alt

উপ-সম্পাদকীয়

ন্যাপ : বাম ধারার উন্মেষ

রণেশ মৈত্র

: শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১

১৯৫৪ সালের জুলাই ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলের দু’দিনব্যাপী সম্মেলন আয়োজিত হয়েছিল। সম্মেলনের নাম ছিল ‘নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন। আহ্বায়ক ছিলেন নিপীড়িত জনগণের তৎকালীন অবিসংবাদিত নেতা জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী তখন আওয়ামী লীগ নেতা (পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি) হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়াদী। কেন্দ্রে যেমন অধিষ্ঠিত ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার-তেমনই পূর্ব পাকিস্তানের অধিষ্ঠিত ছিল আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা-যার অংশীদার ছিল মনোরঞ্জন ধরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় কংগ্রেস, হাজী দানেশ-মাহমুদ আলীর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল।

অর্থাৎ দেশের মূল ক্ষমতা কেন্দ্রে দৃশ্যত: আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন থাকা সত্ত্বেও সেই আওয়ামী লীগেরই প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মওলানা ভাসানী কেন অপর একটি রাজনৈতিক দল গঠনের লক্ষ্যে “নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিককর্মী সম্মেলন আহ্বান করলেন-তার পটভূমি উল্লেখ করা প্রয়োজন।

১৯৫৪ সালে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ওই বছরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক নির্বাচনে বিপুল ভোটাধিক্যে নির্বাচিত হয়ে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের অঙ্গ দলগুলোর মনোনীত প্রতিনিধিদের সমান্বয়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় মন্ত্রিসভা গঠন করে কারারুদ্ধ নির্য্যতীত কমিউনিস্ট নেত্রী ইলা মিত্রকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার অনুমতি দান, বন্দীমুক্তিসহ কতিপয় প্রগতিমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করায় এবং মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক করাচি থেকে ঢাকা আসার পথে কলকাতা অবতরণ করেন। সেখানে আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায় তিনি দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ঐক্য বজায় থাকবে-এ জাতীয় বক্তব্য দেয়ায় পূর্ববাংলার নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত মুসলিম লীগ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ষড়যন্ত্র করে মাত্র ৫৮ দিনের মাথায় শেরে বাংলার নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলার মন্ত্রিসভাকে বাতিল ঘোষণা করলে যুক্তফ্রন্টকে বাতিল ঘোষণা করলে যুক্তফ্রন্টের ঐক্যে ফাটল ধরতে শুরু করে ওই একই ষড়যন্ত্রের কারণে।

অকস্মাৎ দেখা গেল কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে শপথ নিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, যিনি কৃষক শ্রমিক পার্টি সদ্য গঠন করে যুক্তফ্রন্টে শরিক হয়েছিলেন। অপরদিকে আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শপথ নিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন রাজধানী করাচিতে ওই কেন্দ্রীয় সরকারের আইনমন্ত্রী হিসেবে। শেরে বাংলা সম্পর্কে জানা না গেলেও, শহীদ সোহরাওয়াদী যে ওই মন্ত্রিত্ব গ্রহণের আগে আওয়ামী লীগের কোন অনুমোদন নেননি- তা অনেকেরই জানা।

মওলানা ভাসানী তখন ছিলেন বিদেশে বিশ্ব শান্তি পরিষদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের নেতা হিসাবে। তিনি বিদেশে থেকেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ষড়যন্ত্রে যুক্তফ্রন্টের সৃষ্ট ভাঙনের ও ওই দুই নেতার মন্ত্রিত্ব গ্রহণ ও পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরী শাসন প্রবর্তনের কঠোর সমালোচনা করে এক বিবৃতি দিলে আন্তর্জাতিক মিডিয়া তা লুফে নেয়। পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দেয়, মওলানা ভাসানী পাকিস্তানে ফিরলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে। তখন পূর্ব বাংলার বহু সংখ্যক এমএলএ যেমন শেখ মুজিবর রহমান, আতাউর রহমান (রাজশাহী), হাজী মোহাম্মদ দানেশসহ হাজার হাজার নেতা কর্মীকে বিনাবিচারে কারারুদ্ধ করা হয়। স্বভাবতই বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

১৯৫৬ সালে যখন আবারও আতাউর রহমান পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হলেন কোয়ালিশন সরকারের, শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী পশ্চিম পাকিস্তানি দলের সমর্থনে কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী হন। তখন তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন, পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট পাকিস্তানের বিরোধিতা এবং সাম্রাজ্যবাদ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করায় মওলানা ভাসানী ও আওয়ামী লীগের বামপন্থি অংশ ক্ষিপ্ত হন। মওলানা ভাসানী কাগমারিতে একটি সম্মেলন ডাকেন। তাতে প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ও অপর চারজন আওয়ামী লীগ জলীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং আতাউর রহমান খানের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার সব সদস্য ও পূর্ব বাংলার সব জেলার বিপুলসংখ্যক আওয়ামী লীগের সব জেলা বিপুলসংখ্যক আওয়ামী লীগার যোগ দেন।

সেখানে অনুষ্ঠিত বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে আলোচনায় আসে সোহ্রাওয়ার্দী অনুসৃত স্বায়ত্তশাসন, এক ইউনিট ও সাম্রাজ্যবাদ-ঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি। মওলানা ভাসানী সোহরাওয়াদী অনুসৃত নীতিসমূহের কঠোর সমালোচনা করে তাকে দলীয় রীতি অনুসরণের আহ্বান জানালে সোহ্রাওয়ার্দী তাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, স্বায়ত্তশাসন মানলে, এক ইউনিট ভাঙলে ও পররাষ্ট্রনীতি বদলালে পাকিস্তান টিকবে না। ব্যাপক আলোচনার পর বিপুল ভোটাধিক্যে মওলানা ভাসানীর অভিমত অনুমোদিত হয়। ক্ষুব্ধ সোহরাওয়ার্দী ও তার অনুসারীরা তৎক্ষণাৎ ঢাকা ফিরে যাব এবং দলের পাল্টা কাউন্সিল সভা আহ্বান করেন। এ সভায় সোহরাওয়ার্দী অনুসৃত ঐতিসমূহ অনুমোদিত হয় বলে ঘোষণা দিলে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এই পটভূমিতে আহুত হয় “নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন দু’দিনব্যাপী। তখন ছাত্র ইউনিয়ন করতাম-যোগ দিয়েছিলাম এ সম্মেলনে। তাই আমি একজন প্রত্যক্ষদর্শী।

২৫ জুলাই সর্বসম্মতিক্রমে স্থির হয়, নিখিল পাকিস্তান ভিত্তিতে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করার যে দলের লক্ষ্য হবে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধিতা এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠা, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সব আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক যুদ্ধ ও যুদ্ধ উন্মাদনার বিরোধিতা করা এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শোষণমুক্ত করে সমাজতন্ত্র ও বৈষম্য মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা ও নারী-পুরুষের সমতা বিধান করা।

দলের নাম স্থির হয় পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। তবে বেশিরভাগ নেতা চাইছিলেন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি নাম রাখতে। মওলানা ভাসানী বলে ওঠেন, দলের নাম যা-ই রাখা হোক তাতে “আওয়ামী” শব্দটি যেন রাখা হয়। সে অনুযায়ী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নাম রাখা হয় সর্বসম্মতিক্রমে। দলটির মেনিফেস্টো ও গঠনতন্ত্র ও সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হলে সব ডেলিগেটের করতালিতে হল মুখরিত হয়।

নতুন কমিটি গঠন করা হয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং করাচির মাহবুবুল হক ওসমানীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিটির সভাপতি হিসেবে মওলানা ভাসানী এবং মাহমুদ আলী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। মাহমুদ আলী তখন আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন সরকারের একজন মন্ত্রী তিনিও দুই দিন ধরে ঐ সিনেমা হলে সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।

ন্যাপ গঠনের মাধ্যমে উভয় পাকিস্তানের সব প্রদেশের মানুষের ঐক্য সর্ব প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। সব প্রদেশে ন্যাপের শক্তিশালী শাখা গঠিত হয়। সব প্রদেশেই জননন্দিত নবীন ও প্রবীণ নেতাদের নেতৃত্বে একই লক্ষ্যে জনগণ সংগঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলে সমশ্চিত বাম ও উদার গণতন্ত্রী শক্তির সম্মিলিত উদ্যোগে গণ আন্দোলন সৃষ্টির ভিত্তি রচিত হয়েছিল। দুই অঞ্চলের নিষিদ্ধ গোপন কমিউনিস্ট পার্টিও ন্যাপের মাধ্যমে সক্রিয় যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে পাকিস্তান উত্তরকালে প্রথমবারের মতো সক্ষম হয়েছিল-যা ন্যাপের জন্মের এক মুহূর্ত আগে পর্যন্ত কল্পনা করাও সম্ভব হয়নি। প্রথমবারের মতো সক্ষম হয়েছিল-যা ন্যাপের জন্মের এক মুহূর্ত আগে পর্যন্ত কল্পনা করাও সম্ভব হয়নি।

প্রতিষ্ঠাকাল থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ন্যাপ ও বাম দলগুলোর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অনস্বীকার্য

আজ সাম্প্রদায়িকতা, কালোটাকা ও অস্ত্রের ঝনঝনানি রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতাসীন ও উগ্রপন্থিদের কারণে সমগ্র জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হওয়ায় প্রগতিশীল বামধারার রাজনীতি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। তদুপরি সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে সংঘটিত বিপর্যয় এবং দেশের বামপন্থি দলগুলো যেমন ন্যপ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টিতে নানা কারণে অনাকাক্সিক্ষত ও ভয়াবহভাবে ক্ষতিকর ভাঙনের কবলে পড়ে বামশক্তিগুলোর গণভিত্তিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাকাল থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ন্যাপ ও বাম দলগুলোর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অনস্বীকার্য।

কিন্তু জনজীবনের ক্রমবর্ধমান নিত্যদিনের সমস্যা, পুঁজিবাদী শোষণ যেভাবে দিনে দিনে তীব্র হয়ে উঠছে এবং বিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তির কার্যত: অনুপস্থিতির কারণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি করেছে-তাতে বিশ্বাস করার কারণ আছে যে দেশের অবহেলিত যুবসমাজ বাম প্রগতিশীল রাজনীতির পতাকা পুনরায় ঊর্ধ্বে তুলে ধরে ধারাবাহিক লড়াই এর মাধ্যমে নতুন লড়াই এ সামিল হবে ও ওই শূন্যস্থান পূরণ করতে সক্ষম হবে। তবে এক্ষেত্রে শর্ত একটিই-আজকের বামপন্থি দলগুলো ওতাদের নেতাকর্মীকে উপলব্ধি করতে হবে যে দ্রুত সব বামপন্থি শক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ওই প্রক্রিয়াকে কার্যকর করতে সর্বাধিক প্রয়োজন। হতাশা ও প্রস্তাব নির্ভর না হয়ে ঐক্যের ব্যাপারে সক্রিয় উদ্যোগের সাফল্য অনিবার্য।

[লেখক : সভাপতিমন্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ]

উন্নত বাংলাদেশের কাণ্ডারি

সংশপ্তকের জন্য জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা: স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

অপার সম্ভাবনার পর্যটন

ভাবমূর্তির উন্নয়ন

ধর্ম যখন বর্ম

ফল ও সবজি রপ্তানি এবং কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউজ

আফগানিস্তানে তালেবান ও ভূলুণ্ঠিত মানবাধিকার

বিমানবন্দরে পিসিআর ল্যাব স্থাপন প্রসঙ্গে

আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য

পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থিদের নেতৃত্বে কারা আসছেন

বোনেরা প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হলে কী করবেন?

ছবি

তালেবানরা উদারপন্থি হচ্ছে কি

ছবি

কারিকুলাম প্রণয়নের চেয়ে বাস্তবায়নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ

দুর্বিনীত লোভের ফাঁদ

কিশোর শিক্ষার্থীদের কোভিড ভ্যাকসিন

সমাপনী পরীক্ষা এবার থেকেই বাদ নয় কেন

ইটিং ডিজঅর্ডার সম্পর্কে জানা জরুরি

ধনী হওয়ার মন্ত্র ও বোকা বানানোর যন্ত্র

মুজিব বাহিনী ও মুজিববাদ

দেশের ইস্পাত শিল্প

আদিবাসীদের শ্মশানও দখল হয়ে গেল

অন্ধকার অতল গহ্বরে আফগান জনগণ

সংকটে রবিদাস জনগোষ্ঠী

প্রশাসনকে মাটির কাছাকাছি আসতে হবে

তালেবানদের সরকার গঠন

যেখানে সময় এসে মানুষকে ধরা দেয়

পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী রাজনীতির ঘূর্ণাবর্ত

ছবি

শিক্ষা দিবস

সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শূন্যতা ও জঙ্গিবাদ

ঐতিহাসিক সত্য উন্মোচনে ট্রুথ কমিশন

’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন ও আজকের শিক্ষা

আন্তর্জাতিক ওজন দিবস

ভূমিসংক্রান্ত অপরাধ দমনে আইন প্রণয়ন জরুরি

ছবি

শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা

বেশি দামে সার বিক্রিতে প্রতারিত হচ্ছেন কৃষক

tab

উপ-সম্পাদকীয়

ন্যাপ : বাম ধারার উন্মেষ

রণেশ মৈত্র

শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১

১৯৫৪ সালের জুলাই ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলের দু’দিনব্যাপী সম্মেলন আয়োজিত হয়েছিল। সম্মেলনের নাম ছিল ‘নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন। আহ্বায়ক ছিলেন নিপীড়িত জনগণের তৎকালীন অবিসংবাদিত নেতা জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী তখন আওয়ামী লীগ নেতা (পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি) হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়াদী। কেন্দ্রে যেমন অধিষ্ঠিত ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার-তেমনই পূর্ব পাকিস্তানের অধিষ্ঠিত ছিল আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা-যার অংশীদার ছিল মনোরঞ্জন ধরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় কংগ্রেস, হাজী দানেশ-মাহমুদ আলীর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল।

অর্থাৎ দেশের মূল ক্ষমতা কেন্দ্রে দৃশ্যত: আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন থাকা সত্ত্বেও সেই আওয়ামী লীগেরই প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মওলানা ভাসানী কেন অপর একটি রাজনৈতিক দল গঠনের লক্ষ্যে “নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিককর্মী সম্মেলন আহ্বান করলেন-তার পটভূমি উল্লেখ করা প্রয়োজন।

১৯৫৪ সালে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ওই বছরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক নির্বাচনে বিপুল ভোটাধিক্যে নির্বাচিত হয়ে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের অঙ্গ দলগুলোর মনোনীত প্রতিনিধিদের সমান্বয়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় মন্ত্রিসভা গঠন করে কারারুদ্ধ নির্য্যতীত কমিউনিস্ট নেত্রী ইলা মিত্রকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার অনুমতি দান, বন্দীমুক্তিসহ কতিপয় প্রগতিমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করায় এবং মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক করাচি থেকে ঢাকা আসার পথে কলকাতা অবতরণ করেন। সেখানে আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায় তিনি দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ঐক্য বজায় থাকবে-এ জাতীয় বক্তব্য দেয়ায় পূর্ববাংলার নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত মুসলিম লীগ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ষড়যন্ত্র করে মাত্র ৫৮ দিনের মাথায় শেরে বাংলার নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলার মন্ত্রিসভাকে বাতিল ঘোষণা করলে যুক্তফ্রন্টকে বাতিল ঘোষণা করলে যুক্তফ্রন্টের ঐক্যে ফাটল ধরতে শুরু করে ওই একই ষড়যন্ত্রের কারণে।

অকস্মাৎ দেখা গেল কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে শপথ নিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, যিনি কৃষক শ্রমিক পার্টি সদ্য গঠন করে যুক্তফ্রন্টে শরিক হয়েছিলেন। অপরদিকে আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শপথ নিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন রাজধানী করাচিতে ওই কেন্দ্রীয় সরকারের আইনমন্ত্রী হিসেবে। শেরে বাংলা সম্পর্কে জানা না গেলেও, শহীদ সোহরাওয়াদী যে ওই মন্ত্রিত্ব গ্রহণের আগে আওয়ামী লীগের কোন অনুমোদন নেননি- তা অনেকেরই জানা।

মওলানা ভাসানী তখন ছিলেন বিদেশে বিশ্ব শান্তি পরিষদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের নেতা হিসাবে। তিনি বিদেশে থেকেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ষড়যন্ত্রে যুক্তফ্রন্টের সৃষ্ট ভাঙনের ও ওই দুই নেতার মন্ত্রিত্ব গ্রহণ ও পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরী শাসন প্রবর্তনের কঠোর সমালোচনা করে এক বিবৃতি দিলে আন্তর্জাতিক মিডিয়া তা লুফে নেয়। পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দেয়, মওলানা ভাসানী পাকিস্তানে ফিরলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে। তখন পূর্ব বাংলার বহু সংখ্যক এমএলএ যেমন শেখ মুজিবর রহমান, আতাউর রহমান (রাজশাহী), হাজী মোহাম্মদ দানেশসহ হাজার হাজার নেতা কর্মীকে বিনাবিচারে কারারুদ্ধ করা হয়। স্বভাবতই বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

১৯৫৬ সালে যখন আবারও আতাউর রহমান পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হলেন কোয়ালিশন সরকারের, শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী পশ্চিম পাকিস্তানি দলের সমর্থনে কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী হন। তখন তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন, পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট পাকিস্তানের বিরোধিতা এবং সাম্রাজ্যবাদ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করায় মওলানা ভাসানী ও আওয়ামী লীগের বামপন্থি অংশ ক্ষিপ্ত হন। মওলানা ভাসানী কাগমারিতে একটি সম্মেলন ডাকেন। তাতে প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ও অপর চারজন আওয়ামী লীগ জলীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং আতাউর রহমান খানের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার সব সদস্য ও পূর্ব বাংলার সব জেলার বিপুলসংখ্যক আওয়ামী লীগের সব জেলা বিপুলসংখ্যক আওয়ামী লীগার যোগ দেন।

সেখানে অনুষ্ঠিত বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে আলোচনায় আসে সোহ্রাওয়ার্দী অনুসৃত স্বায়ত্তশাসন, এক ইউনিট ও সাম্রাজ্যবাদ-ঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি। মওলানা ভাসানী সোহরাওয়াদী অনুসৃত নীতিসমূহের কঠোর সমালোচনা করে তাকে দলীয় রীতি অনুসরণের আহ্বান জানালে সোহ্রাওয়ার্দী তাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, স্বায়ত্তশাসন মানলে, এক ইউনিট ভাঙলে ও পররাষ্ট্রনীতি বদলালে পাকিস্তান টিকবে না। ব্যাপক আলোচনার পর বিপুল ভোটাধিক্যে মওলানা ভাসানীর অভিমত অনুমোদিত হয়। ক্ষুব্ধ সোহরাওয়ার্দী ও তার অনুসারীরা তৎক্ষণাৎ ঢাকা ফিরে যাব এবং দলের পাল্টা কাউন্সিল সভা আহ্বান করেন। এ সভায় সোহরাওয়ার্দী অনুসৃত ঐতিসমূহ অনুমোদিত হয় বলে ঘোষণা দিলে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এই পটভূমিতে আহুত হয় “নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন দু’দিনব্যাপী। তখন ছাত্র ইউনিয়ন করতাম-যোগ দিয়েছিলাম এ সম্মেলনে। তাই আমি একজন প্রত্যক্ষদর্শী।

২৫ জুলাই সর্বসম্মতিক্রমে স্থির হয়, নিখিল পাকিস্তান ভিত্তিতে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করার যে দলের লক্ষ্য হবে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধিতা এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠা, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সব আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক যুদ্ধ ও যুদ্ধ উন্মাদনার বিরোধিতা করা এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শোষণমুক্ত করে সমাজতন্ত্র ও বৈষম্য মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা ও নারী-পুরুষের সমতা বিধান করা।

দলের নাম স্থির হয় পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। তবে বেশিরভাগ নেতা চাইছিলেন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি নাম রাখতে। মওলানা ভাসানী বলে ওঠেন, দলের নাম যা-ই রাখা হোক তাতে “আওয়ামী” শব্দটি যেন রাখা হয়। সে অনুযায়ী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নাম রাখা হয় সর্বসম্মতিক্রমে। দলটির মেনিফেস্টো ও গঠনতন্ত্র ও সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হলে সব ডেলিগেটের করতালিতে হল মুখরিত হয়।

নতুন কমিটি গঠন করা হয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং করাচির মাহবুবুল হক ওসমানীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিটির সভাপতি হিসেবে মওলানা ভাসানী এবং মাহমুদ আলী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। মাহমুদ আলী তখন আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন সরকারের একজন মন্ত্রী তিনিও দুই দিন ধরে ঐ সিনেমা হলে সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।

ন্যাপ গঠনের মাধ্যমে উভয় পাকিস্তানের সব প্রদেশের মানুষের ঐক্য সর্ব প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। সব প্রদেশে ন্যাপের শক্তিশালী শাখা গঠিত হয়। সব প্রদেশেই জননন্দিত নবীন ও প্রবীণ নেতাদের নেতৃত্বে একই লক্ষ্যে জনগণ সংগঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলে সমশ্চিত বাম ও উদার গণতন্ত্রী শক্তির সম্মিলিত উদ্যোগে গণ আন্দোলন সৃষ্টির ভিত্তি রচিত হয়েছিল। দুই অঞ্চলের নিষিদ্ধ গোপন কমিউনিস্ট পার্টিও ন্যাপের মাধ্যমে সক্রিয় যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে পাকিস্তান উত্তরকালে প্রথমবারের মতো সক্ষম হয়েছিল-যা ন্যাপের জন্মের এক মুহূর্ত আগে পর্যন্ত কল্পনা করাও সম্ভব হয়নি। প্রথমবারের মতো সক্ষম হয়েছিল-যা ন্যাপের জন্মের এক মুহূর্ত আগে পর্যন্ত কল্পনা করাও সম্ভব হয়নি।

প্রতিষ্ঠাকাল থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ন্যাপ ও বাম দলগুলোর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অনস্বীকার্য

আজ সাম্প্রদায়িকতা, কালোটাকা ও অস্ত্রের ঝনঝনানি রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতাসীন ও উগ্রপন্থিদের কারণে সমগ্র জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হওয়ায় প্রগতিশীল বামধারার রাজনীতি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। তদুপরি সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে সংঘটিত বিপর্যয় এবং দেশের বামপন্থি দলগুলো যেমন ন্যপ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টিতে নানা কারণে অনাকাক্সিক্ষত ও ভয়াবহভাবে ক্ষতিকর ভাঙনের কবলে পড়ে বামশক্তিগুলোর গণভিত্তিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাকাল থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ন্যাপ ও বাম দলগুলোর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অনস্বীকার্য।

কিন্তু জনজীবনের ক্রমবর্ধমান নিত্যদিনের সমস্যা, পুঁজিবাদী শোষণ যেভাবে দিনে দিনে তীব্র হয়ে উঠছে এবং বিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তির কার্যত: অনুপস্থিতির কারণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি করেছে-তাতে বিশ্বাস করার কারণ আছে যে দেশের অবহেলিত যুবসমাজ বাম প্রগতিশীল রাজনীতির পতাকা পুনরায় ঊর্ধ্বে তুলে ধরে ধারাবাহিক লড়াই এর মাধ্যমে নতুন লড়াই এ সামিল হবে ও ওই শূন্যস্থান পূরণ করতে সক্ষম হবে। তবে এক্ষেত্রে শর্ত একটিই-আজকের বামপন্থি দলগুলো ওতাদের নেতাকর্মীকে উপলব্ধি করতে হবে যে দ্রুত সব বামপন্থি শক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ওই প্রক্রিয়াকে কার্যকর করতে সর্বাধিক প্রয়োজন। হতাশা ও প্রস্তাব নির্ভর না হয়ে ঐক্যের ব্যাপারে সক্রিয় উদ্যোগের সাফল্য অনিবার্য।

[লেখক : সভাপতিমন্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ]

back to top