একুশের ম্যানিফেস্টো
জাহিদ হায়দার
প্রলেতারিয়েত কি কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো পড়তে পারে?
যদি-বা পড়ে, বুঝতে পারে?
লজ্জা নেই। কবিতা লিখছি।
আমি কখনো তাদের পড়াতে যাইনি ‘বর্ণপরিচয়’।
‘জনগণের হাতে দিতে হবে রাষ্ট্রের শাসন ভার’,
দুই চার পৃষ্ঠা পড়তে জানা আমরা কখনো চাইনি
জনগণ বুঝে যাক বর্ণমালার রাজনৈতিক উত্থানপতন।
বিদ্যাসাগর আমাদেরই বলেছিলেন, ‘ফাজিল চালাক’।
নিজেদের কথার তা-বে,
তর্জনীর ব্যবহারে
পাথর ভাঙা কণ্ঠে বলেন,
‘শ্রমজীবীদের জন্যে এটা করতে হবে’,
‘ওটা করতে হবে’।
হবেগুলি গন্তব্যহীন। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত।
তাদের জন্যে পাঠশালা রেখেছি দিগন্তের দূরে।
‘শ্রেণিদ্বন্দ্ব’ কথাটা শুনেই
সাতাস ভাঙা ঘরের মানুষ চরের বালিতে ঘুমহীন ব’সে
ক্ষুধার্ত চোখে তারার জন্মে আলোর মৃত্যু দেখেন।
একুশের কবিতা
কামরুল হাসান
একুশ কেবল ফেব্রুয়ারির একটি তারিখ নয়,
একুশ প্রতিদিন,
হায়েনাদের চোয়াল থেকে প্রত্যহ কেড়ে নিতে হয়
ভাষার রঙিন
পাতাখানি, হায়েনারা বারবার হানা দেয় ঘরে
যখন সঙ্গীন
মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার অকাতরে
উত্তর দক্ষিণ
করে প্রদক্ষিণ মাকে মা বলে ডাকার আকুলতা
বাড়ে দিনদিন
ওরা বাংলাকে মুছে দিতে বাড়ায় ক্রূর হিংস্রতা
ওরা পরিচয়হীন।
জনীন বর্ণ
শামস হক
বাংলা বর্ণগুলো খাঁচা থেকে হঠাৎ বেরিয়ে পড়ল
এবং পরস্পর পরস্পরের কানে কানে কী যেন বলল
তারপর তারা মিলিয়ে গেল বাতাসে।
পানিবাহিত অনুবীজ হয়ে তারা ঢুকে পড়ল গুটিকয়েক
মানব দেহের রক্তে মাংসে এবং অস্থিমজ্জায়।
বর্ণে ঋদ্ধ ওই মানুষগুলো ক্রমান্বয়ে তেজদীপ্ত
এবং প্রতিবাদী হয়ে জানান দিল-
ধারণকৃত বর্ণ ব্যাতিরেকে কোনো রাজবর্ণ থাকবে না তাদের জমিনে।
হিংস্র ঈগলেরা এ বার্তা মানতে নারাজ
তির্যক নখরে গুটিকয়েক শব্দ বহন করে আনলো
পশ্চিমের গহ্বর থেকে
তারপর তাদেরকে রাজকার্যে নিয়োজিত হতে বলল আর
ঈগলেরা ঠোঁটে বন্দুক ধারণ করে দ্রুত গুলি ধর্ষণ করতে লাগলো
বাংলা বর্ণমালায়।
কিন্তু কী আশ্চর্য! বর্ণ-তনু অক্ষুণœ রয়ে গেল
ঝরে পড়ল শুধু ওই মানুষগুলো যারা তাদেরকে ধারণ করেছিল
বর্ণগুলোর লোহিত কণিকা রাজপথ রঞ্জিত করল!
ব্যথিত শোকাহত মেঘ তার অশ্রু দিয়ে
রক্তিম বর্ণগুলোকে ছড়িয়ে দিল মাটির ভাঁজে ভাঁজে
মাটি তাদেরকে মাতৃস্নেহে ধারণ করে বলল
তোমাদের বিশ্রাম এখানে নয়, মিনারে
অতঃপর শব্দগুলো দ্বিগি¦জয়ে উড়াল দিল
লাল সূর্যের পাশে দ-ায়মান মিনারে।
মিনার থেকে মিনারে স্ববেগে ধাববান বাংলা বর্ণমালা
ছুটে চলে মন্ট্রিল,অস্ট্রিয়া, উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু
জাভা, সুমাত্রা, নেফার অরণ্য থেকে শুরু করে আফ্রিকা,
আমাজান আর লোহিত সাগর, তারপর আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে
বিশ্বের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিল আত্মবিকাশের এক শাশ^ত বার্তা
বাংলা এক জনীন বর্ণ।
জননীর নাকে এখন সাদা রুমাল
খোরশেদ বাহার
যে শিশু বর্ণমালা শিখবে বলে সুর তুলেছে গলায়
তার জননীর নাকে এখন সাদা রুমাল
দূষণের আবর্তে আটকে আছে শুদ্ধস্বর
পলাশ আর কৃষ্ণচূড়ার রং বড্ড মেকি মনে হয়।
কালের গহ্বর থেকে তাই ফেব্রুয়ারিকে খুুঁজি।
সারারাত বর্ণবৃষ্টিতে ডুবে গেছে শহরের সব গলি
এলোমেলো বন্ধনে গ্রন্থিত নতুন নতুন শব্দ
অর্থহীন শব্দসকলের গা-জুড়ে নর্দমার দুর্গন্ধ
এই সব জঞ্জাল জট পাকিয়ে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়।
বৃষ্টির জলে ভাসছে অভিধানের পাতা সাথে নগরজীবন।
ডানাভাঙা বইমেলা
দুলাল সরকার
এ কেমন নীরবতা- চৈতন্য রহিত এক
একুশ যাপন, একুশের মাস? সন্ধি কৃত
অধরের মৌনব্রত পালনের নির্বাক
নতজানু একলব্য বর্ণবাদী দ্রোণের সম্মুখে
এ কি কোনো পাপ?পরাজিত সৈনিকের
ঘুম-ঘুম অবয়বে শ্মশান চিতার পাশে
পোড়ো বাড়ি, স্তব্ধ ইতিহাস- সর্বগ্রাসী
কুশলি থাবার ভয়ে ভীতু পা-ুলিপি?
বিষণœ, বিমর্ষ হিয়া- ফুঁপিয়ে, ফুঁপিয়ে কাঁদে
দুর্বল আবেগের মূর্খ পরিণাম শেষে
সত্য ও সাহসের মৃত কল- ছিন্ন শেকড়;
ডানা ভাঙা বইমেলা- ঝারফুক,মাদুলি ও
প্রতারক কু-লির প্রভাবাধীন কুলুপ আঁটা
মুখের নীরব- আহা,দধীচির হাড়ের মৌনতা,
শুধু শব বহনের কাল- কথা বন্দী কিছু কিছু
জ্ঞানপাপী দোকানে ও মঞ্চের আঁধারে
খোলস ছাড়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত
পরকীয়া মুখোশের আয়ুষ্কাল-
রক্ত পলাশের আহ্বান
মাহফুজ আল-হোসেন
যে দোয়েলটিকে সঙ্গীত শোনাবার জন্য খাঁচাবন্দি করে রাখা হয়েছিল তারও তো ছিল অনুভূতি প্রকাশক এক নিজস্ব ভাষাবোধ;
আর প্রাণান্ত প্রচেষ্টা ছিল প্রতি প্রত্যুষের কিচিরমিচির সভায় স্বীয় কণ্ঠকে পক্ষীকুলের বাইরেও সুপরিচিত করে তুলবার।
ব্যাধের সাধ্য কী বলো সে কেড়ে নেবে তার মুখনিঃসৃত থোকা থোকা অদম্য অমিত অক্ষর! কিংবা কেড়ে নেবে তার স্পর্ধিত অবাধ উড়ান...
আর সে কারণেই বুঝিবা কোনো কোনো ফাগুন সর্বনাশা সুন্দরের চিত্রকর্ম হয়ে ওঠে রক্ত পলাশের আহ্বানে;
আর খাঁচা ভাঙবার সম্মুখ সমরে প্রাণিত হয় অভাবিত আত্মদানের
গণ-অনুশীলনে!!
আর-এক ফালগুনে
চয়ন শায়েরী
আর-এক ফালগুন এসে বলেছিল কোনোদিন-
“আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হবো”
এখনও শিমুলেরা আগুন ছড়ায়
লজ্জায় কিংবা ক্রোধে
-ঐক্য নেই জেনে গেছে
আজও প্রভাতফেরি হয় আর-এক ফালগুনে-
নেই সেই ঐকতান হৃদয়ের অপেরা হাউজে
দ্বিগুণ হয়েছে দ্বিধার পোস্টার
অনৈক্যের ব্যানারের তলে,
খ- খ- সিমফনি তবু প্রভাতফেরির গান- বেসুরো বেজেছে
যদিও গন্তব্য শহিদমিনার,
হৃদয়শিমুলতলে নেই কোনো ঐক্য-
ঐকতান মুখ থুবড়ে পড়েছে
লোক দেখানোর প্রভাতফেরিতে।
ডাক
মুজিব ইরম
আর কিছু নয়
একবার শুধু নাম ধরে ডাক দিতে চাই
গলা খুলে
বিলম্বিত লয়ে
তুমি শুধু উত্তরে জানিও- আছি...
মনে হলে
তুমিও ডাকিও
এই কানে পৌঁছে যেনো মিষ্টি ডাক
তোমার সুরেলা গলা
নিজস্ব জবান...
দূর থেকে
আমি বড়ো তিয়াসি রয়েছি
মনে বড়ো চায়
আমারে ডাকিও তুমি মধুর বাংলা ভাষায়।
ফাগুনের ডাক
জুনান নাশিত
ফাগুনের ডাক নিস্তব্ধ হবে না কোনোকালে
বায়ান্নর সেইক্ষণ থেকে আজো
মুখরিত একুশের ভোর অথবা দুপুর
মায়াময় প্রতিটি দিনের ভাঁজে
সত্যের উজান হয়ে জড়িয়ে জড়িয়ে থাকে
কোকিলের ডাকে এক রক্তাপ্লুত ঘোর
দানা বাঁধে
উড়ে উড়ে চলে যায় রমনা ছাড়িয়ে আরো দূর দিগন্তের দিকে
যেখানে ফাগুন বিন্দু সবুজের অরিগামী স্মৃতির বেদনা ছুঁয়ে
ধীরে ধীরে পল্লবিত
হাজারো তর্কের ভিত কাঁপিয়ে
একুশের ভোর উচ্চকিত নাগরিক সভা থেকে নিমগ্ন প্রান্তরে।
আজো বর্ণমালা আর ভাষার আদর
একাত্তর পেরুনো পথের শেষে
সবুজে সবুজে বেড়ে ওঠে।
ছড়ায়, ছড়িয়ে থাকে
বিম্বিত, বিস্তৃত সবুজ মোড়ানো এই জনপদে।
আরাধ্য বন্দরে
মুশাররাত
আমি মনে হয় পৌঁছে গেছি
অসংখ্য বৃক্ষ আর নাম না জানা
নদী, মাঠ, গ্রাম পেরিয়ে
আমি ছিলাম সমুদ্রপাড়ে
দাঁড়িয়ে থাকা সংসার বিবাগী প্রাণ
জাহাজের ভেঁপু যাকে নিঃসঙ্গ করে দেয় আরও
বিষাদের কাছে নিঃসংকোচে আতœসমর্পণ করতে
যেন সোনালি ঝাড়বাতি
রূপবতী যুবতীর মতো ডেকে গিয়েছে অন্তহীন
সুদৃশ্য ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে
নক্ষত্রের ঝালোরে সাজানো বাসরঘরে
রচিত হয়েছে চূড়ান্ত গন্তব্যের স্বপ্ন
নোঙর তুলেছিলাম সেই নিযুত বছর আগে
আজ তোমার কাছেই রেখে গেলাম
প্রস্ফুটিত স্বপ্নের বাগান
আমি মনে হয় পৌঁছে গিয়েছি আরাধ্য বন্দরে
আজ ভোরে।
একুশের গান
বিনয় বর্মন
পলাশ বা কৃষ্ণচূড়া নয়
লাল হয়ে ফুটেছে হৃদয়
বসন্ত বাতাসে ভাসে
শব্দরেণু নৈঃশব্দ্যসুর
পুকুরে পদ্মচোখ
শেওলামিছিল
শিশিরে আল্পনা আঁকে কারা
কারা দেয় হৃদয় পাহারা
তবে কি নতুন দিন এলো
নাকি কেবলই দুঃসংবাদ
কে যায় রাজপথে নতুন শপথে
ওখানে রক্তের দাগ
ওখানে আগুনের আঁচ
তোমরা কি জানো
ওখানে আজও গান বাজে
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...
কিষাণেরা দিনভর কালো মেঘ চষে
কামরুল ইসলাম
জোছনাঢালা অন্ধকারে মনে হয় তোমারই চোখ
একঝাঁক উতল বাতাস নিয়ে ফিরে এলো আবার-
সংগীত একাকী বেজে ওঠে নির্জন ঘরের আড়ে
ওই ঘর কবরের সুরে সুরে ডুবে যেতে থাকে
সংগীত বলে- ওহে ঘর, ডুবে যাও গহীন অতলে
পাতাদের আদিম গজলে মুখরিত চারপাশ-
তোমার ফিরে আসার দিকে উদ্বাস্তু ধ্বনিরা
গোধূলিতে এঁকে যায় বালুচরী শাড়ির আঁচল
চখাচখির মরণদৃশ্যের ঘোর লাগা সন্ধ্যা-
সেই প্যানোরমিক উতল সময়ে কিষাণেরাদিনভর
মায়ের ভাষায় কালো মেঘ চষে, আর
বৃষ্টি¯œাত রক্তপাত আঙুলে জড়ায়-
কিংশুক, পারিজাত
মঈনুল হাসান
উদ্ধত শিমুলের রং
এখন অনেক বেশি সংযত-
কিংশুক, পারিজাত আর
রঙ ছড়ায় না আগুনের মতো।
চাপা ক্ষোভে আজ- বিষণœ সব,
বড় বেশি অবনত।
সে বেশি দিন আগে নয়
বিদ্রোহের কম্পমান স্বরে,
কম্পিত হয়েছিল প্রতিটি অক্ষর
আগুন জ্বলেছিল প্রতিটি ঘরে ঘরে।
অথচ অনেক দিনের পরে,
আবার ফুটেছে দ্যাখো
শহরের অলিগলিসহ সর্বত্র;
কিংশুক, পারিজাত, অশোক থরে থরে।
দ্রোহের চেতনা যেখানে নিঃশব্দ
বিদ্রোহের নান্দীপাঠ
আমরা ছাড়া আর কে গাইতে পারে?
ভালোবাসা ব্যাজস্তুতিময়
হাদিউল ইসলাম
এক অমূল্য চাঙ্গড়
আমার ওপর পেপারওয়েট
দু’হাতে পৃথিবী এমন জড়ানো আলিঙ্গন
সুখকর উষ্ণ প্রেমিকার মতো
সময় যথেষ্ট প্রতিকূল, বিকারে বিকারে-
নষ্টপ্রায়, তবু মায়ের মতোই মায়া
এক অমূল্য চাঙ্গড়
আমার ওপর পেপারওয়েট বসে আছে
অন্যদের সময়ে কেন যে
ভালোবাসতে শিখেছিলাম অন্তরে বাহিরে
দস্যুসব দৃশ্যত সুন্দর, মনোময় মহামারি
ভালোবাসা ব্যাজস্তুতিময়
নিঃসঙ্গতা
নাহিদ পারভেজ
লেখা হয় না বহুদিন।
কী লিখি- কার জন্য- কেন?
বহুদিন হয় না লেখা।
যাকে নিয়ে লিখবো বলে ভেবেছি তুমুল
সে তো চলে গেছে নক্ষত্র ছিঁড়ে।
সাদা খাতা শূন্য পড়ে আছে-
টেবিলে ধুলোর পরত।
উদাস তাকিয়ে থাকি অসীমে-
ভাবি, বহুদিন পর তুমি আজ
দীর্ঘ-নরম-কোমল চুল
রৌদ্রে শুকিয়ে নেবে।
বৃষ্টির ঝাপটা এসে ভেজায় জানালার কাচ।
যখন সবই এলোমেলো-
নিমগ্ন ভাবনায় খুঁজি মুখশ্রী তোমার-
মায়াবী, সরল।
মনে পড়ে তোমাকে ভীষণ-
তুমি ছাড়া আজীবন নিঃস্ব ও একা
সীমাহীন বিপন্ন জীবন।
শব্দকোষ
অলভী সরকার
বেড়ে উঠছে আত্মজা।
শিখছে শব্দমালা, আধো আধো
একান্ত উচ্চারণরীতি আছে তার;
অন্ধকার জানা হলে নাম রাখে “বন্ধ কার?”
ডিমকে বলে “দিম”, রুটিকে “উইটি”,
সতীর্থ বন্ধুর নাম অতটা সহজ নয়,
যুক্তাক্ষরে ভারী। তবু কন্যা আমার
“ভালোবাসি” স্পষ্ট করে বলে।
ছায়াচ্ছন্ন গোধূলির আদর্শ গণতান্ত্রিক
আকাশের দিকে চেয়ে বিস্মিত হয়,
আসমানি, ধূসর, সোনালি হলুদ, গাঢ় লাল;
প্রশস্ত নগরপথে মহুয়ামথিত আট ফাল্গুন।
সম্মিলিত অভিধানে জুড়েছি আলপনা;
লাখ লাখ আনকোরা শব্দের কোলাজ।
সময়
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
সময় নিজেই এক ধূর্ত গিরগিটি
জন্মের কৃষ্ণবিবর থেকে শুরু করে কখনও লাল কখনও ধূসর
প্রলেপে সে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে প্রতিকূল পরিবেশে
পানির চেয়েও টলমলে তরলিতরূপে। সময় চিরকাল
রঙ পাল্টায়। রঙই তার ঢাল, রঙই তার কালের
কোতোয়াল, গলার উত্তরীয়।
জীবনের নানা রঙ নিজের নয়, সময়ের আরোপিত
সময়ই জীবনকে রঙ দিয়ে রূপ দেয় কালের প্রেক্ষিতে
রঙ কখনও জীবনকে বাঁচায় কখনও ফাঁসায়
কখনও মেকি দর্শনে ধোঁকা দিয়ে বুঝায়, রঙই জীবন।
এক একটি দিনের গায়ে এক এক রঙের প্রলেপ দিয়ে
সময় উদযাপন করে আত্মশ্লাঘা
সুসময়ের রঙ চাপিয়ে দেহে অসময়ও হয়ে ওঠে নায়ক
প্রতারণার পরিকল্পিত ফাঁদে সে আটকায় জীবনকে
গিরগিটিরূপে পৃথিবীর খিড়কিটি সে আটকিয়ে রাখে
রামধনুর সাতরঙে।
সময় কখনও সার্কাসের ক্লাউন কখনও অধিকর্তা
নৈবদ্য
জাফর সাদেক
তার পরও ভাষাকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না
তার মাধুর্যের নৈকট্য থেকে
এখানে আছে অক্ষরের জন্মক্ষরণের দায়
যেমন কম্পিত শীতের রাতে বিচ্ছিন্ন নয়
সবাক কুয়াশার সপ্তনাও
ভাষার মধুরতা হারালে অক্ষর ব্যক্ত করতে চায়
পৃথিবীর চোখে ‘সহনীয়’ বলে আছে এক অধ্যায়
অন্তত নগ্ন-পাগলের পরিধানে চট-বস্ত্র দরকার
আদিগন্ত সরষে ফুলের কুয়াশার ভ্রম
এমন ভ্রমণে তোমাকে দিলাম অক্ষরের নৈবদ্য
আসলে দিলাম কিন্তু কথা ও লেখার সৌন্দর্যের দায়
তুমি তখন এ-ভোরকে নিতে পারো শত কবিতার চরণ
নিবিড় প্রার্থনায় হতে পারো ক্ষরণে মধুর যাপন
বলবো সেক্ষেত্রে- সূর্যোদয় না-হোক তোমার ঋতুকালে
পাপীরা এখানে এসো না
দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
যারা পাপী তারা এখানে এসো না।
যারা পাখি হতে পারো না- শিশু হতে পারো না
তারা এখানে এসো না।
এখানে শুধু কবি মন আসতে পারে- ভাবুক মন পারে-
পারে জলদ গভীর ভালবাসার হৃদয়।
যারাজটিল তারা এখানে এসো না।
জটিল কুটিল তারা দূরে থাকো।
সহজ সরল সুন্দরেরা এসো।
যারা শান্তভাব তারা এখানে এসো।
যারা প্রার্থনায় বসতে পারো নিমগ্ন চিত্তে-
বিশুদ্ধ আনন্দে- তারা এখানে এসো।
যারা প্রশ্ন করে তারা হেরে যায়- বিশ্বাসীরা জিতে যায়-
বিশ্বাসীরা শহিদ মিনারে এসো।
শেকড় ছেঁড়ার শব্দ-০১
পারভেজ আহসান
¯্রােতে ভাঙে বোধের কণা
শ্যাওলায় ঢাকে প্রাণের অক্ষর-
শহিদ মিনারের সিঁড়ি-
মলুয়াউপাখ্যান।
‘ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি’ শুনে
শিশুদের ঘুম আসে না
তারা শুনে-
‘রক-এ-বাই বেবি অন দ্য ট্রি টপ
হোয়েন দ্য উইন্ড ব্লোজ,দ্য ক্রেডল উইল রক’
মাগধী প্রাকৃত ঘুমায় বালির গভীরে।
সিঁড়ি, মানুষ কিংবা আমি
শাখাওয়াত তানভীর
সিঁড়ি ভাঙছি, উপরে উঠছি
সরে যাচ্ছি, পিছু হটছি
একা হচ্ছি, মৃত্যু আঁকছি
সিঁড়ি ভাঙছি, নিচে নামছি
ক্লেদ মাখছি, ডুবে যাচ্ছি
নিখোঁজ হচ্ছি, জীবন খুঁজছি
সিঁড়ি দেখছি, মানুষ দেখছি
জীবন দেখছি, মৃত?্যদেখছি
দেখছি সিঁড়ি বেয়ে-
মানুষের নিত?্য ওঠা-নামা
মানুষের ভিড়ে নিজেকে খুঁজছি
কিন্তু কোথাও তো দেখছি না
আমি হয়তো মানুষেরই মতো-
ভাঙছি সিঁড়ি, অথচ মানুষ নই!
বৈরী সময়ের রুদ্রাক্ষ
রফিকুল ইসলাম আধার
অপেক্ষা আর অভিমানগুলো
আজ পথ হারায়-
বৈরী সময়ের রুদ্রাক্ষে
ঘষে ঘষে মুছে যায় সব।
চারপাশে জমে থাকে শুধু
বোবা স্তব্ধতার পাহাড়;
যেখানে নিভৃতে বেড়ে ওঠা প্রেমও
অবিশ্বাসের কাঠিন্যে ক্রমশ ম্লান হয়,
অনাদরে লুটিয়ে পড়ে ধুলোয়।
বুকের হাওয়া
আদ্যনাথ ঘোষ
এই যে ফাগুন, এই যে আগুন, এই যে আমার বাংলা ভাষা,
দাঁড়িয়েছে তিলোত্তমায়, বুকের মাঝে, মুখের কথায়।
আলপনাতে বইয়ের পাতায়
সবখানে চাই, সবকালে চাই
নতুন পাতায় বেড়ে ওঠায়, মায়ের মুখের চেনা ভাষায়।
চাইনি আকাশ, চাইনি পাহাড়,
চাইনি সাগর, রাজার প্রাসাদ।
চাইছি শুধু বুকের হাওয়া বাংলা ভাষার বর্ণমালা।
আর কিছু না। আর কিছু না।
বাংলা আমার চলা বলার খেলা করার চেনা উঠোন।
অর্থ-বাণিজ্য: বিনিয়োগ বাড়াতে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি এফআইসিসিআই’র