alt

উপ-সম্পাদকীয়

শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল আসক্তি

মাহমুদুল হাছান

: রোববার, ২৫ জুলাই ২০২১
image

‘আসক্তি’ সবার কাছে একটি সুপরিচিত শব্দ। আসক্তি হলো কোন কিছুর প্রতি এমন তীব্র নেশা, টান বা মোহ যা থেকে সামান্য সময়ের জন্য বিচ্যুত হলে মানসিকভাবে কেউ চরম অসুস্থ অনুভব করে। যেমন মদ বা মাদক জাতীয় দ্রব্যাদির প্রতি কারোর নেশা থাকলে তাকে আমরা মাদকাসক্ত বলে থাকি। কেহ ধূমপানে নেশাগ্রস্ত হলে তাকে বলি ধূমপানাসক্ত। এ ধরনের আসক্তি সম্পর্কে আমরা সচরাচর শুনে থাকি, কিন্তু ডিজিটাল আসক্তি বর্তমানে কিশোর-কিশোরীদের জন্য এক মারাত্মক আসক্তি, যে ব্যাপারে আমরা অনেকেই জানি না বা অহর্নিশ শুনতেও পাই না। তবে অনলাইন পদ্ধতিতে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা শুরু হলে ডিজিটাল আসক্তির কথাটি বিভিন্ন মিডিয়ায় বেশ আলোচিত হচ্ছে, যা অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডিজিটাল আসক্তি বলতে ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি এমন মোহ বা টান যা ব্যবহারকারীদের মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন করে তোলে এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তথা ভিডিও গেম, অনলাইন বিনোদন, মোবাইল অপারেশন, ডিজিটাল গ্যাজেট এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্ক প্ল্যাটফর্মগুলোতে নেশাগ্রস্ত করে রাখে। এককথায়, ডিজিটাল আসক্তিতে আক্রান্ত ব্যক্তি অনলাইন কার্যক্রমে এমনভাবে ঝুঁকে পড়ে যা তার দৈনন্দিন আবশ্যকীয় কর্মকা- সম্পন্ন করা থেকে বিরত রাখে এবং তার স্বাভাবিক আচার-আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ডিজিটাল আসক্তির তিনটি ধরন রয়েছে, যথা ফোন আসক্তি, ইন্টারনেট আসক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি। সব বয়সের মানুষের মধ্যে এ আসক্তি দেখা দিলেও কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থীরা এ আসক্তিতে বেশি আক্রান্ত। ডিজিটাল আসক্তি মানুষে মানুষে সম্পর্কের সূক্ষ্ম দিকগুলো দুর্বল করে দেয় এবং সামাজিকভাবে একে অন্যের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে। পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশে ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বিষ্ময়করহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি বা ১০০ মিলিয়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি যার মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৯৩.৭০২ মিলিয়ন যা মোট জনসংখ্যার ৬২%। করোনাকালে, এ সংখ্যা আরও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফেসবুকের ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় হুমকি। ছাত্র, শিক্ষক, বৃদ্ধ, বনিতাসহ প্রায় সব শ্রেণী-পেশার মানুষ এ ফেসবুকের সঙ্গে জড়িত। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উই আর সোশ্যাল’ আর কানাডাভিত্তিক ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠান হুটস্যুইটের যৌথ জরিপে প্রকাশিত হয়েছে যে, সারা বিশ্বে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিবেচনায় ঢাকা দ্বিতীয় যার সংখ্যা ২২ মিলিয়ন বা ২ কোটি ২০ লাখ। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ব্যাংকক শহর, ৩ কোটি আর তৃতীয় স্থানে আছে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত গড়ে দৈনিক সক্রিয় ব্যবহারকারী (ডেইলি অ্যাক্টিভ ইউজার) ছিল ১৫৬ কোটি, যা গত বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি। এছাড়া এখন গড়ে প্রতিদিন ২১০ কোটি ব্যবহারকারী হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম ও মেসেঞ্জার সেবা ব্যবহার করছেন। এছাড়া গড়ে ২৭০ কোটি ব্যবহারকারী কোনো না কোনোভাবে ফেসবুক পরিবারের যে কোন সেবার সঙ্গে যুক্ত।

বর্তমানে শিক্ষাধারা অব্যাহত রাখতে অনলাইন শিক্ষার প্ল্যাটফর্মই একমাত্র অবলম্বন। কারণে-অকারণে শিক্ষার্থীদের অনলাইনে বসতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে অনলাইন শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা ক্লাসের অন্তরালে ঝুঁকে পড়ছে নানা ধরনের অপ্রাসঙ্গিক বিনোদনে যা তাদের মারাত্মকভাবে আসক্ত করে তুলছে। অনলাইন গেম ও ফেসবুক এদের মধ্যে অন্যতম। সুযোগ পেলেই শিক্ষার্থীরা ফেসবুক ও অনলাইন গেমসের দিকে ঝুঁকছেন। অনলাইনে পড়ানোর সময় ইন্টারনেটে শিক্ষকদের তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় শিক্ষার্থীরা ফোন গেমিংয়ে জড়িয়ে পড়ে, ইউটিউবে অশ্লীল ছবি ও গানের প্রতি তাদের আসক্তি বাড়ে এবং কখনো কখনো ফেসবুক চ্যাটিং-এ যুক্ত হয়ে যায়।

সময়ের আবর্তে সবকিছুই পরিবর্তন হচ্ছে। জীবনের রূপ ও বর্ণে পরিবর্তন এসেছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন চিন্তাগুলো আসছে এবং পুরোনো চিন্তার জগতকে গ্রাস করছে। বিকেলে মাঠে খেলতে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে বাইরে বেরোনো, পরিবারের সঙ্গে বসে গল্প করা, সহপাঠীদের সঙ্গে বিনোদন করা- এসব এই ডিজিটাল যুগে নতুন প্রজন্মকে যেন কেবল আড়ষ্ঠ করে চলেছে। কখোনও বা কয়েকজন বন্ধু একসঙ্গে বসে গল্প করলেও সেখানে দেখা যায় সবার নজর ফোনের চার-কোণার স্ক্রিনে। এখন কেউ কাউকে সময় দেয় না। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীদের মাঝে এ গেমাসক্তি দিন দিন বেড়েই চলছে।

এখন, শিক্ষার্থীরা বিনোদনের জন্য অনলাইন গেমস, পাবজি এবং ফ্রি ফায়ার বেছে নেয়। ঘরের এক কোণে বসে মাতাল হয়ে অনলাইনে ভিডিও গেম খেলছে। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের চার কোণে তাদের সময় পার করছে। শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের জন্য সর্বাধিক জনপ্রিয় অনলাইন ভিডিও গেমগুলো হলো পাবজি এবং ফ্রি ফায়ার, যা আজকাল অত্যধিক খেলতে দেখা যায়। প্লেয়ার অজানা ব্যাটেল গ্রাউন্ড (পিইউবিজি), দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্থা ব্লু-হোয়েল সহযোগী প্রতিষ্ঠান দ্বারা বিকশিত একটি খেলা পাপজি এবং ফ্রি ফায়ারের মতো অনলাইন গেমের শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

পাবজি গেমের বিশ্লেষণে দেখা যায় যে একটি পরিত্যক্ত দ্বীপে ১০০ জন লোক বাস করছেন, যেখানে কিছু খেলোয়াড় প্যারাসুট নিয়ে এসে বেঁচে থাকার লড়াই শুরু করে দেয়। এটি চার গ্রুপে খেলা যায়। এই চারজন খেলোয়াড় ১০০ জনকে হত্যার বড় লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। এই গেমের মূল ভিত্তি হলো ‘হত্যা করো, বেঁচে থাকো’। এক কথায় ‘টিকে থাকার জন্য, হত্যা করো’ এটি এ গেমটির মূল লক্ষ্য। ফ্রি ফায়ারও এই গেমটির আদলে সৃষ্ট একটি মডেল গেম।

বিশ্ব পরিসংখ্যানগুলোতে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা এ দুটি গেম সবচেয়ে বেশি খেলছে। একাধিক সমীক্ষা অনুসারে, বর্তমানে বিশ্বের ৮৭ কোটি ছেলেমেয়ে প্রতিদিন পাবজি এবং ফ্রি ফায়ার খেলছে। গুগল প্লে স্টোর থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ডাউনলোড করা হচ্ছে। অন্য একটি অনলাইন সমীক্ষা বলছে যে বাংলাদেশে প্রতিদিন এক কোটিরও বেশি এ গেম খেলা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিশ্বের প্রায় ৫০ কোটি মানুষ প্রতিদিন ফ্রি ফায়ার গেমটি খেলছে। বাংলাদেশে প্রায় ৭ মিলিয়ন মানুষ খেলছে। অন্য একটি জরিপে দেখা গেছে যে কিশোর এবং তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের ৮.৬ শতাংশ ইন্টারনেট গেমিংয়ে আসক্ত। এর মধ্যে ৪.৮ শতাংশ কিশোর এবং ১.৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক।

বাংলাদেশ টেলিযোগযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) অনুসারে, ২০১২ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের প্রায় ৯.৩৭ কোটি মানুষ ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। ২০১৬ সালের তথ্য অনুসারে, শিক্ষার্থীদের ৩৫ শতাংশ মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের, অর্থাৎ কিশোর-কিশোরী। মহামারীর সময় এটি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এগুলি বেশিরভাগই অস্বাভাবিকভাবে ডিজিটাল আসক্তির ঝুঁকিতে থাকে। ২০১৮ সালে আইসিডি-১১ এর একাদশ সংশোধিত সংস্করণে, গেমিং আসক্তি একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে গৃহীত হয়েছিল, যা এটি ২০২২ সালে প্রকাশিত আইসিডি-১১ শীর্ষক ডায়াগনসিস গাইড বইয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। অন্য কথায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই অনলাইন গেমস, সেল ফোন, কম্পিউটার বা ভিডিও গেমসের ক্ষতিকারক ব্যবহারকে একটি রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যাকে ডিজিটাল আসক্তি বলে আখ্যা দিয়েছেন। মজার বিষয় হলো, যারা এই গেমগুলো তৈরি করছে তারা তাদের ছেলেমেয়েদের এই গেমাসক্তি থেকে দূরে রেখেছেন। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো পরবর্তী প্রজন্মকে বুদ্ধিহীন অনুগত অনুসারী হিসেবে তৈরি করা।

প্রতিটি জনপ্রিয় ডিজিটাল গেম হলো ভয়ঙ্কর সন্ত্রাস-সহিংসতা যুদ্ধ এবং মৃত্যুর গল্প। অস্ট্রেলিয়ার ডায়াকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হেলেন ইয়ং তার নিবন্ধ ‘ভায়োলেন্স অ্যান্ড ফার-রাইটস’-এ লিখেছেন, সন্ত্রাসভিত্তিক ভিডিও গেমগুলো সন্ত্রাস-হিংসাকে সাধারণীকরণের ষড়যন্ত্র। এটি মানুষের অভ্যন্তরীণ অপরাধবোধকে উসকে দিচ্ছে। তরুণদের হত্যার বিষয়টি স্বাভাবিক হিসেবে ভাবাতে শেখানো হচ্ছে। মানুষের মধ্যে নৈতিকতা নষ্ট হচ্ছে। এমনকি রাস্তায় কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলেও এখন কেউই সামনে আসে না। গেম নির্মাতাদের মূল লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীদের মধ্যে এক ধরনের আসক্তি তৈরি করা। আসলে, বিশ্বজুড়ে কয়েক মিলিয়ন কিশোর ছাত্রছাত্রী ভিডিও গেমে আসক্ত। ফলস্বরূপ, সামাজিক মূল্যবোধ, শিক্ষা ও সংস্কৃতি ধ্বংস হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অক্ষম হয়ে উঠছে। এই আসক্তিটি তাদের সৃজনশীল শক্তিকে দুর্বল করছে। আসক্তি কখনও কখনও আত্মহত্যার মতো ভয়ঙ্কর পথে ডেকে নিচ্ছে। ২১ মে শাহজাহানপুরে তার মোবাইল ফোনে ‘ফ্রি ফায়ার গেম’ খেলতে না পারায় উম্মে হাবিবা বর্ষা নামে ষষ্ঠ শ্রেণীর এক ছাত্রী আত্মহত্যা করেছিল।

এই গেমগুলো খেলতে পর্যাপ্ত ডেটা প্রয়োজন, যার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন পড়ে। সম্প্রতি, দিনাজপুরের বিরামপুরে ফ্রি ফায়ার ডেটা কিনতে অর্থের ব্যবস্থা করতে না পারায় রিপন নামের এক স্কুলছাত্র আত্মহত্যা করেছিল। বাংলাদেশের একটি অনলাইন সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভিডিও গেমসের কারণে এ বছর প্রায় ১৭ জন আত্মহত্যা করেছে। অনলাইন গেমগুলোর আসক্তির কারণে আত্মহত্যার তালিকাটি দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন ভিডিও গেমের আসক্তি মাদকের চেয়ে মারাত্মক। তারা এর নাম দিয়েছিল ‘ডিজিটাল ড্রাগ’। একজন মাদকসেবী মাদক না পেলে, নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়; একইভাবে, অনলাইন গেম আসক্তরা গেমটি খেলতে না পেরে আত্মহত্যা করতেও দ্বিধা করে না। মাদকের আসক্তির মতো, অনলাইন গেম থেকে বেরিয়ে আসা খুব কঠিন। তবে দৃঢ় ইচ্ছা শক্তি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকা- বা পরিষেবাদিতে নিজেকে জড়িত রেখে গেমের আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

এই ধরনের গেমগুলোর ভয়াবহতা বিবেচনা করে, ভারত, নেপাল, জাপান, ইরান এবং আরও অনেক দেশের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো পাবজি এবং ফ্রি ফায়ার গেমগুলোকে নিষিদ্ধ করেছে। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হলেও অদৃশ্য কারণে এটি থামানো যায়নি। তরুণ প্রজন্মকে যদি আসক্তি থেকে মুক্তি দেয়া না যায়, তবে তাদের একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

শিগগিরই বাংলাদেশে এই সন্ত্রাসভিত্তিক গেমস বন্ধ করা জরুরি। তদুপরি, বাচ্চাদের এ জাতীয় আসক্তি থেকে বাঁচাতে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া দরকার। আমাদের অনলাইন বিশ্বে শিক্ষার্থীদের জন্য মানবিক ও স্বাস্থ্যকর বিনোদন নিশ্চিত করতে হবে, তাদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং তাদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় জড়িত হতে উৎসাহিত করতে হবে, ফেসবুকের ভালো ও শিক্ষণীয় স্টোরিজগুলো ব্যবহারে নির্দিষ্ট পদ্ধতি বের করতে হবে। সরকার ইন্টারনেটভিত্তিক এ জাতীয় বিনোদন ব্যবহারে কঠোর আইনি বিধিনিষেধ জারি করতে পারেন, এমনকি বিটিআরসি নেট গতি দুর্বল করে তাদের এ জাতীয় গেম খেলতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। আমাদের শিক্ষার্থীদের সামাজিক সুরক্ষা নীতি বজায় রেখে খেলার মাঠে যেতে এবং খেলার ব্যবস্থা করতে দেয়া উচিত। তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং বিশ্বে তাদের সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর জন্য, মাদকের আসক্তিকে আমরা ‘না’ বলার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল আসক্তিকে আমাদের ‘না’ বলতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এখন ক্ষতটি ছোট, এটি ওষুধ দিয়ে নিরাময় করা যাবে, তবে ক্ষতটি বড় হয়ে গেলে তা নিরাময় করা কঠিন হবে। সুতরাং আসুন আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের তরুণ প্রজন্ম শিক্ষার্থীদের আলোর পথে ফিরিয়ে আনি এবং অনলাইনভিত্তিক সব গেম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করি। শিক্ষক, বাবা-মা এবং আপামর জনসাধারণ সবাই যদি নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে তবে আমাদের শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল আসক্তি থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে।

[লেখক : প্রিন্সিপাল, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ঢাকা]

উন্নত বাংলাদেশের কাণ্ডারি

সংশপ্তকের জন্য জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা: স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

অপার সম্ভাবনার পর্যটন

ভাবমূর্তির উন্নয়ন

ধর্ম যখন বর্ম

ফল ও সবজি রপ্তানি এবং কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউজ

আফগানিস্তানে তালেবান ও ভূলুণ্ঠিত মানবাধিকার

বিমানবন্দরে পিসিআর ল্যাব স্থাপন প্রসঙ্গে

আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য

পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থিদের নেতৃত্বে কারা আসছেন

বোনেরা প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হলে কী করবেন?

ছবি

তালেবানরা উদারপন্থি হচ্ছে কি

ছবি

কারিকুলাম প্রণয়নের চেয়ে বাস্তবায়নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ

দুর্বিনীত লোভের ফাঁদ

কিশোর শিক্ষার্থীদের কোভিড ভ্যাকসিন

সমাপনী পরীক্ষা এবার থেকেই বাদ নয় কেন

ইটিং ডিজঅর্ডার সম্পর্কে জানা জরুরি

ধনী হওয়ার মন্ত্র ও বোকা বানানোর যন্ত্র

মুজিব বাহিনী ও মুজিববাদ

দেশের ইস্পাত শিল্প

আদিবাসীদের শ্মশানও দখল হয়ে গেল

অন্ধকার অতল গহ্বরে আফগান জনগণ

সংকটে রবিদাস জনগোষ্ঠী

প্রশাসনকে মাটির কাছাকাছি আসতে হবে

তালেবানদের সরকার গঠন

যেখানে সময় এসে মানুষকে ধরা দেয়

পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী রাজনীতির ঘূর্ণাবর্ত

ছবি

শিক্ষা দিবস

সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শূন্যতা ও জঙ্গিবাদ

ঐতিহাসিক সত্য উন্মোচনে ট্রুথ কমিশন

’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন ও আজকের শিক্ষা

আন্তর্জাতিক ওজন দিবস

ভূমিসংক্রান্ত অপরাধ দমনে আইন প্রণয়ন জরুরি

ছবি

শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা

বেশি দামে সার বিক্রিতে প্রতারিত হচ্ছেন কৃষক

tab

উপ-সম্পাদকীয়

শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল আসক্তি

মাহমুদুল হাছান

image

রোববার, ২৫ জুলাই ২০২১

‘আসক্তি’ সবার কাছে একটি সুপরিচিত শব্দ। আসক্তি হলো কোন কিছুর প্রতি এমন তীব্র নেশা, টান বা মোহ যা থেকে সামান্য সময়ের জন্য বিচ্যুত হলে মানসিকভাবে কেউ চরম অসুস্থ অনুভব করে। যেমন মদ বা মাদক জাতীয় দ্রব্যাদির প্রতি কারোর নেশা থাকলে তাকে আমরা মাদকাসক্ত বলে থাকি। কেহ ধূমপানে নেশাগ্রস্ত হলে তাকে বলি ধূমপানাসক্ত। এ ধরনের আসক্তি সম্পর্কে আমরা সচরাচর শুনে থাকি, কিন্তু ডিজিটাল আসক্তি বর্তমানে কিশোর-কিশোরীদের জন্য এক মারাত্মক আসক্তি, যে ব্যাপারে আমরা অনেকেই জানি না বা অহর্নিশ শুনতেও পাই না। তবে অনলাইন পদ্ধতিতে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা শুরু হলে ডিজিটাল আসক্তির কথাটি বিভিন্ন মিডিয়ায় বেশ আলোচিত হচ্ছে, যা অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডিজিটাল আসক্তি বলতে ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি এমন মোহ বা টান যা ব্যবহারকারীদের মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন করে তোলে এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তথা ভিডিও গেম, অনলাইন বিনোদন, মোবাইল অপারেশন, ডিজিটাল গ্যাজেট এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্ক প্ল্যাটফর্মগুলোতে নেশাগ্রস্ত করে রাখে। এককথায়, ডিজিটাল আসক্তিতে আক্রান্ত ব্যক্তি অনলাইন কার্যক্রমে এমনভাবে ঝুঁকে পড়ে যা তার দৈনন্দিন আবশ্যকীয় কর্মকা- সম্পন্ন করা থেকে বিরত রাখে এবং তার স্বাভাবিক আচার-আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ডিজিটাল আসক্তির তিনটি ধরন রয়েছে, যথা ফোন আসক্তি, ইন্টারনেট আসক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি। সব বয়সের মানুষের মধ্যে এ আসক্তি দেখা দিলেও কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থীরা এ আসক্তিতে বেশি আক্রান্ত। ডিজিটাল আসক্তি মানুষে মানুষে সম্পর্কের সূক্ষ্ম দিকগুলো দুর্বল করে দেয় এবং সামাজিকভাবে একে অন্যের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে। পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশে ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বিষ্ময়করহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি বা ১০০ মিলিয়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি যার মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৯৩.৭০২ মিলিয়ন যা মোট জনসংখ্যার ৬২%। করোনাকালে, এ সংখ্যা আরও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফেসবুকের ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় হুমকি। ছাত্র, শিক্ষক, বৃদ্ধ, বনিতাসহ প্রায় সব শ্রেণী-পেশার মানুষ এ ফেসবুকের সঙ্গে জড়িত। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উই আর সোশ্যাল’ আর কানাডাভিত্তিক ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠান হুটস্যুইটের যৌথ জরিপে প্রকাশিত হয়েছে যে, সারা বিশ্বে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিবেচনায় ঢাকা দ্বিতীয় যার সংখ্যা ২২ মিলিয়ন বা ২ কোটি ২০ লাখ। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ব্যাংকক শহর, ৩ কোটি আর তৃতীয় স্থানে আছে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত গড়ে দৈনিক সক্রিয় ব্যবহারকারী (ডেইলি অ্যাক্টিভ ইউজার) ছিল ১৫৬ কোটি, যা গত বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি। এছাড়া এখন গড়ে প্রতিদিন ২১০ কোটি ব্যবহারকারী হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম ও মেসেঞ্জার সেবা ব্যবহার করছেন। এছাড়া গড়ে ২৭০ কোটি ব্যবহারকারী কোনো না কোনোভাবে ফেসবুক পরিবারের যে কোন সেবার সঙ্গে যুক্ত।

বর্তমানে শিক্ষাধারা অব্যাহত রাখতে অনলাইন শিক্ষার প্ল্যাটফর্মই একমাত্র অবলম্বন। কারণে-অকারণে শিক্ষার্থীদের অনলাইনে বসতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে অনলাইন শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা ক্লাসের অন্তরালে ঝুঁকে পড়ছে নানা ধরনের অপ্রাসঙ্গিক বিনোদনে যা তাদের মারাত্মকভাবে আসক্ত করে তুলছে। অনলাইন গেম ও ফেসবুক এদের মধ্যে অন্যতম। সুযোগ পেলেই শিক্ষার্থীরা ফেসবুক ও অনলাইন গেমসের দিকে ঝুঁকছেন। অনলাইনে পড়ানোর সময় ইন্টারনেটে শিক্ষকদের তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় শিক্ষার্থীরা ফোন গেমিংয়ে জড়িয়ে পড়ে, ইউটিউবে অশ্লীল ছবি ও গানের প্রতি তাদের আসক্তি বাড়ে এবং কখনো কখনো ফেসবুক চ্যাটিং-এ যুক্ত হয়ে যায়।

সময়ের আবর্তে সবকিছুই পরিবর্তন হচ্ছে। জীবনের রূপ ও বর্ণে পরিবর্তন এসেছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন চিন্তাগুলো আসছে এবং পুরোনো চিন্তার জগতকে গ্রাস করছে। বিকেলে মাঠে খেলতে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে বাইরে বেরোনো, পরিবারের সঙ্গে বসে গল্প করা, সহপাঠীদের সঙ্গে বিনোদন করা- এসব এই ডিজিটাল যুগে নতুন প্রজন্মকে যেন কেবল আড়ষ্ঠ করে চলেছে। কখোনও বা কয়েকজন বন্ধু একসঙ্গে বসে গল্প করলেও সেখানে দেখা যায় সবার নজর ফোনের চার-কোণার স্ক্রিনে। এখন কেউ কাউকে সময় দেয় না। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীদের মাঝে এ গেমাসক্তি দিন দিন বেড়েই চলছে।

এখন, শিক্ষার্থীরা বিনোদনের জন্য অনলাইন গেমস, পাবজি এবং ফ্রি ফায়ার বেছে নেয়। ঘরের এক কোণে বসে মাতাল হয়ে অনলাইনে ভিডিও গেম খেলছে। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের চার কোণে তাদের সময় পার করছে। শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের জন্য সর্বাধিক জনপ্রিয় অনলাইন ভিডিও গেমগুলো হলো পাবজি এবং ফ্রি ফায়ার, যা আজকাল অত্যধিক খেলতে দেখা যায়। প্লেয়ার অজানা ব্যাটেল গ্রাউন্ড (পিইউবিজি), দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্থা ব্লু-হোয়েল সহযোগী প্রতিষ্ঠান দ্বারা বিকশিত একটি খেলা পাপজি এবং ফ্রি ফায়ারের মতো অনলাইন গেমের শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

পাবজি গেমের বিশ্লেষণে দেখা যায় যে একটি পরিত্যক্ত দ্বীপে ১০০ জন লোক বাস করছেন, যেখানে কিছু খেলোয়াড় প্যারাসুট নিয়ে এসে বেঁচে থাকার লড়াই শুরু করে দেয়। এটি চার গ্রুপে খেলা যায়। এই চারজন খেলোয়াড় ১০০ জনকে হত্যার বড় লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। এই গেমের মূল ভিত্তি হলো ‘হত্যা করো, বেঁচে থাকো’। এক কথায় ‘টিকে থাকার জন্য, হত্যা করো’ এটি এ গেমটির মূল লক্ষ্য। ফ্রি ফায়ারও এই গেমটির আদলে সৃষ্ট একটি মডেল গেম।

বিশ্ব পরিসংখ্যানগুলোতে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা এ দুটি গেম সবচেয়ে বেশি খেলছে। একাধিক সমীক্ষা অনুসারে, বর্তমানে বিশ্বের ৮৭ কোটি ছেলেমেয়ে প্রতিদিন পাবজি এবং ফ্রি ফায়ার খেলছে। গুগল প্লে স্টোর থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ডাউনলোড করা হচ্ছে। অন্য একটি অনলাইন সমীক্ষা বলছে যে বাংলাদেশে প্রতিদিন এক কোটিরও বেশি এ গেম খেলা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিশ্বের প্রায় ৫০ কোটি মানুষ প্রতিদিন ফ্রি ফায়ার গেমটি খেলছে। বাংলাদেশে প্রায় ৭ মিলিয়ন মানুষ খেলছে। অন্য একটি জরিপে দেখা গেছে যে কিশোর এবং তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের ৮.৬ শতাংশ ইন্টারনেট গেমিংয়ে আসক্ত। এর মধ্যে ৪.৮ শতাংশ কিশোর এবং ১.৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক।

বাংলাদেশ টেলিযোগযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) অনুসারে, ২০১২ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের প্রায় ৯.৩৭ কোটি মানুষ ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। ২০১৬ সালের তথ্য অনুসারে, শিক্ষার্থীদের ৩৫ শতাংশ মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের, অর্থাৎ কিশোর-কিশোরী। মহামারীর সময় এটি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এগুলি বেশিরভাগই অস্বাভাবিকভাবে ডিজিটাল আসক্তির ঝুঁকিতে থাকে। ২০১৮ সালে আইসিডি-১১ এর একাদশ সংশোধিত সংস্করণে, গেমিং আসক্তি একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে গৃহীত হয়েছিল, যা এটি ২০২২ সালে প্রকাশিত আইসিডি-১১ শীর্ষক ডায়াগনসিস গাইড বইয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। অন্য কথায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই অনলাইন গেমস, সেল ফোন, কম্পিউটার বা ভিডিও গেমসের ক্ষতিকারক ব্যবহারকে একটি রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যাকে ডিজিটাল আসক্তি বলে আখ্যা দিয়েছেন। মজার বিষয় হলো, যারা এই গেমগুলো তৈরি করছে তারা তাদের ছেলেমেয়েদের এই গেমাসক্তি থেকে দূরে রেখেছেন। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো পরবর্তী প্রজন্মকে বুদ্ধিহীন অনুগত অনুসারী হিসেবে তৈরি করা।

প্রতিটি জনপ্রিয় ডিজিটাল গেম হলো ভয়ঙ্কর সন্ত্রাস-সহিংসতা যুদ্ধ এবং মৃত্যুর গল্প। অস্ট্রেলিয়ার ডায়াকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হেলেন ইয়ং তার নিবন্ধ ‘ভায়োলেন্স অ্যান্ড ফার-রাইটস’-এ লিখেছেন, সন্ত্রাসভিত্তিক ভিডিও গেমগুলো সন্ত্রাস-হিংসাকে সাধারণীকরণের ষড়যন্ত্র। এটি মানুষের অভ্যন্তরীণ অপরাধবোধকে উসকে দিচ্ছে। তরুণদের হত্যার বিষয়টি স্বাভাবিক হিসেবে ভাবাতে শেখানো হচ্ছে। মানুষের মধ্যে নৈতিকতা নষ্ট হচ্ছে। এমনকি রাস্তায় কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলেও এখন কেউই সামনে আসে না। গেম নির্মাতাদের মূল লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীদের মধ্যে এক ধরনের আসক্তি তৈরি করা। আসলে, বিশ্বজুড়ে কয়েক মিলিয়ন কিশোর ছাত্রছাত্রী ভিডিও গেমে আসক্ত। ফলস্বরূপ, সামাজিক মূল্যবোধ, শিক্ষা ও সংস্কৃতি ধ্বংস হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অক্ষম হয়ে উঠছে। এই আসক্তিটি তাদের সৃজনশীল শক্তিকে দুর্বল করছে। আসক্তি কখনও কখনও আত্মহত্যার মতো ভয়ঙ্কর পথে ডেকে নিচ্ছে। ২১ মে শাহজাহানপুরে তার মোবাইল ফোনে ‘ফ্রি ফায়ার গেম’ খেলতে না পারায় উম্মে হাবিবা বর্ষা নামে ষষ্ঠ শ্রেণীর এক ছাত্রী আত্মহত্যা করেছিল।

এই গেমগুলো খেলতে পর্যাপ্ত ডেটা প্রয়োজন, যার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন পড়ে। সম্প্রতি, দিনাজপুরের বিরামপুরে ফ্রি ফায়ার ডেটা কিনতে অর্থের ব্যবস্থা করতে না পারায় রিপন নামের এক স্কুলছাত্র আত্মহত্যা করেছিল। বাংলাদেশের একটি অনলাইন সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভিডিও গেমসের কারণে এ বছর প্রায় ১৭ জন আত্মহত্যা করেছে। অনলাইন গেমগুলোর আসক্তির কারণে আত্মহত্যার তালিকাটি দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন ভিডিও গেমের আসক্তি মাদকের চেয়ে মারাত্মক। তারা এর নাম দিয়েছিল ‘ডিজিটাল ড্রাগ’। একজন মাদকসেবী মাদক না পেলে, নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়; একইভাবে, অনলাইন গেম আসক্তরা গেমটি খেলতে না পেরে আত্মহত্যা করতেও দ্বিধা করে না। মাদকের আসক্তির মতো, অনলাইন গেম থেকে বেরিয়ে আসা খুব কঠিন। তবে দৃঢ় ইচ্ছা শক্তি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকা- বা পরিষেবাদিতে নিজেকে জড়িত রেখে গেমের আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

এই ধরনের গেমগুলোর ভয়াবহতা বিবেচনা করে, ভারত, নেপাল, জাপান, ইরান এবং আরও অনেক দেশের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো পাবজি এবং ফ্রি ফায়ার গেমগুলোকে নিষিদ্ধ করেছে। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হলেও অদৃশ্য কারণে এটি থামানো যায়নি। তরুণ প্রজন্মকে যদি আসক্তি থেকে মুক্তি দেয়া না যায়, তবে তাদের একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

শিগগিরই বাংলাদেশে এই সন্ত্রাসভিত্তিক গেমস বন্ধ করা জরুরি। তদুপরি, বাচ্চাদের এ জাতীয় আসক্তি থেকে বাঁচাতে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া দরকার। আমাদের অনলাইন বিশ্বে শিক্ষার্থীদের জন্য মানবিক ও স্বাস্থ্যকর বিনোদন নিশ্চিত করতে হবে, তাদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং তাদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় জড়িত হতে উৎসাহিত করতে হবে, ফেসবুকের ভালো ও শিক্ষণীয় স্টোরিজগুলো ব্যবহারে নির্দিষ্ট পদ্ধতি বের করতে হবে। সরকার ইন্টারনেটভিত্তিক এ জাতীয় বিনোদন ব্যবহারে কঠোর আইনি বিধিনিষেধ জারি করতে পারেন, এমনকি বিটিআরসি নেট গতি দুর্বল করে তাদের এ জাতীয় গেম খেলতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। আমাদের শিক্ষার্থীদের সামাজিক সুরক্ষা নীতি বজায় রেখে খেলার মাঠে যেতে এবং খেলার ব্যবস্থা করতে দেয়া উচিত। তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং বিশ্বে তাদের সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর জন্য, মাদকের আসক্তিকে আমরা ‘না’ বলার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল আসক্তিকে আমাদের ‘না’ বলতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এখন ক্ষতটি ছোট, এটি ওষুধ দিয়ে নিরাময় করা যাবে, তবে ক্ষতটি বড় হয়ে গেলে তা নিরাময় করা কঠিন হবে। সুতরাং আসুন আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের তরুণ প্রজন্ম শিক্ষার্থীদের আলোর পথে ফিরিয়ে আনি এবং অনলাইনভিত্তিক সব গেম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করি। শিক্ষক, বাবা-মা এবং আপামর জনসাধারণ সবাই যদি নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে তবে আমাদের শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল আসক্তি থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে।

[লেখক : প্রিন্সিপাল, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ঢাকা]

back to top