alt

উপ-সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ফেরাতে হবে

শেখর ভট্টাচার্য

: বৃহস্পতিবার, ২৮ জুলাই ২০২২

বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির মধ্যে মনুষ্যত্ব বোধের প্রভাব এতই বেশি ছিলো যে, সেখানে বিভাজন বিদ্বেষের কোন স্থান ছিলো না। এই চিরায়ত সংস্কৃতিকে ধারণ ও লালন করার জন্য আমরা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন করেছিলাম। এ ভাষা আন্দোলনকে বাঙালি জাতিসত্তার নবজাগরণ বললে অত্যুক্তি করা হবে না। বাঙালির ভাষা আন্দোলন যতোটা না ছিলো ভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলন তার থেকে বেশি ছিলো চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতিকে রক্ষা ও বিকাশের আন্দোলন। সেই আন্দোলনে বাঙালি জয়ী হয়েছিলো- মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি আদায়ের মাধ্যমে। ভাষা আন্দোলনের বিজয়ের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, বৈষম্যহীন বাংলাদেশের বীজ যে রোপিত হয়েছিলো, এ বিষয়ে পরবর্তীতে আমরা সবাই অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছি।

ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের প্রভাব ছিলো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে। নবজাগরণে যুক্ত হয়েছিলেন প্রধানত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, অক্ষয় কুমার দত্ত, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাইকেল মুধুসুদন, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ শিক্ষিত মধ্য ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মানুষেরা। যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ, উপযোগবাদের মতো পাশ্চাত্য নবজাগরণের উপাদান গুলো যুক্ত হয়েছিলো আমাদের ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণে। নবজাগরণের উদ্যোগ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ছিলো সাহসী। তবে এর প্রভাব সারা বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ঢেউ তুলতে সক্ষম হয়নি। ভাষা আন্দোলনের দাবিটি উঠে এসেছিলো মাটির গভীর থেকে। শেকড় থেকে উঠে আসা দাবির সঙ্গে তাই খুব স্বাভাবিকভাবে প্রান্তিক বাঙালি থেকে শুরু করে শিক্ষিত, উচ্চশিক্ষিত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত বাঙালির মানসিক যোগ হয়েছিলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে। মধ্য যুগে চন্ডীদাস মানবতার বাণীকে যেভাবে উচ্চারিত করেছিলেন সেই উচ্চারণে বিশ্বমানবতার কথা সুস্পষ্টভাবে ধ্বণিত হয়েছিলো, এর ধারাবাহিকতায় কবি আবদুল হাকিম (১৬২০-১৬৯০) বঙ্গবাণী কবিতায় যখন ঘোষণা করলেন- ‘যেসব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী। সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি।’ তখন বিশ্বমানবতার সঙ্গে জাতীয়তাবোধও উজ্জীবিত হয়ে উঠলো সারা বাংলায়।

পরবর্তীতে আমাদের লোক-সংস্কৃতিও মানবতার বাণীকে ধারণ করে নিয়ে এসেছিলো অত্যন্ত স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে। লোক-সংস্কৃতি মানুষের জন্য মানবতার ধর্ম ছাড়া আর যে কোন বিকল্প নেই, লোক আঙ্গিকের মাধ্যমে শ্রোতার সামনে তুলে ধরেছে। ফকির লাল শাহ সহজ সরলভাবে জাত, ধর্ম, বর্ণের সংকীর্ণ গন্ডি থেকে মানবতার ডাক, মানবতার মর্মবাণী যে বাঙালির অনুসরণীয় সেই বিষয়টিকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন বাংলার মাঠ-ঘাটে। বাঙালি লোকসমাজ শেকড়ের সংস্কৃতির বাণীতে মুগ্ধ হয়ে ওঠেন। লালনের গানে যখন ধ্বণিত হয়- ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে/লালন কয় জাতের কী রূপ/আমি দেখলাম না দুই নজরে/সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে/কেউ মালা’য় কেউ তছবি গলায়/তাইতে যে জাত ভিন্ন বলায়/ যাওয়া কিম্বা আসার বেলায়/জাতের চিহ্ন রয় কার রে... ।’ লালন অত্যন্ত সহজভাবে বিভেদ বৈষম্যের কুয়াশাকে ভেদ করে মানবতার বাণীকে সামনে নিয়ে আসলেন। লোক কবিতার মাধ্যমে চন্ডী দাস যে বাণীকে তুলে ধরছিলেন লালন তাকে সঙ্গীতের আঙ্গিকে আরও সরল এবং সুরেলা ব্যাখ্যা করে সবার সামনে উপস্থাপন করলেন। আধুনিক যুগে নজরুল সমস্ত কৃত্রিম ভেদাভেদকে ছিন্ন করে মানবতার সূর্যকে অবগুন্ঠন মুক্ত করে বললেন- ‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নাহি কিছু মহীয়ান।’ এরকম অজগ্র সংগীত, কবিতা, নাটক ও উপন্যাসের মাধ্যমে।

লালান, হাসন, রাধারমণ থেকে শুরু করে শাহ আবদুল করিম পর্যন্ত এই ধারাকে বহন করেছেন। সাহিত্য সংস্কৃতিতে বাঙালি জাতিসত্তার চিরায়ত মানবতা,সর্বজনীনতার বাণী অর্থাৎ চন্ডীদাসের ‘শুন হে মানুষ ভাই সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ এই অমীয় মানব ধর্মকে আরও বেগবান, করে তুলেছেন নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, সুকান্ত থেকে শুরু করে আধুনিক বাঙলা কবিতার প্রধান কবি শামসুর রাহমান পর্যন্ত।

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন থেকে জেগে ওঠা অসাম্প্রদায়িক, মানবতার ধারাকে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের প্রতিটি ধাপ অন্তর দিয়ে ধারন করেছে। মুক্তির আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে বাঙালি জাতি সত্তার পুনর্জাগরণের কথা খুঁজে পাই। ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, বৈষম্যহীনতা ছিলো বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের অন্তরে প্রবাহিত মূল সুর। ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনে, ৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলনে সব বৈষম্য হ্রাস করে মানবিক পূর্ববাংলা গড়ার আহব্বান আসে। এরপর ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে সংকীর্ণ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বাক্সে পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পেরেক মারতে সমর্থ হন। এরই ধারাবাহিকতায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের সংবিধানে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে লেখা হয় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের চারটি মূল মন্ত্র, যেগুলো হলো- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষতা। এই চারটি মূলনীতির মাধ্যমে বিজ্ঞানভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক বাংলাদেশ গড়ার সুস্পষ্ঠ প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়। মনে রাখতে হবে এ নীতিগুলোর সঙ্গে শহীদের রক্তের যোগ আছে। তেইশ বছর যে সমস্ত মানুষ নানা রকমের ত্যাগ স্বীকার করেছেন সে সমস্ত মানুষের জীবনের সমস্ত ত্যাগ-তিতিক্ষা, এই চার নীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত আছে।

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরা ভেবেছিলেন, আমরা বোধ হয় শহীদের রক্তে আঁকা পথ ধরে এগোবো। কিন্তু এত দ্রুত বাঙালির ‘দাম দিয়ে কেনা বাংলার’ আদর্শের স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে তা কেউ ভাবতে পারেননি।

পঁচাত্তরে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার উলটো পথে হাঁটতে শুরু করে। পঁচাত্তর থেকে ছিয়ানব্বই পর্যন্ত সারা দেশে যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ রোপিত হয় সে বীজ আমাদের সকলের সামনে মহীরুহতে পরিণত হয়ে উঠছে। বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। জাতীয়তাবাদকে ধর্মাশ্রয়ী জাতীয়তাবাদে পরিণত করা হয়। মোট কথা, ত্রিশ লাখ বাঙালি যে কারণে জীবন উৎসর্গ করেছিলো, যে কারণে তেইশ বছর বাঙালির মুক্তি আন্দোলন হয়েছিলো তার সমস্ত আদর্শ নির্বাসিত হয় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে।

এরপর সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ ক্রমান্বয়ে বেড়ে ওঠে বাংলাদেশে। ভোটের রাজনীতির হিসাব নিকাশে মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার সবাই বিস্মৃত হন। সমগ্র রাজনীতিতে এক ভয়াল সাম্প্রদায়িকতার আবহ তৈরি হয়। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামীলীগ যে দল মুক্তিযুদ্ধকে নেতৃত্ব দিয়েছিলো, সে দলের ভেতরেও কিছু কিছু স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করতে শুরু করে গোপনে এবং প্রকাশ্যে। প্রশাসনের মধ্যেও কিছু মানুষ রঙ-বদল করে কৌশলে সাম্প্রদায়িকতাকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকে। রাজনীতি, প্রশাসন, সামাজিক শক্তির একটি বিপুল অংশের মধ্যে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়।

পৃথিবীর সব দেশেই সংখ্যালঘুরা একটি দলকে আশ্রয় করে, সমর্থন দিয়ে নিজেদের অধিকার রক্ষায় তৎপর হন। ভারতের সংখ্যা লঘুরা একসময় নির্ভর করতেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে। এরকম পৃথিবীর প্রতিটি দেশে সংখ্যালঘুদের পছন্দের একটি দল আছে। সেই পছন্দের দলটি যখন সংখ্যালঘুদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় কিংবা সংখ্যালঘুর ভরসা হতে ভয় পায় রাজনীতির হিসাব-নিকাশ বিবেচনা করে, তখন সংখ্যালঘুদের মানসিক অবস্থা কী দাঁড়ায় তা শুধু সংখ্যালঘু মনোস্তত্ত্ব যারা বুঝেন তারাই অনুভব করতে পারেন। সংখ্যালঘুদের সাহস জোগানোর বিষয়টি যখন রাজনৈতিক মারপ্যাঁচের মধ্যে পড়ে যায়, তখন দেয়াল ছাড়া আর পিঠ ঠেকানোর কোন জায়গা থাকে না।

রামু থেকে শুরু করে সর্বশেষ নড়াইল পর্যন্ত নারকীয় ঘটনার বিচার কাজ সম্পন করতে পারেনি সরকার। কুমিল্লায় দুর্গামন্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননাকে কেন্দ্র করে তিন জেলায় মন্দির ও পূজামন্ডপে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার ৯ মাসের ও বেশি সময়ে মামলার তদন্ত শেষ করা যায়নি। তদন্ত কার্য সমাপ্ত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত একটির পর আরেকটি সাম্প্রদায়িক হামলা চলতে থাকবে। মনে রাখতে হবে- সাম্প্রদায়িক হামলা বা সহিংসতাকে এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে প্রচার করা যাবে না। সংখ্যা এবং ধারাবাহিকতা বিবেচনায় এখন সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা একটি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন যদি আস্থা হারায় বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের কাছ থেকে, তাহলে সংখ্যালঘুদের ক্ষতির থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ক্ষতি বেশি হবে। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ দুটোই পরাজিত হবে। এখনো সময় আছে বাংলাদেশকে বাংলাদেশের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। শুভ বুদ্ধিসম্পন মানুষেরা মনে করেন- নিরপেক্ষ বিচার, সামাজিক সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে জয়ী করে তোলা সম্ভব।

[লেখক : প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

যুবসমাজ : সমস্যা ও সম্ভাবনা

বিচারকের সঙ্গে পুলিশের অসদাচরণ এবং জাস্টিস অব দ্য পিস

ছবি

বাংলা সিনেমার সুদিন কি ফিরছে

সামাজিক সংঘের ভূমিকা

সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ

আলোর ভেতর যত কালো

বাড়াতে হবে খাদ্য উৎপাদন

সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা ও যুদ্ধবিরোধিতার গুরুত্ব

পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি : কৃষিপণ্যে প্রভাব

সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় ইসি কতটা সক্ষম

ছবি

সোশ্যাল মিডিয়া কি একাকিত্ব ও অহংবোধ বাড়িয়ে দিচ্ছে?

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

আদিবাসী বিতর্ক

অনগ্রসর আদিবাসী জাতি

সাক্ষরতা ও শিক্ষা

সম্প্রীতির বাঁধন কি আলগা হয়ে আসছে?

অর্থনৈতিক সংকট : মুক্তি কোন পথে

গাড়িতে চাই শিশু আসন

ডলার সংকটের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও উত্তরণের উপায়

ছবি

পরিবহন খাতে জ্বালানির ব্যবহার

বিশ্ব মন্দায় বাংলাদেশের শক্তি

দাগ তো চেহারার, আয়না মুছে কি হবে

টেকসই উন্নয়নে সাশ্রয়ী দৃষ্টিভঙ্গি

ছবি

ডলার সংকটের শেষ কোথায়?

পাবলিক পরীক্ষায় অপরাধ

মানব পাচারে প্রযুক্তির অপব্যবহার

ছবি

বাংলাদেশের কেন শ্রীলঙ্কা হওয়ার আশঙ্কা কম

শিক্ষকের মর্যাদা

ধেয়ে আসছে বৈশ্বিক ঋণসংকট, শ্রীলঙ্কাতেই শেষ নয়

সব ফিউজ বাল্বের মূল্য সমান

মাঙ্কিপক্সে আতঙ্ক নয়

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশের উপায় কী

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

ছবি

গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা কি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে

কাগজ সংকট সভ্যতারও সংকট

শিশুদের পঠনদক্ষতা বাড়াতে পারে ‘ডাকপড়া’

tab

উপ-সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ফেরাতে হবে

শেখর ভট্টাচার্য

বৃহস্পতিবার, ২৮ জুলাই ২০২২

বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির মধ্যে মনুষ্যত্ব বোধের প্রভাব এতই বেশি ছিলো যে, সেখানে বিভাজন বিদ্বেষের কোন স্থান ছিলো না। এই চিরায়ত সংস্কৃতিকে ধারণ ও লালন করার জন্য আমরা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন করেছিলাম। এ ভাষা আন্দোলনকে বাঙালি জাতিসত্তার নবজাগরণ বললে অত্যুক্তি করা হবে না। বাঙালির ভাষা আন্দোলন যতোটা না ছিলো ভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলন তার থেকে বেশি ছিলো চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতিকে রক্ষা ও বিকাশের আন্দোলন। সেই আন্দোলনে বাঙালি জয়ী হয়েছিলো- মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি আদায়ের মাধ্যমে। ভাষা আন্দোলনের বিজয়ের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, বৈষম্যহীন বাংলাদেশের বীজ যে রোপিত হয়েছিলো, এ বিষয়ে পরবর্তীতে আমরা সবাই অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছি।

ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের প্রভাব ছিলো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে। নবজাগরণে যুক্ত হয়েছিলেন প্রধানত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, অক্ষয় কুমার দত্ত, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাইকেল মুধুসুদন, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ শিক্ষিত মধ্য ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মানুষেরা। যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ, উপযোগবাদের মতো পাশ্চাত্য নবজাগরণের উপাদান গুলো যুক্ত হয়েছিলো আমাদের ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণে। নবজাগরণের উদ্যোগ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ছিলো সাহসী। তবে এর প্রভাব সারা বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ঢেউ তুলতে সক্ষম হয়নি। ভাষা আন্দোলনের দাবিটি উঠে এসেছিলো মাটির গভীর থেকে। শেকড় থেকে উঠে আসা দাবির সঙ্গে তাই খুব স্বাভাবিকভাবে প্রান্তিক বাঙালি থেকে শুরু করে শিক্ষিত, উচ্চশিক্ষিত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত বাঙালির মানসিক যোগ হয়েছিলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে। মধ্য যুগে চন্ডীদাস মানবতার বাণীকে যেভাবে উচ্চারিত করেছিলেন সেই উচ্চারণে বিশ্বমানবতার কথা সুস্পষ্টভাবে ধ্বণিত হয়েছিলো, এর ধারাবাহিকতায় কবি আবদুল হাকিম (১৬২০-১৬৯০) বঙ্গবাণী কবিতায় যখন ঘোষণা করলেন- ‘যেসব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী। সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি।’ তখন বিশ্বমানবতার সঙ্গে জাতীয়তাবোধও উজ্জীবিত হয়ে উঠলো সারা বাংলায়।

পরবর্তীতে আমাদের লোক-সংস্কৃতিও মানবতার বাণীকে ধারণ করে নিয়ে এসেছিলো অত্যন্ত স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে। লোক-সংস্কৃতি মানুষের জন্য মানবতার ধর্ম ছাড়া আর যে কোন বিকল্প নেই, লোক আঙ্গিকের মাধ্যমে শ্রোতার সামনে তুলে ধরেছে। ফকির লাল শাহ সহজ সরলভাবে জাত, ধর্ম, বর্ণের সংকীর্ণ গন্ডি থেকে মানবতার ডাক, মানবতার মর্মবাণী যে বাঙালির অনুসরণীয় সেই বিষয়টিকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন বাংলার মাঠ-ঘাটে। বাঙালি লোকসমাজ শেকড়ের সংস্কৃতির বাণীতে মুগ্ধ হয়ে ওঠেন। লালনের গানে যখন ধ্বণিত হয়- ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে/লালন কয় জাতের কী রূপ/আমি দেখলাম না দুই নজরে/সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে/কেউ মালা’য় কেউ তছবি গলায়/তাইতে যে জাত ভিন্ন বলায়/ যাওয়া কিম্বা আসার বেলায়/জাতের চিহ্ন রয় কার রে... ।’ লালন অত্যন্ত সহজভাবে বিভেদ বৈষম্যের কুয়াশাকে ভেদ করে মানবতার বাণীকে সামনে নিয়ে আসলেন। লোক কবিতার মাধ্যমে চন্ডী দাস যে বাণীকে তুলে ধরছিলেন লালন তাকে সঙ্গীতের আঙ্গিকে আরও সরল এবং সুরেলা ব্যাখ্যা করে সবার সামনে উপস্থাপন করলেন। আধুনিক যুগে নজরুল সমস্ত কৃত্রিম ভেদাভেদকে ছিন্ন করে মানবতার সূর্যকে অবগুন্ঠন মুক্ত করে বললেন- ‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নাহি কিছু মহীয়ান।’ এরকম অজগ্র সংগীত, কবিতা, নাটক ও উপন্যাসের মাধ্যমে।

লালান, হাসন, রাধারমণ থেকে শুরু করে শাহ আবদুল করিম পর্যন্ত এই ধারাকে বহন করেছেন। সাহিত্য সংস্কৃতিতে বাঙালি জাতিসত্তার চিরায়ত মানবতা,সর্বজনীনতার বাণী অর্থাৎ চন্ডীদাসের ‘শুন হে মানুষ ভাই সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ এই অমীয় মানব ধর্মকে আরও বেগবান, করে তুলেছেন নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, সুকান্ত থেকে শুরু করে আধুনিক বাঙলা কবিতার প্রধান কবি শামসুর রাহমান পর্যন্ত।

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন থেকে জেগে ওঠা অসাম্প্রদায়িক, মানবতার ধারাকে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের প্রতিটি ধাপ অন্তর দিয়ে ধারন করেছে। মুক্তির আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে বাঙালি জাতি সত্তার পুনর্জাগরণের কথা খুঁজে পাই। ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, বৈষম্যহীনতা ছিলো বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের অন্তরে প্রবাহিত মূল সুর। ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনে, ৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলনে সব বৈষম্য হ্রাস করে মানবিক পূর্ববাংলা গড়ার আহব্বান আসে। এরপর ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে সংকীর্ণ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বাক্সে পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পেরেক মারতে সমর্থ হন। এরই ধারাবাহিকতায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের সংবিধানে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে লেখা হয় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের চারটি মূল মন্ত্র, যেগুলো হলো- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষতা। এই চারটি মূলনীতির মাধ্যমে বিজ্ঞানভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক বাংলাদেশ গড়ার সুস্পষ্ঠ প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়। মনে রাখতে হবে এ নীতিগুলোর সঙ্গে শহীদের রক্তের যোগ আছে। তেইশ বছর যে সমস্ত মানুষ নানা রকমের ত্যাগ স্বীকার করেছেন সে সমস্ত মানুষের জীবনের সমস্ত ত্যাগ-তিতিক্ষা, এই চার নীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত আছে।

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরা ভেবেছিলেন, আমরা বোধ হয় শহীদের রক্তে আঁকা পথ ধরে এগোবো। কিন্তু এত দ্রুত বাঙালির ‘দাম দিয়ে কেনা বাংলার’ আদর্শের স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে তা কেউ ভাবতে পারেননি।

পঁচাত্তরে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার উলটো পথে হাঁটতে শুরু করে। পঁচাত্তর থেকে ছিয়ানব্বই পর্যন্ত সারা দেশে যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ রোপিত হয় সে বীজ আমাদের সকলের সামনে মহীরুহতে পরিণত হয়ে উঠছে। বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। জাতীয়তাবাদকে ধর্মাশ্রয়ী জাতীয়তাবাদে পরিণত করা হয়। মোট কথা, ত্রিশ লাখ বাঙালি যে কারণে জীবন উৎসর্গ করেছিলো, যে কারণে তেইশ বছর বাঙালির মুক্তি আন্দোলন হয়েছিলো তার সমস্ত আদর্শ নির্বাসিত হয় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে।

এরপর সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ ক্রমান্বয়ে বেড়ে ওঠে বাংলাদেশে। ভোটের রাজনীতির হিসাব নিকাশে মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার সবাই বিস্মৃত হন। সমগ্র রাজনীতিতে এক ভয়াল সাম্প্রদায়িকতার আবহ তৈরি হয়। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামীলীগ যে দল মুক্তিযুদ্ধকে নেতৃত্ব দিয়েছিলো, সে দলের ভেতরেও কিছু কিছু স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করতে শুরু করে গোপনে এবং প্রকাশ্যে। প্রশাসনের মধ্যেও কিছু মানুষ রঙ-বদল করে কৌশলে সাম্প্রদায়িকতাকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকে। রাজনীতি, প্রশাসন, সামাজিক শক্তির একটি বিপুল অংশের মধ্যে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়।

পৃথিবীর সব দেশেই সংখ্যালঘুরা একটি দলকে আশ্রয় করে, সমর্থন দিয়ে নিজেদের অধিকার রক্ষায় তৎপর হন। ভারতের সংখ্যা লঘুরা একসময় নির্ভর করতেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে। এরকম পৃথিবীর প্রতিটি দেশে সংখ্যালঘুদের পছন্দের একটি দল আছে। সেই পছন্দের দলটি যখন সংখ্যালঘুদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় কিংবা সংখ্যালঘুর ভরসা হতে ভয় পায় রাজনীতির হিসাব-নিকাশ বিবেচনা করে, তখন সংখ্যালঘুদের মানসিক অবস্থা কী দাঁড়ায় তা শুধু সংখ্যালঘু মনোস্তত্ত্ব যারা বুঝেন তারাই অনুভব করতে পারেন। সংখ্যালঘুদের সাহস জোগানোর বিষয়টি যখন রাজনৈতিক মারপ্যাঁচের মধ্যে পড়ে যায়, তখন দেয়াল ছাড়া আর পিঠ ঠেকানোর কোন জায়গা থাকে না।

রামু থেকে শুরু করে সর্বশেষ নড়াইল পর্যন্ত নারকীয় ঘটনার বিচার কাজ সম্পন করতে পারেনি সরকার। কুমিল্লায় দুর্গামন্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননাকে কেন্দ্র করে তিন জেলায় মন্দির ও পূজামন্ডপে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার ৯ মাসের ও বেশি সময়ে মামলার তদন্ত শেষ করা যায়নি। তদন্ত কার্য সমাপ্ত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত একটির পর আরেকটি সাম্প্রদায়িক হামলা চলতে থাকবে। মনে রাখতে হবে- সাম্প্রদায়িক হামলা বা সহিংসতাকে এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে প্রচার করা যাবে না। সংখ্যা এবং ধারাবাহিকতা বিবেচনায় এখন সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা একটি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন যদি আস্থা হারায় বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের কাছ থেকে, তাহলে সংখ্যালঘুদের ক্ষতির থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ক্ষতি বেশি হবে। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ দুটোই পরাজিত হবে। এখনো সময় আছে বাংলাদেশকে বাংলাদেশের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। শুভ বুদ্ধিসম্পন মানুষেরা মনে করেন- নিরপেক্ষ বিচার, সামাজিক সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে জয়ী করে তোলা সম্ভব।

[লেখক : প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

back to top