alt

উপ-সম্পাদকীয়

আদিবাসী বিতর্ক : ‘মূলনিবাসী’ প্রত্যয়ে কি সমাধান মিলবে

বাবুল রবিদাস

: রোববার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২

প্রতিবেশী ভারতের সংবিধানে এসসি (Scheduled caste) জাতি, বা এসটি (Scheduled Tribe) জনজাতি অথবা ওবিসি (Other Backward Class) অন্যান্য অনগ্রসর জাতি প্রাচীন ভারতের প্রথম ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত তথাকথিত সংখ্যালঘু মানুষদের সমষ্ঠিকরণকে মূলনিবাসী মানুষ বলে ধরা হয়। ব্রাহ্মণেরা বিভিন্ন সময়ে নিজেদের স্বার্থে এই মূলনিবাসী সমাজকে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার জাতিতে বিভক্ত করে রেখেছিল। ড. বিআর আম্বেদকরের ভাষায় এ জাতিগুলোর মধ্যে Grated Inequality বা ক্রমিকে অসাম্য রয়েছে। একটা জাতির আরেকটা জাতির সঙ্গে রয়েছে বিরোধ। এ বিরোধের ফলে দেখা যাচ্ছে সাড়ে ছয় হাজার জাতি এক জায়গায় আসতে পারছে না। এমনকি তারা অশিক্ষিত হওয়ায় নিজেদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জড়িত হয়ে পড়েছে।

বাবা সাহেব আম্বেদকর এসব মূলনিবাসীকে অর্থাৎ ৬৫০০ জাতিকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন- এসসি, এসটি এবং ওবিসি। তপশিলি জনজাতি ও তপশিলি জাতি অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী আইনের পরিভাষা। ১৯৫০ সালের সিডিউল ট্রাইব অর্ডার অনুসারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বা বিভিন্ন রাজ্য সরকার যে জাতিদের এ তপশিল ভুক্ত বলে ঘোষণা করেছে, তারাই সিডিউল ট্রাইব বা তপশিলি জনজাতির লোক। অনুরূপভাবে ১৯৫০ সালের সিডিউল কাস্ট অর্ডার অনুসারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বা বিভিন্ন রাজ্য সরকার যে, জাতিদের এ তপশিলভুক্ত বলে ঘোষণা প্রদান করেছে তারাই সিডিউল কাস্টস বা তপশিলি জাতির লোক।

ভারতের মন্ডল কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বিভিন্ন রাজ্য কিছু কিছু জাতির লোককে অনগ্রসর বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তপশিলি জনজাতি ও তপশিলি জাতির বাইরে যারা তাদের অনগ্রসর বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের বলা হয় অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর (ওবিসি) লোক। ‘রাজবংশী’ জাতির লোক ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তপশিলি জাতি (Scheduled caste), মেঘালয়ে তপশিলি জনজাতি (Scheduled Tribe)। আবার আসামে দুটোর কোনটাই নয়। তপশিলি জনজাতি ও তপশিলি জাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী সমেত সমগ্র শূদ্র এবং সেই জনজাতি ও শূদ্রদের থেকে কনভার্টেড যবন, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান জৈন প্রভৃতি লোকেরা হচ্ছে মূলনিবাসী। তারাই এ দেশের ভূমিপুত্র। সংখ্যার দিকে থেকে তারা প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৯৪ জন। তারা ভারতের সংখ্যা গরিষ্ঠ বা বহুজন বা অধীজন।

মন্ডল কমিশনের রিপোর্টে ভারত বর্ষের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩.৫ % ব্রাহ্মণ, ৫.৫% ক্ষত্রীয়, ৬% বৌদ্ধ এবং বাকি ৮৫% তপশিলি জনজাতি (Scheduled Tribe) এবং তপশিলি জাতি (Scheduled caste) ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী অর্থাৎ ওি সি (Other Backward Class) সমেত শূদ্র বা তাদের থেকে কনভার্টেড যবন বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন ইত্যাদি। ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে মূলনিবাসী সমাজ যদি আবার ভারতের শাসক শ্রেণী হতে চায় তবে ৬৫০০ জাতিকে মূলনিবাসী পরিচয় নিয়ে একত্রী হতে হবে। একত্রী করতে হলে এসব জাতিগুলোকে আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে; যা বাবা সাহেব বলতেন শিক্ষিত হও। শিক্ষিত মানুষেরাই সংগঠিত হতে পারে ও জাতিকে মুক্তি দিতে পারে; যা বাবা সাহেবের ভাষায় সংগঠিত হও।

শিক্ষিত ব্যক্তিরাই ভবিষ্যৎ বলতে পারেন। তাদের আন্দোলন কখনো বৃথা যায় না; যা বাবা সাহেবের ভাষায় আন্দোলিত হও। বর্তমানে মূলনিবাসীর মানুষ শিক্ষিত হয়েছে, কিন্তু প্রশিক্ষিত হয়নি। তাই ড. বিআর আম্বেদকর বলতেন Our people are educated but untrained. মূলনিবাসী শিক্ষিত জনগণকে পূর্বের প্রয়াত মূলনিবাসী মহাপুরুষের জীবনী তাদের দিকনির্দেশনা বিচারধারা অধ্যায়ন করে জ্ঞানী ও প্রশিক্ষিত হতে হবে। সব জাতিকে একত্রে আনতে দীর্ঘক্ষণ বুঝাতে হবে যে, আমরা সবাই মূলনিবাসী।

পর্যালোচনায় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সংখ্যাগুরু জনগণকে মূল স্রোতধারায় আনয়ন করার লক্ষ্যে ভারতের কোন রাজ্যে সিডিউল কাস্ট তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আবার কোথাও একই জাতিকে সিডিউল ট্রাইব তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। অন্যান্যদের অনগ্রসর বলে তালিকা স্থান দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে ৮৫ ভাগ বহুজন মানুষেরা শিক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও আধুনিকতায় অনগ্রসর। ড. বিআর আম্বেদকর তখনকার সময় মনে করেছিলেন যে, সব অনগ্রসর জনজাতিকে মূলস্রোতধারায় আনতে কোটা পদ্ধতি চালু প্রয়োজন। তারই দূরদর্শিতার সুফল ভারতের মূলনিবাসীরা আজ প্রাপ্ত হয়ে কিছুটা পথ এগিয়ে এসেছে। এখনো অনেক দূর রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতে হবে। এজন্য মূলনিবাসী জনগণকে একত্রিত হতে হবে। সব হিংসা-বিদ্বেশ, দ্বন্দ্ব, পরস্পর পরস্পরের মাঝে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে দূরীভূত করার প্রয়োজনীয়তা আছে। নতুন প্রজন্মকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। তবেই তো মূলনিবাসী জাতি মূলস্রোত ধারায় আসবে ও সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর হবে।

শিক্ষিত মানুষদের সচেতনতায় সমাজে আলো ছড়াবে। শিক্ষিত ও জ্ঞানীরা দুর্বল সমাজের সন্তানদের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠে। তাদের কলমের কালি অত্যন্ত পবিত্র। তাই বলা হয় অসির চেয়ে মশির শক্তির অনেক বেশি। একদিন না একদিন সমাজের সমস্ত কুসংস্কার, কুপ্রথা, কাল্পনিক জীবন আশা ইত্যাদি থেকে বিজ্ঞানের পথে আসবে এবং ভবিষ্যতে ধূম্রজাল থেকে বের হবে ও তবেই তো মুক্তি পাবে দলিত জাতি।

পৃথিবীর অধিকাংশ আদিম অধিবাসীরা নানা পরিবর্তনের স্তরের মধ্য দিয়ে চিকিৎসা, শিক্ষা, বিজ্ঞানে অনগ্রসর হয়ে বর্তমানে পৌঁছেছে। তারা সবাই আদিম সমাজ থেকে উন্নত সমাজে বসবাস করছে; কিন্তু কিছুসংখ্যক অধিবাসী পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের ও সবার সঙ্গে উঠাবসা না করার কারণে তারা আদিম অবস্থায় রয়ে গেছে বা খুব সামান্যই পরিবর্তন হয়েছে। পৃথিবীর আদিম অধিবাসীদের জীবনযাত্রা, সমাজ ব্যবস্থা ও চিন্তাধারাকে তাই খাটো করে দেখা উচিত নয়।

এ প্রসেঙ্গ অধ্যাপক ম. নূরুন্নবী বলেন, পৃথিবীর সব মানুষেরাই আদিবাসী প্রাচীন জনগোষ্ঠী। যারা লেখাপড়া শিখে অগ্রসর হয়ে বিকশিত হয়েছে তারাই আজকে আমরা। আর যারা অনগ্রসর লেখাপড়া, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পশ্চাৎপদ তারাই মূলত আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ।

ধর্মের ওপর ভিত্তি করে আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ বলে গণ্য করা মোটেই ঠিক নয়। তাদের পরিচয় হবে সংস্কৃতি চর্চা ও জীবনযাত্রার ভিত্তি করে। ভারতে সরকারিভাবে Tribal বা Tribe বলা হয় আদিবাসীদের। আদিবাসী শব্দ বিভিন্ন সিনেমা, নাটকে, উপন্যাসে, গল্পে পাওয়া গেলেও আদিবাসী শব্দটি বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে। যেমন-এস্কিমোরা, ইরোকুল, তাসমেন, সামোয়া ইত্যাদি। এক সময় ব্রিটিশরা বিভিন্ন কাগজ-কলমে Aboriginal, Tribal বলেছে। পরবর্তীতে Scheduled caste, Scheduled Tribe বলেছে। এরপর ঙঃযবৎ ইধপশধিৎফ ঈষধংং বা ওবিসি বলা হচ্ছে। এ কারণেই তারা একত্রিত হতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

তাই বর্তমান চিন্তাবিদ, লেখক, জ্ঞানী-গুণীজন মূলনিবাসীরা বলছেন- ৮৫% ভাগ মানুষেরা যেদিন একত্রিত হতে পারবে, সেদিন অনার্য মূলনিবাসী জনগণ বিজয়ী হবে। পশ্চাৎপদ শ্রেণীর বিকাশের রথকে আটকে রাখার উদ্দেশ্যে প্রভাবশালী মহল ও পুঁজিবাদী যৌথ শক্তি প্রয়োগ করে, কতই না ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে আসছে- তার একটা সংক্ষিপ্ত চিত্রবর্ণন করা হলো। আসলে যে কোন বিষয়কে নিয়ে চিন্তা-ভাবনার দৃষ্টিকোণ নিজস্ব চেতনার সঙ্গে সম্বন্ধমুক্ত। পরিস্থিতি ভীষণ গম্ভীর। তবে এর অর্থ এটা নয় যে, পশ্চাৎপদ শ্রেণীর সামনে ‘সাক্ষাৎ মৃত্যু’ ছাড়া কোন রাস্তা খোলা নেই। ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়- কথাও মিথ্যা নয়। তবে উত্তরণ সম্ভব তখনই হবে যখন প্রভাবশালী মহলের গোলামি থেকে দলিত জাতি মুক্ত হবে। প্রভাবশালী মহলের গোলাম অবস্থা থেকে মুক্তি তখনই হবে যখন অজ্ঞানতার অন্ধকার ছিঁড়ে জ্ঞানরূপী আলোয় প্রবেশ করবে। আর অজ্ঞানতা অন্ধসীমা থেকে বেরিয়ে চেতনার আলোকে স্নাত হবে তখনই যখন এরা নিজেদের আপন মহাপুরুষদের বিচার-ধারা বোঝা ও গ্রহণ করার মানসিকতায় তৈরি হবে। সেই মানসিকতা তখনই বিকশিত হবে যখন তারা নিজেদের সেই সব লোকেদের বিশ্বাস করা শুরু করবে, যারা তাদের আপনজন আপন সমাজেরই আপন লোক এবং যারা সুযোগসন্ধানী-সুবিধাদাী রাজনীতি থেকে হাজার ক্রোশ দূরে রয়েছে। পশ্চাৎপদ শ্রেণীর সাবির্ক পরিবর্তন অবশ্যই সম্ভব যদি তারা মহাপুরুষদের প্রদর্শিত পথে (দিশায়) নির্দ্বিধায় চলতে শুরু করে। পুরনো ও বর্তমান দশা অতিক্রম করে পূর্ণ বিকশিত নব-দশা আসবেই এ বিশ্বাস আছে।

বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন ১৮৮৫ এর ৪৯ ধারায় Aboriginals’ শব্দটি লেখা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাইস্বত্ব আইন ১৯৫০ এর ৯৭ ধারায় Aboriginals castes, Tribes উল্লেখ করা আছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী, দলিত, বঞ্চিত, প্রান্তিক জনগণ অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিল। অতঃপর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার পরবর্তীতে সংবিধানে ২৩(ক)-তে Tribes, Minor races, ethnic sects and communities লিপিবদ্ধ করেছেন। কিন্তু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০ এ Ethnic sects বলে আইন পাশ করেন সরকার। ব্রিটিশ সরকার, পাকিস্তান সরকার এবং বাংলাদেশ সরকার অর্থাৎ কোন সরকারই আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেননি। কোন সরকারই আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেননি। বিভিন্ন সরকার বাংলাদেশে কখনো নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, উপজাতি, ইত্যাদি নামে বলেছেন। অনুমান করা যায় যে, আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি ভবিষ্যতেও অসম্ভব। তাই ভারতের তপশিলি জনজাতি, তফশিলি জাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর জাতিরা একত্রে মূলনিবাসী বলে আন্দোলন করছেন। বাংলাদেশের অনগ্রসর ১৫ লাখ ৮৭ হাজার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনগণ একত্রে মূলনিবাসী প্রত্যয় গ্রহণ করে আন্দোলন করলে সুফল পাওয়া যেতে পারে।

[লেখক : আইনজীবী]

কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণ

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে

ধর্মীয় সংখ্যালঘু খ্রিস্টানরা ভালো নেই

বঙ্গবন্ধু, বাংলা ও বাঙালি

ডিসি সম্মেলন : ধান ভানতে শিবের গীত

সন্তানের অভিভাবক হিসেবে মায়ের স্বীকৃতি ও বাস্তবতা

নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিখন-শেখানো কেমন হবে

নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিখন-শেখানো কেমন হবে

বিপর্যয়ের মুখে ধান ও পাট আবাদ : বিপাকে কৃষককুল

বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস

নগরে আগুন লাগলে দেবালয় কি অক্ষত থাকে

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি

পাঠ্য বইয়ে ডারউইনের তত্ত্ব

ভাঙ্গা-মাওয়া এক্সপ্রেস সড়কে দুর্ঘটনা রোধে ব্যবস্থা নিন

প্রাণীর জন্য ভালোবাসা

সন্দেহের বশে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার

শিক্ষকরাই পারেন শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ শেখাতে

ফ্লোর প্রাইস ও স্থিতিশীল শেয়ারবাজার

ছবি

বায়ুদূষণের ঝুঁকিতে দেশ

বিএনপি নেতৃত্বের সংকট ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ

তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সচেতনতা

‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়তে চাই দক্ষ জনসম্পদ

ছবি

অঙ্গদানের অনন্য উদাহরণ

মডেল গ্রাম মুশুদ্দির গল্প

ফাইভ-জি : ডিজিটাল শিল্পযুগের মহাসড়ক

ছবি

স্মৃতির পাতায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

ছবি

দক্ষিণডিহির স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ

একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি এক্সট্রা কারিকুলাম জরুরি

বায়ুদূষণে বাংলাদেশের শীর্ষ অবস্থান আর কতকাল

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সুশাসনের প্রধান উপাদান

নিয়মের বেড়াজালে ‘অপারেশন জ্যাকপট’

নতুন কারিকুলামে বিজ্ঞান শিক্ষা

নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা

খেলার মাঠের বিকল্প নেই

কেমন আছে খ্রিস্টান সম্প্রদায়

কিছু মানুষের কারণে...

tab

উপ-সম্পাদকীয়

আদিবাসী বিতর্ক : ‘মূলনিবাসী’ প্রত্যয়ে কি সমাধান মিলবে

বাবুল রবিদাস

রোববার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২

প্রতিবেশী ভারতের সংবিধানে এসসি (Scheduled caste) জাতি, বা এসটি (Scheduled Tribe) জনজাতি অথবা ওবিসি (Other Backward Class) অন্যান্য অনগ্রসর জাতি প্রাচীন ভারতের প্রথম ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত তথাকথিত সংখ্যালঘু মানুষদের সমষ্ঠিকরণকে মূলনিবাসী মানুষ বলে ধরা হয়। ব্রাহ্মণেরা বিভিন্ন সময়ে নিজেদের স্বার্থে এই মূলনিবাসী সমাজকে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার জাতিতে বিভক্ত করে রেখেছিল। ড. বিআর আম্বেদকরের ভাষায় এ জাতিগুলোর মধ্যে Grated Inequality বা ক্রমিকে অসাম্য রয়েছে। একটা জাতির আরেকটা জাতির সঙ্গে রয়েছে বিরোধ। এ বিরোধের ফলে দেখা যাচ্ছে সাড়ে ছয় হাজার জাতি এক জায়গায় আসতে পারছে না। এমনকি তারা অশিক্ষিত হওয়ায় নিজেদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জড়িত হয়ে পড়েছে।

বাবা সাহেব আম্বেদকর এসব মূলনিবাসীকে অর্থাৎ ৬৫০০ জাতিকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন- এসসি, এসটি এবং ওবিসি। তপশিলি জনজাতি ও তপশিলি জাতি অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী আইনের পরিভাষা। ১৯৫০ সালের সিডিউল ট্রাইব অর্ডার অনুসারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বা বিভিন্ন রাজ্য সরকার যে জাতিদের এ তপশিল ভুক্ত বলে ঘোষণা করেছে, তারাই সিডিউল ট্রাইব বা তপশিলি জনজাতির লোক। অনুরূপভাবে ১৯৫০ সালের সিডিউল কাস্ট অর্ডার অনুসারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বা বিভিন্ন রাজ্য সরকার যে, জাতিদের এ তপশিলভুক্ত বলে ঘোষণা প্রদান করেছে তারাই সিডিউল কাস্টস বা তপশিলি জাতির লোক।

ভারতের মন্ডল কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বিভিন্ন রাজ্য কিছু কিছু জাতির লোককে অনগ্রসর বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তপশিলি জনজাতি ও তপশিলি জাতির বাইরে যারা তাদের অনগ্রসর বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের বলা হয় অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর (ওবিসি) লোক। ‘রাজবংশী’ জাতির লোক ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তপশিলি জাতি (Scheduled caste), মেঘালয়ে তপশিলি জনজাতি (Scheduled Tribe)। আবার আসামে দুটোর কোনটাই নয়। তপশিলি জনজাতি ও তপশিলি জাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী সমেত সমগ্র শূদ্র এবং সেই জনজাতি ও শূদ্রদের থেকে কনভার্টেড যবন, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান জৈন প্রভৃতি লোকেরা হচ্ছে মূলনিবাসী। তারাই এ দেশের ভূমিপুত্র। সংখ্যার দিকে থেকে তারা প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৯৪ জন। তারা ভারতের সংখ্যা গরিষ্ঠ বা বহুজন বা অধীজন।

মন্ডল কমিশনের রিপোর্টে ভারত বর্ষের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩.৫ % ব্রাহ্মণ, ৫.৫% ক্ষত্রীয়, ৬% বৌদ্ধ এবং বাকি ৮৫% তপশিলি জনজাতি (Scheduled Tribe) এবং তপশিলি জাতি (Scheduled caste) ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী অর্থাৎ ওি সি (Other Backward Class) সমেত শূদ্র বা তাদের থেকে কনভার্টেড যবন বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন ইত্যাদি। ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে মূলনিবাসী সমাজ যদি আবার ভারতের শাসক শ্রেণী হতে চায় তবে ৬৫০০ জাতিকে মূলনিবাসী পরিচয় নিয়ে একত্রী হতে হবে। একত্রী করতে হলে এসব জাতিগুলোকে আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে; যা বাবা সাহেব বলতেন শিক্ষিত হও। শিক্ষিত মানুষেরাই সংগঠিত হতে পারে ও জাতিকে মুক্তি দিতে পারে; যা বাবা সাহেবের ভাষায় সংগঠিত হও।

শিক্ষিত ব্যক্তিরাই ভবিষ্যৎ বলতে পারেন। তাদের আন্দোলন কখনো বৃথা যায় না; যা বাবা সাহেবের ভাষায় আন্দোলিত হও। বর্তমানে মূলনিবাসীর মানুষ শিক্ষিত হয়েছে, কিন্তু প্রশিক্ষিত হয়নি। তাই ড. বিআর আম্বেদকর বলতেন Our people are educated but untrained. মূলনিবাসী শিক্ষিত জনগণকে পূর্বের প্রয়াত মূলনিবাসী মহাপুরুষের জীবনী তাদের দিকনির্দেশনা বিচারধারা অধ্যায়ন করে জ্ঞানী ও প্রশিক্ষিত হতে হবে। সব জাতিকে একত্রে আনতে দীর্ঘক্ষণ বুঝাতে হবে যে, আমরা সবাই মূলনিবাসী।

পর্যালোচনায় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সংখ্যাগুরু জনগণকে মূল স্রোতধারায় আনয়ন করার লক্ষ্যে ভারতের কোন রাজ্যে সিডিউল কাস্ট তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আবার কোথাও একই জাতিকে সিডিউল ট্রাইব তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। অন্যান্যদের অনগ্রসর বলে তালিকা স্থান দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে ৮৫ ভাগ বহুজন মানুষেরা শিক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও আধুনিকতায় অনগ্রসর। ড. বিআর আম্বেদকর তখনকার সময় মনে করেছিলেন যে, সব অনগ্রসর জনজাতিকে মূলস্রোতধারায় আনতে কোটা পদ্ধতি চালু প্রয়োজন। তারই দূরদর্শিতার সুফল ভারতের মূলনিবাসীরা আজ প্রাপ্ত হয়ে কিছুটা পথ এগিয়ে এসেছে। এখনো অনেক দূর রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতে হবে। এজন্য মূলনিবাসী জনগণকে একত্রিত হতে হবে। সব হিংসা-বিদ্বেশ, দ্বন্দ্ব, পরস্পর পরস্পরের মাঝে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে দূরীভূত করার প্রয়োজনীয়তা আছে। নতুন প্রজন্মকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। তবেই তো মূলনিবাসী জাতি মূলস্রোত ধারায় আসবে ও সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর হবে।

শিক্ষিত মানুষদের সচেতনতায় সমাজে আলো ছড়াবে। শিক্ষিত ও জ্ঞানীরা দুর্বল সমাজের সন্তানদের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠে। তাদের কলমের কালি অত্যন্ত পবিত্র। তাই বলা হয় অসির চেয়ে মশির শক্তির অনেক বেশি। একদিন না একদিন সমাজের সমস্ত কুসংস্কার, কুপ্রথা, কাল্পনিক জীবন আশা ইত্যাদি থেকে বিজ্ঞানের পথে আসবে এবং ভবিষ্যতে ধূম্রজাল থেকে বের হবে ও তবেই তো মুক্তি পাবে দলিত জাতি।

পৃথিবীর অধিকাংশ আদিম অধিবাসীরা নানা পরিবর্তনের স্তরের মধ্য দিয়ে চিকিৎসা, শিক্ষা, বিজ্ঞানে অনগ্রসর হয়ে বর্তমানে পৌঁছেছে। তারা সবাই আদিম সমাজ থেকে উন্নত সমাজে বসবাস করছে; কিন্তু কিছুসংখ্যক অধিবাসী পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের ও সবার সঙ্গে উঠাবসা না করার কারণে তারা আদিম অবস্থায় রয়ে গেছে বা খুব সামান্যই পরিবর্তন হয়েছে। পৃথিবীর আদিম অধিবাসীদের জীবনযাত্রা, সমাজ ব্যবস্থা ও চিন্তাধারাকে তাই খাটো করে দেখা উচিত নয়।

এ প্রসেঙ্গ অধ্যাপক ম. নূরুন্নবী বলেন, পৃথিবীর সব মানুষেরাই আদিবাসী প্রাচীন জনগোষ্ঠী। যারা লেখাপড়া শিখে অগ্রসর হয়ে বিকশিত হয়েছে তারাই আজকে আমরা। আর যারা অনগ্রসর লেখাপড়া, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পশ্চাৎপদ তারাই মূলত আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ।

ধর্মের ওপর ভিত্তি করে আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ বলে গণ্য করা মোটেই ঠিক নয়। তাদের পরিচয় হবে সংস্কৃতি চর্চা ও জীবনযাত্রার ভিত্তি করে। ভারতে সরকারিভাবে Tribal বা Tribe বলা হয় আদিবাসীদের। আদিবাসী শব্দ বিভিন্ন সিনেমা, নাটকে, উপন্যাসে, গল্পে পাওয়া গেলেও আদিবাসী শব্দটি বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে। যেমন-এস্কিমোরা, ইরোকুল, তাসমেন, সামোয়া ইত্যাদি। এক সময় ব্রিটিশরা বিভিন্ন কাগজ-কলমে Aboriginal, Tribal বলেছে। পরবর্তীতে Scheduled caste, Scheduled Tribe বলেছে। এরপর ঙঃযবৎ ইধপশধিৎফ ঈষধংং বা ওবিসি বলা হচ্ছে। এ কারণেই তারা একত্রিত হতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

তাই বর্তমান চিন্তাবিদ, লেখক, জ্ঞানী-গুণীজন মূলনিবাসীরা বলছেন- ৮৫% ভাগ মানুষেরা যেদিন একত্রিত হতে পারবে, সেদিন অনার্য মূলনিবাসী জনগণ বিজয়ী হবে। পশ্চাৎপদ শ্রেণীর বিকাশের রথকে আটকে রাখার উদ্দেশ্যে প্রভাবশালী মহল ও পুঁজিবাদী যৌথ শক্তি প্রয়োগ করে, কতই না ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে আসছে- তার একটা সংক্ষিপ্ত চিত্রবর্ণন করা হলো। আসলে যে কোন বিষয়কে নিয়ে চিন্তা-ভাবনার দৃষ্টিকোণ নিজস্ব চেতনার সঙ্গে সম্বন্ধমুক্ত। পরিস্থিতি ভীষণ গম্ভীর। তবে এর অর্থ এটা নয় যে, পশ্চাৎপদ শ্রেণীর সামনে ‘সাক্ষাৎ মৃত্যু’ ছাড়া কোন রাস্তা খোলা নেই। ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়- কথাও মিথ্যা নয়। তবে উত্তরণ সম্ভব তখনই হবে যখন প্রভাবশালী মহলের গোলামি থেকে দলিত জাতি মুক্ত হবে। প্রভাবশালী মহলের গোলাম অবস্থা থেকে মুক্তি তখনই হবে যখন অজ্ঞানতার অন্ধকার ছিঁড়ে জ্ঞানরূপী আলোয় প্রবেশ করবে। আর অজ্ঞানতা অন্ধসীমা থেকে বেরিয়ে চেতনার আলোকে স্নাত হবে তখনই যখন এরা নিজেদের আপন মহাপুরুষদের বিচার-ধারা বোঝা ও গ্রহণ করার মানসিকতায় তৈরি হবে। সেই মানসিকতা তখনই বিকশিত হবে যখন তারা নিজেদের সেই সব লোকেদের বিশ্বাস করা শুরু করবে, যারা তাদের আপনজন আপন সমাজেরই আপন লোক এবং যারা সুযোগসন্ধানী-সুবিধাদাী রাজনীতি থেকে হাজার ক্রোশ দূরে রয়েছে। পশ্চাৎপদ শ্রেণীর সাবির্ক পরিবর্তন অবশ্যই সম্ভব যদি তারা মহাপুরুষদের প্রদর্শিত পথে (দিশায়) নির্দ্বিধায় চলতে শুরু করে। পুরনো ও বর্তমান দশা অতিক্রম করে পূর্ণ বিকশিত নব-দশা আসবেই এ বিশ্বাস আছে।

বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন ১৮৮৫ এর ৪৯ ধারায় Aboriginals’ শব্দটি লেখা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাইস্বত্ব আইন ১৯৫০ এর ৯৭ ধারায় Aboriginals castes, Tribes উল্লেখ করা আছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী, দলিত, বঞ্চিত, প্রান্তিক জনগণ অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিল। অতঃপর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার পরবর্তীতে সংবিধানে ২৩(ক)-তে Tribes, Minor races, ethnic sects and communities লিপিবদ্ধ করেছেন। কিন্তু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০ এ Ethnic sects বলে আইন পাশ করেন সরকার। ব্রিটিশ সরকার, পাকিস্তান সরকার এবং বাংলাদেশ সরকার অর্থাৎ কোন সরকারই আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেননি। কোন সরকারই আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেননি। বিভিন্ন সরকার বাংলাদেশে কখনো নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, উপজাতি, ইত্যাদি নামে বলেছেন। অনুমান করা যায় যে, আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি ভবিষ্যতেও অসম্ভব। তাই ভারতের তপশিলি জনজাতি, তফশিলি জাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর জাতিরা একত্রে মূলনিবাসী বলে আন্দোলন করছেন। বাংলাদেশের অনগ্রসর ১৫ লাখ ৮৭ হাজার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনগণ একত্রে মূলনিবাসী প্রত্যয় গ্রহণ করে আন্দোলন করলে সুফল পাওয়া যেতে পারে।

[লেখক : আইনজীবী]

back to top