image
শিল্পী : রাজীব রায়

বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চা

রকিবুল হাসান

জন্ম নিলেই তো মানুষ হয় না। অনেক চেষ্টায় অনেক সাধনায় মানুষ হয়ে উঠতে হয়। এ সাধানার প্রধান মন্ত্র হলো মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা। নিজের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিচর্চা একে অন্যের পরিপূরক। এর সাথে যুক্ত হয় সদাচার। কেননা, মাতৃভাষাচর্চা ব্যতীত দেশপ্রেম ও মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো কঠিন। মাতৃভাষা চর্চার মাধ্যমেই সংস্কৃতিবান হয়ে-ওঠা সম্ভব। সুতরাং সভ্য রাষ্ট্রের অন্যতম পরিচয় হচ্ছে সে দেশের মানুষ কীভাবে নিজের মাতৃভাষা চর্চা করে, সংস্কৃতিকে কতোটা ধারণ করে এবং এর মাধ্যমে ব্যক্তিসত্তার আদর্শ বিনির্মাণে সচেষ্ট থাকে। উল্লেখ্য, পৃথিবীর সকল প্রাচীন, মধ্যযুগীয় এবং আধুনিক সভ্যতার মূল ভিত্তি হিসেবে সব সময় সংস্কৃতির অনন্যতা ও স্বকীয়তাকে বিবেচনা করা হয়।

সংস্কৃতি মানুষের জীবনধারার প্রতিফলন। আমাদের আচার-আচরণ, মূল্যবোধ, রীতিনীতি, রুচি, ব্যবহার, বস্তুগত উপাদানসমূহ সংস্কৃতি। সমাজের মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়তই সাংস্কৃতিক পরিম-লের মধ্যে বেড়ে উঠি। সাধারণ অর্থে সংস্কৃতি বলতে কৃষ্টি, সংস্কার, বিশ^াস ইত্যাদি বোঝানো হলেও সমাজবিজ্ঞানে এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানে সংস্কৃতি পূর্ণাঙ্গ জীবনধারাকে বোঝায়। সংস্কৃতির কারণেই মানুষের ব্যক্তিজীবন এবং সমাজজীবন অন্যদের থেকে স্বতন্ত্রতা পায়।

সেজন্য সংস্কৃতির প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কেননা, সংস্কৃতিই মানুষকে সত্যিকার মানুষে এবং সামাজিক জীবে পরিণত করে। মূল্যবোধ-আদর্শ-সুস্থ জীবনবোধ-মন-মানসিকতা-চিন্তা-ভাবনার অধিকারী হতে হলে সংস্কৃতির কোনো বিকল্প নেই। সংস্কৃতিই মানুষকে বিদগ্ধ রুচির মানুষে পরিণত করতে পারে। আবার সাংস্কৃতিক পরিবেশ যদি সুস্থ না হয়, অপ-সংস্কৃতি যদি সমাজজীবনে চেপে বসে তাহলে সমাজ কলুষিত হয়ে ওঠে, অশুভ চিন্তার মানুষের জন্ম হয়। সুস্থধারার সমাজজীবনে তখন অসুস্থতা এসে ভর করে। একটা আদর্শ সাংস্কৃতিক সমাজ গড়ে ওঠার জন্য ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা, ধারণা, ধর্ম ও বিশ^াস, রীতিনীতি, আচার-আচরণ, অভ্যাস, সামাজিক মূল্যবোধ, উৎসব-পার্বণ এগুলো অপরিহার্য। আর এগুলো মিলেই তো গড়ে ওঠে সংস্কৃতি। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য বাতাসের প্রয়োজন যেমন অপরিহার্য, অথচ এই বাতাসকে কিন্তু দেখা যায় না। অনুভব করা যায়। সংস্কৃতির ভূমিকাও বাতাসের অনুরূপ। সংস্কৃতি ছাড়া কখনোই মূল্যবোধ সম্পন্ন বিদগ্ধ রুচির মানুষের গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। দূষিত বাতাসে যেমন বাঁচা কঠিন, বসবাস করা অসহনীয়, তেমনি অপসংস্কৃতিতে মান-সম্মান, মূল্যবোধ-সুস্থ চিন্তাভাবনা ধারণ করে রুচিবোধসম্পন্ন সুশীল মানুষে পরিণত হওয়া সম্ভব নয়। সংস্কৃতির কারণেই চিন্তা-ভাবনা-মন-মানবিকতা-মূল্যবোধে পরিণত হয়ে ওঠে মানুষ।

বাংলায় সংস্কৃতি ব্যবহার শত শত বছর পূর্বে হলেও, পাশ্চাত্যে এর ব্যবহার চালু হয়েছে আরও আগে থেকেই। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা থেকে বর্তমান ইউরোপীয় সভ্যতা উচ্চতর এটা স্বীকার্য হলেও, প্রাচীন গ্রিক সংস্কৃতি থেকে বর্তমান ইউরোপীয় সংস্কৃতি কিন্তু উচ্চমার্গের নয়। গ্রিক মহাকবি হোমারের সময়কালের যুদ্ধসামগ্রী আর বর্তমান যুদ্ধসামগ্রী এক নয়। বর্তমানের যুদ্ধসামগ্রী বহুগুণে উন্নত ও অত্যাধুনিক। আবার প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ থেকে ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ যে শ্রেষ্ঠ তা গ্রহণযোগ্য নয়। এরিস্টটলের ‘পয়েটিকস’-এর সাথে লাস্কির ‘এ গ্রামার অব পলিটিকস’ তুলনা করলেও একই কথা প্রযোজ্য হবে। মূলকথা, সংস্কৃতির একটি উৎস থাকে-সেই উৎস থেকে সংস্কৃতি বিভিন্নরূপে বিবর্তিত হয়-এক কথায় সংস্কৃতি স্থিতিশীল কোন বিষয় নয়- বরং এটি গতিশীল। পাশ্চাত্যে সংস্কৃতি ‘কালচার’ হিসেবে ব্যবহৃত, বাংলায় সেটা ‘কৃষ্টি’ ও ‘উৎকর্ষ’ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পাশ্চাত্যে ‘কালচার’ যে অর্থে ব্যবহৃত হতো, সেই একই অর্থে বাংলায় ‘কৃষ্টি’ ও ‘উৎকর্ষ’ ব্যবহৃত হয়েছে। ‘কালচার’-এর পরিভাষা হিসেবেই শব্দ দুটিকেই গ্রহণ করা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ সে সময়ে ‘কৃষ্টি’র পরিবর্তে ‘উৎকৃষ্টি’ ব্যবহার অধিক যৌক্তিক মনে করেছেন এবং পত্র-পত্রিকায় এটা নিয়ে লেখালেখিও করেছেন। স্মরণযোগ্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিন্তু তখন সংস্কৃতির ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা দেননি। তিনি ইংরেজি ‘কালচার’ শব্দটির ‘পরিভাষা’ করেছিলেন মাত্র। তবে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি বর্তমানে যে ব্যাপক ব্যবহৃত-এতে রবীন্দ্রনাথের কৃতিত্ব রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘কৃষ্টি’র পরিবর্তে যখন ‘উৎকৃষ্টি’ ব্যবহারের পক্ষে লিখছিলেন, সে-সময়ে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি ব্যবহারের জন্য রবীন্দ্রনাথের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের এ ব্যাপারটিকে গুরুত্বপূর্ণ মান্য করে ক্ষিতিমোহন সেনের মতামত গ্রহণ করেন। ক্ষিতিমোহন সেনের ইতিবাচক সম্মতি পেয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি ব্যবহার শুরু করেন। এরপর শব্দটি ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। এতে ‘উৎকৃষ্টি’ শব্দটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উৎকৃষ্টি শব্দের মধ্যে যে সীমাবদ্ধ গ-ি ছিল, তা বিশালতায় রূপ নেয় সংস্কৃতি শব্দের মধ্যে। সংস্কৃতি শব্দের বহুল ব্যবহারে ‘কৃষ্টি’, ‘কর্ষণ’ ও ‘উৎকর্ষ’-এ শব্দগুলো বর্তমানে সেভাবে ব্যবহার হয় না। অনেকে এ শব্দগুলোকে সংস্কৃতি শব্দের সমার্থক কিংবা কাছাকাছি হিসেবে মনে করেন। আসলে সংস্কৃতি শব্দের সঙ্গে এ শব্দগুলোর অনেক পার্থক্য। এসব দীর্ঘ গবেষণার বিষয়। সহজভাবে দেখলে ব্যাপারটি দাঁড়ায়- বাঙালি সংস্কৃতি বলতে ‘বাঙালিয়ানা’। এই বাঙালিয়ানার ভেতর আছে, আমাদের যাপিত জীবনের সরলতা। এর কারণ বহুবিধ। বাংলাদেশের জন্মসূত্রের মূলে গ্রোথিত আছে দীর্ঘ সময়কালে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শাসকের ভূমিকা ও তাদের ভিন্ন ভিন্ন রুচিবোধ। ফলে এদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক বিকাশ কখনো সমান্তরাল পথে ঘটেনি। শাসন-শোষণের নানা পর্বে গ্রহণ ও বর্জনের মাধ্যমে সময়ের দাবিকে গুরুত্ব দিয়েই সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের বিকাশ ঘটেছে। সে কারণ বাংলাদেশের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বহুমিশ্রিতি বহুরূপী চিত্র পরিলক্ষিত হয়। মূলত এই ‘বহুরূপী’ রূপটিই বাঙালি সংস্কৃতিতে সৌন্দর্যের আভারূপে ফুটে উঠেছে। নানা জাতি ও নানা বর্ণের সংমিশ্রণেই বাঙালি সংস্কৃতির অভিনব এক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে পেরেছে। এখানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র-সব মিলেমিশে একাত্ম হয়ে উঠেছে। এই একাত্ম সম্মিলিত স্বরূপটি ধরে রাখার ক্ষেত্রেও বাঙালির বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা আছে। কারণ এই একাত্ম মিলনমেলায় বহুভাবে বহুবার রাজনৈতিক আক্রমণ ঘটেছে। রাজনৈতিক স্বার্থে একটি জাতিকে দ্বিখ-িত করা হয়েছে। কিন্তু সংস্কৃতির শক্তি এতোটাই যে, এই দ্বিখ-িতার পরেও বাংলাদেশের বাঙালি ও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি- এদের মৌলিক পরিচয় এক এবং অক্ষুণœ রয়েছে- আমরা বাঙালি। রাষ্ট্রীয়ভাবে বাঙালিকে পৃথক করা সম্ভব হলেও, বহুকালের ভাষিক বন্ধনের যে শক্তিমত্তা-তা ছিন্ন করা বা খ-ন করা সম্ভব নয়। বাংলা ভাষার প্রাণের যে শক্তি, সেই শক্তিতে- সেই ভাষিকতায় বাঙালি একই সত্তা ও সূত্রে গাঁথা।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও রাজনীতিতে বাঙালি সংস্কৃতি সবসময় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের চিন্তা-চেতনা-মন-মননে সংস্কৃতির ব্যাপারটা রক্তকোষের মতো যুক্ত। এটিকে বাদ দিয়ে সুস্থধারার শিক্ষা ও রাজনীতি চিন্তা করা যায় না। বাঙালির হাজার বছরের যে সংস্কৃতি প্রবহমান নদীর মতো বহমান, তা থেকে সামান্য বিচ্যুতি ঘটলে রক্তক্ষরণের মতো যন্ত্রণা অনুভূত হয়। বর্তমানে যে শিক্ষাব্যবস্থা ও তথ্যপ্রযুক্তির যে বিশ^ায়ন, সেখানে ভিন দেশি সংস্কৃতি অনায়াসে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ভেতর ঢুকে পড়ছে। সেসব সংস্কৃতির প্রতি বর্তমান তরুণ প্রজন্ম নেশাগ্রস্তের মতো আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে। একই দেশে শিক্ষাব্যবস্থা বিভিন্নমুখী হওয়ার কারণে ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতিনির্ভর আমাদের যে শিক্ষাব্যবস্থা, সেখানেও বিদেশি ভাষা সংস্কৃতির নগ্ন দখলদারিত্ব শক্তভাবে ঘটছে। তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিজের দেশ নয়, বিদেশে। ফলে তারা নিজের দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-ভাষার প্রতি গুরুত্ব হারিয়ে বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। যে কারণে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি বিদেশি ভাষাশিক্ষার শত শত প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। সেদিকেই বর্তমান প্রজন্মের আকর্ষণ বেশি। এর কারণও স্পষ্ট এদেশের তরুণ সমাজ বর্তমানে নিজের দেশে ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন লালন করে না। যে কারণে তাদের মধ্যে ভাষা-সংস্কৃতি-দেশপ্রেম গড়ে উঠতে পারছে না। আমাদের বাংলা ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনালালিত ও কাক্সিক্ষত যে দেশ, তার সফল বাস্তবায়ন ঘটাতে ব্যর্থ হচ্ছি আমরা। শিক্ষা ব্যবস্থায় নানারকম অব্যবস্থাপনা, উন্নত কারিকুলামের অভাব, গবেষণার ঘাটতি ও গুরুত্বহীনতা, বিদেশি ভাষাপ্রীতি-শিক্ষকসমাজের ক্ষমতাপ্রীতি ও অর্থপ্রীতি-দুর্নীতি ও অসততা- তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বড় ধরনের হতাশা তৈরি করেছে। রাজনীতি যখন দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির না হয়ে ব্যক্তিক লোভ-লালসা-হীনস্বার্থ উদ্ধারের পন্থা হয়ে ওঠে, তখন সেই রাজনীতিতে দেশের কোনো কল্যাণ নিহিত থাকে না, যে রাজনীতি শুধু ক্ষমতায় আরোহণের সিঁড়ি হিসেবে নির্ণিত ও বিবেচিত হয় তখন স্বাভাবিকভাবে দেশের স্বপ্ন হতাশার কালো অন্ধকারে পরিণত হয় তা অস্বীকার করা কঠিন। আমাদের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র এবং হাজার বছরের ঐতিহ্য সুন্দর আগামীর যে পথ নির্মাণ করবে বলে এতো ত্যাগ-তিতিক্ষা- তা থেকে আমরা দূরে সরে যাচ্ছি; যা সত্যিকার অর্থে গভীর বেদনাবোধের সঞ্চার করে। অথচ একসময় এদেশের মানুষ এদেশটাকেই নিজের স্বপ্নের দেশ হিসেবে স্বপ্ন দেখেছে। এ দেশটার জন্য জীবন দিয়েছে। এই দেশে জন্ম এই দেশেই মৃত্যু কামনা করেছে। কিন্তু বর্তমানে এ স্বপ্ন দূরাশা হয়ে উঠেছে। নিজের ভাষার প্রতি অবহেলা। নিজের দেশের নামে দুর্নাম বদনাম। দেশটাকে গড়ে তোলার দায়িত্ব না নিয়ে পলায়নবৃত্তিকে কৃতিত্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আর এসবের পিছনে সদাচারী মানুষের অভাব যারা সংস্কৃতিকে ধারণ করে ব্যক্তি স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে দেশাত্ববোধে জাগ্রত করা খুব প্রয়োজন।

আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-শিক্ষা ভয়াবহ অবক্ষয়ের ঝড়ে কবলিত। শিকড়হীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের উত্তর প্রজন্ম। পুঁজিবাদী সমাজে বিদেশি আগ্রাসন এত প্রবল হয়ে উঠে অপসংস্কৃতিকে সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ বানিয়ে ফেলে এবং মানুষ প্রবলভাবে আত্মকেন্দ্রিক ও কোনো একটি জাতিগোষ্ঠীর প্রতি অনুরক্ত হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় নিজের মানুষের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ ও অন্যের প্রতি গভীর মমতাবোধ। শুরু হয় বিশৃঙ্খলা। কিন্তু সংস্কৃতির সঠিক চর্চাই মানুষকে পারে সদাচারী করে তুলতে। তবে একথাও সঠিক অন্য কোনো দেশ বা জাতির সংস্কৃতির প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পাশাপাশি এটিও সঠিক অন্য কোনো দেশ বা জাতির প্রকৃত বা উৎকৃষ্ট সংস্কৃতি কখনও অন্যের ওপর ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালাতে পারে না। বরং যেসব সংস্কৃতি পুঁজিবাদের সম্প্রসারণে ভূমিকা বা এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে তারা সাময়িক উন্মাদনার মাধ্যমে কোনো রাষ্ট্রের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে অপসংস্কৃতিকে চাপিয়ে দেয়।

আচার-আচরণের মাধ্যমেই মানুষের মাঝে মূল্যবোধের সৃষ্টি হয়। আবার এ মূল্যবোধ পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং কখনও ঐসব সংস্কৃতি দ্বারা পরিশীলিত হয়। আচার-আচরণের নিয়ন্ত্রণ যখন সংস্কৃতির মাধ্যমে তৈরি হয় তখনই মানুষ সদাচারী হয়ে ওঠে। সদাচার মানুষের অন্যতম একটি মহৎ গুণ। এটি মানুষের অন্তর জয়ে সাহায্য করে। তাই সদাচারকে অনেকেই চরিত্র গঠনের নান্দনিক বাহন বলেন। সদাচারী মানুষ সর্বদা বিনয়ী হয় এবং পরিবারের সকল সদস্যদের প্রতি যেমন দায়িত্ববান হন তেমনি সমাজ-রাষ্ট্র ও পৃথিবীর সকল মানুষের প্রতি মমতাবোধসম্পন্ন হয়ে থাকেন। সদাচারী মানুষ ব্যক্তিস্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে জনকল্যাণের কথা ভাবেন এবং করেন।

বাঙালির সংস্কৃতিকে যদি সময়কাল বিবেচনায় দেখি, তাহলে আঠারো শতক পর্যন্ত ছিল ধর্মকেন্দ্রিক। বৈষ্ণবসাহিত্য, ইসলাম ধর্মবিষয়ক রচনা ও অধ্যাত্ম-তত্ত্বাশ্রিত প্রণয়োপ্যাখ্যান-এসব সেসময়ের সাহিত্য। সেই ধর্মকেন্দ্রিক সাহিত্যের ভেতরই কবি বড়– চ-ীদাস বলেছেন, ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। মানবিক এ উচ্চারণের ভেতর দিয়েই মানুষের মানবিক বোধের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। যার ফলে, একজন অবৈষ্ণবকবি লিখতে পেরেছেন রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদ, অমুসলমান লেখক দাভুদ মিরবাঘেরি লিখতে পেরেছেন হাসান-হোসেনের মর্মন্তুদ-কাহিনী নিয়ে ‘কারবালা-কাহিনী’। বাঙালি সংস্কৃতির এই মানবিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অবক্ষয়ের যে ভয়াল থাবা তীব্র গতিতে আমাদের ওপর ধেয়ে আসছে, তা থেকে রক্ষার জন্য শিক্ষা-রাজনীতি-সংস্কৃতিতে মানবিকতা-দেশপ্রেম-ভাষাপ্রেম খুব বেশি প্রয়োজন। অবক্ষয়ের এ ভয়াল গ্রাস মানুষকে মানবিক ও সদাচারী হতেও বাধা প্রদান করে এবং ভিন্ন পথে মানুষকে পরিচালিত করে অস্থিতিশীল ও নাজুক সমাজ সৃষ্টি করে। দৈনন্দিন আচার-আচরণ-চিন্তা-চেতনা-মানসিক গঠন ও পরিবর্তন এবং নৈতিকতাবোধ সংস্কৃতির সাথে যেমন জড়িত তেমনি একজন মানুষের স্বকীয় হয়ে ওঠার পিছনে সদাচারের ভূমিকা অনন্য ও অপরিহার্য।

সম্প্রতি