুহূর্তে ছড়িয়ে বেড়ায়, তিনি প্রশ্নাতীত অর্থাৎ তাকে প্রশ্ন করতে নেই। কথাটির অর্থ হলো ক্ষমতাকে, ক্ষমতাসীনকে প্রশ্ন করতে নেই। প্রশ্ন না করার অভ্যাস হয়ে গেলে প্রশ্ন করার সাহস, বিশ্বাস দ্রুত কমে যায় তখন আমরা বলি এই জনপদের মানুষগুলো সন্তুষ্ট চিত্তে জীবনকে যাপন করে যাচ্ছে। কিছু দুষ্টু লোক আবার বলে বেড়ায় সমাজে, জনপদে, রাষ্ট্রে নীরবতার সংস্কৃতি নেমে এসেছে। নীরবতার সংস্কৃতি কথাটির অর্থ হলো, প্রশ্ন করা, জিজ্ঞাসা করার সামনে দেয়াল তুলে দিয়ে শব্দ, বাক্যকে ব্যক্তির মনের বাইরে যেতে না দেয়ার ব্যবস্থা করা। কবি আল মাহমুদ অসাধারণভাবে জিজ্ঞাসা বা প্রশ্ন নিয়ে কবিতার চরণে চরণে চমৎকার কিছু কথা বলে গেছেন। কবির কথাগুলো অনন্তকাল প্রাসঙ্গিক থেকে যাবে, কী বলেছিলেন বাংলা সাহিত্যের এই প্রধান কবি:

“আমার জিজ্ঞাসা যেন ক্রমান্বয়ে কমে আসছে, আমি/অহরহ আর কাউকে প্রশ্নবাণে/বিব্রত করি না।/জানতে চাই না আজকাল/কেবল আমারি কেন পদতলে কেঁপে ওঠে মাটি।/কোথাও ভূকম্পন নেই।/ তবু কেন তবু কেন/নগরকম্পনের জের চলতে থাকে আমার শিরায়।/প্রশ্ন করি না।” আহা, আমাদের এই দেশ, এই সমাজে জিজ্ঞাসা নিয়ে আর কোন কবি এত মহৎ কবিতা রচনা করেছেন কিনা আমার জানা নেই।

ক্ষমতার ধার যেমন বেশি, ভারেও ক্ষমতা ক্ষমতাবান। অস্থির সময়ে তাই ক্ষমতাকে বুদ্ধিমানরা প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকেন। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার থেকে ‘আমন ধান নিয়ে প্রশ্ন সুবিধাজনক। প্রিয় পাঠক আমন ধানের গল্পটির কথা মনে আছে। হুমায়ূন আহমেদের বিপুল জনপ্রিয় ‘অয়োময়’ নাটকের কেন্দ্রিয় চরিত্র মির্জা সাহেব। আভিজাত্যের দম্ভ, জমিদারির অহংকারের সামনে কারো পক্ষে তার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করা কঠিন। মির্জা সাহেব সবার কাছে অভিজাত হিসেবে স্বীকৃত। অভিজাত মানুষ হিসেবে অনুভূতি প্রকাশে সংযমী। কান্না করাকে পৌরুষত্বের গ্লানি বলে ভাবেন। হাসেনও খুব মাপজোক করে। হিসেবি হাসি। খিলখিল করে হাসে ছোটলোকেরা। এরকম হাসিতে ব্যক্তিত্ব ম্লান হয়ে যায়।

অয়োময় নাটকের একটি ছোট দৃশ্য খুব তাৎপর্যময়। মির্জা সাহেবের দরিদ্র শ্বশুর এসেছেন মেয়েকে নাইওর নিতে। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন জামাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রস্তাবটি পাড়তে তিনি হতবিহ্বল। দুর্বল চিত্তের শ্বশুর তাকে কিছু বলতে চান! প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মির্জা সাহেব বিষয়টি তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে টের পেয়ে যান। অনেক কসরত করে, কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করে একপর্যায়ে আলাপের ফাঁকে শ্বশুর মেয়েকে নাইওর নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন।

‘বাবাজি মেয়েটি অনেক দিন হয় ওর মায়েরে দেখে না, এবার তাকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাব বলে চিন্তা করেছি।’ ঠোঁটের কোন দিয়ে এক চিলতে হাসি বেরিয়ে পড়ে মির্জা সাহেবের। হাসির মধ্যে মির্জা সাহেবের নিজস্ব ঢঙের গাম্ভীর্য রয়েছে। এ হাসির অর্থ যে কী, তা ঠাহর করা কষ্ট। নাইওর নেয়ার প্রস্তাবের উত্তরে দাপুটে মির্জা হঠাৎ করে বলে উঠেন, ‘আপনাদের দেশে এবছর আমন ধানের ফলন কেমন’। প্রসঙ্গ ময়মনসিংহ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে চলে যায়। মির্জার দরিদ্র নিস্প্রভ চরিত্রের শ্বশুর, মেয়েকে আর নিয়ে যাওয়ার কথায় ফিরে আসতে পারেন না। অভিজাত জমিদারের মুখের অভিব্যক্তি আর আমন ধানের প্রসঙ্গ স্পষ্ট বুঝিয় দেয়, তিনি এ আলোচনা পছন্দ করছেন না। মির্জা সাহেবের চালে শ্বশুরের দাবার বোর্ডের রাজা, মন্ত্রী ঘোড়া, নৌকা, বোড়ে সব কুপোকাত। প্রশ্নটি হাওরের ধু-ধু বাতাসে কোথায় উড়ে চলে যায় দরিদ্র শ্বশুর তা ঠাহর করতে পারেন না। ক্ষমতা আর ক্ষমতাবানরা প্রশ্ন পছন্দ করেন না। ক্ষমতাবানদের চারদিকে সবকিছু সুন্দর, আলোকময়, তর্কহীন।

জিজ্ঞাসা কি ক্রমান্বয়ে কমে আসছে আমাদের? জিজ্ঞাসা না করার সুবিধা অনেক। আপনি কী জানতে চান, জানতে চাওয়ার মতলব কী এসব বিষয় নিয়ে গবেষণা করার লোকের অভাব নেই দেশে। সকলেই গবেষক। অনেকেই জিজ্ঞাসাকে পাকস্থলীতে ঢুকিয়ে রাখেন আজকাল। পাকস্থলীতে ঢুকিয়ে রাখলে জিজ্ঞাসা বিকশিত হওয়ার

আগেই নীরবে, অলক্ষ্যে বেরিয়ে যায়। কেউ জানতে পারে না। আপনার মুখোশ দৃশ্যমান, মুখ আড়ালে। মুখোশ

নিয়েই দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারেন সারা জীবন

জিজ্ঞাসা বা প্রশ্ন করে করে আজকের পৃথিবী পাথরে পাথর ঘষতে ঘষতে মহাকাশে বিশাল গ্যাসীয় স্রোত, মস্তিষ্ক-কম্পিউটার ইন্টারফেসের উন্নয়ন, সৌরশক্তি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুগে পৌঁছে গেছে। সক্রেটিস থেকে শুরু করে স্টিফেন হকিং পর্যন্ত বিজ্ঞানী বা দার্শনিক ক্ষমতাবানদের সামনে প্রশ্ন করে করে নির্যাতিত হতে হতে পৃথিবীকে এ পর্যায়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। জিজ্ঞাসা বিপদ ডেকে আনে, এ কথাটি জেনেও তারা মানুষের কল্যাণে ‘হ্যামলক’ পান করেছেন। মৃত্যুকালে হাসতে হাসতে সক্রেটিস বলে গেছেন। আমি চলে যাচ্ছি, তোমরা বেঁচে থাকো। কার বেঁচে থাকা মঙ্গলজনক তা শুধু সৃষ্টিকর্তাই জানেন।

সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার চারপাশে প্রশ্ন উত্থাপন ‘জেনে শুনে বিষ পান’ করার মতো বিষয়। এক্ষেত্রে বুদ্ধিমানেরা ‘সুবোধ বালক’ সেজে থাকেন। সুবোধ বালক সাজা ভালো তবে বাউল সেজে থাকা বিপজ্জনক। আজকাল বাউলকে সমাজ আর আলাভোলা বাউল হিসেবে বিবেচনা করে না। বাউলরা প্রশ্ন করেন। জাত, পাত, সৃষ্টি রহস্য নিয়ে বাউলদের সহজ-সরল অনেক প্রশ্ন আছে। যেমন বাউল শিরোমণি লালন তার সংগীতে অনেক প্রশ্ন করে গেছেন। সবাই করেছেন। হাছনেরও নানা প্রশ্ন। সমাজের হাল তো ধরে থাকেন সমাজপতিরা। সমাজপতিরা বড় ক্ষমতাবান। তারাও তাই প্রশ্ন শুনলে বিরক্ত হন।

তাই সময়কে অনুধাবন করে বুদ্ধিমানের মতো প্রশ্ন করতে হবে। হাছন রাজার মতো বাউলের সহজ প্রশ্নও সময় বিরক্তিকর করে তুলতে পারে। ‘কী ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার...’ কাকে, কেন, কী জানতে প্রশ্ন করেছিলেন হাছন। এর সহজ-সরল ব্যাখ্যা হতে পারে আবার জটিল ব্যাখ্যাও সময়ের স্রোতে ভেসে আমরা করতে পারি।

তেরশ নদীতে ঘেরা এই দেশ, এই সমাজের প্রান্তজনরা বড় অসাধারণ। তারা খোলা হাওয়া, তেজি বৃষ্টি, ঝকঝকে রোদ পছন্দ করেন। তাদের চাওয়া-পাওয়া বড় সীমিত। তাদের জিজ্ঞাসাও সীমিত। তাদের কাছে কী হতে পারে না রাজনীতিবিদ, ক্ষমতাবানদের জবাবদিহি।

সুশাসনের জন্য চাই সব ক্ষেত্রে প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণ। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাজনীতির সংস্কৃতি গড়া খুব কঠিন কাজ নয় এদেশে। ক্ষমতার শক্তির জোগান যদি আসে কৃষি ক্ষেতে কাজ করা আপাত নীরিহ কৃষক, গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিক, ফুটপাতে বসে থাকা হকারের কাছ থেকে। শীতের রাতে নিজেকে প্রতিরোধ করার জন্য যে মানুষ দেহকে নানাভাবে ভেঙে মোচড় দিয়ে রাখেন সেসব মানুষকে কী আমরা সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনা। অবশ্যই পারি। এ কাজ যদি আমরা করতে পারি তাহলে খোলা হাওয়া এসে আমাদের নতুন সমাজের শেকড়কে তরতাজা করে তুলবে। আমরা স্লোগান দেই ‘ক্ষমতা না জনতা, জনতা জনতা’। আন্তরিকভাবে আমরা এবার কি এগোবো জনতার ক্ষমতায়নের পথে। অমূল্য সুযোগ অপেক্ষা করছে আমাদের সামনে। আমরা কী এগোবো এবার জনতার ক্ষমতার পথে।

[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

back to top