alt

উপ-সম্পাদকীয়

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে খাদ্য আমদানি

নিতাই চন্দ্র রায়

: শনিবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ লাখ টন বেশি চাল উৎপাদন, আউসের বাম্পার ফলন এবং মজুত ভালো থাকা সত্ত্বেও কমছে না চালের দাম। দেশের প্রধান খাদ্য চালের বাজার সহনীয় করতে ও আমদানি বাড়াতে শুল্ক কমাতে বাধ্য হয়েছে সরকার। চাল আমদানির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। গত ১২ আগস্টের সিদ্ধান্তের ফলে এখন ১৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে সিদ্ধ ও আতপ চাল আমদানি করা যাবে। তবে এই সুবিধা তিন মাস অর্থাৎ অক্টোবর পর্যন্ত বহাল থাকবে বলে জানিয়েছে এনবিআর। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সরকার কী পরিমাণ চাল আমদানির অনুমতি দেবে তার ওপর। বেশি চাল আমদানির অনুমতি দিলে আমন চাষিরা ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন। বর্তমানে সারা দেশে চলছে আমন ধানের চারা রোপণ ও পরিচর্যার কাজ। এ ধান আগামী অক্টোবর-নভেম্বর মাসে কাটা হবে।

আগামী ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশে আসছে ৮ লাখ ৯ হাজার টন সিদ্ধ ও আতপ চাল। সম্প্রতি দুই দফায় আমদানির জন্য ১৬৩ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। গত ২১ আগস্ট ৯২টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নামে চাল আমদানির জন্য বরাদ্দ দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এতে বরাদ্দ রয়েছে নন বাসমতি সিদ্ধ চাল ৩ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং আতপ চাল ৩৩ হাজার টন। এর আগে গত ১৮ আগস্ট ৭১টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির অনুকূলে আমদানির জন্য বরাদ্দ দিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই দফায় চালের পরিমাণ ছিল নন বাসমতি সিদ্ধ চাল ৩ লাখ ৬২ হাজার টন এবং আতপ চাল ৫৬ হাজার টন উভয় ক্ষেত্রেই শর্ত- চালে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ভাঙা দানা থাকতে পারবে। আমদানির শর্তে আরও বলা হয়েছে, বরাদ্দ আদেশ জারির ১৫ দিনের মধ্যে এলসি খুলতে হবে এবং এ সংক্রান্ত তথ্য খাদ্য মন্ত্রণালয়কে ই-মেইলে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করতে হবে। বরাদ্দ পাওয়া আমদানিকারকদের আগামী ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পুরো চাল বাংলাদেশে বাজারজাত করতে হবে। বরাদ্দের অতিরিক্ত আইপি (ইমপোর্ট পারমিট) ইস্যু করা যাবে না। আমদানি করা চাল স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানের নামে ফের প্যাকেটজাত করা যাবে না বলেও শর্তে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া প্লাস্টিকের বস্তায় আমদানি করা চাল বিক্রি করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাংকে এলসি খুলতে ব্যর্থ হলে বরাদ্দ বাতিল হয়ে যাবে বলেও শর্ত দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। প্রসঙ্গত, অনেকদিন ধরেই দেশে চালের বাজার অস্থিতিশীল রয়েছে। বোরো মৌসুমেও চালের বাজার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। গরিবের মোটা চালের কেজি প্রতি দাম ৫০ টাকার কাছাকাছি। চিকন চালের কেজি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। এমতাবস্থায় সরকারে পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও চাল আমদানির সুযোগ দিল সরকার।

চাল আমদানি শুল্ক শতকরা ২৫ থেকে ১৫% এ হ্রাস করার সংবাদ পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার পর থেকে দেশের বিাভন্ন স্থানে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ৫ টাকা কমে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রতি মণ ধানের দাম ১২০০ টাকা থেকে ১১২০ টাকায় হ্রাস পাওয়ার খবরে কৃষকদের মধ্যে ধানের ন্যায্যমূল্য নিয়ে অজানা শঙ্কা বিরাজ করছে। চিকনা মনোহর গ্রামের একজন প্রগতিশীল কৃষক মো. সফর উদ্দিন বলেন, এ সময় বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা হলে কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন এবং লাভবান হবেন আমদানিকারকরা। কোন আমদানিকারক যাতে অনুমোদনের অতিরিক্ত চাল আমদানি করতে না পারেন সেদিকে সরকারকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। যেহেতু নভেম্বর মাসের প্রথম থেকে আমন ধান মাড়াই শুরু হবে, তাই অক্টোবর মাসের পর আমনের ভরা মৌসুমে কৃষকের স্বার্থে দেশে কোন চাল আমদানি করা যাবে না।

২০১৭ সালে হাওরে আগাম বন্যায় বোরো ধান তলিয়ে গেলে ১০ লাখ মেট্রিক টন চাল কম উৎপাদিত হয়। চালের ঘাটতি পূরণে সরকার আমদানি শুল্ক কমিয়ে দিলে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী সে সুযোগে বিদেশ থেকে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানি করে। ফলশ্রুতিতে পরবর্তী দুই বছর কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। কৃষক রাগে-অভিমানে ধান ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দেয়। কোথাও কোথাও কৃষক মহাসড়কে ধান ফেলে প্রতিবাদ জানান। এবার আমদানি শুল্ক হ্রাসের সুযোগে যাতে বরাদ্দের অতিরিক্ত চাল দেশে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যাপারে সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। সেই সঙ্গে নিয়মিত চালের বাজার মূল্যায়ন করে তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া ভোক্তার স্বার্থে ভিজিএফ, ভিজিডি ও ওএমএসের মাধ্যমে চাল বিক্রি কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

ভোক্তা ও কৃষকের স্বার্থে সরকার চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। এ মুহূর্তে সরকারের চালের মজুত রয়েছে ১৭ লাখ মেট্রিক টন। চলমান বোরো সংগ্রহ অভিযানে ইতোমধ্যে সাড়ে আট লাখ টন চাল সংগ্রহ হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় হলেও গত কয়েক বছর ধরেই খাদ্য আমদানি নির্ভরতা বাড়ছে, যা কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়। কোন একটি দেশের খাদ্যশস্যের আমদানি নির্ভরতার হার নিরূপণ করা হয় মোট আমদানির পরিমাণকে মোট উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে ভাগ ও ১০০ দিয়ে গুণ করে। এক দশক আগেও বাংলাদেশের আমদানি নির্ভরতার হার ছিল এক অঙ্কের ঘরে। কিন্তু ছয় বছর ধরে তা দুই অঙ্করে ঘরে রয়েছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে তা ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে খাদ্য আমদানি নির্ভরতার হার ছিল ১৭ দশমিক ১০ শতাংশ। ওই সময় দেশে মোট চাল ও গম আমদানি হয়েছিল ৬৪ লাখ ৫৬ হাজার টন এবং মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৩৩ হাজার টন। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশে। সরকারি মজুত হ্রাস ও বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠার কারণে গত অর্থবছরের কয়েক মাসের মধ্যে বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি বাড়াতে শুল্কছাড় সুবিধা দেয়ার সুবাদে দেশে শুধু চালেরই আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ লাখ টনে। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে দেশে মোট খাদ্যশস্য আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৬ লাখ ৫৬ হাজার টনে। ইউএসডিএর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী এ সময় দেশে খাদ্য শস্য উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৭৩ লাখ ৮০ হাজার টন। গত কয়েক বছরে দেশে আমদানি নির্ভরতা বেড়েছে অনেক। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে আমদানি নির্ভরতার হার ছিল ১৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই নির্ভরতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে বোরো ধান বন্যায় বিনষ্ট হওয়ার কারণে। ওই সময় আমদানি নির্ভরতার পরিমাণ ছিল ২৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমদানি নির্ভরতার হার ছিল ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এর আগের বছরের আমদানি নির্ভরতার হার ছিল ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যশস্যের কৌশলগত মজুতের জন্য চাল আমদানি করা যেতে পারে। তবে সেটা কোনভাবেই মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশের বেশি নয়। মোট আমদানির পরিমাণ মোট উৎপাদনের ২০ শতাংশের বেশি হলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়। বেশি আমদানি করলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। খাদ্যশস্য উৎপাদনের জমির উৎপাদিকা শক্তি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে জমির উৎপাদিকা শক্তি নানা কারণে কমে গিয়েছে। আমাদের উৎপাদন উপকরণের ব্যবহারও ভারসাম্যহীন। বিশেষ করে কৃষক বেশি করে ইউরিয়া সার ও পানি ব্যবহার করছেন। সেখানেও গুরুত্ব দিতে হবে। আমদানি নির্ভরতা কমাতে হলে ফলন বাড়ানোর বিকল্প নেই। সেজন্য শস্যের জাতের উন্নয়ন ও মানসম্মত বীজ সরবরাহ বাড়ানো, মাটির স্বাস্থ্য, বালাই ব্যবস্থাপনা ও কৃষিতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, স্থানীয় সেবা প্রদান ব্যবস্থা উন্নয়ন করতে হবে। এছাড়া বাজার ব্যবস্থা, কৃষি গবেষণা ও যান্ত্রিকীকরণের উন্নয়ন, বিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণ কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিরও কোন বিকল্প নেই।

খাদ্যশস্যের বিশেষ করে ধানের উৎপাদন বাড়াতে হলে ভালো মানের বীজ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। দেশে মোট বীজ চাহিদার বড় অংশ সরবরাহ করা হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে। আবার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরবরাহকৃত বীজের মানহীনতার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এসব বীজ কিনে প্রতারিত হচ্ছেন কৃষক। হেক্টর প্রতি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বিশ্বের বেশিরভাগ ধান উৎপাদনকারী দেশগুলো হাইব্রিড ও উফশী জাতের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। চীনের মোট জমির প্রায় ৬০ শতাংশতে এখন হাইব্রিড ধানের আবাদ হচ্ছে। সে তুলনায় বাংলাদেশে মাত্র ১০ শতাংশ জমিতে হাইব্রিড ধানের চাষ হচ্ছে। বীজ উন্নয়নের ব্যাপারে যেমন সরকারি পর্যায়ে তদারকি দরকার, তেমনি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যাতে কৃষি খাতে বেশি বিনিয়োগ করে এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ প্রদান করে সে ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। গমের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ব্লাস্ট প্রতিরোধী উচ্চ ফলনশীল ঘাত সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন করতে হবে এবং গম চাষ ভুট্টা চাষের মতো লাভজনক হতে হবে। প্রতি বছর বিদেশ থেকে ৫০ থেকে ৬০ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানি করে বাংলাদেশ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে যেসব জমিতে আগে গমের চাষ হতো সেসব জমিতে এখন হচ্ছে ভুট্টার চাষ। কারণ ভুট্টার চাষ গম চাষের চেয়ে অধিক লাভজনক। তাই খাদ্যশস্যের আমদানি নির্ভরতা হ্রাসে দেশের চাহিদা মোতাবেক গম উৎপাদনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

[লেখক : মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন]

netairoy18@yahoo.com

অপার সম্ভাবনার পর্যটন

ভাবমূর্তির উন্নয়ন

ধর্ম যখন বর্ম

ফল ও সবজি রপ্তানি এবং কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউজ

আফগানিস্তানে তালেবান ও ভূলুণ্ঠিত মানবাধিকার

বিমানবন্দরে পিসিআর ল্যাব স্থাপন প্রসঙ্গে

আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য

পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থিদের নেতৃত্বে কারা আসছেন

বোনেরা প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হলে কী করবেন?

ছবি

তালেবানরা উদারপন্থি হচ্ছে কি

ছবি

কারিকুলাম প্রণয়নের চেয়ে বাস্তবায়নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ

দুর্বিনীত লোভের ফাঁদ

কিশোর শিক্ষার্থীদের কোভিড ভ্যাকসিন

সমাপনী পরীক্ষা এবার থেকেই বাদ নয় কেন

ইটিং ডিজঅর্ডার সম্পর্কে জানা জরুরি

ধনী হওয়ার মন্ত্র ও বোকা বানানোর যন্ত্র

মুজিব বাহিনী ও মুজিববাদ

দেশের ইস্পাত শিল্প

আদিবাসীদের শ্মশানও দখল হয়ে গেল

অন্ধকার অতল গহ্বরে আফগান জনগণ

সংকটে রবিদাস জনগোষ্ঠী

প্রশাসনকে মাটির কাছাকাছি আসতে হবে

তালেবানদের সরকার গঠন

যেখানে সময় এসে মানুষকে ধরা দেয়

পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী রাজনীতির ঘূর্ণাবর্ত

ছবি

শিক্ষা দিবস

সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শূন্যতা ও জঙ্গিবাদ

ঐতিহাসিক সত্য উন্মোচনে ট্রুথ কমিশন

’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন ও আজকের শিক্ষা

আন্তর্জাতিক ওজন দিবস

ভূমিসংক্রান্ত অপরাধ দমনে আইন প্রণয়ন জরুরি

ছবি

শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা

বেশি দামে সার বিক্রিতে প্রতারিত হচ্ছেন কৃষক

হাঁস-মুরগির রোগ ও চিকিৎসা

দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স

ছবি

রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব

tab

উপ-সম্পাদকীয়

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে খাদ্য আমদানি

নিতাই চন্দ্র রায়

শনিবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ লাখ টন বেশি চাল উৎপাদন, আউসের বাম্পার ফলন এবং মজুত ভালো থাকা সত্ত্বেও কমছে না চালের দাম। দেশের প্রধান খাদ্য চালের বাজার সহনীয় করতে ও আমদানি বাড়াতে শুল্ক কমাতে বাধ্য হয়েছে সরকার। চাল আমদানির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। গত ১২ আগস্টের সিদ্ধান্তের ফলে এখন ১৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে সিদ্ধ ও আতপ চাল আমদানি করা যাবে। তবে এই সুবিধা তিন মাস অর্থাৎ অক্টোবর পর্যন্ত বহাল থাকবে বলে জানিয়েছে এনবিআর। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সরকার কী পরিমাণ চাল আমদানির অনুমতি দেবে তার ওপর। বেশি চাল আমদানির অনুমতি দিলে আমন চাষিরা ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন। বর্তমানে সারা দেশে চলছে আমন ধানের চারা রোপণ ও পরিচর্যার কাজ। এ ধান আগামী অক্টোবর-নভেম্বর মাসে কাটা হবে।

আগামী ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশে আসছে ৮ লাখ ৯ হাজার টন সিদ্ধ ও আতপ চাল। সম্প্রতি দুই দফায় আমদানির জন্য ১৬৩ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। গত ২১ আগস্ট ৯২টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নামে চাল আমদানির জন্য বরাদ্দ দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এতে বরাদ্দ রয়েছে নন বাসমতি সিদ্ধ চাল ৩ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং আতপ চাল ৩৩ হাজার টন। এর আগে গত ১৮ আগস্ট ৭১টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির অনুকূলে আমদানির জন্য বরাদ্দ দিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই দফায় চালের পরিমাণ ছিল নন বাসমতি সিদ্ধ চাল ৩ লাখ ৬২ হাজার টন এবং আতপ চাল ৫৬ হাজার টন উভয় ক্ষেত্রেই শর্ত- চালে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ভাঙা দানা থাকতে পারবে। আমদানির শর্তে আরও বলা হয়েছে, বরাদ্দ আদেশ জারির ১৫ দিনের মধ্যে এলসি খুলতে হবে এবং এ সংক্রান্ত তথ্য খাদ্য মন্ত্রণালয়কে ই-মেইলে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করতে হবে। বরাদ্দ পাওয়া আমদানিকারকদের আগামী ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পুরো চাল বাংলাদেশে বাজারজাত করতে হবে। বরাদ্দের অতিরিক্ত আইপি (ইমপোর্ট পারমিট) ইস্যু করা যাবে না। আমদানি করা চাল স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানের নামে ফের প্যাকেটজাত করা যাবে না বলেও শর্তে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া প্লাস্টিকের বস্তায় আমদানি করা চাল বিক্রি করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাংকে এলসি খুলতে ব্যর্থ হলে বরাদ্দ বাতিল হয়ে যাবে বলেও শর্ত দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। প্রসঙ্গত, অনেকদিন ধরেই দেশে চালের বাজার অস্থিতিশীল রয়েছে। বোরো মৌসুমেও চালের বাজার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। গরিবের মোটা চালের কেজি প্রতি দাম ৫০ টাকার কাছাকাছি। চিকন চালের কেজি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। এমতাবস্থায় সরকারে পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও চাল আমদানির সুযোগ দিল সরকার।

চাল আমদানি শুল্ক শতকরা ২৫ থেকে ১৫% এ হ্রাস করার সংবাদ পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার পর থেকে দেশের বিাভন্ন স্থানে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ৫ টাকা কমে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রতি মণ ধানের দাম ১২০০ টাকা থেকে ১১২০ টাকায় হ্রাস পাওয়ার খবরে কৃষকদের মধ্যে ধানের ন্যায্যমূল্য নিয়ে অজানা শঙ্কা বিরাজ করছে। চিকনা মনোহর গ্রামের একজন প্রগতিশীল কৃষক মো. সফর উদ্দিন বলেন, এ সময় বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা হলে কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন এবং লাভবান হবেন আমদানিকারকরা। কোন আমদানিকারক যাতে অনুমোদনের অতিরিক্ত চাল আমদানি করতে না পারেন সেদিকে সরকারকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। যেহেতু নভেম্বর মাসের প্রথম থেকে আমন ধান মাড়াই শুরু হবে, তাই অক্টোবর মাসের পর আমনের ভরা মৌসুমে কৃষকের স্বার্থে দেশে কোন চাল আমদানি করা যাবে না।

২০১৭ সালে হাওরে আগাম বন্যায় বোরো ধান তলিয়ে গেলে ১০ লাখ মেট্রিক টন চাল কম উৎপাদিত হয়। চালের ঘাটতি পূরণে সরকার আমদানি শুল্ক কমিয়ে দিলে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী সে সুযোগে বিদেশ থেকে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানি করে। ফলশ্রুতিতে পরবর্তী দুই বছর কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। কৃষক রাগে-অভিমানে ধান ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দেয়। কোথাও কোথাও কৃষক মহাসড়কে ধান ফেলে প্রতিবাদ জানান। এবার আমদানি শুল্ক হ্রাসের সুযোগে যাতে বরাদ্দের অতিরিক্ত চাল দেশে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যাপারে সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। সেই সঙ্গে নিয়মিত চালের বাজার মূল্যায়ন করে তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া ভোক্তার স্বার্থে ভিজিএফ, ভিজিডি ও ওএমএসের মাধ্যমে চাল বিক্রি কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

ভোক্তা ও কৃষকের স্বার্থে সরকার চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। এ মুহূর্তে সরকারের চালের মজুত রয়েছে ১৭ লাখ মেট্রিক টন। চলমান বোরো সংগ্রহ অভিযানে ইতোমধ্যে সাড়ে আট লাখ টন চাল সংগ্রহ হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় হলেও গত কয়েক বছর ধরেই খাদ্য আমদানি নির্ভরতা বাড়ছে, যা কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়। কোন একটি দেশের খাদ্যশস্যের আমদানি নির্ভরতার হার নিরূপণ করা হয় মোট আমদানির পরিমাণকে মোট উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে ভাগ ও ১০০ দিয়ে গুণ করে। এক দশক আগেও বাংলাদেশের আমদানি নির্ভরতার হার ছিল এক অঙ্কের ঘরে। কিন্তু ছয় বছর ধরে তা দুই অঙ্করে ঘরে রয়েছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে তা ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে খাদ্য আমদানি নির্ভরতার হার ছিল ১৭ দশমিক ১০ শতাংশ। ওই সময় দেশে মোট চাল ও গম আমদানি হয়েছিল ৬৪ লাখ ৫৬ হাজার টন এবং মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৩৩ হাজার টন। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশে। সরকারি মজুত হ্রাস ও বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠার কারণে গত অর্থবছরের কয়েক মাসের মধ্যে বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি বাড়াতে শুল্কছাড় সুবিধা দেয়ার সুবাদে দেশে শুধু চালেরই আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ লাখ টনে। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে দেশে মোট খাদ্যশস্য আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৬ লাখ ৫৬ হাজার টনে। ইউএসডিএর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী এ সময় দেশে খাদ্য শস্য উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৭৩ লাখ ৮০ হাজার টন। গত কয়েক বছরে দেশে আমদানি নির্ভরতা বেড়েছে অনেক। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে আমদানি নির্ভরতার হার ছিল ১৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই নির্ভরতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে বোরো ধান বন্যায় বিনষ্ট হওয়ার কারণে। ওই সময় আমদানি নির্ভরতার পরিমাণ ছিল ২৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমদানি নির্ভরতার হার ছিল ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এর আগের বছরের আমদানি নির্ভরতার হার ছিল ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যশস্যের কৌশলগত মজুতের জন্য চাল আমদানি করা যেতে পারে। তবে সেটা কোনভাবেই মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশের বেশি নয়। মোট আমদানির পরিমাণ মোট উৎপাদনের ২০ শতাংশের বেশি হলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়। বেশি আমদানি করলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। খাদ্যশস্য উৎপাদনের জমির উৎপাদিকা শক্তি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে জমির উৎপাদিকা শক্তি নানা কারণে কমে গিয়েছে। আমাদের উৎপাদন উপকরণের ব্যবহারও ভারসাম্যহীন। বিশেষ করে কৃষক বেশি করে ইউরিয়া সার ও পানি ব্যবহার করছেন। সেখানেও গুরুত্ব দিতে হবে। আমদানি নির্ভরতা কমাতে হলে ফলন বাড়ানোর বিকল্প নেই। সেজন্য শস্যের জাতের উন্নয়ন ও মানসম্মত বীজ সরবরাহ বাড়ানো, মাটির স্বাস্থ্য, বালাই ব্যবস্থাপনা ও কৃষিতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, স্থানীয় সেবা প্রদান ব্যবস্থা উন্নয়ন করতে হবে। এছাড়া বাজার ব্যবস্থা, কৃষি গবেষণা ও যান্ত্রিকীকরণের উন্নয়ন, বিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণ কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিরও কোন বিকল্প নেই।

খাদ্যশস্যের বিশেষ করে ধানের উৎপাদন বাড়াতে হলে ভালো মানের বীজ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। দেশে মোট বীজ চাহিদার বড় অংশ সরবরাহ করা হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে। আবার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরবরাহকৃত বীজের মানহীনতার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এসব বীজ কিনে প্রতারিত হচ্ছেন কৃষক। হেক্টর প্রতি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বিশ্বের বেশিরভাগ ধান উৎপাদনকারী দেশগুলো হাইব্রিড ও উফশী জাতের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। চীনের মোট জমির প্রায় ৬০ শতাংশতে এখন হাইব্রিড ধানের আবাদ হচ্ছে। সে তুলনায় বাংলাদেশে মাত্র ১০ শতাংশ জমিতে হাইব্রিড ধানের চাষ হচ্ছে। বীজ উন্নয়নের ব্যাপারে যেমন সরকারি পর্যায়ে তদারকি দরকার, তেমনি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যাতে কৃষি খাতে বেশি বিনিয়োগ করে এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ প্রদান করে সে ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। গমের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ব্লাস্ট প্রতিরোধী উচ্চ ফলনশীল ঘাত সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন করতে হবে এবং গম চাষ ভুট্টা চাষের মতো লাভজনক হতে হবে। প্রতি বছর বিদেশ থেকে ৫০ থেকে ৬০ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানি করে বাংলাদেশ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে যেসব জমিতে আগে গমের চাষ হতো সেসব জমিতে এখন হচ্ছে ভুট্টার চাষ। কারণ ভুট্টার চাষ গম চাষের চেয়ে অধিক লাভজনক। তাই খাদ্যশস্যের আমদানি নির্ভরতা হ্রাসে দেশের চাহিদা মোতাবেক গম উৎপাদনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

[লেখক : মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন]

netairoy18@yahoo.com

back to top