alt

সারাদেশ

মনোহরদীকে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত ঘোষণার সপ্তাহ পার

আশ্রয়ণের ঘর পেয়েও মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়নি অনেক পরিবারের

মোস্তাফিজুর রহমান, নরসিংদী থেকে ফিরে : মঙ্গলবার, ২৮ মার্চ ২০২৩

উদ্বোধন হলেও মনোহরদী উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের নরেন্দ্রপুর গ্রামে আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি -সংবাদ

চারধাপে ‘আশ্রয়ণের’ ২০৮টি গৃহ প্রদানের মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোহরদী উপজেলাকে ‘ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত’ ঘোষণার এক সপ্তাহ পেরিয়েছে। কিন্তু এখনও নতুন ঠিকানায় মাথা গোঁজার সুযোগ হয়নি বেশ কয়েকটি পরিবারের। অন্তত ১৫টির বেশি পরিবারের খোঁজ রয়েছে যারা এখনও অস্থায়ী ঠিকানায় ‘মানবেতর’ জীবনযাপন করছে। তারা জানেন না কবে নাগাদ স্থায়ী ঠিকানায় উঠতে পারবেন।

এমন পরিস্থিতিতে পরিবারগুলোর মধ্য ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেকেই সংবাদকে অভিযোগ করেছেন, ঘরে কাজ ‘ধীরগতিতে’ করছেন ঠিকাদাররা। তাদের ‘গাফিলতির’ কারণেই ঘরে উঠতে ‘বিলম্ব’ হচ্ছে। তবে ঠিকাদাররা জানিয়েছেন, তারা ‘দ্রুত’ কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন। তবে কবে শেষ করতে পারবেন সেটি জানাতে পারেননি।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঘর প্রস্তুত না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম। তিনি গত সোমবার সংবাদকে বলেন, ‘আশা করছি, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাকি কাজ শেষ হয়ে যাবে।’

ঘর অপ্রস্তুত রেখেই উদ্বোধন করার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘প্রস্তুত হওয়া ঘরের সঙ্গে উদ্বোধনের জন্য কিছু কিছু (অপ্রস্তত ঘর) ইম্পুর্ট দেয়া হয়েছিল। মূলত যেগুলোর কাজ প্রায় শেষ সেগুলো উদ্বোধন করা হয়েছে। আশা করছি অসমাপ্ত যে কাজ রয়েছে তা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।’

জানা গেছে, চতুর্থ ধাপে নির্মিত ৩৫টি গৃহ গত ২২ র্মাচ উপজেলা হলরুমে উপজেলা প্রশাসনের এক অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে এসব গৃহ হস্তন্তরের ফলে ‘ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত’ হয় এই উপজেলা। এর আগে ১ম, ২য় ও ৩য় পর্যায়ে যথাক্রমে ৪৫, ৫ ও ১২৩ জন ‘ক’ শ্রেণীর ভূমিহীন-গৃহহীনদের যাচাই-বাছাইপূর্বক মোট ১৭৩টি গৃহ প্রদান করা হয়।

সর্বশেষ ধাপে নির্মিত গৃহগুলোর মধ্যে উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের নরেন্দ্রপুর গ্রামে ৭টি গৃহ রয়েছে। গত রোববার বিকেলে সেখানে গিয়ে দায়িত্বরত পাহারাদার ছাড়া কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। জানতে চাইলে পাহারাদার শাহজাহান বলেন, ‘কাজ শেষ না হওয়ায় এখনও কেউ ঘরে উঠতে পারেননি।’ তবে এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি।

প্রকল্প এলাকা ঘুরে তেমন কোন কর্মতৎপরতাও চোখে পড়েনি। প্রথম দুটি ঘরের কাজ কিছু বেশি সম্পাদন হলেও বাকি ঘরগুলোর কাজ এখনও অনেক পিছিয়ে। ওই ঘরগুলোর বারান্দায় এখন মাটিই ফেলা হয়নি। বড় বড় গর্ত হয়ে আছে। ঘরের প্লাস্টারের কাজও বাকি। দরজা জানালার কাজের ফিনিসিং এখনও হয়নি। ওয়াশরুমের কাজও অসম্পূর্ণ। এছাড়া ঘরগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়নি। পানি সরবারহের কাজ চলমান। মূল সড়ক থেকে ঘরগুলোর মধ্যে রাস্তা তৈরির কাজও হয়নি। এতে একটু বৃষ্টি হলেই সেখানে পানি জমে যাচ্ছে।

এখানে ঘর পাওয়া কয়েকজন সংবাদকে জানিয়েছেন, ঠিকাদার তার ‘ইচ্ছেমতো অল্প অল্প করে’ কাজ করছেন। যেভাবে কাজ হচ্ছে তাতে আগামী ‘এক মাসের’ আগে কাজ শেষ হবে কি না সেই সন্দেহ প্রকাশও করেছেন কেউ কেউ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার তসলিম সংবাদের কাছে দাবি করেন, তিনি কাজ ‘দ্রুত’ শেষ করার চেষ্টা করছেন।

উপজেলার বড়চাপা ইউনিয়নের নয়ানগর বাজারের পাশে একসঙ্গে ১০টি গৃহ নির্মাণ শেষে সেগুলো গৃহহীন ও ভূমিহীনদের হস্তান্তর করা হয়েছে। গত সোমবার সেখানে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি। কোন পাহারাদারও ছিল না। প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এখানেও প্রথম দুটি ঘর প্রায় প্রস্তুত করা হলেও বাকি ঘরগুলোতে কাজ বাকি রয়েছে। ঘরের প্লাস্টারেরর কাজসহ ফিনিসিংয়ের অনেক কাজ অসম্পন্ন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এটি তৃতীয় ধাপে উদ্বোধনের পর উপকারভূগীদের মাঝে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় এখনও কেউ উঠতে পারেননি।

ঘর পেয়েও উঠতে না পেরে ক্ষোভ

ষাটোর্ধ হেলেনা খাতুন। স্বামীহারা চার সন্তানের এ জননী সংসার চালাতে গিয়ে একপাশ প্যারালাইসড হয়ে পড়েছে অনেক আগেই। তাছাড়া বাধ্যক্যজনিত নানা রোগে তিনি আক্রান্ত, হাঁটতে পারেন না, বসতেও পারেন না। শুয়ে থেকেই জীবন পার করতে হচ্ছে তাকে। গত সপ্তাহে তাকে অনেকটা কোলে করে উপজেলায় নিয়ে আসা হয়েছিল।

সেদিন জীবনের বাকি অংশ কাটাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে নরেন্দ্রপুরের ৭টি ঘরের মধ্যে একটি ঘর বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অপ্রস্তুত সেই ঘরে সেদিন উঠতে পারেননি তিনি। উপজেলা থেকে ফিরে আবার থাকতে হচ্ছে ছোট ছেলের চালাকচর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ভাড়া বাড়িতে। এরপর সপ্তাহ গেলেও এখন পর্যন্ত নিজের ঘরে ঠাঁই হয়নি হেলেনা খাতুনের। কবে নাগাদ ঘরে উঠতে পারেন সেটিও জানেন না তিনি। তার সঙ্গে গত সোমবার যখন কথা হচ্ছিল তখন অসুস্থে কাঁপছিলেন। কাঁপতে কাঁপতে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েও এখনও না উঠতে পেরে আক্ষেপ করছিলেন তিনি।

‘আমার কোন ঠিহানা আছিলনা। হারাটা জীবন কষ্ট করছি। এহন সরকার ঠিহানা কইরা দিছে। একটা দালান পাইছি, জাইয়া পাইছি। এজন্য অনেক কৃতজ্ঞ। কিন্তু হেই ঘরটা এহনও দেহি নাই। কহন ঘরে উঠুম কইতামও পারি না।’ সংবাদকে বলছিলেন হেলেনা। এক পর্যায়ে কান্নার সুরে বলে উঠেন, ‘আমার একটাপর একটা অসুক লাইগগাই থাহে। বয়েস হইছে। অনেক কষ্ট করে থাহি। মরার সময় হইছে। মরার আগে কয়েকটা দিন তৃপ্তি নিয়া একটু সুহে থাকার ইচ্ছা। সেটা পূরণ হইয়াও এহনও হইলো না।’

হেলেনা খাতুনের পাশে দাঁড়িয়ে দেখভালে দায়িত্বে থাকা ছোট ছেলে মোহাম্মদ আলী। স্থানীয় চালাকচর বাজারে ডিস ব্যবসায়ের টেকনিশিয়ান হিসাবে কাজ করেন। স্বল্প বেতনের এই কাজ করে একাই টানছেন সংসার। জানালেন, এরমধ্যে দু’দিন ঘুরে এসেছেন কিন্তু তাদের ঘর এখনও তৈরি হয়নি। তাছাড়া সেখানে (প্রকল্প এলাকা) কেউ পাননি বলেও তিনি জানিয়েছেন। আলী সংবাদকে বলেন, সংসারে এখন মা, নিজের ছেলে, বোন, বনের ছেলেসহ ৫ জন আছেন। বড় দুই ভাই এই সংসারের খোঁজ নেন না।

‘অনেক অভাবের সংসার। সবার ছোট ছেলে হয়েও সংসার আমাকে চালাতে হয়। ৬ হাজার টেহা বেতন পাই। বাসা ভাড়া বিদ্যুৎ ২ হাজার টেহার বেশি চলে যায়। বাকি টাকা দিয়ে সংসার চালানো খুব কষ্ট হচ্ছে। আবার মার ওষুধ চিকিৎসার খরচ তো আছেই। অনেক টেনেটুনে চলছি।’

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘ভাবছিলাম এই মাসে মাকে নিয়ে নতুন ঘরে উঠতে পারবো। তাহলে ঈদের আগে বাসার ভাড়াসহ অনেক খরচ থেকে রক্ষা পাইতাম। মার চিকিৎসাও করাতে পারতাম। ঈদে মা-বোন ছেলেদের নতুন কাপড়ও দিতে পারতাম। কিন্তু এখন হবে কি না কিছুই জানি না। সব প্যাচ লাগ্গা গেল।’

হেলেনা খাতুনের পরিবারের মতো অন্যান্য পরিবারগুলোও ‘মানবেতর’ জীবনযাপনের কথা জানিয়েছেন। তবে তাদের অনেকেই নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। বেশ কয়েকজন জানিয়েছেন, ঘরে দ্রুত উঠার জন্য তারা নিয়মিতই খোঁজখবর রাখছেন। কিন্তু কবে উঠতে পারবেন সেটি তাদের জানাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।

ছবি

আজ সন্ধ্যায় দুবাই পৌঁছাবে ২৩ নাবিকসহ এমভি আবদুল্লাহ জাহাজ

অনলাইন ক্যাসিনোর ‘হোতা’ সেলিমের অভিযোগ সাবেক সেনা প্রধানের ভাইদের বিরুদ্ধে

ছবি

তীব্র গরমে চু্য়াডাঙ্গা ও পাবনায় ২ জনের মৃত্যু

ছবি

স্বামীর পুরুষ অঙ্গ কেটে আত্মহত্যা করলেন স্ত্রী

ছবি

বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক ও দুই দেশের শিশুদের খেলাধুলা অনুষ্ঠিত

ছবি

সাবমেরিন কেবল বিচ্ছিন্ন, ধীরগতি হতে পারে ইন্টারনেট

ছবি

বনের আগুন নেভালেন জেলা প্রশাসক, জানে না বনের কর্তারা

ছবি

বিশেষজ্ঞ প্যানেল ও বারি’র জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতবিনিময় কর্মশালা

ছবি

৪২ ডিগ্রি ছাড়াল চুয়াডাঙ্গার তাপমাত্রা, গলে যাচ্ছে রাস্তার পিচ

ছবি

টাঙ্গাইলে সংঘ‌র্ষ থামাতে গিয়ে হামলার শিকার এসআই, ১৬ জন আটক

ছবি

কক্সবাজারে জলকেলি উৎসবের সমাপনীতে আলোকিত জীবনের প্রত্যাশা

ছবি

মায়ানমারের বিজিপির আরও ২৪ সদস্য বাংলাদেশে

ছবি

রাজশাহীতে মোটরসাইকেলে ট্রাকের ধাক্কায় নিহত ৩

ছবি

ইউএসএআইডি এবং সিমিট প্রতিনিধি দলের বারি পরিদর্শন

ছবি

পঞ্চগড় এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনে নারীর ঝুলন্ত মরদেহ

ছবি

‘আনন্দে’ শুরুর পর সড়কের ঈদযাত্রা কেন ‘বিষাদে’

ছবি

ঘটনা চাপা দিতে ১৫০ বস্তা সিমেন্ট সরিয়ে ফেলার অভিযোগ

মীরসরাইয়ে শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি, ঘরের চাল ছিদ্র হয়ে গেছে

ছবি

মাধবপুরে বিরল প্রজাতির লজ্জাবতী বানর উদ্ধার

ছবি

টঙ্গীতে আগুনে পুড়ল ১২টি খাদ্য গুদাম

ছবি

জলকেলি উৎসবে মুখরিত কক্সবাজরের রাখাইন পল্লী

শেরপুরে বিনামূল্যে সার বীজ বিতরণ উদ্বোধন

কেশবপুরে সকাল-সন্ধ্যা বাজারের দখল নিয়ে দু’পক্ষ মুখোমুখি উচ্ছেদ আতঙ্কে অর্ধশতাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী

ছবি

ভালুকায় বোরো ধানে চিটা কৃষকের মাথায় হাত

ছবি

ভালুকায় বোরো ধানে চিটা কৃষকের মাথায় হাত

ছবি

গোবিন্দগঞ্জে সরকারি রাস্তার ১২০টি গাছ কর্তনের অভিযোগ প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে

পুঠিয়ায় শাশুড়িকে হত্যা করেন পুত্রবধূ

ছবি

মির্জাগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু

ছবি

নড়াইলের শ্রীনগর গ্রামে ভ্যানচালককে পুলিশি হয়রানির প্রতিবাদে মানববন্ধন

ছবি

প্রচণ্ড তাপদাহে পুড়ছে বাগান, ঝরছে আম, শঙ্কায় চাষীরা

ছবি

প্রেমিকার ওপর অভিমান প্রেমিকের আত্মহত্যা

ছবি

শ্যামনগর পদ্মপুকুরের প্রধান সড়কের একাংশ যেন বালুর স্তুপে পরিণত

আমার চেয়ে খারাপ লোক এ জেলায় নাই : তাহেরপুত্র বিপ্লব

ছবি

কক্সবাজারে রিসোর্টে পযটক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার

ছবি

ঝালকাঠিতে ট্রাকচাপায় নিহতের পরিবার পাবে ৫ লাখ টাকা

ছবি

সুনামগঞ্জে বাস-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ২

tab

সারাদেশ

মনোহরদীকে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত ঘোষণার সপ্তাহ পার

আশ্রয়ণের ঘর পেয়েও মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়নি অনেক পরিবারের

মোস্তাফিজুর রহমান, নরসিংদী থেকে ফিরে

উদ্বোধন হলেও মনোহরদী উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের নরেন্দ্রপুর গ্রামে আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি -সংবাদ

মঙ্গলবার, ২৮ মার্চ ২০২৩

চারধাপে ‘আশ্রয়ণের’ ২০৮টি গৃহ প্রদানের মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোহরদী উপজেলাকে ‘ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত’ ঘোষণার এক সপ্তাহ পেরিয়েছে। কিন্তু এখনও নতুন ঠিকানায় মাথা গোঁজার সুযোগ হয়নি বেশ কয়েকটি পরিবারের। অন্তত ১৫টির বেশি পরিবারের খোঁজ রয়েছে যারা এখনও অস্থায়ী ঠিকানায় ‘মানবেতর’ জীবনযাপন করছে। তারা জানেন না কবে নাগাদ স্থায়ী ঠিকানায় উঠতে পারবেন।

এমন পরিস্থিতিতে পরিবারগুলোর মধ্য ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেকেই সংবাদকে অভিযোগ করেছেন, ঘরে কাজ ‘ধীরগতিতে’ করছেন ঠিকাদাররা। তাদের ‘গাফিলতির’ কারণেই ঘরে উঠতে ‘বিলম্ব’ হচ্ছে। তবে ঠিকাদাররা জানিয়েছেন, তারা ‘দ্রুত’ কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন। তবে কবে শেষ করতে পারবেন সেটি জানাতে পারেননি।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঘর প্রস্তুত না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম। তিনি গত সোমবার সংবাদকে বলেন, ‘আশা করছি, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাকি কাজ শেষ হয়ে যাবে।’

ঘর অপ্রস্তুত রেখেই উদ্বোধন করার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘প্রস্তুত হওয়া ঘরের সঙ্গে উদ্বোধনের জন্য কিছু কিছু (অপ্রস্তত ঘর) ইম্পুর্ট দেয়া হয়েছিল। মূলত যেগুলোর কাজ প্রায় শেষ সেগুলো উদ্বোধন করা হয়েছে। আশা করছি অসমাপ্ত যে কাজ রয়েছে তা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।’

জানা গেছে, চতুর্থ ধাপে নির্মিত ৩৫টি গৃহ গত ২২ র্মাচ উপজেলা হলরুমে উপজেলা প্রশাসনের এক অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে এসব গৃহ হস্তন্তরের ফলে ‘ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত’ হয় এই উপজেলা। এর আগে ১ম, ২য় ও ৩য় পর্যায়ে যথাক্রমে ৪৫, ৫ ও ১২৩ জন ‘ক’ শ্রেণীর ভূমিহীন-গৃহহীনদের যাচাই-বাছাইপূর্বক মোট ১৭৩টি গৃহ প্রদান করা হয়।

সর্বশেষ ধাপে নির্মিত গৃহগুলোর মধ্যে উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের নরেন্দ্রপুর গ্রামে ৭টি গৃহ রয়েছে। গত রোববার বিকেলে সেখানে গিয়ে দায়িত্বরত পাহারাদার ছাড়া কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। জানতে চাইলে পাহারাদার শাহজাহান বলেন, ‘কাজ শেষ না হওয়ায় এখনও কেউ ঘরে উঠতে পারেননি।’ তবে এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি।

প্রকল্প এলাকা ঘুরে তেমন কোন কর্মতৎপরতাও চোখে পড়েনি। প্রথম দুটি ঘরের কাজ কিছু বেশি সম্পাদন হলেও বাকি ঘরগুলোর কাজ এখনও অনেক পিছিয়ে। ওই ঘরগুলোর বারান্দায় এখন মাটিই ফেলা হয়নি। বড় বড় গর্ত হয়ে আছে। ঘরের প্লাস্টারের কাজও বাকি। দরজা জানালার কাজের ফিনিসিং এখনও হয়নি। ওয়াশরুমের কাজও অসম্পূর্ণ। এছাড়া ঘরগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়নি। পানি সরবারহের কাজ চলমান। মূল সড়ক থেকে ঘরগুলোর মধ্যে রাস্তা তৈরির কাজও হয়নি। এতে একটু বৃষ্টি হলেই সেখানে পানি জমে যাচ্ছে।

এখানে ঘর পাওয়া কয়েকজন সংবাদকে জানিয়েছেন, ঠিকাদার তার ‘ইচ্ছেমতো অল্প অল্প করে’ কাজ করছেন। যেভাবে কাজ হচ্ছে তাতে আগামী ‘এক মাসের’ আগে কাজ শেষ হবে কি না সেই সন্দেহ প্রকাশও করেছেন কেউ কেউ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার তসলিম সংবাদের কাছে দাবি করেন, তিনি কাজ ‘দ্রুত’ শেষ করার চেষ্টা করছেন।

উপজেলার বড়চাপা ইউনিয়নের নয়ানগর বাজারের পাশে একসঙ্গে ১০টি গৃহ নির্মাণ শেষে সেগুলো গৃহহীন ও ভূমিহীনদের হস্তান্তর করা হয়েছে। গত সোমবার সেখানে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি। কোন পাহারাদারও ছিল না। প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এখানেও প্রথম দুটি ঘর প্রায় প্রস্তুত করা হলেও বাকি ঘরগুলোতে কাজ বাকি রয়েছে। ঘরের প্লাস্টারেরর কাজসহ ফিনিসিংয়ের অনেক কাজ অসম্পন্ন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এটি তৃতীয় ধাপে উদ্বোধনের পর উপকারভূগীদের মাঝে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় এখনও কেউ উঠতে পারেননি।

ঘর পেয়েও উঠতে না পেরে ক্ষোভ

ষাটোর্ধ হেলেনা খাতুন। স্বামীহারা চার সন্তানের এ জননী সংসার চালাতে গিয়ে একপাশ প্যারালাইসড হয়ে পড়েছে অনেক আগেই। তাছাড়া বাধ্যক্যজনিত নানা রোগে তিনি আক্রান্ত, হাঁটতে পারেন না, বসতেও পারেন না। শুয়ে থেকেই জীবন পার করতে হচ্ছে তাকে। গত সপ্তাহে তাকে অনেকটা কোলে করে উপজেলায় নিয়ে আসা হয়েছিল।

সেদিন জীবনের বাকি অংশ কাটাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে নরেন্দ্রপুরের ৭টি ঘরের মধ্যে একটি ঘর বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অপ্রস্তুত সেই ঘরে সেদিন উঠতে পারেননি তিনি। উপজেলা থেকে ফিরে আবার থাকতে হচ্ছে ছোট ছেলের চালাকচর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ভাড়া বাড়িতে। এরপর সপ্তাহ গেলেও এখন পর্যন্ত নিজের ঘরে ঠাঁই হয়নি হেলেনা খাতুনের। কবে নাগাদ ঘরে উঠতে পারেন সেটিও জানেন না তিনি। তার সঙ্গে গত সোমবার যখন কথা হচ্ছিল তখন অসুস্থে কাঁপছিলেন। কাঁপতে কাঁপতে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েও এখনও না উঠতে পেরে আক্ষেপ করছিলেন তিনি।

‘আমার কোন ঠিহানা আছিলনা। হারাটা জীবন কষ্ট করছি। এহন সরকার ঠিহানা কইরা দিছে। একটা দালান পাইছি, জাইয়া পাইছি। এজন্য অনেক কৃতজ্ঞ। কিন্তু হেই ঘরটা এহনও দেহি নাই। কহন ঘরে উঠুম কইতামও পারি না।’ সংবাদকে বলছিলেন হেলেনা। এক পর্যায়ে কান্নার সুরে বলে উঠেন, ‘আমার একটাপর একটা অসুক লাইগগাই থাহে। বয়েস হইছে। অনেক কষ্ট করে থাহি। মরার সময় হইছে। মরার আগে কয়েকটা দিন তৃপ্তি নিয়া একটু সুহে থাকার ইচ্ছা। সেটা পূরণ হইয়াও এহনও হইলো না।’

হেলেনা খাতুনের পাশে দাঁড়িয়ে দেখভালে দায়িত্বে থাকা ছোট ছেলে মোহাম্মদ আলী। স্থানীয় চালাকচর বাজারে ডিস ব্যবসায়ের টেকনিশিয়ান হিসাবে কাজ করেন। স্বল্প বেতনের এই কাজ করে একাই টানছেন সংসার। জানালেন, এরমধ্যে দু’দিন ঘুরে এসেছেন কিন্তু তাদের ঘর এখনও তৈরি হয়নি। তাছাড়া সেখানে (প্রকল্প এলাকা) কেউ পাননি বলেও তিনি জানিয়েছেন। আলী সংবাদকে বলেন, সংসারে এখন মা, নিজের ছেলে, বোন, বনের ছেলেসহ ৫ জন আছেন। বড় দুই ভাই এই সংসারের খোঁজ নেন না।

‘অনেক অভাবের সংসার। সবার ছোট ছেলে হয়েও সংসার আমাকে চালাতে হয়। ৬ হাজার টেহা বেতন পাই। বাসা ভাড়া বিদ্যুৎ ২ হাজার টেহার বেশি চলে যায়। বাকি টাকা দিয়ে সংসার চালানো খুব কষ্ট হচ্ছে। আবার মার ওষুধ চিকিৎসার খরচ তো আছেই। অনেক টেনেটুনে চলছি।’

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘ভাবছিলাম এই মাসে মাকে নিয়ে নতুন ঘরে উঠতে পারবো। তাহলে ঈদের আগে বাসার ভাড়াসহ অনেক খরচ থেকে রক্ষা পাইতাম। মার চিকিৎসাও করাতে পারতাম। ঈদে মা-বোন ছেলেদের নতুন কাপড়ও দিতে পারতাম। কিন্তু এখন হবে কি না কিছুই জানি না। সব প্যাচ লাগ্গা গেল।’

হেলেনা খাতুনের পরিবারের মতো অন্যান্য পরিবারগুলোও ‘মানবেতর’ জীবনযাপনের কথা জানিয়েছেন। তবে তাদের অনেকেই নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। বেশ কয়েকজন জানিয়েছেন, ঘরে দ্রুত উঠার জন্য তারা নিয়মিতই খোঁজখবর রাখছেন। কিন্তু কবে উঠতে পারবেন সেটি তাদের জানাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।

back to top