alt

উপ-সম্পাদকীয়

সহনশীলতা : সৃষ্টির শক্তি

এমএ কবীর

: শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১

জালালউদ্দিন রুমি বলেছেন : ‘ধৈর্য মানে শুধু বসে বসে অপেক্ষা করা নয়, ধৈর্য মানে ভবিষ্যৎকে দেখতে পাওয়া। ধৈর্য মানে কাটার দিকে তাকিয়ে গোলাপকে দেখা, রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দিনের আলোকে দেখা।’

গণতন্ত্র ব্যবস্থা চালু হয়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। বিশ্বে প্রথম গণতন্ত্র চালু হয় গ্রিসের শহররাষ্ট্র এথেন্সে। সে সময় রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন উপজাতির মধ্য থেকে নেতাদের মনোনীত করে নেয়া হতো। সেখানে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণের কোন সুযোগ ছিল না। পরে সনাতনি এ রীতি ভেঙে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে একটি অভিনব ব্যবস্থা চালু করা হয়। নতুন এ ব্যবস্থাপনার অধীনে প্রত্যেক মুক্ত নাগরিককে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে সরকার পরিচালনায় সরাসরি অংশগ্রহণের অধিকার দেয়া হয়। সাধারণভাবে এ ঘটনাকেই গণতন্ত্রের প্রথম উন্মেষ বলে গণ্য করা হয়।

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত গত কয়েক দিনের সংবাদ শিরোনামগুলোয় দেশের নির্বাচন নিয়ে অনিয়ম ফুটে উঠেছে। ‘সহিংস পরিবেশে আজ ৮৩৮ ইউপিতে ভোট’, ‘ভোট ছাড়া জয়ে রেকর্ড’, ‘এমপি লীগই শেষকথা, ত্যাগীরা কোণঠাসা’, ‘রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহত ৭’, ‘দ্বিতীয় স্থানেও নেই আওয়ামী লীগ’, ‘তৃণমূলে আওয়ামী লীগের বেহাল দশা’। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে কয়েক শত।

খবরে বলা হয়েছে, চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অতীতের সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে; হয়েছে মানুষের মৃত্যু, সংঘর্ষ, কেন্দ্র দখল। প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে নিজেদের মধ্যে। একদিকে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী, অপরদিকে দল থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে যাওয়া বিদ্রোহী প্রার্থী। দলের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে ঝগড়া নিজেরা মিটমাট করতে ব্যর্থ হয়ে প্রশাসনকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিলেও প্রশাসন সামাল দিতে পারেনি। এ নিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, ‘এটা গোষ্ঠী গোষ্ঠীর নির্বাচন, আধিপত্যের নির্বাচন, এতে সব সময়ই একটু ঝগড়াঝাঁটি হয়।’

আজকাল মানুষের মাথা গরম স্বভাবটা দারুণভাবে বেড়েছে। সেটা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে কিংবা সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-মতাদর্শিক-আঞ্চলিক-বৈশ্বিক কারণে কি না, তা ভাবনার বিষয়। তবে নানা বিষয়েই যে মানবসমাজ অসহিষ্ণু, অধৈর্য, বেপরোয়া হয়ে উঠছে, সেটা কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। কেউ আর পরের কথা শুনতে চায় না, নিজের কথা প্রবলভাবে শোনাতে চায়। অন্যের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নেই, নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে চায় দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির জায়গা দখল করছে উগ্রতা,অসহনশীলতা।

সম্ভবত এ জন্যই প্রতি বছর ১৬ নভেম্বর আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস পালন করা হয়। ইউনেসকো ঘোষিত এই দিবস পালনের লক্ষ্য হচ্ছে বহুমুখী সমাজে সহনশীলতা শিক্ষার মাধ্যমে পৃথিবীর সব মানুষের সুষম ও শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন নিশ্চিত করা।

ইউনেসকোর উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয়, ১৯৯৫ সাল থেকে ‘আন্তর্জাতিক সহনশীলতা বর্ষ’ উদযাপন করা হবে। ১৯৯৬ সালের ১৬ নভেম্বর ইউনেসকোর ২৮তম অধিবেশনে ‘সহনশীলতার মৌলিক নীতি ঘোষণা’ গৃহীত এবং প্রতি বছরের ১৬ নভেম্বরকে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ইউনেসকো মনে করে, মানবসমাজ স্বাভাবিকভাবেই বৈচিত্র্যময় এবং এই বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে ভিন্ন মত ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে মানুষের মধ্যে সহনশীল মনোভাব প্রয়োজন। সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার উপস্থিতি সংঘাতের পথকে প্রশস্ত করে না। বরং সহনশীল পরিবেশ এই সামাজিক বাস্তবতাকে সঠিক পথে পরিচালনার মাধ্যমে সমাজের অন্তর্নিহিত সক্ষমতা বাড়ায়।

‘সহনশীলতার মৌলিক নীতি ঘোষণা’য় বলা হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সহনশীলতাকে বাস্তবায়ন করা। ‘সহনশীলতা হচ্ছে সবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদাকে উন্নত করার অপরিহার্য নীতি।’

ইউনেসকো ঘোষণা দিয়েছে, তাই বছরের এক দিন সহনশীলতা দিবস পালন করা এখন অনেকটা যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয়। তবে ব্যাপকভাবে নয়। গণমাধ্যমেও এই দিবস নিয়ে তেমন লেখা হয় না। সরকারের পক্ষ থেকেও কোন কর্মসূচি নেই। তাহলে কি আমরা যথেষ্ট সহনশীল? আসলে আমরাও তো দিনদিন অতিমাত্রায় অসহনশীল হয়ে পড়ছি। আমরা ভিন্নমতকে পাত্তা দিই না। বিরোধিতা পছন্দ করি না। শুধু কি তাই? এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তো এক দলের মধ্যেই হানাহানি, খুনোখুনি হচ্ছে।

যেসব দেশ সহনশীলতা দিবস পালন করছে, সেসব দেশে সহনশীলতার চর্চা বাড়ছে তা কিন্তু জোর দিয়ে বলা যাবে না। সহনশীলতা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? এক কথায়, ধৈর্য না হারিয়ে, নিজের রাগ-ক্রোধ সংবরণ করে উদারতার উদাহরণ তৈরি করাই সহনশীলতার লক্ষণ। সব মানুষ একরকম নয়। সব মানুষের ধর্মবিশ্বাস এক নয়, সব মানুষের ভাষা এক নয়,সব মানুষের সংস্কৃতি এক নয়, সব মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও এক নয়। কিন্তু এই সব ভিন্নতা নিয়ে মানুষকে এক পৃথিবীতে, এক দেশে, এক পাড়ায় বসবাস করতে হয়। এই যে নানা ভিন্নতা নিয়ে পাশাপাশি বসবাস, তার জন্যই প্রয়োজন বিরোধের বদলে সমঝোতা। মানুষ নিজেদের ও সমাজের কল্যাণের জন্য পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। এই পারস্পরিক নির্ভরতাই তো দ্বন্দ্ব-বিরোধের পরিবর্তে একতাবদ্ধভাবে থাকতে মানুষকে অনুপ্রাণিত করার কথা। কিন্তু তা না হয়ে মানুষ কেন বিরোধাত্মক মনোভাবসম্পন্ন হয়ে উঠল?

স্বার্থচিন্তা, অসংযত লোভ ও নানা ভেদজ্ঞানই হয়তো মানুষকে ক্রমাগত সংকীর্ণ ও অসংযত হওয়ার পথে ঠেলতে ঠেলতে এখন একটা চরম হানাহানি ও উগ্রতার বাতাবরণ তৈরি করেছে। সহনশীলতা একটি সামাজিক মূল্যবোধ। সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে সহনশীলতাও আর থাকতে পারে না। মানুষ ক্রমাগত জ্ঞানবিজ্ঞানে এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন আবিষ্কারের নেশা মানুষকে পেয়ে বসেছে। মানুষ যতই অজানাকে জানছে, ততই তার মধ্যে অস্থিরতাও বাড়ছে। আরও জানার আগ্রহ মানুষের তৃপ্তি কেড়ে নিয়েছে। সারাক্ষণ তার মধ্যে চাওয়া-পাওয়ার তীব্রতা বাড়ছে। মনের মধ্যে চাপ বাড়ছে। আর এই ক্রমবর্ধমান চাপ মানুষের জীবনকে ধৈর্যহীন করে তুলছে। ধৈর্যের অভাব একদিকে মানুষের আত্মবিশ্বাস টলিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে তার সাহসও কমিয়ে দিচ্ছে। ও বুঝি আমাকে ছাড়িয়ে গেল, আমি বুঝি তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লাম; ওর হলো, আমার হলো না এমন সব ঘটনার তাড়া মানুষকে সহনশীল থাকতে দিচ্ছে না। বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসীরা পরস্পরকে শত্রু ভাবছে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে অবিশ্বাস বাড়ছে, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ বাড়ছে, সম্পদের বণ্টন সুষম হচ্ছে না,সবকিছুর মিলিত ফল হিংসা। হিংসা থেকেই উগ্রতা।

যারা শক্তির জোরে বিশ্বাসী, তাদের যুক্তির জোরে আস্থাশীল করে তোলার চেষ্টা হতে পারে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবসের একটি লক্ষ্য। পৃথিবীর সব অসাধারণ কাজগুলো হয়েছে শক্তি দিয়ে যতটা না, তার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধি দিয়ে। সহনশীলতাকে দুর্বলতা না ভেবে শক্তি হিসেবে ভাবতে হবে। এটা ধ্বংসের শক্তি নয়, সৃষ্টির শক্তি।

মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে জীবন। এ জীবনকে কেউই হারাতে চায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’ তিনি এই পৃথিবীকে অত্যন্ত সুন্দর দেখেছেন। কারণ, এ পৃথিবী অপূর্ব সৌন্দর্যে ভরপুর। কবি মানুষের মাঝেই বাঁচতে চেয়েছেন। মানুষের মধ্যে কবি কী দেখতে পেয়েছেন? তিনি মানুষের মাঝে বাঁচতে চেয়েছেন কেন? কারণ, মানুষের মধ্যেই মনুষ্যত্বকে দেখতে পাওয়া যায়। পশুপাখি, জীব-জন্তুরাও দেখতে কম সুন্দর নয়। পশুপাখির পশুত্ব রয়েছে কিন্তু তাদের মধ্যে মনুষ্যত্ব নেই। মানবিকতা ছাড়া কোন মানুষই মানুষ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, সভাপতি, ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]

প্রিয়জন হারানোর বেদনা

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হয়েছেটা কী

ক্ষমতার অপব্যবহার দুর্নীতির অন্যতম কারণ

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন চাই

বাংলাদেশ-রাশিয়া বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক

মুজিববর্ষে আদিবাসীদের প্রতি ভালোবাসা

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হতে হবে মূল লক্ষ্য

ডিজিটাল বাংলাদেশ : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা : এখনও অনেক কাজ বাকি

ছবি

নাসিক নির্বাচন কি বার্তা দিচ্ছে?

ছবি

ঊনসত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলো

ছবি

আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই

আমাদের জীবন, আমাদের সন্তান

সমাজে বিভক্তির ফাটল

ভারতে মুসলমানের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ধারাবাহিক অবহেলা

প্রসঙ্গ তালাকের নোটিশ

কীভাবে অজান্তেই ধনী হয়ে উঠছি

নির্বাচন ব্যবস্থাকে অবাধ, সুষ্ঠু ও কার্যকর করা ছাড়া রাষ্ট্রের প্রকৃত কল্যাণ হবে না

ননএমপিও : অবসান হোক এ অসহ রাত্রির

ছবি

কখন ও কেমন হবে করোনার শেষটা

ছবি

‘বিদ্রোহী’ ও সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ

আস্থাহীনতা কেন চিন্তাহীনতার জন্ম দেয়?

কৃষির রূপান্তর : প্রাপ্তির মধ্যে অপ্রাপ্তিও আছে

ভূমি মন্ত্রণালয়ের আধুনিকায়ন ও প্রত্যাশা

ডিজিটাল বাংলাদেশ : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

“অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু”

নতুন কপিরাইট আইনের খসড়া

ছবি

গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে নারীর অংশগ্রহণ

গণমাধ্যমের শিরদাঁড়া

এনসিটিবিতে হচ্ছেটা কী?

করোনায় সৃষ্ট মনোজগতের বিচ্ছিন্নতা

কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য

ছবি

মানিক সাহা হত্যাকাণ্ড ও বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি

আগামীতে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত কি বেঁচে থাকবে?

ছবি

উড়বে ঘুড়ি, পুড়বে আতশবাজি

স্বজন হত্যার বিচারের অপেক্ষায় এক মানুষ

tab

উপ-সম্পাদকীয়

সহনশীলতা : সৃষ্টির শক্তি

এমএ কবীর

শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১

জালালউদ্দিন রুমি বলেছেন : ‘ধৈর্য মানে শুধু বসে বসে অপেক্ষা করা নয়, ধৈর্য মানে ভবিষ্যৎকে দেখতে পাওয়া। ধৈর্য মানে কাটার দিকে তাকিয়ে গোলাপকে দেখা, রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দিনের আলোকে দেখা।’

গণতন্ত্র ব্যবস্থা চালু হয়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। বিশ্বে প্রথম গণতন্ত্র চালু হয় গ্রিসের শহররাষ্ট্র এথেন্সে। সে সময় রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন উপজাতির মধ্য থেকে নেতাদের মনোনীত করে নেয়া হতো। সেখানে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণের কোন সুযোগ ছিল না। পরে সনাতনি এ রীতি ভেঙে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে একটি অভিনব ব্যবস্থা চালু করা হয়। নতুন এ ব্যবস্থাপনার অধীনে প্রত্যেক মুক্ত নাগরিককে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে সরকার পরিচালনায় সরাসরি অংশগ্রহণের অধিকার দেয়া হয়। সাধারণভাবে এ ঘটনাকেই গণতন্ত্রের প্রথম উন্মেষ বলে গণ্য করা হয়।

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত গত কয়েক দিনের সংবাদ শিরোনামগুলোয় দেশের নির্বাচন নিয়ে অনিয়ম ফুটে উঠেছে। ‘সহিংস পরিবেশে আজ ৮৩৮ ইউপিতে ভোট’, ‘ভোট ছাড়া জয়ে রেকর্ড’, ‘এমপি লীগই শেষকথা, ত্যাগীরা কোণঠাসা’, ‘রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহত ৭’, ‘দ্বিতীয় স্থানেও নেই আওয়ামী লীগ’, ‘তৃণমূলে আওয়ামী লীগের বেহাল দশা’। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে কয়েক শত।

খবরে বলা হয়েছে, চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অতীতের সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে; হয়েছে মানুষের মৃত্যু, সংঘর্ষ, কেন্দ্র দখল। প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে নিজেদের মধ্যে। একদিকে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী, অপরদিকে দল থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে যাওয়া বিদ্রোহী প্রার্থী। দলের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে ঝগড়া নিজেরা মিটমাট করতে ব্যর্থ হয়ে প্রশাসনকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিলেও প্রশাসন সামাল দিতে পারেনি। এ নিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, ‘এটা গোষ্ঠী গোষ্ঠীর নির্বাচন, আধিপত্যের নির্বাচন, এতে সব সময়ই একটু ঝগড়াঝাঁটি হয়।’

আজকাল মানুষের মাথা গরম স্বভাবটা দারুণভাবে বেড়েছে। সেটা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে কিংবা সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-মতাদর্শিক-আঞ্চলিক-বৈশ্বিক কারণে কি না, তা ভাবনার বিষয়। তবে নানা বিষয়েই যে মানবসমাজ অসহিষ্ণু, অধৈর্য, বেপরোয়া হয়ে উঠছে, সেটা কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। কেউ আর পরের কথা শুনতে চায় না, নিজের কথা প্রবলভাবে শোনাতে চায়। অন্যের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নেই, নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে চায় দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির জায়গা দখল করছে উগ্রতা,অসহনশীলতা।

সম্ভবত এ জন্যই প্রতি বছর ১৬ নভেম্বর আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস পালন করা হয়। ইউনেসকো ঘোষিত এই দিবস পালনের লক্ষ্য হচ্ছে বহুমুখী সমাজে সহনশীলতা শিক্ষার মাধ্যমে পৃথিবীর সব মানুষের সুষম ও শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন নিশ্চিত করা।

ইউনেসকোর উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয়, ১৯৯৫ সাল থেকে ‘আন্তর্জাতিক সহনশীলতা বর্ষ’ উদযাপন করা হবে। ১৯৯৬ সালের ১৬ নভেম্বর ইউনেসকোর ২৮তম অধিবেশনে ‘সহনশীলতার মৌলিক নীতি ঘোষণা’ গৃহীত এবং প্রতি বছরের ১৬ নভেম্বরকে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ইউনেসকো মনে করে, মানবসমাজ স্বাভাবিকভাবেই বৈচিত্র্যময় এবং এই বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে ভিন্ন মত ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে মানুষের মধ্যে সহনশীল মনোভাব প্রয়োজন। সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার উপস্থিতি সংঘাতের পথকে প্রশস্ত করে না। বরং সহনশীল পরিবেশ এই সামাজিক বাস্তবতাকে সঠিক পথে পরিচালনার মাধ্যমে সমাজের অন্তর্নিহিত সক্ষমতা বাড়ায়।

‘সহনশীলতার মৌলিক নীতি ঘোষণা’য় বলা হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সহনশীলতাকে বাস্তবায়ন করা। ‘সহনশীলতা হচ্ছে সবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদাকে উন্নত করার অপরিহার্য নীতি।’

ইউনেসকো ঘোষণা দিয়েছে, তাই বছরের এক দিন সহনশীলতা দিবস পালন করা এখন অনেকটা যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয়। তবে ব্যাপকভাবে নয়। গণমাধ্যমেও এই দিবস নিয়ে তেমন লেখা হয় না। সরকারের পক্ষ থেকেও কোন কর্মসূচি নেই। তাহলে কি আমরা যথেষ্ট সহনশীল? আসলে আমরাও তো দিনদিন অতিমাত্রায় অসহনশীল হয়ে পড়ছি। আমরা ভিন্নমতকে পাত্তা দিই না। বিরোধিতা পছন্দ করি না। শুধু কি তাই? এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তো এক দলের মধ্যেই হানাহানি, খুনোখুনি হচ্ছে।

যেসব দেশ সহনশীলতা দিবস পালন করছে, সেসব দেশে সহনশীলতার চর্চা বাড়ছে তা কিন্তু জোর দিয়ে বলা যাবে না। সহনশীলতা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? এক কথায়, ধৈর্য না হারিয়ে, নিজের রাগ-ক্রোধ সংবরণ করে উদারতার উদাহরণ তৈরি করাই সহনশীলতার লক্ষণ। সব মানুষ একরকম নয়। সব মানুষের ধর্মবিশ্বাস এক নয়, সব মানুষের ভাষা এক নয়,সব মানুষের সংস্কৃতি এক নয়, সব মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও এক নয়। কিন্তু এই সব ভিন্নতা নিয়ে মানুষকে এক পৃথিবীতে, এক দেশে, এক পাড়ায় বসবাস করতে হয়। এই যে নানা ভিন্নতা নিয়ে পাশাপাশি বসবাস, তার জন্যই প্রয়োজন বিরোধের বদলে সমঝোতা। মানুষ নিজেদের ও সমাজের কল্যাণের জন্য পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। এই পারস্পরিক নির্ভরতাই তো দ্বন্দ্ব-বিরোধের পরিবর্তে একতাবদ্ধভাবে থাকতে মানুষকে অনুপ্রাণিত করার কথা। কিন্তু তা না হয়ে মানুষ কেন বিরোধাত্মক মনোভাবসম্পন্ন হয়ে উঠল?

স্বার্থচিন্তা, অসংযত লোভ ও নানা ভেদজ্ঞানই হয়তো মানুষকে ক্রমাগত সংকীর্ণ ও অসংযত হওয়ার পথে ঠেলতে ঠেলতে এখন একটা চরম হানাহানি ও উগ্রতার বাতাবরণ তৈরি করেছে। সহনশীলতা একটি সামাজিক মূল্যবোধ। সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে সহনশীলতাও আর থাকতে পারে না। মানুষ ক্রমাগত জ্ঞানবিজ্ঞানে এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন আবিষ্কারের নেশা মানুষকে পেয়ে বসেছে। মানুষ যতই অজানাকে জানছে, ততই তার মধ্যে অস্থিরতাও বাড়ছে। আরও জানার আগ্রহ মানুষের তৃপ্তি কেড়ে নিয়েছে। সারাক্ষণ তার মধ্যে চাওয়া-পাওয়ার তীব্রতা বাড়ছে। মনের মধ্যে চাপ বাড়ছে। আর এই ক্রমবর্ধমান চাপ মানুষের জীবনকে ধৈর্যহীন করে তুলছে। ধৈর্যের অভাব একদিকে মানুষের আত্মবিশ্বাস টলিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে তার সাহসও কমিয়ে দিচ্ছে। ও বুঝি আমাকে ছাড়িয়ে গেল, আমি বুঝি তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লাম; ওর হলো, আমার হলো না এমন সব ঘটনার তাড়া মানুষকে সহনশীল থাকতে দিচ্ছে না। বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসীরা পরস্পরকে শত্রু ভাবছে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে অবিশ্বাস বাড়ছে, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ বাড়ছে, সম্পদের বণ্টন সুষম হচ্ছে না,সবকিছুর মিলিত ফল হিংসা। হিংসা থেকেই উগ্রতা।

যারা শক্তির জোরে বিশ্বাসী, তাদের যুক্তির জোরে আস্থাশীল করে তোলার চেষ্টা হতে পারে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবসের একটি লক্ষ্য। পৃথিবীর সব অসাধারণ কাজগুলো হয়েছে শক্তি দিয়ে যতটা না, তার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধি দিয়ে। সহনশীলতাকে দুর্বলতা না ভেবে শক্তি হিসেবে ভাবতে হবে। এটা ধ্বংসের শক্তি নয়, সৃষ্টির শক্তি।

মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে জীবন। এ জীবনকে কেউই হারাতে চায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’ তিনি এই পৃথিবীকে অত্যন্ত সুন্দর দেখেছেন। কারণ, এ পৃথিবী অপূর্ব সৌন্দর্যে ভরপুর। কবি মানুষের মাঝেই বাঁচতে চেয়েছেন। মানুষের মধ্যে কবি কী দেখতে পেয়েছেন? তিনি মানুষের মাঝে বাঁচতে চেয়েছেন কেন? কারণ, মানুষের মধ্যেই মনুষ্যত্বকে দেখতে পাওয়া যায়। পশুপাখি, জীব-জন্তুরাও দেখতে কম সুন্দর নয়। পশুপাখির পশুত্ব রয়েছে কিন্তু তাদের মধ্যে মনুষ্যত্ব নেই। মানবিকতা ছাড়া কোন মানুষই মানুষ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, সভাপতি, ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]

back to top