alt

উপ-সম্পাদকীয়

হাসপাতালের সেবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালা

আব্দুল মান্নান খান

: শুক্রবার, ২৩ জুলাই ২০২১

দৈনিক সংবাদে ১২ জুলাই ২০২১ তারিখে একটা খবরের শিরোনাম, ‘মানুষ করোনাকে স্বাভাবিক জ্বর-সর্দি ভাবছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী’। ভেতরে বলছে, বর্তমানে করোনা সংক্রমণ শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলেই বেশি ছড়িয়ে পড়ছে। গ্রামের মানুষ করোনাভাইরাসকে স্বাভাবিক জ্বর-সর্দি ভাবছে। রোগীর পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলেই হাসপাতালে আসছেন। কিন্তু ততক্ষণে চিকিৎসকদের আর কিছুই করার থাকছে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক’। মন্ত্রী মহোদয় যথার্থই বলেছেন, রোগীর পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলেই হাসপাতালে আসছেন। একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেছেন, মানুষ ক্লিনিক ও হাসপাতালে আসতে ভয় পায়’। কেন ভয় পায়, কেন রোগীর পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলেই হাসপাতালে আসে যখন ডাক্তারদের আর কিছু করার থাকে না এসব কথার জবাব কে দেবে। মন্ত্রী মহোদয় আপনাকেই তো দিতে হবে।

মানুষ করোনাকে স্বাভাবিক জ্বর-সর্দি ভাবছে। এমন একটা ঘাতক ব্যাধিকে কীভাবে তারা এমন সহজ করে ভাবতে পারল! এ ভাবনা তো আর এমনি এমনি উদয় হতে পারে না। কে না চায় ভালো চিকিৎসা, কে না চায় যথা সময়ে চিকিৎসা। কে চায় তার প্রিয়জনকে বিনা চিকিৎসায় মরতে দিতে। মানুষ আজ ঠেকতে ঠেকতে কোন উপায় না দেখে এরকম একটা মর্মান্তিক ভাবনায় এসে দাঁড়িয়েছে। সর্দি জ্বর, হাঁচি, কাশি, হাপানি তো এ অঞ্চলের মানুষ করোনা আসার পরে কেবল দেখছে না। এটা আমাদের ভ্যাপসা আবহাওয়ার সঙ্গে মজ্জাগত। খুবই পরিচিত অসুখ-বিসুখ এসব। এর জন্য টুটকা-ফাটকা ওষুধও ছিল মানুষের জানা। আর এখন শুনছে এগুলো মরণব্যাধী করোনার উপসর্গ। যদি বিদেশে যাতায়াতের বিষয়টা না থাকত এদেশের মানুষ করোনাকে কোন আমলই দিত না ওই স্বাভাবিক জ্বর-সর্দি ভাবত এটা ঠিক। সেই বিদেশে যাতায়াতের জন্য করোনা সনদ নিয়ে কী কান্ডটাই না হয়ে গেল দেশে। একেবারে হাসপাতাল খুলে বসে ভুয়া সনদ বেচা-কেনার বাণিজ্য শুরু করল আমাদের সুপুত্ররা। বিদেশের বিমানবন্দর থেকে মাথা হেট করে ফিরে আসতে হলো দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। প্রবেশও নিষিদ্ধ করে দেয় কোন কোন দেশ। এখনও শুনছি একখানে করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসছে তো আরেকখানে করালে নেগেটিভ আসছে। বলতে পারেন হাজার হাজার রিপোর্টের মধ্যে এমন কিছু ঘটনা ঘটতেই পারে। আমি বলব না, ঘটতে পারে না। যন্ত্র ভুল করতে পারে না করলে বুঝতে হবে ওই যন্ত্রে গোলমাল।

যাহোক, এখন টিকাই এর প্রতিষেধক। রাস্তায় রাস্তায় টেবিল পেতে গণহারে টিকা দিন সঙ্গে একটা কাগজ ধরিয়ে দিন তাকে টিকা দেয়া হয়েছে বলে। টিকা সংগ্রহ করুন। দেশে বসে থাকার কোন দেরকার নেই যেসব দেশ টিকা উৎপাদন করছে সেখানে গিয়ে বসে থাকেন। প্রয়োজনে লবিস্ট নিয়োগ করুন। টিকা যারা উৎপাদন করছেন তারা তো গুদামজাত করে রাখার জন্য উৎপাদন করছেন না। তারা যদি কোন শর্ত দেয় চোখ বন্ধ করে সেই শর্ত মেনে নিন। বিদ্যুৎ আজ কীভাবে এ অবস্থায় এসেছে একবার মনে করুন। চোখ বন্ধ করে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল বলে আজ ঢাকা মহানগরীতে বিদ্যুৎ যায়-ই না বললেই চলে। আর দেশব্যাপী চাহিদার পরিমাণ কীভাবে মিটছে একবার ভাবুন। তাই যেভাবেই হোক টিকা পেতে হবে কথা এই একটাই। দেশে টিকা উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে। সে চেষ্টা অব্যাহত রেখে যেকোন উপায়ে কোটি কোটি ডোজ টিকা আমদানির ব্যবস্থা করুন যেখান থেকে হোক যে দেশ থেকেই হোক। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার মতো ঘরে ঘরে টিকা পৌঁছে দিন। হাসপাতালে সেবা বাড়ান আইসিইউর সিট বাড়ান। মানুষকে জোর করে ঘরে আটকানোর বৃথা চেষ্টা কোন কাজে লাগবে না।

যারা সরকারি আধা সরকারি স্বায়ত্তশাষিত করপোরেশন ব্যাংক রীমা সরকারি ছোট-বড় মেঘা প্রকল্পে চাকরি-বাকরি করছেন তারা মাসের শেষে বেতনাদি পাচ্ছেন কাজ কিছু করে বা না করে। লক্ষ লক্ষ মানুষ যারা দোকানপাটে কাজ করে খেত, সেই নিম্ন বা নিম্ন মধ্যবত্তি আয়ের মানুষদের জীবন কীভাবে কাটছে- তা ওই মাসিক বেতন যারা পাচ্ছেন তারা বুঝবেন না। বিত্তবানরা আয়েশি জীবনযাপন করছেন আর কীভাবে করোনামুক্ত থাকতে পারবেন তা ভাবছেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাচ্ছেন। তাদের কথা আলাদা। আমার পাড়ায় লন্ড্রি চালায় যে লোকটা তার দোকানে সে ছাড়া আরও দুজন লোক কাজ করত। এখন এতটা সময় ধরে তাদের কোন আয়-উপার্জনের ব্যবস্থা নেই। ওই লোকটাকে আবার দোকানের ভাড়াও দিতে হচ্ছে। নিজের পরিবার আছে। কতদিন, বলেন আর কতদিন লাগবে ওই মানুষটার রাস্তায় নামতে। বলছেন করোনাভাইরাস গ্রামে ছড়িয়ে গেছে। কীভাবে গেছে। একবার ভাবুন তো এ যাবত কতবার ঘোষণা দেয়া হয়েছে অমুক তারিখ থেকে লকডাউন হবে, অমুক তারিখ থেকে দূরপাল্লার যানবাহন চলবে না। কি নির্মম, এ কারণেই কত মানুষ পদদলিত হয়েই মারা গেছে ফেরিঘাটে। গ্রামে করোনাভাইরাস তো এই শহর থেকেই গেছে। গার্মেন্ট কারখানায় ছুটি দিয়ে দেয়া হলো আবার তাদের ফিরিয়ে আনা হলো। অফিসাদি খোলা আবার খোলা না। এর মাঝে আবার ঈদ উপলক্ষে এক সপ্তাহের জন্য সবকিছু শিথিল করা হয়েছে। তারপর আবার লকডাউন বা সাটডাউন হবে। আমাদের অবশ্য লকডাউন সাটডাউন বলা হয় না, বলা হয় সীমিত বিধিনিষেধ ও কঠোর বিধিনিষেধ। এভাবেই হাতের তীর বেরিয়ে গেছে। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে নানা নাম ধারণ করে করোনাভাইরাস আরও ছড়াবে। এখন রাস্তা একটাই টিকা, টিকা আর টিকা। আর হাসপতালে সেবা জোরদার করা। সচেতনতা বৃদ্ধির যে প্রয়াস চালানো হয়েছে-এটা যথেষ্ট হয়েছে বলতে হবে। মোবাইল ফোন সবার হাতে, টিপলেই সাবধান করে দিচ্ছে কী করতে হবে কী করতে হবে না। এর চেয়ে বড় প্রচার আর কী হতে পারে। রাস্তার যেখানে সেখানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল এখন সেটা শিথিল হয়ে গেল কেন। এটা সচল রাখতে হবে। মাস্ক ব্যবহার করার ব্যাপারে ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার ব্যাপারে কথা একটু আলাদা করেই বলতে হয়। এলোমেলো ভাবে হোক আর মাঝেমধ্যে হোক দেখা যাচ্ছে সবই চলছে কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তালা। করোনাকালের শুরুর দিকে সেই মহাআতঙ্কের সময়েও আমরা একটা খবরে স্বস্তি পেয়েছিলাম যে, করোনায় শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে না। বলতে চাচ্ছি এখনও স্বস্তিতে রয়েছে বিষয়টা। এ ব্যাপারে আজ শুক্রবার ১৬ জুলাই ২০২১-এর দৈনিক সংবাদের রিপোর্টটা দেখা যাক, ‘দেশে করোনা সংক্রমণে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ২২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে’। সেখানে বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে ১১টা ধাপের মধ্যে শেষের চারটা ধাপ এরকম, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ১২ জন, ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ছয়জন, ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে একজন এবং শূন্য থেকে ১০ বছরের মধ্যে মারা গেছে একজন। এ অবস্থায় সাহস করতেই পারেন কর্তৃপক্ষ স্কুল খুলে দেয়ার। দেশ জাতির বৃহত্তর সঙ্গে ঝুঁকি তো নিতেই হবে সরকারকে।

আমাদের বিরাট একটা সাফল্য ছিল যে, আমাদের প্রায় সব শিশুকে স্কুলমুখী করা গিয়েছিল। এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে সরকারের ভালো কিছু পদক্ষেপ। যেমন সব ছাত্রছাত্রীকে বিনা মূল্যে বই বিতরণ, গরিব বাবা-মায়ের সন্তানদের উপবৃত্তি প্রদান ও কোন কোন এলাকায় স্কুলের সব শিশুকে কিছু টিফিন দেয়া। সে সাফল্য আজ ম্লান হতে বসেছে। ২০২০ সালের মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ওরা আর সেই লেখাপড়ার সংস্পর্শে নেই। প্রকৃত অর্থে খেটে খাওয়া শ্রমিক শ্রেণীর জনগোষ্ঠী আর ভাবতে পারছে না যে, তাদের সন্তানদের আর লেখাপড়া হবে। তারা আবার স্কুলে যাবে। আকাশ-বাতাস থেকে লেখাপড়া ধরার ক্ষমতা তাদের নেই যে তারা সে আশা করবে। স্কুল নেই তো তাদের ওই লেখাপড়ার প্রসঙ্গ বন্ধ। তা আবার দিন-মাস না প্রায় দুই বছর হতে চলল বন্ধ।

গ্রামের ছেলেমেয়েরা একত্রে মিশছে খেলাধুলা করছে যাদের ঘরে টেলিভিশন নেই তারা হাটেবাজারে গ্রামের চায়ের দোকানে গিয়ে ভিড় করছে কিন্তু যাচ্ছে না কেবল স্কুলে। যে সচেতনতার কথা বলা হচ্ছে সেদিকে একটু শক্ত নজর রেখে গ্রামের স্কুল খুলে দিলে গ্রাম্য জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা অন্তত এ জগৎ থেকে ছিটকে পড়বে না। শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদেরও ওই একই অবস্থা। বাকি শিশুরা ভার্চুয়াল। কেমন ভার্চুয়াল, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিষয়ের পর বিষয় তারা মোবাইলের সামনে বসে শিক্ষকের কথা শুনছে। বলছে খুবই কম। অভিভাবক মহোদয়রা তাতেই খুশি কারণ তাদের কিছু করার নেই। কেউ মোবাইল ছেড়ে কম্পিউটারের বড় স্ক্রিনের সামনে বসে শুনছে। গত বছরই এ কলামে আমাদের শিশুদের পঠনদক্ষতা নিয়ে লিখেছিলাম। আমাদের শিশুরা পঠনদক্ষতায় অনেক পিছিয়ে। এনিয়ে দেশের বিশেষজ্ঞ সুধীজনদের এক গোলটেবিল বৈঠকের উদ্ধৃতি তুলে ধরে বলেছিলাম এই মহাদুর্যোগকালে অনলাইনে শিশুদের আপনারা সব শিখাতে পারবেন না। আপনারা শুধু ওদের পঠনদক্ষতা বুদ্ধির কাজটা করে যান। ওরা পড়বে আপনারা শুনবেন। পড়তে না পারলে পড়তে সহযোগিতা করবেন। ছোট্ট যন্ত্রের মাধ্যমে শিশুদের পরীক্ষা পাসের পড়া পড়াতে যাবেন না। পড়তে পারলে সব পারবে সব শিখতে পারবে। অভিভাবকদেরও একাজটা করতে অনুরোধ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, দেখেন, প্রাইমারি পর্যায়ের (হতে পারে ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত) একজন শিক্ষার্থী মিনিটে কয়টা শব্দ উচ্চারণ করে পড়তে পারে তার পাঠ্যবই থেকে। যদি দেখেন ৩০-৪০টা পারে তো বুঝবেন ঠিক আছে। কথাটা আমার না দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ সুধীজনদের। বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই এখানে।

এখন শিশুরা যা করছে এর পেছনে শিশুদের লেখাপড়া নিয়ে যে বাণিজ্য চলে আসছিল নোট-গাইড কোচিং আর সহায়ক বইয়ের নামে সেটাই আবার এভাবে অনলাইনে হাত বাড়িয়েছে কি না কে বলবে।

[লেখক : প্রাবন্ধিক]

উন্নত বাংলাদেশের কাণ্ডারি

সংশপ্তকের জন্য জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা: স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

অপার সম্ভাবনার পর্যটন

ভাবমূর্তির উন্নয়ন

ধর্ম যখন বর্ম

ফল ও সবজি রপ্তানি এবং কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউজ

আফগানিস্তানে তালেবান ও ভূলুণ্ঠিত মানবাধিকার

বিমানবন্দরে পিসিআর ল্যাব স্থাপন প্রসঙ্গে

আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য

পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থিদের নেতৃত্বে কারা আসছেন

বোনেরা প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হলে কী করবেন?

ছবি

তালেবানরা উদারপন্থি হচ্ছে কি

ছবি

কারিকুলাম প্রণয়নের চেয়ে বাস্তবায়নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ

দুর্বিনীত লোভের ফাঁদ

কিশোর শিক্ষার্থীদের কোভিড ভ্যাকসিন

সমাপনী পরীক্ষা এবার থেকেই বাদ নয় কেন

ইটিং ডিজঅর্ডার সম্পর্কে জানা জরুরি

ধনী হওয়ার মন্ত্র ও বোকা বানানোর যন্ত্র

মুজিব বাহিনী ও মুজিববাদ

দেশের ইস্পাত শিল্প

আদিবাসীদের শ্মশানও দখল হয়ে গেল

অন্ধকার অতল গহ্বরে আফগান জনগণ

সংকটে রবিদাস জনগোষ্ঠী

প্রশাসনকে মাটির কাছাকাছি আসতে হবে

তালেবানদের সরকার গঠন

যেখানে সময় এসে মানুষকে ধরা দেয়

পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী রাজনীতির ঘূর্ণাবর্ত

ছবি

শিক্ষা দিবস

সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শূন্যতা ও জঙ্গিবাদ

ঐতিহাসিক সত্য উন্মোচনে ট্রুথ কমিশন

’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন ও আজকের শিক্ষা

আন্তর্জাতিক ওজন দিবস

ভূমিসংক্রান্ত অপরাধ দমনে আইন প্রণয়ন জরুরি

ছবি

শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা

বেশি দামে সার বিক্রিতে প্রতারিত হচ্ছেন কৃষক

tab

উপ-সম্পাদকীয়

হাসপাতালের সেবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালা

আব্দুল মান্নান খান

শুক্রবার, ২৩ জুলাই ২০২১

দৈনিক সংবাদে ১২ জুলাই ২০২১ তারিখে একটা খবরের শিরোনাম, ‘মানুষ করোনাকে স্বাভাবিক জ্বর-সর্দি ভাবছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী’। ভেতরে বলছে, বর্তমানে করোনা সংক্রমণ শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলেই বেশি ছড়িয়ে পড়ছে। গ্রামের মানুষ করোনাভাইরাসকে স্বাভাবিক জ্বর-সর্দি ভাবছে। রোগীর পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলেই হাসপাতালে আসছেন। কিন্তু ততক্ষণে চিকিৎসকদের আর কিছুই করার থাকছে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক’। মন্ত্রী মহোদয় যথার্থই বলেছেন, রোগীর পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলেই হাসপাতালে আসছেন। একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেছেন, মানুষ ক্লিনিক ও হাসপাতালে আসতে ভয় পায়’। কেন ভয় পায়, কেন রোগীর পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলেই হাসপাতালে আসে যখন ডাক্তারদের আর কিছু করার থাকে না এসব কথার জবাব কে দেবে। মন্ত্রী মহোদয় আপনাকেই তো দিতে হবে।

মানুষ করোনাকে স্বাভাবিক জ্বর-সর্দি ভাবছে। এমন একটা ঘাতক ব্যাধিকে কীভাবে তারা এমন সহজ করে ভাবতে পারল! এ ভাবনা তো আর এমনি এমনি উদয় হতে পারে না। কে না চায় ভালো চিকিৎসা, কে না চায় যথা সময়ে চিকিৎসা। কে চায় তার প্রিয়জনকে বিনা চিকিৎসায় মরতে দিতে। মানুষ আজ ঠেকতে ঠেকতে কোন উপায় না দেখে এরকম একটা মর্মান্তিক ভাবনায় এসে দাঁড়িয়েছে। সর্দি জ্বর, হাঁচি, কাশি, হাপানি তো এ অঞ্চলের মানুষ করোনা আসার পরে কেবল দেখছে না। এটা আমাদের ভ্যাপসা আবহাওয়ার সঙ্গে মজ্জাগত। খুবই পরিচিত অসুখ-বিসুখ এসব। এর জন্য টুটকা-ফাটকা ওষুধও ছিল মানুষের জানা। আর এখন শুনছে এগুলো মরণব্যাধী করোনার উপসর্গ। যদি বিদেশে যাতায়াতের বিষয়টা না থাকত এদেশের মানুষ করোনাকে কোন আমলই দিত না ওই স্বাভাবিক জ্বর-সর্দি ভাবত এটা ঠিক। সেই বিদেশে যাতায়াতের জন্য করোনা সনদ নিয়ে কী কান্ডটাই না হয়ে গেল দেশে। একেবারে হাসপাতাল খুলে বসে ভুয়া সনদ বেচা-কেনার বাণিজ্য শুরু করল আমাদের সুপুত্ররা। বিদেশের বিমানবন্দর থেকে মাথা হেট করে ফিরে আসতে হলো দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। প্রবেশও নিষিদ্ধ করে দেয় কোন কোন দেশ। এখনও শুনছি একখানে করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসছে তো আরেকখানে করালে নেগেটিভ আসছে। বলতে পারেন হাজার হাজার রিপোর্টের মধ্যে এমন কিছু ঘটনা ঘটতেই পারে। আমি বলব না, ঘটতে পারে না। যন্ত্র ভুল করতে পারে না করলে বুঝতে হবে ওই যন্ত্রে গোলমাল।

যাহোক, এখন টিকাই এর প্রতিষেধক। রাস্তায় রাস্তায় টেবিল পেতে গণহারে টিকা দিন সঙ্গে একটা কাগজ ধরিয়ে দিন তাকে টিকা দেয়া হয়েছে বলে। টিকা সংগ্রহ করুন। দেশে বসে থাকার কোন দেরকার নেই যেসব দেশ টিকা উৎপাদন করছে সেখানে গিয়ে বসে থাকেন। প্রয়োজনে লবিস্ট নিয়োগ করুন। টিকা যারা উৎপাদন করছেন তারা তো গুদামজাত করে রাখার জন্য উৎপাদন করছেন না। তারা যদি কোন শর্ত দেয় চোখ বন্ধ করে সেই শর্ত মেনে নিন। বিদ্যুৎ আজ কীভাবে এ অবস্থায় এসেছে একবার মনে করুন। চোখ বন্ধ করে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল বলে আজ ঢাকা মহানগরীতে বিদ্যুৎ যায়-ই না বললেই চলে। আর দেশব্যাপী চাহিদার পরিমাণ কীভাবে মিটছে একবার ভাবুন। তাই যেভাবেই হোক টিকা পেতে হবে কথা এই একটাই। দেশে টিকা উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে। সে চেষ্টা অব্যাহত রেখে যেকোন উপায়ে কোটি কোটি ডোজ টিকা আমদানির ব্যবস্থা করুন যেখান থেকে হোক যে দেশ থেকেই হোক। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার মতো ঘরে ঘরে টিকা পৌঁছে দিন। হাসপাতালে সেবা বাড়ান আইসিইউর সিট বাড়ান। মানুষকে জোর করে ঘরে আটকানোর বৃথা চেষ্টা কোন কাজে লাগবে না।

যারা সরকারি আধা সরকারি স্বায়ত্তশাষিত করপোরেশন ব্যাংক রীমা সরকারি ছোট-বড় মেঘা প্রকল্পে চাকরি-বাকরি করছেন তারা মাসের শেষে বেতনাদি পাচ্ছেন কাজ কিছু করে বা না করে। লক্ষ লক্ষ মানুষ যারা দোকানপাটে কাজ করে খেত, সেই নিম্ন বা নিম্ন মধ্যবত্তি আয়ের মানুষদের জীবন কীভাবে কাটছে- তা ওই মাসিক বেতন যারা পাচ্ছেন তারা বুঝবেন না। বিত্তবানরা আয়েশি জীবনযাপন করছেন আর কীভাবে করোনামুক্ত থাকতে পারবেন তা ভাবছেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাচ্ছেন। তাদের কথা আলাদা। আমার পাড়ায় লন্ড্রি চালায় যে লোকটা তার দোকানে সে ছাড়া আরও দুজন লোক কাজ করত। এখন এতটা সময় ধরে তাদের কোন আয়-উপার্জনের ব্যবস্থা নেই। ওই লোকটাকে আবার দোকানের ভাড়াও দিতে হচ্ছে। নিজের পরিবার আছে। কতদিন, বলেন আর কতদিন লাগবে ওই মানুষটার রাস্তায় নামতে। বলছেন করোনাভাইরাস গ্রামে ছড়িয়ে গেছে। কীভাবে গেছে। একবার ভাবুন তো এ যাবত কতবার ঘোষণা দেয়া হয়েছে অমুক তারিখ থেকে লকডাউন হবে, অমুক তারিখ থেকে দূরপাল্লার যানবাহন চলবে না। কি নির্মম, এ কারণেই কত মানুষ পদদলিত হয়েই মারা গেছে ফেরিঘাটে। গ্রামে করোনাভাইরাস তো এই শহর থেকেই গেছে। গার্মেন্ট কারখানায় ছুটি দিয়ে দেয়া হলো আবার তাদের ফিরিয়ে আনা হলো। অফিসাদি খোলা আবার খোলা না। এর মাঝে আবার ঈদ উপলক্ষে এক সপ্তাহের জন্য সবকিছু শিথিল করা হয়েছে। তারপর আবার লকডাউন বা সাটডাউন হবে। আমাদের অবশ্য লকডাউন সাটডাউন বলা হয় না, বলা হয় সীমিত বিধিনিষেধ ও কঠোর বিধিনিষেধ। এভাবেই হাতের তীর বেরিয়ে গেছে। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে নানা নাম ধারণ করে করোনাভাইরাস আরও ছড়াবে। এখন রাস্তা একটাই টিকা, টিকা আর টিকা। আর হাসপতালে সেবা জোরদার করা। সচেতনতা বৃদ্ধির যে প্রয়াস চালানো হয়েছে-এটা যথেষ্ট হয়েছে বলতে হবে। মোবাইল ফোন সবার হাতে, টিপলেই সাবধান করে দিচ্ছে কী করতে হবে কী করতে হবে না। এর চেয়ে বড় প্রচার আর কী হতে পারে। রাস্তার যেখানে সেখানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল এখন সেটা শিথিল হয়ে গেল কেন। এটা সচল রাখতে হবে। মাস্ক ব্যবহার করার ব্যাপারে ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার ব্যাপারে কথা একটু আলাদা করেই বলতে হয়। এলোমেলো ভাবে হোক আর মাঝেমধ্যে হোক দেখা যাচ্ছে সবই চলছে কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তালা। করোনাকালের শুরুর দিকে সেই মহাআতঙ্কের সময়েও আমরা একটা খবরে স্বস্তি পেয়েছিলাম যে, করোনায় শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে না। বলতে চাচ্ছি এখনও স্বস্তিতে রয়েছে বিষয়টা। এ ব্যাপারে আজ শুক্রবার ১৬ জুলাই ২০২১-এর দৈনিক সংবাদের রিপোর্টটা দেখা যাক, ‘দেশে করোনা সংক্রমণে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ২২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে’। সেখানে বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে ১১টা ধাপের মধ্যে শেষের চারটা ধাপ এরকম, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ১২ জন, ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ছয়জন, ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে একজন এবং শূন্য থেকে ১০ বছরের মধ্যে মারা গেছে একজন। এ অবস্থায় সাহস করতেই পারেন কর্তৃপক্ষ স্কুল খুলে দেয়ার। দেশ জাতির বৃহত্তর সঙ্গে ঝুঁকি তো নিতেই হবে সরকারকে।

আমাদের বিরাট একটা সাফল্য ছিল যে, আমাদের প্রায় সব শিশুকে স্কুলমুখী করা গিয়েছিল। এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে সরকারের ভালো কিছু পদক্ষেপ। যেমন সব ছাত্রছাত্রীকে বিনা মূল্যে বই বিতরণ, গরিব বাবা-মায়ের সন্তানদের উপবৃত্তি প্রদান ও কোন কোন এলাকায় স্কুলের সব শিশুকে কিছু টিফিন দেয়া। সে সাফল্য আজ ম্লান হতে বসেছে। ২০২০ সালের মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ওরা আর সেই লেখাপড়ার সংস্পর্শে নেই। প্রকৃত অর্থে খেটে খাওয়া শ্রমিক শ্রেণীর জনগোষ্ঠী আর ভাবতে পারছে না যে, তাদের সন্তানদের আর লেখাপড়া হবে। তারা আবার স্কুলে যাবে। আকাশ-বাতাস থেকে লেখাপড়া ধরার ক্ষমতা তাদের নেই যে তারা সে আশা করবে। স্কুল নেই তো তাদের ওই লেখাপড়ার প্রসঙ্গ বন্ধ। তা আবার দিন-মাস না প্রায় দুই বছর হতে চলল বন্ধ।

গ্রামের ছেলেমেয়েরা একত্রে মিশছে খেলাধুলা করছে যাদের ঘরে টেলিভিশন নেই তারা হাটেবাজারে গ্রামের চায়ের দোকানে গিয়ে ভিড় করছে কিন্তু যাচ্ছে না কেবল স্কুলে। যে সচেতনতার কথা বলা হচ্ছে সেদিকে একটু শক্ত নজর রেখে গ্রামের স্কুল খুলে দিলে গ্রাম্য জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা অন্তত এ জগৎ থেকে ছিটকে পড়বে না। শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদেরও ওই একই অবস্থা। বাকি শিশুরা ভার্চুয়াল। কেমন ভার্চুয়াল, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিষয়ের পর বিষয় তারা মোবাইলের সামনে বসে শিক্ষকের কথা শুনছে। বলছে খুবই কম। অভিভাবক মহোদয়রা তাতেই খুশি কারণ তাদের কিছু করার নেই। কেউ মোবাইল ছেড়ে কম্পিউটারের বড় স্ক্রিনের সামনে বসে শুনছে। গত বছরই এ কলামে আমাদের শিশুদের পঠনদক্ষতা নিয়ে লিখেছিলাম। আমাদের শিশুরা পঠনদক্ষতায় অনেক পিছিয়ে। এনিয়ে দেশের বিশেষজ্ঞ সুধীজনদের এক গোলটেবিল বৈঠকের উদ্ধৃতি তুলে ধরে বলেছিলাম এই মহাদুর্যোগকালে অনলাইনে শিশুদের আপনারা সব শিখাতে পারবেন না। আপনারা শুধু ওদের পঠনদক্ষতা বুদ্ধির কাজটা করে যান। ওরা পড়বে আপনারা শুনবেন। পড়তে না পারলে পড়তে সহযোগিতা করবেন। ছোট্ট যন্ত্রের মাধ্যমে শিশুদের পরীক্ষা পাসের পড়া পড়াতে যাবেন না। পড়তে পারলে সব পারবে সব শিখতে পারবে। অভিভাবকদেরও একাজটা করতে অনুরোধ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, দেখেন, প্রাইমারি পর্যায়ের (হতে পারে ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত) একজন শিক্ষার্থী মিনিটে কয়টা শব্দ উচ্চারণ করে পড়তে পারে তার পাঠ্যবই থেকে। যদি দেখেন ৩০-৪০টা পারে তো বুঝবেন ঠিক আছে। কথাটা আমার না দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ সুধীজনদের। বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই এখানে।

এখন শিশুরা যা করছে এর পেছনে শিশুদের লেখাপড়া নিয়ে যে বাণিজ্য চলে আসছিল নোট-গাইড কোচিং আর সহায়ক বইয়ের নামে সেটাই আবার এভাবে অনলাইনে হাত বাড়িয়েছে কি না কে বলবে।

[লেখক : প্রাবন্ধিক]

back to top