alt

সারাদেশ

৪৫ বছরে কুড়িগ্রাম সীমান্তে হত্যা ৭২, অপহরণ ৫০

শরীরে ক্ষত নিয়ে মানবেতর জীবনে সীমান্তবাসী

হুমায়ুন কবির সূর্য, কুড়িগ্রাম : শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১

কুড়িগ্রামের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে গরু, মাদক পাচার ও ঘাস কাটতে গিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ’র ছোঁড়া গুলি ও ককটেলের আঘাতে অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছেন। আবার যারা বেঁচে ফিরছেন তাদের অনেকেই শারীরিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাদের পারিবারিক জীবন। বিগত ৪৫ বছরে কুড়িগ্রামের সীমান্তে ৭২ বাংলাদেশীকে হত্যা এবং অর্ধ শতাধিক ব্যক্তিকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামে রয়েছে ২৭৩ কিলোমিটারব্যাপী ভারতীয় সীমান্ত এলাকা। এসব এলাকার মধ্যে ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, রৌমারী ও চর রাজীবপুর উপজেলা এলাকার মধ্যে রয়েছে বেশি অবৈধভাবে সীমান্তে যাতায়াত। এসব এলাকায় কমবেশী চোরাচালান হলেও সংঘর্ষে আহত-নিহতের ঘটনা বেশি ঘটেছে ফুলবাড়ী, নাগেশ^রী, ভূরুঙ্গামারী ও রৌমারী উপজেলায়। তবে ইদানিং সবচেয়ে বেশি মাদক পাচার নিয়ে সীমান্তে দুর্ঘটনা ঘটছে রৌমারী উপজেলায়।

রৌমারী ও চর রাজীবপুর উপজেলায় রয়েছে ৬৮ কিলোমিটার ব্যাপী সীমান্ত এলাকা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয় রাজ্য ঘেঁষা এই জেলার বিপুল সংখ্যক মানুষকে জীবন জীবিকার কারণে সীমান্তে যেতে হয় প্রতিদিন। নোম্যান্সল্যান্ড কিংবা জিরো লাইনের কাছে অনেক মানুষের রয়েছে আবাদী জমি। তাদেরকে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে সেইসব জমি চাষাবাদ করতে হয়। আর এই কাজ করতে গিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হচ্ছে অনেককেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০০ সালে ফুলবাড়ীর খালিশা কোটাল গ্রামের ২ ভাই সগির (২৫) ও একরামুল (৩০), ২০০১ সালে করলা গ্রামের সিরাজুল ইসলাম (২৬), ২০১০ সালে মইনুল (২২) ও মিঠু (২৬) বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়। ২০০৯ সালে গুলিবিদ্ধ হয় আশরাফুল (১৪)। নিহত হয় ৮ জন। এছাড়াও বিএসএফ ধরে নিয়ে গেছে ১০ জনকে। রৌমারী-রাজিবপুর সীমান্তে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছে ৫৮ জন। ধরে নিয়ে গেছে ৩৫ জনেরও বেশি বাংলাদেশীকে। সব মিলিয়ে গত ৪৫ বছরে কুড়িগ্রামের সীমান্তে ৭২ জন বাংলাদেশীকে হত্যা এবং অর্ধ শতাধিক ব্যক্তিকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

সরেজমিন রৌমারীতে ঘুরে দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন রৌমারী উপজেলার দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের ছাট কড়াইবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা টুনু মিয়ার ছেলে মানিক মিয়া (৩৫)। প্রায় তিন বছর আগে সীমান্ত দিয়ে গরু এবং চোরাচালান করতে গিয়ে বিএসএফ’র ছুঁড়ে দেয়া ককটেলের আঘাতে জীবন বেঁচে গেলেও পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে। ডান হাত-পা অবশ। শরীরের বিভিন্ন অংশে রয়েছে ককটেলের স্প্রিন্টার। স্প্রিন্টারের যন্ত্রনা এখনও সহ্য করতে হচ্ছে তাকে। বর্তমানে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন করছে মানিক মিয়া। একই ইউনিয়নের ধর্মপুর গ্রামের বাসিন্দা জোব্বার আলীর ছেলে রেজাউল করিম রেজা। দেড় বছর আগে সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান করতে গিয়ে বিএসএফ’র ককটেলের আঘাতে দৃষ্টি শক্তি হারিয়েছেন। একই গ্রামের বাসিন্দা ইদ্রিস আলীর ছেলে অহিদুর রহমান (৩৬) প্রায় ৫বছর আগে এই চোরাচালান করতে গিয়ে বিএসএফ’র ককটেলের হামলার শিকার হয়ে আজ এক চোখ অন্ধ অপর চোখটিও নষ্ট হবার উপক্রম। অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না।

অনুসন্ধানে বিএসএফ’র হামলায় পঙ্গুত্ব বরণকারীদের একটি ইউনিয়নের তালিকা দেখলেই বোঝা যায় চোরাচালানের কতটা আগ্রহী সীমান্তবাসী। আহতদের মধ্যে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অন্ধত্ব বরণ করেছেন দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের ধর্মপুর গ্রামের বাসিন্দা সেকেন্দার আলীর ছেলে মঞ্জু মিয়া (৪০), জাকির হোসেনের ছেলে কলেজ ছাত্র হাসান, রবিউল ইসলামের ছেলে ছক্কু মিয়া, জহুরুল ইসলামের ছেলে মঞ্জু, একই ইউনিয়নের ছাটকড়াইবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা মালেকের ছেলে জালাল উদ্দিন (৩৫) এবং রৌমারী সদর ইউনিয়নের ভন্দুরচরের বাসিন্দা প্রয়াত ফরহাদ হোসেনের ছেলে লাল মিয়া (৪৫), নতুন বন্দরের মশিউর রহমান(৫৫)।

এছাড়াও ২০১৮সালের ৩০ এপ্রিল বিকেলে ফুলবাড়ী উপজেলার গোড়কমন্ডল সীমান্তে আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার ৯৩০/৮ এর পাশে বাংলাদেশের ২০গজ অভ্যন্তরে রাসেল নিজেদের গরুর ঘাস কাটতে যায়। এসময় ৩৮বিএসএফ ব্যাটালিয়নের নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পের টহলরত বিএসএফ সদস্য রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে স্কুল ছাত্র রাসেলের মুখ মন্ডলে রাবার বুলেট ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। আহত রাসেলের দীর্ঘ একমাস চিকিৎসা শেষে তার ডান চোখটি অন্ধ হয়ে যায়। একটি চোখের দৃষ্টি হারিয়ে অপরটিও এখন হুমকির মুখে পড়েছে। সীমান্তের দরিদ্র এই পরিবারের সন্তান রাসেল বিএসএফ’র কারণে অন্ধ হবার পাশাপাশি এখনও স্প্রিন্টারের টুকরো শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন।

মানিক মিয়া বলেন, প্রায় তিন বছর আগে গরুর জন্য ঘাস আনতে গিয়ে বিএসএফ’র হামলার শিকার হয়ে আজ আমি অচল। আমার পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছি।

রেজাউল করিম রেজা বলেন, অভাবের তাড়নায় চোরাচালান করতে গিয়ে বিএসএফ’র ককটেলের হামলা আমার চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। জমি-জমা যা ছিল বিক্রি করে ঢাকায় চিকিৎসা করেছি। কিন্তু কোন লাভ হয়নি।

ধর্মপুর গ্রামের বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, গত তিন বছরে চোরাচালান করতে গিয়ে ১০জন নিহত হয়েছে বিএসএফ’র হাতে। বহু লোক পঙ্গুত্ব বরণ করছে। এখন এসব পরিবার খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে।

দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের মেম্বার মিজানুর রহমান বলেন, আমার ইউনিয়নে ১০জনের অন্ধ ও শারিরিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ ব্যক্তি রয়েছে।

এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল-ইমরান বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় সীমান্তে চোরাচালানসহ অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। এসব অপরাধে জড়িয়ে যারা পঙ্গুত্ব বা অন্ধত্ব বরণ করেছে তার সঠিক হিসেব আমাদের কাছে নেই।

ছবি

সড়কে ফের নিহত সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী

নভেম্বরে সড়কে ঝরলো ৪১৩ জনের প্রাণ

ছবি

নারী শ্রমিকদের জন্য পোশাক কারখানায় স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন করছে বিকাশ

ছবি

সেন্টমার্টিনে জাহাজ চলাচল বন্ধ ঘোষণা

ছবি

ব্যঙ্গচিত্র নিয়ে রোববার রাস্তায় নামবে শিক্ষার্থীরা

ছবি

ডুমুরিয়ার শুঁটকি যাচ্ছে বিদেশে

তিন যমজ শিশু নিয়ে দিশেহারা হতদরিদ্র বাবা

বাগেরহাটে মাদরাসা থেকে ছাত্র নিখোঁজ : জিডি

ছবি

পাহাড়ে বসতি! মাটি চাপায় শিশুর মৃত্যু

ছবি

গেস্ট হাউসে পর্যটকের মরদেহ, তরুণী আটক

ছবি

সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কট, দুর্ভোগে ৬০ হাজার মানুষ

ছবি

কক্সবাজার বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালন করছেন বিমানবাহিনী

ছবি

ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ এর প্রভাবে ঝালকাঠির আকাশ মেঘাচ্ছন্ন

ছবি

ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে উত্তাল সাগর: ৩ নম্বর সংকেত

চাঁপাইনবাবগঞ্জে জমি বিবাদে নিহত এক

ছবি

ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে বরগুনায়

ছবি

কাটাখালির মেয়র আব্বাসের দুই ভবন ভেঙে দিয়েছে প্রশাসন

ছবি

হঠাৎ বিচ্ছিন্ন বগির সংযোগ, ১ ঘণ্টা রেল যোগাযোগ বন্ধ

ছবি

‘জঙ্গি আস্তানা’ সন্দেহে ঘিরে রাখা বাড়ি থেকে বোমা ও বোমার সরঞ্জাম উদ্ধার

ছবি

চট্টগ্রামে ট্রেনের ধাক্কায় অটোরিকশা চুরমার, ২ জন নিহত

ছবি

হাকিমপুরে ৮ গ্রামে পুরুষ শূন্য, আতঙ্কে শিশু ও মহিলারা

ছবি

লক্ষ্মীপুরে বিদ্রোহী প্রার্থীকে হত্যার হুমকির অভিযোগ থানায়

ছবি

নীলফামারীতে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে বাড়ি ঘিরে রেখেছে র‍্যাব

ছবি

ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ : পটুয়াখালীতে বৃষ্টি শুরু

ছবি

উন্নয়নে ৪০ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি ১০ বছরেও

ছবি

সড়কে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে

ছবি

নারায়ণগঞ্জ সিটিতে আবারও নৌকার মাঝি আইভী

ছবি

পঞ্চাশোর্ধ জরাজীর্ণ ভবনে পাঠদান : দুর্ঘটনার আশঙ্কা

পঞ্চগড়ে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ে : মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী

ছবি

নোয়াখালীতে দুই শিক্ষককে পরীক্ষার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি

ছবি

প্রয়াত স্বামীর মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেখে যেতে চান সত্তরোর্ধ্ব স্ত্রী

সীতাকুন্ডে ট্রাকের ধাক্কায় অটোযাত্রী নিহত আহত ৪

ছবি

ভাসানচরের ৬৫ রোহিঙ্গা স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে কক্সবাজারে

ছবি

কক্সবাজারে বর্ণাঢ্য আয়োজনে প্রতিবন্ধী দিবস পালন

চামড়া সংরক্ষণে অত্যাধুনিক কোল্ড স্টোরেজ হচ্ছে বিভিন্ন জেলায়

ভোটের ফল পরিবর্তনের অভিযোগ : পুনঃগণনার দাবি

tab

সারাদেশ

৪৫ বছরে কুড়িগ্রাম সীমান্তে হত্যা ৭২, অপহরণ ৫০

শরীরে ক্ষত নিয়ে মানবেতর জীবনে সীমান্তবাসী

হুমায়ুন কবির সূর্য, কুড়িগ্রাম

শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১

কুড়িগ্রামের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে গরু, মাদক পাচার ও ঘাস কাটতে গিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ’র ছোঁড়া গুলি ও ককটেলের আঘাতে অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছেন। আবার যারা বেঁচে ফিরছেন তাদের অনেকেই শারীরিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাদের পারিবারিক জীবন। বিগত ৪৫ বছরে কুড়িগ্রামের সীমান্তে ৭২ বাংলাদেশীকে হত্যা এবং অর্ধ শতাধিক ব্যক্তিকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামে রয়েছে ২৭৩ কিলোমিটারব্যাপী ভারতীয় সীমান্ত এলাকা। এসব এলাকার মধ্যে ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, রৌমারী ও চর রাজীবপুর উপজেলা এলাকার মধ্যে রয়েছে বেশি অবৈধভাবে সীমান্তে যাতায়াত। এসব এলাকায় কমবেশী চোরাচালান হলেও সংঘর্ষে আহত-নিহতের ঘটনা বেশি ঘটেছে ফুলবাড়ী, নাগেশ^রী, ভূরুঙ্গামারী ও রৌমারী উপজেলায়। তবে ইদানিং সবচেয়ে বেশি মাদক পাচার নিয়ে সীমান্তে দুর্ঘটনা ঘটছে রৌমারী উপজেলায়।

রৌমারী ও চর রাজীবপুর উপজেলায় রয়েছে ৬৮ কিলোমিটার ব্যাপী সীমান্ত এলাকা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয় রাজ্য ঘেঁষা এই জেলার বিপুল সংখ্যক মানুষকে জীবন জীবিকার কারণে সীমান্তে যেতে হয় প্রতিদিন। নোম্যান্সল্যান্ড কিংবা জিরো লাইনের কাছে অনেক মানুষের রয়েছে আবাদী জমি। তাদেরকে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে সেইসব জমি চাষাবাদ করতে হয়। আর এই কাজ করতে গিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হচ্ছে অনেককেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০০ সালে ফুলবাড়ীর খালিশা কোটাল গ্রামের ২ ভাই সগির (২৫) ও একরামুল (৩০), ২০০১ সালে করলা গ্রামের সিরাজুল ইসলাম (২৬), ২০১০ সালে মইনুল (২২) ও মিঠু (২৬) বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়। ২০০৯ সালে গুলিবিদ্ধ হয় আশরাফুল (১৪)। নিহত হয় ৮ জন। এছাড়াও বিএসএফ ধরে নিয়ে গেছে ১০ জনকে। রৌমারী-রাজিবপুর সীমান্তে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছে ৫৮ জন। ধরে নিয়ে গেছে ৩৫ জনেরও বেশি বাংলাদেশীকে। সব মিলিয়ে গত ৪৫ বছরে কুড়িগ্রামের সীমান্তে ৭২ জন বাংলাদেশীকে হত্যা এবং অর্ধ শতাধিক ব্যক্তিকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

সরেজমিন রৌমারীতে ঘুরে দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন রৌমারী উপজেলার দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের ছাট কড়াইবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা টুনু মিয়ার ছেলে মানিক মিয়া (৩৫)। প্রায় তিন বছর আগে সীমান্ত দিয়ে গরু এবং চোরাচালান করতে গিয়ে বিএসএফ’র ছুঁড়ে দেয়া ককটেলের আঘাতে জীবন বেঁচে গেলেও পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে। ডান হাত-পা অবশ। শরীরের বিভিন্ন অংশে রয়েছে ককটেলের স্প্রিন্টার। স্প্রিন্টারের যন্ত্রনা এখনও সহ্য করতে হচ্ছে তাকে। বর্তমানে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন করছে মানিক মিয়া। একই ইউনিয়নের ধর্মপুর গ্রামের বাসিন্দা জোব্বার আলীর ছেলে রেজাউল করিম রেজা। দেড় বছর আগে সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান করতে গিয়ে বিএসএফ’র ককটেলের আঘাতে দৃষ্টি শক্তি হারিয়েছেন। একই গ্রামের বাসিন্দা ইদ্রিস আলীর ছেলে অহিদুর রহমান (৩৬) প্রায় ৫বছর আগে এই চোরাচালান করতে গিয়ে বিএসএফ’র ককটেলের হামলার শিকার হয়ে আজ এক চোখ অন্ধ অপর চোখটিও নষ্ট হবার উপক্রম। অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না।

অনুসন্ধানে বিএসএফ’র হামলায় পঙ্গুত্ব বরণকারীদের একটি ইউনিয়নের তালিকা দেখলেই বোঝা যায় চোরাচালানের কতটা আগ্রহী সীমান্তবাসী। আহতদের মধ্যে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অন্ধত্ব বরণ করেছেন দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের ধর্মপুর গ্রামের বাসিন্দা সেকেন্দার আলীর ছেলে মঞ্জু মিয়া (৪০), জাকির হোসেনের ছেলে কলেজ ছাত্র হাসান, রবিউল ইসলামের ছেলে ছক্কু মিয়া, জহুরুল ইসলামের ছেলে মঞ্জু, একই ইউনিয়নের ছাটকড়াইবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা মালেকের ছেলে জালাল উদ্দিন (৩৫) এবং রৌমারী সদর ইউনিয়নের ভন্দুরচরের বাসিন্দা প্রয়াত ফরহাদ হোসেনের ছেলে লাল মিয়া (৪৫), নতুন বন্দরের মশিউর রহমান(৫৫)।

এছাড়াও ২০১৮সালের ৩০ এপ্রিল বিকেলে ফুলবাড়ী উপজেলার গোড়কমন্ডল সীমান্তে আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার ৯৩০/৮ এর পাশে বাংলাদেশের ২০গজ অভ্যন্তরে রাসেল নিজেদের গরুর ঘাস কাটতে যায়। এসময় ৩৮বিএসএফ ব্যাটালিয়নের নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পের টহলরত বিএসএফ সদস্য রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে স্কুল ছাত্র রাসেলের মুখ মন্ডলে রাবার বুলেট ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। আহত রাসেলের দীর্ঘ একমাস চিকিৎসা শেষে তার ডান চোখটি অন্ধ হয়ে যায়। একটি চোখের দৃষ্টি হারিয়ে অপরটিও এখন হুমকির মুখে পড়েছে। সীমান্তের দরিদ্র এই পরিবারের সন্তান রাসেল বিএসএফ’র কারণে অন্ধ হবার পাশাপাশি এখনও স্প্রিন্টারের টুকরো শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন।

মানিক মিয়া বলেন, প্রায় তিন বছর আগে গরুর জন্য ঘাস আনতে গিয়ে বিএসএফ’র হামলার শিকার হয়ে আজ আমি অচল। আমার পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছি।

রেজাউল করিম রেজা বলেন, অভাবের তাড়নায় চোরাচালান করতে গিয়ে বিএসএফ’র ককটেলের হামলা আমার চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। জমি-জমা যা ছিল বিক্রি করে ঢাকায় চিকিৎসা করেছি। কিন্তু কোন লাভ হয়নি।

ধর্মপুর গ্রামের বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, গত তিন বছরে চোরাচালান করতে গিয়ে ১০জন নিহত হয়েছে বিএসএফ’র হাতে। বহু লোক পঙ্গুত্ব বরণ করছে। এখন এসব পরিবার খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে।

দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের মেম্বার মিজানুর রহমান বলেন, আমার ইউনিয়নে ১০জনের অন্ধ ও শারিরিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ ব্যক্তি রয়েছে।

এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল-ইমরান বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় সীমান্তে চোরাচালানসহ অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। এসব অপরাধে জড়িয়ে যারা পঙ্গুত্ব বা অন্ধত্ব বরণ করেছে তার সঠিক হিসেব আমাদের কাছে নেই।

back to top