যশোর অঞ্চলের সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার বেড়িবাঁধ সংস্কারে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী -সংবাদ
সাতক্ষীরার খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ ঈদের দিন সকালে ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বাঁধ ভেঙে ঢোকা পানিতে তলিয়ে গেছে ২০০ বিঘা জমির ধান, ৪ হাজার বিঘার বেশি চিংড়ি ঘের, এবং প্রায় ৮ শতাধিক বসতবাড়ি। ঈদ আনন্দ তো দূরের কথা, ওই এলাকার ১০ গ্রামের ১৫ হাজার মানুষ এখন পানিবন্দি এবং ঘরছাড়া হয়ে পড়েছেন।
বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর, কোন উপায় না পেয়ে গ্রামবাসী নিজ উদ্যোগে ঝুঁকি নিয়ে বাঁধ মেরামতের চেষ্টা করেন। তারা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ভাঙা বেড়িবাঁধের স্থানে বিকল্প রিং বসিয়ে বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা করলেও, জোয়ারের পানির চাপে তা সম্ভব হয়নি। অবশেষে, তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনীর একটি টিম।
সরজমিনে দেখা যায়, বর্তমানে আনুলিয়া ইউনিয়নের বিছট, বল্লভপুর, আনুলিয়া, নয়াখালী, চেঁচুয়া, কাকবসিয়া, পারবিছুট এবং বাসুদেবপুর গ্রামসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া, কমপক্ষে ৮টি গ্রাম আংশিক প্লাবিত হয়েছে।
ঈদুল ফিতরের দিন, ৩১ মার্চ (সোমবার) সকালে, পৌনে ৯টার দিকে আনুলিয়া ইউনিয়নের বিছট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশ থেকে খোলপেটুয়া নদীর ২০০ ফুট এলাকায় বেড়িবাঁধ হঠাৎ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
স্থানীয় গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে টানা চার দিন ভাঙন পয়েন্টে বিকল্প রিং বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা করলেও, শেষ রক্ষা হয়নি। এরপর থেকে একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হতে থাকে।
প্লাবিত এলাকার সহস্রাধিক মানুষ বর্তমানে বেড়িবাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি এবং গৃহস্থালির মালামাল নিয়ে তারা চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন।
আনুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, বাঁধ ভেঙে প্রবল জোয়ারের পানিতে ২০০ বিঘা জমির ধান ও ৪ হাজার বিঘার অধিক চিংড়ি ঘের তলিয়ে গেছে। প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ বাড়িঘর পানির নিচে ডুবে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মানুষ এখন দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ভাঙনের পরপরই গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বিকল্প রিং বাঁধ তৈরির চেষ্টা করলেও, প্রবল জোয়ারের তোড়ে সেই বাঁধও ধসে পড়ে, যার ফলে নতুন করে আরও বেশি এলাকায় পানি ঢুকে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাছের ঘেরে নদীর লবণ পানি প্রবাহের জন্য বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে তলার দিকে পাইপ বসানো হয়েছিল, যার কারণে বাঁধের নিচের মাটি দুর্বল হয়ে
পড়েছিল। ধীরে ধীরে মাটি ক্ষয় হয়ে হঠাৎ করে বেড়িবাঁধ ধসে পড়ে, ফলে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে।
বিছট গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল লতিফ জানান, বেড়িবাঁধের ভাঙন পয়েন্ট দিয়ে প্লাবিত এলাকার পানি খোলপেটুয়া নদীতে নামছে, এবং পানির স্রোতে ল্যান্ড সাইডের ভূমি ভেঙে যাচ্ছে।
স্থানীয় উদ্যোগে কয়েকশ মানুষ ভাঙন পয়েন্ট থেকে কিছুটা দূরে মাটি ও বালির বস্তা দিয়ে রিং বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। তবে, দুপুরের জোয়ার শুরু হলে ভাঙন পয়েন্ট দিয়ে ফের প্রবল বেগে পানি ঢুকতে শুরু করে, ফলে আরও নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভয়ভীতি নিয়ে বিছট গ্রামের অনেকে গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছেন। মাটির ঘর ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় অনেকেই তাদের মালপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরের জোয়ারে প্লাবিত গ্রামগুলোর নিম্নঞ্চলের অনেক বাড়িতে নতুন করে পানি উঠে গেছে। তলিয়ে গেছে বেশ কয়েকটি মিষ্টি পানির পুকুরও।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিছট গ্রামের একজন বাসিন্দা বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, পাউবো কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে ভাঙন মেরামতের কাজ বিলম্বিত হচ্ছে, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে।
কর্তৃপক্ষের কার্যকরী উদ্যোগের অভাবে, কিভাবে দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধ করে একটি বিকল্প রিং বাঁধ নির্মাণ করা যাবে সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই, ফলে ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের জন্য বিডম্বনা দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
বিছট নিউ মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আবু দাউদ জানান, বিছট গ্রামের যে স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙেছে, সে স্থানটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এছাড়া, মূল যে পয়েন্টটি ভেঙেছে সেখানে একটি পাইপলাইন ও গেট সিস্টেম ছিল। মাছের ঘেরে পানি তোলার জন্য পাউবো’র বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে পাইপ বসানো হয়েছিল, যার কারণে হঠাৎ বাঁধটি ধসে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, গত সোমবার ঈদের নামাজের সময়, পৌনে ৯টার দিকে গ্রামবাসী জানতে পারেন যে, হঠাৎ করে বাঁধটি ধসে পড়েছে। আমরা গ্রামবাসীর সঙ্গে কয়েকশ লোক দ্রুত ভাঙন পয়েন্টে পৌঁছে বাঁধটি সংস্কারের চেষ্টা করি। তবে, দুপুরের জোয়ারের সময় আমাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ভাঙন পয়েন্ট দিয়ে দ্রুত বেগে পানি ঢুকতে থাকে লোকালয়ে। বিদ্যালয়ের মাঠেও খোলপেটুয়া নদীর পানি প্রবেশ করেছে।
ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) আশাশুনি উপজেলা টিম লিডার আবদুল জলিল বলেন, মূল যে পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙেছে, সেটাতে একটি পাইপলাইন ও গেট সিস্টেম ছিল। তিনি জানান, যেসব ভাঙন পয়েন্টে সমস্যা দেখা দিয়েছে, সবগুলোতেই পাইপলাইনের কারণে দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছে। যদি এই পাইপলাইন স্থাপন বন্ধ না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, পানিবন্দি মানুষ এখন খাদ্য সংকটে ভুগছে। অনেক পরিবার উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে, তবে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ শুরু করলেও এখনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
আনুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রুহুল কদ্দুস জানান, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর থেকে গত কয়েকদিন তাঁদের রাত কাটছে নির্ঘুম। ঈদে তাঁর ইউনিয়নের মানুষ কোনো আনন্দ উপভোগ করতে পারেননি।
স্থানীয়রা সংবাদ প্রতিনিধিকে জানান, বেড়িবাঁধ দ্রুত সংস্কার করা না হলে আনুলিয়া ইউনিয়নের পার্শ্ববর্তী খাজরা ও বড়দল ইউনিয়নের নিম্নঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানান, ভাঙন কবলিত এলাকার ৩০০ মিটার এলাকায় রিং বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে। তবে, জোয়ারের কারণে কাজে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। নদীতে ভাটা শুরু না হলে কাজ করা সম্ভব হচ্ছিল না। গত বুধবার থেকে বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে এবং বৃহস্পতিবারও কাজ চলেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আজ শুক্রবারের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হবে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদ বলেন, ঈদের কারণে শ্রমিক সংকট ও বালু বোর্ড আনতে দেরি হওয়ায় কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। তিনি জানান, তিনি মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন এবং তা ভয়াবহ ছিল। তবে, বুধবার থেকে সন্ধ্যার পর কাজ শুরু হয়েছে এবং সারারাত চলে। তিনি আশা করেন, শুক্রবারের মধ্যে বাঁধ মেরামতের কাজ শেষ হবে। এছাড়া, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং সেই অনুযায়ী তাদের সহযোগিতা করা হবে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার সকাল থেকে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক, আশাশুনি আর্মি ক্যাম্প কমান্ডার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধি ভেঙে যাওয়া বাঁধ ও প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তারা সংকট নিরসনের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
আশাশুনি ক্যাম্প থেকে দুটি পেট্রোল টিম এলাকাটিতে অবস্থান করছে এবং স্থানীয় লোকজন প্রশাসনকে বাঁধ মেরামতের কাজে সহায়তা করছে। এর পাশাপাশি, সেনাবাহিনীর ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের একটি বিশেষ দল বাঁধ মেরামতের জন্য পাঠানো হয়েছে, যারা বাঁধের মেরামতের কাজ করছেন।
যশোর অঞ্চলের সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার বেড়িবাঁধ সংস্কারে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী -সংবাদ
শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫
সাতক্ষীরার খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ ঈদের দিন সকালে ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বাঁধ ভেঙে ঢোকা পানিতে তলিয়ে গেছে ২০০ বিঘা জমির ধান, ৪ হাজার বিঘার বেশি চিংড়ি ঘের, এবং প্রায় ৮ শতাধিক বসতবাড়ি। ঈদ আনন্দ তো দূরের কথা, ওই এলাকার ১০ গ্রামের ১৫ হাজার মানুষ এখন পানিবন্দি এবং ঘরছাড়া হয়ে পড়েছেন।
বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর, কোন উপায় না পেয়ে গ্রামবাসী নিজ উদ্যোগে ঝুঁকি নিয়ে বাঁধ মেরামতের চেষ্টা করেন। তারা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ভাঙা বেড়িবাঁধের স্থানে বিকল্প রিং বসিয়ে বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা করলেও, জোয়ারের পানির চাপে তা সম্ভব হয়নি। অবশেষে, তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনীর একটি টিম।
সরজমিনে দেখা যায়, বর্তমানে আনুলিয়া ইউনিয়নের বিছট, বল্লভপুর, আনুলিয়া, নয়াখালী, চেঁচুয়া, কাকবসিয়া, পারবিছুট এবং বাসুদেবপুর গ্রামসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া, কমপক্ষে ৮টি গ্রাম আংশিক প্লাবিত হয়েছে।
ঈদুল ফিতরের দিন, ৩১ মার্চ (সোমবার) সকালে, পৌনে ৯টার দিকে আনুলিয়া ইউনিয়নের বিছট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশ থেকে খোলপেটুয়া নদীর ২০০ ফুট এলাকায় বেড়িবাঁধ হঠাৎ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
স্থানীয় গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে টানা চার দিন ভাঙন পয়েন্টে বিকল্প রিং বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা করলেও, শেষ রক্ষা হয়নি। এরপর থেকে একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হতে থাকে।
প্লাবিত এলাকার সহস্রাধিক মানুষ বর্তমানে বেড়িবাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি এবং গৃহস্থালির মালামাল নিয়ে তারা চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন।
আনুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, বাঁধ ভেঙে প্রবল জোয়ারের পানিতে ২০০ বিঘা জমির ধান ও ৪ হাজার বিঘার অধিক চিংড়ি ঘের তলিয়ে গেছে। প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ বাড়িঘর পানির নিচে ডুবে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মানুষ এখন দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ভাঙনের পরপরই গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বিকল্প রিং বাঁধ তৈরির চেষ্টা করলেও, প্রবল জোয়ারের তোড়ে সেই বাঁধও ধসে পড়ে, যার ফলে নতুন করে আরও বেশি এলাকায় পানি ঢুকে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাছের ঘেরে নদীর লবণ পানি প্রবাহের জন্য বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে তলার দিকে পাইপ বসানো হয়েছিল, যার কারণে বাঁধের নিচের মাটি দুর্বল হয়ে
পড়েছিল। ধীরে ধীরে মাটি ক্ষয় হয়ে হঠাৎ করে বেড়িবাঁধ ধসে পড়ে, ফলে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে।
বিছট গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল লতিফ জানান, বেড়িবাঁধের ভাঙন পয়েন্ট দিয়ে প্লাবিত এলাকার পানি খোলপেটুয়া নদীতে নামছে, এবং পানির স্রোতে ল্যান্ড সাইডের ভূমি ভেঙে যাচ্ছে।
স্থানীয় উদ্যোগে কয়েকশ মানুষ ভাঙন পয়েন্ট থেকে কিছুটা দূরে মাটি ও বালির বস্তা দিয়ে রিং বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। তবে, দুপুরের জোয়ার শুরু হলে ভাঙন পয়েন্ট দিয়ে ফের প্রবল বেগে পানি ঢুকতে শুরু করে, ফলে আরও নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভয়ভীতি নিয়ে বিছট গ্রামের অনেকে গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছেন। মাটির ঘর ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় অনেকেই তাদের মালপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরের জোয়ারে প্লাবিত গ্রামগুলোর নিম্নঞ্চলের অনেক বাড়িতে নতুন করে পানি উঠে গেছে। তলিয়ে গেছে বেশ কয়েকটি মিষ্টি পানির পুকুরও।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিছট গ্রামের একজন বাসিন্দা বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, পাউবো কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে ভাঙন মেরামতের কাজ বিলম্বিত হচ্ছে, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে।
কর্তৃপক্ষের কার্যকরী উদ্যোগের অভাবে, কিভাবে দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধ করে একটি বিকল্প রিং বাঁধ নির্মাণ করা যাবে সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই, ফলে ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের জন্য বিডম্বনা দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
বিছট নিউ মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আবু দাউদ জানান, বিছট গ্রামের যে স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙেছে, সে স্থানটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এছাড়া, মূল যে পয়েন্টটি ভেঙেছে সেখানে একটি পাইপলাইন ও গেট সিস্টেম ছিল। মাছের ঘেরে পানি তোলার জন্য পাউবো’র বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে পাইপ বসানো হয়েছিল, যার কারণে হঠাৎ বাঁধটি ধসে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, গত সোমবার ঈদের নামাজের সময়, পৌনে ৯টার দিকে গ্রামবাসী জানতে পারেন যে, হঠাৎ করে বাঁধটি ধসে পড়েছে। আমরা গ্রামবাসীর সঙ্গে কয়েকশ লোক দ্রুত ভাঙন পয়েন্টে পৌঁছে বাঁধটি সংস্কারের চেষ্টা করি। তবে, দুপুরের জোয়ারের সময় আমাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ভাঙন পয়েন্ট দিয়ে দ্রুত বেগে পানি ঢুকতে থাকে লোকালয়ে। বিদ্যালয়ের মাঠেও খোলপেটুয়া নদীর পানি প্রবেশ করেছে।
ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) আশাশুনি উপজেলা টিম লিডার আবদুল জলিল বলেন, মূল যে পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙেছে, সেটাতে একটি পাইপলাইন ও গেট সিস্টেম ছিল। তিনি জানান, যেসব ভাঙন পয়েন্টে সমস্যা দেখা দিয়েছে, সবগুলোতেই পাইপলাইনের কারণে দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছে। যদি এই পাইপলাইন স্থাপন বন্ধ না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, পানিবন্দি মানুষ এখন খাদ্য সংকটে ভুগছে। অনেক পরিবার উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে, তবে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ শুরু করলেও এখনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
আনুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রুহুল কদ্দুস জানান, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর থেকে গত কয়েকদিন তাঁদের রাত কাটছে নির্ঘুম। ঈদে তাঁর ইউনিয়নের মানুষ কোনো আনন্দ উপভোগ করতে পারেননি।
স্থানীয়রা সংবাদ প্রতিনিধিকে জানান, বেড়িবাঁধ দ্রুত সংস্কার করা না হলে আনুলিয়া ইউনিয়নের পার্শ্ববর্তী খাজরা ও বড়দল ইউনিয়নের নিম্নঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানান, ভাঙন কবলিত এলাকার ৩০০ মিটার এলাকায় রিং বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে। তবে, জোয়ারের কারণে কাজে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। নদীতে ভাটা শুরু না হলে কাজ করা সম্ভব হচ্ছিল না। গত বুধবার থেকে বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে এবং বৃহস্পতিবারও কাজ চলেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আজ শুক্রবারের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হবে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদ বলেন, ঈদের কারণে শ্রমিক সংকট ও বালু বোর্ড আনতে দেরি হওয়ায় কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। তিনি জানান, তিনি মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন এবং তা ভয়াবহ ছিল। তবে, বুধবার থেকে সন্ধ্যার পর কাজ শুরু হয়েছে এবং সারারাত চলে। তিনি আশা করেন, শুক্রবারের মধ্যে বাঁধ মেরামতের কাজ শেষ হবে। এছাড়া, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং সেই অনুযায়ী তাদের সহযোগিতা করা হবে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার সকাল থেকে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক, আশাশুনি আর্মি ক্যাম্প কমান্ডার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধি ভেঙে যাওয়া বাঁধ ও প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তারা সংকট নিরসনের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
আশাশুনি ক্যাম্প থেকে দুটি পেট্রোল টিম এলাকাটিতে অবস্থান করছে এবং স্থানীয় লোকজন প্রশাসনকে বাঁধ মেরামতের কাজে সহায়তা করছে। এর পাশাপাশি, সেনাবাহিনীর ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের একটি বিশেষ দল বাঁধ মেরামতের জন্য পাঠানো হয়েছে, যারা বাঁধের মেরামতের কাজ করছেন।