image

ভাষা আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ: কবির দূরদৃষ্টি

সাদ কামালী

যেখানে আমাদের আত্মপ্রকাশ বাধাহীন সেখানেই আমাদের মুক্তি

‘বাঙালি একটি সত্য বস্তু পাইয়াছে, ইহা তাহার সাহিত্য - তাহার নিজের সৃষ্টি, যাহাকে নূতন সৃষ্টিও বলা যায়, ইহা দেশের পুরাতন সাহিত্যের অনুবৃত্তি নয়। আমাদের দেশের অধিকাংশ আচারবিচার পুরাতনের নির্জীব পুনরাবৃত্তি, কেবল সাহিত্যই নূতন রূপ নিয়া নূতন প্রাণে নূতন কালের সঙ্গে যোগসাধন করিতে প্রবৃত্ত, বাঙালিকে সাহিত্যই যথার্থভাবে ভিতরের দিক হইতে মানুষ করিয়া তুলিতেছে।’ কথাগুলো ‘সাতিহ্যসম্মিলন’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কথা ছিল ইস্টারের ছুটিতে ২ এপ্রিল থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সিউড়িতে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে রবীন্দ্রনাথ সভাপতিত্ব করবেন, কিন্তু শারীরিক দুর্বলতার জন্য সিউড়িতে সেই ১৯২৬-এ আর যাওয়া হলো না। সম্মেলন উপলক্ষে লিখিত ভাষণ-প্রবন্ধ ‘সাহিত্যসম্মিলন’ পরে ওই বৈশাখেই (১৩৩৩) ‘প্রবাসী’তে ছাপতে দিলেন। সমকাল অতিক্রম করে প্রবন্ধটির প্রাসঙ্গিকতা আজও তাৎপর্যপূর্ণ, অন্তত পূর্ব বাংলা বা আজকের বাংলাদেশে।

কবির দূরদৃষ্টিতে সত্য শত বৎসর পরে এসেও প্রকট বাস্তব, যেন আজই তিনি লিখেছেন আমাদের দৈন্য আর কূপম-ূকতা দেখে। ‘সাহিত্যসম্মিলন’ প্রবন্ধটি দ্বাদশ খ- রবীন্দ্র-রচনাবলি (১২৫তম রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তি উপলক্ষে প্রকাশিত) থেকে পাঠ শেষে মনে হয় তিনি ভীষণভাবে বিপন্নবোধ করছিলেন ’৪৭-এ দেশভাগের পরপরই পাকিস্তানি শাসকের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি উপেক্ষা আর অস্বীকার করবার সাহস দেখে। তিনি আহত হয়েছিলেন মাতৃভাষায় নিজের সাহিত্য, মত ও মনকে প্রকাশ করার বিরোধিতা কিছু গাদ্দার বাঙালিও করছেন। ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য বাঙালির জাগরণ ও আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত প্রাণক্ষয় রক্তক্ষয় ঘটে। মনে হতে পারে ভাষা আন্দোলনের রবীন্দ্রনাথ একজন কলম সৈনিক। তিনি দেখছেন এবং বোঝাতে চেষ্টা করছেন যে নিজের ভাষা ও ‘সাহিত্যই যথার্থভাবে ভিতরের দিক থেকে বাঙালিকে মানুষ করে তুলছে’ বা তুলতে পারে। পাকিস্তানি শাসকদের কথা থাক, বাঙালি গাদ্দারদের বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ তাদের নিজেদের সাম্প্রদায়িক মন, ইচ্ছামত ধর্মের সামাজিকতার ব্যাখ্যায়। নিজেদের বিশ^াস ও মনের কথা অন্যের মনেও বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উত্তরাধিকার ও মালিকানা বাঙালি মুসলমানের নয় বাঙালি হিন্দুদের- এমন প্রচার করতে থাকে। পরস্পরের প্রতি অশ্রদ্ধা অবিশ^াস এবং সমাজের মধ্যে দাঙ্গা প্রবণতা তো ছিল। এর সঙ্গে তথাকথিত শিক্ষিত কিছু গাদ্দার অন্য কোনো বিদেশি ভাষার মধ্যে নিজেদের পরিচয়, ধর্মীয় অনুভূতির ও অনুষঙ্গের নৈকট্য বেশি অনুভব করে। কিন্তু ভাষা ও সাহিত্যের প্রকাশ ও সৃষ্টির সর্বজনীন আদর্শ হলো নিজের ভাবনা, কল্পনা, আকাক্সক্ষা, যুক্তি এবং চিন্তা অন্যের অন্তরে বোধে বুদ্ধিতে পৌঁছানো, আর এই কাজটি সফলভাবে করে নিজের ভাষা। কথা বুঝতেই যদি অভিধান লাগে, সাহিত্য উপলব্ধি কখনো অভিধান দেয় না। মহাকাব্যের কবিগণ ব্যসদেব, মাইকেল, হোমার কেউ নিজ ভাষা উপেক্ষা করে অপরের ভাষার আশ্রয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ সৃষ্টি করেননি। কিন্তু ওই মহৎ সাহিত্যের যা আদর্শ তা শুধু গ্রিক সংস্কৃত ভাষাতেই আবদ্ধ থাকেনি। তার ভাব সৌন্দর্য ঐশ^র্য পৃথিবীর মানুষ নিজের নিজের অন্তরের করে নিয়েছে। কারণ কবি মাতৃষাষায় তার সবটুকু প্রকাশ করেছিলেন বলেই আমরা আমাদের অন্তরে নিতে পেরেছি অন্য ভাষার মানুষ হওয়া সত্ত্বেও।

নিজ ভাষাতেই নিজের অস্তিত্ব সবল থাকে। নিজের মন ও অস্তিত্বে গভীর রেখাপাত সৃষ্টি করে ধর্মীয় অনুভূতি; ধর্মীয় প্রার্থনার মধ্যে নিজেকে নিবেদন ও সমর্পণে ভক্তি ভালোবাসা উজার করে দিতে চাই। তখন ওই প্রার্থনা বা মোনাজাতের ভাষা কি শুধু আরবি, ফার্সি, সংস্কৃত! বরং কেতাবের শ্লোকের সঙ্গে আমরা নিজেদের ভাষায় পরম সত্তার কাছে নিজের ভাষাতেই মঙ্গল কামনা করি। অর্থাৎ মাতৃভাষাই অন্তরকে এবং আমাদের স্বপ্ন কল্পনা ভাবনা এবং সৃষ্টিকে যথাযথভাবে প্রকাশ করতে পারি বলেই- ‘বিদ্রোহী’, ‘বলাকা’, ‘বনলতা সেন’, ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’, ‘মেটামরফসিস’ প্রবল আলোড়িত করে। রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালে একটি নিয়মিত অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মিলন অনুষ্ঠানের জন্য যে ভাষণ-প্রবন্ধ ঠিক করেন তার মূল কথাটাই হলো নিজের ভাষাতেই নিজেকে, নিজের ধর্মীয় অনুভূতি, ধর্মীয় অনুষঙ্গ যথার্থ প্রকাশ ঘটিয়েই সার্থক হতে পারে। কোনো অজুহাতে বিদেশি ভাষার একান্ত ধর্মভাব যেমন সত্যনিষ্ঠভাবে প্রকাশ সম্ভব হয় না, সৃষ্টিশীতাও প্রাণস্পন্দনে সরব হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ ওই প্রবন্ধে বলছেন, ‘নিজের ভাষাটাকে কোণঠেসা করিয়া তাহাদের ওপর যদি উর্দু চাপানো হয়, তাহা হইলে তাহাদের জিহ্বার আধখানা কাটিয়া দেওয়ার মতো হইবে না কি!’

প্রসঙ্গত অন্য একটি দেশের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘চীন দেশে মুসলমানের সংখ্যা অল্প নহে, সেখানে আজ পর্যন্ত এমন অদ্ভুত কথা কেহ বলে না যে, চীনভাষা ত্যাগ না করিলে তাহাদের মুসলমানের ওপর খর্বতা ঘটিবে।’ বাঙালি মুসলমানের ওপর তেমন জরবদিস্তমূলক আরবি ফার্সি উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেয়ার, এমনকি বাংলা ভাষায় পবিত্র ধর্মের এবং বাঙালি মুসলমানের মর্যাদা রক্ষা সম্ভব নয় মনে করে পাকিস্তানি শাসকদের ইচ্ছাকে চরিতার্থ করার লক্ষ্যে উর্দু চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করে। রবীন্দ্রনাথ যেন এমন জবরদস্তি আগাম দেখতে পেয়েই লেখেন, ‘বাংলা যদি বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা হয়, তবে, সেই ভাষার মধ্য দিয়াই তাহাদের মুসলমানিও সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ হইতে পারে। বর্তমান বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখকরা প্রতিদিন তাহার প্রমাণ দিতেছেন।... বাংলা ভাষাতেই তাঁহারা মুসলমানি মালমসলা বাড়াইয়া দিয়া ইহাকে আরো জোরালো করিয়া তুলিতে পারিবেন।... বিষয়সম্পত্তি লইয়া ভাইয়ে ভাইয়ে পরস্পরকে বঞ্চিত করিতে পারে, কিন্তু ভাষা সাহিত্য লইয়া কি আত্মঘাতকর প্রস্তাব কখনো চলে!’ রবীন্দ্রনাথ বিচলিত হন এইসব দেখে যে পঞ্চাশ ষাটের দশকের তমদ্দুন মজলিশের কিছু সদস্যর অতি উর্দুপ্রেম এবং ধর্মের প্রসঙ্গটি টেনে বাংলাকে উপেক্ষা করার, অন্য ভাষার হরফে বাংলা লেখার এবং ইসলামি মূল্যবোধ ও অনুষঙ্গকে একমাত্র অবলম্বন করে বাংলা সাহিত্য ও ভাষা চর্চার ওকালতি করার সাহস দেখাচ্ছে। আমাদের ঐতিহ্য ও নৃতাত্ত্বিক বিকাশকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বাংলায় সৃষ্ট সকল অমর সাহিত্যকে বর্জন করে শুধু বাইরে থেকে আগত একটি ধর্মের বিজ্ঞাপিত ভাষা ও সাহিত্য চর্চা ও প্রকাশের লক্ষ্য করে নেয়ায় যে সর্বনাশ ও কূপম-ূকতা তা রবীন্দ্রনাথ ওই ১৯২৬ সালেই দেখে নিয়েছিলেন। অথচ পাকিস্তান সৃষ্টির দুই মাসের মধ্যে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ সালে যখন ‘তমুদ্দুন মজলিশ’ নামের সাংস্কৃতিক, সামাজিক সংগঠনটি অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে গঠিত হয়, এর মূল লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষার অধিকার সুরক্ষা করা। এই সংগঠনটিই তখন বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনের সূচনা করে। যাই হোক কিছু বিভ্রান্ত তমদ্দুন সদস্য যে ষড়যন্ত্রকে সমর্থন করে এবং নিজেরাও ভূমিকা রাখে তাদের লক্ষ্য করে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘...হিন্দুর প্রতি আড়ি করিয়া বাংলাদেশের কয়েকজন মুসলমান বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা কাড়িয়া লইতে উদ্যত হইয়াছেন। এ যেন ভায়ের প্রতি রাগ করিয়া মাতাকে তাড়াইয়া দিবার প্রস্তাব। বাংলাদেশের শতকরা নিরানব্বইয়ের অধিক সংখ্যক মুসলমানদের ভাষা বাংলা।’ সেই ভাষাকে উপেক্ষা করা বা কবির ভাষায় ‘কোণঠেসা’ করা মানে বাংলাদেশের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়া। রবীন্দ্রনাথের মতো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মহাজন সত্যদ্রষ্টা ছিলেন বলেই বাংলার সম্মান কিছু হলেও রক্ষা পায়। ভাষা ও সাহিত্যে যারা সাম্প্রদায়িকতার বিষ লালন করতে চায়, ভেদ সৃষ্টি করতে চায়, তারা কেউ মিত্র হতে পারে না। ভেদ সৃষ্টি করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘সাহিত্যে যদি সাম্প্রদায়িকতা ও জাতিভেদ থাকিত তবে গ্রিক সাহিত্যের দেবতার লীলার কথা পড়িতে গেলেও আমাদের ধর্মহানি হইতে পারিত।... একদা নিষ্ঠাবান হিন্দুরাও মুসলমান আমলে আরবি ফার্সি ভাষায় প-িত ছিলেন; তাহাতে তাঁহাদের ফোঁটা ক্ষীণ বা টিকি খাটো হইয়া যায় নাই।... হিন্দু মুসলমানকে যাহারা কৃত্রিম বেড়া তুলিয়া পৃথক রাখিবার চেষ্টা করিতেছেন তাঁহারা মুসলামনেরও বন্ধু নহেন, হিন্দুর নহেন।’

প্রসঙ্গত সাহিত্যসম্মিলন প্রবন্ধটি লিখবার দুই মাস আগেই ফেব্রুয়ারির প্রথম ভাগে (১৯২৬) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার নবাবদের আমন্ত্রণে ঢাকা এসেছিলেন। নবাবের আন্তরিক আতিথেয়তা, সংবর্ধনা, এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সংবর্ধনাসহ অনেকগুলো অনুষ্ঠানে দেয় সম্মান ও আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। তো আমাদের বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রবল প্রেরণাদায়ী সৈনিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওই প্রবন্ধ থেকেই অব্যর্থ বাণী উদ্ধৃত করে এই ছোট গদ্যটির ইতি- ‘বাংলা ভাষাকে নির্বাসিত করিয়া অন্য যে কোনো ভাষাকেই গ্রহণ করি না কেন, তাহাতে আমাদের স্বাতন্ত্র্যকে দুর্বল করা হইবে। সেই দুর্বলতাই যে আমাদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় বল-লাভের প্রধান উপায় হইতে পারে, এ কথা একেবারেই অশ্রদ্ধেয়। যেখানে আমাদের আত্মপ্রকাশ বাধাহীন, সেখানেই আমাদের মুক্তি।’

সম্প্রতি