alt

উপ-সম্পাদকীয়

কপ-২৮ ও বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা

নিতাই চন্দ্র রায়

: বৃহস্পতিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে পৃথিবী আজ এক মহা সংকটের সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও দাবানলের মতো প্রতিঘাত দৃশ্যমান হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাগর অধিক উষ্ণ থাকে বলে সামুদ্রিক ঝড়ের সঙ্গে বেশি বৃষ্টিপাত ও বন্যার প্রাদুর্ভাব ঘটে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০২৫ সালের মধ্যে থেমে যাবে আটলান্টিক মহাসাগরের স্রোত। ইতোমধ্যে অ্যান্টার্কটিকার পৃথিবীর বৃহত্তম বরফখন্ড গলে ও সরে গিয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। সিডর, আইলা ও মহাসেনে ক্ষয়-ক্ষতি কাটিয়ে উঠার আগেই মিধিলির আঘাতে সম্প্রতি বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের অগণিত মানুষ চরম ক্ষতির শিকার হয়েছে। নোয়াখালীর ৫টি উপকূলীয় উপজেলা- হাতিয়া, সুবর্ণচর, কবিরহাট, কোম্পানীগঞ্জ ও সদর উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়নে কয়েকশ বাড়ি-ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে ডালপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড় মিধিলির প্রভাবে পটুয়াখালীতে পাকা আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলার ১ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর আমন ধানের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা। বরিশালে ঘূর্ণিঝড়ে শীতকালীন সবজি ও আমন ধানের ক্ষতি ছাড়াও মৎস্য ও ঘর-বাড়ির ক্ষতি হয়েছে অনেক জায়গায়।

এমনই এক সংকটময় সময়ে এবারের বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৮ অনুষ্ঠিত হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী দুবাইয়ে। বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে রাখার এজেন্ডার পাশাপাশি এবারের সম্মেলনে প্রভাব রেখেছে ইসরাইল-হামাস দ্বন্দ্ব। ৩০ নভেম্বর সম্মেলনের উদ্বোধন করেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। এবারের সম্মেলনের শুরুতেই ইতিবাচক কিছু বিষয় দেখা গেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিধ্বস্ত দুর্বল দেশগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত তহবিল চালু করতে সম্মত হয়েছেন সম্মেলনের নেতারা। প্রতিনিধিদের জীবাশ্ম জ্বালানির ভবিষ্যৎ থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘ বিষয়সমূহ নিয়ে আলোচনা করার কথা রয়েছে।

সম্মেলনের শুরুতেই জাতিসংঘ প্রধান সতর্ক করে বলেছেন, ২০২৩ সালে বিশ্বেরউষ্ণতম বছর হতে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য পূরণ হবে না।

বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশই জলবায়ু সংকটে ঝুঁকির মুখে আছে বলে গবেষণায় দেখা গেলেও একই সময়ে আমাদের খাদ্য ও কৃষি ব্যবস্থা জলবায়ু পরিবর্তনে গুরুতর প্রভাব ফেলছে। তাই এবারের কপ-২৮ জলবায়ু সম্মেলনে ১৩৪টি দেশের নেতারা প্রথম এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ঘোষণাপত্র সই করেছেন। দুবাইয়ে চলমান এ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ব্রাজিলসহ অন্য যেসব দেশ বিশ্বে খাবারের ৭০ শতাংশ উৎপাদন করে, তারা প্রত্যেকেই জলবায়ু পরিবর্তন রোধের লড়াইয়ে নিজেদের জাতীয় পরিকল্পনায় খাদ্য ও কৃষি খাতকে বিবেচনায় নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বন উজাড় হওয়া, নগরায়ন, জমিতে সারের ব্যবহারের মতো কর্মকান্ড থেকে বিশ্বে এক-পঞ্চমাংশের বেশি কার্বন নিঃসরণ ঘটে। ২০১৫ সালের এক হিসাবে দেখা গিয়েছে, খাদ্য ব্যবস্থা বিশ্বে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উষ্ণায়নের জন্য দায়ী। খাদ্য ও কৃষি খাতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয় ১৮শ কোটি টন। বিবিসি জানায়, কৃষি সংগঠনগুলো কপ-২৮ সম্মেলনের ওই ঘোষণাপত্রকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে দেশগুলোকে তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে বলেও সতর্ক করেছে। সমালোচকরা বলছেন, এই ঘোষণা খুবই অস্পষ্ট। কারণ খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কিভাবে সামাল দেয়া হবে সেটি বিশ্ব নেতারা নির্ধারণ করেননি।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা পৃথিবীকে টিকিয়ে থাকার লড়াইয়ে কার্যকর ভূমিকা নেয়ার পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকির জন্য দায়ী রাষ্ট্রগুলোকে জবাবদিহিতার আওতার এনে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোকে সহায়তা দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা থেকে বের হওয়ার উপায়ও খুঁজে বের করতে বলেছেন তারা।

১৭৬০ সালে ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে পৃথিবীতে কার্বন নিঃসরণ শুরু হয়, যা বায়ুমন্ডলের তাপমাত্র ও বায়ু দূষণের কারণ। শুধু গত এক শতকেই পৃথিবী তাপমাত্রা প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বেড়ে যাবে। আশঙ্কা করা হচ্ছে এ ধারা অব্যাহত থাকলে একবিংশ শতাব্দীর শেষে বিশ্ব থেকে ৪৩টি দেশ সমুদ্রপৃষ্ঠে হারিয়ে যাবে। বাংলাদেশেরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ডুবে যাবে সাগর গর্ভে। অথচ এজন্য যেসব দেশ প্রধানত দায়ী তারা এখনো নির্বিকার। পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ভারত ও রাশিয়া পৃথিবীব্যাপী ৫৫ শতাংশেরও বেশি কার্বন নিঃসরণ করছে। আর অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর এতে ভূমিকা একবারেই নগন্য। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা মাত্র ০.৪৭ ভাগেরও কম। দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ২৮তম জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে রাষ্ট্র/সরকার প্রধানসহ বিভিন্ন পেশার ৮০ হাজার প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করছেন। এ মহাসম্মেলনকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বের মানুষ অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে জলবায়ুর অভিঘাত থেকে পরিত্রাণ পেতে কী বার্তা আসে সেজন্য। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী অধিক কার্বন নিঃসরণে প্রভাবশালী দেশ তথা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা চীনের রাষ্ট্র-সরকারপ্রধান বা শীর্ষস্থানীয় কেউ এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করছেন না।

জলবায়ুবিষয়ক কর্মকান্ডে নেতৃত্বের কণ্ঠস্বর হিসেবে এবং জলবাযু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের পক্ষে বিশ্বব্যাপী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্প্রতি ‘এশিয়া ক্লাইমেট মবিলিটি চ্যাম্পিয়ন লিডার অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করা হয়েছে। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা( আওএম)- সমর্থিত বৈশ্বিক জোট গ্লোবাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট মোবিলিটি (জিসিসিএম) তাকে এ পুরস্কারে ভূষিত করে। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৮তম অধিবেশনের ক্লাইমেট মবিলিটি সামিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ুর কারণে বাধ্য হয়ে অভিবাসন গ্রহণ করা এবং বাস্তুচ্যুতির দিকটি বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টিতে আনেন। এর আগেও বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে ঢাকায় আইওএমের সহযোগিতায় আয়োজিত দুটি সংলাপ এবং গত বছর মিসরের শারম এল শেখে কপ-২৭ এ বিষয়টি তুলে ধরে।

জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং পানি ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ ডেল্টা প্লান ২১০০ প্রণয়ন করছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন জনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে- দুর্যোগ থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য ৪ হাজার ২৯১টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র, ৫২৩টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ এবং ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা।

অন্যদিকে ২০২০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে পৃথিবী ও মানবজাতিকে রক্ষার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন’ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক গোলটেবিল বৈঠকে ভিডিও বার্তায় পাঁচটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবগুলো হলো- ১. রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য উৎসাহিত করতে হবে। ২. বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম রাখা এবং প্যারিস চুক্তির সবগুলো অনুচ্ছেদ বাস্তবায়ন করতে হবে। ৩. জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে প্রতিশ্রুত তহবিল সরবরাহ করতে হবে। ৪. দূষণকারী দেশগুলোকে অবশ্যই প্রশমনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে জাতীয় নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) বৃদ্ধি করতে হবে। ৫. জলবায়ু উদ্বান্তুদের পুনর্বাসনকে একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘এশিয়া ক্লাইমেট মবিলিটি চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান তখই সার্থক হবে যখন ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন’ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে উত্থাপিত তার পাঁচ দফা প্রস্তাব বাস্তবায়নে কপ-২৮ থেকে দৃঢ় ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে- এই প্রত্যাশাই এখন বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা।

[লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন]

গণতন্ত্র কি তাহলে বিদায়ের পথে

কাঁঠাল হতে পারে রপ্তানি বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত

ছবি

প্রাণের মেলা

গণতন্ত্র কি তাহলে বিদায়ের পথে

সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত হোক

সাঁওতালী ভাষা বিতর্ক এবং উত্তরবঙ্গের আদিবাসী

ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার রাজধানীর আজিমপুর

ছবি

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালির নবজাগরণ

খুলনায় একুশে বইমেলার মুগ্ধতা

মধুরতম ভাষা ও রক্তাক্ত বাংলা

উৎসব ও প্রথার বিবর্তন

চুরমার ফিলিস্তিন ও খাদ্য রাজনীতি

কুষ্ঠজনিত মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে করণীয়

যুব ক্ষমতায়ন স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণকে ত্বরান্বিত করবে

লাইব্রেরির ভবিষ্যৎ ও ভবিষ্যতের লাইব্রেরি

একজীবনে অনেক বছর বেঁচে থেকেও নিজেকে চেনা হয়ে ওঠে না

“ছুরি-কাঁটা ও নব্যধনী”

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সন্দেশখালি লাইন

শিশুরও হতে পারে ক্যান্সার, প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

চিকিৎসা নিতে কেন ভারতে গিয়েছিলাম

ইসরায়েলের গণহত্যা, দক্ষিণ আফ্রিকার মামলা

বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু গণিত

ছবি

সুন্দরবন কি আরেকটু বেশি মনোযোগ পেতে পারে না

নিজেকে বরং নিজেই প্রশ্ন করতে শিখুন

গড়ে উঠুক সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

ছবি

বিদ্যা দেবী মা সরস্বতী

বিশ্ব বেতার দিবস ও বাংলাদেশ বেতার

কৃষিবিদ দিবস

ছয় বছরের অর্জন ও প্রত্যাশা

জলবায়ু সম্মেলন এবং নয়া উদারবাদী কর্তৃত্ব

জিআই সনদের সন্ধানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ

নির্বাচন ও সামাজিক অস্থিরতা

ছবি

খাদ্যে আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরোনোর পথ কী

ছবি

ট্রাম্প দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন, তবে পথ মসৃণ নয়

দুর্নীতিবাজদের খতম করা যাবে কি?

মূল্যস্ফীতি কমবে কীভাবে

tab

উপ-সম্পাদকীয়

কপ-২৮ ও বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা

নিতাই চন্দ্র রায়

বৃহস্পতিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে পৃথিবী আজ এক মহা সংকটের সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও দাবানলের মতো প্রতিঘাত দৃশ্যমান হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাগর অধিক উষ্ণ থাকে বলে সামুদ্রিক ঝড়ের সঙ্গে বেশি বৃষ্টিপাত ও বন্যার প্রাদুর্ভাব ঘটে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০২৫ সালের মধ্যে থেমে যাবে আটলান্টিক মহাসাগরের স্রোত। ইতোমধ্যে অ্যান্টার্কটিকার পৃথিবীর বৃহত্তম বরফখন্ড গলে ও সরে গিয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। সিডর, আইলা ও মহাসেনে ক্ষয়-ক্ষতি কাটিয়ে উঠার আগেই মিধিলির আঘাতে সম্প্রতি বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের অগণিত মানুষ চরম ক্ষতির শিকার হয়েছে। নোয়াখালীর ৫টি উপকূলীয় উপজেলা- হাতিয়া, সুবর্ণচর, কবিরহাট, কোম্পানীগঞ্জ ও সদর উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়নে কয়েকশ বাড়ি-ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে ডালপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড় মিধিলির প্রভাবে পটুয়াখালীতে পাকা আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলার ১ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর আমন ধানের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা। বরিশালে ঘূর্ণিঝড়ে শীতকালীন সবজি ও আমন ধানের ক্ষতি ছাড়াও মৎস্য ও ঘর-বাড়ির ক্ষতি হয়েছে অনেক জায়গায়।

এমনই এক সংকটময় সময়ে এবারের বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৮ অনুষ্ঠিত হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী দুবাইয়ে। বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে রাখার এজেন্ডার পাশাপাশি এবারের সম্মেলনে প্রভাব রেখেছে ইসরাইল-হামাস দ্বন্দ্ব। ৩০ নভেম্বর সম্মেলনের উদ্বোধন করেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। এবারের সম্মেলনের শুরুতেই ইতিবাচক কিছু বিষয় দেখা গেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিধ্বস্ত দুর্বল দেশগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত তহবিল চালু করতে সম্মত হয়েছেন সম্মেলনের নেতারা। প্রতিনিধিদের জীবাশ্ম জ্বালানির ভবিষ্যৎ থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘ বিষয়সমূহ নিয়ে আলোচনা করার কথা রয়েছে।

সম্মেলনের শুরুতেই জাতিসংঘ প্রধান সতর্ক করে বলেছেন, ২০২৩ সালে বিশ্বেরউষ্ণতম বছর হতে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য পূরণ হবে না।

বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশই জলবায়ু সংকটে ঝুঁকির মুখে আছে বলে গবেষণায় দেখা গেলেও একই সময়ে আমাদের খাদ্য ও কৃষি ব্যবস্থা জলবায়ু পরিবর্তনে গুরুতর প্রভাব ফেলছে। তাই এবারের কপ-২৮ জলবায়ু সম্মেলনে ১৩৪টি দেশের নেতারা প্রথম এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ঘোষণাপত্র সই করেছেন। দুবাইয়ে চলমান এ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ব্রাজিলসহ অন্য যেসব দেশ বিশ্বে খাবারের ৭০ শতাংশ উৎপাদন করে, তারা প্রত্যেকেই জলবায়ু পরিবর্তন রোধের লড়াইয়ে নিজেদের জাতীয় পরিকল্পনায় খাদ্য ও কৃষি খাতকে বিবেচনায় নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বন উজাড় হওয়া, নগরায়ন, জমিতে সারের ব্যবহারের মতো কর্মকান্ড থেকে বিশ্বে এক-পঞ্চমাংশের বেশি কার্বন নিঃসরণ ঘটে। ২০১৫ সালের এক হিসাবে দেখা গিয়েছে, খাদ্য ব্যবস্থা বিশ্বে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উষ্ণায়নের জন্য দায়ী। খাদ্য ও কৃষি খাতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয় ১৮শ কোটি টন। বিবিসি জানায়, কৃষি সংগঠনগুলো কপ-২৮ সম্মেলনের ওই ঘোষণাপত্রকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে দেশগুলোকে তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে বলেও সতর্ক করেছে। সমালোচকরা বলছেন, এই ঘোষণা খুবই অস্পষ্ট। কারণ খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কিভাবে সামাল দেয়া হবে সেটি বিশ্ব নেতারা নির্ধারণ করেননি।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা পৃথিবীকে টিকিয়ে থাকার লড়াইয়ে কার্যকর ভূমিকা নেয়ার পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকির জন্য দায়ী রাষ্ট্রগুলোকে জবাবদিহিতার আওতার এনে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোকে সহায়তা দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা থেকে বের হওয়ার উপায়ও খুঁজে বের করতে বলেছেন তারা।

১৭৬০ সালে ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে পৃথিবীতে কার্বন নিঃসরণ শুরু হয়, যা বায়ুমন্ডলের তাপমাত্র ও বায়ু দূষণের কারণ। শুধু গত এক শতকেই পৃথিবী তাপমাত্রা প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বেড়ে যাবে। আশঙ্কা করা হচ্ছে এ ধারা অব্যাহত থাকলে একবিংশ শতাব্দীর শেষে বিশ্ব থেকে ৪৩টি দেশ সমুদ্রপৃষ্ঠে হারিয়ে যাবে। বাংলাদেশেরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ডুবে যাবে সাগর গর্ভে। অথচ এজন্য যেসব দেশ প্রধানত দায়ী তারা এখনো নির্বিকার। পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ভারত ও রাশিয়া পৃথিবীব্যাপী ৫৫ শতাংশেরও বেশি কার্বন নিঃসরণ করছে। আর অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর এতে ভূমিকা একবারেই নগন্য। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা মাত্র ০.৪৭ ভাগেরও কম। দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ২৮তম জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে রাষ্ট্র/সরকার প্রধানসহ বিভিন্ন পেশার ৮০ হাজার প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করছেন। এ মহাসম্মেলনকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বের মানুষ অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে জলবায়ুর অভিঘাত থেকে পরিত্রাণ পেতে কী বার্তা আসে সেজন্য। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী অধিক কার্বন নিঃসরণে প্রভাবশালী দেশ তথা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা চীনের রাষ্ট্র-সরকারপ্রধান বা শীর্ষস্থানীয় কেউ এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করছেন না।

জলবায়ুবিষয়ক কর্মকান্ডে নেতৃত্বের কণ্ঠস্বর হিসেবে এবং জলবাযু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের পক্ষে বিশ্বব্যাপী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্প্রতি ‘এশিয়া ক্লাইমেট মবিলিটি চ্যাম্পিয়ন লিডার অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করা হয়েছে। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা( আওএম)- সমর্থিত বৈশ্বিক জোট গ্লোবাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট মোবিলিটি (জিসিসিএম) তাকে এ পুরস্কারে ভূষিত করে। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৮তম অধিবেশনের ক্লাইমেট মবিলিটি সামিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ুর কারণে বাধ্য হয়ে অভিবাসন গ্রহণ করা এবং বাস্তুচ্যুতির দিকটি বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টিতে আনেন। এর আগেও বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে ঢাকায় আইওএমের সহযোগিতায় আয়োজিত দুটি সংলাপ এবং গত বছর মিসরের শারম এল শেখে কপ-২৭ এ বিষয়টি তুলে ধরে।

জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং পানি ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ ডেল্টা প্লান ২১০০ প্রণয়ন করছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন জনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে- দুর্যোগ থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য ৪ হাজার ২৯১টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র, ৫২৩টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ এবং ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা।

অন্যদিকে ২০২০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে পৃথিবী ও মানবজাতিকে রক্ষার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন’ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক গোলটেবিল বৈঠকে ভিডিও বার্তায় পাঁচটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবগুলো হলো- ১. রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য উৎসাহিত করতে হবে। ২. বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম রাখা এবং প্যারিস চুক্তির সবগুলো অনুচ্ছেদ বাস্তবায়ন করতে হবে। ৩. জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে প্রতিশ্রুত তহবিল সরবরাহ করতে হবে। ৪. দূষণকারী দেশগুলোকে অবশ্যই প্রশমনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে জাতীয় নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) বৃদ্ধি করতে হবে। ৫. জলবায়ু উদ্বান্তুদের পুনর্বাসনকে একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘এশিয়া ক্লাইমেট মবিলিটি চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান তখই সার্থক হবে যখন ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন’ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে উত্থাপিত তার পাঁচ দফা প্রস্তাব বাস্তবায়নে কপ-২৮ থেকে দৃঢ় ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে- এই প্রত্যাশাই এখন বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা।

[লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন]

back to top