নিজের ভাষার প্রশ্নে
ফারুক মাহমুদ
দহন-দক্ষতা নিয়ে অশ্রু হাসে আগুনের ভাষায়
যে থাকে নিজের মধ্যে, ভুল মন্ত্রে সে-ও চলে যায়
রুদ্ধশ্বাস মেঘ থেকে কখনো কি বৃষ্টি ঝেপে আসে!
ছুরিকে বিশ্বাস নেই- ডেকে আনে পদনখধূলি
দূষিত নির্মাণজাত ছাইপাঁশে ভরা তার ঝুলি
রুচিযোগ্য ঝরাফুল- তারো থাকে অন্ত্যমিল হাসি
দেশ ভেবে আদিখ্যেতা- মূর্খ-মূঢ়, নীতি সর্বগ্রাসী
নিজের ভাষার প্রশ্নে কেউ যদি দ্বিধান্বিত থাকে
আমার ধিক্কার আর করুণার শতঘৃণা তাকে
ভাষা হারানোর শোক
নাসির আহমেদ
আমরা এখন ভয়াবহ নিস্তব্ধ
নির্বাক বসে আছি মুখোমুখি। কবিতার উপযোগী কোনো
শব্দও নেই আর আয়ত্বে আজ।
টেলিফোনে দুই প্রান্তে দুজন যেন বোবা-কালা!
ঘড়ির কাঁটাও থেমে গেছে- নিশ্চুপ!
অথচ ঘুরছে অদৃশ্য এক ঘড়িতে সময়।
বোবা-কালা এই বধির সময় ভাষাকে
বিপর্যস্ত করেছে ভীষণ! প্রতিটি বর্ণ ক্লান্ত!
বর্ণ তো নয়, যেন কালো কালো
মরা মাছি পড়ে আছে কবিতার
বইয়ের পাতায়, লেখার খাতায়!
নৈঃশব্দ্যের হিম তা-বে থেমে গেছে সব কিছু।
স্বেচ্ছায় কবি রুদ্ধকণ্ঠ? নিশ্চয়ই নয়-
যে ভাষার এত ক্ষমতা- একদা বদলে দিয়েছে বাংলার ইতিহাস-
সে ভাষারও নেই ক্ষমতা এখন গ্লানি মোছাবার।
মা আমার চির দুঃখিনী, যেন ভাষাহারা নারী
নির্বাক চেয়ে আছে, শুধু চোখে কথার আগুন জ্বলে।
একুশের অগ্নিস্মৃতি
হাসান হাফিজ
বর্ণমালা এখনো রক্তের দাগ তোমার শরীরে
রক্তরঙই লাবণ্য ও অহং তোমার
এত ক্রোধ তোমার নিভৃত বুকে
এত দ্রোহ এতটা বারুদ
কীভাবে সঞ্চিত ছিল অগ্নিবীজ এত
বোঝবার উপায় ছিল না-
আপাতনিরীহ শান্ত নির্বিরোধ
স্বভাব তোমার ছিল-
আঘাতে জাগ্রত হলে অনশ্বর রুদ্রতাপে
জ্বলে উঠলে দুর্বাসার মতো
যখনই আক্রান্ত হই
শত্রুর বিরুদ্ধে আমি,আমরা এই বঞ্চিতেরা
স্বাভাবিক নিয়মেই জ্বলে উঠতে জানি
সেই অগ্নি স্বতঃস্ফূর্ত, প্রকৃতিরই মতো সহজিয়া
স্বৈরাচার পুড়ে ভস্ম
অমন স্বপ্ন ও সাধ
শুধু এই ছোট জনপদে
কেন থাকবে সীমায়িত? খুলেছে অর্গল
মাতৃভাষা দিবসের রক্তঝরা অঙ্গীকার
গর্ব হোক বিশ্বমানবের
সানন্দ সম্পদ হোক বিশ্বমানবের...
কবিতার চিত্রকলা
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল
নেত্রকোনা যাবার পথে চায়ের দোকানে টং-মাচায়
পা দুলিয়ে দুধ চা-
সেটাও একটি কবিতা।
ভালো মানুষের বদ অভ্যাসের মতো
কারো ঘাড়ে একটা তেড়া নাড়ি থাকে
সেটাই কবিতা।
মুছিভর্তা,
কাঁচা কাঁঠালের তরকারি, পাঁকা কাঁঠালের ভৈত্যা
খাদ্য সিরিজে বহুমাত্রিক কবিতা।
গ্রীষ্মের গরমে বগলে ঘামের গন্ধ
অন্ধের দৃষ্টিতে
সেটাও একটি আবুল খায়ের মুসলেউদ্দিনের কবিতা।
খুনের পর খুনি রক্তমাখা ছুরি নদীতে ফেলে দেয়
জলস্রোতে মিশে যাওয়া রক্তের রং
সেটিও একটি কবিতা!
সহবাসের পর
ভাস্কর্য নির্মাণের মতো স্বামীর স্নান করিয়ে দেয়ার দৃশ্য
সেটিও একটি স্মৃতিচারণমূলক কবিতা।
বত্রিশ গুঁড়িয়ে-পুড়িয়ে দেয়ার পর আমরা যারা কাঁদি
আমাদের কান্না কবিতার অধিক।
অমর এক একুশের বসন্ত দিবসে
আবদুর রাজ্জাক
অনন্তকাল ধরে বসে আছি আমি এক দুর্লভ,
কীভাবে যেন আমাকে কেউ বিচ্যুত করেছে, যেন আমি
তোমার কাছে ক্রমশ কোমল হয়ে উঠেছি। তারপর-
আটচল্লিশ, বায়ান্ন, বাষট্টি, ধারণ করে করে এখনো আমি
এক অতুলনীয় একাত্তর।
এতোকাল- কোন ভালোবাসায় তুমি আমাকে ধরে রেখেছো?
তোমার কোনো কিছুই আমাকে ক্লান্ত করেনি কখনো।
ওহে অতুলনীয়া- রাশি রাশি কবিতা ছড়ায়ে দিয়েছো
সোহাতিল উঠোনে আমার,
উঠোনের সেই মায়াবৃক্ষে কতো পাখি ডাকে, গুঞ্জন করে, আর
আমার স্বপ্নগুলো এলোমেলো হয়ে যায় কালের কারণে,
পাঁজরে বিরহের স্রোত, ভিতরে জাগরণী গান-
এর কিছুই কি বোঝো না তুমি?
না বোঝো কবিতা, না বোঝো জীবন, না বোঝো মাটির মমতা!
অলক্ষ্যে, বৃক্ষেরা কাঁদে নিঃশব্দে, বাতাসে অপূর্ণ হাহাকার।
চলতি পথের হাওয়া
তাহমিনা কোরাইশী
ছেলেটার মনে অনন্ত উচ্ছ্বাস দুরন্ত চপলতা
আর মেয়েটার মন দ্বিধান্বিত তবুও আনন্দ কম নয়
কাউকেই বোঝানো যাবে না নদীতে কতটা জল
আর কতটা মনে মরুভূমি!
হয় পথ চলা দু’জনার এই আনন্দধামে
কিছু কথা গিঁট দিয়ে রাখা হয় মেয়েটির আঁচলে
কিছু তো প্রকাশ হয়ে যায়।
মেয়েটার বয়স তার বত্রিশ দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে থাকে পাহারায়
প্রথম প্রেমের শিহরন আনন্দে ছেলেটি খলখল,
প্রাণ কাঁদে নিভৃতে মেয়েটির
সময়ের প্রেমে কেনো বঞ্চিত হবে এ মনিহার!
প্রেম তো নয় কাঙ্গালি, নয় অভাগী, নয় বিষণœতার নাম।
ভালোবাসায় রঙিন প্রজাপতি উড়ন্ত আহ্লাদী ডানায়
ছেলেটির উত্তাপে মেয়েটি জ্বলে ওঠে বারবার
তবুও মন কাঁদে অতীতের উত্তাপহীন বেদনায়।
বিরস বদনে দেয় না ধরা ছেলেটির পাশে
কেবলি ছলনায় প্রেম বিলায়
হয়! কত শত কথা মøান চিত্তে
মনে মনে এঁকে যায়।
বসন্ত এসে গেছে
প্রণব মজুমদার
বঞ্চনায় হারিয়েছে তোমার বিশ্বাস
মুকুল ঝরা হৃদয়ে জেগেছে বসন্ত
দূর নিস্তব্ধতায় নিমগ্ন ভালোবাসায়
মিশে যাওয়া স্নানে ছড়িয়েছ সৌরভ
তৃষ্ণার্ত রসমত্তা; সুখ নেয় ধীরে ধীরে।
মন কী উতলা-আসুক আনন্দ আবার?
মন বয়স নেই, আসে সে সাঁঝ বেলায়!
শীতল দিবারাত্রির নিবিড় শয্যার মন্থন
স্বপ্ন বিলাসে সন্ধ্যা-রাতে নামে পরম সুখ
বিচ্ছুরিত গোলাপী আলো; বসন্ত আগমন!
মিলন মাহেন্দ্রক্ষণ, বিন্দুস্থিত দুটি মন
হৃদয় অলিন্দে আবদ্ধ নিবিষ্ট মায়ার আয়ু
মলয় বাতাসের গোলাপরাঙা পুলক বসন্ত
শুকনো পাতার মতো কী ঝরে যাবে?
বাংলাদেশ : ভেতরে যার বর্ণমালা
মোহাম্মদ বিলাল
সূর্যটা লাল টকটকে
সূর্যটা গরম
সূর্যটায় জমে আছে রক্ত
সূর্যটার চারিদিকে ছড়ানো সবুজ
সূর্যটা আছে বুকের ভেতর
তাই ফুলে ওঠা সমুদ্রের মাঝেও
হারায় না পথ
বাংলাদেশ, নরম মাটির ভেতর
জেগে ওঠা মায়ের বুক
যখন দাঁতাল সময় মারমুখী হয়
তখনও গভীর কালো ঊনপঞ্চাশটি বর্ণমালা
আগুন হয়ে ওঠে
রাতের অন্ধকারে তার যেনো আলোর মিছিল
বাংলাদেশ- ভাষার ভেতরেই জন্ম
ভাষাটাই তো সবার-অন্যসব যার যার
আহা, বর্ণমালা, তমসার মুখোমুখি
দীপ্ত¯্রােতধারা, হৃৎপি-ে বইছে অবিরল
একুশের কবিতা-৩
আসাদ কাজল
একুশে রক্তাক্ত হাত বিশ কোটি প্রাণ
রাজার শাষণ- রাজ্য বর্ণমালা ঘিরে
অপরুপ জল ছুঁয়ে শহিদের ভিড়ে
শহিদের রক্ত দিয়ে সাজাই বাগান।
দ্রোহ বিরহ বিদ্রোহ রক্তে মিশে যায়
আমি কি শহিদ হবো? দেশদ্রোহী হবো?
যদি তাই হই শহিদের দেখা পাবো?
যুদ্ধশেষে শহিদেরা কোথায় হারায়?
একুশে রক্তাক্ত হাত মুছে দেই আমি
ভাষা বর্ণমালা দিয়ে গড়ি জন্মভূমি।
মৌনতা শিখিনি বলে-রক্তাক্ত হয়েছি
শহিদের রক্ত ছুঁয়ে শপথে রয়েছি।
একুশে রক্তাক্ত হাত বিশ কোটি প্রাণ
রক্তের ভিতর খুঁজি এ ভাষার ঘ্রাণ।
একুশের কান্না
রেখা আক্তার
একুশ মানে-ই রক্ত পলাশ
শিমুল ফোটে রক্তলালে
একুশ এলেই কৃষ্ণচূড়া
থোকায় ফোটে সবুজ ডালে।
খোকা! খোকা! আর্তনাদে
কাঁদে মায়ের নিভৃত মন
মায়ের সাথে ডুকরে ওঠে
শিমুল পলাশ তেরো পার্বণ।
অর্থ-বাণিজ্য: বিনিয়োগ বাড়াতে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি এফআইসিসিআই’র