image
সরকারের সঙ্গে আলোচনা সন্তোষজনক না হওয়ায় গতকাল প্রাথমিকের শিক্ষকরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন -সংবাদ

দুর্নীতি: আরও খারাপ হয়েছে বাংলাদেশের অবস্থা, বলছে টিআইবি

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর বিচারে গত এক বছরে বাংলাদেশে দুর্নীতি পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তাতে তাদের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনমন ঘটেছে দুই ধাপ। দুর্নীতির এই ধারণা সূচকের (সিপিআই) ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) বিশ্বের ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এবার ১৫১ নম্বরে। গতবার এ তালিকায় বাংলাদেশ ১৪৯ নম্বরে ছিল। আবার অধঃক্রম অনুযায়ী (খারাপ থেকে ভালো) বিবেচনা করলে বাংলাদেশ অবস্থান এবার ১৮০ দেশের মধ্যে চতুর্দশ, যেখানে গতবছর ছিল দশম অবস্থানে। ১০০ ভিত্তিতে এই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর এক বছরে দুই পয়েন্ট কমে হয়েছে ২৩। এই স্কেলে শূন্য স্কোরকে দুর্নীতির ব্যাপকতার ধারণায় সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ১০০ স্কোরকে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত বা সর্বোচ্চ সুশাসনের দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশ্বের ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের ২০২৪ সালের দুর্নীতির পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বার্লিনভিত্তিক সংস্থা টিআই তাদের এই বার্ষিক সূচক প্রকাশ করে।

দুর্নীতির ধারণা সূচকে (সিপিআই) বৈশ্বিক গড় স্কোরের কাছাকাছি, গত ১২ বছরেও পৌঁছাতে পারেনি বাংলাদেশ। এরমধ্যে স্কোর বেড়েছিল মাত্র তিনবার, বেশিরভাগ সময়েই হয়েছে পতন। সিপিআই অনুযায়ী, দুর্নীতির ধারণার মাত্রাকে ০ (শূন্য) থেকে ১০০ (একশ)-এর স্কেলে নির্ধারণ করা হয়। এই পদ্ধতি

অনুসারে, স্কেলের ০ (শূন্য) স্কোরকে দুর্নীতির ব্যাপকতায় সর্বোচ্চ এবং ১০০ স্কোরকে দুর্নীতির ব্যাপকতা সর্বনিম্ন বলে ধারণা করা হয়। এক্ষেত্রে বৈশ্বিক গড় স্কোর ৪৩ এর ঘরে।

সূচক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সাল থেকে এবারই বাংলাদেশের স্কোর সবচেয়ে কম। অর্থাৎ, দুর্নীতি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান এক যুগের মধ্যে এখনই সবচেয়ে বাজে। ২০১২ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৬, পরের বছরেই তা বেড়ে ২৭ হয় এবং ২০১৮ সালে হয় ২৮। তারপরেই ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করে। সর্বশেষ যা মাত্র ২৩-এ নেমেছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক গড় স্কোরের তুলনায় বাংলাদেশ পেয়েছে প্রায় অর্ধেক। কেবল তাই নয়, গত ১২ বছরের মধ্যে এবার সর্বনিম্ন স্কোর পেয়েছে বাংলাদেশ।

তবে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও বাংলাদেশের মতো এত ব্যাপকতর দুর্নীতি নেই। ফলে তাদের সিপিআই সূচকে তাদের অবস্থান বাংলাদেশের থেকে অনেক এগিয়ে। যেমন ভুটান রয়েছে ১৮তম স্থানে, মালদ্বীপ ৯৬, ভারত ৯৬, নেপাল ১০৭, শ্রীলঙ্কা ১২১ এবং পাকিস্তান ১৩৫তম স্থানে। মানে এরা সবাই বাংলাদেশের থেকে উপরের দিকে অবস্থান করছে।

মঙ্গলবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে তাদের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সেখানে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এবারের প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক এবং বাংলাদেশের দুর্নীতির পরিস্থিতি তুলে ধরেন।

সেখানে তিনি বাংলাদেশ দুর্নীতির নিয়ন্ত্রণ ‘হারাতে বসেছে’ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের স্কোর কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর তুলনায় কম। এ সূচকে শুধু কর্তৃত্ববাদীর মেয়াদ বলা যাবে না, এর মধ্যে অন্তর্বতীকালীন সরকারেরও কিছুটা মেয়াদ চলে এসেছে।’

গতবারের মতোই এ সূচকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে বাজে অবস্থায় আছে কেবল মায়ানমার ও আফগানিস্তান। ১৬ স্কোর নিয়ে মায়ানমার ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) রয়েছে তালিকার ১৬৮ নম্বরে। আর তালিকার ১৬৫তম অবস্থানে থাকা আফগানিস্তানের স্কোর ১৬।

গতবারের মতোই এ সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে ভুটান। ৭২ স্কোর নিয়ে ভুটানের অবস্থান সূচকের ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী ১৮ নম্বরে। এরপর ভারত ও মালদ্বীপ ৯৬ (স্কোর ৩৮), নেপাল ১০৭ (স্কোর ৩৪), শ্রীলঙ্কা ১২১ (স্কোর ৩২), পাকিস্তান ১৩৫তম (স্কোর ২৭) । ২৩ স্কোরে বাংলাদেশের সঙ্গে সূচকের একই অবস্থানের রয়েছে ইরান ও কঙ্গো। ইফতেখারুজ্জান বলেন, অ্যাপার্টমেন্ট কেনা, বিনিয়োগ করার সুযোগ কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলো করে দিচ্ছে, সেখান থেকে অর্থপাচারের চাহিদা আসছে। ‘ওইসব দেশ থেকে প্রশ্ন এলে পাচার করাটা নিয়ন্ত্রণ করা যেত। আমাদের দেশ থেকে যেসব দেশে টাকা পাচার হচ্ছে, তাদের স্কোর আমাদের চেয়ে অনেক ভালো। যেমন- সিঙ্গাপুরে আমাদের দেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে, সিঙ্গাপুর হচ্ছে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে। এই দুর্নীতির দায়ও আমাদের, অর্থপাচারের দায়ও আমাদের। যদিও আমরা ব্যর্থ হচ্ছি।’ ৫ আগস্ট ক্ষমতার পালাবদলের পরও দেশে ‘চাঁদাবাজি, দখলবাজি’ চলছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। ইফতেখারুজ্জান বলেন, ‘সুতরাং ব্যক্তির পরিবর্তন হয়েছে, চেয়ারের পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু চলাচল পরিবর্তন হয়নি।’ এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘দুদক সংস্কারে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে সেগুলো মেনে পদক্ষেপ নেয়া হলে বাংলাদেশের স্কোর বাড়ার সম্ভাবনা আছে। তবে সেটা নির্ভর করবে এ প্রতিষ্ঠানগুলো কতটুকু কার্যকর এবং রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের পরিবর্তন কতটুকু হবে তার ওপর।’

‘দুদক অসংখ্য মামলা হাতে নিয়েছে, দুদক চেষ্টা করছে দায়িত্বটা কার্যকরভাবে পালন করার জন্য। কতটুকু হচ্ছে সেটা হয়ত আমরা পরে আরও বিশ্লেষণ করে বলব। কিন্তু এটা দৃশ্যমান যে তাদের (দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা) হাতে এ কাজগুলো দেয়া হয়েছে।’ টিআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের সূচকে ১৮০টি দেশের গড় স্কোর গতবারের মতোই ৪৩। তালিকায় এবার সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে আফ্রিকার দেশ সাউথ সুদান. তাদের স্কোর ৮। এরপরে রয়েছে যথাক্রমে সোমালিয়া, ভেনেজুয়েলা, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া, ইরিত্রিয়া, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, নিকারাগুয়া ও সুদান। অন্যদিকে সর্বোচ্চ ৯০ স্কোর নিয়ে গতবারের মতোই তালিকায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ডেনমার্ক। এর পরে রয়েছে ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, নিউজিল্যান্ড, লুক্সেমবুর্গ, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস ও অস্ট্রেলিয়া।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি