যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের শতাধিক দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এই তালিকায় বাংলাদেশের নামও রয়েছে। এখন থেকে বাংলাদেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় ৩৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে। এতদিন এই শুল্কহার ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ, যা এখন দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেল।
তবে কিসের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরাও ধোঁয়াশার মধ্যে পড়েছেন। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দাবি এটা পাল্টা শুল্কারোপ, কারণ বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে ‘৭৪ শতাংশ শুল্ক’ আছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে বাংলাদেশে ৭৪ শতাংশ শুল্কারোপের যে দাবি, এটা ট্রাম্প প্রশাসন কীভাবে হিসাব করল? প্রশ্ন বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের। আমেরিকার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সুপারিশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮৪০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। এর মধ্যে তৈরি পোশাকের পারিমাণ ৭৩৪ কোটি ডলার। নতুন করে সম্পূরক শুল্ক আরোপের ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বড় ধাক্কা খেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে খাত-সংশ্লিষ্টদের মনে।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সংবাদকে বৃহস্পতিবার বলেন, ‘শুল্কারোপের জেরে বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী চাহিদা কমে যেতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানিতে পড়তে পারে।’
তবে নতুন এ শুল্কারোপের ফলে মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না কারণ বাংলাদেশের প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের ওপরেও একই ধরনের শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে এর হার বাংলাদেশের তুলনায় বেশি।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি কমতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের কারণে আমেরিকার মূল্যস্ফীতি বাড়বে। দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। এতে আমেরিকার বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপীও চাহিদা কমে যেতে পারে। তার একটি নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানিতে পড়তে পারে।’
‘অন্যায্য বাণিজ্য অনুশীলন’ মোকাবিলা!
ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, মার্কিন রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে যেসব দেশ উচ্চ শুল্কের বাধা তুলে রেখেছে, তাদের তথাকথিত সেই ‘অন্যায্য বাণিজ্য অনুশীলন’ মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন পদক্ষেপ। নতুন নীতির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র সমস্ত আমদানির ওপর প্রাথমিকভাবে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে, যাকে বলা হচ্ছে বেইজ লাইন ট্যারিফ। আর যেসব দেশ হোয়াইট হাউসের ভাষায় ‘কারসাজি’ করে ডলারের মান নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং সুরক্ষামূলক শুল্ক ও অশুল্ক বাধা আরোপ করে রেখেছে, তাদের ক্ষেত্রে উচ্চ হারের সম্পূরক শুল্ক প্রযোজ্য হবে।
বাংলাদেশ সময় বুধবার রাত ২টার পর হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন সম্পূরক শুল্কহার ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের ঘোষণায় বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ মার্কিন পণ্যের ওপর ‘৭৪ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক’ আরোপ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় এখন থেকে বাংলাদেশি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে ৩৭ শতাংশ ‘হ্রাসকৃত সম্পূরক শুল্ক’ আরোপ করা হবে।
ভারতের পণ্যের ওপর ২৬ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প, যা বাংলাদেশ বা ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশের তুলনায় কম। ভিয়েতনামের পণ্যের ওপর ৪৬ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা এসেছে। কম্বোডিয়ার পণ্যে ৪৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার পণ্যে ৪৪ শতাংশ, পাকিস্তানের পণ্যে ২৯ শতাংশ এবং মায়ানমারের পণ্যে ৪৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। চীনা পণ্যে ৩৪ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়েছে হোয়াইট হাউজের তালিকায়। ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের তথ্য বলছে,
বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব পণ্য রপ্তানি হয় তার মধ্যে রয়েছে কৃষিপণ্য (খাদ্যশস্য, বীজ, সয়াবিন, তুলা, গম এবং ভুট্টা), যন্ত্রপাতি এবং লোহা ও ইস্পাত পণ্য। আর বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি পণ্যের মধ্যে আছে তৈরি পোশাক, জুতা, টেক্সটাইল সামগ্রী ও কৃষিপণ্য।
ধোঁয়াশায় অর্থনীতিবিদরা, দ্রুত আলোচনা শুরুর সুপারিশ
বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে ৭৪ শতাংশ শুল্কারোপ করেছে বলে দেশটি যেটা দাবি করেছে সেটা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ঠিক কীভাবে এই হিসাবটা করল তা অস্পষ্ট।
এ বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমান সংবাদকে বলেন, ‘বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের তুলা রপ্তানির পঞ্চম বৃহত্তম বাজার। এই তুলা রপ্তানিতে বাংলাদেশের কোনো শুল্ক নেই। বাংলাদেশ স্ক্র্যাপ আমদানি করে আমেরিকা থেকে। সেখানেও শূন্য শুল্ক। পেট্রোলিয়াম গ্যাস আমদানিতে ৩১ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। এই হচ্ছে প্রধান প্রধান আমদানি। তাহলে আমেরিকা কেন ৭৪ শতাংশের কথা বলছে, সেটা জানতে চাওয়া দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, যারা তাদের পণ্য ব্যবহার করে রপ্তানি করবে, তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়া হবে। বাংলাদেশ আমেরিকার তুলা ব্যবহার করে করে পোশাক বানিয়ে রপ্তানি করে। ফলে এ বিষয়টি টিকফা-র আলোচনায় তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশের যেসব ব্র্যান্ড ক্রেতা রয়েছে, তাদের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনকে অবহিত করা যেতে পারে যে বাংলাদেশ আমেরিকার তুলা ব্যবহার করে আমেরিকাসহ অন্যান্য বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে।’
একই মন্তব্য করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ডিরেক্টর খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের হিসাব অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে বাংলাদেশের ৭৪ শতাংশ শুল্কারোপের বিষয়টি মেলাতে পারছি না। তবে তারা হয়তো শুধু শুল্কের বিষয়টি নয়, দুদেশের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এটা নির্ধারণ করেছে।’
এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং শুল্কারোপের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি উইং চালুর সুপারিশ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘খুব দ্রুত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটা উইং খুলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করা দরকার। আমাদের জানা দরকার তারা কোন কোন বিষয় হিসাব করে এই অঙ্কটা বের করেছে। আলোচনার মাধ্যমে হয়তো শুল্ক কমিয়ে আনা সম্ভব।’
প্রাইভেট সেক্টরকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি সংবাদকে বলেন, ‘এই শুল্কারোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের দাম অনেকটা বেড়ে যাবে। আর বাংলাদেশ বেশির ভাগ রপ্তানি করে তৈরি পোশাক। এসব পণ্যের ক্রেতা তুলনামূলক স্বল্প আয়ের। তাই পণ্যের দাম যখন বাড়বে তখন তারা পণ্য কম ক্রয় করবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন ট্রেডবডিগুলোর কাজ হবে বায়ারদের সঙ্গে আলোচনা করা। শুল্কারোপের পর ক্রেতাদের ওপর যে বাড়তি দামের বোঝা উঠবে সেটা যেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি বায়াররাও কিছুটা বহন করেন। এতে একই সঙ্গে ক্রেতা, যুক্তরাষ্ট্রের বায়ার ও বাংলাদেশের সাপ্লাইয়ার সবাই লাভবান হবেন।’
ক্রেতারা যেন অন্য দেশে চলে না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখার সুপারিশ করে তিনি সংবাদকে বলেন, ‘বায়াররা যেখানে কম মূল্যে পণ্য পাবে তারা সেখান থেকেই পণ্য কিনবে। সম্প্রতি সারা বিশ্বের অনেক দেশেই শুল্কারোপ করা হলেও আফ্রিকার দেশগুলোতে তুলনামূলক কম। তাই অনেক বায়ার হয়তো সেসব দেশ থেকে আমদানি করতে পারে। সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন বাংলাদেশের বায়াররা অন্য দেশে চলে না যায়।’
সরকারের পক্ষ থেকে কী বলা হচ্ছে?
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি এক পোস্টে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ (যুক্তরাষ্ট্রের) পণ্যে শুল্ক পুনর্বিবেচনা করতে কাজ করছে এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনআরবি) শুল্ক যুক্তিসঙ্গত করার জন্য বিকল্পগুলো দ্রুত চিহ্নিত করছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং আমাদের বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা আশা করি, মার্কিন সরকারের সঙ্গে আমাদের চলমান আলোচনা শুল্ক বৃদ্ধির সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সরকার মনে করে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে চলমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা এই সমস্যার সমাধানে সহায়ক হবে, যদিও এখনও এটি পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। ফলে, বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক বৃদ্ধি একটি জটিল বাণিজ্যিক সমস্যা তৈরি করতে পারে, যার জন্য সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।’
ব্যবসায়ীরা কী বলছেন?
যেসব আমেরিকান ক্রেতা পণ্য আমদানি করেন তারা অন্য দেশে চলে যেতে পারেন এমনটা আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। এই বিষয়ে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মো. মহিউদ্দিন রুবেল সংবাদকে বলেন, ‘বায়াররা কিন্তু দিনের শেষে যেখানে সস্তা পাবে সেখানেই যাবে। তারা বিকল্প দেশগুলো খুঁজে বের করবে। বাংলাদেশে যেমন এসেছিল সস্তা শ্রমের জন্য, সস্তা মূল্যের জন্য। একইভাবে তারা এখন যেখানে সস্তা পাবে সেখানেই যাবে। তাই আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই শুল্ক সহনীয় পর্যায়ে নিতে না পারি তাহলে প্রতিযোগীদের থেকে পিছিয়ে পড়ব।’
রপ্তানি ডাইভারসিফিকেশন করা জরুরি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। ডাইভারসিফিকেশন করতে হবে। আমাদের নতুন মার্কেটে যেতে হবে। যদি নতুন মার্কেটে যেতে পারি তাহলে এই ভয়টা পেতে হতো না। নতুন পণ্য রপ্তানি করতে হবে।’
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘যে ট্যারিফ বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা হয়েছে সেটা আমাদের ওপর হওয়ার কথা না। যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানির এভারেজ ডিউটি ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। আমেরিকায় কিন্তু পণ্যের আইটেম অনুযায়ী ডিউটি। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফ্ল্যাট ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। আমেরিকায় পলেস্টারে একরকম, নিটে একরকম, উলে একরকম, ট্রাউজারে একরকম। একেকটায় একেক রকম ডিউটি। কিন্তু গড়ে সেখানে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। ধরা যাক, যুক্তরাষ্ট্র বছরে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের তৈরি পোশাক আমদানি করে। সেখানে ১০ শতাংশ আমদানি হয়তো কমে যাবে। ফলে আমাদের ওপর এর প্রভাব অবশ্যই পড়বে, কারণ আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার হলো আমেরিকা।’
শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের শতাধিক দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এই তালিকায় বাংলাদেশের নামও রয়েছে। এখন থেকে বাংলাদেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় ৩৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে। এতদিন এই শুল্কহার ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ, যা এখন দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেল।
তবে কিসের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরাও ধোঁয়াশার মধ্যে পড়েছেন। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দাবি এটা পাল্টা শুল্কারোপ, কারণ বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে ‘৭৪ শতাংশ শুল্ক’ আছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে বাংলাদেশে ৭৪ শতাংশ শুল্কারোপের যে দাবি, এটা ট্রাম্প প্রশাসন কীভাবে হিসাব করল? প্রশ্ন বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের। আমেরিকার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সুপারিশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮৪০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। এর মধ্যে তৈরি পোশাকের পারিমাণ ৭৩৪ কোটি ডলার। নতুন করে সম্পূরক শুল্ক আরোপের ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বড় ধাক্কা খেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে খাত-সংশ্লিষ্টদের মনে।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সংবাদকে বৃহস্পতিবার বলেন, ‘শুল্কারোপের জেরে বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী চাহিদা কমে যেতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানিতে পড়তে পারে।’
তবে নতুন এ শুল্কারোপের ফলে মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না কারণ বাংলাদেশের প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের ওপরেও একই ধরনের শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে এর হার বাংলাদেশের তুলনায় বেশি।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি কমতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের কারণে আমেরিকার মূল্যস্ফীতি বাড়বে। দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। এতে আমেরিকার বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপীও চাহিদা কমে যেতে পারে। তার একটি নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানিতে পড়তে পারে।’
‘অন্যায্য বাণিজ্য অনুশীলন’ মোকাবিলা!
ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, মার্কিন রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে যেসব দেশ উচ্চ শুল্কের বাধা তুলে রেখেছে, তাদের তথাকথিত সেই ‘অন্যায্য বাণিজ্য অনুশীলন’ মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন পদক্ষেপ। নতুন নীতির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র সমস্ত আমদানির ওপর প্রাথমিকভাবে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে, যাকে বলা হচ্ছে বেইজ লাইন ট্যারিফ। আর যেসব দেশ হোয়াইট হাউসের ভাষায় ‘কারসাজি’ করে ডলারের মান নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং সুরক্ষামূলক শুল্ক ও অশুল্ক বাধা আরোপ করে রেখেছে, তাদের ক্ষেত্রে উচ্চ হারের সম্পূরক শুল্ক প্রযোজ্য হবে।
বাংলাদেশ সময় বুধবার রাত ২টার পর হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন সম্পূরক শুল্কহার ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের ঘোষণায় বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ মার্কিন পণ্যের ওপর ‘৭৪ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক’ আরোপ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় এখন থেকে বাংলাদেশি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে ৩৭ শতাংশ ‘হ্রাসকৃত সম্পূরক শুল্ক’ আরোপ করা হবে।
ভারতের পণ্যের ওপর ২৬ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প, যা বাংলাদেশ বা ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশের তুলনায় কম। ভিয়েতনামের পণ্যের ওপর ৪৬ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা এসেছে। কম্বোডিয়ার পণ্যে ৪৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার পণ্যে ৪৪ শতাংশ, পাকিস্তানের পণ্যে ২৯ শতাংশ এবং মায়ানমারের পণ্যে ৪৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। চীনা পণ্যে ৩৪ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়েছে হোয়াইট হাউজের তালিকায়। ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের তথ্য বলছে,
বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব পণ্য রপ্তানি হয় তার মধ্যে রয়েছে কৃষিপণ্য (খাদ্যশস্য, বীজ, সয়াবিন, তুলা, গম এবং ভুট্টা), যন্ত্রপাতি এবং লোহা ও ইস্পাত পণ্য। আর বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি পণ্যের মধ্যে আছে তৈরি পোশাক, জুতা, টেক্সটাইল সামগ্রী ও কৃষিপণ্য।
ধোঁয়াশায় অর্থনীতিবিদরা, দ্রুত আলোচনা শুরুর সুপারিশ
বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে ৭৪ শতাংশ শুল্কারোপ করেছে বলে দেশটি যেটা দাবি করেছে সেটা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ঠিক কীভাবে এই হিসাবটা করল তা অস্পষ্ট।
এ বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমান সংবাদকে বলেন, ‘বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের তুলা রপ্তানির পঞ্চম বৃহত্তম বাজার। এই তুলা রপ্তানিতে বাংলাদেশের কোনো শুল্ক নেই। বাংলাদেশ স্ক্র্যাপ আমদানি করে আমেরিকা থেকে। সেখানেও শূন্য শুল্ক। পেট্রোলিয়াম গ্যাস আমদানিতে ৩১ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। এই হচ্ছে প্রধান প্রধান আমদানি। তাহলে আমেরিকা কেন ৭৪ শতাংশের কথা বলছে, সেটা জানতে চাওয়া দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, যারা তাদের পণ্য ব্যবহার করে রপ্তানি করবে, তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়া হবে। বাংলাদেশ আমেরিকার তুলা ব্যবহার করে করে পোশাক বানিয়ে রপ্তানি করে। ফলে এ বিষয়টি টিকফা-র আলোচনায় তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশের যেসব ব্র্যান্ড ক্রেতা রয়েছে, তাদের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনকে অবহিত করা যেতে পারে যে বাংলাদেশ আমেরিকার তুলা ব্যবহার করে আমেরিকাসহ অন্যান্য বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে।’
একই মন্তব্য করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ডিরেক্টর খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের হিসাব অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে বাংলাদেশের ৭৪ শতাংশ শুল্কারোপের বিষয়টি মেলাতে পারছি না। তবে তারা হয়তো শুধু শুল্কের বিষয়টি নয়, দুদেশের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এটা নির্ধারণ করেছে।’
এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং শুল্কারোপের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি উইং চালুর সুপারিশ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘খুব দ্রুত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটা উইং খুলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করা দরকার। আমাদের জানা দরকার তারা কোন কোন বিষয় হিসাব করে এই অঙ্কটা বের করেছে। আলোচনার মাধ্যমে হয়তো শুল্ক কমিয়ে আনা সম্ভব।’
প্রাইভেট সেক্টরকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি সংবাদকে বলেন, ‘এই শুল্কারোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের দাম অনেকটা বেড়ে যাবে। আর বাংলাদেশ বেশির ভাগ রপ্তানি করে তৈরি পোশাক। এসব পণ্যের ক্রেতা তুলনামূলক স্বল্প আয়ের। তাই পণ্যের দাম যখন বাড়বে তখন তারা পণ্য কম ক্রয় করবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন ট্রেডবডিগুলোর কাজ হবে বায়ারদের সঙ্গে আলোচনা করা। শুল্কারোপের পর ক্রেতাদের ওপর যে বাড়তি দামের বোঝা উঠবে সেটা যেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি বায়াররাও কিছুটা বহন করেন। এতে একই সঙ্গে ক্রেতা, যুক্তরাষ্ট্রের বায়ার ও বাংলাদেশের সাপ্লাইয়ার সবাই লাভবান হবেন।’
ক্রেতারা যেন অন্য দেশে চলে না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখার সুপারিশ করে তিনি সংবাদকে বলেন, ‘বায়াররা যেখানে কম মূল্যে পণ্য পাবে তারা সেখান থেকেই পণ্য কিনবে। সম্প্রতি সারা বিশ্বের অনেক দেশেই শুল্কারোপ করা হলেও আফ্রিকার দেশগুলোতে তুলনামূলক কম। তাই অনেক বায়ার হয়তো সেসব দেশ থেকে আমদানি করতে পারে। সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন বাংলাদেশের বায়াররা অন্য দেশে চলে না যায়।’
সরকারের পক্ষ থেকে কী বলা হচ্ছে?
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি এক পোস্টে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ (যুক্তরাষ্ট্রের) পণ্যে শুল্ক পুনর্বিবেচনা করতে কাজ করছে এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনআরবি) শুল্ক যুক্তিসঙ্গত করার জন্য বিকল্পগুলো দ্রুত চিহ্নিত করছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং আমাদের বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা আশা করি, মার্কিন সরকারের সঙ্গে আমাদের চলমান আলোচনা শুল্ক বৃদ্ধির সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সরকার মনে করে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে চলমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা এই সমস্যার সমাধানে সহায়ক হবে, যদিও এখনও এটি পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। ফলে, বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক বৃদ্ধি একটি জটিল বাণিজ্যিক সমস্যা তৈরি করতে পারে, যার জন্য সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।’
ব্যবসায়ীরা কী বলছেন?
যেসব আমেরিকান ক্রেতা পণ্য আমদানি করেন তারা অন্য দেশে চলে যেতে পারেন এমনটা আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। এই বিষয়ে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মো. মহিউদ্দিন রুবেল সংবাদকে বলেন, ‘বায়াররা কিন্তু দিনের শেষে যেখানে সস্তা পাবে সেখানেই যাবে। তারা বিকল্প দেশগুলো খুঁজে বের করবে। বাংলাদেশে যেমন এসেছিল সস্তা শ্রমের জন্য, সস্তা মূল্যের জন্য। একইভাবে তারা এখন যেখানে সস্তা পাবে সেখানেই যাবে। তাই আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই শুল্ক সহনীয় পর্যায়ে নিতে না পারি তাহলে প্রতিযোগীদের থেকে পিছিয়ে পড়ব।’
রপ্তানি ডাইভারসিফিকেশন করা জরুরি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। ডাইভারসিফিকেশন করতে হবে। আমাদের নতুন মার্কেটে যেতে হবে। যদি নতুন মার্কেটে যেতে পারি তাহলে এই ভয়টা পেতে হতো না। নতুন পণ্য রপ্তানি করতে হবে।’
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘যে ট্যারিফ বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা হয়েছে সেটা আমাদের ওপর হওয়ার কথা না। যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানির এভারেজ ডিউটি ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। আমেরিকায় কিন্তু পণ্যের আইটেম অনুযায়ী ডিউটি। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফ্ল্যাট ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। আমেরিকায় পলেস্টারে একরকম, নিটে একরকম, উলে একরকম, ট্রাউজারে একরকম। একেকটায় একেক রকম ডিউটি। কিন্তু গড়ে সেখানে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। ধরা যাক, যুক্তরাষ্ট্র বছরে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের তৈরি পোশাক আমদানি করে। সেখানে ১০ শতাংশ আমদানি হয়তো কমে যাবে। ফলে আমাদের ওপর এর প্রভাব অবশ্যই পড়বে, কারণ আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার হলো আমেরিকা।’