alt

জাতীয়

স্মৃতিতে সজীব সুস্থ

ওবায়েদ উল হক

: শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

আহমদুল কবির জন্ম : ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯২৩; মৃত্যু : ২৪ নভেম্বর ২০০৩

আহমদুল কবিরের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে ১৯৪৪ কি ৪৫-এ কলকাতায় ধর্মতলা স্ট্রিটে ছায়ানট পিকচার্স নামে আমার চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থার অফিসে। আমি তখন ১৯৪৩ সালে অবিভক্ত বাংলায় মজুতদার-মুনাফাখোর-অসাধু ব্যবসায়ীদের সৃষ্ট কৃত্রিম মহাদুর্ভিক্ষের পটভূমিতে রচিত কাহিনী অবলম্বনে ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’ নামক পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি নির্মাণ করছি। সেই তেতাল্লিশের মন্বন্তরে পঞ্চাশ লাখ লোক অনাহারে মারা যায়। এমন একটি জাতীয় ট্র্যাজেডির করুণ চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য সিনেমাকেই গণসংযোগের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম।

একদিন আমার ধর্মতলার অফিসে কয়েকজন দীপ্তিমান নবীন অভ্যাগতের আগমন গুলো। খায়রুল কবির, আহমদুল কবির, সৈয়দ নুরুদ্দিন, এ.কে.এম আহসান (পরে জাদরেল সিএসপি), কবি সানাউল হক মামুন (পরে বিশিষ্ট সিএসপি), ওয়াদুদুল হক ( আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়)- সকলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, কৃতী, মেধাবী ছাত্র। কদল প্রিয় বান্ধব। আমার অফিসে এলেন ওয়াদুদুল হক সাহেবের সুবাদে।

প্রতিদিনই আসেন। একদিন দৈনিক আজাদ-এর বার্তা সম্পাদক মোহাম্মদ মোদাব্বের আলেন। তাঁর আমন্ত্রণে এঁরা সবাই আজাদ-এর বার্তা বিভাগে সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত টিকে থাকলেন শুধু খায়রুল কবির। তিনি ’৪৭-এ বাংলা বিভাগের পর আজাদ পত্রিকার কলকাতা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের কাজ দেখাশোনা করেন। তখন আহমদুল কবিরকে মনে হয়েছে মিতভাষী ও প্রিয়ভাষী। বুদ্ধির দীপ্তি তাঁর নীরব হাসিতে ও সরব বাচনে। আহমদুল কবির চলে গেলেন ব্যাংকিংয়ের জগতে। হলেন স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার অফিসার। কৃতিত্বের সঙ্গে চাকরি করেছেন; কিন্তু বাঁধা পথে চলতে তার উৎসাহ ছিল না। নিজের তৈরি পথে চলতেই তাঁর আনন্দ। স্বাধীন জীবনের আকর্ষণ ছিল অপ্রতিরোধ্য। আজাদের বার্তা বিভাগ তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। কিন্তু সাংবাদিকতার অদৃশ্য বাঁধন কি তিনি ছিন্ন করতে পেরেছিলেন?

দৃশ্যতই পারেননি। এক সময় চাকরির মায়া ত্যাগ করে তিনি স্বাধীন ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। তবে এটাও ছিল অন্য কোন মহত্তর উদ্দেশ্য সাধনের উপায় মাত্র তা বুঝতে খুব বেশি দেরি হয়নি। ’৫৪ সালে তিনি দৈনিক ‘সংবাদ’-এর মালিকানা কিনে নিলেন। অন্য কোন মূল্যবান অর্থকরী প্রতিষ্ঠান নয়, কিনলেন একটি সংবাদপত্র। কেন? গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ সংবাদপত্র। জনস্বার্থের অতন্দ্র প্রহরী সংবাদপত্র। সেই সংবাদপত্রই তিনি কিনলেন। বোধগম্য কারণেই। জনগণের সঙ্গে তাঁর নাড়ির যোগ অবিচ্ছেদ্য। জনকল্যাণমূলক কোন কাজে সাংবাদিকতার ভূমিকার গুরুত্ব সঠিক অনুধাবন করেই তিনি তা করেছিলেন। পরে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও সহায়ক ছিল এই সংবাদপত্র দৈনিক ‘সংবাদ’-এর আবির্ভাব ঘটে প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকারের মুখপত্র হিসেবে। ’৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের সাড়া জাগানো বিজয় ও মুসলিম লীগের ভরাডুবির ফলে দৈনিক ‘সংবাদ’ তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে; কিন্তু হাতবদলের ফলে এর চরিত্র বদলও ঘটে। আহমদুল কবিরের মালিকানা ও সম্পাদনায় দৈনিক ‘সংবাদ’ অল্পদিনের মধ্যেই একটি আধুনিক, উদার, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। একদা মুসলিম লীগ সরকারের মুখপত্র দৈনিক ‘সংবাদ’ আজ বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী, নির্ভীক, গণতন্ত্রের মুখপত্র জাতীয় দৈনিক। এই বিস্ময়কর রূপান্তরের ইতিহাসও বেশ বেদনাদায়ক। বিজ্ঞাপন বন্ধ, কালো তালিকাভুক্তি ও প্রকাশনা নিষিদ্ধ ইত্যাদি নিবর্তনমূলক পদক্ষেপের পরও মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাক হানাদার বাহিনী এর কার্যালয় পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। তাঁকে কারারুদ্ধও করা হয়, কিন্তু তিনি আপস করেননি। কোন নির্যাতনই আহমদুল কবিরকে তাঁর গণতান্ত্রিক বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। অসীম মনোবলের অধিকারী ছিলেন বলেই তিনি দৈহিক নির্যাতন ও আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করেও নীতিতে অটল থাকতে পেরেছিলেন।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলো। খণ্ডিত বাংলার পূর্বাংশ হলো পূর্ব পাকিস্তান। ’৪৬ সালের কলকাতার রক্তক্ষয়ী হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার নারকীয়তা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলাম। কিন্তু দেশ ভাগের ধাক্কা সামলানো সম্ভব হয়নি। ধর্মতলার অফিস একেবারে বন্ধ করে পার্ক সার্কাসের বাসা হিন্দু ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানে রেখে আমি সপরিবারে জন্মস্থান পূর্ববাংলার ফেনীতে চলে আসতে বাধ্য হই। সাত-আট মাস পর আটচল্লিশ সালে টালিগঞ্জের ইন্দ্রপুরী স্টুডিও মালিকের আশ্বাস পেয়ে আবার কলকাতায় গিয়েছিলাম চলচ্চিত্র নির্মাণকাজ নতুন করে শুরু করার আশায়। পরিবেশের পরিবর্তন ঘটেছে। পার্ক সার্কাসে মুসলমান প্রতিবেশীরা কেউ নেই। তবু কলকাতার দাঙ্গা নিয়ে কাহিনী রচনা প্রায় সমাপ্ত। শিল্পী নির্বাচনও শুরু করার কথা ভাবছি। এমন সময় বজ্রপাত। মহাত্মা গান্ধী আততায়ীর হাতে নিহত হলেন। নাথুরাম গডসে আমাদেরও বাঁচতে দিল না। নিমেষেই যেন পট পাল্টে গেল। যেখানেই যাই নিজেকে অবাঞ্ছিত বোধ করতে লাগলাম। আমার ম্যানেজার হরেন মুখার্জীকেও কেমন অসহায় মনে হলো। সুতরাং সপ্তাহখানেক পরই কলকাতাকে চিরবিদায় জানিয়ে শেষবারের মতো চলে আসতে হলো। ঢাকায় তখনও বাণিজ্যিকভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণের কোন সুযোগ-সুবিধা ছিল না। তাই ফেনীর বাড়িতে আশাহত মনে নিরাশার ধেয়ানে কাল কাটাতে লাগলাম।

কয়েক মাস পর ১৯৪৯ সালে ঢাকা থেকে ইংরেজি ভাষার দৈনিক পত্রিকা দি পাকিস্তান অবজার্ভার প্রকাশিত হয়। মালিক আল হেলাল কোম্পানি। হামিদুল হক চৌধুরী তার চেয়ারম্যান। জনাব আবদুস সালামের সুসম্পাদনায় ঢাকার পাকিস্তান অবজারভার উপমহাদেশে একটি উন্নতমানের সংবাদপত্রের মর্যাদা লাভ করে। পঞ্চাশ সালের দিকে এই অবজারভারে লেখালেখি শুরু করি। একান্ন সালের ৫ জুলাইয়ে লেখা সম্পাদক সালাম সাহেবের একটা চিঠি পাই। তিনি লিখেছেন- “My dear Brother, I have come to learn that you are not keeping good health for some time past...I believe it will be very good for you if instead of lying quiescent on bed at Feni you could join us hee as a member of the Editorial Board. Mr. Hamidul Huq Chowdhury has also agreed with us and I write to you with his author- ity to request you to come here and join us...”

স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পেরে উত্তর দিতে গড়িমসি করছিলাম। ৭ আগস্ট তাঁর টেলিগ্রাম পেলাম- Please join immediately. দুদিন পর ঢাকায় এলাম। অবজারভার অফিসে আমাকে বলা হলো বাড়িতে বসে যখন পারি লিখলেই চলবে। এভাবে জনাব সালামের সৌজন্য ও নির্বন্ধাতিশয্যে আমার সাংবাদিক জীবনের শুরু। অবসর জীবনের প্রায় অলস দিনে তাঁকে গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি।

বায়ান্ন সালে একেবারে অযৌক্তিকভাবে মুসলিম লীগ সরকার পাকিস্তান অবজারভার-এর প্রকাশনা অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। চুয়ান্ন সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। অবজারভার পুনঃপ্রকাশিত হয় এবং আজও তার প্রকাশনা অব্যাহত আছে।

ওইসময়ই প্রায় এক যুগ পর আহমদুল কবিরের সঙ্গে আবার সাক্ষাৎ হয়। এবার ঢাকায় সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতার ভুবনে, যে ভুবনে তাঁর দৃপ্ত পদচারণা অর্ধশতাব্দী ধরে অপ্রতিহত ছিল। তিনি সরকারি চাকরি করেছেন। নানা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করেছেন। একাধিক বামপন্থী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। নতুন দল গঠন করেছেন।

কিন্তু তিনি মূলত ছিলেন একজন নেতৃস্থানীয় সাংবাদিক। দৈনিক সংবাদ ছিল তাঁর গর্ব, তাঁর গৌরব। দৈনিক ‘সংবাদ’-এর প্রধান সম্পাদক- এই ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠ ও শেষ পরিচয়।

তাঁর আকস্মিক অন্তর্ধানে একটা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী শূন্যতাবোধে আমরা পীড়িত।

৯ ডিসেম্বর, ২০০৩

ছবি

এবার ৪০০ পুলিশ সদস্য পাচ্ছেন

ছবি

টাঙ্গাইল শাড়ি আমাদের : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

ছবি

প্রশ্নফাঁস হয়নি, প্রতারক চক্র গুজব ছড়াচ্ছে : ঢাবি উপাচার্য

ছবি

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ট্রাফিক লাইট সচলের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

ছবি

মাটি ও মানুষের সঙ্গে সংযোগ আছে, দেশে এমন রাজনৈতিক দলের অভাব : শেখ হাসিনা

ছবি

মজুতকারীদের গণধোলাই দেওয়া উচিত: প্রধানমন্ত্রী

ছবি

রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের ৩৮ সদস্য গ্রেফতার

ছবি

লিবিয়া থেকে ফিরলেন আরও ১৪৪ বাংলাদেশি

ছবি

জার্মানি সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন শুরু

ছবি

নতুন সরকার গঠনের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আসছেন প্রধানমন্ত্রী

ছবি

চেম্বার ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অ্যানেসথেসিয়া দেয়া যাবে না

দ্রব্যমূলের উর্ধ্বগতি অনেকেই কষ্টে দিন কাটছে বলে অভিযোগ

ছবি

সেনাবাহিনীর ভেটেরিনারি কোরের বাৎসরিক অধিনায়ক সম্মেলন ঃ প্রথম কোর পূর্ণমিলনী অনুষ্ঠিত

ছবি

চেম্বার-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া যাবে না: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

ছবি

দেশে ৪০ শতাংশ শিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে

ছবি

বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে ‘সামুদ্রিক সম্পদ’ আহরণ করুন: প্রধানমন্ত্রী

ছবি

পাসপোর্ট সূচকে এক ধাপ পেছাল বাংলাদেশ

ছবি

প্রধানমন্ত্রীকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টের অভিনন্দন

ছবি

ঋণ পরিশোধের চাপ তো কিছুটা আছে, তবে আমরা কি মরে গেছি : অর্থমন্ত্রী

ছবি

২১ বছর সমুদ্রসীমার অধিকার নিয়ে কেউ কথা বলেনি: প্রধানমন্ত্রী

ছবি

মর্মাহত স্বাস্থ্যমন্ত্রী, জে এস ডায়াগনস্টিক সেন্টার তাৎক্ষণিক বন্ধের নির্দেশ

ছবি

বিদেশি ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও মাতৃভাষা শিক্ষার মাধ্যম হওয়া উচিত: প্রধানমন্ত্রী

ছবি

কারসাজি বন্ধে চালের বস্তায় ৬ টি তথ্য লেখা বাধ্যতামূলক করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়

ছবি

বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষায় রূপান্তরিত করাই লক্ষ্য: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ছবি

‘অনুমোদন’ ছাড়াই অ্যানেস্থেসিয়া, জেএস ডায়াগনস্টিক সিলগালা

ছবি

এবার সুন্নতে খৎনা করাতে গিয়ে আইডিয়াল শিক্ষার্থীর মৃত্যু

ছবি

উচ্চ আদালতে বেড়েছে বাংলা ভাষার ব্যবহার, রায় ও শুনানি হচ্ছে বাংলায়

ছবি

মার্চে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে: প্রতিমন্ত্রী

ছবি

একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি স্পিকারের শ্রদ্ধা

ছবি

জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার ১১ বিচারক বদলি

ছবি

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে ভিড়

ছবি

একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

ছবি

শিশু আয়ানের মৃত্যু: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে হাইকোর্টের ‘অসন্তুষ্ট, তদন্তে নতুন কমিটি

ছবি

হাছান মাহমুদের সঙ্গে ঘানার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাত

ছবি

তিউনিসিয়া উপকূলে নৌ-দুর্ঘটনায় ৮ বাংলাদেশীর প্রাণহানি ও ২৭ জীবিত উদ্ধার

ছবি

১৫ ঘন্টা অস্ত্রপচারে আলাদা হলো শিশু নূহা ও নাভা

tab

জাতীয়

স্মৃতিতে সজীব সুস্থ

ওবায়েদ উল হক

আহমদুল কবির জন্ম : ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯২৩; মৃত্যু : ২৪ নভেম্বর ২০০৩

শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

আহমদুল কবিরের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে ১৯৪৪ কি ৪৫-এ কলকাতায় ধর্মতলা স্ট্রিটে ছায়ানট পিকচার্স নামে আমার চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থার অফিসে। আমি তখন ১৯৪৩ সালে অবিভক্ত বাংলায় মজুতদার-মুনাফাখোর-অসাধু ব্যবসায়ীদের সৃষ্ট কৃত্রিম মহাদুর্ভিক্ষের পটভূমিতে রচিত কাহিনী অবলম্বনে ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’ নামক পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি নির্মাণ করছি। সেই তেতাল্লিশের মন্বন্তরে পঞ্চাশ লাখ লোক অনাহারে মারা যায়। এমন একটি জাতীয় ট্র্যাজেডির করুণ চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য সিনেমাকেই গণসংযোগের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম।

একদিন আমার ধর্মতলার অফিসে কয়েকজন দীপ্তিমান নবীন অভ্যাগতের আগমন গুলো। খায়রুল কবির, আহমদুল কবির, সৈয়দ নুরুদ্দিন, এ.কে.এম আহসান (পরে জাদরেল সিএসপি), কবি সানাউল হক মামুন (পরে বিশিষ্ট সিএসপি), ওয়াদুদুল হক ( আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়)- সকলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, কৃতী, মেধাবী ছাত্র। কদল প্রিয় বান্ধব। আমার অফিসে এলেন ওয়াদুদুল হক সাহেবের সুবাদে।

প্রতিদিনই আসেন। একদিন দৈনিক আজাদ-এর বার্তা সম্পাদক মোহাম্মদ মোদাব্বের আলেন। তাঁর আমন্ত্রণে এঁরা সবাই আজাদ-এর বার্তা বিভাগে সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত টিকে থাকলেন শুধু খায়রুল কবির। তিনি ’৪৭-এ বাংলা বিভাগের পর আজাদ পত্রিকার কলকাতা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের কাজ দেখাশোনা করেন। তখন আহমদুল কবিরকে মনে হয়েছে মিতভাষী ও প্রিয়ভাষী। বুদ্ধির দীপ্তি তাঁর নীরব হাসিতে ও সরব বাচনে। আহমদুল কবির চলে গেলেন ব্যাংকিংয়ের জগতে। হলেন স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার অফিসার। কৃতিত্বের সঙ্গে চাকরি করেছেন; কিন্তু বাঁধা পথে চলতে তার উৎসাহ ছিল না। নিজের তৈরি পথে চলতেই তাঁর আনন্দ। স্বাধীন জীবনের আকর্ষণ ছিল অপ্রতিরোধ্য। আজাদের বার্তা বিভাগ তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। কিন্তু সাংবাদিকতার অদৃশ্য বাঁধন কি তিনি ছিন্ন করতে পেরেছিলেন?

দৃশ্যতই পারেননি। এক সময় চাকরির মায়া ত্যাগ করে তিনি স্বাধীন ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। তবে এটাও ছিল অন্য কোন মহত্তর উদ্দেশ্য সাধনের উপায় মাত্র তা বুঝতে খুব বেশি দেরি হয়নি। ’৫৪ সালে তিনি দৈনিক ‘সংবাদ’-এর মালিকানা কিনে নিলেন। অন্য কোন মূল্যবান অর্থকরী প্রতিষ্ঠান নয়, কিনলেন একটি সংবাদপত্র। কেন? গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ সংবাদপত্র। জনস্বার্থের অতন্দ্র প্রহরী সংবাদপত্র। সেই সংবাদপত্রই তিনি কিনলেন। বোধগম্য কারণেই। জনগণের সঙ্গে তাঁর নাড়ির যোগ অবিচ্ছেদ্য। জনকল্যাণমূলক কোন কাজে সাংবাদিকতার ভূমিকার গুরুত্ব সঠিক অনুধাবন করেই তিনি তা করেছিলেন। পরে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও সহায়ক ছিল এই সংবাদপত্র দৈনিক ‘সংবাদ’-এর আবির্ভাব ঘটে প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকারের মুখপত্র হিসেবে। ’৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের সাড়া জাগানো বিজয় ও মুসলিম লীগের ভরাডুবির ফলে দৈনিক ‘সংবাদ’ তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে; কিন্তু হাতবদলের ফলে এর চরিত্র বদলও ঘটে। আহমদুল কবিরের মালিকানা ও সম্পাদনায় দৈনিক ‘সংবাদ’ অল্পদিনের মধ্যেই একটি আধুনিক, উদার, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। একদা মুসলিম লীগ সরকারের মুখপত্র দৈনিক ‘সংবাদ’ আজ বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী, নির্ভীক, গণতন্ত্রের মুখপত্র জাতীয় দৈনিক। এই বিস্ময়কর রূপান্তরের ইতিহাসও বেশ বেদনাদায়ক। বিজ্ঞাপন বন্ধ, কালো তালিকাভুক্তি ও প্রকাশনা নিষিদ্ধ ইত্যাদি নিবর্তনমূলক পদক্ষেপের পরও মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাক হানাদার বাহিনী এর কার্যালয় পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। তাঁকে কারারুদ্ধও করা হয়, কিন্তু তিনি আপস করেননি। কোন নির্যাতনই আহমদুল কবিরকে তাঁর গণতান্ত্রিক বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। অসীম মনোবলের অধিকারী ছিলেন বলেই তিনি দৈহিক নির্যাতন ও আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করেও নীতিতে অটল থাকতে পেরেছিলেন।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলো। খণ্ডিত বাংলার পূর্বাংশ হলো পূর্ব পাকিস্তান। ’৪৬ সালের কলকাতার রক্তক্ষয়ী হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার নারকীয়তা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলাম। কিন্তু দেশ ভাগের ধাক্কা সামলানো সম্ভব হয়নি। ধর্মতলার অফিস একেবারে বন্ধ করে পার্ক সার্কাসের বাসা হিন্দু ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানে রেখে আমি সপরিবারে জন্মস্থান পূর্ববাংলার ফেনীতে চলে আসতে বাধ্য হই। সাত-আট মাস পর আটচল্লিশ সালে টালিগঞ্জের ইন্দ্রপুরী স্টুডিও মালিকের আশ্বাস পেয়ে আবার কলকাতায় গিয়েছিলাম চলচ্চিত্র নির্মাণকাজ নতুন করে শুরু করার আশায়। পরিবেশের পরিবর্তন ঘটেছে। পার্ক সার্কাসে মুসলমান প্রতিবেশীরা কেউ নেই। তবু কলকাতার দাঙ্গা নিয়ে কাহিনী রচনা প্রায় সমাপ্ত। শিল্পী নির্বাচনও শুরু করার কথা ভাবছি। এমন সময় বজ্রপাত। মহাত্মা গান্ধী আততায়ীর হাতে নিহত হলেন। নাথুরাম গডসে আমাদেরও বাঁচতে দিল না। নিমেষেই যেন পট পাল্টে গেল। যেখানেই যাই নিজেকে অবাঞ্ছিত বোধ করতে লাগলাম। আমার ম্যানেজার হরেন মুখার্জীকেও কেমন অসহায় মনে হলো। সুতরাং সপ্তাহখানেক পরই কলকাতাকে চিরবিদায় জানিয়ে শেষবারের মতো চলে আসতে হলো। ঢাকায় তখনও বাণিজ্যিকভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণের কোন সুযোগ-সুবিধা ছিল না। তাই ফেনীর বাড়িতে আশাহত মনে নিরাশার ধেয়ানে কাল কাটাতে লাগলাম।

কয়েক মাস পর ১৯৪৯ সালে ঢাকা থেকে ইংরেজি ভাষার দৈনিক পত্রিকা দি পাকিস্তান অবজার্ভার প্রকাশিত হয়। মালিক আল হেলাল কোম্পানি। হামিদুল হক চৌধুরী তার চেয়ারম্যান। জনাব আবদুস সালামের সুসম্পাদনায় ঢাকার পাকিস্তান অবজারভার উপমহাদেশে একটি উন্নতমানের সংবাদপত্রের মর্যাদা লাভ করে। পঞ্চাশ সালের দিকে এই অবজারভারে লেখালেখি শুরু করি। একান্ন সালের ৫ জুলাইয়ে লেখা সম্পাদক সালাম সাহেবের একটা চিঠি পাই। তিনি লিখেছেন- “My dear Brother, I have come to learn that you are not keeping good health for some time past...I believe it will be very good for you if instead of lying quiescent on bed at Feni you could join us hee as a member of the Editorial Board. Mr. Hamidul Huq Chowdhury has also agreed with us and I write to you with his author- ity to request you to come here and join us...”

স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পেরে উত্তর দিতে গড়িমসি করছিলাম। ৭ আগস্ট তাঁর টেলিগ্রাম পেলাম- Please join immediately. দুদিন পর ঢাকায় এলাম। অবজারভার অফিসে আমাকে বলা হলো বাড়িতে বসে যখন পারি লিখলেই চলবে। এভাবে জনাব সালামের সৌজন্য ও নির্বন্ধাতিশয্যে আমার সাংবাদিক জীবনের শুরু। অবসর জীবনের প্রায় অলস দিনে তাঁকে গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি।

বায়ান্ন সালে একেবারে অযৌক্তিকভাবে মুসলিম লীগ সরকার পাকিস্তান অবজারভার-এর প্রকাশনা অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। চুয়ান্ন সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। অবজারভার পুনঃপ্রকাশিত হয় এবং আজও তার প্রকাশনা অব্যাহত আছে।

ওইসময়ই প্রায় এক যুগ পর আহমদুল কবিরের সঙ্গে আবার সাক্ষাৎ হয়। এবার ঢাকায় সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতার ভুবনে, যে ভুবনে তাঁর দৃপ্ত পদচারণা অর্ধশতাব্দী ধরে অপ্রতিহত ছিল। তিনি সরকারি চাকরি করেছেন। নানা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করেছেন। একাধিক বামপন্থী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। নতুন দল গঠন করেছেন।

কিন্তু তিনি মূলত ছিলেন একজন নেতৃস্থানীয় সাংবাদিক। দৈনিক সংবাদ ছিল তাঁর গর্ব, তাঁর গৌরব। দৈনিক ‘সংবাদ’-এর প্রধান সম্পাদক- এই ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠ ও শেষ পরিচয়।

তাঁর আকস্মিক অন্তর্ধানে একটা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী শূন্যতাবোধে আমরা পীড়িত।

৯ ডিসেম্বর, ২০০৩

back to top