alt

উপ-সম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা সংকট : নিরাপত্তা পরিষদেও প্রচেষ্টা চালাতে হবে

মর্তুজা হাসান সৈকত

: বুধবার, ২৪ নভেম্বর ২০২১

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে প্রথমবারের মতো একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে। প্রত্যাশা করা হচ্ছে- প্রস্তাবটি মায়ানমারে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়তা করবে। প্রস্তাবে রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সাথে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাধ্যবাধকতাগুলো পূরণ করা এবং মায়ানমারে নিযুক্ত জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতসহ জাতিসংঘের সব মানবাধিকার ব্যবস্থাপনাকে পূর্ণ সহযোগিতা দিতে মায়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ প্রস্তাব গ্রহণকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ অতীতে অনেক দেশ এ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিলেও এবার কেউ বিরোধিতা করেনি। এমনকি জাতিসংঘে মায়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি ও সামরিক জান্তার প্রতি অনাস্থা জানিয়ে প্রস্তাবটি সমর্থন করেছেন। এর পাশাপাশি আরেকটি কারণেও এ প্রস্তাবটি ঐতিহাসিক- মায়ানমার ইস্যুতে অধিকাংশ সদস্য দেশের সঙ্গে দৃশ্যত দ্বিমত প্রকাশকারী দেশ চীন ও রাশিয়াও অন্যান্যবারের মতো এবার বিপক্ষে দাঁড়ায়নি।

এমন এক সময়ে এ প্রস্তাবটি পাস হয়েছে যার কিছুদিন পূর্বে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৭৬তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতি ‘অতি জরুরি’ ভিত্তিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন জোরদার করার দাবি জানিয়ে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ প্রস্তাব পাসের কারণে মায়ানমার কতখানি চাপের মুখে পড়ল- এ নিয়ে সন্দেহ কিছুটা রয়েই গেছে। কারণ সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাব দিয়ে কোনো বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এজন্য প্রয়োজন নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মত প্রস্তাব। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই সত্যি যে, এতদিন চীন ও রাশিয়া সেখানে মায়ানমারের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করার কারণে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়নি। তবে এবার যেহেতু দেশ দুটি সাধারণ পরিষদে বিরোধিতা করেনি সেক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষেত্রেও হয়তো আগের অবস্থান পর্যালোচনা করতে পারে।

এবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানের পর একটি জোরালো পদক্ষেপ এলেও প্রশ্ন আসতে পারে এতদিনেও কেন প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি? এর কারণ হচ্ছে, জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো রোহিঙ্গাদের ওপর চলা জাতিগত নিধন নিয়ে সোচ্চার হলেও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো যারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে মোটাদাগে ভূমিকা রাখতে পারতো তারা বাংলাদেশ আশ্বাস দিলেও আশানুরূপ সহযোগিতা করেনি। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে মাঠে রেফারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া চীনের ভূমিকা বাংলাদেশকে বরাবরই হতাশ করেছে। দেশটি শুরু থেকেই বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে উপস্থাপনের পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় সমাধানের পক্ষে কাজ করেছে। নিরাপত্তা পরিষদে তারা বারবার ভেটো প্রয়োগ করেছে, প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে কেবল তাদের আশকারা পেয়েই মায়ানমার নানা অজুহাতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রেখেছে।

একপর্যায়ে চাপ দিয়ে চুক্তি করিয়েছে, অন্তরালে থেকে প্রত্যাবাসন নাটকও করিয়েছে। তদুপরি জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও চীন ও রাশিয়ার ভূমিকার কারণে নিরাপত্তা পরিষদ কোনরকম ব্যবস্থা নিতে পারেনি। যদিও গাম্বিয়ার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন নির্যাতনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শুনানিতে সম্মতি দেয়। তবে হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অন্তর্র্বতী আদেশ দেওয়ার সময়টাতে মায়ানমারকে সাহস জোগাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেশটি সফর করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

অন্যদিকে এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় চীনের পাশাপাশি ভারতও সম্প্রতি এক চরম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এটাও আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য বয়ে এনেছে। এর ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের মতো ভারতের মতো বন্ধুদেশকেও কখনো পাশে পায়নি বাংলাদেশ। চীন ও ভারত চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ হলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে দুটি দেশই কৌশলগতভাবে বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সীমান্ত নিয়ে চীনের সাথে ভারতের বিরোধ দীর্ঘদিনের। ভারতের আকসাই চীন অঞ্চল ও অরুণাচল প্রদেশকে চীন নিজেদের এলাকা মনে করে। সেই কারণে দেশটি লাদাখ ও সেভেন সিস্টার্স নিয়ে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকে। এ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে থাকা শিলিগুড়ি করিডোর। এ করিডোরটি ভারতের মূল ভূখন্ডের সাথে সেভেন সিস্টার্সে যোগাযোগের একমাত্র পথ। চীনের দোকলাম থেকে যার দূরত্ব মাত্র ১৩০ কিলোমিটার।

দুর্যোগপূর্ণ সময়ে চীনের চুম্বী ভ্যালিতে মোতায়েন থাকা সেনাবাহিনী শিলিগুড়ি করিডোরের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে পুরো সেভেন সিস্টার্স ভারতের মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ফলে নিরাপত্তা ও যোগাযোগের কথা চিন্তা করে ভারত কালাদান প্রকল্পের মাধ্যমে সেভেন সিস্টার্সে প্রবেশের বিকল্প একটি পথ তৈরিতে উদ্যোগী হয়। এটার ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে দ্রুত সংযোগ স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ রুট ছাড়াও অন্য একটি বিকল্পও তৈরি থাকলো ভারতের কাছে। এ কারণে ভারতের কাছে দেশটি খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে সৃষ্ট নতুন ভূ-রাজনৈতিক ইকুয়েশনের কারণে চীনও মায়ানমারের ওপর নির্ভরতা দিন দিন বাড়িয়েছে। বিশ্বে প্রভাব বিস্তারে চীনের বিআরআই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ধরা হয় মায়ানমারকে। বলা হচ্ছে- চীনা অর্থনীতির লাইফলাইন হয়ে উঠতে পারে এই প্রবেশদ্বার। এসবের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির ভারসাম্য চীনের পক্ষে রাখা হবে। আর এর বিনিময়ে মায়ানমার যা চেয়েছে তাই দিয়েছে চীন। এসব ইকুয়েশনের কারণে মায়ানমারও হয়তো ভেবেছে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করতে পারলেই রোহিঙ্গা সংকটের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ কমে যাবে। এ কারণে তারা দিনের পর দিন ছলচাতুরি করে গেছে। তবে এবারের প্রস্তাব পাসের ঘটনা নিঃসন্দেহে তাদের সেই ভাবনায় পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

চীন তার ভূ-রাজনীতির স্বার্থে উত্তর কোরিয়ার মতো মায়ানমারকেও যা খুশি তাই করার লাইসেন্স দিলেও মায়ানমার ধীরে ধীরে পশ্চিমাদের সাথেও সখ্য বাড়িয়েছে। মায়ানমারের এই চালাকি চীন-রাশিয়া বুঝতে পারছে। বাংলাদেশের জোরদার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং চীনের এই বোধোদয়ের সম্ভবত যোগফলই হচ্ছে- জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে চীনের বিরোধিতা না করা। আর মায়ানমার প্রসঙ্গে চীন যেদিকে রাশিয়াও সেদিকে এই নীতির কারণে রাশিয়াও বিরোধিতা করেনি। তবে বাংলাদেশকে এইটুকুতে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। চীন এবং রাশিয়ার এ পদক্ষেপ তখনই ইতিবাচক হিসেবে গণ্য হবে যখন নিরাপত্তা পরিষদেও দেশ দুটি একই অবস্থান ধরে রাখবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এ ব্যাপারে ইতিবাচক। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চীন, রাশিয়াসহ ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোও যাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করে, সেই কৌশল নিতে হবে এখন। এ দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বিদ্যমান থাকলেও, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সেটির সিকিভাগও কাজে লাগানো যায়নি। তাই বাংলাদেশের এখন সার্বক্ষণিক লক্ষ্য হওয়া উচিত, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সেই ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে কীভাবে আরও জোরালো করা যায় সেদিকে কাজ করা।

নিরাপত্তা পরিষদে যদি সদস্য দেশগুলোর ইতিবাচক অবস্থান নিশ্চিত করা যায় তাহলে মায়ানমার তার অবস্থান পাল্টাতে বাধ্য হবে। কারণ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব মেনে চলা বাধ্যতামূলক। তাই আমাদের প্রত্যাশা একটাই- ক্যারিশম্যাটিক বিশ্বনেতা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিরাপত্তা পরিষদেও প্রস্তাব গ্রহণের সফলতা নিয়ে আসার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করবে অচিরেই।

[লেখক : প্রাবন্ধিক]

সহনশীলতা : সৃষ্টির শক্তি

ছবি

ভোগ্যপণ্যের ওপর ডলারের দামের প্রভাব

ছবি

খেলা বনাম রাজনীতি

সুবর্ণ দিনের প্রত্যাশায়

ছবি

শহীদ ডা. মিলন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন

ভারতের কৃষি আইন, মোদির ঘোষণা এবং রাজনীতি

তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা কেন দরকার?

খসড়া আয়কর আইন নিয়ে কিছু কথা

তেল-গ্যাস সংকট : হাত বাড়াতে হবে সমুদ্রে

ইউপি নির্বাচন ও ইসির ভূমিকা

আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস

খেলার মাঠে পাকিস্তানপন্থার উল্লাস

পঞ্চাশের পাওয়া না-পাওয়া

ছবি

স্মরণ : লাল ঝান্ডা ও সম্পাদকের কলম

ছবি

স্মরণ : একজন সাহসী সম্পাদক

গ্লাসগো সম্মেলন থেকে কী মিলল?

জগৎজ্যোতি দাস : ইতিহাসের বীরশ্রেষ্ঠ

গণপরিবহন ও উন্নত দেশের স্বপ্ন

নতুন ধানের উৎসব

এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স : বিপর্যয় রোধে করণীয়

পুষ্টি নিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা

কালের চাকা থেমে নেই

মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রশাসন

১৫৫(৪) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবতা

ধর্ষণ মামলায় বিচারকের পর্যবেক্ষণ

শিশুদের নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষা

জীবনযাত্রার খরচ বাড়ার উত্তাপ

রাজনীতির আবরণে ধান্ধাবাজির সামাজিক বিস্তার এবং বামপন্থা

সিআরবি রক্ষা আন্দোলন

ছবি

রপ্তানিমুখী কৃষির শিল্পায়ন

ছবি

আমরা এখন একা

‘ইতিবাচক দর্শন ও আগামী প্রজন্ম’

কেমন হচ্ছে পাবলিক পরীক্ষা?

বাগদা ফার্ম, সাঁওতাল হত্যা দিবস এবং অনড় সরকার

হিন্দু বিতাড়নের রাজনীতি

যে বিষয়গুলো আড়ালেই থেকে যায়

tab

উপ-সম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা সংকট : নিরাপত্তা পরিষদেও প্রচেষ্টা চালাতে হবে

মর্তুজা হাসান সৈকত

বুধবার, ২৪ নভেম্বর ২০২১

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে প্রথমবারের মতো একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে। প্রত্যাশা করা হচ্ছে- প্রস্তাবটি মায়ানমারে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়তা করবে। প্রস্তাবে রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সাথে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাধ্যবাধকতাগুলো পূরণ করা এবং মায়ানমারে নিযুক্ত জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতসহ জাতিসংঘের সব মানবাধিকার ব্যবস্থাপনাকে পূর্ণ সহযোগিতা দিতে মায়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ প্রস্তাব গ্রহণকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ অতীতে অনেক দেশ এ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিলেও এবার কেউ বিরোধিতা করেনি। এমনকি জাতিসংঘে মায়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি ও সামরিক জান্তার প্রতি অনাস্থা জানিয়ে প্রস্তাবটি সমর্থন করেছেন। এর পাশাপাশি আরেকটি কারণেও এ প্রস্তাবটি ঐতিহাসিক- মায়ানমার ইস্যুতে অধিকাংশ সদস্য দেশের সঙ্গে দৃশ্যত দ্বিমত প্রকাশকারী দেশ চীন ও রাশিয়াও অন্যান্যবারের মতো এবার বিপক্ষে দাঁড়ায়নি।

এমন এক সময়ে এ প্রস্তাবটি পাস হয়েছে যার কিছুদিন পূর্বে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৭৬তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতি ‘অতি জরুরি’ ভিত্তিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন জোরদার করার দাবি জানিয়ে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ প্রস্তাব পাসের কারণে মায়ানমার কতখানি চাপের মুখে পড়ল- এ নিয়ে সন্দেহ কিছুটা রয়েই গেছে। কারণ সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাব দিয়ে কোনো বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এজন্য প্রয়োজন নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মত প্রস্তাব। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই সত্যি যে, এতদিন চীন ও রাশিয়া সেখানে মায়ানমারের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করার কারণে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়নি। তবে এবার যেহেতু দেশ দুটি সাধারণ পরিষদে বিরোধিতা করেনি সেক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষেত্রেও হয়তো আগের অবস্থান পর্যালোচনা করতে পারে।

এবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানের পর একটি জোরালো পদক্ষেপ এলেও প্রশ্ন আসতে পারে এতদিনেও কেন প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি? এর কারণ হচ্ছে, জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো রোহিঙ্গাদের ওপর চলা জাতিগত নিধন নিয়ে সোচ্চার হলেও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো যারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে মোটাদাগে ভূমিকা রাখতে পারতো তারা বাংলাদেশ আশ্বাস দিলেও আশানুরূপ সহযোগিতা করেনি। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে মাঠে রেফারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া চীনের ভূমিকা বাংলাদেশকে বরাবরই হতাশ করেছে। দেশটি শুরু থেকেই বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে উপস্থাপনের পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় সমাধানের পক্ষে কাজ করেছে। নিরাপত্তা পরিষদে তারা বারবার ভেটো প্রয়োগ করেছে, প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে কেবল তাদের আশকারা পেয়েই মায়ানমার নানা অজুহাতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রেখেছে।

একপর্যায়ে চাপ দিয়ে চুক্তি করিয়েছে, অন্তরালে থেকে প্রত্যাবাসন নাটকও করিয়েছে। তদুপরি জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও চীন ও রাশিয়ার ভূমিকার কারণে নিরাপত্তা পরিষদ কোনরকম ব্যবস্থা নিতে পারেনি। যদিও গাম্বিয়ার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন নির্যাতনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শুনানিতে সম্মতি দেয়। তবে হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অন্তর্র্বতী আদেশ দেওয়ার সময়টাতে মায়ানমারকে সাহস জোগাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেশটি সফর করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

অন্যদিকে এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় চীনের পাশাপাশি ভারতও সম্প্রতি এক চরম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এটাও আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য বয়ে এনেছে। এর ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের মতো ভারতের মতো বন্ধুদেশকেও কখনো পাশে পায়নি বাংলাদেশ। চীন ও ভারত চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ হলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে দুটি দেশই কৌশলগতভাবে বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সীমান্ত নিয়ে চীনের সাথে ভারতের বিরোধ দীর্ঘদিনের। ভারতের আকসাই চীন অঞ্চল ও অরুণাচল প্রদেশকে চীন নিজেদের এলাকা মনে করে। সেই কারণে দেশটি লাদাখ ও সেভেন সিস্টার্স নিয়ে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকে। এ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে থাকা শিলিগুড়ি করিডোর। এ করিডোরটি ভারতের মূল ভূখন্ডের সাথে সেভেন সিস্টার্সে যোগাযোগের একমাত্র পথ। চীনের দোকলাম থেকে যার দূরত্ব মাত্র ১৩০ কিলোমিটার।

দুর্যোগপূর্ণ সময়ে চীনের চুম্বী ভ্যালিতে মোতায়েন থাকা সেনাবাহিনী শিলিগুড়ি করিডোরের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে পুরো সেভেন সিস্টার্স ভারতের মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ফলে নিরাপত্তা ও যোগাযোগের কথা চিন্তা করে ভারত কালাদান প্রকল্পের মাধ্যমে সেভেন সিস্টার্সে প্রবেশের বিকল্প একটি পথ তৈরিতে উদ্যোগী হয়। এটার ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে দ্রুত সংযোগ স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ রুট ছাড়াও অন্য একটি বিকল্পও তৈরি থাকলো ভারতের কাছে। এ কারণে ভারতের কাছে দেশটি খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে সৃষ্ট নতুন ভূ-রাজনৈতিক ইকুয়েশনের কারণে চীনও মায়ানমারের ওপর নির্ভরতা দিন দিন বাড়িয়েছে। বিশ্বে প্রভাব বিস্তারে চীনের বিআরআই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ধরা হয় মায়ানমারকে। বলা হচ্ছে- চীনা অর্থনীতির লাইফলাইন হয়ে উঠতে পারে এই প্রবেশদ্বার। এসবের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির ভারসাম্য চীনের পক্ষে রাখা হবে। আর এর বিনিময়ে মায়ানমার যা চেয়েছে তাই দিয়েছে চীন। এসব ইকুয়েশনের কারণে মায়ানমারও হয়তো ভেবেছে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করতে পারলেই রোহিঙ্গা সংকটের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ কমে যাবে। এ কারণে তারা দিনের পর দিন ছলচাতুরি করে গেছে। তবে এবারের প্রস্তাব পাসের ঘটনা নিঃসন্দেহে তাদের সেই ভাবনায় পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

চীন তার ভূ-রাজনীতির স্বার্থে উত্তর কোরিয়ার মতো মায়ানমারকেও যা খুশি তাই করার লাইসেন্স দিলেও মায়ানমার ধীরে ধীরে পশ্চিমাদের সাথেও সখ্য বাড়িয়েছে। মায়ানমারের এই চালাকি চীন-রাশিয়া বুঝতে পারছে। বাংলাদেশের জোরদার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং চীনের এই বোধোদয়ের সম্ভবত যোগফলই হচ্ছে- জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে চীনের বিরোধিতা না করা। আর মায়ানমার প্রসঙ্গে চীন যেদিকে রাশিয়াও সেদিকে এই নীতির কারণে রাশিয়াও বিরোধিতা করেনি। তবে বাংলাদেশকে এইটুকুতে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। চীন এবং রাশিয়ার এ পদক্ষেপ তখনই ইতিবাচক হিসেবে গণ্য হবে যখন নিরাপত্তা পরিষদেও দেশ দুটি একই অবস্থান ধরে রাখবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এ ব্যাপারে ইতিবাচক। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চীন, রাশিয়াসহ ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোও যাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করে, সেই কৌশল নিতে হবে এখন। এ দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বিদ্যমান থাকলেও, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সেটির সিকিভাগও কাজে লাগানো যায়নি। তাই বাংলাদেশের এখন সার্বক্ষণিক লক্ষ্য হওয়া উচিত, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সেই ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে কীভাবে আরও জোরালো করা যায় সেদিকে কাজ করা।

নিরাপত্তা পরিষদে যদি সদস্য দেশগুলোর ইতিবাচক অবস্থান নিশ্চিত করা যায় তাহলে মায়ানমার তার অবস্থান পাল্টাতে বাধ্য হবে। কারণ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব মেনে চলা বাধ্যতামূলক। তাই আমাদের প্রত্যাশা একটাই- ক্যারিশম্যাটিক বিশ্বনেতা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিরাপত্তা পরিষদেও প্রস্তাব গ্রহণের সফলতা নিয়ে আসার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করবে অচিরেই।

[লেখক : প্রাবন্ধিক]

back to top