alt

উপ-সম্পাদকীয়

সমাজের নির্লিপ্ততা এবং ন্যায়ের দাবি

অমিত রায় চৌধুরী

: বুধবার, ২৫ মে ২০২২

খবরটা শুনে চমকে উঠেছিলাম। কলেজপড়ুয়া একটি মেয়ে ঢাকায় তার আত্মীয়ের বাড়িতে উঠেছে। বখাটের উপদ্রব এড়াতে এটাই তার কৌশল। এ জাতীয় ঘটনার সামাজিক ছক মানুষের খুবই চেনা। তবু কেন এ বিষয়টি ভাবনার খোরাক হলো সে আলোচনাটাই জরুরি। প্রণয়ঘটিত কিংবা দুর্বলের ওপর শক্তির দাপট অথবা সংখ্যালঘুর অসহায়ত্ব-কোন হেতুই এখানে প্রযোজ্য নয়। সে কারণেই চিন্তার নতুন দিগন্ত। নতুন গন্তব্য। যুক্তির জগৎ নানা প্রশ্নে আলোড়িত। শিক্ষার্থীর বাবা নিপাট ভদ্রলোক। পারিবারিক ঐতিহ্য এমন খ্যাতিই বয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে। সচ্ছল, প্রতিষ্ঠিত, সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার। প্রচলিত সামাজিক শক্তির যে নিয়ামক-যেমন জনবল বা অর্থবল-তা সবই তাদের আছে। অভিভাবক থানায় জিডি করেছেন। দুর্বৃত্ত গ্যারেজ শ্রমিক। নেশায় আসক্তি থাকতে পারে। তবুও সাহসটা লাগামছাড়া মনে হয়। মেয়ে সুশ্রী, মেধাবী-এটাই কি ঘটনার একমাত্র অনুঘটক? মগজ তাতে সায় দেয় না। পরিবারটি আসলে নিরীহ, ভদ্র। এখানেই ভিকটিমের দুর্বলতা নিহিত। আপাত তুচ্ছ এই ঘটনা সমাজের কাছে ভিন্ন বার্তা হাজির করে। অনেক আগাম বিপদেরও সংকেত দেয়।

একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে-এখন যার সামর্থ্য আছে, বিদেশই হচ্ছে তার নিশ্চিত গন্তব্য। এর মধ্যে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, আমলা, রাজনীতিবিদ-সবাই আছে। সবার লক্ষ্য যদিও এক নয়। কারো উদ্দেশ্য অবৈধ সম্পদের সুরক্ষা বা শাস্তি থেকে বাঁচা। অবশ্যই আরও একটি অংশ আছে; যাদের টার্গেট আলাদা। এরা এখন মোটামুটি সচ্ছল। দেশে সমৃদ্ধির লভ্যাংশ ভোগ করছে। কিন্তু নিরাপদ ভবিষ্যতের গ্যারান্টি নেই। এরা যে কালো টাকার মালিক, তা কিন্তু নয়। যে সব কারণে ছেলেমেয়েরা দেশ ছাড়তে চায়, তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো মজবুত সমাজ ও মুক্ত জীবনের হাতছানি। মনোজগতে আকাঙ্ক্ষার গড়নই হয়তো বদলে যাচ্ছে। দেশে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার নয়। ইউরোপ-আমেরিকায় যে কোন চাকরি। বিদেশমুখী এই স্রোতের নতুন ট্রেন্ড মফস্বলের সম্পন্ন কৃষক, শিক্ষক এমনকি ব্যবসায়ী অভিভাবক। বিশেষকরে মেধাবী নারী শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতার এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই। দেশে এখন ভালো ছেলেমেয়েদের কাজ করার অনেক সুযোগ। এদের পেছনে রাষ্ট্রের খরচও কম না। তারপরও কেন এরা বিদেশের পথে পা বাড়িয়ে? সমাজেরও কি এখানে কিছু দায় থেকে গেল? কারণটি অবশ্যই ভাবিয়ে তুলছে।

সৎভাবে যারা জীবনযাপন করতে চায় বিশেষকরে আইন মেনে চলতে চায়-তারা কি ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক ও প্রান্তিক হয়ে পড়ছে? আলোচনা করা যাক। শিল্পপতি, উকিল, ডাক্তার, ব্যবসায়ী-বিত্তশালী শ্রেণীর বড় অংশই ন্যায্য কর জালের বাইরে। সামর্থ্যবান বিরাট জনগোষ্ঠী আদৌ কর দেয় না। যারা দেন তারা নিরন্তর চেষ্টা করেন কীভাবে করের বোঝা কৌশলে হালকা করা যায়। আর ঘুষখোর আমলা, ব্যবসায়ী ডাক্তার, কোচিংবাজ শিক্ষক কিংবা নীতিহীন রাজনীতিক-এরা তো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কেবলমাত্র চাকরিজীবী বাধ্য হয়ে কর দেন। সাধারন মানুষ পণ্যের উপভোক্তা হিসেবে শুল্ক দেন। বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন-ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত কাক্সিক্ষত মাত্রায় নেই; যা অর্থনীতির টেকসই বিকাশের পথে অন্তরায়। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, যে মানুষটি স্বেচ্ছায় কর দিতে চান, তার জন্য পথটি কি সুগম?কার্যত তা নয়। অনেক হয়রানি কখনো তাকে হতাশ করে। একজন প্রাইভেট কারের মালিক যিনি আইন মানেন, তাকে ট্যাক্স-নবায়ন-ফিটনেস-বীমা বাবদ বড় অঙ্ক পরিশোধ করতে হয়। যিনি ম্যানেজ করে চলেন তার জন্য ঝুট-ঝামেলা নেই। দেখেছি-কর পরিশোধের সরকারি সনদ দেয়ার পরও ব্যাংকে টাকা জমা হয়নি। জরিমানা গুনতে হয়েছে আইন মেনে চলা মালিককে। মনে আছে-৯০ দশকের শুরু। খুলনায় স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগনাল সিস্টেম কার্যকর হয়েছে। রয়্যাল ইনটারসেকশনে লালবাতি দেখে দাঁড়িয়ে যেতেই বিপত্তি। অনেকেই বিনা হেলমেটে সিগনাল অমান্য করে বীরদর্পে চলে যাচ্ছে। কিন্তু পুলিশ আমাকে ছেঁকে ধরেছে। তাদের অনুমান প্রথাগত ছকে বাঁধা। ভেবেছে আমি গ্রাম থেকে এসেছি, না হয় গোবেচারা ভদ্রলোক। অনুমান করি আমার আপডেট ট্রাভেল ডকুমেন্টস সেদিন পুলিশকেই বিলক্ষণ হতাশ করেছিল।

একজন শিক্ষকের কথা জানি। প্রকৃত অর্থে ধার্মিক। সহজ, সরল, অন্তর্মুখী স্বভাবের। দলবদ্ধ হয়ে মানুষকে মসজিদে যেতে বলতেন। প্রচন্ড ঠান্ডা কিংবা ঘন বর্ষা তাকে এমন কমিটমেন্ট থেকে কখনো বিরত করেছে-মনে করতে পারি না। সহকারি অধ্যাপক হতে ঘুষ দেবেন না বলে প্রভাষক থেকে গিয়েছিলেন। ডিজি অফিসের দাবি মিটিয়ে পরবর্তী ব্যক্তি যথারীতি পদোন্নতি পেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলতেন-আমার দেশের গরিব মানুষ দুর্নীতি করে না। তারাই এই অপকর্ম করে; যারা গরিবের টাকায় লেখাপড়া করেছে। কিন্তু টাকা দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়াটা যেন এখন এ সমাজে অনেকটা গা সওয়া। ভুল-ত্রুটি বা দুর্বলতাকে টাকা দিয়ে ছাপিয়ে যাওয়া যেন সমাজ অনুমোদনই করেছে। ওয়ান ইলেভেনের পর অনেক শিক্ষককে স্কেল পরিবর্তনের জন্য ডিজি অফিসে যেতে দেখিনি। কারণ সে সময় ঘুষ চলেনি। তারাই অপেক্ষা করেছে রাজনৈতিক সরকারের জন্য। বিশ্বাস ছিল-ওই সময়ে কাজ করতে অসুবিধা হবে না। এরা প্রকৃত পক্ষে ছাপোষা মানুষ। কিন্তু মনের দীনতা তো হাজার কোটি পাচারকারীর মতোই করুণ।

সমাজ কিংবা শিক্ষাঙ্গন-সর্বত্রই আজ এমন মানুষের অভাব; যাকে অনুসরণ করা যায়। সত্যি কথা বলতে কি-তারুণ্যের জন্য আজ কোন আইকন নেই। ভালো শিক্ষক, ভালো মানুষ পাওয়াও দুষ্কর। আসলে চাহিদা বা স্বীকৃতি না থাকলে গুণী মানুষের সৃষ্টিও হয় না। যে শিক্ষক নীতিনিষ্ঠ, দায়িত্বশীল, লেখাপড়া করেন, ক্লাস নেন, ভীষণ মনোযোগী-তার বাজার আজ ভালো না। সমাজ তাকে প্রাপ্য সম্মান দেয় না। পরীক্ষার হলে তাকে কাজে লাগানো যায় না। হলে হলে বোঝাপড়ার সংস্কৃতি তিনি বোঝেন না। মানতেও পারেন না। ব্যবহারিক নম্বর আদায় করতেও তিনি সিদ্ধহস্ত নন। তিনি লেখাপড়া করতে বলেন। দক্ষতা-জ্ঞানের কথা বলেন। তার পাশে ভিড় নেই। দেখেছি এরা উপেক্ষিত। কোচিংবাজদের রমরমা বাজার। শিক্ষকের জনপ্রিয়তার মাপকাঠি আজ আর জ্ঞান কিংবা নৈতিকতা নয়। বৈষয়িক সমৃদ্ধির শর্টকাট সিঁড়ির সন্ধান যার জানা, তিনিই জনপ্রিয়। তিনিই গ্রাহ্য। এটাই সমাজের জন্য বিপদ সংকেত।

রাষ্ট্র ও সমাজের মনস্তত্ত্ব আলাদা। সুস্থ জীবন যাপনের জন্য রাষ্ট্র আইন তৈরি করে। সবার জন্য সে আইন সমানভাবে প্রযোজ্য। আইনই সমাজবদ্ধ মানুষের আচরণে শৃঙ্খলা আনে। সরকার তা প্রয়োগ করে। বিধিবদ্ধ উপায়ে। রাজনৈতিক সরকারেরর ঝুঁকি অনেক। কারণ ভোটে তাকে উতরে যেতে হলে জনপ্রিয়তা ধরে রাখা চাই। তুষ্টিকরণ ও জনপ্রিয়তার ভেদরেখা টিকে থাকে মূল্যবোধের ওপর; যা সামাজিক রীতিনীতির মাপকাঠি। এই নৈতিক ভিত দুর্বল হলে সমাজ নড়বড়ে হয়ে যায়। রাজনীতিতে আপস আজ বহুল আলোচিত। কারণ যারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সুবিধাভোগী, তারা যে সবসময় রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের পক্ষেই থেকে যাবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে, ন্যায়-অন্যায় নানা কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তারা একাট্টাই থাকে। যে প্রশাসক সৎ, নিরপেক্ষ ও কঠোর, তার পক্ষে জনপ্রিয় হওয়া কি সহজ?জয়ী না হলে তার সব কীর্তি ম্লান হয়ে যায়। হিটলার ভাবতেন মানুষের ভোলার ক্ষমতা বিপুল, গ্রহণের ক্ষমতা কম। গণস্মৃতি সবসময়ই দুর্বল। নীতির কারণে লক্ষ্যভেদে অসফল হলে তিনি হয়ে যান ‘ট্যাক্টলেস’ বা অযোগ্য। জনপ্রতিনিধি ভাবেন-ন্যায়ের পথে গেলে নির্ঘাত তার ভোট হারানোর ঝুঁকি। কিন্তু অন্যায়ের বিপক্ষে সবাই একাট্টা নয়। বরং সুযোগ সন্ধানী মন ঘোলা জলে মাছ শিকারেই উদগ্রীব। অন্যায়ের শক্তি সঞ্চয়ের উৎস কত বিচিত্র!

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক নিষ্ক্রিয়তার বেশ কিছু ছবি নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছে। একদিকে সৎ মানুষেরা দ্রুতগতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। সভ্যতা,ভদ্রতা কিংবা সততা এখন দুর্বলতার পতাকা। বিত্ত, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা সমাজকে ভুল সংকেত দিচ্ছে। পণ্য সংস্কৃতির চাপে পর্যুদস্ত সরল জীবন। সমাজ বুনন বিপর্যস্ত। যৌথ পরিবার ভাঙছে, গড়ে উঠছে ছোট ছোট পরিবার। বাড়ছে আত্মকেন্দ্রিকতা,অসুস্থ প্রতিযোগিতা। চলছে অলীক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। প্রাচুর্য,জেদ অথবা বিচ্ছিন্নতার বোধ সামাজিক দুরত্ব তৈরি করছে। হারিয়ে যাচ্ছে সমাজ গঠনের আদি দর্শন। ঐক্য, সহমর্মিতা ও প্রতিরোধের সংকল্প। প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটছে একের পর এক অপরাধ। এমনকি লোমহর্ষক সহিংসতা। উপস্থিত জনতা নীরব দর্শক, নির্বিকার, প্রতিবাদহীন। শুধু এপার বাঙলায় নয়, ওপার বাঙলার অবস্থাও এক। সমাজ বিজ্ঞানী অভিজিত মিত্রের মতে-দুর্বৃত্তরা বুঝে নিয়েছে এ সমাজ ভীত। তাই খেলনা পিস্তলেই কাজ হবে। বিপদটা এখানেই। মাত্র একজন দুর্বৃত্তের ছুরির আঘাতে রক্তাক্ত হয় তরুণী, প্রকাশ্যে জনাকীর্ণ রাজপথে, অপরাধী হেঁটে যায় হেলেদুলে, মিশে যায় জনারণ্যে।

মানুষের স্বভাবে অপরাধ প্রবণতা আছে। বিজ্ঞান বলে-পরিবেশই শিশু-কিশোরকে অপরাধ প্রক্রিয়ায় জারিত করে। অপরাধমনষ্কতা এমনকি সুবিধাবাদিতাও জৈবিক নয়। সমাজের চিরন্তন স্বভাবই হলো চারপাশের সঙ্গে সমঝোতা করে নেয়া। এই বন্দোবস্তও এক অর্থে আপস বা সুবিধাবাদিতা। একই রকম সংস্কৃতি বা শৃঙ্খলার ছকে গড়ে উঠে যে জনসমষ্টি সমাজ তৈরি করে, সে সমাজই বিপন্ন হয় সুস্থ রাজনীতির অভাবে। নীরবে-নিভৃতে চলতে থাকে শুদ্ধ জীবনাচার নষ্ট করার প্রক্রিয়া। সুস্থ সমাজ নির্মাণে মনোযোগ কম দিলে তার জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়। সমাজে প্রতিরোধের শক্তি কেন আজ ক্ষীয়মান?যন্ত্র সভ্যতায় মানুষ কি সত্যিই আত্মমগ্ন? ভাবতেই হবে। ঐতিহাসিক বিবর্তনের পথে কোন এক ক্রান্তিকালে আমরা হয়তো দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সুশীল সমাজ বা সাধারন মানুষ-সবার ভাবনায় এই উদ্বেগের বিষয়টিকে জায়গা দিতে হবে। একটি সংবেদী, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার বহুশ্রুত সংকল্পে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ]

বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে করণীয়

জীবন ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে পদ্মা সেতু

বাজেট বরাদ্দ এবং আদিবাসী

লাভ-ক্ষতির হিসাব

পাখি রক্ষায় চাই বাস্তবসম্মত উদ্যোগ

ছবি

একজন বিজ্ঞানপ্রেমীর অকাল প্রয়াণ

বন্যাকালীন রোগ-বালাই রোধে করণীয়

অর্থ পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়

মাদকাসক্তি ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি

ছবি

‘ভয় নেই, আমি এসে গেছি’

পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক দূষণে আরএসএসের ভূমিকা

একতা, ন্যায় ও শক্তির প্রেরণা

ছবি

পদ্মা সেতু : স্বপ্ন এখন বাস্তব

পদ্মা সেতু : বাঙালির আত্মবিশ্বাস ও গৌরবের প্রতীক

মাঙ্কিপক্স ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

ছবি

রোহিঙ্গাদের বাড়ি ফেরার আকুতি

চেরাপুঞ্জির বৃষ্টি

কুসিক নির্বাচনে ইসি কি পাস করেছে

বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকান্ড : আইনি শূন্যতা ও আইনের শাসন

পাহাড়-টিলা ধস সামাল দিতে আমরা কি প্রস্তুত

ছবি

জয় হোক মানবতার

বন্যা : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ

পার্বত্যাঞ্চল ও সমতলের ভূমি ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশের এনজিও ব্যবস্থাপনার মূল সমস্যা কী

ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল প্রকাশ মাধ্যম মোস্তাফা জব্বার

বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে

ছবি

শরণার্থীদের নিরাপত্তার অধিকার

পদ্মা সেতু : বিএনপির দায় ও সরকারের দায়িত্ব

প্রস্তাবিত বাজেট ব্যাংক খাতে কী প্রভাব রাখবে

ছবি

পদ্মা সেতু : দেশের ‘আইকনিক স্থাপনা’

ডিজিটাল কারেন্সির ব্যবহার ও সম্ভাবনা

নবীকে নিয়ে বিজেপি নেতার কটূক্তি

অগ্নিকান্ডে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি ও করণীয়

ছিন্নমূল মানুষ ও বাংলার কথা

খুনিদের বাঁচাতে আইন হয় কিন্তু আইনজীবীদের সুরক্ষায় আইন নেই

বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি

tab

উপ-সম্পাদকীয়

সমাজের নির্লিপ্ততা এবং ন্যায়ের দাবি

অমিত রায় চৌধুরী

বুধবার, ২৫ মে ২০২২

খবরটা শুনে চমকে উঠেছিলাম। কলেজপড়ুয়া একটি মেয়ে ঢাকায় তার আত্মীয়ের বাড়িতে উঠেছে। বখাটের উপদ্রব এড়াতে এটাই তার কৌশল। এ জাতীয় ঘটনার সামাজিক ছক মানুষের খুবই চেনা। তবু কেন এ বিষয়টি ভাবনার খোরাক হলো সে আলোচনাটাই জরুরি। প্রণয়ঘটিত কিংবা দুর্বলের ওপর শক্তির দাপট অথবা সংখ্যালঘুর অসহায়ত্ব-কোন হেতুই এখানে প্রযোজ্য নয়। সে কারণেই চিন্তার নতুন দিগন্ত। নতুন গন্তব্য। যুক্তির জগৎ নানা প্রশ্নে আলোড়িত। শিক্ষার্থীর বাবা নিপাট ভদ্রলোক। পারিবারিক ঐতিহ্য এমন খ্যাতিই বয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে। সচ্ছল, প্রতিষ্ঠিত, সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার। প্রচলিত সামাজিক শক্তির যে নিয়ামক-যেমন জনবল বা অর্থবল-তা সবই তাদের আছে। অভিভাবক থানায় জিডি করেছেন। দুর্বৃত্ত গ্যারেজ শ্রমিক। নেশায় আসক্তি থাকতে পারে। তবুও সাহসটা লাগামছাড়া মনে হয়। মেয়ে সুশ্রী, মেধাবী-এটাই কি ঘটনার একমাত্র অনুঘটক? মগজ তাতে সায় দেয় না। পরিবারটি আসলে নিরীহ, ভদ্র। এখানেই ভিকটিমের দুর্বলতা নিহিত। আপাত তুচ্ছ এই ঘটনা সমাজের কাছে ভিন্ন বার্তা হাজির করে। অনেক আগাম বিপদেরও সংকেত দেয়।

একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে-এখন যার সামর্থ্য আছে, বিদেশই হচ্ছে তার নিশ্চিত গন্তব্য। এর মধ্যে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, আমলা, রাজনীতিবিদ-সবাই আছে। সবার লক্ষ্য যদিও এক নয়। কারো উদ্দেশ্য অবৈধ সম্পদের সুরক্ষা বা শাস্তি থেকে বাঁচা। অবশ্যই আরও একটি অংশ আছে; যাদের টার্গেট আলাদা। এরা এখন মোটামুটি সচ্ছল। দেশে সমৃদ্ধির লভ্যাংশ ভোগ করছে। কিন্তু নিরাপদ ভবিষ্যতের গ্যারান্টি নেই। এরা যে কালো টাকার মালিক, তা কিন্তু নয়। যে সব কারণে ছেলেমেয়েরা দেশ ছাড়তে চায়, তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো মজবুত সমাজ ও মুক্ত জীবনের হাতছানি। মনোজগতে আকাঙ্ক্ষার গড়নই হয়তো বদলে যাচ্ছে। দেশে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার নয়। ইউরোপ-আমেরিকায় যে কোন চাকরি। বিদেশমুখী এই স্রোতের নতুন ট্রেন্ড মফস্বলের সম্পন্ন কৃষক, শিক্ষক এমনকি ব্যবসায়ী অভিভাবক। বিশেষকরে মেধাবী নারী শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতার এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই। দেশে এখন ভালো ছেলেমেয়েদের কাজ করার অনেক সুযোগ। এদের পেছনে রাষ্ট্রের খরচও কম না। তারপরও কেন এরা বিদেশের পথে পা বাড়িয়ে? সমাজেরও কি এখানে কিছু দায় থেকে গেল? কারণটি অবশ্যই ভাবিয়ে তুলছে।

সৎভাবে যারা জীবনযাপন করতে চায় বিশেষকরে আইন মেনে চলতে চায়-তারা কি ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক ও প্রান্তিক হয়ে পড়ছে? আলোচনা করা যাক। শিল্পপতি, উকিল, ডাক্তার, ব্যবসায়ী-বিত্তশালী শ্রেণীর বড় অংশই ন্যায্য কর জালের বাইরে। সামর্থ্যবান বিরাট জনগোষ্ঠী আদৌ কর দেয় না। যারা দেন তারা নিরন্তর চেষ্টা করেন কীভাবে করের বোঝা কৌশলে হালকা করা যায়। আর ঘুষখোর আমলা, ব্যবসায়ী ডাক্তার, কোচিংবাজ শিক্ষক কিংবা নীতিহীন রাজনীতিক-এরা তো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কেবলমাত্র চাকরিজীবী বাধ্য হয়ে কর দেন। সাধারন মানুষ পণ্যের উপভোক্তা হিসেবে শুল্ক দেন। বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন-ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত কাক্সিক্ষত মাত্রায় নেই; যা অর্থনীতির টেকসই বিকাশের পথে অন্তরায়। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, যে মানুষটি স্বেচ্ছায় কর দিতে চান, তার জন্য পথটি কি সুগম?কার্যত তা নয়। অনেক হয়রানি কখনো তাকে হতাশ করে। একজন প্রাইভেট কারের মালিক যিনি আইন মানেন, তাকে ট্যাক্স-নবায়ন-ফিটনেস-বীমা বাবদ বড় অঙ্ক পরিশোধ করতে হয়। যিনি ম্যানেজ করে চলেন তার জন্য ঝুট-ঝামেলা নেই। দেখেছি-কর পরিশোধের সরকারি সনদ দেয়ার পরও ব্যাংকে টাকা জমা হয়নি। জরিমানা গুনতে হয়েছে আইন মেনে চলা মালিককে। মনে আছে-৯০ দশকের শুরু। খুলনায় স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগনাল সিস্টেম কার্যকর হয়েছে। রয়্যাল ইনটারসেকশনে লালবাতি দেখে দাঁড়িয়ে যেতেই বিপত্তি। অনেকেই বিনা হেলমেটে সিগনাল অমান্য করে বীরদর্পে চলে যাচ্ছে। কিন্তু পুলিশ আমাকে ছেঁকে ধরেছে। তাদের অনুমান প্রথাগত ছকে বাঁধা। ভেবেছে আমি গ্রাম থেকে এসেছি, না হয় গোবেচারা ভদ্রলোক। অনুমান করি আমার আপডেট ট্রাভেল ডকুমেন্টস সেদিন পুলিশকেই বিলক্ষণ হতাশ করেছিল।

একজন শিক্ষকের কথা জানি। প্রকৃত অর্থে ধার্মিক। সহজ, সরল, অন্তর্মুখী স্বভাবের। দলবদ্ধ হয়ে মানুষকে মসজিদে যেতে বলতেন। প্রচন্ড ঠান্ডা কিংবা ঘন বর্ষা তাকে এমন কমিটমেন্ট থেকে কখনো বিরত করেছে-মনে করতে পারি না। সহকারি অধ্যাপক হতে ঘুষ দেবেন না বলে প্রভাষক থেকে গিয়েছিলেন। ডিজি অফিসের দাবি মিটিয়ে পরবর্তী ব্যক্তি যথারীতি পদোন্নতি পেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলতেন-আমার দেশের গরিব মানুষ দুর্নীতি করে না। তারাই এই অপকর্ম করে; যারা গরিবের টাকায় লেখাপড়া করেছে। কিন্তু টাকা দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়াটা যেন এখন এ সমাজে অনেকটা গা সওয়া। ভুল-ত্রুটি বা দুর্বলতাকে টাকা দিয়ে ছাপিয়ে যাওয়া যেন সমাজ অনুমোদনই করেছে। ওয়ান ইলেভেনের পর অনেক শিক্ষককে স্কেল পরিবর্তনের জন্য ডিজি অফিসে যেতে দেখিনি। কারণ সে সময় ঘুষ চলেনি। তারাই অপেক্ষা করেছে রাজনৈতিক সরকারের জন্য। বিশ্বাস ছিল-ওই সময়ে কাজ করতে অসুবিধা হবে না। এরা প্রকৃত পক্ষে ছাপোষা মানুষ। কিন্তু মনের দীনতা তো হাজার কোটি পাচারকারীর মতোই করুণ।

সমাজ কিংবা শিক্ষাঙ্গন-সর্বত্রই আজ এমন মানুষের অভাব; যাকে অনুসরণ করা যায়। সত্যি কথা বলতে কি-তারুণ্যের জন্য আজ কোন আইকন নেই। ভালো শিক্ষক, ভালো মানুষ পাওয়াও দুষ্কর। আসলে চাহিদা বা স্বীকৃতি না থাকলে গুণী মানুষের সৃষ্টিও হয় না। যে শিক্ষক নীতিনিষ্ঠ, দায়িত্বশীল, লেখাপড়া করেন, ক্লাস নেন, ভীষণ মনোযোগী-তার বাজার আজ ভালো না। সমাজ তাকে প্রাপ্য সম্মান দেয় না। পরীক্ষার হলে তাকে কাজে লাগানো যায় না। হলে হলে বোঝাপড়ার সংস্কৃতি তিনি বোঝেন না। মানতেও পারেন না। ব্যবহারিক নম্বর আদায় করতেও তিনি সিদ্ধহস্ত নন। তিনি লেখাপড়া করতে বলেন। দক্ষতা-জ্ঞানের কথা বলেন। তার পাশে ভিড় নেই। দেখেছি এরা উপেক্ষিত। কোচিংবাজদের রমরমা বাজার। শিক্ষকের জনপ্রিয়তার মাপকাঠি আজ আর জ্ঞান কিংবা নৈতিকতা নয়। বৈষয়িক সমৃদ্ধির শর্টকাট সিঁড়ির সন্ধান যার জানা, তিনিই জনপ্রিয়। তিনিই গ্রাহ্য। এটাই সমাজের জন্য বিপদ সংকেত।

রাষ্ট্র ও সমাজের মনস্তত্ত্ব আলাদা। সুস্থ জীবন যাপনের জন্য রাষ্ট্র আইন তৈরি করে। সবার জন্য সে আইন সমানভাবে প্রযোজ্য। আইনই সমাজবদ্ধ মানুষের আচরণে শৃঙ্খলা আনে। সরকার তা প্রয়োগ করে। বিধিবদ্ধ উপায়ে। রাজনৈতিক সরকারেরর ঝুঁকি অনেক। কারণ ভোটে তাকে উতরে যেতে হলে জনপ্রিয়তা ধরে রাখা চাই। তুষ্টিকরণ ও জনপ্রিয়তার ভেদরেখা টিকে থাকে মূল্যবোধের ওপর; যা সামাজিক রীতিনীতির মাপকাঠি। এই নৈতিক ভিত দুর্বল হলে সমাজ নড়বড়ে হয়ে যায়। রাজনীতিতে আপস আজ বহুল আলোচিত। কারণ যারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সুবিধাভোগী, তারা যে সবসময় রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের পক্ষেই থেকে যাবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে, ন্যায়-অন্যায় নানা কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তারা একাট্টাই থাকে। যে প্রশাসক সৎ, নিরপেক্ষ ও কঠোর, তার পক্ষে জনপ্রিয় হওয়া কি সহজ?জয়ী না হলে তার সব কীর্তি ম্লান হয়ে যায়। হিটলার ভাবতেন মানুষের ভোলার ক্ষমতা বিপুল, গ্রহণের ক্ষমতা কম। গণস্মৃতি সবসময়ই দুর্বল। নীতির কারণে লক্ষ্যভেদে অসফল হলে তিনি হয়ে যান ‘ট্যাক্টলেস’ বা অযোগ্য। জনপ্রতিনিধি ভাবেন-ন্যায়ের পথে গেলে নির্ঘাত তার ভোট হারানোর ঝুঁকি। কিন্তু অন্যায়ের বিপক্ষে সবাই একাট্টা নয়। বরং সুযোগ সন্ধানী মন ঘোলা জলে মাছ শিকারেই উদগ্রীব। অন্যায়ের শক্তি সঞ্চয়ের উৎস কত বিচিত্র!

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক নিষ্ক্রিয়তার বেশ কিছু ছবি নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছে। একদিকে সৎ মানুষেরা দ্রুতগতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। সভ্যতা,ভদ্রতা কিংবা সততা এখন দুর্বলতার পতাকা। বিত্ত, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা সমাজকে ভুল সংকেত দিচ্ছে। পণ্য সংস্কৃতির চাপে পর্যুদস্ত সরল জীবন। সমাজ বুনন বিপর্যস্ত। যৌথ পরিবার ভাঙছে, গড়ে উঠছে ছোট ছোট পরিবার। বাড়ছে আত্মকেন্দ্রিকতা,অসুস্থ প্রতিযোগিতা। চলছে অলীক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। প্রাচুর্য,জেদ অথবা বিচ্ছিন্নতার বোধ সামাজিক দুরত্ব তৈরি করছে। হারিয়ে যাচ্ছে সমাজ গঠনের আদি দর্শন। ঐক্য, সহমর্মিতা ও প্রতিরোধের সংকল্প। প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটছে একের পর এক অপরাধ। এমনকি লোমহর্ষক সহিংসতা। উপস্থিত জনতা নীরব দর্শক, নির্বিকার, প্রতিবাদহীন। শুধু এপার বাঙলায় নয়, ওপার বাঙলার অবস্থাও এক। সমাজ বিজ্ঞানী অভিজিত মিত্রের মতে-দুর্বৃত্তরা বুঝে নিয়েছে এ সমাজ ভীত। তাই খেলনা পিস্তলেই কাজ হবে। বিপদটা এখানেই। মাত্র একজন দুর্বৃত্তের ছুরির আঘাতে রক্তাক্ত হয় তরুণী, প্রকাশ্যে জনাকীর্ণ রাজপথে, অপরাধী হেঁটে যায় হেলেদুলে, মিশে যায় জনারণ্যে।

মানুষের স্বভাবে অপরাধ প্রবণতা আছে। বিজ্ঞান বলে-পরিবেশই শিশু-কিশোরকে অপরাধ প্রক্রিয়ায় জারিত করে। অপরাধমনষ্কতা এমনকি সুবিধাবাদিতাও জৈবিক নয়। সমাজের চিরন্তন স্বভাবই হলো চারপাশের সঙ্গে সমঝোতা করে নেয়া। এই বন্দোবস্তও এক অর্থে আপস বা সুবিধাবাদিতা। একই রকম সংস্কৃতি বা শৃঙ্খলার ছকে গড়ে উঠে যে জনসমষ্টি সমাজ তৈরি করে, সে সমাজই বিপন্ন হয় সুস্থ রাজনীতির অভাবে। নীরবে-নিভৃতে চলতে থাকে শুদ্ধ জীবনাচার নষ্ট করার প্রক্রিয়া। সুস্থ সমাজ নির্মাণে মনোযোগ কম দিলে তার জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়। সমাজে প্রতিরোধের শক্তি কেন আজ ক্ষীয়মান?যন্ত্র সভ্যতায় মানুষ কি সত্যিই আত্মমগ্ন? ভাবতেই হবে। ঐতিহাসিক বিবর্তনের পথে কোন এক ক্রান্তিকালে আমরা হয়তো দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সুশীল সমাজ বা সাধারন মানুষ-সবার ভাবনায় এই উদ্বেগের বিষয়টিকে জায়গা দিতে হবে। একটি সংবেদী, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার বহুশ্রুত সংকল্পে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ]

back to top