alt

অর্থ-বাণিজ্য

ওভার ইনভয়েসিং হচ্ছে, ১০০ এলসি বন্ধ করেছি : গভর্নর

অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক : বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২

বিদেশে পণ্য আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ার আড়ালে কীভাবে দেশের অর্থ পাচার হচ্ছে, তা নিয়ে আবারও কথা বললেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।

তিনি বলেছেন, ‘‘আশ্চর্যজনকভাবে দেখলাম, ২০-২০০ শতাংশ পর্যন্ত ওভার ইনভয়েসিং (অতিরিক্ত মূল্য দেখানো) করে পণ্য আমদানি করা হয়েছে। এ রকম ১০০ এলসি বন্ধ করেছি আমরা।”

বৈদেশিক বাণিজ্যে পণ্যর দাম কম বা বেশি দেখিয়ে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ‘ট্রেড বেজড মানি লন্ডারিং’ বন্ধ করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিআইডিএস আয়োজিত তিন দিনব্যাপী বার্ষিক উন্নয়ন সম্মেলনের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার গভর্নরের বক্তব্যে অর্থ পাচারের প্রসঙ্গ আসে।

এছাড়াও গত ১৫ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারও বলেন, পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য অতিরিক্ত দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল্য কম দেখানোর (আন্ডার ইনভয়েসিং) বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে।

করোনাভাইরাস মহামারী পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলে বাড়তে থাকে পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র খোলা এবং নিষ্পত্তির পরিমাণ। এ ধারা অব্যাহত থাকে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেও।

আমদানি বাণিজ্য বৃদ্ধির বিপরীতে রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্স সেভাবে বৃদ্ধি না পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চাপে পড়ে বাংলাদেশ। আমদানি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় গত বছরের আগস্টে থাকা ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়নে।

আর চলতি হিসাবে ঘাটতি ক্রামগত বৃদ্ধি পাওয়ায় গত এপ্রিল থেকে আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও কড়াকড়ি আরোপ করতে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বছরের শুরুতেও গড়ে প্রতি মাসে ৮ বিলিয়নের উপরে হওয়া আমদানি অক্টোবরে ৪ বিলিয়নের ঘরে নামিয়ে এনেছে সরকার।

এই কড়াকড়ির পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকেই অভিযোগ করছেন, আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খুলতে দেওয়া হচ্ছে না বৈদেশিক ‍মুদ্রার সংকটে।

এ বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বৃহস্পতিবার বিআইডিএস এর বার্ষিক উন্নয়ন সম্মেলনে বলেন, “আমরা কোনো এলসি বন্ধ করিনি, এটি সত্য নয়। আমরা ‘প্রাইস কন্ট্রোল’ (মূল্য নিয়ন্ত্রণ) করছি। যাতে সঠিক দরে পণ্য আমদানি ও রপ্তানি হয়।”

তিনি বলেন, “বিলাসী পণ্য আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে মাত্র। কারণ হচ্ছে, আপাতত এসব বিলাসী পণ্য কম এলেও কোনো সমস্যা হবে না।”

অতিরিক্ত ও কম মূল্য দেখিয়ে করতে চাওয়া এলসি বন্ধ করে দেওয়া হলেও পরে তা সংশোধন করে প্রকৃত দরে আমদানি করতে চাইলে ব্যবসায়ীরা এলসি করতে পারছেন বলে তথ্য দেন গভর্নর।

তিনি বলেন, ওভার ইনভয়েসিং হচ্ছে কি না, তা দেখতে গত বছর এবং এবছরের অনেক এলসির তথ্য নিয়ে গত জুলাই থেকে যাচাই-বাছাই শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখনই ২০-২০০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে পণ্য আমদানির বিষয়টি তারা জানতে পারেন।

পণ্য বাণিজ্যে আন্ডার ইনভয়েসিং হচ্ছে কি না– তা যাচাইয়েরও উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন গভর্নর।

তিনি বলেন, ‘‘একলাখ ডলারের মূল্যর গাড়ি আমদানি করা হয়েছে মাত্র ২০ হাজার ডলারে। এতে বোঝা যায়, বাকি অর্থ তারা হুন্ডির মাধ্যমে দিয়েছে।’’

দেশের বাজারে আপেল বিক্রির উদাহরণ দিয়ে গভর্নর বলেন, “বাজারে যে দরে আপেল বিক্রি হচ্ছে, তার চেয়ে কম দরে আমদানি করা হচ্ছে। দর কম দেখানোতে সরকারের রাজস্ব আয়ও কমছে এখান থেকে।

“এভাবে আন্ডার ইনভয়েসিং এর মাধ্যম পণ্য আমদানি হচ্ছে, যে দর কম দেখানো হচ্ছে, তা হুন্ডির মাধ্যমে পরিশোধ করা হচ্ছে। হুন্ডিতে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রবাসীদের না পাঠানো রেমিট্যান্স।”

ব্যাংক ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদহার বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও অনুষ্ঠানে কথা বলেন গভর্নর। তিনি বলেন, কৃষি খাতে অনেক দেশই কম সুদে ঋণ দেয়। এটি সরকারের দিক থেকে করা হয়। আর ব্যাংকারদের পক্ষ থেকে সিএমএসএমই খাতে সুদহার বড়িয়ে ৯ শতাংশের ‘ক্যাপ’ তুলে দেওয়ার দাবি করা হয়। তখন খরচ বৃদ্ধির বিষয়টিকে তারা যুক্তি হিসেবে দেখায়।

“এ খাতের খরচ কমিয়ে আনার কৌশল হিসেবে সিএমএসএমই খাতে ব্যাংকগুলোকে ২ শতাংশ সুদে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ অর্থ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করে। এখন তারা কম সুদের তহবিল পাওয়ায় এ খাতে সুদহার তুলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।”

তার মতে, ব্যবসায়ীদের জন্য মেয়াদী ও চলতি মূলধনের ঋণ সুদহারে ৯ শতাংশের সীমা তুলে দেওয়ার ‘সঠিক সময়’ এখন নয়।

গভর্নর বলছেন, মহামারী পরবর্তী সময়ে যে দুটো সমস্যা অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে, তার একটি হচ্ছে রিজার্ভ, অন্যটি মূল্যস্ফীতি।

“এই মূল্যস্ফীতির বৃদ্ধি মুদ্রা সরবরাহ থেকে আসেনি। এটি আমদানি দর বেড়ে যাওয়ার ঘটনা থেকে হয়েছে।”

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছেন, “আমদানিতে ডলারের খরচ ও বিনিময় মূল্য বৃদ্ধিতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে। উচ্চ বিনিময় হারকে সমন্বয় কেরলে ঋণ প্রবৃদ্ধি অনেক কম দেখাবে।”

ডলারে দাম বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে গভর্নর বলেছেন, “বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাজার অনুযায়ী হওয়া উচিত। এখন তা বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই খোলা বাজারে ১২১ টাকায় উঠে যাওয়া ডলার এখন ১১০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আর আমদানি পর্যায়ে ডলারের দর এখন ১০৩-১০৪ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। যা কয়েক মাস আগেও বেশি ছিল।

আমদানি, রপ্তানি, রেমিটেন্স ও নগদ বিক্রিতে ভিন্ন ভিন্ন দর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা দর নিয়ন্ত্রণ (রেগুলেটেড ম্যানেজমেন্ট) ব্যবস্তাপনায় যাব না। আমরা বাজারমূখি করব ধীরে ধীরে। শিগগিরই ভিন্ন ভিন্ন দর একটি সমন্বিত দরে চলে আসবে। এত বেশি ব্যবধান থাকবে না।”

রেমিটেন্সে প্রবৃদ্ধি কমার জন্য হুন্ডিকে দায়ী করে গভর্নর বলেন, “রেমিটেন্স কমে যাওয়ার বড় কারণ হচ্ছে হুন্ডি। এ জন্য রেমিটেন্স আনা সহজ ও আমদানিতে ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিং বন্ধ করা হচ্ছে।

“রেমিটেন্স আনা সহজ করতে মোবাইলে আনার সুযোগ হচ্ছে। রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বন্ধ করা হয়েছে। আগামী ৩-৬ মাস অপেক্ষা করতে হবে। প্রবাসীরা নিজেই রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবেন। তখন রেমিট্যান্সে একটি বড় উল্লম্ফন দেখা যাবে।”

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক তথ্যে দেখা যায়, ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মিস ইনভয়েসিং বা অস্বচ্ছ লেনদেনের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৮০৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি মিস ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়টি বেশ আগে থেকে বলে আসছে। ডলারের সাম্প্রতিক সংকটের মধ্যে দেশ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় আসছে পণ্য আমদানিতে ‘ওভার ইনভয়েসিং।

আমদানি-রপ্তানিতে এমন ‘মিস ইনভয়েসিং’ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বড় অংকের অর্থ পাচারের তথ্য উঠে আসছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণাতেও।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক তথ্যে দেখা যায়, ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মিস ইনভয়েসিং বা অস্বচ্ছ লেনদেনের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৮০৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি মিস ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়টি বেশ আগে থেকে বলে আসছে। ডলারের সাম্প্রতিক সংকটের মধ্যে দেশ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় আসছে।

উল্লেখ্য, আমদানিতে ‘ওভার ইনভয়েসিং’ মানে হল অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংক চ্যানেলে বিদেশে পাচার করা। পণ্যের মূল্যের নামে পাঠানো অতিরিক্ত অর্থ পায় বিদেশে আমদানিকারকের পক্ষে কেউ । এভাবেও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন অর্থনীতিবিদরাও অনেক দিন যাবৎ এ অভিযোগ করছে।

ছবি

অবশেষে নিম্নমুখী আকরিক লোহার দর

ছবি

বাণিজ্যমেলায় ৩০০ কোটি টাকার রপ্তানি আদেশ পাওয়া গেছে

ছবি

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক রিজার্ভ শাখার শীর্ষ পদে পরিবর্তন

বাণিজ্য মেলায় রপ্তানি আদেশ ৩০০ কোটি টাকা

আইএমএফের ঋণ প্রাপ্তি, দেশের অর্থনীতির সক্ষমতার প্রকাশ : অর্থমন্ত্রী

দেশে অটোরিকশা উৎপাদন শুরু করছে রানার

গ্রামীণফোনের ৯৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা

রাজধানীতে স্বর্র্ণালঙ্কার মেলা শুরু ৯ ফেব্রুয়ারি

ছবি

বাণিজ্য মেলা শেষ: এবার দর্শনার্থী ৩৫ লাখ, কেনা-বেচা ১০০ কোটি টাকা

ছবি

২৭ দিনে ১৬৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্স

ছবি

পুঁজিবাজারের উন্নতি হলে অর্থায়ন সম্ভব: আইএমএফ

ছবি

বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন দিলো আইএমএফ

ছবি

এসআইবিএলের চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত এমডির পদত্যাগ

ছবি

আবার বাড়লো বিদ্যুতের দাম, কাল থেকেই কার্যকর

ছবি

মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলা শেষ হচ্ছে আজ

ছবি

রিজার্ভের অর্থে আর কোনও তহবিল নয়: গভর্নর

ছবি

জালিয়াতি জালিয়াতিই, আদানি অন্যতম ধনী হলেও তা জালিয়াতি: হিনডেনবার্গ

ছবি

কাতারে স্টেডিয়াম তৈরীতে নিহত-আহতদের ক্ষতিপূরণ চেয়ে রুল

ছবি

৫ কোম্পানির দ্বিতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

ছবি

আইএমএফ ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন দিতে পারে আজ

ছবি

ন্যাশনাল ব্যাংকে মেহমুদ হোসেনকেই এমডি পদে রাখতে হবে

দেশে ব্যবসায় সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি : সিপিডি

পরপর ৪ দিন উত্থানের পর শেয়ারবাজারে পতন

ছবি

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাণিজ্য সহায়তা করবে জাপান : বাণিজ্যমন্ত্রী

ছবি

তৃতীয় শীর্ষ ধনী থেকে সপ্তম স্থানে নেমেছেন আদানি

বাণিজ্য মেলায় ভ্যাট আদায় দেড় কোটি টাকা

ছবি

ব্যাংক খাতের সমন্বিত ও সার্বিক সংস্কার প্রয়োজন: এডিবি কান্ট্রি ডিরেক্টর

ছবি

রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়াতে লন্ডন হাইকমিশনের বিশেষ উদ্যোগ

ছবি

মাসের ব্যবধানে রসুনের দাম বেড়েছে ৩৫ শতাংশ

ছবি

কালি ও কলম পুরস্কার পেলেন যারা

ছবি

দেশে মোটরসাইকেল বিক্রি কমলেও নিবন্ধন বেড়েছে

এবার বাড়ছে না বাণিজ্যমেলার সময়

১০ হাজার কোটি টাকা মূলধন বাড়লো শেয়ারবাজারে

চীনে পূর্ণ মালিকানায় ব্যবসা করতে পারবে বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান

ছবি

সংকটের মধ্যেও আশার আলো, একদিনে রেমিটেন্স এলো ৭ কোটি ডলার

ছবি

পাইকারি বিদ্যুতের দাম ফের বাড়ানোর প্রস্তাব

tab

অর্থ-বাণিজ্য

ওভার ইনভয়েসিং হচ্ছে, ১০০ এলসি বন্ধ করেছি : গভর্নর

অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক

বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২

বিদেশে পণ্য আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ার আড়ালে কীভাবে দেশের অর্থ পাচার হচ্ছে, তা নিয়ে আবারও কথা বললেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।

তিনি বলেছেন, ‘‘আশ্চর্যজনকভাবে দেখলাম, ২০-২০০ শতাংশ পর্যন্ত ওভার ইনভয়েসিং (অতিরিক্ত মূল্য দেখানো) করে পণ্য আমদানি করা হয়েছে। এ রকম ১০০ এলসি বন্ধ করেছি আমরা।”

বৈদেশিক বাণিজ্যে পণ্যর দাম কম বা বেশি দেখিয়ে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ‘ট্রেড বেজড মানি লন্ডারিং’ বন্ধ করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিআইডিএস আয়োজিত তিন দিনব্যাপী বার্ষিক উন্নয়ন সম্মেলনের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার গভর্নরের বক্তব্যে অর্থ পাচারের প্রসঙ্গ আসে।

এছাড়াও গত ১৫ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারও বলেন, পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য অতিরিক্ত দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল্য কম দেখানোর (আন্ডার ইনভয়েসিং) বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে।

করোনাভাইরাস মহামারী পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলে বাড়তে থাকে পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র খোলা এবং নিষ্পত্তির পরিমাণ। এ ধারা অব্যাহত থাকে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেও।

আমদানি বাণিজ্য বৃদ্ধির বিপরীতে রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্স সেভাবে বৃদ্ধি না পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চাপে পড়ে বাংলাদেশ। আমদানি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় গত বছরের আগস্টে থাকা ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়নে।

আর চলতি হিসাবে ঘাটতি ক্রামগত বৃদ্ধি পাওয়ায় গত এপ্রিল থেকে আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও কড়াকড়ি আরোপ করতে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বছরের শুরুতেও গড়ে প্রতি মাসে ৮ বিলিয়নের উপরে হওয়া আমদানি অক্টোবরে ৪ বিলিয়নের ঘরে নামিয়ে এনেছে সরকার।

এই কড়াকড়ির পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকেই অভিযোগ করছেন, আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খুলতে দেওয়া হচ্ছে না বৈদেশিক ‍মুদ্রার সংকটে।

এ বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বৃহস্পতিবার বিআইডিএস এর বার্ষিক উন্নয়ন সম্মেলনে বলেন, “আমরা কোনো এলসি বন্ধ করিনি, এটি সত্য নয়। আমরা ‘প্রাইস কন্ট্রোল’ (মূল্য নিয়ন্ত্রণ) করছি। যাতে সঠিক দরে পণ্য আমদানি ও রপ্তানি হয়।”

তিনি বলেন, “বিলাসী পণ্য আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে মাত্র। কারণ হচ্ছে, আপাতত এসব বিলাসী পণ্য কম এলেও কোনো সমস্যা হবে না।”

অতিরিক্ত ও কম মূল্য দেখিয়ে করতে চাওয়া এলসি বন্ধ করে দেওয়া হলেও পরে তা সংশোধন করে প্রকৃত দরে আমদানি করতে চাইলে ব্যবসায়ীরা এলসি করতে পারছেন বলে তথ্য দেন গভর্নর।

তিনি বলেন, ওভার ইনভয়েসিং হচ্ছে কি না, তা দেখতে গত বছর এবং এবছরের অনেক এলসির তথ্য নিয়ে গত জুলাই থেকে যাচাই-বাছাই শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখনই ২০-২০০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে পণ্য আমদানির বিষয়টি তারা জানতে পারেন।

পণ্য বাণিজ্যে আন্ডার ইনভয়েসিং হচ্ছে কি না– তা যাচাইয়েরও উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন গভর্নর।

তিনি বলেন, ‘‘একলাখ ডলারের মূল্যর গাড়ি আমদানি করা হয়েছে মাত্র ২০ হাজার ডলারে। এতে বোঝা যায়, বাকি অর্থ তারা হুন্ডির মাধ্যমে দিয়েছে।’’

দেশের বাজারে আপেল বিক্রির উদাহরণ দিয়ে গভর্নর বলেন, “বাজারে যে দরে আপেল বিক্রি হচ্ছে, তার চেয়ে কম দরে আমদানি করা হচ্ছে। দর কম দেখানোতে সরকারের রাজস্ব আয়ও কমছে এখান থেকে।

“এভাবে আন্ডার ইনভয়েসিং এর মাধ্যম পণ্য আমদানি হচ্ছে, যে দর কম দেখানো হচ্ছে, তা হুন্ডির মাধ্যমে পরিশোধ করা হচ্ছে। হুন্ডিতে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রবাসীদের না পাঠানো রেমিট্যান্স।”

ব্যাংক ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদহার বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও অনুষ্ঠানে কথা বলেন গভর্নর। তিনি বলেন, কৃষি খাতে অনেক দেশই কম সুদে ঋণ দেয়। এটি সরকারের দিক থেকে করা হয়। আর ব্যাংকারদের পক্ষ থেকে সিএমএসএমই খাতে সুদহার বড়িয়ে ৯ শতাংশের ‘ক্যাপ’ তুলে দেওয়ার দাবি করা হয়। তখন খরচ বৃদ্ধির বিষয়টিকে তারা যুক্তি হিসেবে দেখায়।

“এ খাতের খরচ কমিয়ে আনার কৌশল হিসেবে সিএমএসএমই খাতে ব্যাংকগুলোকে ২ শতাংশ সুদে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ অর্থ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করে। এখন তারা কম সুদের তহবিল পাওয়ায় এ খাতে সুদহার তুলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।”

তার মতে, ব্যবসায়ীদের জন্য মেয়াদী ও চলতি মূলধনের ঋণ সুদহারে ৯ শতাংশের সীমা তুলে দেওয়ার ‘সঠিক সময়’ এখন নয়।

গভর্নর বলছেন, মহামারী পরবর্তী সময়ে যে দুটো সমস্যা অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে, তার একটি হচ্ছে রিজার্ভ, অন্যটি মূল্যস্ফীতি।

“এই মূল্যস্ফীতির বৃদ্ধি মুদ্রা সরবরাহ থেকে আসেনি। এটি আমদানি দর বেড়ে যাওয়ার ঘটনা থেকে হয়েছে।”

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছেন, “আমদানিতে ডলারের খরচ ও বিনিময় মূল্য বৃদ্ধিতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে। উচ্চ বিনিময় হারকে সমন্বয় কেরলে ঋণ প্রবৃদ্ধি অনেক কম দেখাবে।”

ডলারে দাম বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে গভর্নর বলেছেন, “বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাজার অনুযায়ী হওয়া উচিত। এখন তা বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই খোলা বাজারে ১২১ টাকায় উঠে যাওয়া ডলার এখন ১১০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আর আমদানি পর্যায়ে ডলারের দর এখন ১০৩-১০৪ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। যা কয়েক মাস আগেও বেশি ছিল।

আমদানি, রপ্তানি, রেমিটেন্স ও নগদ বিক্রিতে ভিন্ন ভিন্ন দর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা দর নিয়ন্ত্রণ (রেগুলেটেড ম্যানেজমেন্ট) ব্যবস্তাপনায় যাব না। আমরা বাজারমূখি করব ধীরে ধীরে। শিগগিরই ভিন্ন ভিন্ন দর একটি সমন্বিত দরে চলে আসবে। এত বেশি ব্যবধান থাকবে না।”

রেমিটেন্সে প্রবৃদ্ধি কমার জন্য হুন্ডিকে দায়ী করে গভর্নর বলেন, “রেমিটেন্স কমে যাওয়ার বড় কারণ হচ্ছে হুন্ডি। এ জন্য রেমিটেন্স আনা সহজ ও আমদানিতে ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিং বন্ধ করা হচ্ছে।

“রেমিটেন্স আনা সহজ করতে মোবাইলে আনার সুযোগ হচ্ছে। রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বন্ধ করা হয়েছে। আগামী ৩-৬ মাস অপেক্ষা করতে হবে। প্রবাসীরা নিজেই রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবেন। তখন রেমিট্যান্সে একটি বড় উল্লম্ফন দেখা যাবে।”

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক তথ্যে দেখা যায়, ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মিস ইনভয়েসিং বা অস্বচ্ছ লেনদেনের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৮০৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি মিস ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়টি বেশ আগে থেকে বলে আসছে। ডলারের সাম্প্রতিক সংকটের মধ্যে দেশ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় আসছে পণ্য আমদানিতে ‘ওভার ইনভয়েসিং।

আমদানি-রপ্তানিতে এমন ‘মিস ইনভয়েসিং’ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বড় অংকের অর্থ পাচারের তথ্য উঠে আসছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণাতেও।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক তথ্যে দেখা যায়, ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মিস ইনভয়েসিং বা অস্বচ্ছ লেনদেনের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৮০৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি মিস ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়টি বেশ আগে থেকে বলে আসছে। ডলারের সাম্প্রতিক সংকটের মধ্যে দেশ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় আসছে।

উল্লেখ্য, আমদানিতে ‘ওভার ইনভয়েসিং’ মানে হল অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংক চ্যানেলে বিদেশে পাচার করা। পণ্যের মূল্যের নামে পাঠানো অতিরিক্ত অর্থ পায় বিদেশে আমদানিকারকের পক্ষে কেউ । এভাবেও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন অর্থনীতিবিদরাও অনেক দিন যাবৎ এ অভিযোগ করছে।

back to top